নববইয়ের দশকে যে-কজন লেখকের আবির্ভাব ঘটেছিল পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য-অঙ্গনে তাঁদের অনেকেই তুবড়ির বর্ণচ্ছটা দেখিয়ে, প্রভূত ধূম উদ্গিরণ করে কিয়ৎকালের মধ্যেই নির্বাপিত হলেও, তিলোত্তমা মজুমদার পাঠকের মধ্যে বিগত দুই দশক ধরে থেকে গেলেন। এর একটি বড় কারণ এই যে, তিলোত্তমার সৃজনের নতুন ভাষা, আধুনিক মানবমনের গভীর পরিজ্ঞান। আধুনিক মধ্যবিত্ত নারীর পারস্পরিক সম্পর্ক-কাঙ্ক্ষা-যৌনতা শতাব্দীপ্রাচীন সংস্কার ছিঁড়ে-খুঁড়ে, সমস্ত চাপান আড়াল ভেঙে বেরিয়ে এলো যেন!
তিলোত্তমা প্রধানত ঔপন্যাসিক কিন্তু ছোটগল্প, কবিতাও অসামান্য। আমাদের আজকের আলোচনা তাঁর অদ্যাবধি প্রকাশিত সতেরোটি উপন্যাসের আটটি নিয়ে।
হ্যাঁ, তিলোত্তমা তাঁর ঋ, চাঁদের গায়ে চাঁদ, বসুধারা, শামুকখোল, প্রহাণ, জর্মের চোখ, একতারা, রাজপাট ইত্যাদি উপন্যাসে নিয়ে এলেন নতুন ভাষা। যে-সযত্ননির্মিত গদ্যে অবলীলায় মিশে গেল প্রাচীন ‘আমাতে’, ‘তোমাতে’, ‘নাই’ ইত্যাকার প্রকাশভঙ্গি – ‘তা এই হলো যে মানুষের বিবিধ অবস্থা। পুরাণ-তত্ত্ব-গপ্পো। যুক্তি নাই। তর্ক থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু যুক্তি নাই। তোমার যেমন তিনটা চোখ নাই, আমার যেমন চারখান পা নাই। তেমন-তেমন, মানুষের কোনও যুক্তি নাই।’ (চাঁদের গায়ে চাঁদ) এবং এই গদ্য দর্শনঋদ্ধ। তিলোত্তমার উপন্যাসে যা হয়ে উঠেছে গভীরতা প্রকাশের অমোঘ একাঘ্নী।
ছেলের মা তাকে ‘স্বদেশি আন্দোলন’ থেকে ফেরাতে ঠাকুরঘরে ডেকে রাধারঞ্জনকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করাতে চাইছেন। ছেলে তাঁর কথা না শুনলে তিনি আত্মঘাতী হবেন। শুরু করেছেন পিলসুজ দিয়ে কপালে ক্রমাগত আঘাত। সেই সংকটকালের বর্ণনা – ‘কয়েক মুহূর্ত নিশ্চল হয়ে বসে রইলেন রাধারঞ্জন। তারপর অন্ধকারে জড়িয়ে ধরলেন মাকে। পিলসুজ কেড়ে নিতে চাইলেন। কিন্তু কাজটি বড় সহজ ছিল না। প্রার্থনা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় দয়াময়ীর ব্যক্তিত্বে হঠাৎ টান পড়েছিল। তিনি ধৈর্য হারিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে বাসা নিয়েছিল আত্মবিস্মরণ। এবং কে না জানে, আত্মবিস্তৃত হলেই মানুষ অতিমানুষতাপ্রাপ্ত হয়, কিংবা অবমানুষতা। তখন নিশ্চিহ্ন বোধের ঘরে ফুল দিতে হয় কারওকে। সে কর্মেই প্রয়াসী হলেন রাধারঞ্জন। পিলসুজটি কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেললেন দিগ্ভ্রষ্ট অন্ধকারে। শব্দ করে ভেঙে পড়ল দেবতার পট। পিলসুজটি কিছুক্ষণ গড়িয়ে নিল নিজের মতো।’ (ঋ)
বর্ণনাটি পড়ামাত্র স্মৃতিধার্য হয়ে যায় – ‘তখন নিশ্চিহ্ন বোধের ঘরে ফুল দিতে হয় কারওকে’ – বাক্যটি। আরো আছে লেখিকার এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে। বিনতা সন্তানসম্ভবা। তার স্বামী শেখর সন্দিহান – ‘এই বাচ্চার বাবা কে? বলো বলো। এর বাবা কে?’ এর পরে বিনতার যুক্তিবাদী মনের ছবি – ‘সাতদিন ধরে বিনতা কিছু খেতে পারল না। চুল বাঁধল না। সিঁদুর দিল না কপালে। তার কখনও ঘৃণা হল, কখনও বড় অপমানে ভিজে উঠল চোখ। কখনও ভীষণ রাগে মরে যেতে ইচ্ছে করল। কিন্তু একটিবারও সে শেখরের পায়ে পড়ল না। ঈশ্বরের নামে শপথ নিল না। একটিবারও কেঁদে কেঁদে বলতে পারল না – ওগো! বিশ্বাস করো – বরং সে ভাবতে থাকল – কী আশ্চর্য! যারা পিতৃত্ব বহন করে, যাদের পরিচয় নিয়ে ঘটে যেতে পারে জন্মান্তর, তাদের আসলে বোঝার কোনো ক্ষমতাই নেই, সন্তান প্রকৃতই তার নিজের কিনা। এখানে শুধুই অনিবার্য বিশ্বাসের দাবি। এবং এই বিশ্বাস কত সহজেই ভেঙে ফেলা যায়…।’ এমত দার্শনিকতার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটতে থাকে বিনতা-নাম্নী নারীর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। তার নরম সুবেদী মনের সমান্তরালে উন্মোচিত হয় চরিত্রের দার্ঢ্য। প্রকাশিত হয় তার আর শেখরের সম্পর্কের অচেনা স্তর, যা নাকি বিনতা সন্তানসম্ভবা না হলে বোঝাই যেত না!
আবার কোনো ব্যক্তি নয়, রাস্তার চরিত্র। বিকশিত হয় তিলোত্তমার নিজস্ব দৃষ্টিতে, তাঁর গদ্যের মায়াঅঞ্জনে – ‘অন্ধও ঘুমোয়নি। মাস্টারও না। জেগে আছে যে-যার মতো। ফটিকবিল বস্তিতে দু’টি মাত্র জাগ্রত মানুষ। বাকি সব ঘুমন্ত। সারা বস্তি ঘুমিয়ে পড়েছে। এমনকি ঘুমিয়ে পড়েছে মাছেরাও। বিলের জলের নীচে যথার্থ বাসস্থানে। শুধু কোনোদিন ঘুমোবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে জেগে আছে পি ডব্লু ডি রোড। রেললাইন তবুও ঘুমোয়। একটা ট্রেন যাবার পর আরও একটা আসার আগে একটু বিশ্রাম নিয়ে নেয় সে। অল্প অল্প ঘুমিয়েও কি পড়ে না? অন্তত এটুকু তো সে জানে – একটি রেল চলে গেলেই আর একটি সঙ্গে সঙ্গে ঝমঝমিয়ে তার ঘাড়ে এসে চড়বে না! রাস্তার সে-সুযোগ নেই। তাকে কেউ ঘুমোতে দেবে না। তাই ঘুমোনোর ইচ্ছেই সে ত্যাগ করেছে। একমাত্র ধর্মঘটের প্রতীক্ষা। ধর্মঘট হলে পুলিশের গাড়ি ছাড়া আর কোনও গাড়ি সইতে হয় না তাকে। কিন্তু বরাহনগরের সব রাস্তা জানে – পুলিশের গাড়ির ওজন দুর্বহ।’ (বসুধারা)
এমন আপাত-নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কবিতাঘন গদ্যে পরিপার্শ্ব, চরিত্রের গভীর মনের কথা প্রকাশ করার আয়োজন দেখি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর চাঁদের অমাবস্যায় – ‘দুপুরবেলায় ইস্কুলের বিশ্রামঘরে আত্মপ্রবঞ্চনার কথাটি যুবক শিক্ষক সর্বপ্রথম আপন-মনে স্বীকার করে। বস্ত্তত, স্বীকার করতে সে বাধ্য হয়। সর্বপ্রকার চেষ্টার শেষ হয়েছে, কি করে তার ক’দিনব্যাপী মানসিক বিহবলতার সত্য কারণ নিজের কাছে আর ঢেকে রাখে? সঙ্গে সঙ্গে যে-ন্যায়বানের শ্বেতসৌধ সে সৃষ্টি করেছিল তা নিমেষে ধূলিসাৎ হয়। নিজের কাছেই সে নিজে ধরা পড়েছে অবশেষে : কোথাও আর একটি প্রাচীর দাঁড়িয়ে নাই যার পশ্চাতে সে আত্মগোপন করতে পারে।’
অথবা – ‘অকস্মাৎ মুস্তফার প্রবল জ্বর শুরু হয়। তবারক ভুইঞা পূর্ণ-উদ্যমে জ্বরাক্রান্ত নিঃসঙ্গ মুহাম্মদ মুস্তফার সেবা-শ্রুশ্রূষায় লেগে যায়। একদিন রাতে মুহাম্মদ মুস্তফা দেখতে পায় তবারক ভুইঞা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে স্থিরদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সহসা সে একটি কণ্ঠস্বরও শুনতে পায়। তবে সে বুঝতে পারে, কণ্ঠস্বরটি তবারক ভুইঞার নয়, নিজেরই কণ্ঠস্বর। অকারণেই সে যেন চমকিত হয়ে পড়ে, অকারণে এ-জন্যে যে নিজের কণ্ঠস্বর শুনলে চমকিত হবার কোনো যথার্থ কারণ নেই। তারপর ঘরময় সহসা নীরবতা নাবে। অনেকক্ষণ সে-নীরবতা জমাট হয়ে থাকে, যে-নীরবতার মধ্যে বাইরে কোথাও বিদ্যুৎগতিতে চক্কর দিতে থাকা একটি বাদুড়ের আবির্ভাব হলে সে-বাদুড়ের শব্দ, পরে দূরে কোথাও একটি বিড়াল-ছানা ক্ষীণ-কাতর কণ্ঠে কাঁদতে শুরু করলে সে-কান্নার শব্দ – এসব উচ্চরব ধারণ করে। তবারক ভুইঞা কেমন চঞ্চল হয়ে একবার হাত-পাখাটি তুলে নেয়, পরক্ষণে রোগীর তৃষ্ণা পেয়ে থাকবে ভেবে পুঁতি-ঝোলানো জালি দিয়ে ঢাকা পানির গেলাসটি ওঠায়।’ (কাঁদো নদী কাঁদো)
যদিও সৈয়দ সাহেবের কাহিনি-নির্মাণ প্রকরণের সঙ্গে বহিরঙ্গে এক কণাও মিল নেই তিলোত্তমার সৃজনের, কিন্তু এই জীবন দেখার আপাত-নির্লিপ্তির সঙ্গে যেন তাঁর আত্মিক সংযোগ!
তিলোত্তমার প্রকাশভঙ্গির স্বকীয়তা আছে। ওই স্বাতন্ত্র্য কোথায়? বৈশিষ্ট্যই বা কী? উপন্যাসের কাহিনি বহমান, কখনো লেখকের কথনে, কখনো চরিত্রের সংলাপে। তার গভীর মনের কথায় উৎসারিত হচ্ছে জীবনবোধ, দার্শনিক বিশ্লেষণ, দাঁড়িয়ে পড়ছে তার আচরণের পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তি, যা আদতে লেখকেরই কথা। কিন্তু একটিবারের জন্যও কাহিনির বহমানতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না। সবাই হাত ধরাধরি করে মিলেমিশে চলছে ওই মূল প্রবাহের সঙ্গে। বস্ত্তত প্রবাহটির সহায়ক ক্রিয়া তারা। এই কারণেই, আমরা দর্শন কিংবা মনস্তত্ত্ব শিখব বলে তিলোত্তমা পড়তে বসি না। জীবনপ্রবাহের এক সংবেদী রূপ উপভোগ করব বলে তাঁর উপন্যাস পড়ি।
অনেকেই তিলোত্তমা-প্রসঙ্গে যৌনতা টেনে আনেন। তা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা যাক। যৌনতা নিয়ে প্রতিটি মানুষের নিজস্বতা আছে, তা কোনো নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা যায় না। তিলোত্তমা তাঁর সৃজনে সেই বৈচিত্র্য দেখাবার সৎ চেষ্টা করেছেন গভীর অভিনিবেশে। ফলে তাঁর যৌনতা নিছক যৌনতার প্রদর্শন নয়, তা হয়ে ওঠে সম্পর্কের জটিল স্তর প্রকাশের মাধ্যম। এই জটিলতা প্রবহমান সেই আদিম যুগ থেকেই। আদিম উলঙ্গ মানব-মানবীও, নৃতত্ত্ববিদ-সমাজবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সঙ্গমের সময় খুঁজে নিতে চেয়েছে আড়াল। স্বাভাবিক অভ্যাসে, প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, হয়তো কোনো গোষ্ঠীনেত্রী সঙ্গম করে তার পুত্রের সঙ্গে, হয়তো সেই পুত্র পেয়েছে তারই স্বামীর মর্যাদা, সেই নারীও অকারণে প্রদর্শন করতে চায়নি তার যোনিদেশ। বৃদ্ধ ঢাকতে চেয়েছে তার শিশ্ন। অর্থাৎ সভ্যতার জন্মলগ্নেই এই নৈতিকতা-অনৈতিকতার দ্বন্দ্ব। সেই আদিপর্ব থেকেই খাড়া মেরুদন্ড পাওয়া হোমো সেপিয়েন্সের এটিই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটিই তার ধরন। অতএব, আধুনিক নর-নারীর সম্পর্ক যে আরো জটিল, জটিলতর হবে তা নিয়ে তো তর্ক হতে পারে না। এবং সেই আধুনিক জটিলতার কোনো কোনো স্তর প্রকাশিত তিলোত্তমার রচনায়। যতদূর বুঝেছি, যৌনতা নিয়ে মানুষের ‘দ্বিচারিতা’ দেখানোর জন্য লেখক কোমর বেঁধে নামেননি, তিনি দেখাতে চেয়েছেন জীবনের একটি সত্যকে। তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতা-প্রসূত লেখায় সেই জীবনের সত্য হয়ে উঠেছে শিল্পের সত্য। যা ম্যাক্সিম গোর্কির ভাষায়, ‘স্বাধীন, মুক্ত মানুষের ধর্ম’।
আরো এক কথা, তিলোত্তমা তথাকথিত ফেমিনিস্ট নন। যাঁরা কথায় কথায় পুরুষ-বিদ্বেষ প্রকাশ করেন, তাঁদের সঙ্গে লেখকের আড়ি। তাঁর কাছে সবাই মানুষ। তিনি তন্নিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করেন সেই বিচিত্র, চলমান মানুষের প্রেম-অপ্রেম, যৌনতা-শৈত্য, সারল্য-কুটিলতা তথা তার চারিত্র্য।
যৌনতা প্রসঙ্গে লেখকের যে-উপন্যাসগুলির কথা সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে তা হলো – চাঁদের গায়ে চাঁদ, প্রহাণ আর শামুকখোল।
প্রথমে চাঁদের গায়ে চাঁদ। ২২৮ পাতার আখ্যায়িকাটির প্রথম ২৮ পাতায় অনবদ্য সংযম-দক্ষতায়, মাত্র কয়েকটি তথ্যের অাঁচড়ে লেখক ‘অবলোকন’ করিয়েছেন নারীবঞ্চনার ইতিহাসের ভরকেন্দ্রটিকে, যা নাকি নারী আবাস গড়ে ওঠার প্রাথমিক, গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি। তারপরে ঘটনার শুরু উত্তর কলকাতার এক নারী-আবাসে, যেখানে ছাত্রীরা আসে তাদের বয়ঃসন্ধিকালে, কলেজ প্রবেশের সময়। কাহিনি এগিয়েছে শ্রুতি, শ্রেয়সী আর দেবরূপার নির্ভরে। যেখানে মফস্বল থেকে কলকাতার কলেজে পড়তে আসা শ্রুতি দেখছে তার ঘরের অন্য দুই আবাসিক শ্রেয়সী আর দেবরূপার ক্রম-ঘনিষ্ঠতা। সে অনুধাবন করছে। আবর্তিত হচ্ছে দেবরূপা-শ্রেয়সীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। তার চেতনা পরিণত হচ্ছে। দেবরূপার মধ্যে ক্রমশ পুরুষভাব, কর্তৃত্ব বাড়ছে। সে শাসন করছে, অধিকার করছে, প্রায় গ্রাস করতে চাইছে শ্রেয়সীকে। শ্রেয়সীর মধ্যেও আত্মসমর্পণ। ক্রমশ স্থাপিত হচ্ছে সমলিঙ্গ-প্রেম। রাত্তিরে শ্রুতির কানে আসে দেবরূপা-শ্রেয়সীর একান্ত সংলাপ –
– এ কী! ব্রা পরে আছিস? এতক্ষণ ব্রা খোলার সময় পাসনি?
– আমার ইচ্ছে করেনি, খুলিনি! ব্যস!
– ব্রা খোল। বলেছি না, রাত্তিরে ব্রা পরে থাকবি না।
– থাকব। বেশ করব। উঃ…উ…উ…
– আবার কথা। দেখি, আমি খুলে দিই।
শ্রুতির চেতনায় বিস্ফোরণ ঘটেছে, যখন সে এক মধ্যরাতে হঠাৎ আলো জ্বেলে দেখছে দেবরূপা-শ্রেয়সীর শারীরিক মিলন – ‘…দু’খানি গোল চাঁদ যেন-বা যুক্ত আছে। এবং উপুড় করা গোলাটে সে চাঁদে পাঁচ পাঁচ দশখানি আঙুল যেন বা বাজাচ্ছে মৃদঙ্গম…।’ শ্রুতি লাইট জ্বালাতে ওরা বিরক্ত। নেভাতে বলেছে। শ্রুতি নেভায়নি। কিন্তু সে যে ওদের নৈকট্যকে অনৈতিক ভেবেছে, তা নয়। বরং কানাঘুষোয় ওদের নৈকট্যের খবর যারা জেনেছিল, হোস্টেলের সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আবাসিক দেবরূপা-শ্রেয়সীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাদের বহিষ্কারের দাবি তুললে, শ্রুতি, অভিযুক্তদের ‘রুমমেট’ হিসেবে যার সাক্ষ্য অতীব গুরুত্বের, স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সে বিসদৃশ কিছু দেখেনি কোনোদিন। তার নিজের মতো করে শ্রুতি দেবরূপা-শ্রেয়সীর পাশেই দাঁড়িয়েছে।
প্রতিভাত হয়েছে শ্রুতি চরিত্রটির দার্ঢ্য এবং অন্যদের চেয়ে তার দশ কদম এগিয়ে-থাকা মনোভাব, যা আসলে লেখকেরই।
এর বহুকাল পরে শ্রুতি, তখন এক বেসরকারি সমাজসেবী সংস্থার কর্মী, আবার দেখা পায় দেবরূপার। সেও ঘটনাচক্রে ওখানেই কর্মী হয়ে এসেছে। সংস্থার আশ্রয়ে এসে পড়ে নারীমনোভাবাপন্ন, নিরাশ্রয় এক পুরুষ। যা প্রথমে বোঝা যায়নি। কারণ, সে পরে সালোয়ার-কামিজ, জনসমক্ষে স্নান করার সময়েও সে খুলতে চায় না বক্ষবন্ধনী। অচিরেই সে নাম পেয়েছে ললিতা। হঠাৎ শ্রুতি একদিন আবিষ্কার করে, দেবরূপার সঙ্গে ললিতা-নাম্নী পুরুষটির শারীরিক নিবিড়তা – ‘দেবরূপার শাড়ি উঠে গেছে কোমরে। পা ছড়ানো। ওর কোলে ললিতা। গায়ে শার্ট নেই। বুকে একটি কাপড় কাঁচুলির মতো বাঁধা। তার ওপর দেবরূপার হাত খেলছে। দুজনের মুখ একপাশে নামানো। এর ঠোঁটে ওর ঠোঁট ঢুকে আছে। কোনো হুঁশ নেই।’
এই নিবিড়তা ব্যাখ্যা করছেন তিলোত্তমা দার্শনিকতা-ঋদ্ধ ভাষায় – ‘…ওরা শরীর-প্রকৃতি ছাপিয়ে গেছে। মন-প্রকৃতিতে মিলেছে। চিরন্তর নারীমন চিরন্তন পুরুষমনে মিলেছে। দেহ-গঠন এখানে বাধা হয়নি। নারীদেহধারী পুরুষ, পুরুষদেহী নারীকে জড়িয়েছে।’ এর পরেই যখন সেই অমোঘ বাক্যবন্ধ উচ্চারণ করেন লেখক – ‘জয় প্রকৃতির জয়!’ – তখন এই প্রকৃতি আর শুধু ‘শরীর-প্রকৃতি’ কিংবা ‘মন-প্রকৃতি’র সংজ্ঞায় আটকে থাকে না, তা হয়ে যায় সেই অসীম প্রকৃতি – নেচার।
এক অন্যরকম যৌনভাবনা রূপ পায় প্রহাণ রচনায়। যেখানে সফল ব্যবসায়ী, নীতিবাগীশ সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা শ্রী, যার স্বভাবেই আছে লঙ্ঘন, আছে বিদ্রোহ, তীব্রভাবে কামনা করছে তাঁকেই! মাঝে মাঝে তুলে দিচ্ছে গভীর প্রশ্ন – ‘আচ্ছা বল তো বাপি, কোনটা বেশি অন্যায়? মা হওয়া না ভ্রূণহত্যা?’ আবরণহীন কামনাকাতর শ্রী সুজয়ের দিকে এগিয়ে এসেছে সঙ্গমের তীব্র ইচ্ছায়। সুজয় শ্রীর গলা টিপে খুন করলেন – ‘…তোরা আর জন্মাস না এখানে। প্লিজ। প্লিজ। প্লিজ।’ অব্যবহিত পরেই সুজয় যখন বলেন, ‘…আজ আমি পাপ করলাম। আত্মজকে হত্যা করলাম আমি।’, তা আর শুধু সুজয়ের সংলাপ থাকে না, হয়ে ওঠে বর্তমানকালের সেসব গুটিকয়েক মানুষের চিন্তাধারা, যারা বিদেশ থেকে আমদানি করা সামাজিক উন্নয়নের মডেল স্থাপনার্থে, সুনীতির দোহাই পেড়ে, সফলতার কথা বলে, নিজের দেশের নিজের মানুষকে, আগামী প্রজন্মকে খুন করছে। এবং পাপ মাখছে। অবশ্য কেউ এই বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত না হয়ে বলতে পারেন, সুজয়ের এই খুন যৌননৈতিকতা রক্ষার্থে! বলতেই পারেন। সেও একরকমের ব্যাখ্যা। তার বিরোধিতাও করা যায় না। ভালো লেখা এমনই। নানারঙের আলো-বিচ্ছুরণকারী পলকাটা হীরকখন্ডের মতো!
আরো গভীর জটিলতা প্রকাশ করে শামুকখোল। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র শুভদীপের সঙ্গে যৌনসংসর্গ হয় তার জীবনের প্রথম নারী বারো বছরের বড় মালবিকার। শুভদীপ অচিরেই বোঝে, এই সঙ্গম পরস্পরের সম্মতিতে ঘটে যাওয়া ক্ষণিকের উপভোগ্য মাত্র – সেখানে দীর্ঘস্থায়ী কিছু নেই। বিশ্বাস নেই, দায়িত্ব নেই, ন্যায়ের কণামাত্র নেই! দ্বিতীয় নারী মহুলী শুভদীপের শরীর জাগিয়ে দূরে সরিয়ে দেয় তাকে। গড়ে উঠতে থাকে তার নিজস্ব দর্শন। প্রত্যাখ্যাত শুভদীপের জীবনে এসে পড়ে তৃতীয় নারী চন্দ্রাবলী। সে কুরূপা কিন্তু কিন্নরকণ্ঠী। জীবনের লড়াইয়ে আহত চন্দ্রাবলী নিজেই আসে ঋজু, নির্মেদ, সুদর্শন শুভদীপের শরীরে। তার শরীর-দর্শনে শুভদীপের ঘৃণা জন্মায় কিন্তু নিখাদ কামবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে সে চন্দ্রাবলীকে রমণ করে। শুভদীপের এই অদ্ভুত যৌন-আচরণে প্রকাশিত পুরুষ মনস্তত্ত্বের এক জটিল স্তর। সে একদিকে অতীতে পাওয়া যাবতীয় অপমান অবজ্ঞার প্রতিক্রিয়া অন্য এক নারীর অভিমুখে পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে তারই সঙ্গে বারংবার সঙ্গমে লিপ্ত হচ্ছে। এভাবেই তৃপ্ত হচ্ছে তার অহংবোধ! আবার একদিন চন্দ্রাবলী তাকে ছেড়ে চলে গেলে তীব্র স্নায়বিক দাহ গ্রাস করে শুভদীপকে। তার জীবনদর্শনে, চেতনায় এসে যায় মৃত্যুবোধ। আত্মঘাতী চিন্তায় আচ্ছন্ন শুভদীপকে আবার জীবনের পথে ডাকে চন্দ্রাবলী – ‘আমার জন্য বাঁচো শুভদীপ’। সেই কুরূপা চন্দ্রাবলীর ডাকে শুভদীপ ফিরে আসে জীবনের দিকে। বহিরঙ্গের রূপের আকর্ষণ ব্যর্থ করে জয়ী হয় গভীর মনের ভাষ্য।
যৌনতার মনস্তত্ত্ব, তার বিভিন্ন স্তর নিয়ে তিলোত্তমার উপন্যাস এই তিনটি। এর আগেই তিনি লিখেছেন ঋ, বসুধারা, যা বিষয়ের দিক থেকে এই তিনটি উপন্যাসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আবার ঋ এবং বসুধারা দুই-ই ভিন্ন-ভিন্ন গোত্রের। ঋর ভরকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে দুই পুরুষ, দুই নারীর বিশ্বাস, বিশ্বাসহীনতা আর তার প্রতিক্রিয়া। বসুধারার চলন অনেক মানুষকে নিয়ে। এতে ধরা থাকে সমকালের রাজনীতি, শান্তি-অশান্তি, সংঘর্ষ-নির্মাণ এবং মানবপ্রেম যা নাকি কখনো ধর্মকে অতিক্রম করেছে। এরই মধ্যে এক অধ্যাপক সমগ্র চেতনা দিয়ে অনুভব করেন মানবতার অনিবার্য আকর্ষণ, প্রেমের অনিরুদ্ধ শক্তি। ক্রমশ বোঝা যাবে বসুধারার মধ্যেই নিহিত তিলোত্তমার অন্যতম নিপুণ কৃতি রাজপাটের বীজ।
চাঁদের গায়ে চাঁদ-প্রহাণ-শামুকখোল সিরিজের পর এসে যায় জর্মের চোখ। প্রথম জীবনে রাজকুমার, পরবর্তীকালে ধর্মপ্রচারক, সন্ন্যাসী জর্মের অাঁখিপল্লব থেকে চা-গাছের জন্ম – এই বৌদ্ধ উপকথা উপন্যাসটিতে প্রতীকের মতো ব্যবহৃত। এই আখ্যানের পটভূমি মাটিবাড়ি চা-বাগান, বাগানের ক্ষুদ্র, কুটিল রাজনীতি। করণিক বিজু লিখতে শুরু করেছিল চা-শ্রমিকদের ইতিহাস। মালিক, দালাল আর স্বার্থান্বেষী ইউনিয়ন নেতা – এই ত্রয়ীর অশুভ অাঁতাত। তাদের চক্রান্তে চা-বাগানের অবস্থা হতমান। শ্রমিকজীবনে ঘোর বিপর্যয়। ক্রোধে অধৈর্য শতাধিক শ্রমিক বাগান-অফিসে হামলা চালাল, লুট করা হলো ম্যানেজার-নেতাদের বাড়ি। এরপরেই বিজুর যে-বন্ধুটি নেপালি লেবার-লাইনে আদিবাসীদের লেখাপড়া শেখাত, সেই কমল খুন হয়ে গেল। প্রতিক্রিয়ায় বিজু উন্মাদ। একদিন ঠান্ডা হলো চা-বাগান। আরোগ্যলাভ করল বিজু। এক ভোরে বিজু তার ডায়েরি ছিঁড়ে ফেলল, ‘একটা একটা করে পাতা ছিঁড়ে কুচি-কুচি করে উড়িয়ে দিল বাতাসে। ছেঁড়া-ছেঁড়া কাগজের টুকরো পড়ে রইল উঠোনময়।’ অকস্মাৎ বিজুর মনে হয়, এরা কাগজের কুচি নয়, এরা কমলের চোখের পাতা। ‘কমলের নাকি জর্মের? জর্মই কমল হয়ে এসেছিল বুঝি… সে এখন নিশ্চিত, এসব চোখের পাতার থেকে আবার জন্ম নেবে সহস্রের অধিক স্বাস্থ্যবান চা-গাছ।’ কমলের চোখের পাতা থেকে জন্মানো এই নতুন চা-গাছ নতুন এক সময়, নতুন এক প্রতিবেশ চাইছে, বেশ বোঝা যায়। প্রতীকটির প্রয়োগও যথাযথ হয়ে ওঠে। সর্বোপরি চা-বাগানের নোংরা রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে নতুন এক দিনকে আবাহন করে।
এবার একতারা আর রাজপাট। প্রথমে একতারা। এ-রচনা দেবারতি ভট্টাচার্য নামে এক মেয়ের অপমান, বঞ্চনা আর তার ঘুরে দাঁড়াবার আখ্যান। যে-মেয়ে পাহাড়-জঙ্গল-নদীঘেরা উজানিনগর বলে এক ছোট মফস্সল শহর থেকে তার বিবাহ উপলক্ষে কলকাতায় এসেছিল। দেবারতির মতোই তার বিবাহের উপহার হিসেবে সেই নগর থেকেই বাসের মাথায় চেপে কলকাতায় এসেছিল এক কাঠের ওয়ার্ডরোব। কলকাতায় পৌঁছতে তার লকটা হয়ে গেছে নড়বড়ে, ‘পাল্লার পালিশে অাঁচড়, হাতলের নকশায় আধুনিকতার বদলে গেঁয়ো প্লাস্টিক’। বিবাহের আসরে সে যেন উজানিনগর থেকে আসা দেবারতির এক দীন-দুঃখী আত্মীয়। তার দিকে বিদ্রূপ ছুড়ে দিচ্ছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন, যারা ওয়ার্ডরোবের চারপাশে ঘুরছে – ‘তার গ্রাম্যতায়, দুর্বলতায়, পালিশের ওপরকার ক্ষতে কটূক্তি নিক্ষেপ করছিল। হাসাহাসি করছিল। ওদের ধনী, অহংকারী ঠোঁট বেয়ে, গাল বেয়ে, দামি পাঞ্জাবির পকেট উপচে বিদ্রূপ ঝরে পড়ছিল।’ এমনতর অপমানের আবহে দেবারতির বিবাহ অনুষ্ঠানের শুরু।
বিবাহের প্রস্ত্ততির সময়েই অবশ্য বেনারসি শাড়ি কেনা উপলক্ষে দেবারতি অপমানিত হয়েছে তার বড়মামার কাছে। বিবাহের পর তার স্বামী নীল, শাশুড়ি মাধবী এবং শ্বশুর শিবানন্দের থেকে প্রতিনিয়ত পাওয়া নানান ছোটবড় অপমানের তরঙ্গে ডুবে-ভেসে দেবারতি পার করে সাত-সাতটি বছর। সব অপমান একেবারে নীরবে মেনে নেয়নি। তার সীমিত ক্ষমতায়, ভদ্রতা বজায় রেখে কখনো প্রতিবাদও করেছে সে। এবং নিজের মতো করে লিখতেও শুরু করেছে তার নিজস্ব কথা। যে-ওয়ার্ডরোবকে ত্যাজ্য-ত্যক্ত করে অন্যত্র রাখা হয়েছিল, তাকে ফিরিয়েও এনেছে নিজের ঘরে। সমগ্র উপন্যাসে এই মূক ওয়ার্ডরোব হয়ে উঠেছে এক অপার ব্যঞ্জনায় বাঙ্ময় এক চরিত্র। দেবারতি তার দিকে তাকিয়ে নিজের পীড়িত জীবনের কথা ভেবেছে কতদিন! তার জীবন সত্যিই পীড়িত, তার শাশুড়ির দেওয়া লাঞ্ছনা ছাড়াও, তার সন্দেহ, যা অমূলক নয়, সে বোঝে তার স্বামী নীল লোক ঠকিয়ে পয়সা রোজগার করে বেড়ায়। কখনো তীব্র আপত্তি জানায় দেবারতি, জোরগলায় তা ঘোষণাও করে। কাজটা সহজ নয়, কারণ, সেই যৌথ পরিবারের বাড়িতে বিবাহিত হয়ে আছে তার দিদি সঞ্চিতা, যার স্বামী নির্মল। তাকে ভাবতে হয়েছে দিদি-জামাইবাবুর যেন কোনো অপমান না হয় তার কথাও। দেবারতি তার এই বিবাহিত জীবনের ইতি ঘোষণা করে শ্বশুরালয় ছাড়ে সেদিন, যার কিছুকাল আগেই নীল একটি লোকের লালসা মেটানোর জন্য অর্থের বিনিময়ে তাকে তুলে দিয়েছিল সেই অর্থবানের কাছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত রাগের মাথায় নেওয়া নয়। যদিও নীলের প্রযোজনায় ঘটা ওই চরম অপমানের ঘটনাটি দেবারতিকে চরম সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যায়, তার আগের প্রতিটি অপমান, প্রতিটি লাঞ্ছনা তার ‘ছেড়ে যাবার তপস্যায়’ যুক্তি নির্মাণ করতে সাহায্য করেছে। এর পরেই দেবারতির নতুন জীবনের শুরু। না, সে তার পিত্রালয়ে ফিরে যায় না, তার নতুন ঠিকানা ‘স্বনির্ভরা’ সরকারি হোস্টেল। তারপর চাকরি পাওয়া। চাকরিতে প্রচুর শ্রম, স্বাস্থ্যহানির সম্ভাবনা। তারই মধ্যে লেখালেখি। আইনগতভাবে তাদের বিবাহিত জীবনের সমাপ্তি। একদিন বড় প্রকাশনা থেকে দেবারতির প্রথম বই প্রকাশ। দেবারতি আর মরবে না। বাঁচবে। প্রতিদিন নিজের মতো করে, নিজের জোরে বাঁচবে।
অদ্যাবধি যে-সতেরোটি উপন্যাস লিখেছেন তিলোত্তমা, তার মধ্যে একতারা তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। ২৩৭ পাতার এ-আখ্যানের প্রথম ৫৬ পাতার মধ্যেই দেবারতির গৃহত্যাগের দৃশ্য রচনা করলেও, তার কারণগুলি, লেখক মেলে ধরেন কখনো সামনে এগিয়ে, কখনো অতীতে ফিরে, অসামান্য কথকের দক্ষতায়। সমগ্র আখ্যায়িকাটির নির্মাণেই সংযমের পরিচয়, কিন্তু এই ঘর ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্যটিতে তা অনবদ্য। এই ঘরছাড়া নিয়ে লেখক খুব সহজেই টিভি-সিরিয়াল মার্কা মেলোড্রামা বানাতে পারতেন, করেননি। বরং তার শ্বশুরালয় ত্যাগ যে বহুদিনের সঞ্চিত অপমানের পরিণতি, তা বোঝাতে দেবারতিকে বহিরঙ্গে একেবারে স্বাভাবিক রেখেছেন – ‘ঠিক বারোটায় আমি খেতে বসি একা। কারওকে ডাকি না। তৃপ্তি করে খাই পুঁই-চিংড়ি, ডাঁটা চিবোই। মাছের কাঁটা চুষে, চিবিয়ে ছাতু করে ফেলি একদম।’ এরপরে সে নীলের মুখোমুখি, সেখানেও কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। অবশেষে যৌথ পরিবারের গুরুজনদের প্রণাম করে সদর খুলে পথে নামা। কোনো উচ্চকিত শব্দক্ষেপণ নেই কোথাও। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘সকল কলাসৃষ্টিতেই সরলতার সংযম একটা প্রধান বস্ত্ত। সংযমই হচ্ছে সীমার তর্জনী দিয়ে অসীমকে নির্দেশ করা।’ দেবারতির ‘স্বাভাবিকতা’, ‘সংযম’ আমাদের বুঝিয়ে দেয় তার সিদ্ধান্তের গভীরতা, তার আত্মবিশ্বাস। বোঝা যায়, সে অকূল কষ্টে পড়লেও আর এ-বাড়িতে ফিরছে না।
হঠাৎ ইবসেনের আ ডল্স হাউসের কথা মনে পড়ল। নাটকটিতে নোরা ছেড়ে যাচ্ছে তার স্বামী টরভ্যাল্ডকে। নির্গমনের সময় নোরা দড়াম করে দরজা বন্ধ করে বাড়ি ছাড়ে। জর্জ বার্নার্ড শ যাকে বিশেষিত করেছেন – ‘The slamming of door that shook Europe’। দেবারতির গৃহত্যাগেও এমনই হাড়কাঁপান ধাক্কা লাগে। মনে হয়, পরিবারের সীমানায় যে-সামন্ততান্ত্রিকতা, দুর্নীতি চলে, তার সব দড়ি-দড়া, কড়িবরগা ভেঙে পড়ছে। বহিরঙ্গে কোথাও কোনো চিৎকার নেই, প্রায় নীরব অথচ কত বাঙ্ময়! নোরার শেষ অঙ্কে বলা কথার মতোই, বোঝা যায়, দেবারতি তার নিজস্ব identity খুঁজে পেয়েছে। তার নিজের জীবনের রূপকার সে নিজেই।
রাজপাট। গঙ্গা-ভাগীরথীর তটস্থ আধুনিক মুর্শিদাবাদের প্রেক্ষাপটে সমসময়ের রাজনীতি আর তথাকথিত রাজনীতিকদের পিশুন-প্রবৃত্তির আবহে রচিত এক ধ্রুপদাঙ্গের উপন্যাস। গভীর পরিশ্রমে, প্রত্যক্ষ স্থানিক অভিজ্ঞতার নির্ভরে নির্মিত ৮০৪ পাতার এ-আখ্যানের চলন, বিষয়, তিলোত্তমার অন্যান্য কাজের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
প্রথমভাগেই আমরা দেখা পাই ময়না বৈষ্ণবীর, যার পূর্বাশ্রমের নাম ময়নামতী হালদার – ‘পানের রসে লাল ঠোঁট বৈষ্ণবীর। কপালে ও নাকে গঙ্গামাটির অলকা-তিলকা। গলায় তুলসীর মালা। হাতেও তেমনই মালা জড়ানো। পরনে আধময়লা সাদা শাড়িটি। কাঁধে ছোট কালো ঝোলায় ভিক্ষের চাল এবং হয়তো আরো অন্য কিছু। ত্বকে হালকা ভাঁজ পড়েছে বৈষ্ণবীর। অথচ শরীর টানটান। তীব্র।’ বৈষ্ণবী খঞ্জনি বাজিয়ে গান গেয়ে মাধুকরী করে বেড়ায়। গঙ্গার মতোই সে প্রবহমান। ঝোলায় পাওয়া দানের মতোই তাঁর সংগ্রহে জমে ওঠে বিভিন্ন গৃহস্থের গল্প। পঞ্চবুধুরি শ্রীপাটে অন্য এক শিষ্যের প্রতি শ্রীকৃষ্ণপাদ মহারাজের আচরণে ব্যথিত হয়ে, গুরুর অনুমতিতে মাধুকরী করে দান সংগ্রহ করবার অজুহাত দেখিয়ে বৈষ্ণবী সেই আশ্রম ছেড়ে চলে আসে হরিহরপাড়ার উপান্তে ঘোষপাড়ার বৈষ্ণব মঠে। এখানে থেকেই ময়না মাধুকরীতে যায়। ঘুরে বেড়ায় পরিপার্শ্বের গ্রামগুলিতে – তেকোনা, চতুষ্কোনা, ভগবানগোলা, বাঁশুলি, কালান্তর, গোমুন্ডি। সেসব গ্রামের গৃহস্থ পরিবারগুলি ময়নাকে ভালোবাসে খুব। তারা আপন করে নেয় তাকে।
একদিন কমলি নামে এক দুর্ভাগার সঙ্গে কথা বলে ময়না আবিষ্কার করে, ঘোষপাড়ার মঠে বলরাম বাবাজির নির্দেশনায় চলছে দেহব্যবসা, নারীপাচার। ময়না বৈষ্ণবী ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ। হরিহরপাড়ার চাটুজ্যেবাড়িতে বসে ময়নার এই দুঃখ-কাহিনির শ্রোতা হন বাড়ির নয়াঠাকুমা আর চার তরুণ – মোহনলাল, সিদ্ধার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, হারাধন সরকার ও রেজাউল মন্ডল। প্রতিবাদী সিদ্ধার্থের নেতৃত্বে মানুষ সংগঠিত হয় মঠের পাপাচারের বিরুদ্ধে। পুলিশে অভিযোগ করা হয়। ফলস্বরূপ, মঠ কর্তৃপক্ষের চক্রান্তে মাধুকরীরত ময়না বৈষ্ণবীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। বিক্ষোভ কমে না। বাড়ে। সিদ্ধার্থ রাজনৈতিক বিশ্বাসে সিপিএম কিন্তু তার কোনো রাজনৈতিক গোঁড়ামি নেই। অনেককে নিয়ে পথ চলতে চায় সে। রাজনীতির কাজের পাশাপাশি ভাঙন-প্লাবনপীড়িত গ্রামের সাধারণ মানুষকে প্লাবন নিয়ন্ত্রণ আর ভাঙন প্রতিরোধ বিষয়ে শিক্ষিত করে তোলে সে। তাদের জানায় নদীকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পন্থা। মুক্তমনের মানুষ সিদ্ধার্থ সিপিএমে থাকতে পারে না। দল ছাড়ে। কংগ্রেস ডাকে তাকে। বিজেপিতে যোগ দেবে না সে। কিন্তু সে তার নিজের মতো পথ চলে। তৌফিক তার সঙ্গী। নিজের মতো পথ চলতে চাইলে যা হয়, প্রত্যেক দলই তাকে ভয় করে। উপড়ে ফেলতে চায়। যে-খুন সে করেনি, সেই খুনে তাকে জড়িয়ে গ্রেফতার করার আয়োজন শুরু হয়। নীলমাধবের সঙ্গে দেখা হয় সিদ্ধার্থের। নীলমাধব সশস্ত্র বিপ্লবী। তার স্বপ্ন সমাজবদলের। সিদ্ধার্থ তোলে সেই চিরকালীন প্রশ্ন – ‘হিংস্রতা কি হিংস্রতা নাশ করতে পারে’। দুলুক্ষ্যাপা তার সঞ্চয়ভরা ঝুলি উপহার দেয় সিদ্ধার্থকে – ‘তুমিই তো আমাদের পথ দেখাবে বাবা। তোমার টানে টানে আমরাও তোমার পিছু ছাড়ব না।’ সিদ্ধার্থ হয়ে যায় সাধারণ মানুষের নির্ভরতার জায়গা, জনগণের প্রতিবাদী মুখ। এই প্রতিবাদ, যা ছড়িয়ে যাবে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে।
এই বৃহদাকারের উপন্যাসে প্রাসঙ্গিকভাবেই স্থান পেয়েছে মুর্শিদাবাদের ইতিহাস, ভূগোল, নদীপ্রকৃতি, বাউলদের নানান (কু) আচার। ওই জনপদের নানান বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে এই ধ্রুপদী আখ্যানে। তথাকথিত, বাজার-চলতি রাজনীতিকদের ভন্ডামি, তার নীতিহীন হিংস্রতাও উন্মোচিত হয় আমাদের সামনে। সিদ্ধার্থ চরিত্রটি আকর্ষক। বঞ্চিত মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর সৎ আবেগে পূর্ণ এই শুভ্র মানুষটিকে যখন বাজারি রাজনীতিকদের বিপ্রতীপে স্থাপন করা হয়, ওই রাজনীতির কারবারিদের কালো দিকগুলি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই উপন্যাসের জাত আলাদা। প্রথম থেকেই, ময়না বৈষ্ণবীর খুনের পরেই, সিদ্ধার্থের মানসিকতায় বোঝা যাচ্ছে, অন্যায়, অনাচারের বিরুদ্ধে এবার সংগঠন গড়ার লক্ষ্যে এগোবে মানুষ। গণজাগরণের উদ্বোধন হবে এবার। এ-ধরনের সৃজনে, যাকে বলা হয় উদ্দেশ্যমূলক বা পক্ষপাতমূলক রচনা, আশঙ্কা থাকে শিল্পরসহানির। তখন সেই রচনা পাঠ আর নান্দনিক অভিজ্ঞতা হয় না। নিজের বিশ্বাস, মনোভাব, অবস্থান ব্যক্ত করবার তাগিদে লেখক প্রায়শই হারিয়ে ফেলেন শিল্পবোধের ভরকেন্দ্রটিকে। তখন সেই সৃজন হয়ে দাঁড়ায় নিছক সংবাদ বা প্রচারপত্র। যাঁরা উদ্দেশ্যমূলক লেখার প্রবক্তা, সেই এঙ্গেলস, লেনিন, ট্রটস্কি, মাও থেকে জর্জ অরওয়েল সবাই এ-বিষয়ে লেখকদের সতর্ক করেছেন। শিল্প, ট্রটস্কি বলছেন, এমনই হবে যেন, ‘…it enriches the spiritual experience of the individual and the community, it refines feelings, makes it more flexible, more responsive, it enlarges the volume of thought in advance…’। মাও জে-ডং বলছেন আরো স্পষ্ট ভাষায় – ‘শিল্পকর্ম রাজনৈতিক দিক থেকে যতই প্রগতিশীল হোক না, শৈল্পিকগুণের অভাবে তা শক্তিহীন হয়ে পড়ে। অতএব, আমরা যেমনি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণে ভুল শিল্পকর্মের বিরোধিতা করি, তেমনি তথাকথিত ‘প্রচারপত্র-স্লোগান রীতির’ ঝোঁক, যা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্ভুল কিন্তু শিল্পকর্মে শক্তিহীন, তারও বিরোধিতা করি।’ আর এক বিখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল লিখছেন – ‘আমি যা করতে চেয়েছি তা হলো রাজনৈতিক লেখনীকে শিল্পরূপ দান। আমি সবসময় লিখতে শুরু করি একটি পক্ষপাতমূলক অবস্থান থেকে, একটি অন্যায় অবিচারের অনুভূতি থেকে। আমি যখন লিখতে বসি, কখনো নিজেকে বলি না, ‘আমি একটি শিল্প রচনা করতে চলেছি’, আমি লিখি কারণ আমি চাই কোনো অসত্যের মুখোশ খুলে দিতে, কোনো ঘটনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য আমার কথা লোকে শুনুক। কিন্তু আমি কোনো বই, এমনকি কোনো সাময়িকপত্রের জন্য দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখতে পারতাম না যদি না তা এক নান্দনিক অভিজ্ঞতাও হতো।’
এই মাপকাঠিতে তিলোত্তমার রাজপাট, আমাদের বলতে কোনো দ্বিধা নেই, এক সুনিপুণ কৃতি, অপূর্ব নান্দনিক অভিজ্ঞতা।
তিলোত্তমার গদ্যভঙ্গি, জীবনবোধ, ঘটনা নির্মাণের কুশলতা নিয়ে কিছু ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা গেল, যদিও এমন টুকরো কথায় তার সমগ্রতা বোঝানো শক্ত। প্রসঙ্গত, রবীন্দ্রনাথের সাবধানবাণী – ‘সমগ্র পটের মধ্যে যে-ছবি আছে পটটাকে ছিঁড়ে তার বিচার করা চলে না – অন্তত সেটা আর্টের বিচার নয়… বিচারশক্তির প্রেস্টিজ শাসনশক্তির প্রেস্টিজের চেয়ে অনেক বেশি।’ অতএব, আর ছেঁড়া-খোঁড়া নয়! কিছু কথা বলে এ-লেখা শেষ করব।
তবে শুধু কি গদ্যভঙ্গির জন্যই, তা সে যতই সুষমানিটোল হোক না কেন, কিংবা শুধু কি জীবনবোধের জন্য, তা সে যতই প্রাণদায়ী হোক না কেন, অথবা নির্মাণ-কুশলতার জন্যই, তা সে যতই সহজ সিঁড়িভাঙা হোক না কেন, আমরা তিলোত্তমাকে অভিবাদন জানাব? না, কখনো নয়। এর পরে যা থাকলে রচনা স্মরণীয় হয়ে ওঠে, সেই না-বলা কথা জগৎটিও তিলোত্তমায় আছে।
যে-কোনো সৎসাহিত্য আমাদের প্ররোচিত করে সাদা-কালোতে বলা-কথার বাইরে না-বলার রঙিন জগতে প্রবেশ করতে। তিলোত্তমার উপন্যাসেও আমরা পেয়ে যাই আমাদের সেই বাইরের মনের থেকে অন্দরের মনে যাওয়ার হাতছানি! আমরা ঋ উপন্যাসের বিনতার একটি মুখচ্ছবি কল্পনা করবার চেষ্টা করি – তার শান্ত মুখ, দীঘল দুই চোখও এমনিতে শান্ত, কিন্তু কখনো বজ্রের দ্যুতি খেলে যায় সেই শান্ত পুষ্করিণীতে। একতারার দেবারতির হাত কি হলুদমাখা? গরমকালে তার কপালের টিপ কি লেপটে গেছে? গরম তেল ছিটকে তার হাতের উপরিভাগে যে-ফোস্কা পড়েছে, তাতে হাত বুলোতে ইচ্ছে করে পরম মমতায়। ভট্টাচার্যবাড়ি ত্যাগের সময় আমাদেরও তার পাশে পথ চলতে ইচ্ছা হয়। রাজপাটের ময়না বৈষ্ণবীর গাত্রবর্ণ নিশ্চয়ই তামাটে। মাঝারি উচ্চতা বোধহয়। তার দার্শনিক চোখ নিশ্চয়ই কখনো কৌতুকময় হয়ে ওঠে। মানুষটি হয়তো নরম মনের কিন্তু চাপের মুখে সে নিশ্চয়ই বেতসবৃত্তি করে না। প্রহাণের সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়ে শ্রীকে আর একটু বোঝালে কেমন হতো? আমরা সবাই তো সেই আদিম যৌনতার ভগ্নাংশ রক্তে বয়ে নিয়ে চলেছি এখনো! চাঁদের গায়ে চাঁদের শ্রুতি, যার পর্যবেক্ষণক্ষমতা অসামান্য, কি দেখতে ছোটখাটো? সে কি অল্পসল্প তোতলা, যা পরবর্তীকালে ঠিক হয়ে যাবে? নিশ্চয়ই অদম্য তার প্রাণশক্তি, ধৈর্যও নিশ্চয় কিছু কম নয়। তিলোত্তমার উপন্যাস পড়তে গিয়ে আমরা আবিষ্কার করি এমনই ‘বলা এবং না-বলার অপরূপ ছন্দ’।
সবশেষে ‘চিরকালের প্রশ্নটি’ যদি রবীন্দ্রনাথ ছুড়ে দেন – ‘হে গুণী, কোন অপূর্ব রূপটি তুমি সকল কালের জন্য সৃষ্টি করলে?’, আমরা এগিয়ে দেব মুক্তমনের দেবারতিকে, যাকে অনুগমন করবে নীল-মাধবী-শিবানন্দ সংসারের অন্তর্লীন সামন্ততান্ত্রিকতার চিহ্ন হিসেবে। যাবে শ্রুতি, দেবরূপা বয়ঃসন্ধির দর্শন নিয়ে এবং অবশ্যই ময়না বৈষ্ণবী, যে নাকি আধুনিক আবিলতার শিকার। আমি নিশ্চিত সেই প্রাজ্ঞ মানুষটি তাদের অভ্যর্থনা করবেন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.