আউজকা বাসে ওটোনের সোম একটা আচানক বিত্তান্ত ঘটছে। আমি এই যে রিয়াজুল – আমি নাকচোখ খোলা রিয়াজুলে এক ট্যাপ খাইয়া গেছি – বিত্তান্তের গুণে। বিত্তান্তটা বিরাট কিছু না। কিন্তুক আমারে টাসকি খাওয়াইয়া দিছে। আতকা ঘটছে কিনা – টাসকি না খাইয়া যাই কই। নাইলে এই ত্রিয়েস্তে আছি আউজকা ধরতাছি পাঁচবছর যাইতাছে গা, নিয়মসিয়ম ভালাবুরা – এই দেশের চলাচলতি বালামতন বোজার আমার বাদ নাই। যেই কয়জন দেশি-পোলা আমরা আছি এই ত্রিয়েস্তায়, সবটি, সবটিরে চিনি। ঠায়-ঠেকায় লগে থাকি, নাইলে ছাড়া ছাড়া – কেউঅইর খোঁজ কেউঅই রাখি না। খাইয়া লইয়া কাম আর নাই যে, খালি এর-তার পোন্দের পিছে এয়-তায় ঘোরতে থাকমু! তয় দেখাসাক্ষাৎ হয়, কিন্তুক দিইন রাইত একলগে গলাগলি নাই। যেরা যেরা এক বাসাত থাকে, তারা তারা এক গুরুপ, নিজেরা নিজেরা। এই যেমুন আমি থাকি সুবার বাসায়। ফেলাটটা অয় কিনছে। তার একটা ঘর আমি ভাড়া লইছি। আরেক ঘরে ভাড়া লইছে ইলিয়াছে। অন্যটাত থাকে সুবা হালার পুতে নিজে। নয় বছর দইরা আছে এই দেশে অয়ে। কয় বোলে – এইনেই থাইক্কা যাইব পুরা জিন্দিগি। তয় উয়ে থাকতে পারে। অরা তো আমাগো মোতন না। অগো দ্যাশখেশের লাইগা টান কম। আমাগো যেমুন বাড়ির লেইগা কইলজা ফাইট্টা যাইতে থাকে সব সোম, উয়ে তো দেখতাছি হেমুন না। উয়ে কয়, এইনেই বাকি জিন্দিগির লেইগা থাম্বা গাইড়া বইব। আর হেইটাই তো করছে অয়ে। ফেলাট কিইন্না বাড়িঅলা অইয়া গেছেগা একদমে। তয় অরা পারেও শালার। দেশবাড়ির লেইগা কান্দাকান্দি করতে থাকা পরান নিয়া অর তো দেহি কোনো ঝামেলা অয় না। আমি অরে হেইটাই খালি জিগাই – টাইমে টাইমে, আরে সুব্রইত্তা তুই, পারস কেমনে? সুব্রত পারে। উয়ে পারে পারুক, কিন্তুক আমি এমুন পারতে চাই না। আমি এই দেশে পইড়া থাকোনের লেইগা আহি নাই। ট্যাকা কামানের লেইগা আইছি। কামাইতাছি। বাইত পাটাইতাছি দুই হাতে। বাবায় জায়গা জমি কিনতাছে। বিল্ডিং তোলছে বাইত। মুদিত ট্যাকা লাগাইছে। দেখতে দেখতে চাইর বচ্ছর গেছে গা। আমার তো ইচ্ছা যাউক গা আরো চাইর-পাঁচ বছর। হাতে বালামোতন ক্যাশ ট্যাকা বাইন্দা, আল্লা আল্লা কইরা দ্যাশে ফিরা যামু। ব্যবসা করমু হেইর পর দ্যাশে থাইক্কা।
ট্যাকা খেপে খেপে বাইতও পাটাইতাছি, নিজের কাছেও ব্যাংকে রাখতাছি এইনে। খায়-খরচ আর বাড়িভাড়া বাদে বেহুদা খরচার মইদ্দে আমি নাই। ট্যাকা হইল জমানের লেইগা। এইর জন্যই তো আওন এইনে, নাকি? কিন্তুক, কথাটা কি পুরা হাছা হইল! এই যে কইলাম – ট্যাকা কামাইয়ের লেইগাই আইছি! পুরা হাছা এইটা না। আরো কথা আছে এইর পিছে। তয় এহন কথা হেইটা না। কথা হইল – এতো চোখকান খোলা থাকোনের পরেও এই যে বাসে ধরাটা খাইলাম! যেমুন তেমুন ধরা খাওন না।
হইছিল কি, কামের তেনে ফিরতিকালে আমি খাড়াইয়া রইছি বাস ইস্টপে। কুড়ি মিনিট পরে পরে বাস। এহন, আমার ইস্টপে যাইতে গেলে ৬নং বাসে গেলেও চলে, ৩৬-এ গেলেও অয়। আমি খাড়াইয়া রইছি, এহন যে কোনো একটা আইলেই উটমু। দেহি যে ৩৬ আইতাছে। আহুক, যাওন দা হইছে কথা। অমা, বাসে উইট্টা সারি নাই, কে জানি হুড়মুড়াইয়া উইট্টা আমারে এই একা ধাক্কা দিয়া ফালাইয়া দিতে দিতে, ঝুপ্পুস কইরা ধইরা ফালাইল আর নিজে ধইরা লইল সিটের একটা হাতল – পড়োন ঠেকাইতে। কালা আন্ধাইরা এক কালা বাউশ হালার পুতে। আবার কয় ছরি ছরি ছরি – ইক্সিটিমি ছরি। তর ছরির খ্যাতা পুড়ি। তর এই শেষ টাইমে, দরজা বন্ধ হয় হয় টাইমে দৌড় পাইড়া আইয়া ওটোনের কাম কি রে ব্যাটা! দুঃক্ষুটা যে পাইলাম ধাক্কা খাইয়া – ছরি দিয়া হেইটা উশুল হইব! মনে মনে গাইল দিয়া আমার কোরোধ কমব না। মুখ দিয়া গাইল দিতে হইব। বাংলা এইনে কেটায় বুঝতাছে! আমি অন্যদিকে চাইয়া দেওয়া ধরলাম গাইল। শালার পুতেরা – শ্রীলঙ্কা থুইয়া এইনে কোন মরা মরতে আইছস! শালার পুত। হালার ঘরের হালা। ‘আপনি গালিটা বেশি দিয়ে ফেলছেন না ভাই? আমি ইচ্ছে করে করিনি কাজটা। ব্যালান্স রাখতে পারি নাই যে!’
হায় হায় – শ্রীলঙ্কাইন্নাটায় দি বাংলা কয়! আমার দেশি ভাই নি? ইয়া আল্লা! হুড়ুত কইরা মনের ভিতরে আফসোস আইসা ধাক্কা দিল। শরম পাইলাম। দেশি পোলা না? নতুন আইছে লাগে। আমরা পুরানরা এমুন করলে অগো উপায় কি! চলতি বাসেই শেষে অর লগে কোলাকুলি করোন খালি বাকি রাখি। কেমনে আইল – কোন রাস্তা দিয়া আইল – কয়দিন ধইরা আসছে – আমাগো দেশি গো কার বাড়িত আছে – জিগাই কত কথা। হেয় খালি চক্ষু বড় বড় কইরা শোনে। কোনো জব দেয় না। ঘটনা কী – পোলাটায় এমুন ক্যান! নাকি দুই নম্বর! ধুরঅ – কি কই – আমরা সকলতে দুই নম্বর না অইয়া – এইনে আইতে পারতাম নি। আমরা বেবাকটি দুই নম্বর। তয়, অয়ে কী? কতা খালি হোনে, জব দেয় না। আমার ইস্টপ আইয়া পড়তাছে না! আমি আবার জিগাই, বিত্তান্ত কী? শেষে সেয় মোক খোলে। কয়, আমি স্টুডেন্ট।
আরে আল্লা! দেশে এখন স্টুডেন ভিসা দিয়া বিদেশ পাঠানের সুবিধা হইছে নাকি! নামে স্টুডেন কামে ট্যাকা কামাইয়ের ধান্দা – সেই কেইস নাকি! হইলে খুইল্লা কইতে দোষটা কোনখানে। এইনে এই বিদেশে দেশি ভাইগো মইদ্যে আবার লুকাছাপা কি? আমি তারে কই, ‘আরে মিয়া খোলাসা কইরা কন। কত লাগল আইতে – আওয়া হইল কোন রাস্তা দিয়া, এহন কি করোনের ধান্দা -’
আমার কথা শুইন্না সে করকরা চোখে আমারে দেখতে থাকে তো দেখতেই থাকে, কোনো কথা নাই। অনেক খোন কোনো কথা নাই। শেষে মুখ খোলে। ‘আমি স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে এসেছি এখানে।’
‘বাড়িত তেনে কত ট্যাকা পয়সা নিয়া আসতে হইছে?’
‘নিয়ে আসতে হয়নি তো তেমন কিছু! ক্যান?’
‘তাইলে চলেন ক্যামনে? খরচাপাতি চলে ক্যামনে?’
‘ইউনিভার্সিটি দেয় বললাম না? এসব কেন জিজ্ঞেস করেন?’
‘না জিগাইলে জানমু ক্যামনে?’ আমি তারে বুঝ দিয়া বলি। বলি বটে, তবে কইলজাটা চিনচিনায়। পোলাটা লেখাপড়া করতে আসছে – কলারশিপ বোলে পায় – দেশি পোলা। কিন্তু ব্যবহারের তাছির দ্যাখো। কথা বাইর করতে হইতাছে ঠেইল্লা গুতা দিয়া। ফুটানি করতাছে নি! করলে করুক গা। শিক্ষিত্ কিনা – ফুটানি দেহায়। দুইদিন পর কই যাইব গা গুড়ুম গাড়ুম। তহন দেশি ভাই বিছরাইয়া বেদিশা হইয়া কূল পাইত না।
‘আপনি ধারেকাছেই থাকেন?’ পোলাটায় আমারে জিগায়। এইত্তো বোল ফুটতাছে – আমি মনে মনে এই কথা বইল্লা মুখে কই, ‘এই যে আর দুই ইস্টপ পরে – রাইয়ানো। সেইখানে আমার বাসা।’ এইটা তো ধইরা নেওয়া যায় যে এইরপর সেয় নিজেই তার থাকোনের জায়গার কথা বলব। আমার তেমুনই মনে হইছিল। কিন্তুক শেষে দেখি যে সে আর কোনো কথাই তোলে না। না পাইরা আমিই জিগাই; ‘আপনে কই থাকেন?’ ‘এই – একটু দূরে – বারকোলায়। সালিতা কনতোভেল্লিতে আমার ফ্ল্যাট।’ অ। সেইটা খুব বেশি দূরে না। আমার স্টপের পরে তিনটা স্টপ। তার বাদেই বারকোলা। আমি ঝুম ধইরা বইসা থাকি, দেখি সে আর কোনো কথা কয় কিনা। রাইয়ানো – আমার ইস্টপ আসতে তো আর বাকি নাই। কিন্তুক পোলাটার মুখে কোনো কথা নাই। আরে ঠায়-ঠিকানা না নিলে চলতে ফিরতে ঠেকায় পড়লে যাবি কই! কিন্তুক ঠায়-ঠিকানা নেওয়ার তার কোনো লড়াচড়ি দেখা যায় না। তাইলে আমার দিক দিয়া আমি কিলিন হইয়া থাকি। দেশি ভাই যখন আমার বাসার নম্বরটা অন্তত দিয়া থুইয়া যাই। বাস আইসা আমার স্টপেথামতে থামতে আমি তারে বলি আমার বাসার নাম্বার। রাস্তা পার হইয়া হাতের ডাইনে গিয়া হাতের ডাইনের চাইরতলা বিল্ডিংয়ের তিনতলা। কি মনে কইরা সে আমারে তার নাম বলে। তারপর আমার নাম জিগায়। আমার নাম তো রিয়াজুল। অর নাম বোলে রকিব।
বাস থেকে রিয়াজুলের, নাকি রেজাউল – ওহ, আই অ্যাম কনফিউজড – নামা দেখতে দেখতে মনে হলো – আরে এর সঙ্গে তো আরেকটু কথা বলা যেত! কিন্তু ও থাকতে থাকতে এ-কথাটা কিন্তু মনে আসেনি বা আমি মনে আসতে দেইনি যে আরেকটু কথা বলা যেতে পারে। বাঙালির সঙ্গ খোঁজার জন্য কি এখানে এসেছি আমি? তাহলে বাংলাদেশ আছে কোন প্রয়োজনে! ওইসব দেশি ভাইবন্ধু খুঁজে বের করে একটা কর্নার বানিয়ে মিনি বাংলাদেশ দাঁড় করানোর ইমোশন আমি ফিল করি নাকি? নাহ্, করি না তো! তাই রিয়াজুলের সঙ্গে কথা বাড়ানোর ইচ্ছে হলো না। ত্রিয়েস্ত আর এমন কী বড়ো শহর! ডাউন-টাউন কি পিয়েৎসা ওবেরদানে – কোনো না কোনো উইকএ্যান্ডে দেখা হয়ে যাবেই। এই সাতদিনে দেখা গেছে – যখুনই ডাউন-টাউনের দিকে আসা গেছে – ঘুরে-ফিরে অনেকবার একটা-দুটো মুখের সঙ্গে দেখা হয়েছে। আর একই রুট ধরে যখন আসা-যাওয়া চালাতে হবে – দেখা হয়ে যাবেই। ওফ এই ব্যাপারটা আমার এখনই মনে করে অশান্তি লাগছে। আমার কোনো বঙ্গদেশি দরকার নেই – একজনও দরকার নেই। আমি কমপ্লিটলি বঙ্গভাষা ব্যবহার না করার পরিস্থিতি পেতে চাই। অনেক হয়েছে বঙ্গভাষা ব্যবহার। অনেক অনেক হয়েছে বাঙালির মুখ দেখা, বাঙালি দিয়ে ঘিরে থাকা। বাট লুক রকিব হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ ফ্যাট ইয়ু কুড্নট ফরগেট অ্যানি থিং। সাতদিন হলো তো। হাজার মাইল দূরে আসা হলো তো – ঘোর মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করে দেয়াওতো হলো – এই সাতদিনে মনে হলো সাত আলোকবর্ষ দূরে চলে আসা হলো বাসার সকলের কাছ থেকে – মনে মনে দূরে – কিন্তু যেগুলো থেকে দূরে চলে আসার জন্য অ্যাডামেন্ট হয়ে উঠেছিলাম, সেগুলো আমার মধ্যে আমার সঙ্গে পায়ে পায়ে চলছে। খুব আশ্চর্যের ব্যাপার তো! বিষয়টা মনে রাখতে চাই না। বাট নাউ মাই রিয়ালাইজেশন এমন যে ওগুলো আমার রক্তকণা হয়ে গিয়েছিল – এখন ওই রক্তকণা ঝরিয়ে ফেলে নতুন রক্তকণা বানাতে কতোদিন লাগবে? কতোদিন! হেই অ্যাড্রিয়াটিক – ডু ইয়ু হ্যাভ অ্যান আইডিয়া হাউ লং ইট উইল টেক? অ্যাড্রিয়াটিক কি আমার কথা শোনে, শুনতে পায়?
অ্যাড্রিয়াটিক এই তো আমার বাঁয়ে – ওকে বাঁয়ে রেখে চলতে চলতে শেষে মিরামারে – লাস্ট স্টপ – অ্যাড্রিয়াটিকের একদম পাশে – আমার য়্যুনিভার্সিটি। ডাউন-টাউন থেকে অনেকখানি দূরে। ওই যে রিয়াজুল ছেলেটা নেমে গেল – রাইয়ানোতে – ওখান থেকেও বেশ দূরে। ডাউন-টাউনে আজকে আসাটা অকারণেই ছিল। ক্লাসশেষে মনে হলো – যাই একটু চেনাশোনা হয়ে আসি ডাউন-টাউনের সঙ্গে – জাস্ট একটু হ্যালো বলা আর কি মনে মনে পথ-ঘাটগুলোকে – শহরের গন্ধটার সঙ্গে ফ্যামিলিয়ার হয়ে ওঠা – এই আর কি – ঘুরতে ঘুরতে বাসস্টপের কাছে যেতে যেতে দেখি – বাস ছেড়ে দেয় দেয়। বাস থার্টিসিক্স – ওহ – ওটাকে মিস করলে ফের বিশ মিনিটের ধাক্কা – দৌড়ে উঠে যাওয়া ছাড়া দেয়ার ওয়াজ নো আদার ওয়ে। কিন্তু উঠে তাল সামলাতে না পেরেই তো ওই ঝক্কিটা বাধলো।
তো স্যরি বলো আর অ্যাপোলজি যতো করো – সে লোকের বিড়বিড়ানো বকা দেওয়া থামে না। আরে দুষছে কাকে! শ্রীলঙ্কানদের। ফানি। আই নো মাই কমপ্লেকশান এই ধারণা মনে আনতে পারে, খুবই পারে যে আমি শ্রীলঙ্কান। ইট ইজ ডার্ক ভেরি ডার্ক – দেশে থাকতে এ-নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি। কিন্তু যেই দুবাই থেকে রওয়ানা দিলাম ত্রিয়েস্তের দিকে – আমি জিজ্ঞাসিত হওয়া শুরু করলাম – শ্রীলঙ্কান? আচ্ছা, এরকম বাংলা বানানো শুরু করেছি আমি – জিজ্ঞাসিত হওয়া শুরু করলাম! হা হা হা! আমরা এভাবে বলি? নয় কেন! আম্মাকে ফোনে বলবো এই কথা। আর বলবো – পার হয়ে এসেছি তো। তুমি এখন নির্বিঘ্ন মনে করো আম্মা – নির্ভাবনা হও। উঁহু! হলো না – এখানে বলতে হবে, ভাবনামুক্ত হও। কিন্তু কেন বলা যাবে না নির্ভাবনা হও! নির্ভাবনা হও – বলাটা অনেক বেশি জোরালো শোনায় না ভাবনামুক্ত হও বলার চেয়ে? যা খুশি তা হোক গে। তো বাসের ভাইজান আমাকে ঠেসে বকা দিচ্ছিল শ্রীলঙ্কান শ্রীলঙ্কান বলে। ফানি। দেন ইট মেড মি ইগার টু মেক হিম সারপ্রাইজড্। সে-কারণেই বাংলায় বলা – দেখি না কী করে? কী করে আবার! হতভম্ব হয়ে যায়। হা হা হা। পার হয়ে আসার পরে আবার বঙ্গভাষীর বেষ্টন আমাকে নিতে হবে কেন! আই হেইট আই হেইট আই হেইট য়্যু বাংলাদেশ মাই লাভ – মাই লাভ – মাই লাভ –
আম্মা খালি বলতেন – তোকে আল্লা আল্লা করে পার করতে হবে এইখান থেকে। আল্লা আমার বাচ্চাটাকে নিরাপদে পার করতে দিয়ো। আমি কি ঘোর ঝঞ্ঝার কালে অথৈ নদীতে পড়েছিলাম নাকি? কোথায় ছিলাম! কোথায়! আমার দেশে। বাংলাদেশে।
বাস তেনে নামোনের এক সেকেন আগে পর্যন্ত মনে অয় নাই যে আমার এহন বাইত যাইতে মন চাইব না। পুরাটা দিন কাম করতে হইছে – কম্পানি পাঠাইছে ডাউন-টাউনের শেষ মাথার একটা বাড়ির কামে। আমি করি ওয়েল্ডিংয়ের কাম। সারাটা দিন খাড়ার উপরে – ঝালাই দেও জোড়া দেও। কাহিলের উপরে দিয়া কাহিল হইয়া গেছিগা। অন্যদিন হইলে তো রুমে গিয়া ধুপ্পুস। এহন মনে অইতাছে একটা রেস্টুরেনে বইয়া এট্টু কাফি খাই, নাকি হাঁটমু! পোলাটার বেবহার আমার মেজাজটা গান্ধা কইরা দিছে। ফুটানি করল না? ল্যাখাপড়া জানোনের ফুটানি! আরে আমরা কামলা মানুষ আছি – একেকজন কত্ত ট্যাকা কামাই করি দেশের হিসাবে – খেয়াল করবি তো! ল্যাখাপড়া আমাগো হইত না বাও মোতন চললে? বাও মোতন চলোনের উফায় আছিল সম্বন্ধীর পুতের দেশে!
চৈত মাসের বিয়ানবেলা – আমি খাড়াইয়া রইছি গোলাপজাবুন গাছের সামনে। হায়রে ফুলের ফুল, গাছে। ফুলের গন্ধ কী! কালা কালা ভোমরার ভোনভোনানি কী ফুলে ফুলে! আমি মায়রে ডাক পারতাছি; অমা – মা গো – এদিক আহ। দেইক্কা যাও। এইবার দুনিয়ার গোলাপজাবুন অইব গাছে। এইর মইদ্যে বাবায় কামে যাওনের লেইগা মেলা দিয়া আমারে কয় কি – ‘অই রিয়াজুইল্লা এট্টু পর দশটার সোমে নয়াপাড়া যাবি।’ নয়াপাড়া ভইরা হুসিয়ারি আর ড্রাইংয়ের দোকান – আমি অইনে গিয়া কি করমু? বাবায় কয় অইনে গিয়া হোসেন মিয়ার ডাইংয়ের দোকানে কামে লাগতে। আমার ইস্কুল আছে না! ‘আউজকার তেনে এর পড়া বন।’ বাবায় কইয়া কামে মেলা দেয়। বাবায় যুদি কামে লাগাইয়া দেয় তাইলে আমার আর করোনের উফায় থাকে কী! আমরা দশ ভাই। সব এমা-ডেমা পাই-সিকি – একটার পিটে আরেকটা। মাইয়া মাইয়া করতে করতে বাবায় বেচইন হইয়া গেছিল বোলে – কিন্তুক বারে বারে খালি পোলা। মায় কয় যে এই কইরা কইরা দশ জন হইয়া গেল, কিন্তুক মাইয়ার নামগন্ধ নাই। মাইয়া নাই দেইক্খা বাড়ির আলিক্ষিও ছোটন নাই। আমি পাঁচ নম্বরে। সবার বড় যে – মিয়া ভাইয়ে ভাদাইম্মা – কামে কাইজে মন নাই। মেজু ভাইয়ে খালি দরগাত দরগাত ঘোরে। তাগো পরের দুইজনে দর্জির দোকানে সিলির কাম শিখে। আমার ছোটটি খালি ঘুরাঘুরি করে। তার মইদ্দে একলা আমারে মায় ইস্কুলে দিছে।
ফাইভে উইট্টা সারি নাই, হেইর মিদে বাবায় কয় ডাইংয়ের কামে গিয়া লাগতে। লাগলাম। দিন রাইত ডাইংয়ের ফ্যাট্টরিতে কাম। ল্যাখাপড়া কতদিন হইল ছাড়ছি? আরে ছোবান্নাল্লা – বহুত বহুত দিন। পোলাটা – রকিব কইল না নামটা – পোলাটা মনে লয় আমার বয়সী হইব। অর লগে আর কোনো দেশি পোলা আইছে নাকি পড়তে
এই ত্রিয়েস্তে – আইসিটিপিতে পড়তে আসাটা কী রকম জটিল ঘোরালো অসম্ভব একটা ব্যাপার হয়ে উঠতে যাচ্ছিলো! আমার ইচ্ছেটা ছিলো ইউএসএ-তে যাওয়ার। জনস হপকিন্স আমাকে যেতে ডাকছে, গ্রান্ট দিচ্ছে মন ভরে যাওয়ার মতো – যাই ওখানেই। আম্মা খালি বলে, না – আগে ইউরোপ ঘুরে যা। আইসিটিপি ঘুরে যা। আচ্ছা – জনস হপকিন্স তবে এ-বছর বাদ। আমি আইসিটিপিতে যাওয়ার জন্য কাজ করা শুরু করি। আশ্চর্য কাণ্ড – তা-ই নিয়ে কথা কথা কথা, কতোরকম কথা – আমার ক্লাসমেটদের – স্যারদের – কী অন্য ডিপার্টমেন্টের কতোজনের। কী রকম কথা সেইসব? হা হা হা – মনে পড়ে, সব মনে পড়ে।
আরে রকিব তো চাল মারছে। ইউএসএ হইলে কেউ আবার ইতালি যায়! অই রকিব অই, সত্যি যদি জনস হপকিন্স অফার দিয়া থাকে – সেইটা ছাইড়া তুমি ইতালি যাইতাছো! একটু বেশি চাপা দিয়া দিছ না? হয় নাই, হয় নাই – মিছা ফুটাইছে। একটা চাল ঝারছে –
ওয়ার্ল্ডের বেস্ট জায়গাটা রাইখা আইসিটিপি পাড়াইতে যাবে – এইটাতে কী বুঝায় গাধায়ও বুঝে – হি হি হি।
আম্মা আম্মা দ্যাখো, এইগুলি আমাকে শুনতে হচ্ছে ক্যাম্পাসে ঢুকলেই – তোমার জন্য তোমার কথা শুনে – আমি গোঙাই রাগ ঝারি। ‘এসব কহন তুলতে হয় না। আগে পার হও – পার হয়ে নাও – তারপর পেছন ফিরে দেখো।’
স্যারদের রিকমেন্ডশন নেওয়া তো লাগে। আমি টেবিল টেনিস বলের মতো ঝটকা খেতে থাকি – নানান রকম মতের। স্যারদের মত। সিনিয়র-মোস্ট স্যার ড. আজাহার আলী। আমাকে স্যার কথা শেষ করতে দেন না। হাউ হাউ করে ওঠেন। নো নো – আইসিটিপি ইজ নট অ্যা ম্যাটার অফ জোক। তুমি সেখানে সারভাইভ করতে পারবা না।
জ্বী স্যার, কেন?
ওদের সিসটেমটা উন্নত। পড়াশোনার লোড আন ইমাজিনেবল। ইয়ু কান্ট সারভাইভ হিয়ার।
ড. শামসুল আলম কি সহজে দেবেন, না পরিস্থিতি কঠিন করে তুলবেন? আমি অনুমান করতে পারি না। তার কাছে যাই।
ওয়েল রকিব – এখন বাইরে যেতে চাইতেছো ক্যান?
পড়ে আসি স্যার।
বোঝলা না ইটস অ্যা রং স্টেপ। হোয়াট ইয়ু আর গোয়িং টু ডু – আমি তো বলব রং ডিসিশান। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হইছ। এখন দেশে মাস্টার্সটা করো। পরে ফিরা আসলে ডিপার্টমেন্টে হোল্ড থাকবে না – জয়েন করতে পারবে না। চাকরি পাওয়া কঠিন হবে। রিসার্চ করতে চাইলে জয়েন করেও যাওয়া যাবে। চাকরিটা আগে। রিসার্চ কিছু লাফায়ে চলে যাচ্ছে না। খেতে তো হবে, নাকি?
ঠিক। আমি তো না খেতে পাওয়া জাতি। আমার আবার হাজার স্টাডিজের স্বপ্ন দেখা কি! আম্মা – আমার ছিঁড়েফেঁড়ে যেতে ইচ্ছে করে! আমি যে ছেলে সেটা আমার মনে থাকে না। ছেলেদের তো কাঁদতে নেই, না? আমার চোখ দিয়ে ঝপঝপিয়ে পানি ঝরতে থাকে। জ্ঞানে আমাদের কোনো দরকার নেই – কিছুর দরকার নেই – শুধু খাওয়া দরকার। দাঁড়া দাঁড়া একটুখানি। পার হয়ে নে তারপর – তারপর দেখিস – আম্মাও আমার সঙ্গে কাঁদতে থাকে।
ডায়িং ফ্যাট্টরিত কামে তো লাগলাম। সারাদিন অইনে খালি শার্টে গেঞ্জিতে ছাপ্পা দেও – সাইজ করো – মাল সাপ্লাই লও আর দেও। কামে কামে দিন যায়। সন্ধ্যাকালে বাইত আসলে পরে দোস্ত-বন্ধুগো লগে একটু টাইমপাস তো করোন লাগে। অগো লগে কথাবার্তা রং-তামাশা করতে করতে রাইত বাইজ্জা যায় একেকদিন দশটা এগারোটা। মায় ভাত লইয়া বইয়া বইয়া ঝিমায় আর আমার লেইগা রাস্তা চায়। ‘এত্ত রাইত করোনের কাম কি তর রাস্তায়?’ মায় আমারে ঝামটা মারে। দোস্ত গো লগে এট্টু চলাচলতি লাগব না নি আমার? আমিও লগে লগে খেজি দেই। বিত্তান্ত শেষ অয়, কিন্তুক য্যান শেষও অয় না। সেজু ভাইয়ে টেইলারিং কাম এই কয় বছরে যা শিখোনের শিইক্ষা নিজেই এক দোকানে মাস্টারের কাম করে। যা পায় চলে – কিন্তুক সেয় ঘন ঘন বাইত খাওন দাওন আনোনের ধুম ফালাইয়া দেয়। এই আসলো শবেবরাত – হেয় ধুম কইরা নিয়া আসলো তেরোটা মুরগি – ছয় সের পোলাওর চাইল – হাবিজাবি। কথা নাই বার্তা নাই ঘরের সবটিরে সিনেমা দেখতে লইয়া যায়। শার্টের উপরে শার্টের কী বাহার – খালি ট্যাকা লাড়ে চাড়ে – ট্যাকার উপরে ট্যাকা। দরজি কামে এত্তা ট্যাকা কুনদিক দিয়া আহে! রাস্তাঘাটে বাইর হইলে দোস্ত বন্ধুরা কেমুন জানি আওয়াজ দেয় – কিরে ফুইল্লা তো তরা হাত্তি হইয়া যাইতাছস গা! কিয়ের হাত্তি!
অরা যে কি কয় অরাই বোঝে, আমারে জইঙ্গা কওনের আগেই এক সন্ধ্যা রাইতে পুলিশ আইসা খেও দিয়া আমাগো বেবাকটিরে ধইরা ভ্যানে তোলল। ক্যান আমরা আরেস্ট হইলাম! পুলিশের কাছে বোলে খবর গেছে যে – কোন এক ডাকাতি মামলার আসামি বোলে এই পাড়ার চ্যাংড়া পোলাপাইনটি। হাজতে পইড়া পইড়া দিন যায় আর তারিখের দিন কোর্টে যাই কোমরে দড়িবান্ধা হইয়া। মোটা মোটা শিকের ঘের দেওয়া একখান খাঁচার মতন খুপড়ির মইদ্যে ঢুইক্কা জজ হুজুরের দিকে দুই হাত জোড়া কইরা খাড়াইয়া থাকি, কিন্তু বিছার আর আগায় না। খালি টাইম পড়ে। এমনে সেমনে একবছর যায় – কোনো বিছার নাই, খালি টাইম পড়া ছাড়া। আমাগো সবটির লেইগা উকিল রাখছে সবটির বাবায় মিল্লা – একজন – য্যান আমাগো জামিন লইয়া দেয়। সেই উকিল কই যায়, কি করে, কি কয়, কি বোলে – আমাগো জামিনের কোনো খবর নাই। খালি হাজত খাইট্টা যাইতাছি তো যাইতাছি। হাজতে কুকড়ি মুকড়ি খাইয়া শুইয়া থাকতে থাকতে কাইন্দা জারে জার হই। আরে এইটা কী বিষয় – আমারে ক্যান হাজত খাটতে হইতাছে!
আমি ফিজিক্স পড়ার স্বপ্ন নিয়ে বড় হয়ে উঠেছিলাম। যেতে হবে তাত্ত্বিক জ্ঞানের পথে – মেঘরাজ্য না ছোঁয়া পর্যন্ত থামবো না – এ-ই হচ্ছে আমার জন্য আমার পণ। আমি যে একটা মারাত্মক অন্যায় করে ফেলতে যাচ্ছি সেটি ভর্তি-পরীক্ষার ভাইভা বোর্ডে ঢুকেই বুঝতে পেরেছিলাম। অপরাধ বা অন্যায় এই যে, আমি ইউনিভার্সিটিতে একমাত্র পছন্দের বিষয় হিসেবে নিতে চাচ্ছি ফিজিক্স। পিওর ফিজিক্স। ভাইভা বোর্ড টুকরা টাকরা হাসি দিয়ে আমার পাগলামির তল মাপা শুরু করলো। দুই দুই বার স্ট্যান্ড করা ছেলে ফিজিক্স পড়তে আসবে কেন! তার জন্যে তো পশ সব সাবজেক্ট অপেক্ষা করে আছে। সে কম্পিউটার সায়েন্স পড়বে, নয় পড়বে ফার্মেসি, নয় অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স। নয় মাইক্রোবায়োলজি। ফিজিক্স! হোয়াই ফিজিক্স। হ্যালো! হ্যাভ ইউ গন ক্রেজি! ফিজিক্স নিতে চাও!
দ্যাখো ছেলে – হ্যাভ ইউ কাম ফ্রম আ রিমোট ভিলেজ? ঢাকায় তোমার কেউ নাই পরামর্শ দেওয়ার? ভালো সাবজেক্ট কোনটা, বলার?
ফিজিক্স কেন নিবা তুমি? এর চাকরির ভবিষ্যৎ কী?
ডাবল স্ট্যান্ড একটা ছেলে ফিজিক্স নিয়া ভবিষ্যৎ মাটি করতে চায়!!!
রকিব নিরুত্তর থাকে। ফিজিক্স পড়লে ভবিষ্যৎ মাটি হয়! রকিবের তো ফিজিক্স ছাড়া নো আদার চয়েস। রকিব ফিজিক্স চায় – হি ওয়ান্টস টু বি স্পয়েল্ড ইন দিস ওয়ে। রকিব ফিজিক্স চায়। ভাইভা বোর্ড ওর এই বেকুবি দেখে বিদ্রƒপে হেসে ওঠে আবার – জনাদুই আফসোস করে। দু-একজন শেষবারের মতো ওর মত ফেরাতে চায় – ভীতিপ্রদর্শনের পথ ধরে।
এখন তো বুঝতাছো না। পরে কিন্তু হাজার চেষ্টা করলেও সাবজেক্ট বদলাতে দিব না তোমাকে। তোমার নাম রোল নাম্বার মার্ক করে রাখলাম।
পরে কিন্তু ভালো বিষয়ে যাবার আর চান্স পাবা না।
এই শেষবার সুযোগ দেওয়া হলো – নিবে কম্পিউটার সায়েন্স?
রকিব ফিজিক্স চায়। হেই ফিজিক্স – হেই – হ্যাভ ইউ হার্ড হোয়াট দে সে তোমার সম্পর্কে! তুমি রাগ করো না শুদ্ধতম জ্ঞান – রকিব তোমাকে চায়। কিন্তু রকিবকে কী বিড়ম্বনা ঘিরে ফেলে দ্যাখো! ক্লাস শুরু হবার পর সকলে তাকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। ডিপার্টমেন্টের মামুরা দেখে, ক্যান্টিনের ক্যাশিয়ার দেখে, বয় বাবুর্চি দেখে। দেখে আর চোখ ছানাবড়া করে। মাথা গরম নাকি ছেলেটার – ভালো ভালো সাবজেক্ট রেখে আসছে কিনা রদ্দি মদ্দি ফিজিক্স ঘাঁটতে। ওহ! আমি পারছিলাম না – পারছিলাম না ওইসব চাউনির বিদ্রƒপ সহ্য করতে। ফিজিক্স পড়তে চাওয়ার অপরাধের জন্য যে-দণ্ড আমার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল – আমি পারছিলাম না তা সহ্য করতে। ওহ! আম্মা। এটা আমি কোথায়! কোথায়! আমি বাংলাদেশে।
জিয়োগ্রাফি থেকে দলেবলে পোলাপান আসে – নব্য আঁতেলকে খোঁজ করতে। কেমিস্ট্রির দঙ্গল হি হি করে ওঠে – ইন্টেলেকচুয়াল অফ নিউ এরা – ওই যে যায়। অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অদ্ভুত আওয়াজ তোলে গলায়, মাইক্রোবায়োলজি হাঁক দেয়, আঁতলামি আঁতলামি …।
আম্মা – আম্মা – এরা এমন করে কেন! আমি কীভাবে পড়বো এখানে! ‘একটু সহ্য কর – একটু পুরু কর চামড়াটা, কালো।’ নিবিড় দুঃখের দিনে আম্মা আমাকে এই নামে ডাকে। আম্মা – কালো – তার চামড়াটা পুরু করে নেবে – গণ্ডারের মতো পুরু। ‘তোকে আগে পার করি এই আন্ধার সুড়ঙ্গ -তারপর রাগ করা যাবে – কালো।’ টিটকারিগুলো আমার ওপর আছড়ে পড়তে থাকে এদিক থেকে ওদিক থেকে – পড়তেই থাকে ননস্টপ। ওহ! অ্যাম আই গোয়িং টু বি সামথিং লাইক জড় প্রস্তর! টিটকারি সহ্য হয়ে যায় আমার! হাউ কাম!
জামিনের লেইগা রাস্তা গোনতে গোনতে শেষে হাজতের মোশার কামড়ও সহ্য হইয়া যায় আমার। না ফুরাইতে চাওয়া দিনগুলা সাইমু হইয়া যায়। এমুন সোমে আঁতকা খবর আসে মামলা নাকি খারিজ হইয়া গেছে। কিসের মামলা ক্যান খারিজ হইল ক্যামনে খারিজ হইল – কিছুই বোঝার উপায় নাই। শুধু একবছর সাত মাস বাদে বাইত আইলাম হাড্ডিকাটা সার হইয়া। হাজতখাটা দাগী এক ঢ্যাঙা বেটা হইয়া।
আমি এদিকে জেলে দিন পার করি কাইন্দা কাইট্টা, বাড়িত আইয়া দেহি যে, বাড়িত বহুত চমচমি চলতাছে। খাওন লওন হইতাছে বেশুমার – কাপড়চোপড় কিনা হইতাছে অহন তহন। সব সেজু ভাইয়ে করতাছে। হেয় বোলে কিয়ের ব্যবসা ধরছে। দর্জি কাম থুইয়া সেয় কিসের ব্যবসা করে! আমি তারে জিগাই, সেয় কয় – ‘আছে। তর হোননের কাম কি।’ তাইলে আমি আর জিগাই ক্যান! অন্য সকলতের লগে আমিও খাইয়্যা যাই। বাড়িত কী রান্ধার ধুম রে বাবা, এই দুই ডজন ডিমের কোরমা রানতাছে মায়, এই ছয় সের গরুর গোশত। লগে খাওনের লেইগা দুনিয়ার পরটা। খাই, লই আর টাউনে গিয়া কাম বিছরাই। আগের ডায়িং ফ্যাট্টরি কয় যে আমারে নিব না। আমি রোজ গিয়া তাগোই ধরাধরি করতে থাকি। বেহুদা ধরাধরি কইরা সিনেমা হলের পুস্টারটি ভালামতন দেইখ্যা দোফরের টাইমে বাইত আইয়া – ধুম ধাড়াক্কা খাওন খাই – দুনিয়ার খাওন। আমারে খাওন দিতে দিতে মা কয় – ‘অইবনে কাম, আউজকা না অয় কাউলকা। তুই বেজার অইয়া থাকিস না।’ হেই দিন দোফরেও বেহুদা ধরাধরি কইরা, সিনেমা হলে ঘোরান দিয়া বাড়িত পা দিয়া দেখি – বাড়ি ভইরা কুদাকুদি, ঘরের জিনিসপাতি ছন্নভন্ন, হাড়ি পাতিল উলটাইন্যা – আর উঠান ভইরা পুলিশ।
সেজু ভাইয়ের দোস্ত জালাইল্লার কোমরে দড়ি। সেয় কতক্ষণ পরপর পুলিশের রুলের বাড়ি খাইতাছে আর চিক্কার দিয়া উঠতাছে। কি হইছে কি – বিষয়টা – আমাগো বাইত পুলিশ ক্যান! জালাইল্লায় আমারে দেইখ্যাই কয় কী – পুলিশ ছার – কইতাছি কইতাছি – এই হইল আমার ফেনছি ব্যবসার পার্টনার। আয় হায় আমি কবের থেইক্যা ফেনছিডিলের কারবার করা ধরলাম! জালাইল্লায় এটা কয় কি! আমি কই – অই শালার পুত, এইটা কী কলি? আমি তর লগে ফেনছির ব্যবসা করি! কে কারে কথা কইতে দেয়! আমার কোমরে আবার দড়ি পড়ে – ঠেইল্লা লাথি দিয়া পুলিশে আমারে গাড়ির ভিতরে ফিক্কা দেয়। শালার পুতের দেশ। কার মাইর কার উপরে দেও তুমি। সেজু ভাইয়ের এত ট্যাকার চমচমির পিছে তাইলে এই বিত্তান্ত! পুলিশে আমাগো পুষ্করণীতে খেও দিয়া গাট্টি বান্ধা ফেনছিডিলের বোতল তুইল্লা আনে। মামলা পাকতে কতক্ষণ। তয় হাতেনাতে ধরতে পারে নাই তো। এই-সেই কইরা জামিন পাওয়া গেল ছয়মাসের মাথায়। এখন তারিখে তারিখে গিয়া কোর্টে
হাজিরা দেও। কিসের মইধ্যে যে পড়লাম এই শালার পুতের দেশে।
জামিন লইয়া আসার পর আরেক মুসিবত। আমাগো মহল্লার যেই পোলাপাইনটি এই হেইদিন আছিল গুড়াগাড়া, আতকা কেমনে জানি অরা ডাঙর হইয়া উইট্টা আমারে কয় – ‘মালপানি ছাড়।’ কিয়ের মালপানি? ‘ফেনছি দিয়া কামাইতাছো না? তুমি একলা লাল অইবা নি পুঙ্গির পুত?’ রাস্তা দিয়া হাঁটতাছি – কথা নাই বার্তা নাই – কোন মহল্লার কত্তটি ড্যাকরা অইয়া উঠতে থাকা ছেড়া কুঁদাইয়া খাড়ায় আমার সামনে, ‘আমাগো দশ বতল ডাইল দেওন লাগব।’ ‘কিসের ডাইল?’ ‘আমাগো আতে টাইম কম। কইতাছি দিতে, এক্ষণ দিয়া দেওন লাগব।’ ‘অই তরা কি কস? কইতাছস কি? শালার পুতেরা আমি ডাইল পামু কাইনে?’ ‘ডাইল পাইবা কইনে? গুষ্টি সুদ্ধা ডাইলের ব্যবসা কইরা দুনিয়া ভাসাইয়া দিতাছ, জিগাও ডাইল কই পাইবা? ভালা চাইলে এক্ষন দেও দশ বতল।’
‘শালার পুতেরা!’, আমার ত দেহি আর সহ্য হয় না। ‘অই শালার পুতেরা, দিতাম না তগো ডাইল। দেহি তো কি করস তরা।’ অরা সবাই মিল্লা হুড়ুত কইরা আমার উপরে ঝাইপ্পা পড়ে। ঘুসি কিল গুতা লাথি দিতাছে তো দিতাছেই। আমি একলা কয়টারে খেদামু – কয়টারে কাবু করমু – মাইনষেরা দ্যাহো খাড়াইয়া খাড়াইয়া দেখতাছে আমার মাইর খাওন – একজনও নি আগাইয়া আহে আমারে বাঁচাইতে! এইটা শালার কেমুন চুতমারানির দেশ হইয়া গেছে!
ফয়সাল আমাকে বলে যে, দোস্ত তোর ফার্স্ট ইয়ারের নোটগুলা আমারে দে। ‘হোয়াই? হোয়াট ইজ দ্য ইউজ অফ ইট?’ ‘আমারে তো দোস্ত ফার্স্ট ইয়ারের ইম্প্রুভমেন্ট পরীক্ষাটা দেওন লাগবে। নম্বর দ্যাখ থার্ড ক্লাসেরও আসে নাই এইবার।’ ওহ্। এতো খারাপ করলি কেমনে! আমি বেদম দিশাহারা বোধ করি। আঁতেল আঁতেল বলে চিৎকার দিতে থাকা সকলের মধ্যে ফয়সালই একজন যে আমার সঙ্গে কথা বলা ধরে। আমার পাশে বসে ক্লাসে, আমার সঙ্গে চা খেতে যায়, একসঙ্গে ল্যাবওয়ার্ক করে। উফ্ আই অ্যাম গ্রেটফুল টু হিম। ফয়সাল এত্তো খারাপ করলো ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট! ‘কাম অন রকিব – সকলে কি তুই হবে নাকি যে রেকর্ড মার্কসের চেয়ে দশ নম্বর বেশি পেয়ে বসে থাকবে!’ ফয়সাল খুব রাগ করে আমার সঙ্গে। আচ্ছা – ঠিক আছে – অই নোটগুলো তো আমার আর দরকার নেই, ওকে দিই। ফয়সাল আমার সবগুলো নোট নেয়। আমি বলি, বোঝানোর দরকার হলে বলিস – একসঙ্গে বসবোনে। ফয়সাল কতোটা পড়ে আমি খোঁজ নেবার সময় পাই না। ও সামলাতে যাচ্ছে ওর ইম্প্রুভমেন্ট পরীক্ষা – আমার তো সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল। ওফ, কেন যে পরীক্ষা দিতে হয় ছাত্রকে। সিস্টেমটা বদলানো যায় না! আই ডিসলাইক ইট। তবুও তো মাথাগরম না করে সেকেন্ড
ইয়ার ফাইনাল শেষ করতে হলো – রেজাল্ট যবে আসে – আসুক। থার্ড ইয়ার ক্লাস যে দৌড়ুনো শুরু করেছে, গড!
এদিকে সে-এক কাণ্ড! ওই মেয়েটির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল আমার। যে-মুখের স্বপ্ন আমি দেখি ফিজিক্সের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে – সেই মুখ – আম্মা যে-মুখকে বলে পানপাতা মুখ – সেই মুখ – এইখানে আমার ডিপার্টমেন্টে! তার নাম লাবনী। ক্লাসে যাওয়া, ল্যাবে ঢোকা, লাইব্রেরিতে কাজ করা, সবকিছু ঢের বেশি ভালো লাগার হয়ে ওঠে – ওইখানে লাবনী আছে যে! কিন্তু আমি কী করে ওই মেয়েটিকে এই কথা বলি! কেমন করে বলি! কেমন করে বলতে হয়! শিট! আই ডোন্ট নো দ্য ওয়ে। শিট। হোয়াট অ্যা অপদার্থ আই অ্যাম! আমি গোমড়াই আমার ভেতরে। কীভাবে কাছে যেতে হয়? কীভাবে!
আহ ন্যাচার আই অ্যাম থ্যাংকফুল টু ইয়ু! দূর তুমি কীভাবে নিকট করো! লাবনী নিজে নিজেই আমাকে এসে বলে, ‘ভাইয়া ফিজিক্স পড়তে আসছি। কিন্তু খুব কঠিন লাগতেছে। আপনার হেল্প না হইলে আগাইতেপারব বলে মনে হইতাছে না।’ দূর কাছে এসে পৌঁছায়, কিন্তু লাবনী কেমন ভাষায় কথা বলে! এটা কেমন বাংলা! এটা কেমন বাংলা! আমার কানে সহ্য হতে চায় না। ও-কে; সব ঠিক করে নেওয়া যাবে। কিন্তু ওকে কখন সময়টা দেই! আমার পড়া আছে না? থার্ড ইয়ার ফাইনাল ঘনাচ্ছে না? কিন্তু সময় তো দিতে হবে। ও-কে, সপ্তাহে তিনদিন লাইব্রেরি ওয়ার্ক বাদ। আমি লাবনীকে পুরো বিকেল ভরে পড়াই। পুরো ক্যাম্পাস জেনে যায় রকিব লাবনীর জন্য উতলা। লাবনী জানে না ক্যানো! সারা ক্যাম্পাস আরো কতো কী জানে রকিবের বিষয়ে – রকিব সে-সব জানে না ক্যানো! ক্যাম্পাস জানে ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্টদের কাছে রকিব তার ফার্স্ট ইয়ারের নোটগুলা বিক্রি করছে – খুব ভালো রেটে বিক্রি করছে। অলমোস্ট সব স্টুডেন্টই খাচ্ছে লাস্ট দুবছর ধরে – এবার যে-ফার্স্ট ইয়ার এসেছে তারা শুরু থেকেই হন্যে হয়ে খুঁজছে। তবে রকিবের চক্ষুলজ্জা আছে। সে-জন্য রকিবের হয়ে ওগুলো সেল করছে ফয়সাল। বন্ধুর জন্য কাজ করে দেওয়া আর কি! আঁতেল হলে কি হয়, ধান্দাটা ভালো জানে রকিব। টাকা আর্ন করার ফন্দি বের করে নিতে তার বুদ্ধির তুলনা আছে! ফয়সাল রকিবের নোটগুলা বিক্রি করে পকেটে টাকা তুলতে তুলতে সবকথা শোনে। শুনে ঠা ঠা হাসে। শালা আঁতেল – দ্যাখছো ধরা খাওয়া কারে বলে? তুই শালা এখন ধরা খাওয়া ফয়সালের হাতে। কারে বিশ্বাস করাবি তুই যে-এইটা আমার চাল। আম্মা – এটা আমি কোথায় আছি – কোথায়! ফয়সাল আমার নোটগুলা পড়ার জন্য নিয়েছিল! এসব কী হচ্ছে আম্মা – আমি কী করব – কী করব! আমি লাবনীর কাছে যাই। আমার চলতে ইচ্ছে করে না তবু চলি। আজ ওকে বলা দরকারই আমার মনের কথা। আজ স্পষ্ট করে বলা দরকার। ও শুনুক আজ আমার মুখে – এতোদিন কথা দিয়ে যা প্রকাশ করা হয়নি – আমার চোখ, আমার ওর দিকে ছুটে যাওয়া, আমার ভঙ্গি আমার কণ্ঠস্বর বারে বারে মিনিটে মিনিটে ওকে যা বলেছে – আজ তার স্পষ্ট উত্তর আমাকে শুনতেই হবে। আমি বলি – ‘লাবনী আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ ‘এসব আপনি কী বলতেছেন, ভাইয়া? আমার শুনতে খারাপ লাগতেছে।’ লাবনী চেহারা কালো করে রুক্ষ কণ্ঠে বলে। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি – তুমি বোঝ না?’ ‘আমি ক্যান এইসব বুঝব? আমি আপনারে বড় ভাইয়ের মতো দেখি – ভালোবাসার কথা এইখানে আসতাছে ক্যান!’
লাবনী আমাকে বড় ভাইয়ের মতো দেখে! ও গড, ও গড, ওহ গড! বেশ তো – দেখতেই পারে। দুজন কী একই সঙ্গে প্রেমে পড়তে পারে? কেন পড়লো না! কেন। হোয়াই। হোয়াটস দ্য প্রবলেম উইথ মি! কেন! আই লাভ ইয়ু লাবনী – প্রিয়তমা সুন্দরীতমা – হে আমার উজ্জ্বল উদ্ধার – আমাকে তোমার ভালোবাসা দাও। ‘ওই কালো কুষ্টির সঙ্গে প্রেম। ছোঃ। কথা বলতে গিয়ে তোতলাতে তোতলাতে আমার কানের মাথা নষ্ট করে দেয় – ওর সঙ্গে কী প্রেম! লাবনী এতো সস্তা না – আরে, হাবাটারে তো পড়া বোঝার কাজে শুধু ব্যবহার করা যায় – ওইটাই ওর জন্য মহা পাওয়া। ওর সঙ্গে প্রেম করতে হবে। ছাগল নাকি!’ আমি শুনতে পাই লাবনীর মনের কথা অন্যদের মুখে।
আম্মা বলে – এই ঘোর সুড়ঙ্গ অন্ধকার তোকে পেরুতে হবে কালো। হ্যাঁ – হ্যাঁ, আম্মা- পেরুতে হবে। টলিস না – টলিস না – খবরদার টলবি না। রকিব যদি কষ্টে ছিঁড়ে কেঁড়ে শেষও হয়ে যায় – সেই ছেঁড়া-খোঁড়া রকিবকে রকিবেরই বয়ে নিয়ে যেতে হবে। কতো বাকি পেরোনো – কতো বাকি!
আফিয়ায় আমারে রোজ দুফুরের টাইমে অগো বাড়ির ওর বরই গাছতলায় যাইতে কয়। এত্তবার হাজতখাটা জেলখানা ফিরত আমি, তো দেহি উয়ে আমারে দেখলে মুখ মটকায় না। হাসি দেয় আর ডাক পারে। আমি শেষে একদিন যাই অগো বরই গাছতলায় দুপুর টাইমে দেহা করতে। অয়ে কথা কয় হাসি মশকরা করে – আমার খারাপ লাগব ক্যান। উয়ে কয় – একদিন রুবেলের – ওই যে হিরু রুবেল – অর একটা পিকচার দেহাইতে লইয়া যাইতে। আচ্ছা নিমু। এইটা কোনো ব্যাপার। উয়ে আমার লগে পিকচার দেহে, এক রিকশায় গাও ঘেঁষাঘেঁষি কইরা আমরা যাই আসি, বাদামভাজা খাই – চেনাচুর – আমি বোঝতাছি যে, ভাব-ভালোবাসা ঘইট্টা যাইতে আছে এইনে। হউক না। প্রেম-মোহব্বত না থাকলে জুয়ানকি জমে! ঈদে চান্দে অরে জরজিটের থিরি পিচ কিইন্না দেই। এক ঈদে দিলাম পাঁচ ট্যাকা। এটা দিয়াই প্রেম-মোহব্বত জমে। চুমাচামি খাই, জাবড়াজাবড়ি বাদ নাই। অম্মা কিয়ের মইদ্যে কি – একদিন শোনা যায় যে আফিয়ায় বোলে কার লগে পলাইয়া গেছে গা।
আরে পলাইলে তো আমার লগে পলাইব। প্রেম-মোহব্বত তো ওর লগে আমার। কিন্তু পলাইল কার লগে – যেইটার বেশি ট্যাকা আছে – মোহসীন ওইটার লগে। মোহসীন কয়দিন জানি কয় নাই হইয়া থাকলো – তার বাদে আবার আইসা ঘোরে – খায় লয় – য্যান কিছু অয় নাই – য্যান আফিয়া কেটায় উয়ে কিচ্ছু জানে না। উয়ে তো ফিরা আসল, আফিয়ায় আছে কই! আফিয়ার সন্ধান কেউ জানে না। আর তামাশাটা দ্যাখো, অর মায়-বাবায় গিয়া কিনা নাবালক মাইয়া অপহরণের মামলা দেয় আমার নামে। হায়রে মজা – চুতমারানির দেশের তামশা দ্যাখছ – পুলিশ আমারে বিছরাইয়া বাড়িঘর ফাতাফাতা করে। আরে – আমি এর কী জানি! আমি কেমনে আসামি হই! কিন্তুক আমি আসামি। পুলিশের খাতায় আমার নাম পাক্কা কইরা তোলা আছে না। দাগী আসামি। তবে এইবার আর আমারে ধরোন খায় না। বহুত ধরা খাইছি ভালামানুষীর কারণে – এহন আমি নাক-কান খোলা হইনাইনি! শালার পুতের দেশ – গাদ্দারের গুষ্টির দেশ – মার পিছা-অর নাক মুখ বরাবর। যামুগা শালার এই দেশ ছাইড়া। হাঁটোন পার্টির লগে ম্যালা দিলে দেশ ছাড়তে কতক্ষণ –
আমার কিন্তুক পাসপোটও আছিল না। এক কাপড়ে এক জোতায় ছাড়লাম শালার দেশ। এই ইন্ডিয়া দিয়া যাই পাঞ্জাবের দিকে – ধরা খাইয়া জেল খাটি ছয় মাস। পাকিস্তান দিয়া ইরান গেলাম – ইরান ছাইড়া টার্কি। টার্কি থুইয়া রুমানিয়া, রুমানিয়ার বাদে হাঙ্গেরি। বাউন্না বাতাসের মতোন জানপরান হাতে নিয়া লৌড় পারলাম। মার সোনার গয়নাগাটি যা আনছিলাম – কোনদিনে হেটি দালালেরা নিয়া গেছে গা। আর আনছিলাম সেজু ভাইয়ের ফেনছি বেচোনের এক বোন্দা ট্যাকা – চক্ষের পলকে তুইল্লা লইয়া গেছে দালালে। জায়গায় জায়গায় বাগানে ক্ষেতে যেইনে পারে কাম করায় মাসের পর মাস। এক মাইল আগাইলে তিন মাস থোম ধইরা বইয়া থাকোন। থাকলাম। খাটলাম। মনে মনে রাখলাম এই কিরা যে, এই জীবনে ওই শালার পুতের দেশে আর ফিরোন নাই। দেহি কদ্দুর যাওন যায়। যদ্দুর যাওন যায় যামু।
রুমানিয়ায় আইসা দালাল আমাগোরে কয় যে, যাইতে হইলে এইরপর বন্ধ ভ্যানের ভিতরে লেটকি খাইয়া যাইতে হইব। এই ছাড়া অন্য রাস্তা নাই। কী সব গোশত মোশত নেওনের আজদাহা ভ্যান। ঠাসা বন্ধ চাইর দিক- খালি উপরে এক কোণায় একটা গর্ত – কোনোমতে বাতাস ঢোকে কি ঢোকে না – এমুন অবস্থা। তয় যাওন তো লাগব। এইটা নিয়া আবার কথা কী! যাওন লাগব, যামু।
হায়রে ঘুটঘুট্টি আন্ধার ভ্যানের ভিতরে – হায়রে আন্ধার। মনে হয়, কব্বরের তেনে বেশি আন্ধার। হাচা-মিছা এট্টু বাতাস আহে কি আহে না – তাই হড়হড়াইয়্যা ভিতরে নেই। চাইর চাক্কার আন্ধার কব্বর যায় যায় যায় – কতবার দিন গেল রাইত আসল কে জানে – ঘুরঘুট্টি কব্বর যাইতাছে তো যাইতাছে – কই গেছে খাওন – কই গেছে গোছল – কিসের বলে ঘুম – কিসের বলে জাগনা থাকা – সব জাবড়াজাবড়ি কইরা হইয়া উঠছে নিঃসাড় আন্ধার। এই হুঁশ আছে, এই হুঁশ নাই হইয়া যায়। আহারে এট্টু পানি যদি পাইতাম। কব্বর চলে চলে – কোনোখানে থামোন নাই। হায়রে পানির লেই¹া কইলজা ফাইট্টা যাইতে চায়। পানি খামু। পানি খাওন লাগব। পানি কই পামু। পানি কেমনে পামু! শেষে পানির বন্দোবস্ত সকলটি একদমে কইরা ফালায়। চড়চড়াইয়া মোতা ধইরা আঁজলায় সেই মুত নেয়। খাওন যায় না কেটায় কয়! খাওন যায় ত। খাওন যায়। পানির মতোনই তো লাগে। মুত মোনে অয় না – পানি। শেষে একদিন কব্বরের দরজা ফাঁক হয়। আমাগো সামনে দেহি এক ধু-ধু সীমাছাড়া ময়দান।
ফয়সাল আমার নোটগুলো বছরের পর বছর ধরে বিক্রি করে চলছিল আমার নাম করে – সকলেই জেনেছে সেই কথা, শুধু আমি জানিনি। আমার জানতে দেরি হলো কেন। আমি ফেরি হচ্ছি – আমি বিক্রি হচ্ছি – আমি কেন জানবো না! তাহলে আমি সারভাইভ করার যোগ্যতা রাখি না। আমি তো প্রেম পাবারও যোগ্যতা রাখি না। আমি তবে কী? কী? কেন আমি! কোথায় – কোথায় আমি!
কারা নাকি আমাকে খুঁজছে খুব করে, কিন্তু একটুর জন্য ধরতে পারছে না। হয় আমি ল্যাব থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছি, ল্যাবে গিয়ে তারা আমার খোঁজ করে। আমি নেই। ক্লাসশেষে দৌড়ে গেছি বাস ধরতে, তারা ক্লাসের সকলের কাছে আমার সন্ধান করছে। কারা তারা? তারা পার্টির লোক। তারা শেষে একদিন আমাকে ধরে ওঠে। খুব তাড়া ছিল। ক্লাস আটটায়, আমি আটটা পাঁচ করে ফেলেছি। সিঁড়ি ডিঙোচ্ছি দুতিনটা করে, তারা আমাকে ঘিরে ফেলে ওপর থেকে এসে। ঘিরে নিয়ে হ্যান্ডশেকের ওপরে হ্যান্ডশেক করা শুরু করে।
আরে ভাই আসেন চা খাই, তাদের প্রধান বলে।
না ভাই স্যরি, আমার ক্লাস।
কিন্তু ইম্পরট্যান্ট আলাপ ছিল – তারা চা খেতে চাওয়ার কারণটা জানায়। চিনছেন তো আমাগো? আমরা দলের নেতা-কর্মী; একজন আরো স্পষ্ট হয়। এখন আপনেরে আমাদের পার্টিতে জয়েন করতে হইব, একজন ভালো ছাত্র পার্টিতে আসলে আমাদের ইজ্জত বাড়ব –
কি কি সুবিধা আপনি পাবেন বলতেছি – ‘হলে একটা পুরা রুম আপনেরে দেওয়ার ব্যবস্থা হবে। আজকা থেকে। আপনার ভালামন্দ দেখার দায়িত্ব পার্টির।
এইটা তো একদিন দুইদিনের ব্যাপার না। ভার্সিটিতে আপনার ঢোকার জন্য পার্টি সবকিছু করবে।
টাকা-পয়সার বিষয়টা পার্টি দেখবে। আমরা শুধু আপনার ফেসভ্যালুটা চাইতেছি। একটা হোন্ডা আপনার জন্য থাকবে – ফুয়েল কোনো ব্যাপার না।
যদি আমাদের সঙ্গে না এসে ওদেরটাতে যান, খারাপ হয়ে যাইব পরিস্থিতি। আমরা আগে আসছি।
হয় আমাদের পার্টিতে, নাইলে কোনোখানে না।’
তাহলে ওরা একটা অপশন রেখেছে আমার জন্য! হয়তো ভুল করে, নাকি দয়া করে! আমি – আমি পড়াটা শেষ করতে চাই। আমার ক্লাস এখন। তারা শেষ কথা বলে দিয়ে চলে যায়। তারপর অন্য গ্রুপ আসে। একইরকম নিরাপত্তা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আশ্বাস – তাদের মুখেও। আমার ফেসভ্যালু এতো। আমি কোন পথ দিয়ে বের হবো এই ঘের থেকে, এই ঘিরে থাকা থেকে! ‘গলা চড়াসনে কালো ওদের সঙ্গে’ – আম্মা কাঁপতে থাকে, ‘বল – বল যে তুই রাজনীতি বুঝিস না – বল যে পড়াটা শেষ করতে চাস – আর কিছু
চাস না।’ আর কী চাইব আমি? আর কিছু চাওয়ার থাকতে পারে!
আমার আগে যারা অনার্স করে গেলো – তারা সব তিন বছরের কোর্স করা গ্রাজুয়েট। আমাদের সেশন থেকে অনার্স কোর্স চার বছরের। আমরা প্রথম ব্যাচ – চার বছরের গ্রাজুয়েশন কোর্সের। ওয়েল – পৃথিবীর অন্য সবদের মতো হতে চলেছি তাহলে।
স্যারদের অনেকে আমাকে রুমে যেতে বলতে থাকেন। কেন? কেন কে জানে? জুলফিকার হায়দার স্যার কথা সোজা বলেন। স্যারদের কতো দল, রঙের নামে নাম সব দল। জুলফিকার স্যার খয়েরি না যেন কালো দল নিয়ে ব্যস্তসময় কাটান। ‘শোনো রকিব, তুমি ফোর্থ ইয়ারে লেজার ফিজিক্স নিবা। আমার সাবজেক্ট।’
আমি – আমি তো মডার্ন ফিল্ড থিয়োরি পড়বো স্যার –
দেখো। এইটা আমার প্রেস্টিজ ইস্যু। ওরা আমার সাবজেক্টের পাশে কিনা দাঁড়া করায় মডার্ন ফিল্ড থিয়োরি! এইটার বাজার আছে! এইটা পড়লে ভাত পাবা না।
আমি স্যার –
ফার্স্ট ক্লাস নম্বরের উপরে আরো কতো বেশি চাও তুমি? সমস্যা হবে না। তাছাড়া ভবিষ্যতে চাকরির ব্যাপারটা তো আছে। আমার দল ক্ষমতায় আসবেই।
স্যার –
মডার্ন ফিল্ড থিয়োরির মতো পদার্থবিদ্যা আমাদের জন্য না। ওইটা ওইসব ডেভেলপ্ড কান্ট্রির পিপল্দের জন্য। আমার সাবজেক্টে অনেক কাজ হয়ে গেছে। এইটা আমাদের স্টুডেন্টদের জন্য ঠিক বিদ্যা। ওই ফিল্ড থিয়োরি – এইটার ভাত নাই।
স্যার আমি থিয়োরিটিক্যাল হাই এনার্জি ফিজিক্স পড়ব। ওটার জন্য কিন্তু থিয়োরি না নিলে হবে না স্যার। এই জন্য আমার ফিজিক্স পড়া।
কী? তুমি নিজের মত ফলাও! কী বোঝ তুমি ফিজিক্সের? মডার্ন ফিল্ড থিয়োরি পড়বা, না, আমার বিষয় বাদ দিয়া? যাও, মর গিয়া। দেখব ক্যামনে তুমি বিভাগে জয়েন করো।
পদার্থবিদ্যার এই নবীন শাখাটায় কাজ করার ভীষণ ইগারনেস যে আমার ভেতরে। কেন সেটা আমার জন্য হবে না? আমি কেমন করে থাকবো এখানে এমন বিরূপ ক্রুদ্ধ চোখের নিচে! আরো কতো কতো ধমকাধামকি আছে আমার জন্য?
ড. কবির হোসেন স্যার বলেন যে, বিষয়টা তো নতুন – এই যে ফোর্থ ইয়ারের জন্য যে-কোর্সটা চালু হয়েছে – তোমরা নিজেরা নিজেরা আগে পড়ে নাও বইপত্র। আর রকিব তুমি সিলেবাস ধরে ধরে নোট তৈরি করো তো। অমুক তারিখের মধ্যে নোট তুমি আমার কাছে সাবমিট করবে। তারপর আমি দেখব – কীভাবে আমি পড়াব।
স্যার যখনই যেভাবেই পড়ান গে না – আমার কিন্তু মজা লাগতে থাকে একেবারে নতুন বিষয়টা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে। নোট করতে করতে খুব ভালো লাগতে থাকে বিষয়টাকে। মজা পাই। স্যার আমার কাছ থেকে নোটটা নিয়ে নেন একেবারে, তার কাছে নোট নিয়ে যাবার পরে। এটা আমার কাছে থাকুক – স্যার ডিসিশন জানিয়ে দেন। ইস, ফটোকপি করে রাখলে হতো। ব্যাপারটা খেয়াল আসেনি – রকিব কাঁদে – পড়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে কাঁদে – হুঁ-হুঁ – কেমনে পার হতে হয় – পার হয়ে কোথায় যাওয়া …
রকিবের নোট ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে পড়ানো হতে থাকে রকিবের ক্লাসে, হুবহু পড়ানো হতে থাকে। পরের ইয়ারে। আর কতক্ষণ লাগবে এই সুড়ঙ্গটা পার হতে? অতোটা সময় মাথাটা খাড়া রাখা যাবে তো! আমি পার হতে পারব নাকি। নাকি পারব না! চোখের সামনে
ধু-ধু হলুদ খালি লাফঝাঁপ দেয় – আমার চোখের সামনে – রকিবের কান্না পেতে থাকা চোখ –
ভ্যান কব্বর থেইক্কা নাইম্মা দেখি ধা-ধা মাঠ, মদ্যিখানে কতো কতো তারের বেড়া, লগে কাঁটাতারও আছে। দালালে কয় ওই তার পার হইয়া ওইপারে যাইতে হইব। আমরা আছি অহন শ্লোভেনিয়ায় – হরেকরকম তারের বেড়ার এই পারে, ওই পারে ইটালিয়া। আমার শেষ যাওনের জায়গা। এই তার সকলের ভিতরে দিয়া যাইতাছে কারেন্ট। তার কাইট্টা কেউ যায় – সাধ্য নাই। তার ডিঙ্গাইয়া কেউ যায় – উপায় নাই।
দুইপাশ থেইক্যা তার আইসা ঢুইক্যা গেছে এক পাইপের ভিতরে। আরে বাপ্পুস রে – পাইপটা গিয়া যে কোনখানে ঠেকছে – এ-মুড়া থেইক্যা কিছু বোঝন যায় না। কোন আসমানের কাছে জানি গিয়া শেষ হইছে এইটার আরেক মাথা! আমি টাসকি খাইয়া যাই। দালালে কয় – এই পাইপ তিন কিলোমিটার লম্বা। আমি বুঝি মাইল – কিলুমিটারের আমি কী বুঝি! পাইপের ভিতরটা বহুত চওড়া, কিন্তুক বোলে এইটার ভিতরে দিয়া গেছে পাঁচ হাজার ভোল্ট কারেন্ট – ওই তারগুলির মধ্য দিয়া। আয় হায় আমাগো বলে এই পাইপের ভিতরে দিয়া হামা দিয়া যাইতে অইব তিন কিলোমিটার। ওই ইটালিয়ায়। আমরা বিশজনে ঝলৎ কইরা চিক্কুর দিয়া উঠি মনে মনে। ডরে – আগা মাথা ছাড়া ডরে – থরথরাইতে থাকে শইল। কেমনে যামু কারেন্টের তারের ঠাসা পাইপের ভিতর দিয়া!
অন্য উনিশ জনে যেমুন পিন্দে, আমিও তেমুন পিন্ধি প্লাস্টিকের টুকরা। পিন্দন ত না – কেমনে জানি দালালে পেঁচাইয়া দেয় প্লাস্টিক আমার শইলে তেনার মতোন কইরা। এক অংশ এক তিল য্যান খোলা না থাকে – একদম মোড়ানো, একদম। এইটা তো আর শুইয়া করল করোন না। প্ল্যাস্টিক মোড়া হইয়া বইসা বইসা পা টিপে টিপে আগানো। নড়নচড়ন নাই, শইল থেইক্যা খবরদার যানি প্লাস্টিক কোনোদিক দিয়া না সরে। পাঁচ হাজার ভোল্টের কারেন চলতাছে কইলাম – রিয়াজুলে দ্যাহো গো মা, বইয়া বইয়া পাও ফেলতাছে টিইপ্যা টিইপ্যা। প্ল্যাস্টিক য্যান একচুল না লড়ে রিয়াজুল। ইয়া আল্লা – কত কুটি বছর লাগব এই পাইপ পার হইতে! ইয়া আল্লা – প্লাস্টিক সইরা গেল নাকি মাথার তেনে! কান্দিস না, কান্দিস না রিয়াজুল। আরে সম্বন্ধীর পুতের দেশ রে- তুই আমারে তর কাছে ঠাঁই দিলি না।
আমি দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি করছিলাম শুধু ওইখানে – ওই দেশে আমার দেশে – আসলে আমি থুবড়ে পড়ে গেছিলাম – ক্রল করছিলাম আমি – কোনোমতে ক্রল করা – ভাতের ব্যবস্থা করার জন্য যেখানে জীবনের সব আয়োজন – সেই পশুস্তরের জীবনে আমি চাই থিয়োরিটিক্যাল হাই এনার্জি ফিজিক্স পড়তে! পাগল না আমি? চতুষ্পদ। আইসিটিপির সব কাগজপত্র হাতে পাওয়া মাত্র আম্মা আমাকে প্লেনে তুলে দিল। আম্মা তুমি কাঁদবা নাকি আম্মা – একা হয়ে যাচ্ছো যে – একদম একা!
আহ, আমার বাচ্চাটা এবার বাঁচবে। এবার স্কলার হবার রাস্তা ধরে মাথা তুলে হাঁটতে পারবে – আমার বাচ্চাটাকে আমি পার করতে পেরেছি – ভয়াল অন্ধকার সুড়ঙ্গ পার করে দিতে পেরেছি – আমি ওকে উন্মুখ উদ্বাস্তু করে অথৈ বিভুঁইয়ে পাঠিয়ে দিতে পেরেছি। ও বাঁচবে, ও বাঁচবে, ও বাঁচবে –
ওহ বাংলাদেশ – ও আমার দেশ – এটা কেমন বেঁচে থাকা। অ্যাই রকিব অ্যাই – কাঁদবে না – এটা বিভুঁই, চোখে পানি আসা চলবে না – কাঁদে না ধুর- য়


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.