লুৎফুন্নাহার সকাল আটটায় এসে গেল। সে বলেছিল সকালে আসবে, কিন্তু এত সকালে আসবে তা মনে হয়নি। আমি ডরমিটরি থেকে বের হয়ে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে হাঁটতে শুরু করব, এমন সময়, ঠিক এই সময়টাতে ট্যাক্সি করে লুৎফুন্নাহার এসে গেল। ট্যাক্সিওয়ালাকে ভাড়া দিতে দিতে বললো, আমার কথা ভুলে গেছো?
– ভুলিনি।
– ডরমিটরি থেকে বেরিয়ে পড়েছ। কোথাও যাচ্ছো তো!
– বড় ক্যাফেটেরিয়ায়। ওখানকার সকালের নাস্তা খুব ভালো। অনেক পদের অনেক কিছু থাকে।
– আরেকটু হলেই তো আমাকে পেতে না। আমি ভিসিটরস রুমে ১০ মিনিট অপেক্ষা করে চলে যেতাম।
– ঠিক আরেকটু হলেই। তোমার আর দু-মিনিট দেরি হলেই একটা গিঁট লেগে যেত।
পার্সের মুখটা বন্ধ করতে করতে লুৎফুন্নাহার বলল, চলো তাহলে ক্যাফেটেরিয়ায়।
ডরমিটরি পার হয়ে বড় একটা ঘাসের চত্বর। সেটার পূর্ব পাশে ক্যাফেটেরিয়া। স্বাভাবিকভাবে হাঁটলে বড়জোর সাত মিনিট।
ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে লুৎফুন্নাহার বললো, আমি একটা দোসা খেতে চাই, মাসালা দোসা না, প্লেইন দোসা।
– এরা দোসা বানায় বলে মনে হয় না। কখনো কারো টেবিলে দোসা দেখেছি বলে মনে পড়ে না।
– তাহলে আর কী করা। সেই ব্রাউন টোস্ট বাটার জ্যাম-জেলি, অরেঞ্জ জুস আর কফি। কিন্তু আজ কফি খাবো না। শরীরভরা অবসাদ। অবসাদের মধ্যে ক্যাফেইন ঢুকিয়ে দিতে চাই না। আমি শাড়ি পরেছি। শাড়িটা মানিয়েছে? তুমি কি নেবে? পরোটা আর ডিমের অমলেট?
– শাড়িতেই তোমাকে মানায়।
– কেন মানায়? শাড়িতেই আমাকে কেন মানায়?
– তা জানি না। চলো ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসি। একটু পরেই দলে দলে ছাত্রছাত্রী চলে আসবে। অনেকের সকালে ক্লাস থাকে। শাড়িতে মানায়; সম্ভবত শাড়ি তোমার ফিগারের সঙ্গে যায়।
– আমার ফিগার কী রকম?
– লক্ষ করে দেখিনি। আজকে লক্ষ করে দেখব। পরে বলবো তোমার ফিগার কী রকম।
যা সব সময় নিই সেই দুটি পরোটা নিলাম আমি। সঙ্গে সবজি-ভাজি আর সেদ্ধ ডিম আর একটি কলা। ডিম ভাঙতে গিয়ে হয়তো টেবিলটা নষ্ট করে ফেলব – এই ভেবে সেদ্ধ ডিম রেখে দিয়ে কিচেনের দিকে চলে গেলাম। সেখানে বললাম, আমাকে ডিম ভাজা দিন।
– ডাবল অমলেট?
– না, একটি ডিম পোচ করে দিন।
ব্রেকফাস্ট নিয়ে লুৎফুন্নাহার একটা টেবিলে গিয়ে বসেছে। ডিম ভেজে আসতে আমার সময় লেগে গেল। দুটি কলা নিলাম। লুৎফুন্নাহার কি সকালবেলায় কলা খাবে?
টোস্টে মাখন লাগিয়েছিল লুৎফুন, এবার মারমালেড লাগাতে লাগলো। অরেঞ্জ মারমালেড।
আমাকে দেখে বলল, জানো দুটি মিশিয়ে চমৎকার স্বাদ হয়। এ-কথা বলে একটু হাসলো লুৎফুন্নাহার। বললো, মানুষকে পদে পদে কত না সিদ্ধান্ত নিতে হয়। টুকটাক সিদ্ধান্ত। খুব ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত একটার পর একটা। আমাদের একদিনের জীবন শত শত সিদ্ধান্তে ভরা।
তা ঠিক। কলা নেওয়ার সময় ভাবছিলাম একটি কলা নেব, না দুটি কলা। ভাবছিলাম, তুমি কি ব্রেকফাস্টে কলা খাবে, নাকি খাবে না।
– এক বছর পরেই তুমি বিএ পাশ করবে। এমএ’তে ভর্তি হবে আর আমি চিরকালের জন্য আন্ডারগ্রেড থেকে যাব।
পরোটার ভেতর কিছুটা সবজি ভরে আমি মুখে পুড়তে যাব এমন সময় এই কথা। আমি হাত নামিয়ে বললাম, কেন ওখানে তুমি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাওনি?
লুৎফুন্নাহার বললো, নতুন জীবন, নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ। মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই ভেবেছি এক বছর বাদ থাক। বাসা থেকে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস বেশ দূরে। বাস ধরতে গেলেও পনেরো মিনিট হাঁটতে হয়। ড্রাইভিং শিখে লাইসেন্স নিতেই ছয় মাস লেগে যাবে। কী একটা শার্ট পরেছো তুমি। অদ্ভুত দেখাচ্ছে। আর শার্ট ছিল না?
– আমি তো কেবল নাস্তা খেতে বেরিয়েছিলাম। এর মধ্যেই তুমি এসে যাবে ভাবিনি।
– কেন, বলেছিলাম না সকাল সকাল চলে আসবো!
– তা ঠিক। নাস্তা খাওয়ার পর ডরমিটরিতে গিয়ে ভালো শার্ট পরে নেব।
– গাঢ় নীল রঙের একটা হাফ শার্ট ছিল তোমার। ওটা আছে? ওটাতে তোমাকে খুব মানাত।
– আছে। গত ঈদে একটি পাঞ্জাবি কিনেছি। ভেবেছিলাম ওটা পরবো।
– পাঞ্জাবি থাক, বরং নীল হাফ শার্টটাই পরো আজ।
আশেপাশের টেবিলগুলো ভরে গেছে। অনেকেই দ্রুত ব্রেকফাস্ট শেষ করে কফি নিয়েছে। কেউ কেউ খালি পেটে কফি দিয়ে দিন শুরু করে। অনেকের ব্ল্যাক কফি না হলে চলে না। কফির কড়া গন্ধ ভেসে আসছে। কিন্তু আমি কফি নেব না। আমি চা খাই। চা খেতে ভালোবাসি। খাওয়া শেষ হলে আমি চা নিয়ে আসব এক কাপ।
– তুমি কেমন আছো লুৎফুন?
– মানিয়ে নিতে পারছি না। এরকম বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। মানিয়ে নেওয়ার নামই সম্ভবত মানবজীবন। পদে পদে মানিয়ে চলতে হয়। কিন্তু আমি তো পারছি না।
– তোমার হাসব্যান্ড সুপুরুষ। বিয়ের দিন দেখেছিলাম। আয়পত্র কেমন? আয়ের কথা জিজ্ঞেস করা সমীচীন হলো কি না বুঝতে পারছি না।
– জানি না। তবে মনে হয় বেশ ভালো। শনিবারে শনিবারে প্লেন চালানো শিখতে যাচ্ছেন। ইনস্ট্রাক্টর ছাড়াই ১০ ঘণ্টা প্লেন চালিয়েছেন। দুই বছরে। সত্তর ঘণ্টা চালাতে পারলে একা প্লেন চালানোর লাইসেন্স পাবেন। দু-বছর লাগবে। তখন ছোট প্লেন কিনবেন একটা।
– প্লেন কিনে ফেলবেন! প্লেন থাকবে কোথায়? বাসার উঠানে? কত বড় বাসা তোমাদের?
– দুই কিলোমিটার দূরে একটি প্রাইভেট অ্যারোড্রোম আছে। সেখানে নিজস্ব প্লেন রাখা যায়। মাসে মাত্র দুশো ডলার দিতে হয়। হাসলো লুৎফুন্নাহার।
তারপর বললো, উনার অফিস খুব দূরে না। গাড়ি চালিয়ে দুপুরে খেতে আসেন। আমি দশটায় রান্নাঘরে যাই। বারোটার মধ্যে ভাত, ডাল, একটা সবজি আর মাছ বা মাংসের একটা কারি রান্না করে ফেলি। দুটোর মধ্যে লাঞ্চের পর্ব শেষ। তিনি চলে যান। এর পরে কাজ নেই। খুবই একঘেয়ে একটা অবস্থা।
অরিত্র বললো, বইপত্র পড়তে পারো। দৈনিক পত্রিকা, ম্যাগাজিন।
– পারি। কাছের লাইব্রেরিটাও পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে। অত দূর হেঁটে যাওয়া সম্ভব নয়। বাসায় থাকতে থাকতে আমার ওজন দুই কেজি বেড়ে গেছে। আর ওদেশে কেউ মনে হয় বাসায় দৈনিক পত্রিকা রাখে না।
– ভদ্রলোককে তোমার পছন্দ না?
– পছন্দ না হওয়ার কোনো কারণ বলতে পারছি না।
– তোমার হাতখরচের টাকা? খুবই ব্যক্তিগত কথা। তবু মুখে এসে গেল প্রশ্নটা।
– উনি আমার জন্য ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে পাঁচ হাজার ডলার জমা করে দিয়েছেন। ব্যাংক ডেবিট কার্ড দিয়েছে, ক্রেডিট কার্ড দিয়েছে। খরচ করতে সমস্যা নেই। ক্রেডিট কার্ডের লিমিট চার হাজার ডলার।
– এদেশের যে কেউ বলবে তুমি সুখে আছো। অসুখী হওয়ার কোনো কারণ দেখা যাচ্ছে না।
– তা বলবে। কিন্তু আরামে থাকা আর সুখী হওয়া কি এক কথা, অরিত্র?
– এক কথা নয়? অরিত্রর চোখেমুখে কৌতূহল।
– এক কথা নয় অরিত্র। জীবনের একটা অর্থ
থাকা দরকার। ওখানে সে-অর্থটা থাকবে না। আমাকে আজ বেঁচে থাকতে হবে যাতে পরদিনের কাজগুলি করতে পারি। এরকম মনে হয় আমার। বড় কথা, মিশিগান আমার ঠিকানা নয়। হবেও না কোনো দিন। মানুষ নিজের ঠিকানায় থাকতে চায়। তুমি চাও না?
একটু থেমে লুৎফুন বললো, আমার মন চাইছে না আর ফিরে যাই। একমাস ঘুমিয়ে নিয়ে পরের সেমিস্টারে এই ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাই।
– সেটা কি সম্ভবপর মনে হচ্ছে? মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে না পড়ে ঢাকায় পড়া সুবিধাজনক – এটা খুব শক্ত যুক্তি হবে না। তোমার স্বামী ওই দেশের নাগরিক। তিনি তোমাকে দেশে ফিরতে দেবেন কেন? তোমার বাবা-মা?
– আব্বা-আম্মাও রাজি হবেন না।
– আমারও সেরকম মনে হয়।
– একটি সমাধান আছে। আমি ইচ্ছে করলে চিরদিনের জন্য চলে আসতে পারি।
অরিত্র অবাক হলো। কিছু বললো না। ওকে একটু চিন্তিত দেখালো।
একটু চুপ থেকে বললো, তুমি কি বিয়ে ভেঙে দেওয়ার কথা বললে?
ঘাড় নাড়লো লুৎফুন্নাহার, ঠিক তাই।
– ওটা কি ঠিক হবে?
লুৎফুন্নাহার বললো, আমাদের বাসায় কোনো কনডোম নেই।
– হঠাৎ এ-কথা? ও আচ্ছা, বাচ্চা নেওয়ার কথা ভাবছিলে?
– না। ওর সিমেনে স্পার্ম কাউন্ট খুব কম। ও কখনো সন্তানের বাবা হতে পারবে না।
– আশ্চর্য!
– আশ্চর্য হওয়ার কী আছে। অনেক পুরুষই এরকম। আমরা শুধু মেয়েদের বাঁজা বলে জানি। পুরুষরাও অক্ষম হয়। আমেরিকায় প্রায় ১০ পার্সেন্ট পুরুষমানুষ সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম।
অরিত্র বললো, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিয়েটা ভেঙে দেওয়া ঠিক হবে কি না।
– স্পার্ম কাউন্ট কম বলে ডিভোর্স করা যায়। আচ্ছা, এসব কথা আজ থাক। পরে আরেকদিন ভাবা যাবে।
অরিত্র গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।
– তুমি এত লাজুক কেন অরিত্র? এত সুন্দর কবিতা লেখ অথচ পত্রিকায় ছাপতে দাও না।
– কে পড়বে আমার কবিতা?
– কে পড়বে আমার কবিতা? কে শুনবে আমার গান? লুৎফুন্নাহারের গলায় অরিত্রের কথাটা প্রতিধ্বনির মতো শোনালো।
– কলা খাবে না?
– হাতে নিয়ে দেখেছি। বড্ড শক্ত। মনে হয় এখনো পাকেনি।
– চা খাবে তো?
– চা খাব। দু-চামচ চিনি নেব। অনেকখানি দুধ নেব। আচ্ছা এখানে মালাই চা হবে না? মনে আছে, একবার তুমি পুরান ঢাকায় নিয়ে গিয়ে কোনো একটি রেস্টুরেন্টে মালাই চা খাইয়েছিলে। খুব ভালো লেগেছিল তা নয়। কিন্তু এখন খেতে ইচ্ছে করল।
– সুযোগ পেলেই মানুষ পুরনো স্মৃতি ছুঁয়ে দেখতে চায়।
– বেশ বললে।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠলাম, ওদের জিজ্ঞেস করে আসি মালাই চা হবে কি না। এত বড় ক্যাফেটেরিয়া, দুধের কড়াইয়ে মালাই থাকা অস্বাভাবিক না।
আমার হাত টেনে ধরল লুৎফুন, তোমাকে যেতে হবে না।
– যাব আর আসব।
– ধরো তুমি মালাই চা আনার নাম করে গেলে আর ফিরে এলে না। আমি তোমার অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে এই কোনায় ওই কোনায় খোঁজ করে আবার টেবিলে ফিরে এসেছি। তোমাকে ফোন করতে পারছি না। তুমি টেবিলে তোমার ফোনটাও রেখে গেছো। কী অবস্থা হবে ভেবে দেখেছো?
– তোমার মন আজ খুব খারাপ মনে হচ্ছে। মন খারাপ থাকলে পৃথিবীটা নিরাশায় ভরে যায়।
– হুম।
– চলো দুজনে একসঙ্গে গিয়ে মালাই চায়ের খোঁজ করি।
– মালাই চা লাগবে না।
– এমনি চা নিয়ে আসি।
লুৎফুন্নাহার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।
চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল লুৎফুন্নাহার খুব সাবধানে। ওর ভয় হচ্ছিল ঠোঁট না পুড়ে যায়।
– আজ তোমার সঙ্গে দেখা হবে বলে একটা কবিতা লিখেছি কাল রাতে।
অবাক হলো না লুৎফুন্নাহার। উদাস কণ্ঠে বলল, পড়তে দিও। আমার মনে হয়, কবিরা অন্য এক জগতের মানুষ, যে-জগতের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ নেই। কবিরা পৃথিবীতেই থাকে, এখানেই তাদের ঘোরাফেরা অথচ তাদের মনটা অন্য কোনো জগতের বাসিন্দা আর সেই জগতের আবেগ, অনুভব, উপলব্ধি, চিন্তা, দেখার চোখ – সবই অন্যরকম। একদম অন্যরকম।
– তাই মনে হয় বুঝি? এটা ঠিক, আমি সব সময় কবিতা লিখতে পারি না। একটা বিশেষ পরিবেশ লাগে।
ঘাড় নাড়লো লুৎফুন্নাহার। বললো, কাল লেখা কবিতাটির দু-একটি লাইন শোনাও।
অরিত্র মৃদু স্বরে শুরু করল –
একটি নিঝুম পথ, দুপুরের রোদে আর গাছেদের সবুজ ছায়ায়
একা, যেন একাকী খুব। দিক ভুলে অন্য কোনো শহর থেকে
এখানে এসেছে চলে। কোনোদিন কেউ
এই পথে বাড়াবে না পা
জানা নেই কারো এই আজনবি পথের সন্ধান।
পথ ভুলে নাকি অভিমানে এই পথ শহর ছেড়েছে?
প্রিয় পথিকের ক্রোধে দুঃখ পেয়েছিল?
ঘুমিয়ে পড়েছিল? স্বপ্নাহত হয়ে এসে ছেড়েছে নিজ বাসভূমি?
এই পথে কেউ হারিয়ে যাবে না কোনোদিন –
শুধু পথভুলো মনভুলো এক জোড়া সাদা সাদা হাঁস
দুপুরের রোদ ভুলে সেই পথে হাঁটে।
একটি বাঁশির সুর প্রতিবেশী কোনো গলি থেকে
উপচে পড়েছে এসে
রাতভুলো বাঁশিটির সেই সুর শুনে
হাঁসেরা থমকে গিয়ে ভয় খেয়ে হেজিটেট করে,
হাঁসেদের পায়ে পায়ে সন্দেহ ঘোরে।
অরিত্র হেসে বললো, আরো আছে কিন্তু মনে নেই। এটা খসড়া। পরে ঘষামাজা করবো।
– আশ্চর্য। তোমার কল্পনাশক্তির প্রশংসা করি। পথ ভুল করে একটি পথ অন্য শহরে চলে এসেছে! আমি কখনোই ওরকম করে ভাবতে পারবো না।
অরিত্র একটু হেসে উঠলো।
– হাসলে যে!
কথা না বলে পকেট থেকে এক টুকরো হলুদ কাগজ বের করলো অরিত্র আর সেটা এগিয়ে দিলো লুৎফুন্নাহারের দিকে।
সকাল ১০টা : লুৎফুন্নাহার আসবে
সকাল ১১টা : সদরঘাট থেকে লঞ্চে চাঁদপুর (লঞ্চের নাম মেঘনা-৩)
দুপুর ২টা : চাঁদপুরে কোনো রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করা
বিকেল ৫টা : চাঁদপুর থেকে লঞ্চে সদরঘাটে ফিরে আসা
সন্ধ্যা ৬টা : কোনো বড় শপিংমলে গিয়ে একটা শাড়ি কেনা
সন্ধ্যা ৭টা : বেঙ্গলে গিয়ে গান শোনা (রজনীকান্ত সেনের দশটি গান করবেন লুভা নাহিদ চৌধুরী)
রাত ৯টা : কোনো রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার (কাবাব আর রুমালি রুটি)
রাত ১০টা : লুৎফুনকে ওর বান্ধবী সাবিনা মাহবুবের বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে (সাবিনা মাহবুবের বাসায় যাচ্ছে এবং রাতে থাকবে বলে ও বাসা থেকে বেরিয়েছে)
লুৎফুন্নাহার জিজ্ঞেস করলো, আজ তোমার টিউশনি নেই?
– ছিল। বলেছি জরুরি কাজ আছে সন্ধ্যাবেলায়। পরে আরেকদিন পুষিয়ে দেব।
– একটাই টিউশনি?
– একটাই।
– সপ্তাহে ক’দিন?
– চার দিন।
হলুদ কাগজটা অরিত্রের দিকে ফিরিয়ে দিলো লুৎফুন্নাহার।
অরিত্র বললো, চলো উঠি।
– আমি একটু টয়লেট থেকে আসছি।
– ক্যাফেটেরিয়া খালি হওয়া শুরু হয়েছে। ব্রেকফাস্ট শেষে ছাত্রছাত্রীরা কেউ ক্লাসের দিকে দৌড়াচ্ছে, কেউ যাচ্ছে লাইব্রেরির দিকে। আগে আগে লাইব্রেরিতে না গেলে চেয়ার-টেবিল পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
অরিত্র ঘড়ির দিকে তাকালো। সাড়ে নয়টা। আজ ওর কোনো লেকচার নেই।
– দেশে ফিরে কী করবে ভেবেছ?
– ভাবনার তেমন কিছু নেই। আবার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবো। ইংরেজি সাহিত্যে বিএ, এমএ পাশ করবো। তারপর কোনো ভালো ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ও-লেভেল এ-লেভেলে ইংরেজি সাহিত্য পড়াব।
– বিয়ে করবে আবার?
– দেখা যাক।
– তাহলে মিশিগান থেকে চলেই আসতে চাও?
– মিশিগানের কেবল একটি জিনিসই আমার ভালো লাগে। একটি বা দুটি। সেপ্টেম্বর মাসে ম্যাপল গাছের পাতা ধীরে ধীরে লাল হয়ে যায়। অক্টোবরে ম্যাপল গাছের মাথায় যেন আগুন লেগে যায়। তারপর পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়তে শুরু করে। রাস্তা ঢেকে দেয়। এত এত ঝরা পাতা। পা বাড়ালেই পায়ের নিচে শুকনো পাতা। কুরকুর করে ভেঙে পড়ে।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বললো না।
অরিত্র বললো, চলো উঠি।
– বিয়ে সম্ভবত করবো। বিয়ে করাই স্বাভাবিক। আমি সন্ন্যাসিনী তো নই। বিয়ে করে সংসার করবো। তোমাকেও বিয়ে করে ফেলতে পারি। তুমি আমাকে দু-তিনটি বাচ্চা দেবে। আমি ওদের যত্ন করে মানুষ করবো। এ-পৃথিবীতে কিছু তো রেখে যাবো। পারবো না?
ডরমিটরিতে অরিত্রর রুমে এসে লুৎফুন্নাহার বলল, তোমার আর বিছানার চাদর নেই?
– আছে। দু-সেট আছে চাদর। লন্ড্রি ধোয়া দু-সেট চাদর আলমারিতে রাখা আছে।
বালিশের কাভার দুটি পাল্টে দিলো লুৎফুন্নাহার। বিছানায় লন্ড্রি থেকে আনা একটা চাদর বিছিয়ে দিলো। টিস্যু পেপারে পা মুছে বিছানার এক ধারে পা তুলে বসে লুৎফুন্নাহার বলল, তোমার হলুদ কাগজটা বের করে দাও তো।
হলুদে কাগজের উল্টো দিকে সে লিখলো, আমি আজ কোথাও যাবো না।
মুখে বললো, একটা বছর মানিয়ে নিতে নিতে আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। কত যে মানিয়ে নেওয়া! এখন আমি ঘুমাবো। লাঞ্চের কথা বলে আমাকে জাগাবে না। খুব ইচ্ছে করলে ঘুমের মধ্যে আমার কপালে আলতো করে চুমু খেতে পারো। খুব সাবধানে – যেন আমার ঘুম ভেঙে না যায়।
লুৎফুন্নাহার দেয়ালের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। চোখ বন্ধ করে খুব মৃদুস্বরে বললো, আরেকদিন আমাকে চাঁদপুরে নিয়ে যেও অরিত্র। আজ থাক।
চারটে ঘুমের ওষুধ খেয়ে এসেছিল লুৎফুন্নাহার। দ্রুত ঘুম এসে গেল তার। গাঢ় ঘুম।
চেয়ারে বসে জেমস জয়েসের ইউলিসিস-এ মনোনিবেশ করার চেষ্টা করলো অরিত্র। কয়েকদিন হলো পড়া শুরু করেছে। ঘন শব্দবিন্যাসের সঙ্গে নিবিড় অনুভূতির জটিল গ্রন্থি। প্রফেসর বলেছেন, ইউলিসিস না পড়ে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ পাশ করা ঠিক হবে না। আধা ঘণ্টা পড়ে বা বলা যায় জয়েসের সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তি করে সে ক্লান্ত হয়ে গেল। কোথায় সাহিত্য পাঠের আনন্দ? বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলো ঘুমের মধ্যে লুৎফুন গুটিশুটি মেরে ভ্রূণের ভঙ্গি ধারণ করেছে। সে উঠে আলমারি থেকে লন্ড্রিতে ধোয়া দ্বিতীয় চাদরটি বের করে ওর শরীরের ওপর বিছিয়ে দিলো।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.