॥ ৮ ॥

দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মুখপাত্র টেলিফোন করলেন সকালবেলা। অতি আকর্ষণীয় প্রস্তাব।

বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন হবে পরের সপ্তাহেই। সেজন্য বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যবেক্ষকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সার্ক-অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর একটা কোটা আছে। ভারত থেকে পাঠানো হবে দশজনকে। আমি সেই দশের অন্যতম হতে রাজি আছি কিনা।

অরাজি হবার তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বাংলাদেশে যাবার যে-কোনো সুযোগ পেলেই আনন্দে মনটা নেচে ওঠে। যেন একটা অদৃশ্য চুম্বক আমায় টানে। দুঃখের বিষয়, সেই টানটা ইদানীং ক্রমশআলগা হয়ে আসছে। এ-ধরনের সরকারিদলের প্রতিনিধি হলে প্রচুর খাতির-যত্ন পাওয়া যায়।

সারা ভারত থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষদের বেছে নেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক, খেলোয়াড়, চিত্রতারকা, লেখক, বিজ্ঞানী। শুধু রাজনৈতিক নেতারা একবারে বাদ। পশ্চিম বাংলা থেকে একমাত্র আমি, কিন্তু মজার ব্যাপার, দশজনের মধ্যে তিনজনই বাঙালি! দিল্লির নিখিল চক্রবর্তী প্রখ্যাত সাংবাদিক, সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাতিমান আশিস নন্দী, তিনিও দিল্লির। খেলোয়াড় হিসেবে পতৌদির নবাব, শর্মিলা ঠাকুরের স্বামী হিসেবে তিনিও তো বাংলার জামাইবাবু! তাছাড়া, সেইসময় আনন্দবাজার গোষ্ঠীর একটি ইংরেজি খেলার পত্রিকার সম্পাদক পতৌদি, অর্থাৎ তিনি আমার সহকর্মীও বটে। বিমানে আমরা পাশাপাশি সিটে বসে পৌঁছোলাম ঢাকায়। কোনো নবাবের সঙ্গে এত ঘেঁষাঘেঁষি করে বসার অভিজ্ঞতা আমার আগে কখনো হয়নি।

পতৌদি অত্যন্ত সুপুরুষ, কিন্তু মুখখানা খুব কঠোর মনে হয়। হয়তো তার একটা কারণ, তাঁর একটা চোখ পাথরের।

আমার সঙ্গে দু-একটা কথা বলার সময় তাকাচ্ছিলেন পাশ ফিরে। মাঝে মাঝে হাসছিলেন, তখনই লক্ষ করলাম, ওঁর একটা চোখ স্থির। মানুষ যখন হাসে, তখন তার চোখও হাসে, এরকম মানুষের একচোখে হাসি, অন্য চোখে নীরবতা। আমার খুব মায়া হয়েছিল।

ঢাকা বিমানবন্দরে সাধারণ নির্গমন পথের বদলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো পেছন দিকে ভি আই পি এনক্লোজারে, সেখানে ফাইল-পত্তর নিয়ে বসে আছেন অনেক কর্তাব্যক্তি। এখন ঠিক হবে, কোন পর্যবেক্ষক কোন জেলায় যাবে।

আমাকে জিজ্ঞেস করতেই, আমি প্রায় কিছু না ভেবেই বললুম, বরিশাল।

ওঁরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন। ওঁদের মধ্যে দু-চারজন বোধহয় জানেন যে, আমার জন্মস্থান ফরিদপুর তথা মাদারিপুরে। সেখানে আমার ঘোরাঘুরি করার আগ্রহ হওয়াই তো স্বাভাবিক।

একজন জিজ্ঞেস করলেন, কেন, বরিশালই বলছেন কেন? বিশেষ কোনো কারণ আছে?

আমি বললুম, না। তবে বরিশাল জেলায় আমি কখনো যাইনি, সেটাই একটা কারণ হতে পারে।

বিমানবন্দর থেকে গাড়ির মিছিল করে আমাদের আনা হলো এক পাঁচতারা হোটেলে।

পতৌদি আমাকে চুপি চুপি বললেন, আমি কোনো জেলায়-টেলায় যাবো না। আমি হোটেলে ঘুমোবো।

প্রত্যেক অন্যদেশীয় পর্যবেক্ষকের সঙ্গে থাকবেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। আমি সঙ্গী হিসেবে পেলুম ইমদাদুল হক মিলনকে, তাতে আমার আনন্দের অবধি রইলো না। মিলন আমার ছোটভাইয়ের মতন, আমি তার রচনার খুব অনুরাগী। মিলনের মতন পড়ুয়াও আমি খুব কম দেখেছি। বাংলা সাহিত্যের সব খুঁটিনাটি খবর সে রাখে। অপরিচিত কোনো ব্যক্তিকে সঙ্গী হিসেবে পেলে তাঁর সঙ্গে ভাব জমানো আমার পক্ষে মুশকিল হতো।

সেবারে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে বেশ অভিনবত্ব ছিল। আগের সরকারকে পদত্যাগ করিয়ে এক অস্থায়ী সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। এতে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার সম্ভাবনা প্রবল। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এই ব্যবস্থা নেই, ভারতেও নেই, তবে ভারতে নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রচুর ক্ষমতা। মন্ত্রী-টন্ত্রিরাও তাদের ভয় পায়। একবার এলাহাবাদের আদালতের নির্দেশে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনের ফলাফল বানচাল হয়ে গিয়েছিল, তিনি পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।

মিলন আর আমার জন্যে দেওয়া হলো একটি আলাদা বাতানুকূল গাড়ি। সেই গাড়িতে সোজা একেবারে বরিশাল। পথে অবশ্য কয়েকটি ফেরি পার হতে হয়েছিল, মাদারিপুরের পাশ দিয়ে যাবার সময় অনেককাল পরে দেখলুম আমার বাল্যকালের প্রিয় নদী আড়িয়ালখাঁ।

বরিশালে গিয়ে নির্বাচনের পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে বেশি সময় দেবার বদলে জীবনানন্দ দাশের বাড়ি দেখা, ধানসিড়ি নদীর অনুসন্ধানেই মেতে উঠেছিলুম বেশি। এই পর্বটি নিয়ে আমি অন্য একটি রচনা লিখেছি। সুতরাং এখানে আর পুনরুক্তি করতে চাই না।

ঢাকায় হোটেলে থাকার সময়, বরিশাল যাবার আগে ও পরে, নিরাপত্তার ঘেরাটোপের জন্য বাইরে বেরুনো হয়নি। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ করারও সুযোগ ঘটেনি। মিলনের সঙ্গেই কেটেছে অনেকটা সময়।

এই ধরনের সরকারি কাজে প্রচুর কাগজপত্র, ডোসিয়ের ফাইল, বুকলেট ইত্যাদি পেতে ও পড়তে হয়। সই করতে হয় অনেক জায়গায়। আমার মতে, প্রায় সবই অপ্রয়োজনীয়। সরকারি কাজে প্রচুর কাগজের অপচয় হয়। বলাই বাহুল্য, আমি অন্যের অগোচরে সে-সবকিছুই ফেলে দিই না পড়ে। পৃথিবীতে কত ভালো ভালো বই পড়া এখনো বাকি রয়ে গেছে। খামোখা সরকারি কাগজ পড়ে সময় নষ্ট করতে যাবো কেন?

মাঝে মাঝে দরজায় নক করে অতি সুদর্শন ছেলেমেয়েরা এইসব কাগজপত্র দিয়ে যায় কিংবা কিছুতে সই করায়। নির্বাচনের কাজেই অল্পস্থায়ী হিসেবে এদের নিয়োগ করা হয়েছে। তাদেরই একজন আমার চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল।

এরা সবাই এসে আমাকে সম্বোধন করে মিস্টার গঙ্গোপাধ্যায়। আমার গায়ে যেন ছ্যাঁকা লাগে। কলকাতায় কোনো বাঙালি আমাকে মিস্টার বললে দুই ধমক লাগাতুম। এখানে এরা সমস্ত বিদেশিকেই যেমন পদবি ধরে ইংরেজিতে সম্বোধন করে, আমার বেলাতেও সেই একই নিয়ম!

ঢাকা বিমানবন্দরে এর আগে একবার বেশ মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

এখানকার কাস্টমস ও ইমিগ্রেশান ফর্মের একদিকে থাকে ইংরেজি, অন্যদিকে বাংলা। স্বাভাবিকভাবেই আমি বাংলাতেই সবকিছু লিখে দিলুম। সংশ্লিষ্ট অফিসারটি কাগজটি উল্টে-পাল্টে দেখে বলে দিলেন, এটা তো চলবে না। আপনাকে ইংরিজিতে লিখতে হবে।

কেন?

বাংলায় লিখবে শুধু বাংলাদেশীরা। বিদেশিদের লিখতে হবে ইংরিজিতে। এটাই নিয়ম!

বাংলাদেশে এসে কারুর মুখে এই বিদেশি শব্দটা শুনলে এখনো আমার মর্মপীড়া হয়। এটা আমার দুর্বলতা অবশ্যই। এটাই তো বাস্তব সত্য।

কিন্তু বিদেশি হোক বা যে-ই হোক, বাংলা জানলে কেন বাংলায় লেখা যাবে না? ব্যাপারটা তো একই।

ধরা যাক ক্লিনটন সিলির কথা, যে জীবনানন্দ দাশের একটি চমৎকার জীবনী লিখেছে। অনেক মাস কাটিয়ে গেছে ঢাকা ও কলকাতায়, অনেক বাঙালি শিক্ষিত মানুষের চেয়েও তার বাংলাজ্ঞান বেশি। সে ঢাকায় এলে বাংলায় ফর্ম ভর্তি করতে পারবে না?

কী অদ্ভুত সরকারি নিয়ম! কিংবা কী অদ্ভুত সেই নিয়মের প্রয়োগ!

যাই হোক, এক সন্ধেবেলা দরজায় বেল শুনে আমি দেখি, এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটি ফাইল, সে আমাকে কিছু একটা সই করাতে চায়। এ-ও আমাকে মিস্টার গঙ্গোপাধ্যায় বলে সম্বোধন করেছে।

সই করতে করতে হঠাৎ আমার মনে হলো, এ-মেয়েটিকে কী আমি আগে দেখিনি? চেনা মনে হচ্ছে কেন?

ফাইলটা ধরে আছে তার যে-হাত, সেই হাতের আঙুল দুধে-আলতা রঙের। এবার ভালো করে দেখলুম তার মুখ।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, নীলোফার?

সে বললো, থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।

তারপর ফাইলটা নিয়ে হাঁটতে আরম্ভ করলো।

তবে কি আমার ভুল হলো? না মাত্র কয়েক মাস আগেই তো গিয়েছিল শান্তিনিকেতনে আমাদের বাড়িতে। এরকম একজন সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলার পরেও তাকে ভুলে যাবার মতন ভীমরতি আমার এখনো হয়নি!

তাহলে কি নীলোফার আমাকে চিনতে পারেনি?

আমার চেহারাটা মনে রাখবার মতন নয় ঠিকই। একটা ছাতার সঙ্গে অন্য একটা ছাতার যেমন তফাৎ বোঝা যায় না। সেইরকম অন্য হাজার মানুষের সঙ্গে আমার কোনো তফাৎ নেই। কিন্তু আমার নামটা তো ও দেখেছে।

ঠিক বিস্ময় নয়, খুবই অস্বস্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম দরজার কাছেই।

কয়েক মিনিট বাদেই লম্বা করিডোর দিয়ে হেঁটে এলো সেই মেয়েটি। আমার দিকে সে তাকালোও না।

এসব ক্ষেত্রে, মেয়েটিকে ডাকতে হলে এক্সকিউজ মি বলে কথা শুরু করতে হয়। কিন্তু এত রক্ত দিয়ে, কত অসহনীয় কষ্টের দিন অতিক্রম করে বাংলাদেশের মানুষ বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে আমি ইংরেজি বলতে যাবো কেন? তাহলে তো আমার তরফ থেকে বাংলা ভাষার অমর্যাদা করা হবে!

আমি স্পষ্ট করে ডাকলুম, নীলোফার, শোনো।

মেয়েটি থমকে দাঁড়ালো।

আমি বললুম, তুমি যদি যমজ বোন না হও, তাহলে তুমি নিশ্চয়ই নীলোফার। তুমি আমায় চিনতে পারছো না?

নীলোফার নতমুখে, ধীর গলায় বললো, বিদেশি অতিথিদের কারুর সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত কথা বলার নিয়ম নাই।

বিদেশিদের হোটেলের ঘরের মধ্যে গিয়ে দরজা বন্ধ করে কথাবার্তা বলার ব্যাপারে নিষেধ থাকতেই পারে। আমি তো ওকে ঘরের মধ্যে ডাকিনি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কোনো চেনা মানুষের সঙ্গে দু-একটা কথা বলায় কী আপত্তি থাকতে পারে? আমরা তো সভ্য মানুষ।

বলতে ইচ্ছে করে, এসব নিয়মের মুখে আমি লাথি মারি!

কিন্তু বলা তো যায় না! সবাই মনে করে, আমি এখন একজন প্রবীণ লেখক। সবসময়ে সহবৎ মেরে চলা উচিত।

আমি বললুম, ঠিক আছে!

এর পরবর্তী দুদিন নীলোফারকে আমি কয়েকবার দেখেছি দূর থেকে। সেও আমাকে চেনার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। আমিও আর কথা বলার চেষ্টা করিনি তার সঙ্গে।

কোনো সুন্দরী মেয়ে সম্পর্কে জীবনে আর কখনো আমি মনের মধ্যে এমন বিরক্তির ভাব পোষণ করিনি।

বরিশালে একজন তরুণ সরকারি অফিসার আমাকে যথারীতি মিস্টার গঙ্গোপাধ্যায় সম্বোধন করে সঙ্গে সঙ্গে ঘুরেছিল। আমরা উঠেছিলুম একটা সাধারণ হোটেলে, একদিন সন্ধেবেলা মিলন আর আমি নিভৃত আড্ডায় বসেছি, তারমধ্যে সেই ছেলেটি এসে পড়লো। কোনো কাজের ছুতোও নেই, এমনিই। একটু পরে সে বলেছিল, স্যার, এখন তো আর আমি সরকারি ডিউটিতে নেই, আপনাকে সুনীলদা বলতে পারি? আমিও কবিতা লিখি।

সে কবিতা লেখে এবং আমার লেখা-টেখাও কিছু পড়েছে। সেজন্যই তার আলাদা আবেগ ছিল। সে মিলনেরও খুব ভক্ত।

নীলোফার কবিতা লেখে না, আমার কোনো লেখাই সে সম্ভবত পড়েনি। তাই আমার সম্পর্কে তার আলাদা কোনো আবেগও নেই।

শুধু মনের মধ্যে একটা কৌতূহল খচখচ করছিল। শামীমের সঙ্গে এখনো কি নীলোফারের কোনো সম্পর্ক আছে? আনোয়ারা এখানে নেই, শামীমের গোঁয়ার ভাইটি জেলে। এখন নীলোফারের সঙ্গে শামীমের মেলামেশার কোনো বাধা থাকারই কথা নয়। যদি না মানসিক বাধা থাকে।

শান্তিনিকেতনে নীলোফার তার বিবেকের বাধার কথাই বলেছিল। কিন্তু বিবেকের সংকল্পও সবসময়ে অটল থাকে না। অনেক সময় বদলে যায়। বন্যায় কত বড় বড় মজবুত বাঁধ ভেঙে উড়ে যায়। বিবেকের বাঁধ সেই তুলনায় অনেক কমজোরি।

বিশেষত যদি শরীরের টান আসে।

কী জানি!

বীথি আর গাজী শাহাবুদ্দিনদের বাড়িতে প্রতিবারই যাই, সেখানে থেকেছিও কয়েকবার। এবার দেখা করাই হলো না। নিশ্চয়ই পরে ওরা খুব রাগারাগি করবে। ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে থেকে আমাকে হাজিরা দিতে হলো কয়েকটি সরকারি মিটিং আর পার্টিতে, কলকাতায় ফিরতেও হলো সেই দলের সঙ্গে।

এবারেও ফেরার সময় পতৌদি আমার পাশে।

অন্য সবাই বলাবলি করছে যে, বাংলাদেশের নির্বাচন এবার যথেষ্ট নিরপেক্ষভাবেই পরিচালিত হয়েছে, হিংসাত্মক ঘটনাও ঘটেছে কম। পতৌদির এসব ব্যাপারে যেন কোনো আগ্রহই নেই।

একবার তিনি আমাকে বললেন, বাংলাদেশ ইজ এ বিউটিফুল কান্ট্রি। আই ফেল্ট সো স্যাড ফর দিজ পিপ্ল!

এই বাক্যদুটির কোনো সরল ব্যাখ্যা হয় না। কী ভেবে উনি বললেন, আমি তার অর্থ জিজ্ঞেস করিনি।

হঠাৎ আমার মনে হলো, পতৌদি কি কখনো কাঁদেন? সব মানুষকেই

জীবনে কখনো-না-কখনো কাঁদতেই হয়। তখন কি ওঁর শুধু একচোখ দিয়ে জল পড়ে? ভাবলেই কেমন যেন শিরশির করে গা, একচোখ শুকনো, অন্য চোখে অশ্রুধারা!

প্লেনের মধ্যে দেখা হলো বটু আর কাজলের সঙ্গে। বটু অর্থাৎ মাহমুদুল হক, জীবন আমার বোন আর কালো বরফ নামে ওর দুটি উপন্যাস পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। বন্ধু-বান্ধব সবাই ওকে বটু বলেই ডাকে। আমি যেমন পূর্ববঙ্গে জন্মে, পালিত হয়েছি পশ্চিমবঙ্গে, বটুও জন্মেছে পশ্চিমবঙ্গে, এখন বাংলাদেশের মানুষ। বটুর কথা ও ভাষায় এখনো পশ্চিমবঙ্গের ছাপ স্পষ্ট। কাজল সেই তুলনায় একেবারে অবিমিশ্র বাঙাল। ওরা আসছে কলকাতায় বেড়াতে, সম্ভব হলে আজমির শরিফও ঘুরে আসবে। আমার ধারণা ছিল, বটুর তেমন ধর্মভাব নেই, ওর বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা শুনে মুগ্ধ হয়েছি। যারা সব বিষয় নিয়েই হাস্য পরিহাস করতে পারে, তাদের মধ্যে কি কোনো বিষয়ে গোঁড়ামি থাকা সম্ভব?

কলকাতা থেকে প্লেনে শিলিগুড়ি যেতে যতটা সময় লাগে, তার চেয়েও কম সময়ে ঢাকা থেকে পৌঁছোনো যায় কলকাতায়। কলকাতায় পৌঁছে আমি হয়ে গেলুম স্বদেশি, আর বটু হয়ে গেল বিদেশি। যদিও এই এয়ারপোর্ট থেকে খুব কাছেই বারাসাতে বটুর জন্ম। আমরা দাঁড়ালুম আলাদা লাইনে।

সুটকেস-উদ্ধারের জন্য আমরা যখন গোলচক্করে দাঁড়িয়েছি, তখন কাজল ফিসফিস করে বললো, সুনীলদা, শোনছেন তো, বীণা কী করছে?

বটু ধমক দিয়ে বললো, চুপ করো। সুনীলদা সবই জানে! বাংলাদেশের কোনো খবর কি সুনীলদার অজানা থাকে নাকি?

আমি বললুম, বীণা কে? আমি তো চিনি না।

বটু বললো, ইমতিয়াজকে তুমি চেনো না? ইমতিয়াজ, পাবলিশার, গতবছর তার বাড়িতে বিরাট পার্টি দিয়েছিল, তুমি ছিলে, আমিও ছিলাম, বেলাল, রফিক, সেখানে বীণা গান গাইলো, তোমার মনে নেই?

আমি বললুম, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, কিন্তু মেয়েটির নামটা খেয়াল নেই। কী করেছে বীণা?

বটু বললো, স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হলে যা হয়। আগে মেয়েরা এ চরম অবস্থায় পড়লে হয় আত্মহত্যা করতো, নাহয় অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে ভেগে যেত। এখন নতুন একটা ফ্যাশান হয়েছে। এখন আরব কান্ট্রিতে চাকরি করতে চলে যায়। গরিব ঘরের অসহায় বোকা-সোকা মেয়েরা আড়কাঠিদের পাল্লায় পড়ে চালান হয়ে যায়, বিক্রি হয়ে যায়, আর মাঝারি ঘরের বউরা নিজে থেকে গিয়ে ফাঁদে পড়ে। তাছাড়া বাজারে যে রটে গেছে, শামীমের বউ আনোয়ারা, ওদের তো তুমি ভালোই চেনো, সেই আনোয়ারা নাকি সউদি আরবে গিয়ে ভালো চাকরি পেয়ে অনেক টাকা রোজগার করছে!

কাজল চোখ বড় বড় করে বললো, দুই হাজার ডলার পাঠাইছে অর বড় বুইন নাসরিনরে!

আমি বললুম, সত্যি?

বটু বললো, সত্যি না মিথ্যে কে জানে? নাসরিনকে কেউ কি জিজ্ঞেস করতে গেছে? গুজবও হতে পারে। জানো তো, গুজব তৈরি করার ব্যাপারে বাঙালির ব্রেইন কত উর্বর!

আমি বললুম, যদি কথাটা সত্যি হয়, তাহলে তো আনোয়ারার খুব ভালো খবর বলতে হবে। দু হাজার ডলার মানে, সে বেশ ভালোই কাজ পেয়েছে, ভালো আছে!

কাজল বললো, আমিও তাইলে আরব দ্যাশে চলে যাবো। জানেন তো সুনীলদা, অর সাথে আমার যখন-তখন ঝগড়া হয়। এবার নিজে রোজগার করব।

বটু বললো, ঝগড়া? সে তো তুমি একাই করো। আমি কোনো কথা বলি? দুজনে একসঙ্গে না চ্যাঁচালে ঝগড়া হয়?

আমি বটুর পিঠে চাপড় মেরে বললুম, শোনো শোনো, একটু-আধটু ঝগড়া করতে শেখো। মাঝে মাঝে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া না হলে প্রেমও টেকে না। ঝগড়ার পর ভাব, নিমপাতার ঝোলের পর পায়েসের মতন!

বটু হঠাৎ হাসতে শুরু করে দিল। এমনই জোরে জোরে হাসি যে, আশেপাশের লোক তাকালো তার দিকে।

কাজল তার মুখে হাতচাপা দেবার চেষ্টা করে ফিসফিস করে বললো, এই, এই, পাগল হইলা নাকি?

বটু হা-হা করতে করতেই বললো, সুনীলদা আর স্বাতীদি ঝগড়া করছে। এই দৃশ্যটা ভাবতেই আমার… স্বাতীদি… হা-হা-হা।

মালপত্র এসে গেছে। বাইরে এসে আমরা আলাদা ট্যাক্সিতে।

আমার মনটা বেশ খুশি খুশি হয়ে উঠলো।

হঠাৎই একটা সুসংবাদ পাওয়া গেল আনোয়ারা সম্পর্কে। সে যথেষ্ট টাকা উপার্জন করে তার বোনকে কিছু পাঠাচ্ছে।

কিন্তু সে একটা চিঠি লেখে না কেন আমাদের? সউদি আরব থেকে কি চিঠি লেখা নিষেধ?

বাড়িতে এসে স্বাতীকে খবরটা দিতেই সে বললো, আমি জানতুম, আমি মনে মনে ঠিক জানতুম, আনোয়ারার কোনো বিপদ হতে পারে না। ওর মতন এমন সৎ আর তেজী মেয়ে…। যারা অন্যায় করে, তারাও খাঁটি সৎ মানুষদের ভয় পায়।

এ-বক্তব্য অবশ্য আমার পক্ষে মেনে নেওয়া শক্ত।

পৃথিবীতে অন্যায়কারীর সংখ্যা কম, সৎ মানুষই বেশি। তবু যে- কোনো যুদ্ধ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামায় সৎ আর সাধারণ মানুষদেরই তো প্রাণ যায়!

পরদিন গেলুম আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে।

মা থাকেন বাগুইহাটিতে। তাঁর নিজস্ব বাড়িতে, একা। ঠিক একা নন, কাছেই এক বাড়িতে থাকে আমার মেজভাইরা। আর আমার মায়ের বাড়ির পাশাপাশি বাড়িগুলোতে থাকেন আমার কয়েক মামা, মাসিমা আর মাসি, পিসিরা। অর্থাৎ একটা ছোটখাটো ফরিদপুর কলোনি বলা যায়।

আমার মায়ের বাপের বাড়ি বরিশালে। যদিও তিনি সেখানে কখনো যাননি। মায়ের বিয়ের আগের বছরগুলো কেটেছে তাঁর মামাবাড়ি আমগ্রামে।

আমি বাংলাদেশ ঘুরে এলেই মামা-মামি-মাসি-পিসিরা ভিড় করে মায়ের ঘরে চলে আসে গল্প শুনতে। এঁদের সকলেরই জন্ম পূর্ববাংলায়, দেশভাগের পর আর কখনো যাওয়া হয়নি ওদিকে। কিন্তু     স্মৃতিতে ওখানকার মানুষজন, গাছপালা, পুকুর, এমনকি আকাশ পর্যন্ত জীবন্ত!

ওঁদের ছেলেবেলায় ওইসব অঞ্চলে পাকারাস্তা প্রায় ছিলই না, নৌকোই ছিল প্রধান ভরসা। আমি নিজেও বাল্যকালে কলকাতা থেকে দেশের বাড়িতে যাবার সময় প্রথমে ট্রেনে খুলনা, তারপর স্টিমারে চরমুগুরিয়া, সেখান থেকে নৌকোয় একেবারে মামাবাড়ির ঘাটে। অন্য গাড়ি-টাড়ির কোনো ব্যাপারই ছিল না।

এবার আমি সরাসরি ঢাকা থেকে গাড়ি চেপে, মাদারিপুরের পাশ দিয়ে, আড়িয়ালখাঁ পেরিয়ে ঢাকা পৌঁছে গেছি শুনে বিস্ময়ে সেই বুড়িদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়!

বিশেষত বরিশাল ছিল নদী-নালা-পরিবৃত স্থান, স্টিমার বা নৌকো ছাড়া পৌঁছোবার উপায় ছিল না। সেই বরিশালে আমি গেছি গাড়িতে? সত্যি?

শুনতে শুনতে সেই বুড়িদের চোখে যেন ঘোর নেমে আসে। যেন তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন, তাঁদের বাল্যের সেই জল-কাদার দেশ যেন এখন স্বর্গভূমির মতন? কিন্তু একবার তা স্বচক্ষে দেখে আসা আর তাঁদের ভাগ্যে নেই। এক পিসি তাঁর পুরনো স্নেহমাখা হাত আমার গায়ে বুলোতে লাগলেন। যেন আমাকে ছুঁয়েই তিনি তাঁর জন্মভূমির বাতাসের স্পর্শ নিতে চান। (ক্রমশ)