আট

মুক্তিযুদ্ধ যখন তুঙ্গে, অক্টোবরের ৬ তারিখ, সকালবেলা এক কাণ্ড ঘটল। সেই কানাগলির ভেতরকার আমাদের বন্ধ গেটে হঠাৎ ধামাধাম করে লাথি মারতে লাগল কেউ। আব্বা কিংবা আজাদ কেউ বাড়িতে নেই। আমি জানালার সামনে গিয়ে উঁকি দিলাম। বাইরে তিনজন মিলিশিয়া নিয়ে দাঁড়িয়ে সেই কাবলিঅলাটা। আমাকে দেখেই উর্দু-বাংলা মিশিয়ে প্রথমে দরজা খুলতে বলল, তারপর জিজ্ঞেস করল আব্বার কথা। আমাদের বাড়িতে তখন প্রবল আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মা এবং ছোট ভাইবোনগুলো ভয়ে জড়সড় হয়ে গেছে। কারণ বাড়ি ঢুকতে পারলেই সর্বনাশ করবে তারা। আর এই সময়ে যদি আব্বা ফিরে আসেন, তাহলে গেট থেকেই ধরে নিয়ে যাবে তাঁকে এবং আব্বার হদিস আমরা আর কোনওদিন পাব না।

এ-অবস্থায় কী করব?

ওমর ফারুকদের বাড়ির সামনের দিকটায়, রজনী চৌধুরী রোডের পাশে বেশ কয়েকটি দোকান। সেইসব দোকানের একটি, ঠিক কোণার দোকানটি কাশেমের। মুদিদোকান। সেই দোকান থেকে সওদাপাতি আনি আমরা। কখনও দুচার টাকা বাকিও দেয় কাশেম। মুদিদোকানটির পুবপাশে একটি দর্জিদোকান। দোকানের মালিকটি সবসময়ে মুখ গোমড়া করে থাকে। তাকে কখনও হাসতে দেখিনি আমি। একাত্তর সালের সেই সময়টায় দর্জিদোকানের মালিক মুখ গোমড়া লোকটির যুবক বয়সী দূর সম্পর্কের এক ভাই থাকত দোকানে। সামান্য লেখাপড়া জানা অতিস¥ার্ট ধরনের যুবক। তার নাম আজ আর আমার মনে নেই। তবে ভালো উর্দু জানত সে। যুবকটি আমাকে খুব পছন্দ করত। আমার হঠাৎ মনে হলো সেই যুবককে ডেকে আনি। কানাগলির দিককার গেট না খুলে বাড়িঅলাদের মূল গেট দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সেই যুবককে আমি ডেকে আনলাম। প্রথমে সে আমাদের ঘরে এলো। আমার মুখে সব শুনে জানালা দিয়ে উর্দুতে কী কী বলল কাবলিঅলা আর কালো পোশাকের যমদূতের মতো মিলিশিয়াদের সঙ্গে। তার কথাবার্তা শুনে তারা তাকে বাইরে যাওয়ার ইশারা করল। যুবকটি অসীম সাহসী। সে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেল। আমাদের দিককার গেট খুলেই যেতে চেয়েছিল। আমি বললাম, সামনের দিককার গেট দিয়ে যাওয়ার জন্য। সে তাই করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলিশিয়ারা তাকে নিয়ে চলে গেল। কানাগলিটা ফাঁকা হয়ে গেল।

আমার মা তখন প্রবল উৎকণ্ঠায়, অস্থিরতায় দিশেহারা। হায় হায়, কোথায় নিয়ে গেল ছেলেটিকে! মেরেটেরে ফেলবে নাকি! আমাদের জন্য শেষ পর্যন্ত অন্যের ছেলে না মারা যায়!

কিন্তু আমাদের কারও কিছু করার নেই। কোথায় খুঁজব তাকে! আর খুঁজতে গেলে আমাকেও যদি ধরে নিয়ে যায়! মেরে লাশটা যদি ফেলে দেয় রেললাইনের ওদিককার আখক্ষেতে, কিংবা ধোলাইখালের কালো পচা নোংরা জলে!

আশ্চর্য ব্যাপার, আধঘণ্টা পরে ফিরে এলো সেই যুবক। মুখটা শুকনো, ভয়ার্ত। আমার আব্বাকে খালু বলত সে। বলল, কাবলিঅলাটি টাকা আদায়ের জন্য মিলিশিয়াদের নিয়ে এসেছে। যখন-তখন আবার আসবে। খালুকে পেলে অসুবিধা আছে। টাকা দিতে না পারলে ধরে নিয়ে যাবে। আর এই সময় পাকিস্তানিরা কাউকে ধরে নিয়ে গেলে সে আর ফিরে আসে না।

শুনে আমরা সবাই যেন একসঙ্গে মরে গেলাম। মা স্তব্ধ হয়ে গেলেন, ছোট ভাইবোনগুলো স্তব্ধ হয়ে গেল। সুদে-আসলে সেই পাঁচশো টাকা তখন অনেক টাকা। ঘরে দশ-বিশটি টাকাও আমাদের থাকে না। দেশের এই অবস্থা, টাকা যোগাড় হবে কেমন করে? আবার কখন এসে হানা দেবে মিলিশিয়ারা!

আমরা যখন এসব ভাবছি, যুবক বলল, ওরা ভেবেছে খালু আমার বাবা। এজন্য ধুপখোলা মাঠে নিয়ে হাতের মোটা বেত দিয়ে খুব পিটিয়েছে আমাকে। বলেছেন, আমরা আবার আসব। টাকা না পেলে খালুর সঙ্গে আমাকেও ধরে নিয়ে যাবে। সুতরাং আমি এসবের মধ্যে আর নেই। আজই এই পাড়া ছেড়ে সোজা গ্রামে চলে যাব। একবার বেঁচে ফিরতে পেরেছি, আরেকবার ধরলে ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।

আমার ইচ্ছে হলো যুবকটির পা জড়িয়ে ধরে বলি, আপনি যাবেন না। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকেন, আমার আব্বাকে বাঁচান।

বলা হলো না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম যুবকের দিকে। সে একবারও আমার দিকে তাকাল না। চলে গেল।

আব্বা ফিরলেন দুপুরের পর। ক্ষুধাক্লান্ত ভাঙাচোরা শরীরের মানুষ। সব শুনে এমন দিশেহারা হলেন, ফ্যাল ফ্যাল করে আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর নিজের অজান্তেই যেন বারান্দার হাতাঅলা চেয়ারটায় বসে পড়লেন। খানিক পর দুহাতে পেট ধরে কেমন কুঁকড়ে গেলেন। অর্থাৎ আলসারের ব্যথা শুরু হয়ে গেছে তার। কোনও রকমে পাঞ্জাবির পকেট থেকে দুআনা পয়সা বের করে পাঁচ ন¤¦র মেয়ে উষাকে দিলেন খাওয়ার সোডা কিনে আনতে। উষা তখন পাঁচ-ছ বছরের। দিশেহারা ভঙ্গিতে দৌড়ে চলে গেল কাশেমের দোকানে।

মনে আছে, সেই ফাঁকে আব্বাকে কোনও রকমে একটু ডাল-ভাত খাইয়েছিলেন মা। ভাত খেয়ে ব্যথা কমানোর জন্য সেই সোডা খেলেন তিনি। তার কিছুক্ষণ পর থেকেই এক ধরনের অস্বস্তি শুরু হলো তাঁর। না শুতে পারেন, না বসতে পারেন। অবিরাম পায়খানায় যেতে শুরু করলেন।

পায়খানাটা ছিল দক্ষিণ দিককার এককোণে। পুরনো ঢাকার পুরনো আমলের বাড়ি। চার-পাঁচ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে পায়খানায় উঠতে হয়। চার-পাঁচবার পায়খানার যাওয়ার পর আব্বা একেবারে নেতিয়ে গেলেন। আব্বা পায়খানায় যাচ্ছেন, আমরা সবাই উৎকণ্ঠিত মুখে দাঁড়িয়ে আছি পায়খানার কাছে। একবার পায়খানা ঘরের দরজা খুলে কোনও রকমে অতি অসহায় ভঙ্গিতে উষার দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। আমাকে ধর মা, আমাকে ধর।

আমরা সবাই ধরাধরি করে ঘরে নিয়ে এলাম তাঁকে। তারপর থেকে তাঁর আর জ্ঞান নেই। আমাদের বাড়িঅলার বড়মেয়ে ডাক্তার, ডাক্তার খালেদা বারি। তিনি এসে কী কী ওষুধ দিলেন, কাজ হলো না। হাসপাতালে নিয়ে যেতে বললেন । শুনে আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এত দুঃখকষ্ট গেছে জীবনে, কিন্তু তখনও পর্যন্ত আমাদের কাউকে কখনও হাসপাতালে যেতে হয়নি। হাসপাতাল সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণা নেই। তখন অব্দি আমি মূর্খের মতো জানি, হাসপাতালে গেলে কেউ কখনও ফিরে আসে না। যায় মানুষ, ফেরে লাশ।

আমরা সবাই কান্নাকাটি শুরু করলাম। আব্বার চারপাশ ঘিরে কান্নার রোল পড়ে গেল।

বাড়িঅলার বড়ছেলের নাম কাশেম। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তিনি একটি আকাশি রঙের ভেসপা চালাতেন। সেই কাশেম ভাই আব্বাকে হাসপাতালে নেয়ার উদ্যোগ নিলেন। বাড়ির সামনে স্কুটার আনা হলো, আব্বাকে স্কুটারে তুললাম। তাঁর মাথা আমার কোলে, পা আজাদের কোলে, স্কুটার চলতে লাগল। পেছন পেছন ভেসপা নিয়ে কাশেম ভাই। তিনি বেশ স¥ার্ট, সুপুরুষ ধরনের।

সন্ধ্যার সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছলাম। কাশেম ভাই চেষ্টা-তদবির করে ভর্তি করালেন আব্বাকে। দোতলার একটি ওয়ার্ডে বেড পাওয়া গেল। আমি এবং আজাদ তীব্র উৎকণ্ঠা বুকে চেপে একজন আব্বার পায়ের কাছে আরেকজন মাথার কাছে বসে রইলাম। রাত গভীর হতে লাগল।

তখন সন্ধ্যার পর ঢাকা হয়ে যেত মৃতের শহর। কোথাও কোনও জনমনিষ্যির সাড়া নেই, রিকশার সাড়া নেই। তীব্র নির্জনতা ভেঙে, নৈঃশব্দ ভেঙে কখনও কখনও ছুটে যায় পাকিস্তানি শূকরছানাদের জলপাই রঙের গাড়ি। আতঙ্কে আরো নির্জন হয় নির্জনতা।

হাসপাতালের বেশির ভাগ বেডই ফাঁকা। রোগী নেই, ডাক্তার আছেন দু-একজন, নার্স আছে দু-একজন। আব্বাকে দেখছিলেন এক তরুণ ডাক্তার। খুবই নীরস এবং নির্দয় মুখে রোগী দেখার দায়িত্ব পালন করেই তিনি ব্যস্ত হয়ে ছুটে যাচ্ছিলেন ডক্টরস রুমে।

আব্বা অচেতন হয়ে পড়ে আছেন, আমার বুক হাজার মণ পাথরের সমান ভারি হয়ে আছে উৎকণ্ঠায়, তবুও ডাক্তারটির আচরণে কৌতূহল হচ্ছিল। ডক্টরস রুমে কী এমন মধু আছে যার আকর্ষণে অমন করে ছুটে যাচ্ছেন তিনি!

 ঘোরতর দুঃসময়েও মানুষ কখনও কখনও এমন সব কাজ করে যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। সেই রাতে আমিও তেমন একটি কাজ করলাম। আনমনা ভঙ্গিতে আব্বার মাথার কাছ থেকে উঠে দাঁড়ালাম। আজাদ ভাবল আমার বুঝি বাথরুম পেয়েছে। সে কোনো কথা বলল না। আমি গিয়ে ডক্টরস রুমের দরজায় দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে হতবাক হয়ে দেখি চেয়ারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আবিষ্ট হয়ে আছেন সেই তরুণ ডাক্তার। তাঁর সামনে টেবিলের ওপর ছোট্ট একটি রেডিও। রেডিওতে স্বাধীনবাংলা বেতারকেন্দ্র ধরা হয়েছে। উদাত্তস্বরে গান হচ্ছে,

তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর

পাড়ি দেব রে

আমরা কজন নবীন মাঝি,

হাল ধরেছি, শক্ত করে রে।

সেই গান শুনে আমি কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে গেলাম মাত্র কয়েক পা দূরত্বে অচেতন হয়ে আছেন আমার বাবা। মৃত্যু তাঁর শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে।

রাত পৌনে একটার দিকে হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল আব্বার বুক। আমি ছুটে গিয়ে সেই ডাক্তারকে ডেকে আনলাম। আব্বার দিকে একপলক তাকিয়ে তিনি বললেন, আপনাদের যদি কাউকে কোনও খবর দেয়ার থাকে দিয়ে দিন। রোগীর অবস্থা খারাপ।

কিন্তু কাকে খবর দেবো আমরা!

কে আছে আমাদের!

আত্মীয়-স্বজন বলতে সামান্যই আমাদের। প্রধান আত্মীয় টুনুমামারা। টুনুমামার বাবা আবুল হোসেন খান, তাঁর ডাকনাম আবেদীন। বুজির একমাত্র আপনভাই। বুজিরা দুভাইবোনই ছিলেন। ছোটভাই আবেদীনকে তিনি আবদিন বলে ডাকতেন। গেন্ডারিয়াতেই বাড়ি আমার সেই নানার। দীননাথ সেন রোডে। সাধনা ঔষধালয়েরমাঝখানকার গলি দিয়ে ঢুকে সোজা একেবারে শেষ মাথায়। উনষাট-ষাট সালের দিকে বাড়িতে একটি দোতলা টিনের ঘর, সামনের দিকে বাংলাঘর আর কয়েকটি লিচুগাছ। বাড়ির লাগোয়া দক্ষিণ দিকে বিলের মতো কচুরিপানাভর্তি জলাশয়। টিনের পায়খানা-ঘরটি ছিল সেই দিকে। পশ্চিম পাশে ছিল বাগানমতো বেশ অনেকখানি জলাশয়। একটি জামরুল গাছ ছিল, মেহেদি ঝোপ ছিল, আরো কী কী সব ফুলের গাছ। বাগানের লাগোয়া রাস্তার দিকে চটির বেড়া।

আমার তখন চার-পাঁচ বছর বয়স। কখনও জিন্দাবাহার থেকে, কখনও মেদিনীমণ্ডল থেকে আমরা সবাই সেই বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। তখন টুনুমামা কলেজে পড়েন। মিনুখালা আর অনুমামা নাইন টেনে, খোকনমামা আজাদের এক-দু ক্লাস ওপরে, মিন্টুমামা আজাদের সঙ্গে। মণি, বীনাখালা আর আমি এক ক্লাসে পড়ি ঠিকই, কিন্তু স্কুলে ভর্তি হইনি। বীনাখালা বোধহয় প্রাইমারি স্কুল-টিস্কুলে যায়। সেন্টুমামা আমার ছোট, বাদল পলির সমান। রীনা-দীনা তখনও হয়নি।

ছেলেবেলায় এই বাড়ি ছিল আমার প্রধান আকর্ষণ। জিন্দাবাহার হোক কিংবা মেদিনীমণ্ডল হোক, যেখান থেকেই শুনতাম গেন্ডারিয়ায় যাওয়া হবে, খুশিতে পাগল হয়ে যেতাম। এই বাড়িতে আমার সবচেয়ে প্রিয়মানুষ বীনাখালা। আমি ডাকতাম বিনুখালা। সেই বয়সে তো বটেই, আজও আমার মনে হয়, বীনাখালার মতো সুন্দর কোনো মেয়ে এই পৃথিবীতে আর নেই। দীননাথ সেন রোডের সেই বাড়ি মানে পড়ন্ত বিকেলে হারমোনিয়াম বাজিয়ে বিনুখালার মিষ্টি গলার গান। খোকনমামা মিন্টুমামার সঙ্গে আজাদ আর আমার দুরন্তপনা। একটি গ্রামোফোন ছিল। আমরা বলতাম ‘কলের গান’। কোনও কোনও নির্জন দুপুরে দোতলায় বসে কলের গান বাজাতেন টুনুমামা ও অনুমামা। স্বপ্নের মতো ভেসে আসত হেমন্তের অবিস্মরণীয় গলা, ‘আমি বন্ধু বিহীন একা’।

বাড়ির পুবদিকে, লিচুগাছগুলো ছাড়িয়ে বাঁধানো ঘাটলার একটি পুকুর। পুকুরের ওপারে কাদের যেন কয়েকটি ছাপড়া ঘর, কয়েকটি কলাগাছ। তার পেছনে রেললাইন। ভোররাতে বহুদূর থেকে ভেসে আসত ট্রেনের হুইসেল। তারপর ঝিকঝিক ঝিকঝিক করে চলে যেত ট্রেন। কখনও কখনও যেত হালকা খয়েরি রঙের বগিঅলা মালগাড়ি। সেগুলো যে কী লম্বা হতো! লিচুতলায় দাঁড়িয়ে বীনাখালা আর আমি বগি গুনছি। গুনা আর শেষই হতো না আমাদের। মালগাড়ির বগি গুনতে গুনতে মুগ্ধচোখে তাকাতাম বীনাখালার দিকে। সাদা কিংবা আকাশি রঙের ফ্রক পরা বীনাখালার চুল ঝুটি করে বাঁধা। আমার মনে হতো, বীনাখালা এই পৃথিবীর কোনো মেয়ে নয়, বীনাখালা ছোট্ট এক পরী। পরীস্থান থেকে ভুল করে আমাদের পৃথিবীতে চলে এসেছে।

একাত্তর সালের অক্টোবরে বীনাখালারা কেউ ঢাকায় নেই। মিনুখালার শ্বশুরবাড়ি মৌছামান্দ্রা চলে গেছে। দীননাথ সেন রোডের বাড়িতে বহুকাল আগের পুবে-পশ্চিমে লম্বা দোতলা বিল্ডিং হয়েছে। সেই বিল্ডিং একদম ফাঁকা। রুমে রুমে তালা ঝুলছে। বাড়ি পাহারা দেয় একটি নেড়িকুকুর। আমি কিংবা আজাদ কখনও কখনও গিয়ে সেই বাড়ি দেখে আসি। কুকুরটিকে একটু-আধটু খাবার দিয়ে আসি।

ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে অনুমামা ঢুকেছিলেন এয়ারফোর্সে। আমার মামাদের মধ্যে সবচেয়ে হ্যান্ডসাম আর স্মার্ট লোক। পাকিস্তান এয়ারফোর্স লুফে নিয়েছিল তাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা পড়ে আছেন তিনি। করাচিতে। পুরো পরিবার এই নিয়ে আতঙ্কিত। পাকিস্তানি মিলিটারিরা ততোদিনে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। লৌহজং শ্রীনগরে আর্মি ক্যাম্প। যখন-তখন গ্রমে এসে হামলা করবে তারা। একদিকে এই ভয়, আরেকদিকে অনুমামাকে নিয়ে উৎকণ্ঠা, মৌছামান্দ্রায় বীনাখালারাও কাটাচ্ছে ঘোরতর দুর্দিন। বীনাখালারা ছাড়া আর কাছের আত্মীয় কে আমাদের?

ফজলকাকা, হাপিকাকা?

তারা কে কোথায় আছে আমরা জানিই না। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তারা আমাদের খোঁজখবরই নেয়নি। ডালুর সেজোভাই নজরুল, আমরা ডাকতাম নজুদা, তিনি চাকরি করতেন এজিবিতে। তখন বোধহয় দূরে কোথাও থাকেন তিনি, পরে ঢালকানগরে এসে প্রথমে মেসে থাকতেন, পরে একা বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। আর আছে গণিমামা, হামিদমামা, বাবুলদারা। মুক্তিযুদ্ধে কে কোথায় ছিটকে পড়েছে কে জানে। এই রাতদুপুরে কাকে কোথায় খবর দেবো আমরা? কাকে ফোন করব?

তখনকার দিনে ফোন বেশ দুর্লভ ব্যাপার। টুনুমামাদের বাড়িতে আছে। মিনুখালার বর বাদল খান সাহেব তখন বিজনেসে খুবই ভালো করতে শুরু করেছেন। কলুটোলায় পুরনো আমলের তিনতলা একটি বাড়ির তিনতলার বারোআনি নিয়ে থাকেন। সেখানেও টেলিফোন আছে। কিন্তু ওখানেও কেউ নেই। রুমে রুমে তালা।

আব্বা মারা গেলেন রাত একটায়। একজন নার্স সাদা চাদরে তাঁর শরীর ঢেকে দিল। আমি নিঝুম হয়ে কাঁদতে লাগলাম। ডাক্তারের রুম থেকে আজাদ কাঁদতে কাঁদতে ফোন করল আমাদের বাড়িঅলার ঘরে। আমার মা, পুনুআম্মা, সত্তর সাল থেকে আমাদের বাসায় কাজ করছে বারেকের মা, সে, আমাদের অসহায় ভাইবোনরা সবাই জেনে গেল এতবড় একটি পরিবারকে অকূলে ভাসিয়ে পরিবারের একমাত্র ভরসার মানুষটি এইমাত্র চলে গেলেন।

ভোর পাঁচটার দিকে কাশেম ভাই আর তার ছোটভাই আবুল এসেছিলেন আব্বার লাশ নিতে। আমি বসে আছি আব্বার লাশের পাশে, আজাদ অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি করছে। সংসারের বড় ছেলে হিসেবে তার ওপর এখন এতগুলো মানুষের দায়িত্ব। বোধহয় সেই  চিন্তায় দিশেহারা হয়েছিল আজাদ।

ঘণ্টাতিনেক ধরে আব্বার লাশের পাশে বসে নিঃশব্দে কেঁদেছিলাম আমি। আমার মন চলে যাচ্ছিল ছেলেবেলায়, শৈশব-কৈশোরের কত স্মৃতি আব্বার সঙ্গে। কত ভালোবাসা, আবেগ, স্নেহের মুহূর্ত। আমি মেদিনীমণ্ডলে একা বুজির কাছে আছি।

কাল বিকেলে বুজি বলেছেন আজ বিকেলের লঞ্চে আব্বা আসবেন। শোনার পর থেকে আমার ভেতর শুরু হয়েছে অদ্ভুত এক ছটফটানি। সন্ধেবেলা পড়তে বসে পড়ায় আর মন বসে না। হারিকেনের ম্লান আলোর দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকি। বুজির কোলের কাছে শুয়ে রাতের বেলা কিছুতেই ঘুম আসে না। শুধু মনে হয়, কখন সকাল হবে। সকালবেলা মনে হয় কখন দুপুর হবে, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কখন হাজামবাড়ির মজিদের সঙ্গে মাওয়ার ওদিককার নদীতীরের লঞ্চঘাটে গিয়ে দাঁড়াব আমি। কখন পদ্মার বাঁকে ছবির মতো আস্তেধীরে ফুটে উঠবে একটি লঞ্চ, তর তর করে এগিয়ে আসবে ঘাটের দিকে। কাছাকাছি আসার পর দেখা যাবে ডেকের ওপর হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন আব্বা।

আব্বার জন্য এই অপেক্ষাটা শুরু হয়েছিল ছেলেবেলায়। সেই বয়সেই বুঝে গিয়েছিলাম চারপাশের মানুষের মধ্যে আমি সবচাইতে ভালোবাসি আমার আব্বাকে। আমার আব্বার মতো মায়াবী, সুন্দর মুখের মানুষ আর কেউ নেই। আব্বার মতো ভালোবাসতে কেউ জানে না।

ছেলেমেয়েদের মধ্যে আমার জন্য আব্বার ছিল সবচাইতে বেশি টান। এজন্য ছুটিছাটায় আব্বা আমাকে দেখতে আসতেন।

বাষট্টি-তেষট্টি সালের কথা। তখন ঢাকা থেকে মাওয়া মেদিনীমণ্ডলে যাওয়ার দুটো পথ ছিল। একটি সরাসরি লঞ্চে। ঢাকার সদরঘাট থেকে সকালবেলা লঞ্চে চড়লে সেই লঞ্চ মুন্সিগঞ্জ চাঁদপুর হয়ে দিনের শেষে মাওয়া ভাগ্যকূল পৌঁছাত। আর একটা পথ ছিল শ্রীনগর হয়ে। মেদিনীমণ্ডল থেকে হেঁটে কিংবা সীতারামপুর, কাজির পাগলা অথবা গয়ালিমান্দ্রা থেকে কেরায়া নৌকায় শ্রীনগর, ষোলঘর কিংবা আলমপুর থেকে লঞ্চে শীতলক্ষ্যা ধরে ঢাকায়। খরালিকালের পথ ছিল এই রকম। বর্ষায় শ্রীনগরের লঞ্চ গয়ালিমান্দ্রা পর্যন্ত আসত। তখনকার বর্ষায় শ্রীনগরের খাল আজকালকার ছোটখাট নদীর মতো।

আমাকে দেখতে এসে এক-দুদিনের বেশি থাকতেন না আব্বা।

যে-একটি দুটি দিন বাড়ি থাকতেন আব্বা, আমি সারাক্ষণ তাঁর সঙ্গে। স্কুলে যেতাম না, পড়তে বসতাম না। খেতাম আব্বার সঙ্গে, ঘুমাতাম তাঁর গলা জড়িয়ে। আর কত যে কথা বলতাম আব্বার সঙ্গে। ওই বয়সের ছেলেমানুষি কথা। এমনকি গান গেয়েও শোনাতাম আব্বাকে। অর্থাৎ নিজের সব গুণপনা দিয়ে আব্বাকে মুগ্ধ করার চেষ্টা।

আব্বা মুগ্ধ হতেন। যখন-তখন বুকে জড়িয়ে ধরতেন আমাকে। মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতেন। সেই বয়সে সবচাইতে দুঃখের দিন ছিল আব্বা যেদিন চলে যেতেন।

তখন খরালিকাল। মাওয়ার লঞ্চে এসে আব্বা ফিরে যাচ্ছেন শ্রীনগরের লঞ্চে। সকালবেলাই আব্বার জন্য গরম ভাত আর সাচরা মাছের ঝোল রেঁধেছেন বুজি। আমাকে নিয়ে খেতে বসেছেন আব্বা। কিন্তু আমাদের দুজনের কারোরই গলা দিয়ে ভাত নামে না। আব্বার চোখেও পানি আসে, আমার চোখেও পানি আসে। তারপর একসময় জড়িয়ে ধরে, মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে পথে নামতেন আব্বা।  বারবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকতাম আমি। আব্বা হেঁটে যান আর ফিরে ফিরে তাকান। দূর থেকে আমি দেখি, থেকে থেকে চোখ মুছছেন তিনি।

কোনও কোনও সময় সীতারামপুর থেকে কেরায়া নৌকায় করে শ্রীনগর যান আব্বা। হাজামবাড়ির মজিদ তাঁর ব্যাগ পৌঁছে দিতে যায়। মজিদ সঙ্গে থাকলে আমি সীতারামপুর পর্যন্ত যেতে পারি। কিন্তু নৌকা ছাড়ার পর একদিকে কাঁদেন আব্বা আরেকদিকে আমি।

আমার সমগ্র ছেলেবেলা কেটেছে এইভাবে, আব্বার জন্য কেঁদে।

তারপর যখন ঢাকায় চলে এলাম তখন শুরু হয়েছিল আব্বার জন্য অন্যরকম এক অপেক্ষা। দশটি ছেলেমেয়ের সংসার এক চাকরিতে কিছুতেই চালাতে পারতেন না আব্বা। এজন্য অফিসের পর নানারকমের টুকটাক কাজ করতে হতো তাঁকে, টিউশনি করতে হতো। সকালবেলা বাসা থেকে বেরিয়ে ফিরতেন অনেকটা রাত করে। দুপুরে খেতেন কি খেতেন না, জানতেও পারতাম না। কিন্তু যত বাড়তো আব্বার জন্য উৎকণ্ঠা ততোই বাড়তো আমার। পড়তে বসে আব্বার জন্য আনমনা হয়ে যেতাম, খেতে বসে আনমনা হয়ে যেতাম। অন্যান্য ভাইবোন যে যার মতো পড়াশুনা খাওয়া-দাওয়া গল্প-গুজব করে শুয়ে পড়তো, আব্বার কথা হয়তো ভাবতোই না, কিন্তু আমি শুতে পারতাম না। আমি একা চলে যেতাম রাস্তার মোড়ে। আব্বার জন্য দাঁড়িয়ে থাকতাম। অনেকটা রাত করে ফিরতেন আব্বা। দূরে থেকে পা চালিয়ে হেঁটে আসতেন। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মায়াবী মুখখানা তাঁর ভরে যেত মোহময় এক হাসিতে।

সেই রাতে আব্বার লাশের পাশে বসেও আমার বিশ্বাস হয়নি আব্বা মারা গেছেন, আব্বা আর কোনওদিন ফিরে আসবেন না। তাঁর সঙ্গে কোনওদিন আমার আর দেখা হবে না।

তারপর থেকে কতদিন, কতভাবে যে আব্বার জন্য আমি অপেক্ষা করেছি। মনে হয়েছে হঠাৎ করে কোনও দুপুরশেষে আব্বা এসে হাজির হবেন। কোনও বৃষ্টিভেজা বর্ষায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে গামছায় মাথা মুছবেন।

আব্বা মারা গেছেন তেত্রিশ বছর আগে। এখনও কোনও কোনও গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে মনে পড়ে তাঁর কথা। নিজের অজান্তেই ফিরে যাই ছেলেবেলায়, কৈশোরকালে। নিজেকে দেখতে পাই গেন্ডারিয়ার ডিস্টিলারি রোডের কোনও এক মোড়ে গভীররাতে একাকী দাঁড়িয়ে আছি। আব্বার জন্য অপেক্ষা করছি। ওই তো মলিন পাজামা আর খদ্দরের পাঞ্জাবি পরা আব্বা সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ফিরে আসছেন। দূর থেকে আমাকে দেখেই মায়াবী মুখখানি তাঁর উজ্জ্বল হয়েছে। কাছে এসে আমার মাথায় হাত দিয়েছেন তিনি।

এখনও কোনও কোনও গভীর রাতে আব্বার জন্য কাঁদি আমি।মানুষের মৃত্যুর খবর কেমন কেমন করে যেন পেয়ে যায় মানুষ। পরদিন সকালে একে একে অনেক লোক এলো আমাদের বাসায়। [চলবে]