চামড়া

অনুবাদ : সালেহা চৌধুরী

১৯৪৬ সালে দীর্ঘদিন শীত ছিল। এপ্রিল মাসে বড় রাস্তায় হিম ঝড়ো বাতাস বয়ে গেল। বাতাস বইলো প্রবল ও কঠিন গতিতে। বরফের মেঘ মাথার উপর। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত।

ড্রিওলি নামের একজন মানুষ আস্তে আস্তে রুডি বিভলির রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। করুণ শীতার্ত  অস্তিত্ব¡। শজারুর মতো লাগছে তার লম্বা কোট। কলার তোলা কোটের ফাঁকে তার দুটি চোখ আর কপাল লক্ষ করা যায়। একটি রেস্তোরাঁর দরজা খুলে গেল। রোস্ট চিকেনের উপাদেয় গন্ধ তাকে বিবশ করে ফেলেছে। ক্ষুধায় ওর পাকস্থলী তোলপাড় করছে। দোকানের কোনো জিনিসই সে তাকিয়ে দেখছে না। সাজানো দোকানে নানা সামগ্রী। পারফিউম, সিল্ক সার্ট, টাই, মণিমুক্তো, হীরে, চিনেমাটির জিনিস, বাঁধানো বই। একটি ছবির গ্যালারি রাস্তায়। ছবির গ্যালারির প্রতি ড্রিওলির আকর্ষণ বরাবর। গ্যালারির জানালায় একটিমাত্র ছবি। ও দাঁড়াল ছবি দেখতে। যেতে যেতে আবার ফিরে আসে। ছবি দেখতে দেখতে কেমন এক অস্বস্তি পেয়ে বসে তাকে। সে থেমে অনেকক্ষণ ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। আর দেখতে দেখতেই মনে পড়ে যায় একটি ঘটনা। অনেককাল আগের স্মৃতি। কোনো এক দৃশ্য ভাবছে সে, কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছে না। মনে করতে পারছে না কোথায় দেখেছে সে-দৃশ্য। সে আবার তাকায়। এ-প্রকৃতির ছবি। পাশাপাশি একসারি বৃক্ষ। হঠাৎ ঝড় বয়ে যাওয়া বিপর্যস্ত দৃশ্য। বৃক্ষসারির চারপাশে আকাশ। ছিন্নভিন্ন মেঘ। ছবিটিতে একটি ছোট স্টিকার লাগানো ‘চেমসুতে’ (১৮৯৪-১৯৪৪)।

ড্রিওলি বড় বড় চোখে তাকিয়ে। মনের মধ্যে এক আশ্চর্য ভাবনা। বোধহয় এ-ছবি তার পরিচিত। কোনো এক পাগলের আঁকা পাগলা ছবি। কিন্তু ছবিটি ওর ভালো লাগছিল। চেমসুতে চেমসুতে বলতে বলতেই বলে সে – হায় ঈশ্বর! এই বলে হঠাৎ সে চিৎকার করে ওঠে। সেই আমার ছোট্ট মানুষ কালমাক। ওর ছবি আজ প্যারিসের বিখ্যাত গ্যালারিতে। কী অভাবনীয় ঘটনা! কী অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

বুড়ো মানুষটি জানালার আরো কাছে সরে আসে। মনে পড়ছে সেই কালমাক নামের ছেলেটিকে। খুব মনে পড়ছে।

– কখন দেখেছিলাম তাকে? ঠিক কখন? অনেক অনেকদিন আগে না? বিশ বছর? না, তার চেয়েও বেশি। তিরিশ বছর আগে না? হ্যাঁ, এক মুহূর্ত কী ভাবল সে। যুদ্ধের আগের বছর। ১৯১৩ সালের আগের বছর। চেমসুতে। সেই অসুন্দর কালমাক। হঠাৎ মন বিষণ্ন করে তোলে। অসংখ্য অভিযোগ করবার সেই ছেলেটি। আসলে ড্রিওলি ভালোবেসেছিল সোঁতেকে। ভীষণ ভালোবেসেছিল। কারণ সোঁতে শিল্পী। সে ছবি আঁকতে পারত। কেমন ছবি আঁকত সে? মনে পড়েছে স্পষ্টভাবে। মনে পড়ছে আনুষঙ্গিক আরো অনেক কিছু। রাস্তা, রাস্তার পাশের আবর্জনার ¯তূপ। বিশ্রী পচা গন্ধ। বাদামি বেড়ালের সাবধানে পা ভাঙা। আর ওই সব ঘামে-ভেজা মেয়েমানুষের দল। বাড়ির দরজার সামনে খদ্দের ধরবার জন্য বসে থাকে। পাথুরে রাস্তায় দুপা মেলে। কোন রাস্তা? কোন রাস্তায় এই সোঁতে থাকত? ফালগিয়েতে না? বুড়োমানুষ বারবার মাথা ঝাঁকায়। মনে পড়ছে সবকিছু। ছবি আঁকার সেই ছোট্ট স্টুডিও, যেখানে মাত্র একটি চেয়ার পাতা। সেই জঘন্য লাল সোফা। ছেলেটি ওই সোফাতেই ঘুমোত না? মাতাল, ভয়ংকর, সবকিছু কেমন গোঁমড়ামুখো, বিমর্ষ। একটি ঘটনার পর আরেকটি ঘটনা মনে পড়ছে তার। মনে পড়ছে ননসেন্স ‘টাটু আঁকার ঘটনা’। ভীষণ এক পাগলামির গল্প আছে এই টাটুকে ঘিরে। একদিন কিছু টাকা হয়েছিল ড্রিওলির। সে কয়েক বোতল ওয়াইন কিনে সোঁতের স্টুডিওতে প্রবেশ করেছিল। সোঁতে ড্রিওলির স্ত্রীকে মডেল বানিয়ে সেদিন ছবি আঁকছিল। – আজ আমরা উদযাপন করব, ড্রিওলি বলেছিল। আমরা তিনজন মিলে উদযাপন করব।

– কী উদযাপন করব? জিজ্ঞাসা করেছিল সোঁতে। তারপর হেসে বলেছিল – তুমি কি তোমার স্ত্রীকে তালাক দিতে যাচ্ছো? যাতে আমি ওকে বিয়ে করতে পারি?

– অবশ্যই না। উত্তর দিয়েছিল ড্রিওলি। উদ্যাপন অন্য কারণে। হঠাৎ কিছু টাকা পেয়েছি আজ। আমার অপ্রত্যাশিত মজুরি।

– আমি যে কিছু উপার্জন করতে পারিনি তারো উদ্যাপন হোক। এই বলে ড্রিওলি পার্সেল খুলছিল। দ্রুত হাতে ওয়াইনের বোতল।

– নয়জন মক্কেল নিয়ে আজ আমার কারবার হয়েছে। ওরা সকলেই ভালো লোক। ভালো না হলে মুশকিল হতো। নয়জন মাতাল সৈনিক, বুঝতেই পারছ। এর মধ্যে সাতজন ক্যাশ পয়সা দিয়েছে। আর তাতেই আমার অবস্থা আরো ভালো। কিন্তু কাজ করতে করতে চোখ-দুটো বড় ক্লান্ত। ড্রিওলি চোখ খোলে। আবার বন্ধ করে ক্লান্তিতে। চোখের মণির চারপাশ করুণ লাগছে। বেদনার কালো ছায়া। পার্সেল খুলতেই ঝকঝকে তিন বোতল মদ চোখে পড়ল। একটি নিজের, একটি ওর স্ত্রীর আর একটি সোঁতের। কর্কস্ক্রুতে বোতল খুলছিল সে। সোঁতে ব্রাশ নামিয়ে রাখে। – এখন কী করে কাজ করি?

ড্রিওলি আর ওর বউ এগিয়ে এল ছবি দেখতে। ড্রিওলির এক হাতে বোতল আর অন্যহাতে গ্লাস। – না। ছেলেটি হঠাৎ জ্বলে ওঠে আগুনের মতো। এই বলে ছবির ক্যানভাসটি কেড়ে নিয়ে দেয়ালে উলটো করে রেখে দিল। কিন্তু ড্রিওলি ছবি দেখছে। সে-প্রতিবাদ শোনেনি। বলে ড্রিওলি আমার ভালো লাগছে।

– পচা ছবি। বলল সোঁতে।

– চমৎকার। আর সব ছবির মতোই চমৎকার। তোমার সব ছবিই আমার ভালো লাগে।

– গোলমাল ওখানেই। ভালো হলেই ছবিগুলো আমি খেতে পারি না।

– তবু ওগুলো চমৎকার ছবি। ড্রিওলি ওকে এক গ্লাস ওয়াইন ঢেলে দিল। – পান করো। ভালো লাগবে পান করলে।

এই পৃথবীতে আজ পর্যন্ত সোঁতের চাইতে আর অসুখী মানুষ দেখেনি ড্রিওলি। সাতমাস আগে এক ক্যাফেতে দেখেছিল ছেলেটিকে। বড় নিঃসঙ্গ বসবার ভঙ্গি। ড্রিওলি খুব কাছে বসে প্রশ্ন করেছিল, তুমি কি রাশিয়ার মানুষ?

– হ্যাঁ।

– রাশিয়ার কোন অঞ্চল থেকে এসেছ?

– মিনশফ।

ড্রিওলি লাফিয়ে উঠে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। আসলে সে-ও ওই শহরে জন্মগ্রহণ করেছে।

– ঠিক মিনশফ নয়, মিনশফের কাছাকাছি।

– ঠিক কোথায়?

– মিলোভিচি। মিনশফ থেকে বারো মাইল দূরে।

– মিলোভিচি? ড্রিওলি আবার উচ্চ চিৎকারে ওকে জড়িয়ে ধরে। বলে, ওই রাস্তা দিয়ে আমি কতবার বালক-বয়সে যাতায়াত করেছিলাম। তারপর সোঁতের খুব কাছে বসে স্নেহ-ভালোবাসায় তাকিয়ে দেখে। বলে, জানো তোমাকে পশ্চিম রাশিয়ার মানুষ মনে হয় না। তোমাকে লাগে টারটার না হলে কালমাকের মতো।

এখন এই ছবির আঁকিয়ে সোঁতেকে ঠিক তেমনি ভালোবাসায় তাকিয়ে দেখছে। আসলে সোঁতের মুখ কালমাকের মতো। প্রশস্ত মুখ, গালের হাড় দৃশ্যমান।বড় নাক। আর এই মুখের সঙ্গে মানিয়ে গেছে বড় বড় খাড়া কান। চোখদুটি তত বড় নয়। কালো চুল। মোটা ফোলা ঠোঁট। কিন্তু হাতদুটি অসামান্য। মেয়েদের হাতের মতো মসৃণ। ছোটো গোলালো আঙুল।

– আমাকে আরো মদ দাও। উদ্যাপন করতে চাইলে ভালোমতোই উদ্যাপিত হোক সবকিছু। ড্রিওলি মদ বিতরণের পর চেয়ারে বসেছে। সোঁতে ড্রিওলির স্ত্রীর সঙ্গে সোফাতে। সামনের মেঝেতে তিন বোতল মদ। ‘যতক্ষণ সম্ভব পান করে যাবো। আমি আজ ধনী। এবারে বাইরে যাবো আর কয় বোতল মদ আনব।’

– আরো ছয় বোতল। এক এক জনের জন্য দুই বোতল।

– আমি যাচ্ছি আনতে।

– আমিও যাচ্ছি তোমার সঙ্গে। কাছের দোকান থেকে আরো ছয় বোতল মদ কিনল ড্রিওলি। মেঝেতে দুই সারিতে বোতলগুলো সাজাল। ড্রিওলি কর্কস্ক্রুতে সেগুলোর ছিপি খুলল। তারপর একের পর এক বোতল শূন্য করবার পালা। – আসলে খুব বড়লোকেরা এভাবেই উদযাপন করে।

– সত্যি কথা বলছ তুমি। সত্যি কথা, তাই না জোশি?

– অবশ্যই সত্যি, জোশি জানায়।

– কেমন লাগছে তোমার?

– ভালো।

– তুমি ড্রিওলিকে ছেড়ে আমাকে বিয়ে করবে?

– না।

– চমৎকার মদ, ড্রিওলি জানায়। ভাগ্য ভালো হলেই মানুষ এমন মদ পান করতে পারে।

অতঃপর এক বিশেষ পরিকল্পনা করে ওরা মাতাল হলো। আর মাতলামিতে এক ধরনের গাম্ভীর্য ধরে রাখা ছিল। কতসব কথাবার্তা। কতসব বিষয়। বারবার নানাসব পছন্দসই বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি। আবার কখনো মদের প্রতিক্রিয়ায় ঋষির মতো সমাহিত, ভাসছে এক অপার্থিব জগতে, পা আপাতত ভূমি স্পর্শ করবে না। আর এমন অবস্থাকেই বোধকরি মদ্যপানের শ্রেষ্ঠ সময় বলা হয়ে থাকে। ড্রিওলি ভাবছে, আসলে আমরা কি পাগল? না হলে এভাবে মাটিতে শুয়ে আছি কেন? সবকিছু থেকে আমরা কত দূরে?

তারপর ড্রিওলি আলো জ্বালায়। হাঁটতে গিয়ে একটু অবাক লাগল। পা-দুটি তো ঠিকই সঙ্গে সঙ্গে আসছে আর ভূমি স্পর্শ করছে। হাঁটতে পারাটাই এক মধুর অভিজ্ঞতা। সারা ঘরে ঘুরতে লাগল ড্রিওলি। দেয়ালে খাড়া করে রাখা ক্যানভাসটি তুলে নিল। – শোনো। বলল সে ধীরে। – আমার মাথায় এক বুদ্ধি এসেছে। সে এসে দাঁড়াল সোঁতের সামনে। বলল, মন দিয়ে আমার কথা শোনো ছোট মানুষ কালমাক।

– কী শুনব?

– আমার মাথায় এক অভাবনীয় ধারণা খেলা করছে। তুমি কি আমার কথা শুনবে?

– আমি জোশির কথা শুনছি, জানায় সোঁতে।

– এবারে আমার কথা শোনো। তুমি আমার বন্ধু। আমার অসুন্দর ছোট মানুষ কালমাক সোঁতে। তুমি ও আমি দুজনেই মিনশফের অধিবাসী। তোমার মতো সাধারণ শিল্পীর আঁকা একটি ছবি আমার চাই। একটি অনবদ্য, অনন্য সাধারণ ছবি।

– ওই তো কিছু ছবি স্ট্যাক করা আছে। ওখান থেকে বেছে যেটি ভালো মনে হয় নাও, কিন্তু আমাকে বিরক্ত করো না। দেখছ না আমি জোশির সঙ্গে কথা বলছি।

– এবারে আমার কথা শোনো কালমাক। আমি এমন একটি ছবি চাই যা সারাক্ষণ আমার সঙ্গে থাকবে। যেখানেই আমি যাই না কেন ছবিটি আমার সঙ্গে যাবে। আমার দেহের সঙ্গে সারাক্ষণ লেগে রইবে, এমন কোনো ছবি চাই।

ড্রিওলি একটু এগিয়ে এসে সোঁতের হাঁটু নাড়া দেয়। বলে, মনোযোগ দিয়ে শোনো কালমাক।

– শোনো না ওর কথা, জোশি বলে।

– কথা হলো, তুমি একটি ছবি আমার চামড়াতে আঁকবে। আমার শরীরে। তারপর সে-ছবির উপর টাটু করবে। তাহলে সারাক্ষণই সে-ছবি আমার শরীরে থাকবে।

– কী উন্মাদের মতো কথা বলছ তুমি!

– আমি শেখাব কী করে টাটু করতে হয়। একজন শিশুও পারে টাটু করতে।

– আমি শিশু নই।

– আরে বাবা আগে অনুগ্রহ করে আমার কথাই শোনো না।

– তুমি এক ভীষণ পাগল মানুষ ড্রিওলি। আসলে কী চাও তুমি ঠিক করে বলো।

– আসলে আমি যা চাই তুমি অনায়াসেই তা করতে পারো। কিচ্ছু অসুবিধা হবে না তোমার।

– টাটু করতে হবে এই তো বলছ?

– হ্যাঁ, টাটু। দুই মিনিটে আমি তা তোমাকে শেখাব।

– অসম্ভব।

– তুমি কি মনে করছ আমি মাতলামির ঘোরে না জেনেশুনে এগুলো বলছি। সোঁতে বলে, ঠিক তা না।

– টাটু সম্পর্কে কেউ যদি কিছু জানে সে ড্রিওলি। গতমাসে একজনের পেট সম্পূর্ণভাবে ফুলপাতায় টাটু করেছিলাম। আর একজনের বুক-ভর্তি লোমের ভেতর এমন এক টাটু করেছিলাম ওকে মনে হচ্ছিল ভাল্লুক। একজনের হাতের মাসলে মেয়ের মুখ। ও হাত লম্বা করতেই সে-টাটুর মেয়ে কত যে ভাবভঙ্গি করত তা বলে শেষ করা যাবে না।

– আমি জানি এখন তুমি মাতাল। এবং তোমার মাথায় মাতালের বুদ্ধি ছাড়া আর কিছু নেই সোঁতে।

– জোশি মডেল হবে। আমার পিঠে তুমি জোশির ছবি আঁকবে। আমি কি আমার স্ত্রীর ছবি আমার পিঠে আঁকতে পারি না?

– জোশির ছবি?

– হ্যাঁ, জোশির ছবি, বলে ড্রিওলি। ড্রিওলি জানে কোন নামে সোঁতেকে রাজি করানো কঠিন হবে না।

– আমার টাটু করতে হবে না, বলে জোশি।

– আমার ডার্লিং জোশি কথা শোনো। আগে এই বোতল শেষ করো তারপর মতামত দিও। ওটুকু খেলে তোমার মনোভাব বদলাবে এ-ই আমার ধারণা। এ আমার এক শখ বলতে পারো। জীবনে এমন কোনো শখ আগে হয়নি। বলতে পারো এ-আমার এক বিশেষ চিন্তা।

– কী বিশেষ চিন্তা? জোশি প্রশ্ন করে।

– হ্যাঁ, তোমার বিবসনা শরীর। এ-এক দারুণ ব্যাপার হবে।

– বিবসনা নয়, জোশি জানায়।

– এ-এক অসাধারণ ভাবনা। যে-ভাবনাকে আমরা এ-মুহূর্তে উদ্যাপন করতে পারি।

আরেক বোতল মদ শেষ হলো। সোঁতে বলে, আমি কী করে টাটুর কাজ করব? আগে করিনি। তবে আমি ছবি এঁকে দিতে পারি। যতদিন গোসল না করছ ও-ছবি তোমার পিঠে থাকবে। যদি সারাজীবন গোসল না করো সারাজীবনই থাকবে।

– না, ছবি নয়, ড্রিওলি কঠিনভাবে বলে।

– যতদিন গোসল না করছ আমি বুঝব আমার ছবির মূল্য দিতেই তুমি গোসল না করে আছো। বুঝতে পারব আমার ছবি-সম্বন্ধে তোমার শ্রদ্ধা-ভক্তির পরিমাণ।

– আমার কিন্তু ভালোই মনে হচ্ছে এ-অসাধারণ চিন্তা।

তবে সারাজীবন গোসল করছ না এ-ভাবনা

অস্বস্তিকর। ঠিক আছে টাটুই হোক। তবে বিবসনা নয়।

– তাহলে চুল-ভর্তি মাথা আর মুখ, ড্রিওলি বলে।

– এ আমি সামলাতে পারব না, সোঁতে বলে। কঠিন কাজ।

– এ-ভীষণ সহজ কাজ। দু-মিনিটে শেখাচ্ছি তোমাকে। দেখো না তুমি কী সহজ কাজ এ। আমি চললাম জিনিসপত্র কিনতে। কী কী লাগবে টাটু করতে সেইসব। কালি আর সুচ। অনেকরকম কালি আছে যা তুমি চাও। আর অনেক রকম সুচ।

– অসম্ভব। সোঁতে আবার বলে ওঠে।

– অনেকরকম কালি আছে তাই না জোশি, আর অনেকরকম সুচ।

– হ্যাঁ, তা আছে, জোশি জানায়।

– তোমরা থাকো আমি চললাম কালি আর সুচ কিনতে।

চেয়ার থেকে উঠে বাইরে গেল ড্রিওলি – কঠিন সংকল্পে।

আধঘণ্টা পর ড্রিওলি একা ফিরে এলো। – সবকিছু এনেছি আমি। চিৎকার করে বলল। বাতাসে তুলে ধরল এক বাদামি সুটকেস। – টাটু আঁকিয়েদের কী কী লাগে সব আমার কাছে আছে। ব্যাগটি টেবিলে রাখে ড্রিওলি। ব্যাগ খুলে ইলেকট্রিক সুই আর কালি বের করে। প্লাগ করে সুই।

মৌমাছির মতো শব্দ উঠল এরপর। আর সুচ উঁচুনিচু ভঙ্গিতে টাটু করতে শুরু করেছে। জ্যাকেট খুলল, জামা খুলল ড্রিওলি। – আমাকে দেখো সোঁতে তাহলে বুঝতে পারবে কাজটি কত সহজ। নিজের নগ্ন হাতে টাটু আঁকতে শুরু করল। প্রথমে কালির রং বেছে নাও। তারপর সুচের আগা কালিতে ডোবাও। সুচ খাড়া করে ধরো। তারপর হালকাভাবে নকশার উপর সুচ ঘোরাতে থাকো। সুচ থেকে কালি এসে প্যাটার্ন বানাবে। এই তো ব্যাপার। দেখো আমি কীভাবে তোমার হাতের উপর গ্রেহাউন্ডের ছবি আঁকছি। সোঁতে এবার ভয়ংকর কৌতূহলী হয়ে উঠছে। বলে, আচ্ছা এবার আমাকে সুচ ও কালি দাও গ্রেহাউন্ডের ছবি আঁকতে। মৌমাছির মতো শব্দ উঠল। ড্রিওলির হাতে ফুটে উঠতে লাগল গ্রেহাউন্ডের ছবি।

– আরে এ-তো দারুণ মজার। মনে হচ্ছে কালিকলম দিয়ে ছবি আঁকার মতো মজার আর সহজ। তবে আঁকতে সময় লাগে এ-ই যা।

– এছাড়া আর কোনো কিছু শেখার নেই। বলে ড্রিওলি। – তাহলে আমরা কি শুরু করব এখুনি?

– মডেল জোশি, এবার তুমি এসে দাঁড়াও সামনে। উৎসাহে ছুটোছুটি করছে ড্রিওলি। সারাঘরে এদিক-সেদিক থেকে সব এনে সামনে রাখে। যেন এবার এক মজার খেলা শুরু হবে। – ও দাঁড়াবে কোথায় সোঁতে, ড্রিওলি বলে।

– ওখানে দাঁড়াতে বলো, ড্রেসিং টেবিলের পাশে। বলো ওকে চুল ব্রাশ করবার পোজ দিতে। ওর কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো চুল ব্রাশ করছে এমন ছবি আঁকব আমি।

– চমৎকার। তুমি আসলে জিনিয়াস।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও জোশি ড্রেসিং টেবিলের সামনে পোজ দিয়ে দাঁড়ায়। হাতে ধরা একগ্লাস মদ। ড্রিওলি সার্ট খুলল এবং ট্রাউজার পা পর্যন্ত গোটাল। আন্ডারপ্যান্ট, জুতো আর মোজা এ-ই ছিল তার পরনে। সে উত্তেজনায় দুলছে এপাশ থেকে ওপাশ। তার শরীর ছোট, সাদা আর লোমবিহীন। – আমি তোমার ক্যানভাস। বলো, এই ক্যানভাসকে তুমি কোথায় চাও।

– কোথায় আবার ইজেলে! ইজেলের উপর যেখানে ক্যানভাস থাকে।

– পাগল নাকি! আমি ইজেলের উপর বসব মানে?

– তুমি ক্যানভাস। ইজেল না-তো কোথায় বসবে?

– কীভাবে?

– তুমি ক্যানভাস ঠিক কিনা?

– অবশ্যই এ-মুহূর্তে আমি ক্যানভাস ছাড়া আর কিছু না।

– তাহলে ইজেলে বসো। অসুবিধা কী?

– সোঁতে, এ কী করে সম্ভব আমি ক্যানভাসে বসব?

– তাহলে চেয়ারে বসো। পিঠ সামনে রেখে বসো। তাহলে তোমার মাতাল মাথা চেয়ারে রাখতে পারবে। তাড়াতাড়ি বসে পড়ো। আমি শুরু করতে যাচ্ছি।

– আমি রেডি। আমি তোমার আঁকার অপেক্ষা করছি।

– প্রথমে ছবি আঁকব। তারপর ছবি যদি পছন্দ হয় তার উপর টাটু আঁকব। একটি প্রশস্ত ব্রাশে ড্রিওলির পিঠের উপর ছবি করতে লাগল সোঁতে।

– আরে আরে মনে হচ্ছে একটি একটি বড় দৈত্যের মতো বিচ্ছু আমার পিঠে চলাফেরা করছে।

– শান্ত হয়ে বসো। শান্ত হও। এত ছটফট করো না। সোঁতে দ্রুত কাজ করছে। নীলের মিলে ছবি এঁকে চলেছে সে। যেন পরে টাটু করতে গিয়ে কোনো অসুবিধা না হয়। মাতলামির বিন্দু-বিসর্গ ওর অস্তিত্বে নেই।

আধঘণ্টায় দ্রুত ব্রাশ চালিয়ে ছবি শেষ করে সোঁতে।

– নাও ছবি শেষ। তোমার কাজ শেষ হলো জোশি। এ-কথা শুনবার সঙ্গে সঙ্গে জোশি কাউচে শুয়ে গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে।

ড্রিওলি জেগে আছে। দেখল, ছেলেটি সুচ ডোবাল নীল কালিতে। সারা পিঠে তীব্র সুঁচের সূচ্যগ্র বেদনা। ব্যথা মোটেই সুখপ্রদ নয়। কিন্তু অসহনীয়ও নয়। কিন্তু এই সূচ্যগ্র ব্যথা ওকে ঘুম থেকে জাগিয়ে রাখে। ড্রিওলি দেখে সুচ ও কালির সুনিপুণ ব্যবহার। ভাবছে মনে মনে, কী আঁকছে ড্রিওলি। কী টাটু করছে এই ক্ষুদে কালমাক। গভীর মনোযোগে এবং তীব্র আগ্রহে ছেলেটি কাজ করে চলেছে। একটি সুচের মেশিন কী অসাধারণ সাধন করতে পারে সেই ছবি দেখছে ও।

সকালের আলো ফুটছে, কিন্তু সুচযন্ত্রের মৌমাছির মতো শব্দ থামছে না। সোঁতে আপনমনে কাজ করছে। ড্রিওলির আজও স্পষ্ট মনে আছে যখন ও বলল কাজ শেষ। চারপাশে সকালের পরিচ্ছন্ন আলো। রাস্তায় লোক-চলাচল শেষ হয়েছে।

– আমি দেখতে চাই, ড্রিওলি বলে। সোঁতে পেছনে আয়না ধরে। ড্রিওলি সে-আয়নায় পিঠ দেখতে চেষ্টা করে।

– গড, জেসাস ক্রাইস্ট, হে আমার পরম পিতা, এ কী কাণ্ড! এই বলে ড্রিওলি চিৎকার করে ওঠে। বিস্ময়কর এই ছবি! ওর সম্পূর্ণ পিঠ শুরু থেকে শেষ। ঘাড়ের কাছ থেকে কোমর পর্যন্ত। পিঠের এপাশ থেকে ওপাশ একেবারে আগুন বরণ। সোনালি, নীল, লাল, বেগুনি, কালোর মিশ্রণে এক অবিশ্বাস্য ছবি। খুব গভীরভাবে একটি টাটু করা মুখ পিঠে বসে আছে। যে-ছবি সে এঁকেছিল ব্রাশে, সেইটি। আর মেরুদণ্ডের রেখাকে এত চমৎকারভাবে আর কে ব্যবহার করতে পেরেছে। এছাড়াও আর নানা বৈশিষ্ট্যে ছবিটি পরিপূর্ণ। এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ছবিতে প্রাণ পেয়েছে। ছবিটি জীবন্ত। আর সব ছবিতে সোঁতে যেভাবে ভাঙেচুরে তেমনি রেখার টান এই ছবিতে। ভাঙাচুরা, তীক্ষè, দোমড়ানো ভঙ্গি সোঁতের ছবির আপন স্টাইল। এ-এক বিশেষ মুড বা ভাবের ছবি। জোশির মুখ এখানে ক্যামেরার ফটোর মতো নয়। মুখ ছন্দময়, আলোছায়ায় অপরূপ। গোছা গোছা চুল সবুজ লতানো ডালের মতো চারপাশে ঝুলছে।

– অভাবনীয়, অসাধারণ, ড্রিওলি বলে।

– আমারও ভীষণ ভালো লাগছে, সোঁতে বলে। বলে, এই ছবিটিতে আমার সই থাকা প্রয়োজন। আর একবার তুলে নেয় সুচ ফোটানো-যন্ত্র। নিজের নাম লাল কালিতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখে। তা টাটু করে সই হয়ে যায়। ড্রিওলির কিডনি যেখানে ঠিক তার উপর।

মোহাবিষ্টের মতো জানালায় দাঁড়িয়ে ছবি দেখছে ড্রিওলি। এই রাস্তায় দীর্ঘদিন পরে আবার সে সোঁতের ছবি দেখতে পায়। মনে হয় এই জন্মে নয়, ঠিক আগের জন্মে ও সোঁতেকে জানত। যুদ্ধফেরত ড্রিওলি প্রশ্ন করেছিল জোশিকে। – আমার সেই আর্টিস্ট সোঁতে, গেল কোথায় সে?

– চলে গেছে, জোশি উত্তর দিয়েছিল। জানি না কোথায়। কিন্তু শুনেছি এক আর্টডিলার ওকে সেরেটে পাঠিয়েছিল। আরো ছবি আঁকবার জন্য।

– হয়তো ও আবার ফিরে আসবে।

– হয়তো, বলেছিল জোশি।

এরপর সোঁতেকে নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন উত্থাপন হয়নি বাড়িতে। তারপর ওরা চলে আসে লিহার্ভে। ওখানে জমজমাট ব্যবসা শুরু করেছিল ড্রিওলি। আজকের বৃদ্ধ ড্রিওলি সেই জমজমাট ব্যবসার স্মৃতিতে আপন মনে হাসে। ওই ছিল তাদের জীবনের সবচাইতে ভালো সময়। দুই যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়। ডকের পাশে ছোট দোকান আর অগণিত খরিদ্দার সৈন্য। সবসময়েই ম্যালা কাজ। প্রতিদিন চার, পাঁচ, ছয়জন সৈন্য আসত। নানাসব ছবি করে হাতে, বাজুতে, পায়ে। বড় সুন্দর সেসব সময়। তারপর দ্বিতীয় যুদ্ধ। জোশি যুদ্ধে মারা গেল। জার্মানদের আগমনে ব্যবসা শেষ। তারপর আর কেউ টাটু করতে আসেনি হাতের বাজুতে। বয়স হয়েছে। আর নতুন কী কাজ করবে ড্রিওলি? তারপর একদিন ফিরে আসে প্যারিসে। আশা ছিল জীবন সহজ হবে, কিন্তু হয়নি।

আপাতত যুদ্ধশেষের এইসব দিনে না আছে সংগীত, না আছে উপায়, না আছে নতুন কিছু করবার। এই বুড়ো মানুষটি জানে না ঠিক কী করবে সে। ভিক্ষা পছন্দ নয়। কী করে বাঁচবে এ-ই তার ভাবনা। আপাতত জানালার ছবির দিকে তাকিয়ে ভাবছে – এই তাহলে আমার সেই কালমাক সোঁতের ছবি। আর এই ছবির দিকে তাকিয়ে মনের স্মৃতিতে সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভুলেই গিয়েছিল ড্রিওলি ওর পিঠে আঁকা আছে সোঁতের অবিস্মরণীয় শিল্পকর্ম, একপিঠ টাটুতে আঁকা অনবদ্য শিল্পকর্ম। কতদিন পর সে-ছবির কথা মনে পড়ল। মুখ বাড়িয়ে জানালার ওপারের আর সব ছবি দেখতে পেল ও। মনে হলো একই শিল্পীর আঁকা নানা ছবি। বেশকিছু মানুষ ঘুরে ঘুরে ছবি দেখছে। বড় স্পষ্ট সবকিছু। এ-এক বিশেষ প্রদর্শনী। বুঝতে পারল ড্রিওলি।

তারপর? দরজা খুলে হঠাৎই আর্ট গ্যালারিতে প্রবেশ করে ড্রিওলি। ড্রিওলি তাকিয়ে দেখছে ভেতরের এই সাজসজ্জা, বিশাল বুদ্ধিদীপ্ত মানুষের সমাবেশ। ভাবছে ভেতরে যাবে কী যাবে না। আর দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরের জনসমাবেশ দেখতে থাকে। পেছনে একটি ভারি কণ্ঠস্বর – এখানে কী করছ তুমি? কালোকোট পরিহিত এক বেঁটে মোটা মানুষ। মোটামুখে গালের অযাচিত চর্বি দুপাশে ঝুলে পড়েছে। সে এবার কাছে আসে। ড্রিওলির পানে চেয়ে বলে, তুমি এখানে কী চাও?

ড্রিওলি অনড়ভাবে দাঁড়িয়ে।

– অনুগ্রহ করে এই গ্যালারি থেকে বাইরে যাও। এখানে তোমার দাঁড়িয়ে থাকা বেমানান।

– আমি কি ছবি দেখতে পারি না? ছবি দেখার অনুমতি কি আমি পাব না?

– আমি তো বলেছি তোমাকে চলে যেতে।

ড্রিওলি শক্তভাবে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ভীষণ রেগে গেল ও। রেগে শক্ত হলো ওর সমস্ত শরীর।

– আর ঝামেলা সৃষ্টি করো না। বেরোও এই দিকে। মোটা মানুষটি ড্রিওলির ক্রোধিত শক্ত হাত চেপে ধরে। ঠেলে বাইরে পাঠাতে চেষ্টা করে। আর এতেই ভয়ানকরকম ক্ষেপে গেল ড্রিওলি। বলল তেমনি ক্রোধিত স্বরে – এক্ষুনি তোমার হাত সরাও আমার পিঠের উপর থেকে। তার চিৎকারে সকলে তাকাল ওর দিকে। সকলের চোখ ড্রিওলির উপর। আর একজন এসে যোগ দিল মোটা মানুষের সঙ্গে। দুজনে মিলে ঠেলে বাইরে পাঠাতে চাইল তাকে। অন্য লোকজন অনড়ভাবে এ-দৃশ্য দেখছে। ভাবখানা এমন, ঠিকই হচ্ছে এমন বাজে ব্যবহার। এমন এক লোক যাতে ভেতরে আসতে না পারে তারই ব্যবস্থা হচ্ছে। ও কেন আসতে চায় এমন বুদ্ধিমান সম্ভ্রান্ত লোকের আসরে।

– আমার কাছে ওর একটি ছবি আছে। ও আমার বন্ধু। ছবিটি ও আমাকে দিয়েছিল।

– তুমি কি ঘোরতর পাগল না উন্মাদ? বলল সকলে। পুলিশকে ডাকো পুলিশকে ডাকো। ও এক বদ্ধ পাগল। নিজেকে ছাড়াল ড্রিওলি কঠিন হাতে। ছুটে গেল ও গ্যালারির ভেতরে। – আমি দেখাচ্ছি। এক্ষুনি দেখাচ্ছি, বলল ড্রিওলি। একে একে খুলে ফেলল ওর ওভার কোট, জ্যাকেট, সার্ট। তারপর শূন্য পিঠ দর্শকের দিকে রেখে ও পিছু ফেরে।

– এই তো। ওর ঘনঘন নিশ্বাস পড়ছে। বলল, এই তো এখন দেখতে পাচ্ছ। এই তো আমার পিঠ।

সারাঘরে হঠাৎ পিনপতন নিস্তব্ধতা। ড্রিওলির এই ছবিতে সকলের চোখ। সকলে একেবারে স্তব্ধ। হঠাৎ এমনি এক অপ্রত্যাশিত ঘটনায় সকলে স্তম্ভিত। পিঠের সেই টাটুর ছবিতে সকলের চোখ। ছবিটি এখনো আগের মতো স্পষ্ট। রং আগের মতোই উজ্জ্বল। বৃদ্ধ মানুষের পিঠটি একটু কৃশ হয়ে গেছে। কাঁধের হাড় মাংস ঠেলে বেরিয়ে আসছে। মনে হয় ছবিটি ভাঁজ করা কাগজের ছবির মতো একটু কোঁচকানো। একজন আর্তনাদে বলে, হায় ঈশ্বর! ঠিকই তো বলেছে ও। এ-তো সোঁতের ছবি। তারপর সকলে ঘিরে ধরে ওকে। বলে, নিঃসন্দেহে এ সোঁতে। নিশ্চয়ই প্রথম দিকের ছবি, অন্য আর একজন বলে।

– অভূতপূর্ব! অন্য একজন বলে। তারপর সকলে মিলে অভূতপূর্ব ধ্বনিতে সারাঘর মুখরিত করে। – আরে দেখছ এ-ছবিতে সোঁতের নাম সই করা আছে।

– কাঁধটি একটু সামনে ঝোঁকাও। ছবিটি যেন আর একটু অকোঁচকানো অবস্থায় দেখা যায়।

– অনেককাল আগের ছবি, বলে ড্রিওলি।

– কখন এঁকেছিল সে।

– ১৯১৩ সালে। ওই বছরের শরতে।

– কে শিখিয়েছিল ওকে টাটু করতে?

– আমি, ড্রিওলি জানায়।

– আর মেয়েটি কে?

– আমার স্ত্রী জোশি, ড্রিওলি বলে।

গ্যালারির মালিক আপাতত শান্ত। সে আর সব দর্শককে ঠেলে সোঁতের সামনে উপস্থিত। সারামুখে হাসি। বলে মঁসিয়ে, আমি ছবিটি কিনতে চাই। ড্রিওলি লক্ষ করল, মোটা মানুষটির মুখে থলথলে চর্বি। বলে সে আবার, আমি কিনব মঁসিয়ে। ছবিটি আমি কিনব। বলল ও।

– কীভাবে কিনবে? নরম সুরে ড্রিওলি বলে।

– দুইশ হাজার ফ্রাংক দেবো এই ছবির জন্য। বলল ও। ডিলারের চোখ ছোট আর কালো। উত্তেজনায় তার নাকের পাতা কাঁপছে। সে বিস্ময়াহত।

– তুমি ফট করে বিক্রি করো না। এর দাম আসলে বিশগুণ বেশি।

ড্রিওলি মুখ তুলল কথা বলতে। প্রথমে ওর মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হলো না। দম নিয়ে বলে, কিন্তু কীভাবে আমি এই ছবিটি বিক্রি করতে পারি, মঁসিয়ে। ওর কণ্ঠে সারা পৃথিবীর বিষাদ।

– হ্যাঁ, ঠিকই তো বলল ও। কীভাবে বিক্রি করবে এ-ছবি? জনতার ভেতর থেকে একজন বলে।

– শোন সেই আর্টডিলার এগিয়ে এলো। বলল, আমি তোমাকে সাহায্য করব। আমি তোমাকে বড়লোক করব। আমরা দুজনে মিলে একটি উপায় বের করব, ঠিক আছে?

ড্রিওলি ঠান্ডা চোখে দেখল তাকে। – কিন্তু কীভাবে তুমি কিনবে? আর কিনে এ-ছবি দিয়ে কী করবে তুমি? রাখবে কোথায়? কোথায় রাখবে, কোথায় রাখবে আমাকে বলো?

– কোথায় রাখব, আমি কোথায় রাখব, এই বলতে বলতে লোকটি নাক চুলকাতে শুরু করে মোটা আঙুলে। মনে হচ্ছে ছবিটি নিতে গেলে তোমাকেও নিতে হবে। এ-অবশ্য একটু অসুবিধার ব্যাপার। তুমি না মরা পর্যন্ত এ-ছবির কোনো মূল্য নেই। বয়স কত তোমার বন্ধু?

– একষট্টি।

– কিন্তু তুমি তো মোটেই সুস্বাস্থ্যে ভরপুর নও। আর্টডিলার নাক থেকে হাত সরিয়ে ওর আপাদমস্তক ভালোমতো দেখতে লাগল। খুব ধীরে ড্রিওলির শরীর জরিপ করছিল। যেমন এক কৃষক তার বুড়ো ঘোড়াকে জরিপ করে। – আমার এসব ভালো লাগছে না। ড্রিওলি নামের বুড়ো মানুষটি। একটি দীর্ঘ মানুষের শরীরে ভর দিয়ে দাঁড়ায় ড্রিওলি। লোকটি খুব ধীরে ড্রিওলির কাঁধে হাত রাখে। ড্রিওলি এইভাবে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকায় ক্ষমা প্রার্থনা করে। লোকটি হাসে। কিছু বলে না। ড্রিওলির নগ্ন কাঁধে একটু চাপ দেয়। ওর দুহাতে দস্তানা।

– শোনো আমার বন্ধু, লোকটি বলে। তুমি কি সাঁতার দিতে ভালোবাসো? কিংবা সূর্যস্নানে সময় কাটাতে চাও?

ড্রিওলি একটু চমকে তাকায় ওর মুখপানে।

– ভালো খাবার চাও তুমি? লাল দামি মদ? বোর্দোর লাল মদ? এই বলে লোকটি সাদা শক্ত দাঁত দেখিয়ে হাসতে থাকে। লোকটির সাদা দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো। নরম সুন্দর কণ্ঠস্বর ওর। একটি দস্তানা পরা হাত তখনো ছুঁয়ে আছে ড্রিওলির কাঁধ। বলে, আমি যা বললাম পছন্দ তোমার?- অবশ্যই, বলে ও।

– সুন্দরী রমণীর সঙ্গ চাও?

– কেন নয়? বলল ড্রিওলি।

– চাও না তোমার শরীরের মাপে তৈরি করা কোট আর প্যান্ট? যাকে বলা হয় ‘মেড টু মেজার’?

ড্রিওলি এই অসম্ভব প্রস্তাবের ভদ্রলোকের পানে তাকায়? এরপর আর কী বলবে শুনতে চায় ও।

– কখনো তোমার পায়ের মাপ দিয়ে জুতো বানানো হয়েছে?

– না।

– তুমি কী চাও?

– আমি ঠিক…

– সকালে এসে কেউ তোমাকে শেভ করাবে আর চুল কেটে দেবে বাড়িতে এসে, এসব চাও না?

শুনতে শুনতে ড্রিওলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নেয়।

– আর কোনো এক সুন্দরী এসে তোমার হাত-পায়ের নখ কেটে দেবে, এ চাও না? জনতার একজন হঠাৎ হেসে উঠল।

– আর সকালে দুজন সুবেশী তরুণী চা-খাবার এনে দেবে, চাও না? এসব ভালো লাগে তোমার? এসব পছন্দ করো? ড্রিওলি স্থির চোখে তখনো তাকিয়ে আছে।

– কান্সে আমার একটি বড় হোটেল আছে। আমি তোমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি বাকি জীবন সেই হোটেলে তুমি আমার অতিথি হিসেবে কাটাও। লোকটি থামল। আর ড্রিওলি সবকিছু শুনল। আর এসব প্রস্তাব নিয়ে ভাবল। এইসব লোভনীয় কথা খেলা করছে ওর মাথায়। – তোমার একমাত্র কাজ হবে খোলা পিঠে তুমি আমার হোটেলের সামনের সৈকতে ঘুরবে। আমার হোটেলে যারা থাকবে তাদের মধ্যে দিয়ে। তারপর সাঁতার-পান, এসব পছন্দ তোমার?

কোনো উত্তর শোনা গেল না আপাতত।

– বুঝতে পারছ না এতে লোকজন সোঁতের এই অভাবনীয় ছবি দেখতে পাবে? তুমিও বিখ্যাত হবে। এমন ব্যাপার আমার হোটেলে ঘটবে ভাবতেই ভালো লাগছে। লোকজন বলবে, দ্যাখো দ্যাখো ওই লোকটির পিঠে দশ লক্ষ ফ্রাংক। এমন ভাবনা কেমন লাগছে তোমার? ভালো লাগছে? ড্রিওলি ক্যানারি পাখির নকশা আঁকা গ্লাভস-পরিহিত মানুষটির পানে তাকায়। বলে ড্রিওলি, এ-অসম্ভব মজার জিনিস হবে তুমি যা বলছ। কিন্তু তুমি কি ঠাট্টা করছ না সত্যি সত্যি বলছ?

– অবশ্যই আমি সিরিয়াস।

– থামো, আর্টডিলার বলে। আমার কথা শোনো বুড়ো মানুষ। আমার সমস্যার সমাধান কি এভাবে হতে পারে? শোনো এবার আমার প্রস্তাব। একজন সার্জনকে ডাকব আমি। ও অপারেশন করে তোমার পিঠের চামড়া তুলে নেবে। তারপর নতুন চামড়া বসাবে। আর এর বদলে যে-টাকা পাবে তা দিয়ে হেসে-খেলে আনন্দে সারাজীবন কাটবে তোমার।

– আমার পিঠের চামড়া থাকবে না তারপর আনন্দ?

– আরে না না, তুমি কিছু বুঝতে পারছ না। ওই সার্জন তোমার পিঠে নতুন চামড়া বসিয়ে দেবে। তুমি একদম সুস্থ-স্বাভাবিক থাকবে। ভয়ের কিছু নেই।

– সার্জন এরকম করতে পারে?

– হ্যাঁ, কেন পারবে না?

ক্যানারি পাখির ছবি আঁকা গ্লাভস-পরিহিত সেই লোভনীয় মানুষটি বলে, এই বুড়ো মানুষের জন্য চামড়া তোলা আর বসানো খুবই বিপদজনক। এ-অপারেশন ওকে মেরে ফেলতে পারে।

– এ-অপারেশন মেরে ফেলবে আমাকে? ড্রিওলি ভীতবোধ করে।

– অবশ্যই তুমি অপারেশন সহ্য করতে পারবে না। যা হবে সে-এই, তোমার পিঠ থেকে চামড়া উঠে আসবে।

– আল্লাহর নামে আমাকে বাঁচাও। ড্রিওলি কেঁদে ওঠে। চারপাশের লোকজনের পানে তাকায়। বলছে সেই কণ্ঠ, এত টাকা দেওয়ার আগে ওকে মেরে ফেলবে। কিছু লোক হাসে ব্যঙ্গের হাসি। আর্টডিলার একটু অস্বস্তিকরভাবে ওয়াইন রঙের কার্পেটে হেঁটে বেড়ায়।

ক্যানারি পাখির নকশা করা দস্তানা পরা হাত আবার এসে পড়ে ওর পিঠের উপর। বলে, এসো আমার সঙ্গে। আপাতত তোমাকে কোথাও নিয়ে যাই। খেতে খেতে এইসব আলোচনা হবে। আমার হোটেলের নাম ব্রিস্টল। কান্সে অবস্থিত। আগে ভালোমতো ডিনার করি, পরে সবকিছু আলোচনা হবে। তোমার খিদে পায়নি?

ভ্রƒ কুঁচকে ড্রিওলি তাকায়। লোকটিকে ও ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। লম্বা সাপের মতো গলা বাড়িয়ে লোকটি যখন কথা বলছিল ড্রিওলির পছন্দ হয়নি।

– রোস্ট ডাক আর স্যামবারটিন। খাবে চলো। কথায় রসাল ভঙ্গি। যেন ওর কথাতেই খিদে বেড়ে যায়। এরপর মনোরম ডেসার্ট। কিংবা নরম ফেনায়িত সুখকর আরো কিছু খাবার।

ড্রিওলি একবার ছাদে তাকাল। ওর ঠোঁটদুটি ভেজা। সকলে খেয়াল করল এই ক্ষুধার্ত বুড়ো মানুষের দুঠোঁট সুস্বাদু খাবারের চিন্তায় ভিজে উঠেছে।

– কেমন রোস্ট ডাক তোমার পছন্দ? বাদামি ভাজা ভাজা উপরে আর ভেতরে নরম এমনি…

আমি তোমার সঙ্গে আসছি। ড্রিওলি সার্ট কুড়িয়ে দ্রুত হাতে পড়ছে। বলল, আমার জন্য একমিনিট দেরি করো। আমি আসছি। আর মুহূর্তের মধ্যে আর্টগ্যালারি থেকে বেরিয়ে নতুন পেট্রোনের সঙ্গে রওয়ানা দিল।কয়েক সপ্তাহ পরে অনেকেই দেখল সোঁতের একটি নতুন ছবি। রমণীর চুলভর্তি মাথা, অনিন্দ্য মুখ।    বড় অদ্ভুতভাবে আঁকা। বড় চমৎকার করে ফ্রেম    ও বার্নিশ করা। বুয়োনেস আরিসে বিক্রির জন্য টাঙানো। আসলে কান্সে ব্রিস্টল বলে কোনো  হোটেল নেই। কোনো সুদর্শনা হাত-পায়ের যত্ন নেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত হয়ে নেই। নেই কোনো পরিচারিকা, যে বিছানায় বয়ে আনে সকালের চা আর খাবার।