নদীর পাড়-ভাঙা অবয়বের মধ্যেই প্রথম ভাস্কর্য গড়ার অনুপ্রেরণা খুঁজে পাই – আবদুর রাজ্জাক

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : রশীদ আমিন

শিল্পী আবদুর রাজ্জাক একজন বহুমাত্রিক শিল্পী। তিনি একাধারে যেমন ভাস্কর্য গড়েছেন, তেমনি ছবি এঁকেছেন প্রচুর – কী জলরঙে, কী তেলরঙে অথবা ড্রইংয়ের বলিষ্ঠ রেখার টানে উদ্ভাসিত করেছেন নানা অবয়ব। এই বহুমাত্রিকতাই যেন তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

চারুকলা ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র, যুক্ত ছিলেন প্রতিষ্ঠালগ্নের শিল্প-আন্দোলনে, অতঃপর শিক্ষক হিসেবে কাটিয়ে দিয়েছেন কয়েক যুগ, বর্তমানে অবসরে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন শিল্পীর অবসর নেই। কাজ করছেন অনবরত, পরিকল্পনা করছেন নতুন প্রদর্শনীর। অত্যন্ত কৃতী ও মেধাবী ছাত্র হিসেবে হয়েছিলেন জয়নুলের স্নেহধন্য। পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তে ঘুরেছেন কখনো শিক্ষার্থী হিসেবে, কখনো বা প্রদর্শনীর সুবাদে। নিজের জ্ঞানকে করেছেন সমৃদ্ধ এবং    তা অকাতরে দান করে গেছেন ছাত্রদের মাঝে। তাঁর হাতেই প্রথম   গড়ে উঠেছিল চারুকলা ইনস্টিটিউটের ভাস্কর্য বিভাগ। ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে তা ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের প্রথম ভাস্কর্যটির রূপকার তিনিই। এই রকমই নানামুখী শিল্পকর্মকাণ্ডে কাটিয়ে দিয়েছেন দীর্ঘসময়। বর্তমানে বলা যেতে পারে এক ধরনের নিভৃত জীবন যাপন করছেন। বারিধারা ডি.ও.এইচ.এসের ছিমছাম বাড়িটিতে তাঁর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলামএক আলাপচারিতায়।

রশীদ আমিন : আপনার শৈশবের কথা বলবেন কি? কেমন পারিপার্শ্বিকতার মধ্য দিয়ে আপনি বড় হয়েছেন, আর কী-ই বা ছিল আপনার শিল্পী হওয়ার প্রেরণা…

আবদুর রাজ্জাক : আমাদের সময়ে তো এইরকম ছিল না। এখন যেমন স্কুলগুলোতে ড্রইং-টিচার আছে, সে-রকম কিছু ছিল না। আমি ফরিদপুর জেলা স্কুলের ছাত্র। আমাদের বাড়ির কাছে কার্তিকপুরে একটি স্কুল ছিল, সেখানেই আমার লেখাপড়া শুরু, তারপর ফরিদপুরে চলে আসি। তবে ছেলেবেলা থেকে আমার ছবি আঁকার আগ্রহ ছিল। আমার মামাবাড়িতে ছিলাম, সেখানে মামাদেরও এই বিষয়ে আগ্রহ ছিল। আমার বাবা এবং মামা সলিমুল্লাহ্ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল থেকে ড্রাফ্টসম্যান হিসেবে ডিগ্রি নেন। সেখানে আঁকাআঁকির রেওয়াজ ছিল, তাঁদের ড্রইং শিখতে হতো। মূল প্রেরণা বাবার কাছ থেকেই। বাবার আঁকার প্যালেটটি এখনো আমার কাছে আছে। তিনি আমাকে একটি তুলিও উপহার দিয়েছিলেন। তা-ও সযত্নে রেখে দিয়েছি।

রশীদ আমিন : আপনার বাবাও তাহলে ছবি আঁকতেন?

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, ওই তো বললাম ড্রাফ্টসম্যানের কাজের সুবাদে কিছু চর্চা ছিলই। আমার মামাও আমাকে একটি প্যালেট দিয়েছিলেন, সেটিও আমি প্রিজার্ভ করেছি। তারপর ডল-কালেকশন, এটিও আমার একটি শখ ছিল। বাড়ির কাছে কুমোরপাড়া ছিল, সেখানে গিয়ে আমি পুতুল সংগ্রহ করতাম। সেগুলো এখনো আমার কাছে আছে। আমাদের শরিয়তপুর হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা ছিল, দূর থেকে ওদের সবকিছু দেখতাম, তা খুব শিল্পিত ছিল। ফরিদপুরে যখন আসি, তখন বিভিন্ন ম্যাগাজিনে বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখতাম এবং সেগুলো আমি সংগ্রহ করতাম। জয়নুল আবেদিন, আনোয়ারুল হক, শফিকুল আমিন প্রমুখের কাজ ছাপা হতো। পশ্চিমবঙ্গের কিছু শিল্পীর কাজ দেখে মুগ্ধ হতাম।

রশীদ আমিন : পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের নাম মনে আছে?

আবদুর রাজ্জাক : যামিনী রায়, নন্দলাল, অবনীন্দ্রনাথ। আর ওই ছবিটি আমার খুব মনে আছে – নন্দলালের আঁকা লালনের ছবিটি।

রশীদ আমিন : ম্যাগাজিনের নামগুলো কি মনে আছে?

আবদুর রাজ্জাক : ঠিক মনে করতে পারছি না। আমি শুধু ছবিগুলো কেটে আলাদাভাবে সংগ্রহ করে রাখতাম। যাই হোক, আমার এদিকে বেশ ইন্টারেস্ট ছিল। ম্যাট্রিক পাশ করার পর খ্রিষ্টান স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে আমি কিছুদিন আঁকা শিখি – যাকে সফ্ট পেইন্টিং বলা হতো। গুঁড়া রং ঘষে ঘষে করা হতো। ওই আমার প্রথম প্রথাগতভাবে শিল্পকর্মে হাতেখড়ি। তার আগে তো নিজে নিজে যা পারতাম করতাম। আমার বড়ভাই এক্ষেত্রে আমাকে খুব উৎসাহ দিত, সে আমাকে প্রায়শ মডেল দিত, আমার বড়ভাই হচ্ছে নজরুলের বাবা। শিল্প-সমালোচক নজরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওগ্রাফির প্রফেসর। ওই ভাইয়ের সঙ্গে ফরিদপুরে থাকতাম, ম্যাট্রিক পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হলাম। সেটিও একটি ইতিহাস। আমি কলকাতায় যাবো আর্ট কলেজে ভর্তি হতে, তখন পার্টিশন হয়ে গেল। আমার মামা ছিলেন কলকাতায়। তিনি বললেন, আর্ট কলেজ তো ঢাকায় আসতাছে, তুমি ইন্টারমিডিয়েট কমপ্লিট করে ঢাকায় পড়ো। এই ইন্টারমিডিয়েট পাশ করতে গিয়ে আমি সেকেন্ড ব্যাচের হয়ে গেলাম। তা না হলে আমি আমিনুল ইসলামদের সঙ্গেই থাকতাম। আমার ভাগ্য ভালো আমার বড়ভাই ঢাকায় চলে এলো এবং আমি তাঁর বাসায় থেকে পড়াশোনা শুরু করলাম। বাসাও নবাবপুরে, আর্ট কলেজও নবাবপুরে।

রশীদ আমিন : যে-দুটি রুম নিয়ে নবাবপুরে আর্ট কলেজ শুরু হয়েছিল সেখানেই –

আবদুর রাজ্জাক : আমরা যখন ভর্তি হই তখন দুটি ছিল, পরে উপরতলায় আরো দুটি রুম পাই।

রশীদ আমিন : ওই সময়ের সহপাঠীরা…

আবদুর রাজ্জাক : সবাই তো বিখ্যাত – কাইয়ুম চৌধুরী, রশিদ চৌধুরী, মুর্তজা বশীর।

রশীদ আমিন : কতজন ছাত্র ছিল, মনে আছে?

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, আমিনুল সাহেবদের ব্যাচে কম ছিল, ২৫/৩০ জনের মতো। হয়তো আরো কম হবে, আমরা ছিলাম চল্লিশ জনের মতো।

রশীদ আমিন : মেয়েরা…

আবদুর রাজ্জাক : মেয়েরা তো অনেক পরে আসে, কলেজ শাহবাগে আসার পর। ৫৮ সালের দিকে আমি যখন জয়েন করি, আমেরিকা থেকে এসে, আমার উপরই দায়িত্ব পড়ে ওদের ক্লাশ নেওয়ার। কাইয়ুম সাহেবের স্ত্রী তাহেরা, মোহসেনা আলী, গোপেশ মালাকারের স্ত্রী – এরাই ছিল ওই প্রথম ব্যাচের ছাত্রী।

রশীদ আমিন : আবার একটু পুরানো প্রসঙ্গে ফিরে যাই। আপনি তো আর্ট কলেজে ভর্তি হলেন, আবেদিন স্যার ছিলেন ওই সময়, নিশ্চয়ই তাঁর নাম আগেই শুনেছিলেন। সে-সময়ের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? শুরুর কথা একটু বলবেন কি?

আবদুর রাজ্জাক : আবেদিন স্যারকে তো আগেই চিনতাম, ম্যাগাজিনের পাতায়। তাঁর আঁকা ওই বাঁশি বাজানোর ছবিটি এখনো অন্তরেগেঁথে আছে। আমার বাবার ইচ্ছা ছিল আমাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াবেন, তখন তো ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার এদের খুব কদর ছিল, আমার ভাইয়ের ইচ্ছা আমি আর্ট কলেজে পড়ি। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে টেস্ট দিই। হয়েই গেছে, ইচ্ছা করলে ভর্তি হতে পারি। বড় ভাইয়ের ইচ্ছা আর্ট কলেজে ভর্তি হই। তখন আমার ভাই বলল, ‘তোমার কিছু কাজ নিয়ে জয়নুল আবেদিন স্যারের সঙ্গে দেখা করি। দেখি কী হয়।’ উনি একাই গেলেন, আমার বেশকিছু কাজ নিয়ে। আবেদিন স্যার তখন বাসা নেননি। শ্বশুরবাড়িতে থাকেন, পাকিস্তান মাঠের কাছে। আবেদিন সাহেব আমার কাজ দেখে খুবই মুগ্ধ হলেন, বললেন, ওকে কালকেই পাঠিয়ে দিন। ও ভালো, ও ভালো ছবি আঁকে। কথা-অনুযায়ী আমি পরের দিন গেলাম। আমি তো কাউকে চিনি না, গেলাম। সে অনেক ঘটনা। কামরুল ভাই তখন ইয়াং টিচার, বসে বসে তবলার মতো কী যেন বাজাচ্ছেন। আমি বললাম, ‘আবেদিন সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে চাই’। উনি বললেন, বসো। তখন তো একটি ঘরের মধ্যে অফিস, ক্লাসরুম সব একাকার। ফার্নিচারগুলো দেখে আমার খুব ভালো লাগল। ছবি আঁকার ডেস্কগুলো – আগে এ-ধরনের জিনিস অন্য কোথাও দেখিনি – খুবই ভালো লাগছিল। আবেদিন সাহেবের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ তোমার ভাই তো কালকে গেছিল, তো তুমি ভর্তি হয়ে যাও।’ রশিদ চৌধুরীদের টেস্ট নিয়েছিলেন এবং টেস্টে সে অ্যালাও হয়নি। সে অনেক ঘটনা। আমার কোনো টেস্ট নিলেন না। তারপর ভর্তি হয়ে গেলাম। আনোয়ারুল হক সাহেব ছিলেন, হাবিবুর রহমান সাহেব, শফি সাহেব – তো ক্লাস শুরু করে দিলাম। ওঁরা খুব গাইড করতেন।

রশীদ আমিন : ওই সময়ে আবেদিন সাহেবই কি সরাসরি গাইড করতেন, যা অনেকটা গুরুশিষ্য-পরম্পরার মতো?

আবদুর রাজ্জাক : না, মূলত আনোয়ারুল হক সাহেব, কামরুল ভাই, শফি সাহেব – তাঁরাই সারাক্ষণ গাইড করতেন। আবেদিন স্যার মাঝে মাঝে এসে দেখিয়ে দিতেন। তবে রিলেশনটা খুব ভালো ছিল। ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক অন্যরকম ছিল, কী বলব, একদম ফ্রেন্ডলি। একটা অন্তরঙ্গতা ছিল। সবসময়ে গাইড করতেন, এটা কেনো, ওটা কেনো, ওইখানে যাও ইত্যাদি। তারপর স্কেচ করতাম আউটডোরে। সেখানেও আমাদের সঙ্গে যেতেন।

আমাদের সময়ে এত সিলেবাস-টিলেবাস ছিল না। স্টিল লাইফ, ড্রইং – এইসবই শুধু। ছিল না কোনো থিওরির সাবজেক্ট। হয়তো বললেন, কাইলকা আস, তোমাদের পরীক্ষা হবে – এইরকম আর কি। কোনো ডিপার্টমেন্ট ছিল না। গ্রাফিক্সের সাবজেক্ট হাবিবুর রহমান স্যার, শফি স্যার, ওঁরা নিতেন। কমার্শিয়াল ডিজাইনও শিখতাম। তারপর আস্তে-ধীরে যখন সেগুনবাগিচায় এলাম, তখন ধীরে ধীরে সবকিছু তৈরি হতে লাগল।

রশীদ আমিন : আপনাদের ছাত্রজীবনের ঢাকা তো ছিল অন্যরকম। ছিমছাম একটি স্নিগ্ধ ব্যপার ছিল।

আবদুর রাজ্জাক : গাড়িঘোড়া এত ছিল না। নদীর পাড়টা খুবই সুন্দর ছিল। বুড়িগঙ্গার পাড়।

রশীদ আমিন : ঢাকা নগর জাদুঘর থেকে আপনার একটি প্রদর্শনী হয়েছিল এবং একটি বইও প্রকাশ হয়েছিল।

আবদুর রাজ্জাক : চল্লিশ বছর পূর্তি-উপলক্ষে।রশীদ আমিন : এই বইটিতে আমরা দেখি বুড়িগঙ্গার অনেক ছবি এঁকেছিলেন জলরঙে, ঢাকার ল্যান্ডস্কেপও এঁকেছিলেন। পঞ্চাশের দশকের ঢাকার ল্যান্ডস্কেপের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে আমরা ধরতে পারি। এই ছবিগুলো আঁকার প্রেক্ষাপট একটু বলবেন কী?

আবদুর রাজ্জাক : আমরা একটি গ্রুপ ছিলাম – রশিদ চৌধুরী, আমি, মুর্তজা বশীর, কাইয়ুম চৌধুরী। আমিনুলও ছিল – তবে ও একটু সিনিয়র ছিল। আমরা দলবেঁধে কাজ করতাম। সবারই সাইকেল ছিল। সাইকেলে ঘুরে বেড়াতাম। মনে হলে বেগমবাজারে বশীরদের বাসায় চলে যেতাম। নদীর ওই পারে গেলে সাইকেল নিয়েই যেতাম। নৌকাতে পার হতাম। আমাদের সময়ে এইরকম সুন্দর সুন্দর স্ট্রাকচার ছিল না। বেশির ভাগই ছিল মাঠ। ধানমন্ডি তো ছিল শুধু ধানক্ষেত, কোনো দালানকোঠা ছিল না। শুধু ওই মসজিদটি ছিল, সাতমসজিদ রোডে। চলে যেতাম পালপাড়া রায়ের বাজারের ওইদিকে। সবই তো ধানক্ষেত, নিউমার্কেটও ছিল না। আমরা এগুলো আঁকার চেষ্টা করতাম, চেহারা-টেহারাও আঁকতাম, মাঠে কাজ করছে। ইউনিভার্সিটির স্ট্রাকচারগুলোও আঁকতাম। আমরা সবসময়ে ডিফারেন্ট সাবজেক্ট খুঁজতাম। শুধু স্টাডি নয়, এর মধ্যে অন্য ধরনের একটি অন্বেষাও কাজ করত। বঙ্গভবনের আশেপাশে ধোপারা কাজ করত। সেগুলোও আমাদের প্রিয় বিষয় ছিল। তবে পুরানো ঢাকার দিকে কিছু স্ট্রাকচার ছিল, গলিটলি ছিল – সেগুলোও আঁকতাম।

রশীদ আমিন : তখন তো শহর বলতে পুরানো ঢাকাকেই বোঝাত।

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, ইসলামপুর, চকবাজার, বাংলাবাজার। বাংলাবাজারেরও অনেক ছবি এঁকেছি। আমরা চেষ্টা করতাম বিষয়টিকে ধরে রাখতে এবং সেই সঙ্গে ইমপ্রুভমেন্টও হতো। সবাই এঁকেছে। তবে আমার বিষয়টি ছিল অন্যরকম। আমেরিকা যাওয়ার আগে একটি চেস্ট অফ ড্রয়ারে কাজগুলো আমি যত্ন করে রেখে গিয়েছিলাম। সুতরাং কাজগুলো নষ্ট হয়নি, তাই এক্জিবিশন করতে পেরেছি।

রশীদ আমিন : আপনার এই ছবিগুলোর সঙ্গে উনিশ শতকে চার্লস ডয়েলির অঙ্কিত এনগ্রেভিং চিত্রমালার কিছুটা তুলনা করতে পারি।

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, ওই ছবিগুলো আমি দেখেছি। খুবই চমৎকার এবং সত্যিই একটি প্রামাণ্য দলিল। পাগলাঘাট নিয়ে ছবি এঁকেছেন।

রশীদ আমিন : এবার আপনার জীবনের পরবর্তী অধ্যায় অর্থাৎ গ্রাজুয়েশন, বিদেশযাত্রা ইত্যাদির সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।

আবদুর রাজ্জাক : নিজের কথা বলতে খারাপ শোনায়, তবে আমি বরাবরই ভালো ছেলে ছিলাম, ফার্স্ট হতাম। রেজাল্ট ভালো ছিল। প্রথম ফুলব্রাইট স্কলারশিপ অর্জন করি, কমপিটিটিভ ছিল। আমেরিকা যাওয়ার আগে আমি ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউটে চাকরি নিই। তখন আর্ট কলেজে ঢোকা একটু কঠিনই ছিল। ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউটের অফিস ছিল পুরানো ঢাকার রথখোলার মোড়টি থেকে একটু বাঁদিকে। একটি পুরানো জমিদার বাড়ি, জায়গাটি খুবই সুন্দর ছিল। দেয়ালে অনেক সুন্দর সুন্দর রিলিফওয়ার্ক ছিল। আমার খুব ভালো লাগত। আমাকে মশার মডেলিং করতে হতো। আমার পোস্ট ছিল আর্টিস্ট কাম মিউজিয়াম কিউরেটর। আমার বস খুব শিল্পরসিক ছিলেন। তিনিও ছবি ভালোবাসতেন। আমি তাঁর মেয়ের একটি পোর্ট্রেট করেছিলাম। সেখানে থাকতে থাকতেই আমার ফুলব্রাইট স্কলারশিপ হয়ে যায়। আবেদিন সাহেব আমাকে খুব সাহায্য করেছিলেন। পাসপোর্ট-ভিসা থেকে শুরু করে সবকিছু বিষয়ে। যাওয়ার আগে বললেন, ‘একা যাচ্ছো, একাই কিন্তু ফিরে আসবা, আর চোখ-কান-মন সব খোলা রাখবা।’ এই ঘটনাটি আমার জীবনের একটি মোড় ঘুরিয়ে দিল। আমেরিকাতে যাওয়ার পর, ওরা আমাদের খুব সমাদর করল, কারণ ওই প্রোগ্রামে আমরাই ছিলাম প্রথম। ষোলোটা দেশের ছাত্ররা গেছে। আমাদের ওরিয়েন্টশন হলো একটি মেয়েদের কলেজে, ওয়েলিংটনে। সেখানে একটি এক্জিবিশনও করেছিলাম। তারপর চলে গেলাম আইওয়াতে। আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি। আমি আগে থেকেই বলে রেখেছিলাম, গ্রাফিক্সের (প্রিন্টমেকিং) ওপর পড়াশোনা করব। তখন বিশ্ববিখ্যাত একজন গ্রাফিক্স আর্টিস্ট (প্রিন্টমেকার) লেসানিস্কি আইওয়াতে ছিলেন। তাঁর অধীনেই আমাকে দেওয়া হলো।

রশীদ আমিন : এত বিখ্যাত শিল্পীর সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলেন, সেটি নিঃসন্দেহে একটি চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা।

আবদুর রাজ্জাক : তাহলে ওঁর সম্পর্কে কিছু বলি। তাঁর বাড়ি ছিল আর্জেন্টিনায়। বিয়ে করেছিলেন স্পেনে। স্পেনে খুব যাতায়াত ছিল এবং পিকাসোর সঙ্গে ছিল বন্ধুত্ব। লেসানিস্কিই পিকাসোকে প্রথম প্রিন্ট শেখান। পিকাসো দুটি কাজও লেসানিস্কিকে উপহার দিয়েছিলেন। তাঁর স্টুডিওতে ওই কাজগুলো আমি দেখেছি। এত বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী, তাঁর সঙ্গে না মিশলে বোঝার উপায় নেই, এত সরল। সারাক্ষণ কাজ করতেন। খুবই মাইডিয়ার টাইপের লোক। ছাত্রদের সঙ্গে সহজভাবে মিশতেন এবং ছবি দেখিয়ে দেওয়ার সময়ে অনেক কথা বলতেন, রেফারেন্স টানতেন। তিনি একটি কথা বলতেন, অ্যাসিডে এচিং করার পর প্লেটটি যখন রিলিফওয়ার্কের সৌন্দর্য অর্জন করবে, তখনই বুঝবে এটি একটি উৎকৃষ্ট কাজ হবে। এভাবে উনি আমাদেরকে এচিং করা শেখাতেন। আমি তাঁর কাজ সংগ্রহ করতে পারিনি। ছাত্রদের জন্যে কনসেশন ছিল। অর্ধেক মূল্যে দিতেন। তবে স্মৃতি হিসেবে প্রিন্টের ওপর বিভিন্ন কমেন্ট, সেগুলো রেখে দিয়েছি। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কিছুদিন রেখেও দিতে চেয়েছিলেন। শুধু আমার জন্যস্পেশালি চিঠি লেখেছিলেন এম্ব্যাসিতে। ওই সময়ে আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল, আমেরিকার একুশতম জাতীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ। আইওয়া থেকে চারশ প্রতিযোগীর মধ্যে মাত্র চারজন আমরা সুযোগ পেয়েছিলাম। সেটি ছিল বিরাট গৌরবের ব্যাপার। কত লোক যে টেলিফোন করল, অভিনন্দন জানাল, তার ইয়ত্তা নেই। কেউ কেউ আমার ছবিও কিনল, তাতে আমার কিছু উপকার হলো। আবেদিন সাহেব তখন আমেরিকায়, তিনিও খুব খুশি হয়েছিলেন, আমাকে অভিনন্দন জানালেন।   তারপর আমেরিকায় আমি আরো দুবছর থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম। একটি অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ পেয়েছিলাম। কিন্তু থাকলাম না। আবেদীন সাহেবও বললেন, ‘তোমার চাকরি রেডি, তুমি চলে এসো।’ তখন তো আর এখনকার মতো ছিল না। বাবা-মা, ভাই-বোন, সবার একটি মায়া ছিল।

রশীদ আমিন : কিছুটা হোমসিক।

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, কিছুটা হোমসিকও বটে। তো চলে আসলাম দেশে।

রশীদ আমিন : তারপর আপনি দেশে ফিরে চারুকলায় যোগ দিলেন শিক্ষক হিসেবে। সেটি ১৯৫৮ সালে। শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর আপনার অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল, সে-সম্পর্কে একটু বলবেন।

আবদুর রাজ্জাক : শিক্ষকতা আমার ভালোই লাগত। আমি ও রশিদ চৌধুরী একই সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেলাম। আমরা দুজনেই প্রি-ডিগ্রির ক্লাস নিতাম। রশিদ আমার খুব ভালো বন্ধু ছিল। আমরা একসঙ্গে থাকতাম সারাক্ষণ। ক্লাস নিতে আমার ভালোই লাগত। পরে আমাকে বি.এফ.এ. পেইন্টিং ক্লাস নিতে বলা হলো। পেইন্টিংয়ের ক্লাস নিতাম। ওই হাশেম খানরা ছিল ছাত্র – হাশেম খান, গোপেশ মালাকার, এঁরা। ওই সময়ে ছাত্রীও ঢুকল এবং ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিশতে ভালোই লাগত। আমি এনজয় করতাম।

রশীদ আমিন : আপনাদের তারুণ্যের সময়ে, বিশেষ করে ষাটের দশকে একটি সুন্দর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে উঠেছিল, শিল্পীদের সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী সবার সঙ্গে একটা যোগসূত্র ছিল। সেই সময়ের কথা কী কিছু বলবেন?

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, পরিমণ্ডল। শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গায়ক সবাই সবাইকে চিনত তখন এবং সবাই খুবই কাছাকাছি। এমনকি আমরা আড্ডা দিতাম একসঙ্গে। দুটি জায়গায়। ক্যাপিটাল নামে একটি রেস্টুরেন্ট ছিল নবাবপুর রোডে। আরেকটি ছিল বাংলাবাজারে, শামসুর রাহমান সেখানে যেতেন।

রশীদ আমিন : বিউটি বোর্ডিং?

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, বিউটি বোর্ডিংয়েও যেতাম। তবে আমাদের বেশি আড্ডা হতো ক্যাপিটালে। ওইখানে সবাই আসতেন। কিবরিয়া সাহেব তখন নবাবপুর সরকারি স্কুলে ঢুকেছেন। কিবরিয়া সাহেব, বাসেত সাহেব এবং মুর্তজা বশীর পরে ওইখানে ঢোকেন। ওঁরা সবাই ওই আড্ডাতে আসতেন। বিজন চৌধুরী আসত। বিজন চৌধুরীকে মনে পড়ে?

রশীদ আমিন : হ্যাঁ, অবশ্যই, পশ্চিমবঙ্গের স্বনামধন্য শিল্পী।

আবদুর রাজ্জাক : ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজের প্রিন্সিপাল ছিল। বিজন চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম এরা একই ব্যাচে ছিল, রহমান, শামসুল কাদের। রহমান চিটাগাং ক্যাডেট কলেজে চলে গেল। বিজন চৌধুরী ইন্ডিয়ায়। আমিনুল ইসলাম আর্ট কলেজে জয়েন করল। তবে মস্তবড় কথাই বলব, ওই সময়ে সাংবাদিক, শিল্পী, গায়ক, লেখক সবার মধ্যে একটা মিল ছিল, সখ্য ছিল। 

রশীদ আমিন : রাজনৈতিক আন্দোলনে কি আপনারা যোগ দিতেন?

আবদুর রাজ্জাক : সবাই খুব পার্টিসিপেট করত।

রশীদ আমিন : শিল্পীদের ভূমিকা কেমন ছিল?

আবদুর রাজ্জাক : একেবারে প্রথম সারির।  মস্তবড় ভূমিকা ছিল শিল্পীদের। যতটুকু মনে আছে, ৫২ সালে আমি সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র, একটু একটু আঁকতে পারি। ওই যে শহীদ হলো, মেডিকেল কলেজের সামনে, আবুল বরকত। তখন আমরা একেবারে কাছাকাছি ছিলাম। বশীর আরো কাছে ছিল। ওর তো পায়জামা-পাঞ্জাবি একেবারে রক্তে ভিজে গেল। ওই সময়ে আমাদের একটা প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা নিমতলি জাদুঘরে, লেডি নুন উদ্বোধন করবেন। বশীর আর আমি চলে গেলাম সেখানে, সেই রক্তেভেজা অবস্থায়। এ-সম্পর্কে আমার একটি আর্টিক্লও ছিল, সংবাদে ছাপা হয়েছিল। এক্জিবিশন বন্ধ হয়ে গেল। কামরুল ভাই ছিলেন দায়িত্বে। আন্দোলনের সময়ে পোস্টার আঁকা, ব্যানার – এগুলো আমরা করতাম স্বতঃস্ফূর্তভাবেই। ময়দা দিয়ে আঠা বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় লাগাতাম। বশীর বেশি এক্সপার্ট ছিল। ছোটখাট মানুষ, কিন্তু সাহস ছিল। আমিও থাকতাম ওর সঙ্গে।

রশীদ আমিন : এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। আপনার শিল্পচর্চা-বিষয়ে কিছু জানতে চাই। আপনি বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেন। একাধারে ভাস্কর্য, পেইন্টিং, প্রিন্টমেকিং – সবকিছুতেই আপনার সমান আগ্রহ। এ-বিষয়ে কি কিছু বলবেন? কীভাবে আপনি এত মাধ্যমে কাজ করার প্রেরণা পান? আমাদের দেশের শিল্পীদের মধ্যে খুব-একটা দেখা যায় না, যদিও পশ্চিমদেশীয় শিল্পীদের মধ্যে এ-ধরনের প্রবণতা দেখা যায়।

আবদুর রাজ্জাক : আসলে শৈশব থেকেই প্রাকৃতিকভাবেই হয়তো এই গুণটি আমার মধ্যে আছে। আমি আগেই বলেছি, আমি পালপাড়া থেকে বিভিন্ন পুতুল সংগ্রহ করতাম, সুন্দর সুন্দর ঘোড়া, যা এখনো আমার সংগ্রহে আছে। ছোটবেলা থেকেই মাটি দিয়ে অনেক কিছু বানাতাম। হয়তো খুব সহজাতভাবেই আমার ভেতর এগুলো ছিল, আমাদের বাড়ির ঘরের একটা দরোজা ছিল, যা অত্যন্ত কারুকার্যময়, এত সুন্দর কাঠের কাজ আমি কখনো দেখিনি। সেটি দেখেও মুগ্ধ হয়ে থাকতাম। তারপর নানা ধরনের ক্রাফ্টের কাজ করেছি ছোটবেলা থেকেই। ফরিদপুরে একজন অ্যাডভোকেটের মা বয়স্ক মহিলা, তিনি কাঁথা সেলাই করতেন। আমি তাঁকে ডিজাইন করে দিতাম, তিনি সেলাই করতেন। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। প্রায়শ আমাকে ডাকতেন ডিজাইন করে দেওয়ার জন্য। এ-রকম অনেক ধরনের কাজ আমি করেছি। আরেকটি বিষয় আমাকে খুব মুগ্ধ করত, নদীর পাড় ভেঙে যাওয়ার পর যে-অবয়বটি হতো, তা আমার কাছে মনে হতো ভাস্কর্য। সেটি আমি খুব লক্ষ করতাম। পদ্মার পারে তো আমাদের বাড়ি ছিল। আমি আর আমার এক ভাই ডা. হেদায়েত কোদাল নিয়ে গিয়ে নদীর পাড় ভেঙে নানা ধরনের অবয়ব তৈরি করতাম। এভাবে ছোটবেলা থেকেই প্রাকৃতিকভাবে নানাকিছু দেখে আমার ভেতর নানাকিছু করার প্রেরণা আসে। আর্ট কলেজ-জীবনে ছাপচিত্রের প্রতি আমার বরাবরই ঝোঁক ছিল, করেছিও অনেক। পেইন্টিং তো করতামই। ভাস্কর্য আমেরিকাতে শেষ বছরে বিশেষভাবে শিখি। আমার সিরামিক্সের প্রতিও আগ্রহ ছিল। আমেরিকাতে ছাত্রাবস্থায় সিরামিক্সেরও একটি কোর্স নিতে চেয়েছিলাম। সবাই বলল এত কিছু তুমি করতে পারবে না। সেজন্য সিরামিক্সটা আর হলো না। তবে কালেকশন করেছি অনেকের কাজ। আমেরিকার একজন বিখ্যাত প্রফেসরের কাজও আমার কালেকশনে আছে।

রশীদ আমিন : আপনার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেল আপনার একটি কালেকশন হবি আছে। ছোটবেলায় ডল কালেকশন করতেন। আপনার বাসায় দেখছি অনেকের শিল্পকর্ম। বিভিন্ন সময়ে এক্সচেঞ্জ করেছেন। এটি আমার কাছে মনে হয় একটি বিরল গুণ।

আবদুর রাজ্জাক : পোর্ট্রেটও করেছি অনেক। যেখানেই গেছি পোর্ট্রেট করেছি বন্ধু-বান্ধব সবার। এই যে কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর, রশিদ চৌধুরী, আমিনুল ইসলাম, এদের কত যে পোর্ট্রটে করেছি তার ইয়ত্তা নেই। বিদেশেও যেখানে গেছি, যাদের সাথে পরিচয় হয়েছে, আমি তাদের প্রতিকৃতি এঁকেছি, এগুলো সবই আমার কালেকশনে আছে। আমি চিন্তা করছি একশ পোর্ট্রেট দিয়ে একটি এক্জিবিশন করব।

রশীদ আমিন : নিঃসন্দেহে এটি একটি চমৎকার প্রদর্শনী হবে। আরেকটি বিষয়ে একটু জানতে ইচ্ছে করছে। আপনি আমেরিকাতেই লেসানিস্কির মতো বিখ্যাত শিল্পীর অধীনে প্রিন্ট শিখলেন। স্বভাবতই দেশে এসে প্রিন্টমেকিং বিভাগে জড়িত হওয়ার কথা ছিল। তাহলে কেন অন্য বিভাগে চলে গেলেন?

আবদুর রাজ্জাক : হ্যাঁ, এটি একটি বিষয়। আমার প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল প্রিন্ট ডিপার্টমেন্টে যাওয়ার, কিন্তু কোনো পদ ছিল না। ওঁরা ইচ্ছা করলে পারতেন কিনা জানি না, তবে প্রিন্টের প্রতি ভালোবাসা আমার এখনো আছে। আমি অনেক কাজ করেছি। আরো করার ইচ্ছা আছে। আমার নিজস্ব ছোট্ট মেশিন আছে, সেখানে কাজ করেছি। স্টপআউট, বার্নিশ, এখনো আমার সংগ্রহে আছে। আমি এ-মাধ্যমে কাজ করার তাগিদ অনুভব করছি। করব। অন্তত এচিং না হোক, ড্রাই পয়েন্ট হলেও করব।

রশীদ আমিন : তারপর আপনার উদ্যোগেই ভাস্কর্য বিভাগ খোলা হলো। সেই অভিজ্ঞতা একটু বলুন।

আবদুর রাজ্জাক : আবেদিন সাহেবের যথেষ্ট আগ্রহ ছিল এ-বিষয়ে। তিনি নিজে অনেক ড্রইং করেছিলেন – ডিপার্টমেন্টের স্ট্রাকচারটি কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে। সেগুলো এখনো আমার সংগ্রহে আছে। তিনি বললেন, তুমি একটু ইসলামিক ফাউন্ডেশনে যাও। ওদের সঙ্গে একটু কথা বলো। আমি গেলাম। আবুল হাশিম সাহেব তখন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান। তাকে বললাম আমি অনেক মুসলিম সুলতানদের প্রাসাদে দেখেছি বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য শোভা পাচ্ছে, প্রাসাদে ঢুকতেই শ্বেতপাথরের সিংহ চোখে পড়ে, আর ভেতরে ঢোকার পর অনেক রিলিফওয়ার্ক। ইউরোপ থেকে শিল্পী এনে মেটালের ভাস্কর্য গড়িয়েছেন। তবে আমাদের দেশে এ-ধরনের কাজ হলে অসুবিধা কোথায়? তিনি আমার সমস্ত কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং সম্মতিজ্ঞাপন করলেন। বললেন, অলরাইট, গো এহেড। তারপর মোটামুটি আমরা শুরু করে দিলাম, তেমন কোনো অসুবিধা আর হলো না।

রশীদ আমিন : এই সময়ে এসে আমাদের ভাস্কর্য সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?

আবদুর রাজ্জাক : আমি এ-বিষয়ে আর্টিক্ল লিখেছি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। ভাস্কর্য এমন একটি মাধ্যম, এটি আসতেই হবে, যতই ধর্মীয় বিধিনিষেধ থাকুক না কেন, ভাস্কর্যকে দাবিয়ে রাখা যাবে না। মানুষ যত শিক্ষিত হবে ততই এর ব্যাপ্তি বাড়তে থাকবে।

রশীদ আমিন : আমাদের দেশের সামগ্রিক শিল্প-আন্দোলন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী? আপনি তো দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের শিল্পজগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তো আপনার কী মনে হয়, কতটুকু এগিয়েছে?

আবদুর রাজ্জাক : আমি বলি, আমাদের সঙ্গী-সাথিরা তো নামকরা শিল্পী। কেউ বেঁচে আছে, কেউবা মরে গেছে। যেমন হামিদুর রহমান মরে গেছে। জয়নুল আবেদিন সাহেব, শফি সাহেব, আনোয়ার সাহেব, কামরুল ভাই – ওঁরা যে এ-দেশে একটি আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেন, তখন অনেক ঝুঁকি নিয়েই করেছিলেন। তবে ওঁরা জানতেন এর ভবিষ্যৎ কী, এ-ব্যাপারে যথেষ্ট কনফিডেন্ট ছিলেন। আর ওঁরা কলকাতা থেকে ট্রেইন্ড। কলকাতা তখন কালচারালি অনেক উপরে। ওঁরা ছিলেন অনেক বেশি এনলাইটেন্ড। এই বাংলায় সেই ট্রাডিশন ছিল না। তার মধ্যেও ওঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন। ওঁরা জানতেন এর প্রয়োজন এবং এর ভবিষ্যৎ। আমাদের চোখের সামনেই দেখলাম কতটা এগিয়ে গেল। একটা সময় ছিল যখন বিদেশী ছাড়া কেউ ছবিই কিনত না। এখন দেশী লোকেরাও ছবি কেনে এবং দেদারসে ছবি বিক্রি হচ্ছে। কত জায়গায় কত ম্যুরাল হচ্ছে। কত ধরনের কমিশনড ওয়ার্ক হচ্ছে, ভাবাই যায় না। তবে ছবির উন্নতি সম্পর্কে শেষকথা বলা যায় না। কারণ আমি একটি ছবি আঁকলাম। আমার কাছে ভালো লাগল, আরেকজনের কাছে ভালো লাগল, সেটাই শেষকথা নয়। অনেকভাবেই ছবির বিশ্লেষণ করার দরকার আছে। উন্নত দেশগুলোতে যেভাবে এগিয়েছে, সেভাবে হয়তো আমাদের এগোয়নি, সেক্ষেত্রে একটা তুলনামূলক বিশ্লেষণ দরকার আছে। তবে নতুনরাও কাজ করছে। তাদের মধ্য থেকেই  নতুন ধারা তৈরি হবে। ষাটের দশকের ব্যাপারে কেন সবাই এত বলে, কারণ, আমরা নতুন কিছু দিতে পেরেছিলাম। যাই করি না কেন, সেখানে একটা নতুনত্বের স্বাদ ছিল। এই বিষয়টি মনে  রাখা দরকার। কিবরিয়া    সাহেব, আমিনুল, বশীর, বাসেত – এঁদের সবার কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্পজগতের পরিবর্তন এসেছিল। বলা যেতে পারে একটি টার্নিং পয়েন্ট। আমাদের নতুনত্বের অনুসন্ধানী হওয়া উচিত। হয়তো কেউ কেউ একটা স্ট্যান্ডার্ড অর্জন করে, কিন্তু ওটাই শেষকথা নয়। তাকে বদল করার সাহস থাকতে হবে। যেমন পিকাসো বলত, ‘আগামীকাল আমি কী করব জানি না।’

রশীদ আমিন : এখন কী করছেন? সামনে কোনো প্রদর্শনীর কথা ভাবছেন?

আবদুর রাজ্জাক : কাজ করছি। একটা শো করব। তবে খুব শিগগিরই হয়তো সম্ভব হবে না। এ শোটিও মিক্সড হবে। একধরনের কাজ দিয়ে সম্ভব হবে না। আমি তো নানান ধরনের কাজ করি। পোর্ট্রেটও হয়তো থাকবে কিছু।

রশীদ আমিন : আপনার সে-প্রদর্শনীর অপেক্ষায় থাকলাম। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য। অনেক কথা হলো।আবদুর রাজ্জাক: শিল্প নিয়ে কথা বলতে আমার ভালোই লাগে। ধন্যবাদ।