বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি ও কথাসাহিত্যিক আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা-আন্দোলনের সময় দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। এই আন্দোলনকে নিয়ে তিনি চার লাইনের একটি কবিতা লিখে পুলিশি হয়রানির শিকার হন। গ্রেফতার এড়াতে তিনি দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে পালিয়ে বেড়ান। এ-কারণেই তাঁর অ্যাকাডেমিক শিক্ষার তেমন অগ্রগতি ঘটাতে পারেননি। আল মাহমুদের প্রথম দিকের কবিতা মূলত প্রেম, দেশপ্রেম ও প্রকৃতি নিয়ে রচিত। দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতার মূল বক্তব্য সৌন্দর্যের আদি কারণ অনুসন্ধান ও আধ্যাত্মিকতা। আল মাহমুদের প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে লোক লোকান্তর (১৩৭০), কালের কলস (১৩৭৩), সোনালী কাবিন (১৯৭৩), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬), অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না (১৯৮০), পাখির কাছে ফুলের কাছে (১৯৮০), বখতিয়ারের ঘোড়া (১৯৮৫), আরব্য রজনীর রাজহাঁস (১৯৮৭), প্রহরান্তের পাশফেরা (১৯৮৮), এক চক্ষু হরিণ (১৯৮৯), মিথ্যাবাদী রাখাল (১৯৯৩), আমি দূরগামী (১৯৯৪), হৃদয়পুর (১৯৯৫), দোয়েল ও দয়িতা (১৯৯৭), দ্বিতীয় ভাঙন (২০০০), নদীর ভিতরে নদী (২০০১), পানকৌড়ির রক্ত (১৯৭৫), সৌরভের কাছে পরাজিত (১৯৮২), গন্ধবণিক (১৯৮৮), ডাহুকী, কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, কবি ও কোলাহল, মরু মূষিকের উপত্যকা, রিপু, যে পারো ভুলিয়ে দাও, আগুনের মেয়ে, পুরুষ সুন্দর, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.), যেভাবে বেড়ে উঠি, দিনযাপন, কবির আত্মবিশ্বাস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তার মধ্যে লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, পানকৌড়ির রক্ত ও সৌরভের কাছে পরাজিত গ্রন্থে আল মাহমুদের মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনার প্রকাশ ঘটেছে।
আল মাহমুদ নারীকে তাঁর কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে খুঁজে নিয়েছেন। যৌনতা-বিষয়ে আল মাহমুদের কোনো জড়তা নেই। তিনি এ-প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি অজু করে সাহিত্য রচনা করি না। পুরুষ মানুষ হিসেবে যা দেখেছি তাই লিখেছি। তার মানে এই নয় যে, আমি ইচ্ছাকৃতভাবে নগ্নতা বা অশ্লীলতাকে জড়িয়ে লিখেছি। বাস্তব অর্থে মানবজীবন যেমন, তার আচরণ যেমন, তার সম্বন্ধসূত্র যেমন, তার যৌনতা যেমন, সবগুলি নিয়েই সাহিত্য হয়।’ তিনি নারীকে কেবল যৌন-সহচরী হিসেবে দেখেননি; কঠিন, কঠোর বাস্তবতায় কামনা করেছেন যৌথ আনন্দ-বেদনার অংশীদার হিসেবে। আল মাহমুদের নারী যৌনগন্ধময় ও সংগ্রামশীল। নারীর শরীরে তিনি খুঁজে পান কবিতার অকৃত্রিম অনুপ্রেরণা। নারীর দৈহিক সৌন্দর্য কখনো কখনো আল মাহমুদকে প্রবলভাবে কাতর করে। নারীর সৌন্দর্যকে কবি অনুভব এবং উপভোগ করতে চান। নারীর রূপ বর্ণনায় আল মাহমুদ দ্বিধাহীন। নারীদেহের একটি বিশেষ অঙ্গের বর্ণনায় তিনি চমৎকার উপমার সৃষ্টি করেছেন। যেমন –
ক.
আর ভাবি তোমার বসনহীন বুকের উপমা হওয়ার জন্যই
আজ পৃথিবীর এই পর্বতশিরায় বরফ জমছে।
(‘ঘৃণার পালঙ্কে’, মিথ্যাবাদী রাখাল)
খ.
জানি না কিভাবে এই মধ্যযামে আমার সর্বস্ব নিয়ে আমি
ঘরে যাই দুটি চোখ, যেন জোড়া যমজ ভ্রমর পাশাপাশি
বসে আছে ঈষদুষ্ণ মাংসের ওপর।
(‘অবগাহনের শব্দ’, সোনালী কাবিন)
গ.
আবার পুরনো দৃশ্যে ফিরে গিয়ে দেখি;
সমস্ত বোতাম খোলা, শিশুর মুখের কাছে
ফলভারে সুঠাম কামনা। শিয়রে রেহেলে রাখা
আল্লার আদেশ। বাতিদানে আচ্ছাদিত ময়ূরপুচ্ছের প্রায় মোমের
আগুন।
(‘শিল্পের ফলক’, লোক লোকান্তর)
আল মাহমুদ ‘আমি ও আমার কবিতা’ প্রবন্ধে তাঁর কবিতার বিষয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন, ‘আমার কবিতার প্রধান বিষয় হলো নারী। আমি এক সময় ভাবতাম একজন কবি-পুরুষের কাছে নারীর চেয়ে সুন্দর আর কে আছে? না, কিছু নেই। পৃথিবীতে যত জাতির কবিতায় যত উপমা আছে আমি আমার সাধ্যমতো পরীক্ষা করে দেখেছি, সবই নারীর সঙ্গে তুলনা করেই। দয়িতার দেহের উপমা দিতে কবিরা পৃথিবী নামক এই গ্রহটাকে চষে ফেলেছেন। এমন নদী, পর্বত বা প্রান্তর নেই, যার সঙ্গে কবিরা তাঁদের প্রেমিকার স্তন, ঊরু, অলকদাম বা নিতম্বের তুলনা দেননি। এভাবেই মানুষ তার প্রিয় মানবীর রহস্য ও রূপের সঙ্গে প্রকৃতির রহস্য ও সৌন্দর্যের সম্মিলন ঘটিয়েছেন এবং প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে উপনীত হয়েছেন আধ্যাত্মিকতায়, ধর্মে। আমার কবিতার আরেক প্রধান বিষয় হলো প্রকৃতি। আমি নিসর্গরাজি অর্থাৎ প্রকৃতির মধ্যে এমন একটা সংগুপ্ত প্রেমের মঙ্গলময় ষড়যন্ত্র দেখতে পাই, যা আমাকে জগৎ-রহস্যের কার্যকারণের কথা ভাবায়। একঝাঁক পাখি যখন গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়ায়, মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে পতঙ্গ ও পিঁপড়ের সারি আর মৌমাছিরা ফুল থেকে ফুলে মধু শুষে ফিরতে থাকে, আমি তখন এই আয়োজনকে সুন্দরই বলি না বরং অন্তরালবর্তী এক গভীর প্রেমময় রমণ ও প্রজননক্রিয়ার নিঃশব্দ উত্তেজনা দেখে পুলকে শিহরিত হই। মনে আদিম মানুষের মতো অতিশয় প্রাথমিক এক দার্শনিক জিজ্ঞাসা জাগে – কে তুমি আয়োজক? তুমিও কবি? না কবিরও নির্মাতা? তবে তুমি যে অনিঃশেষ সুন্দর আমি তার সাক্ষ্য দিচ্ছি। আমার সাক্ষ্য গ্রহণ করো প্রভু। এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কোরানে এসে উপনীত হয়েছি।’ কবির উপরোক্ত স্বীকারোক্তি থেকে পাঠকরা অতি সহজেই আল মাহমুদের কবি-আত্মা ও কাব্যবিশ্বাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবেন।
(উপমা, আল মাহমুদ সংখ্যা, মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন)
আল মাহমুদ জীবনের প্রথম দিকে মার্কসবাদী জীবনাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। মার্কসবাদী চিন্তাচেতনা বা শ্রেণিহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্ন তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি মুখে মার্কসবাদের কথা বললেও বাস্তবে মার্কসবাদী ছিলেন না। ১৯৭৪ সালে জাসদ-সমর্থিত দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক হলে তৎকালীন সরকারের নির্দেশে তিনি গ্রেফতার হন। জেলে থাকাকালীন তাঁর জীবনাদর্শের পরিবর্তন হয়। তিনি মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনা বাদ দিয়ে ধর্মকেন্দ্রিক জীবনাদর্শে নিমগ্ন হন। এ-সময়ের ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এদেশে একটা র্যাডিক্যাল সংবাদপত্র সম্পাদনা করতে গেলে যা হয়, আমার ভাগ্যেও তাই ঘটলো। অর্থাৎ বিনা কারণে আমার জেল হয়ে গেল। আমি এক বছর বিনা বিচারে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকার সময় হঠাৎ আমার পিতার আদেশ পালনের সুযোগ পাই। অর্থাৎ একখন্ড পবিত্র কুরআন আমার স্ত্রী আমাকে জেলখানায় দিয়ে এলে আমি তা অর্থসহ আদ্যোপান্ত পাঠ করা শুরু করি। আর প্রথম পাঠেই আমার শরীর কেঁপে ওঠে। এর আগে কোনো গ্রন্থ পাঠে আমার মধ্যে এমন ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়নি। যেন এক অলৌকিক নির্দেশে আমার মস্তক মাটিতে গুটিয়ে পড়ে।’ আল মাহমুদ চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো থেকে মার্কসবাদী দর্শন ত্যাগ করে আল কোরান দ্বারা প্রভাবিত হন। সোনালী কাবিন পর্যায়ে তাঁর কবিভাবনা ছিল এরকম :
কিছুই থাকে না কেন? কারোগেট, ছন কিংবা মাটির দেয়াল
গাঁয়ের অয় বট উপড়ে যায় চাটগাঁর দারুণ তুফানে
চিড় খায় পলেস্তারা, বিশ্বাসের মতন বিশাল
হুড়মুড় শব্দে অবশেষে
ধসে পড়ে আমাদের পাড়ার মসজিদ।
(‘বাতাসের ফেনা’, সোনালী কাবিন)
মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো কাব্যগ্রন্থে সেই ধসে পড়া পাড়ার মসজিদটি বিধ্বস্ত হয়েছে ভিন্ন দৃষ্টিতে –
তবু আমার মনে হলো, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কাত হয়ে পড়া
গম্বুজটিই বুঝিবা খানিকটা উঁচু হয়ে আছে।
(‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)
আল মাহমুদ সোনালী কাবিন কাব্যে যে-মসজিদকে ভেঙে যেতে দেখেছিলেন, মতাদর্শের পরিবর্তনের কারণে তাঁর কাছে মনে হচ্ছে মসজিদের গম্বুজটি ‘খানিকটা উঁচু’ হয়ে আছে। ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তন এভাবে তাঁর চিন্তাচেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আমূল বদলে দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মন্ত্রে উজ্জীবিত আল মাহমুদ প্রথম দিকে লিখেন :
শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতের উঠিয়েছে হাত
হিয়েনসাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা,
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোশাকে এসো এঁটে দিই বীরের তকোমা।
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ,
(‘সোনালী কাবিন ১০’, সোনালী কাবিন)
ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থান বদলের পর কবি আল মাহমুদ কবিতা লিখেন এভাবে –
মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে
মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;
আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।
… … …
আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা
মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।
(‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, বখতিয়ারের ঘোড়া)
আল মাহমুদ প্রচলিত শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে ঘোষণা করেন : ‘ইসলামকে আমি গ্রহণ করেছি আমার জীবনের সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে।’ তাঁর মনে প্রবল ধারণা জন্মেছে যে, একমাত্র ইসলামই পারে রাষ্ট্রের সকল সমস্যার সমাধান করতে। খাঁটি মুসলমানের মতো তাই তো তিনি একজন ইমামের অনুসন্ধান করেন। তিনি লিখেন –
চলো অপেক্ষা করি সেই ইমামের
যিনি নীল মসজিদের মিনার থেকে নেমে আসবেন
মেশকের সুরভি ছড়িয়ে পড়বে
পৃথিবীর দুঃসহ বস্তিতে।
(‘নীল মসজিদের ইমাম’, বখতিয়ারের ঘোড়া)
কমরুদ্দিন আহমদ (জ. ১৯৬৫) একজন কবি ও গবেষক। আশির দশক থেকে তিনি লেখালেখি শুরু করেন। এ পর্যন্ত তিনি ছয়টি গ্রন্থের জনক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো – শহর ছেড়েই যাবো (২০০৬), সবুজ সুখের পুলক (২০০৭), বিষাদের ভাসানে জলজ ঘাতক (২০০৯), আধুনিক কবিতা : প্রাসঙ্গিক বিবেচনা (২০১১), হৃদয় শঙ্খ তীরে (২০১৩) এবং এ-বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধগ্রন্থ আল মাহমুদ : কবি ও কথাশিল্পী (২০১৫)। আমাদের আলোচ্য গ্রন্থ শেষেরটি। এ-গ্রন্থে গবেষক কমরুদ্দিন আহমদ আল মাহমুদের সমগ্র সাহিত্যকর্মের আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছেন। তিনি বিষয়ক্রম সাজিয়েছেন এভাবে – আবহমান বাংলাকাব্যে আল মাহমুদ, সোনালী কাবিন : জৈবিক সংকটের শিল্পরূপ, আল মাহমুদের ছন্দ ও উপমা, আল মাহমুদের কবিতায় কাহিনিকাব্যের খন্ড-আস্বাদ, আল মাহমুদ : ব্যতিক্রমী ছড়াশিল্পী, আল মাহমুদের উপন্যাস : নরনারীর বিচিত্র হৃদ্যতার সাতকাহন, ডাহুকী সমাজস্বীকৃত প্রেমের জয়গান, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস উপমহাদেশ, পারিবারিক উপন্যাস অর্ধেক মানবী, কাবিলের বোন দ্বান্দ্বিক জটিলতায় বৈধতার বন্ধন, আল মাহমুদের ছোটগল্প, প্রাবন্ধিক আল মাহমুদ, আল মাহমুদের কবিতায় নন্দনতত্ত্ব ও লোকসংস্কৃতি ও আল মাহমুদের কবিতায় মিথের ব্যবহার। নিম্নে কমরুদ্দিন আহমদের কয়েকটি প্রবন্ধের আলোচনার প্রয়াস পাব। সোনালী কাবিন : জৈবিক সংকটের শিল্পরূপ এই শিরোনামে তিনি আল মাহমুদের সোনালী কাবিন কাব্যগ্রন্থের কিছু কবিতার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আবহমান বাংলার বাঙালির জীবন-যাপন, মৃত্যুর সীমারেখাকে অতিক্রম করে ভাষা আর ‘প্রেমময় কাব্যে’র শপথের নান্দনিকতায় পাঠকচিত্তকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে যায়, আল মাহমুদের সোনালী কাবিন।… লোক লোকান্তর ও কালের কলসে দেখেছি কবির ব্যক্তিগত আত্মিক সংকট। সোনালী কাবিনে এসে প্রাধান্য পেয়েছে জৈবিক সংকট। সোনালী কাবিনের পূর্বে প্রাতিস্বিকতাকে ছুঁতে পারেননি কবি। তখন কবির প্রধান ভর ছিল কল্পনা, প্রতিভা এবং অনন্য কাব্যভঙ্গির ওপর। সোনালী কাবিনে এসে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক ভাষারীতির ধরন। আঞ্চলিক ভাষারীতির মিশ্রণ আল মাহমুদের কবিতাকে শুধু অভিনব করেনি, বাংলা কবিতায় আধুনিকতাকে তিরিশি কবিতার পর বহুদূর প্রসারিত করে দিয়েছে। এখানে এসে জীবনানন্দের পর আল মাহমুদও পরবর্তী কবিদের কবি হয়ে উঠেছেন।’ (পৃ ৩১ ও ৩৩)।
আল মাহমুদ ছড়া-সাহিত্যে উজ্জ্বলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। ছড়া ও কবিতাকে তিনি আলাদাভাবে দেখতে নারাজ। কাব্যজীবনের প্রথম দিকে রচিত পাখির কাছে ফুলের কাছে গ্রন্থটিকে ছড়ার বই বললেও পরবর্তীকালে আলাদাভাবে কোনো ছড়াগ্রন্থ রচনা করেননি। বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থে ছড়াজাতীয় রচনাগুলো স্থান পেয়েছে। আরব্য রজনীর রাজহাঁস, প্রহরান্তের পাশফেরা, এক চক্ষু হরিণ, বারুদগন্ধী মানুষের দেশ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে তাঁর ছড়া-কবিতাগুলো স্থান পেয়েছে। পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন কবি লেখেন ‘৩-সংখ্যক সনেট’।
ট্রাক! ট্রাক! ট্রাক!/ ট্রাকের মুখে আগুন দিতে/ মতিয়ুরকে ডাক।
কোথায় পাবে মতিয়ুরকে/ ঘুমিয়ে আছে সে।
তোরাই তবে সোনা মানিক/ আগুন জ্বেলে দে।
(‘ঊনসত্তরের ছড়া-১’, পাখির কাছে ফুলের কাছে)
আল মাহমুদ শিশুদের উপযোগী কিছু উল্লেখযোগ্য ছড়া লিখেছেন। এই ছড়াগুলোতে কবির শিশুমনের অভিব্যক্তি চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন –
ক.
আম্মা বলেন পড়রে সোনা/ আববা বলেন মন দে
পাঠে আমার মন বসে না/ কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।
আমার কেবল ইচ্ছে জাগে/ নদীর কাছে থাকতে।
বকুলডালে লুকিয়ে থেকে/ পাখির মতো ডাকতে।
(‘পাখির মতো’, পাখির কাছে ফুলের কাছে)
খ.
একটা ছেলে এই ছেলেটা/ নখ ভরা তার মাটি
ময়লা হাতে খায় সে খাবার/ ধরে দুধের বাটি।
মাছি ভন ভন মাছি ভন ভন/ সর্দি-ভরা নাক
নাকের উপর পড়ছে মাছি/ যেন কাকের ঝাঁক।
এই ছেলে আর এই মেয়েটার/ অসুখ থাকে রোজ,
ঘণ্টা ধরে গিলছে বড়ি/ বোতল ভরা ডোজ।
(‘বাঁচার জন্য’, এক চক্ষু হরিণ)
আল মাহমুদ কাব্যচর্চার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসও রচনা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হলো – যেভাবে বেড়ে উঠি, কাবিলের বোন, নিশিন্দা রানী, উপমহাদেশ, অর্ধেক মানবী, ডাহুকী, আগুনের মেয়ে, কবি ও কোলাহল ইত্যাদি। গবেষক কমরুদ্দিন কিছু উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি ফ্রয়েডের মনোবিকলন তত্ত্ব, নর-নারীর প্রেমভাবনা, যৌন-ঈর্ষা, সামাজিকতাবোধ ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি আল মাহমুদের গল্প নিয়ে বিশদ কোনো বিশ্লেষণে যাননি। অথচ আল মাহমুদ একজন সফল গল্পকার। তাঁর তিনটি অসাধারণ গল্প হচ্ছে – ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘জলবেশ্যা’ ও ‘মীরবাড়ির কুরসীনামা’। নন্দনতত্ত্ব ও দেশজ সংস্কৃতি, লোকায়ত বিশ্বাস, ইতিহাস ও ঐতিহ্য, প্রকৃতি ও মানুষ, দার্শনিকতার সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় সাধন তাঁর কবিতায় যেভাবে এসেছে, অন্য কারো কবিতায় সেভাবে আসেনি। তাঁর কবিতায় বাঙালির আবহমান কালের ইতিহাস মুদ্রিত হয়েছে। নারী, নারীর শরীরী কাম ও যৌনতা, প্রেম মিলেমিশে তাঁর কবিতার শরীর গঠিত। তিনি লেখেন –
ক.
শুরু হোক স্তোত্রপাঠ গন্ধবতী তোমার সুনামে,
পীতাভ ধোঁয়ার তলে ডুবে থাক মন্দির-দেহলি,
শঙ্খমাজা স্তন দুটি মনে হবে শ্বেতপদ্ম কলি,
লজ্জায় বিবর্ণ মন ঢেকে যাবে ক্রিসেনথিমামে –
অথবা রক্তের নাচ শুরু হবে সিম্ফনির সুর
বৃষ্টির শব্দের মতো মনে হবে তোমার নূপুর।
(‘সিম্ফনি’, লোক লোকান্তর)
খ.
চরের মাটির মতো খুলে দাও শরীরের ভাঁজ
উগোল মাছের মাংস তৃপ্ত হোক তোমার কাদায়,
ঠোঁটের এ-লাক্ষারসে সিক্ত করে নর্ম কারুকাজ
দ্রুত ডুবে যাই এসো, ঘূর্ণমান রক্তের ধাঁধায়।
(‘৩-সংখ্যক সনেট’, সোনালী কাবিন)
আল মাহমুদকে নিয়ে ইতোমধ্যে অনেকে গবেষণা করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইয়াহইয়া মান্নান দুটো গ্রন্থ রচনা করেছেন। প্রথমটি আল মাহমুদ ও বিচিত্র অনুষঙ্গ এবং দ্বিতীয়টি আল মাহমুদের উপন্যাস বিষয় চিন্তা। কাজলেন্দু দে রচনা করেন আল মাহমুদের কবিকৃতি নামক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। তারপর ফজলুল হক তুহিন রচনা করেন আল মাহমুদের কবিতা বিষয় ও শিল্পরূপ। সর্বশেষ আমরা পেলাম কবি ও প্রাবন্ধিক কমরুদ্দিন আহমদ-রচিত আল মাহমুদ : কবি ও কথাশিল্পী ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে। আল মাহমুদকে নিয়ে শেষ কথা বলার সময় এখনো হয়নি। গত ১১ জুলাই আল মাহমুদ আশি বছরে পদার্পণ করেছেন। কবি আল মাহমুদ সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। আমরা আশা করি, আগামী দিনগুলোতে তিনি আমাদের আরো অনেক ভালো ভালো সাহিত্য-রচনা উপহার দেবেন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.