আবারো অসুখ করল!
সে ফোন করে নাফিদকে খবরটা দেয়।
– কদিন আগেই না ভুগলি!
নাফিদ বলে, একা মানুষের অসুখ ভালো জিনিস না।
– অসুখের আবার ভালো-মন্দ!
– চিন্তা করিস না। আজকে চেম্বার নেই। আমি সময়মতো চলে আসব।
সফরের মনে হলো, এবারের অসুখটা কোনো ময়লা থেকে হয়েছে। সম্ভবত গত পরশু হাত না ধুয়ে খেতে বসে গিয়েছিলাম। – কারণ জানতে চাইলে নাফিদকে বলা যেতে পারে।
নিজে সবসময় কমন একটা কথা বলে, বাসার কোথাও কোনোমাত্র ময়লা আমি বরদাশত করব না। – নতুন বুয়া এলেই এই কথাটা কোনোদিনই না বলে পারে না।
রুহানি মারা গেছে। এক বছর হয়ে গেল। অনেক দিন হলো একলা থাকে। আরো কতদিন একলা থাকতে হবে কে জানে। কোনো নারীর সঙ্গে থাকার কথা এখন সে কল্পনা করতেও ভয় পায়। মেয়েমানুষের কথা মনে হলেই রুহানির সেই দিনগুলি যেন স্তূপাকারে পিরামিডের মতো জেগে ওঠে। অসংখ্য ছবি উড়ে উড়ে এসে প্রথমে ভিতটা তৈরি করে, তারপর ধাপে ধাপে চূড়ায় পৌঁছে যায়।
রুহানিকে বিয়ে করার আগে থেকেই অনেক বেতন দিয়ে সে সবসময় দুটি কাজের লোক রেখে আসছিল। একজন ঘরদোর পরিষ্কার করবে, অন্যজন রান্না করে দেবে।
নাফিদ মেডিসিনের ডাক্তার। অনেকদিন দেশের বাইরে ছিল। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কীসব রাজ্যের ডিগ্রিফিগ্রি নিয়ে ফিরেছে। নাফিদ বড়লোকের ছেলে। ঠাটেবাটে মানুষ! তবে আর্ট-কালচার খুব ভালোবাসে। নাফিদ এলে তার সুন্দরী নতুন স্ত্রীকে নিয়েই আসে। মজা করে বলে, আমার ওষুধে কতটা কাজ হবে কি হবে না, জানি না; কিন্তু ইরার মতো সুন্দরী যদি তোর পাশে কিছুক্ষণ বসে কথা বলে তুই অর্ধেক ভালো হয়ে যাবি।
সফরউদদীন তরফদার শুনেই হো-হো করে হেসেছিল।
– জানিস তো, সুন্দরী নারীরা চাইলে মৃত্যু পর্যন্ত ঠেকিয়ে দিতে পারে।
নাফিদ তখন নাসিরুদ্দিন হোজ্জার কৌতুকটাও শুনিয়ে দেয় : হোজ্জা মৃত্যুশয্যায়। ঠিক তখন স্ত্রীকে বললেন সেজেগুজে পাশে এসে বসতে। স্ত্রী বিরক্ত হয়ে বলল, মরার সময় রসিকতা! হোজ্জার কথা হলো – সুন্দর করে সেজে বসে থাকলে ফেরেশতা জান কবজ করতে দেরি করবে। যত দেরি হবে, তত বেঁচে থাকার সময় বাড়বে। – নাফিদ এই গল্পটা এত মজা করে বলেছিল। সে আর ইরা হাসতে হাসতে মরে।
সফর বলে, ভাবি, আপনাকে কি এভাবে হাসিয়ে-ভাসিয়ে পটিয়ে ফেলল!
ইরাও কম নয়, বিশুদ্ধ ঢাকাইয়া ঢংয়ে বলে, আবার জিগায়!
নাফিদের কথা হলো, দোস্ত যতই যা বলো, ডাক্তার হিসেবে আমি যেটা বুঝি – হিউম্যান টাচ থাকাটাই হলো বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় দিক। মানুষের সঙ্গ এবং সেটা ভালো সঙ্গ। সঙ্গগুণে পাথর হাসে। দোষের কথাটা বলতে চাই না।
– ও বাবা, তুই তো দেখি আবার গম্ভীর গম্ভীর কথা শুরু করে দিলি।
– খারাপটা কী বললাম, সঙ্গগুণে পাথর হাসে – মানে, ভালোর সঙ্গে কঠিন-হৃদয়ের মানুষও প্রাণ ফিরে পায়। – এমন করে কি ভাবতে পারি না?
– ওরে বাহ, তুই তো নতুন প্রবাদের জন্ম দিলি। আরো কিছু এমন জন্ম দে না। আমরা তোকে প্রবাদপুরুষ উপাধি দিয়ে ডাকি!
– এটাই তো মজার ব্যাপার। কৌতুক-ঠাট্টা-তামাশা মানুষ দুম করে ভুলে যায়। সিরিয়াস জিনিস সিরিয়াসলিই মনে থাকে।
– কথা মন্দ বলিসনি।
ইরা প্রথম যেদিন আসে সে ঘুরে-ঘুরে দেয়ালে টানানো রুহানি ও তার ছবিগুলি দেখছিল। সফর বহুদিন থেকে ছবিগুলি আজ নামাবে কাল নামাবে করে আর নামানোর সময় করে উঠতে পারেনি। রুহানির ছবি কেন এখনো দেয়ালে থাকবে? আবার মনে হয়েছে থাকুক না। জীবন কত অকল্পনীয় হতে পারে – ছবিগুলি সেটা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিক।
ইরা অনেক মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলি দেখছিল। সফরের জানতে ইচ্ছা করে, ভাবি কি সাইকিয়াট্রিস্ট নাকি। ছবি দেখে মন পড়তে চাইছেন? যার ছবি তার এবং যে ছবিগুলি টানিয়েছে, তারও?
কথাটা মুখে এলো না। আর প্রথম দিনেই সব কিছু জানবে কেন? তাছাড়া অসুখ মাঝে মধ্যেই হবে। আগেও যেমন হয়েছে, সামনেও হবে। ইরাসহই হয়তো বারবার নাফিদ সফরকে দেখে যাবে।
অসুখ বলতে সফরের দুটো অসুখই ঘুরেফিরে ছোটবেলা থেকে হয়ে আসছে। এক হলো জ¦র সঙ্গে সর্দি-কাশি, দুই হলো পেটের অসুখ। খাওয়া-দাওয়ায় একটু উল্টাপাল্টা করলেই প্রথমে চুকা ঢেকুর, পরে পেট ফাঁপা এবং পরে পাতলা পায়খানা।
জ¦র-সর্দি সহ্য হয়, কিন্তু এই পেটের অসুখ একদম সহ্য করতে পারে না। প্রতিবার এত দুর্বল করে দিয়ে যায়।
নাফিদ এবারো যখন বলল, এদিন আগে ভুগলি, আবার বাধালি?
– কী জানি! কেন হলো! ময়লাই কারণ হয়তো।
ইরা বলে, আপনি মনে হয় দুষ্টু আছেন। দুষ্টু ছেলেদেরই এসব অসুখ হয়। খাওয়ার আগে হাত-মুখ ভালো করে ধুয়ে নিলে কত অসুখের হাত থেকে রেহাই মেলে! – এটা কি এই বয়সে নতুন করে জানাতে হবে!
নাফিদ বলে, বুঝেছি, তুই আমার সুন্দর বউটাকে বারবার দেখার জন্য এমন ঘন-ঘন অসুখে পড়ছিস!
ইরা শুনে কাচভাঙা হাসিতে ভেঙে পড়ে।
– হতেও পারে।
নাফিদ গেয়ে ওঠে, হতেও পারে এই অসুখ, শেষ অসুখ! হতেও পারে এই গান, শেষ গান!
প্রথমবার যখন নাফিদের সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে গিয়েছিল। সময়টা ছিল ঈদের ছুটির আগে আগে। নাফিদের রুমটা হলের একটা করিডোরের শেষে। বেশ শব্দ করে সে ওইদিন জেমসের গান শুনছিল।
– এখনো জেমস শুনিস নাকি!
– নারে দোস্ত। আমার সেই কপাল আর নাই। তোর ভাবি তো রবীন্দ্রসংগীত ছাড়া কিছু শুনতেই পারে না। কোনো রকমের গান না। একমেবাদ্বিতীয়ম রবীন্দ্রসংগীত। এই তুমি না ছায়ানট পাশ করেছিলে, নাকি ফেল করেছিলে!
– এটা কী সফরভাইকে শোনানোর জন্য বললে! পাশ করেছিলাম। এত ভালো ফল করেছিলাম, চাইলে সেখানে টিচারিও করতে পারতাম।
– আরে দেখতে হবে না, আমার স্ত্রী শুধু রূপবতী নয়, গুণবতী এবং ব্লা ব্লা ব্লা …
– সুন্দরী ডাক্তার বউকে নতুন করে গুণবতী বলার কী আছে?
– আরে সুন্দরী ডাক্তার নারী অনেক আছেন। ডাক্তার হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে গুণের কী সম্পর্ক! এটা মেধার ব্যাপার।
– গুণ তাহলে কী?
– ম্যারাডোনা বা মেসি, গুণ হলো ধরো আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল বা পিকাসো বা, কী বলব!
– বাবা তুই দেখি আঁতেল হয়ে যাচ্ছিস!
– না না, তবে গুণী ডাক্তারও অনেক আছেন। যেমন বদরুদ্দোজা চৌধুরী থেকে অরূপ রতন চৌধুরীরা কম নেই, যারা ডাক্তারও, গুণীও।
– আমার মতে, দুটো পেশার মানুষরা বিশেষভাবে গুণী হয়ে যায়। এক ডাক্তার – এঁরা দেখেন জীবন-মৃত্যু, সুস্থতা-অসুস্থতার লড়াই। আর হলো উকিল – যাঁরা দেখেন সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের লড়াই।
– বাহ দুই বন্ধু তো রীতিমতো সেমিনার বসিয়ে দিয়েছ! ইরা এসে ফোড়ন কাটে।
– কী করব ভাবি! আপনি যদি একটা গান শোনাতেন তো কৃতার্থ হতাম।
ইরা কোনোমাত্র দেরি না করে তৎক্ষণাৎ শান্ত হয়ে বসে পড়ে। চোখটা একটু বন্ধ করে মুহূর্ত কয়েকের জন্য। তারপর চোখ খুলে শুরু করে গাওয়া, ‘আমার জীবনপাত্র উছলিয়া মাধুরী করেছ দান’।
কোনোমাত্র, আর গলা ভালো নেই, গাই না অনেকদিন, কী মুশকিল মাফ করে দিন, আজ থাক আরেকদিন – এমন কোনো কিছু না বলে, একদম সরাসরি গান শুনিয়ে দেওয়াটাও সফরের অভিনব লাগে।
গান শেষে নাফিদ ও সফর রীতিমতো স্তব্ধ বিস্ময়ে জমে যায়। রাত সাড়ে নয়টা বাজে। পরীবাগের এই ভেতর দিকে থাকা অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংটার চারতলায় থাকা এই ঘরটা কিছুক্ষণের জন্য অপার্থিব হয়ে গিয়েছিল।
গান শেষ হলে সফর বলে, ভাবি আপনার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে ইচ্ছা করছে!
– ছি ছি, কী বলেন!
– ভাগ্যিস আগের মতো দ্বিধাহীনভাবে পা সামনে দিয়ে বলেননি, করুন তাহলে!
সেদিন নাফিদ ও ইরা চলে যাওয়ার পর যেমন ভালো লেগেছিল, তেমনি তার মনে হয়েছিল ডুকরে কেঁদে উঠতে। রুহানি চলে যাওয়ার পর শেষবারের মতো কেঁদেছিল। এরপর থেকে সফর আর কোনোভাবেই চোখে জল আনতে পারে না।
‘তার গোপন ব্যথার নীরব রাত্রি হোক আজি অবসান।’ – কথা বারবার কানে বিঁধে রইল।
অসুখে থাকার জন্য সারাদিন বিছানায় আধোঘুমে আধোজাগরণে কেটে গেছে। অনেক রাত অবধি জেগে থেকে যখন ঘুম এলো, পরম শান্তিতে সেদিন ঘুম হলো। বহুদিন এমন দিন আসেনি সফরউদদীন তরফদারের জীবনে।
পরদিন সে অনেকটাই সেরে ওঠে। একটু বেলার দিকে ফেসবুকে নাফিদের আইডি খোঁজে। তার আগেই ফেসবুকের স্ক্রিনে ফ্রেন্ড-সাজেশনের তালিকায় ইরাবতী রাহমান নামটা দেখে। কোনো ভুল নেই। নাফিদের স্ত্রীই তিনি। আগে কখনো ফেসবুকে ঘন ঘন হানা দেওয়ার কথা কল্পনাও করেনি সে। অফিসের কাজের ব্যস্ততাও আছে। আর এমন একটা স্পর্শকাতর দপ্তরে তার চাকরি, কোনো রকম কিছু সে নিজের মতো লিখতে বলতে নিজেকেই আটকে রাখে।
ইরা ভাবির অসংখ্য ছবি। ছবিগুলি দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা বিষয় তার বিদ্যুতের মতো মাথায় খেলে যায় – আরে! এ তো ‘ফর্সা রুহানি’, আর রুহানি হলো ‘কালো বা শ্যামলা ইরা ভাবি’। যদিও এটা সহজে ধরার মতোই ছিল, কিন্তু কেন ধরতে পারেনি! রুহানিরও ঘনকালো পিঠছাপানো কোঁকড়ানো কালো চুল! চোখের ধরন। ছোট কপাল, চোয়াল, মুখের গড়ন, পাশ থেকে একেবারেই তফাৎ নেই।
রুহানিকে বিয়ের আগেই রুহানির হাজারো কাহিনি সে জানত। রুহানিকে সেই মেহেরপুরে থাকার সময় থেকে সে জীবনে চেয়ে এসেছিল, মনে মনে প্রতিক্ষণে চেয়েছিল! অন্য কোনো মেয়ের কথা সে কল্পনাও করেনি।
রুহানি তাঁর জীবনে এসেছিল তিন হাত ঘুরে। প্রথমবার সে পালিয়ে গিয়েছিল। সেটি বিয়ে ছিল কি ছিল না – কোনোদিন সে জানতে চায়নি। পরের দুটো বিয়ের প্রথমটা বছর দুই, আরেকটা বছর তিন টিকেছিল। ভাগ্যিস কোনো পক্ষেই কোনো সন্তান হয়নি।
সফরের সঙ্গেও রুহানির মাত্র বছর তিনেকের দাম্পত্য। সফরের কাছে রুহানি বলে, তার ভাষ্যমতে, জীবন সার্থক করা শরীরী সুখ পেয়েছিল এবং অবশ্যই তার কাছে সেও।
আড়াই বছর সময় পার হওয়ার পর কদিন রুহানির লাগাতার শরীর খারাপ করতে শুরু করে। ডাক্তারের কাছে নিলে ডাক্তার তো মা হওয়ার কথা জানায়। কথাটা শোনামাত্র রুহানির কালো মুখের থেকে রক্ত সরে গিয়েছিল। ডাক্তার সামনাসামনি বা মুখোমুখি বসে থাকার কারণে ঝট করে বিষয়টা খেয়াল করলেও পাশে বসে থাকায় সফর সেটা ধরতে পারেনি। রুহানি তাকে বাসায় ফিরে জানায় যে, সে কোনোভাবেই এখন মা হতে চায় না। এই নিয়ে সেদিন রাতে অনেক ঝগড়াঝাটি হয়। এরপর যা হয় তা আরো ভয়াবহ। রুহানি নিজে গিয়ে পরদিনই অ্যাবরশন করিয়ে আসে।
এই ঘটনার পর থেকে সফরের সঙ্গে রুহানির সম্পর্ক ভয়াবহ রকমের শীতল হয়ে পড়ে। রুহানিকে নিয়ে সফরের রীতিমতো প্রতিদিনের আতঙ্ক শুরু হয়। রুহানিও প্রতিদিনই নিত্যনতুন উদ্ভট অদ্ভুত সব আচরণ করতে থাকে। যেমন : কথা নেই বার্তা নেই দু-তিনদিনের জন্য উধাও হয়ে যাওয়া। সফর এসব দেখে ভেতরে ভেতরে থরথর করে কাঁপতে শুরু করে। কী ঘটছে তার জীবনে এসব! কোনো দিন দুঃস্বপ্নেও তো এসব ভাবেনি। – রুহানির ওপর কোনো কিছুর আছর হলে নাকি! রুহানি তাকে বিয়ের সময় যাকে বলে ‘পইপই করে বারণ করেছিল’ – তার সঙ্গে জীবন মানে খুবই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে।
– কী রকম ঝুঁকি!
– জাদুটোনা আছে। তাবিজ-তুমারের ব্যাপার আছে কিছু। কালোজাদু বোঝো!
– মানে, কীসের কালো জাদু?
– সেটা তো এখন বলতে পারব না। বললেও বোঝাতে পারব না। আমি নিজেও জানি না। তবে একটা কথা বলি,
আমি কারো জীবনে সুখের হাওয়া হয়ে বয়ে যাওয়ার জন্য জন্মাইনি। আমাকে তোমার পাশে নেওয়ার মানে নিজেকে বিপদে ফেলা।
সফরের তখন বয়স চল্লিশ ছুঁইছুঁই। সরকারের এত বড় চাকুরে সে, তার জন্যও বিয়ের পাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল না! সমস্যা সেই পুরনো – সফরের পছন্দ হলে পাত্রীপক্ষের পছন্দ হয় না। পাত্রীপক্ষের তাকে পছন্দ হলে সফরের পছন্দ হয় না। – এরই ফেরে পড়ে শেষ অবধি হঠাৎ করে তার রুহানির কথা কেন মনে হলো। রুহানির মায়াময় চেহারা। তার জীবন্ত ভাস্কর্যের মতো রহস্যময় বাঁকবিভঙ্গের শরীরটা বহুদিন পর নতুন করে দেখতে পেয়েছিল। অদ্ভুতভাবে সারাজীবন সে হয় রুহানিকে অথবা রুহানির মতো কারো জন্য অপেক্ষা করে চলছিল! – সেই রুহানি কোথায় আছে? খোঁজ করতে তাকে সে মেহেরপুরেই পেয়ে যায়। সে-সময়টায় দ্বিতীয় স্বামীর কাছে তালাক নিয়ে রুহানি আবার তার বাপের বাড়ি ফিরে এসেছে।
একগাদা ভাইবোনের ভেতরে রুহানির কেন আলাদা কদর ছিল কে জানে। লোকে বলত, এই মেয়ে মায়াবিনী, জাদুকরী কেউ। স্নিগ্ধ-শান্ত চেহারার পেছনে এ স্রেফ কোনো এক পিশাচিনী! কিন্তু এক অপ্রতিরোধ্য টানে রুহানি স্বপ্নে প্রলেপ পরা পুুরুষদের টানত – সেই টান উপেক্ষা করা তো যেতই না, সেজন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করা যেত। এমন বিধ্বংসী শরীর! যেমন তার আঁটুনি, তেমন বাঁধুনি! যদিও রুহানি খুব সস্তা ছিল না। কিন্তু তার কাছে ঘেঁষা পুরুষদের সে নিজে যদি পছন্দ করতো, তাহলে আর কোনো বাধাবিপত্তি বড় হতো না।
রুহানি সুবর্ণকুমার রায়, চিন্ময় বড়ুয়া, ডি এস পেরেরার সঙ্গে তার কাটানো সময়ের কথা বলেছিল। তাদের সঙ্গে কীভাবে দুনিয়া ভুলে যেত – সেসব কাহিনি। আর এরা সবাই অর্থবিত্তে প্রতিপত্তিতে কেউ কারো চেয়ে কম ছিল না। রুহানির একটাই বাতিক – পুরুষ মানেই হয় ক্ষমতাবান, নয়তো টাকাওয়ালা হতে হবে এবং অবশ্যই ক্লিন সেভড একটা মুখ হতে হবে। কোনো রকমের কোনো দাড়িগোঁফ থাকা যাবে না। চুল ফৌজি ছাঁটের না হলেও কাছাকাছি হতে হবে। নিজেই হাসতে হাসতে বলেছিল। সেই প্রথম পাগলের প্রলাপের মতো তিনদিন টানা মদ খেতে খেতে অবিরাম বলে গিয়েছিল নিজের জীবনের এইসব কাহিনি। বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ত। আবার ঘুম থেকে জেগে উঠে এসবই বলতে শুরু করে দিত। হাতের গ্লাস প্রায়ই মেঝেতে পড়ে ভেঙে যায় যায় থেকে কতবার যে সামাল দিয়েছে সফর! পাগল হওয়ার দশা হয়েছিল তার।
এসব কথা সফর কাউকে বলতে পারেনি।
রুহানি ওইরকম টানা তিনদিন মদ খাওয়ার পর আরো অসুস্থ হয়ে যেতে থাকে। আর বলা যায়, তার অসুখ যাতে দিনে দিনে আরো বেড়ে যায়, সেজন্য যা যা নিষেধ করা হতো, সেগুলিই সবচেয়ে বেশি করে করত। নিজেকে একরকম প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়ে দিয়ে রুহানি নিজেই নিজেকে মেরে ফেলেছিল। এটা এক রকমের আত্মহত্যা ছাড়া আর কী!
রুহানিকে দাফন করার দিন বাসায় ফিরে সফরের চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল। কোনোভাবেই কান্না আসছিল না। তারপর গোসল করার সময় শাওয়ারের নিচে জীবনের দীর্ঘতম কান্না সে কেঁদেছিল। এভাবে কোনোদিন আর সে কাঁদেনি; হয়তো আর কোনোদিন কাঁদবেও না। নিজেকে এ-সময় বারকয়েক প্রশ্নও করেছিল, এর জন্য শেষ পর্যন্ত কি সফর নিজেই দায়ী? অনেক চেষ্টা করেও নিজের ওপর কোনো দোষ সে টেনে আনতে পারেনি। সেদিনই প্রথম নিজেকে তার আস্ত কুত্তার বাচ্চা টাইপের মানুষ মনে হয়েছিল! এত ঘৃণা করেছিল নিজেকে সে!
এই বিষয়টাই অনেক পরে, কদিন আগে অসুখ থেকে সেরে ওঠার পর, আর নতুন করে বারবার ফেসবুকে হানা, আর ইরাবতী রাহমানের পেজে যাওয়া-আসা করতে করতে সে খেয়াল করে। যেমন খেয়াল করে : ইরাবতীর জন্ম বার্মায় বা বর্তমান মিয়ানমারে। তার বাবা সেখানে বাংলাদেশের দূতাবাসে পোস্টেড ছিলেন। পরে জেনেছিল অ্যাটাশে হিসেবে ছিলেন।
বেশ কদিন ‘ইরাবতী রাহমান ইরাবতী রাহমান’ চলতে থাকলে হঠাৎ তার মনে হয়, এখন কেউ বা কারো মুখ থেকে ইরাবতী রাহমানের অন্ধকার কোনো অতীতের কাহিনি যদি সফর শুনতে পেত, তাহলে জগতের এই সময়ে সে সবচেয়ে সুখী বোধ করত। সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে হয়, নিজেকে সে এতটা নিচে নামিয়ে আনতে পারল! লজ্জায়-গ্লানিতে তার মরে যেতে ইচ্ছা করল। অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থাকে। ধীরে ধীরে মাথা তোলার সময় ক্যালেন্ডারে চোখ যায়। অদ্ভুতভাবে ১২ই এপ্রিলে গিয়ে চোখ আটকে যায়। ১২ই এপ্রিল! আজ রুহানির জন্মদিন!
সেদিন অফিস থেকে ফেরার সময় বড় একটা গাঁদাফুলের মালা কিনে আনে সফর।
বাসার দেয়ালে টানানো রুহানির সবচেয়ে বড় ছবিটায় সেদিনই প্রথমবারের মতো মালাটা পরিয়ে দেয়। আর সারাদিন মনে মনে জপ করে, আপাতত তার যেন কোনো অসুখ না হয়। আর মালাটা শুকিয়ে যাওয়া অবধি কেউ যেন তার বাসায় না আসে।
এজন্য সে সবার আগে ফোন করে কাজের মেয়েকে দশ দিনের ছুটিও দিয়ে দেয়।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.