এ-বছরের প্রথম দিনটি ছিল শিল্পী অধ্যাপক মোহাম্মদ কিবরিয়ার ৯৭তম জন্মদিন। গুণী ও খ্যাতনামা এই শিল্পীর জন্মদিনে রাজধানীর লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে তাঁর নির্বাচিত ৮৪টি অপ্রদর্শিত মৌলিক শিল্পকর্ম (১৯৮০-২০০৬) নিয়ে প্রদর্শনী শুরু হয়েছিল গত ১লা জানুয়ারি। এটি শেষ হয় জানুয়ারির ২৬ তারিখ।
প্রদর্শনীটি দেখে মনে হয়েছে, এ শুধু চিত্রকর্মের সমারোহ নয়; এই কাজগুলোয় একজন পরিণত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিদগ্ধ শিল্পীর একপ্রকার নীরব আত্মসংলাপ অনুভব করা যায়।
১৯৮০ থেকে ২০০৬ সময়পর্বের ৮৪টি কাজ নিয়ে আয়োজিত এই প্রদর্শনী মূলত শিল্পীর শিল্পকৃতি প্রকাশের চেয়ে মনে হয়েছে আগামীর জন্য তাঁর সঞ্চয়। যেগুলো তিনি রেখে দিয়েছিলেন অন্য কোনো পরিকল্পনার প্রস্তুতি হিসেবে। তাঁর চলে যাওয়ার দুই দশক পর পরিবারের আগ্রহ ও ইচ্ছায় এই আয়োজন।
মোহাম্মদ কিবরিয়ার জীবনের পটভূমি এই পাঠের জন্য অপরিহার্য। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁকে অনিচ্ছাকৃত অভিবাসীতে পরিণত করেছিল। ১৯২৯ সালের ১লা জানুয়ারি তাঁর জন্ম পশ্চিম বাংলার বীরভূম জেলার সুরি গ্রামে। ১৯৫০ সালে তিনি কলকাতা আর্ট স্কুল থেকে স্নাতক সমমানের শিক্ষা সমাপ্ত করে একাকী ঢাকায় আসেন। এই বাস্তুচ্যুতি তাঁর শিল্পে কখনো সরাসরি বিষয় হয়ে ওঠেনি, কিন্তু তার অভিঘাত ছড়িয়ে আছে ভাঙা ফর্ম, স্তরবিন্যাস, নীরবতা ও অসম্পূর্ণতার ভাষায়। প্রাথমিক কিউবিস্ট পর্বে সেই ভাঙন ছিল দৃশ্যমান ও কাঠামোগত; জাপানে উচ্চশিক্ষার পর তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় ভাষাহীন, ধ্যানী বিমূর্ততায়।
এই প্রদর্শনীর চিত্রকর্মের ছাব্বিশ বছরের সময়পর্বটির অনেক আগে থেকেই কিবরিয়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে নানা সম্মাননাপ্রাপ্তিতে যেমন অগ্রসর, সুপ্রতিষ্ঠিত, তেমনই দেশের প্রধান বোদ্ধা এক চিত্রকর। পারিবারিক সংগ্রহে থাকা স্বাক্ষরবিহীন যেসব কাজ, অসম্পূর্ণ কোলাজ কিংবা কলমে অংকনকৃত নারীদেহের অনুকৃতি দেখা গেছে, এগুলো হয়তো শিল্পীর বড় আকৃতির চিত্রপটে আঁকার সুবিধার্থে করা শিল্পীর খসড়া কাজ। কিবরিয়ার এসব খসড়া কাজের মধ্যে ১৯৮৩ সালে কামরুল হাসান কৃত কালি ও কলমে আঁকা এক নারী-অবয়বও ছিল।
শিল্পীপুত্র নারশিদ কিবরিয়ার লেখায় জানা গেল, তাঁর পিতা বাড়ির অলিন্দ্যে বসে চা পান করতে করতে পাশেই রাখা নানা রঙের কাগজ, অন্য শিল্পীর প্রদর্শনীর ক্যাটালগ, কাটার, কাঁচি, ম্যাগাজিন, কলম, পেনসিল, আঠা এসব ব্যবহার করে কোলাজ তৈরি করতেন। নারশিদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি – তাঁর পিতা কিবরিয়া কাগজে অনুভূতিপ্রবণ পরিবেশ ও মুড তৈরি করে একটু একটু করে কাজ অগ্রসর করতেন। এক্ষেত্রে চিত্র গঠনের চেয়ে তাঁর অন্তর্গত অনুভূতির প্রকাশটিই গুরুত্বপূর্ণ।
মাধ্যমগতভাবে প্রদর্শনীতে রয়েছে ৬০টির বেশি কোলাজ, ১৫ থেকে ১৮টি মিশ্র মাধ্যম ড্রয়িং ও ইংক ওয়ার্ক, সীমিত কিছু ছাপাই বা এচিং এবং শেষ পর্যায়ে অয়েল প্যাস্টেল ও কাগজে তেলরঙের কাজ। সবই কাগজে, এই ছোট পরিসর ও মাধ্যম ইংগিত করে – এগুলো ঠিক গ্যালারির চার দেয়ালে শোভা বৃদ্ধির জন্য আঁকা বা তৈরি নয়; এগুলো স্টুডিওর ভেতরে চিন্তার পরিসর সৃষ্টির জন্যই শিল্পীর প্রয়াস ছিল। সমগ্র কিবরিয়ার সৃষ্টিশীলতার অদেখা রূপটি এবার দর্শক-বোদ্ধারা দেখতে পেলেন এ-প্রদর্শনীর হাত ধরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে বিশ্ব-শিল্পের ক্ষেত্রে যে পরিবর্তন হয়েছিল, যে আধুনিক ধ্যান শিল্পকে নতুন ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে, এর পরিশীলিত ছাপ এই প্রদর্শনীর কাজগুলোর পটভূমিতে।
গত শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশকে নিউইয়র্ক স্কুলের শিল্পীরা রংকে আবহে রূপ দেওয়ার যে-ভাষা তৈরি করেছিলেন, তার প্রতিধ্বনি কিবরিয়ার বড় ক্যানভাসে ধ্বনিত হলেও ছোট আকৃতির খসড়া কাজগুলোয় সেই নাটকীয়তা নেই। ইউরোপীয় আধুনিকতায় স্থানিক ও সময়ের চিহ্ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও কিবরিয়ার কাজে ওদের রুক্ষতা নেই, তাঁর চিত্রপট সংযত ও নমিত শিল্পীর স্বভাবের অনুরূপ। কাজের উপস্থাপন ও প্রবণতায় তাঁর সঙ্গে পল ক্লি, মার্ক রথকোর আত্মীয়তা প্রত্যক্ষ করা গেলেও এই প্রদর্শনী দেখিয়ে দেয় যে, কিবরিয়া তাঁদের মনের ভেতরে নিয়েছেন, গ্রহণ করেছেন, তবে তা রূপান্তর করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে উচ্চতর শিল্পশিক্ষা গ্রহণে কিবরিয়ার জাপানগমন। সেখানে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিল্পের গতিপ্রকৃতি প্রত্যক্ষ করেন এবং নিজ চিত্রকলার এতকালের ধ্যানকে বদলে ফেলার প্রেরণা পেয়ে যান।
এবার প্রদর্শিত কাজগুলোর কতকটি নিয়ে আলোচনা করা যাক। ১৯৮০ সালে আঁকা তেরোটি চিত্র ও কোলাজচিত্র এই প্রদর্শনীতে দেখা গেল। যেমন চিত্র-১, ২, ৩, ৪, ৬, ২৬ এবং ২৮ থেকে ৩৪ সংখ্যক।
চিত্র-১-এর ওপরে ও নিচে গাঢ় নীল রঙের আলোছায়ার মাঝে ডট, রেখার কারিকুরিসহ প্রায় ফাঁকা জায়গাটুকু যেন পুরো চিত্র গঠনের ভার বহন করে শ্বাস ফেলার জন্য রাখা।
১৯৮৭ সালে আঁকা চিত্র-৫-এর সংযত রেখা, জলরঙের ওয়াশ প্রকাশ করে একটি অবয়বিক ফর্ম। চিত্র-৬-এ সাদা স্পেসে জলরঙের স্বচ্ছ হালকা ওয়াশের ওপরে অকস্মাৎ কালচে রং ছেড়ে ভাঙা উল্লম্ব ফর্ম তৈরি করেছেন শিল্পী।
চিত্র-৯-এর কাগজের কোলাজে ছেঁড়া অসম প্রান্ত আমাদের নিয়ে যায় অসম্পূর্ণতার রূপ কিংবা ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে। চিত্র-১৮-তে দেখা যায়, তিন টুকরো কাগজের কোলাজের কেন্দ্রে হালকা ওয়াশের মধ্যে সূক্ষ্ম ও মোটা রেখার উচ্ছ্বাস। অন্য দুটি কালচে টুকরোয় সাদা, বাদামি ও লালচে পোড়ামাটির মতো ছেঁড়া কাগজ জুড়ে দেওয়া। অসম প্রান্তকে গুরুত্ব দিয়ে স্পেস বিভাজনের চমৎকার চাক্ষুষ রূপ এখানে প্রতিভাত হয়েছে।
চিত্র-৩২-এও প্রিন্টেড ও স্বচ্ছ কাগজ কালো রং কাগজের ওপর পেস্টিং করে শিল্পী দুই প্রান্তে মানব অবয়বাকৃতির আবহে স্বতঃস্ফূর্ত রেখায় একাধিক টান এবং এর ওপরে, নিচে এবং দুপাশে ছাপা কাগজের ছেঁড়া কাটা অংশ জুড়ে দিয়েছেন। এতে প্রকাশ করে ইঙ্গিতের ভাষ্য।
চিত্র-৭৯-তে আমরা প্রত্যক্ষ করি কালো এবং ধূসর বর্ণের বিপরীতধর্মী ঐক্য। এর প্রায় নির্জন ভূ-স্তরে বৃষ্টি ও বাতাসের অঙ্গভঙ্গি, যেখানে শিল্পীর অদেখা উপস্থিতি আছে যেন।
এই প্রদর্শনীর আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, কোথাও কেবল একটি সাদাকালো ম্যাগাজিনের ছবি কেটে লাগানো হয়েছে, কোনো রং বা হাতের কাজ এখানে প্রায় নেই।
এটি শিল্পকর্ম হিসেবে দর্শককে দেখানোর জন্য নয়;
এটিকে বলা যায় অনেকটা ছবির খসড়া। শিল্পভাষ্য নির্মাণের আগেই একজন অভিবাসী মানুষের মতোই শিল্পী এখানে তাঁর স্মৃতি, ইমেজ ও আবহকে অনেক দিন ধরে জমা করেন। এখানেই মোহাম্মদ কিবরিয়া বিশ্বশিল্পে অনন্য। তিনি আধুনিকতার কোনো একপাক্ষিক কেন্দ্র অনুকরণ করেননি। জাপানি জেন-ভাবধারাকে তিনি সাংস্কৃতিক অলংকার হিসেবে ব্যবহার করেননি। একে গ্রহণ করেছেন মেথড ও নৈতিকতা হিসেবে।
নিউইয়র্ক, ইউরোপ ও জাপানের অভিজ্ঞতা তিনি একত্র করেছেন একজন দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীর স্মৃতিবোধের তাড়না থেকে। তাঁর আধুনিকতা তাই উচ্চকিত ও আক্রমণাত্মক নয় – বরং তাঁর স্বভাবের মতো নীরব, সংযত ও মানবিক। এই প্রদর্শনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় – আধুনিক শিল্প সব সময় উচ্চকণ্ঠ নয়। গভীর সত্যটি অনেক সময় প্রকাশ পায় নীরবতার মধ্য দিয়েই।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.