বুদ্ধিজীবীর অনুমান-বাক্য – ‘সব বেড়ালই মরে। সক্রেটিস মরে গেছে। সুতরাং সক্রেটিস একটা বেড়াল।’ বুদ্ধিজীবীদের যুক্তিশাস্ত্র অনেককিছুই প্রমাণ করে দিতে পারে, কিন্তু হৃদয়বৃত্তিতে কতটুকু আবেদন রাখতে পারে? মানুষের মাঝ থেকে মানবিক ব্যাপারগুলো যখন লোপ পেতে থাকে, তখন তাকে যুক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করা যায় না, হৃদয়বৃত্তি দিয়েই করতে হয়। হৃদয় যার মরে যায় তার বেঁচে থাকাটা পশুর বেঁচে থাকা। পশুদের বিচারবুদ্ধি কম থাকে। তাদের পক্ষে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আর যার মাঝে হৃদয়বৃত্তি আছে, তারই আছে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ। এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ তাকে জাগিয়ে রাখে, অকল্যাণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে উৎসাহিত করে। গণ্ডার নাটকের বিষয়বস্তু এ-রকমই।
প্রাচ্যনাটের সর্বশেষ মঞ্চপ্রযোজনা গণ্ডার। কালজয়ী নাট্যকার ইউজিন আয়োনেস্কোর এ-নাটকটি অনুবাদ করেছেন জহুরুল হক। নির্দেশনা দিয়েছেন কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন। প্রাচ্যনাটের দ্বাদশ প্রযোজনা এটি। প্রাচ্যনাট তাদের প্রযোজনা দিয়ে ইতোমধ্যেই পাশ্চাত্যের নাটকের সঙ্গেও একটি সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ইতিপূর্বে তাদের এ ম্যান ফর অল সিজনস নাটকটি দিয়ে তারা অনেকখানি এগিয়ে গেছে। গণ্ডার নাটক তাদেরকে আরো এককদম সামনের দিকে এগিয়ে দিল।
আমাদের দেশে অ্যাবসার্ড নাটক তেমন জনপ্রিয় নয়। স্যামুয়েল বেকেট তাঁর ওয়েটিং ফর গোডোর কল্যাণে বিশেষ সুপরিচিত হলেও তাঁর অন্য কোনো নাটকের তেমন কোনো মঞ্চায়ন আমরা দেখতে পাই না। আমাদের দর্শকরা তেমন আগ্রহী না হওয়ায় অ্যাবসার্ড নাটক মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে নাট্যদলগুলো এগিয়ে এসেছে কম। সেক্ষেত্রে প্রাচ্যনাট ইউজিন আয়োনেস্কোকে নিয়ে কাজ করার জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার দাবি রাখে। অবশ্য আয়োনেস্কোর দি লেসন এর আগেই মঞ্চে এনেছে সিএটি। তবে নাটক-নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাস্তব কারণেই সিএটির থেকে বেশি সতর্ক থাকতে হয় প্রাচ্যনাটকে।
বিগত শতকের অন্যতম প্রধান ঘটনা দুটি বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সিকি শতাব্দী পার না হতেই আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ আমাদের এ-বিশ্বকে নাস্তানাবুদ করে ফেলেছিল। সমাজের নানা স্তরে এ-দুটি যুদ্ধ দারুণ দারুণ সব ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। অর্থনীতি ভেঙে পড়ল। ভেঙে পড়ল মানুষের বিশ্বাসও। শরীরে যেমন যুদ্ধের ক্ষত তৈরি হলো, মনেও হলো তার সংক্রমণ। এই সংক্রমণ সামাজিক ও মানবিক মানুষের মনে নতুন অভিঘাত, নতুন শূন্যতা সৃষ্টি করল। অস্তিত্বের সংকট দেখা দিল। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করল। এমন একটি সময়ে রচিত হয়েছে গণ্ডার। গণ্ডার সেই সময়েরই এক প্রতিচ্ছবি।
ব্যস্ত শহরের মাঝে একটি বিদেশী রেস্তোরাঁয় মামুলি আড্ডার একপর্যায়ে কেউ-একজন শুনতে পায় বিকট ও অদ্ভুত এক শব্দ। সতর্কদৃষ্টির কেউ একজন আবিষ্কার করে শহরের রাস্তা দিয়ে একটি গণ্ডার ছুটে যাচ্ছে। এই গণ্ডারের আলোচনা শেষ না হতেই আরো একটি গণ্ডার এসে যায় শহরে। গণ্ডার তখন সবার মুখে মুখে। গণ্ডারের মাথায় শিং একটি না দুটি – এ-নিয়ে যখন যুক্তি-তর্ক তখনই এক-এক করে মানুষগুলো গণ্ডারে পরিণত হতে থাকে। গণ্ডার নাটকটি একটি বিশেষ সময়কে ধারণ করে, যে-সময়টি ‘গণ্ডার’ দেখা থেকে গণ্ডারে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়াকাল। এ-বিশেষ সময়টি সর্বকালেই স্থিত।
গণ্ডার নাটকের প্রধান চরিত্র ব্যারেঞ্জার। ব্যারেঞ্জার কল্পনাপ্রবণ, অগোছালো একজন মানুষ। আর তার আশেপাশে যারা, তারা তার থেকে আলাদা। তার বন্ধু জ্যাঁ কিংবা প্রেমিকা ডেইজি তারাও তার থেকে আলাদা।
চারদিকের সবাই যখন গণ্ডারে পরিণত হতে চলেছে ব্যারেঞ্জার তখন শত চেষ্টা করেও তার বন্ধু জ্যাঁকে ফেরাতে পারেনি। পারেনি ডেইজিকেও নিজের দিকে টেনে আনতে। ব্যারেঞ্জার আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয় নিজের অস্তিত্বের লড়াইটি নিজেকেই করতে হয়।
গণ্ডার নাটকটি একটি অ্যাবসার্ড নাটক হয়েও দারুণ উপভোগ্য ছিল। মূল নাটকটি পড়া না থাকায় এই মুহূর্তে বলা সম্ভব হচ্ছে না যে, কতটা বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে নাট্যকর্ম। তবে আমরা যতটুকু দেখতে পেয়েছি তাতে গণ্ডারকে সার্থক বলতেই হবে। আর এ-নাট্যকর্মের জন্য প্রাচ্যনাট এবং নির্দেশক কাজী তৌফিকুল ইসলাম ইমন প্রশংসার দাবি রাখেন।
গণ্ডার নাটকের শুরুতেই চমৎকার নাটকীয় এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। শহরে এক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সব জায়গায় নড়ন-চড়ন লাগে। মানুষের অস্তিত্বে, চিন্তাচেতনায় ওলট-পালট ঘটতে শুরু করে। এমন একটি আবহ-তৈরির জন্য অন্ধকারের ভেতরে তিনকোণায় তিনটি উচ্চতায় তিনটি বৈদ্যুতিক বাতির
দোল খাওয়া সাংঘাতিক তাৎপর্যপূর্ণ। শুরুতেই দর্শককে টানবার চমৎকার কৌশল-অবলম্বন করেছেন নির্দেশক। প্রায় পৌনে দুঘণ্টার নাটকে নানারকম কৌশল অবলম্বন করে নির্দেশক নাটকটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। একসঙ্গে অনেক চরিত্রের মঞ্চে অবস্থান এবং ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে নিজেদের মাঝে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় মঞ্চটিকে সহজ এবং স্বতঃস্ফূর্ত করে তোলার ক্ষেত্রে নির্দেশক বেশ সাবলীল ছিলেন। অ্যাবসার্ড নাটকের সংলাপের পারম্পর্যহীনতা এ-নাট্যক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই সংলাপের ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠে ভিন্নমাত্রার উচ্চারণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দু-একজন অভিনয়শিল্পী ছাড়া প্রত্যেকেরই অভিনয় ছিল নিখুঁত এবং প্রাণবন্ত। প্রাচ্যনাটের টিমওয়ার্ক সত্যিই প্রশংসনীয়।
গণ্ডার নাটকের মঞ্চ ও আলোক-পরিকল্পনা করেছেন সাইফুল ইসলাম। সাইফুল দীর্ঘদিনের আলোর কারবারি। গণ্ডার নাটকে তিনি অত্যন্ত সংযমী আলো ব্যবহার করেছেন। নাটকের মুডকে তিনি আগাগোড়া ধরে রেখেছেন। আর তার প্রকাশও অনেক সাবলীল। মঞ্চসজ্জার ক্ষেত্রে সাইফুল পরপর তিনটি নাটকে একটি ভিন্নতর সংযোজনার প্রয়াস চালাচ্ছেন। রক্তকরবী, বৌবসন্তী এবং গণ্ডার – এই তিনটি নাটকের মঞ্চে তিনি নতুন ধরনের টেকচার ব্যবহার
করেছেন। এই টেকচার ঢাকার মঞ্চে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করতে যাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।
গণ্ডার নাটকের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জিনিসটি হলো – এ-নাটকের ধ্বনি। এ-নাটকের ধ্বনি-পরিকল্পনার কাজ করেছেন রাহুল আনন্দ। রাহুল এ-নাটকের সহকারী নির্দেশকও। অসাধারণ ধ্বনি-পরিকল্পনার কাজ করেছেন তিনি। প্রথাগত যন্ত্রানুষঙ্গ ব্যবহার না করে তিনি সম্ভবত স্বোদ্ভাবিত কিছু যন্ত্র ব্যবহার করেছেন। এসব যন্ত্র থেকে উৎসারিত অপরিচিত সুরধ্বনি দর্শকদের চমৎকৃত করেছে। গণ্ডারের দেহমন-সত্তাকে উপস্থাপনে দারুণ উদ্ভাবনীশক্তির পরিচয় দিয়েছেন রাহুল। অনেক আগে থেকেই আমি তাঁর সংগীত-প্রতিভার ভক্ত ছিলাম। তাঁর এবারকার কাজ আমাকে বিমুগ্ধ করেছে আরো বেশি।গণ্ডার শুধু প্রাচ্যনাটকে নয় আরো অনেক নাট্যদলকে সাহসী করে তুলবে। গণ্ডারের আরো শক্তি, আরো দীর্ঘায়ু কামনা করি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.