অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্ত :
শতবার্ষিকী শ্রদ্ধার্ঘ্য
অশোক মিত্র
কলকাতা, ২০০৩
বইটি ভাগ্যক্রমে হাতে পাই। নাম অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্ত : শতবার্ষিকী শ্রদ্ধার্ঘ্য। কালি ও কলম-সম্পাদক আবুল হাসনাত অনুগ্রহ করে পড়তে দেন। তা নইলে এ-বইয়ের হদিস আমার পাবার কথা নয়। আগ্রহ বা প্রত্যাশা কোনোটিই ছিল না। কারণ এমন উদ্যোগের বিষয় কিছুই জানতাম না। অবশ্য জানার সুযোগও কিছু মেলেনি। দূরের বৃত্তে বসবাস। যোগাযোগের পথটাও অচেনা। তাছাড়া মেধার ঘাটতি সংকোচে জড়িয়ে রাখে। পথের খোঁজটুকুও করতে দেয় না। হাসনাতের কাছে তাই আমি কৃতজ্ঞ। এমন অমূল্য বই (আক্ষরিক অর্থেও, সে-প্রসঙ্গ পরে) তিনি না-দিলে পড়া হতো না। হাসনাত বইটি পান সংবাদের সম্পাদক সদ্যপ্রয়াত আহমদুল কবিরের কাছ থেকে। প্রজ্ঞাবান এই মানুষটি হয়তো চেয়েছিলেন, বইটি সবার নজরে পড়ুক। তাঁর গুরুবন্দনাও এতে স্থান পেয়েছে এবং সেটি অসাধারণ। তবে তা দেখাবার জন্যে তিনি ব্যস্ত হয়েছিলেন, এমনটি ভাবতে পারি না। তাঁর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য, আত্মমর্যাদাবোধ ও মাত্রাজ্ঞান তাঁকে কখনোই সেভাবে উৎসাহিত করত না। আসলে বইটির গুরুত্ব তিনি বুঝেছিলেন। অমিয় দাশগুপ্তকে চেনানোই শুধু নয়, মেধার চর্চায় আমাদের ঐতিহ্যের বিস্মৃতপ্রায় একটি ধারাকেও বোধহয় তিনি চেনাতে চেয়েছিলেন, সেই সঙ্গে একঝলক আলোয় অতীতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেও। আহমদুল কবির নিজের অজান্তেই সেই সময়ের আলোর পিপাসু তরুণমনের এক (একমাত্র নয়) প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। আমরা তাঁকে দিয়ে প্রেক্ষাপটের একটা আভাস পাই। আজ তিনিও বিগত। বড় বেদনার সঙ্গে এই কথাটি মনে পড়ে। বইটি পড়ার সময়ে আরেক পশলা বিষণ্নতায় তা মিশে যায়। কারণ, শুরুতেই জানি, ‘যাঁরা এই আয়োজন সাজিয়েছেন, তাঁরাও অনেকেই এখন পরিণত বার্ধক্যে উপনীত, -।’ আগামী দিনের জন্যে অমিয় দাশগুপ্তকে ঘিরে তাঁদের স্মৃতির সঞ্চয় ও মেধার দীপ্তি একটুখানি তাঁরা এখানে ধরে রাখেন, এই প্রাপ্তিটুকুই তারপরেও আমরা অক্ষয় বলে মানি।
বইটি নিয়ে কথা বলার আগে অধ্যাপক অমিয়কুমার দাশগুপ্তের জীবনবৃত্তান্তের চুম্বক কিছুটা তুলে ধরা বোধহয় জরুরি। কারণ এই নাম আজ এদেশে আমাদের চেতনায় পরিচয়ের ঘণ্টাধ্বনি যদি কোথাও টুংটাং একটু-আধটু বাজায়, তবে তা এত মৃদু যে, কিছুই প্রায় শোনা যায় না। অবশ্যই তিনি জনসভার লোক ছিলেন না, ছিলেন বিদ্বৎসভার। কিন্তু এই বিদ্বৎসভার সঙ্গেও বিচ্ছেদ দুস্তর। কালের বিচ্ছেদই শুধু নয়, বিচ্ছেদ মানসিকতারও। যে-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল
তাঁর সাধনপীঠ, সেখানে আজ ফেরিওয়ালাদেরই দাপট এবং তামসিক ক্ষমতাবলয়ের জঘন্য দালালিতে তা প্রতিকারহীন কলুষে আকণ্ঠ মগ্ন। প্রাচীন দু-একজনের ধূসর স্মৃতি হয়তো এখনো তাঁকে দূরের ফ্রেমে ধরে রাখে, কিন্তু নিত্যদিনের জীবনচর্চায় তা খাপছাড়াই থেকে যায়।
এই স্মরণ-সংকলনে ছড়ানো-ছিটানো টুকরো টুকরো তথ্য জড়ো করে আমরা পাই, ১৯০৩ সালের ১৬ জুলাই অমিয়কুমার দাশগুপ্তের জন্ম। আদিনিবাস, বরিশাল জেলার গৈলা গ্রাম। স্কুলের পড়াশোনা ওই গ্রামেই। পরে বরিশাল বি.এম. কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক-সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ। দুটিতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। অসাধারণ মেধার পরিচয় দেওয়ায় এম.এ. পরীক্ষার ফল বের হওয়ার আগেই ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শিক্ষক করে নেয়। পরে বিশ বছর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগেই তাঁর অধ্যাপনা ও গবেষণা। মাঝখানে দুবছর, ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৬, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে প্রফেসর লায়নেল রবিন্সের নির্দেশনায় কাজ করে তাত্ত্বিক অর্থনীতিতে ডক্টরেট। তাঁর ওই গবেষণাগ্রন্থের নাম The Conception of Surplus in Theoretical Economics। তাত্ত্বিক অর্থনীতির চর্চায় এই উপমহাদেশে তিনিই অগ্রপথিক। ১৯৪৬-এ তিনি ঢাকা ছেড়ে যান। তবে কর্মজীবনের বেশির ভাগ অধ্যাপনাতেই কাটান। কিছুদিন কটকে রাভেন্শ কলেজে প্রফেসর, তারপর কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের প্রধান। নয়াদিল্লির ইন্ডিয়ান স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজেও তিনি পড়ান, সবশেষে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে উনআশি বছর বয়স পর্যন্ত অনারারি প্রফেসর। জীবনের শেষ দশ বছর কাটান শান্তিনিকেতনে; অবসরেও অবশ্য তাঁর পড়াশোনায় ও গবেষণায় ছেদ পড়ে না এতটুকু। এর ভেতরে কিছুদিন বিলেতে কেমব্রিজ ও সাসেক্স্ বিশ্ববিদ্যালয়েও কমনওয়েলথ ফেলো হিসেবে তিনি পড়িয়েছেন এবং উনিশশ পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় আন্তর্জাতিক মুদ্রাভাণ্ডারের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া-বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করে পুরো একটি মেয়াদ কাটিয়ে এসেছেন। ১৯৯২ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
কোথায় কী পদ তিনি অলংকৃত করেছেন, এ-দিয়ে তাঁর প্রতিষ্ঠার কিছুটা ইঙ্গিত মেলে হয়তো, কিন্তু তা তাঁর প্রতিভার যথার্থ পরিচায়ক নয়। কর্মনিয়োগের বাঁধাধরা নিয়মে গতানুগতিক প্রক্রিয়ায় অনেকেই ওইসব পদে আসীন হতে পারেন, কিন্তু তাঁরা কেউ অমিয় দাশগুপ্ত হন না। তাঁর অনন্যতা ফুটে ওঠে অর্থনীতিচর্চায় তাঁর ক্লান্তিহীন নিষ্ঠায় ও তাঁর গভীর মননের ফসল অসাধারণ সব রচনায়। আমরা জানতে পাই, আর্থার লুইসের সাড়া-জাগানো প্রবন্ধ Economic Development and Unlimited Supply of Labour 1954 mv‡j ‡Q‡c ‡e‡ivevi Av‡MB GKB wel‡q Abyiƒc wPš—vi c«Kvk wZwb NUvb Zvui Keynesian Economics and Underdeveloped Countries শীর্ষক রচনায়। পাশ্চাত্যের পাদপ্রদীপের আলো সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ওপর পড়েনি। অবশ্য অনেক পরে স্বীকৃতির সান্ত্বনা মিলেছে। আর্থার লুইস ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান প্রধানত তাঁর ওই কাজের জন্যে। দুজন কেউ কারো কাজ সম্পর্কে অবহিত না হয়েও একইরকম চিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। অমিয় দাশগুপ্ত এছাড়াও আর যেসব কাজ করেছেন, তা প্রায় সবই বিশ্বমানের। শাস্ত্রচর্চার মূল ধারাতে এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়। চিন্তার জগতে আলোড়নও তোলে। তাঁর লেখা পূর্ণাঙ্গ বই সবগুলোই উল্লেখযোগ্য। তবে Epochs of Economic Theory -র সামনে কেনেথ অ্যারো, মিচিও মরিশিমা ও ফ্রাংক হানের মতো প্রথমসারির অর্থনীতিবিদও শ্রদ্ধায় মাথানত করেন। বইটি একাধিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর সময়ে শুদ্ধ অর্থনীতির চর্চায় এ-অঞ্চলে তিনিই ছিলেন সর্বাগ্রগণ্য। দেশ-বিদেশে সবাই তা মেনেছেন। সম্ভ্রমও তাঁর জুটেছে।
একই সঙ্গে তিনি ছিলেন এক অতুলনীয় শিক্ষক। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা যে তাঁকে মনে রাখেন, তা মূলত এই কারণেই। তাঁর মেধার ব্যক্তিত্ব সবটাই ফুটে উঠত তাঁর শিক্ষকতায়। সেখানে কোনো ফাঁকি ছিল না। দায়সারাভাবে চর্বিত-চর্বণও না। বুদ্ধির একরোখা নিষ্ঠ প্রয়োগে প্রতিপাদ্যকে তিনি স্পষ্ট করে তুলতেন। ক্লাসে কেউ অমনোযোগী থাকতেন না। থাকতে পারতেন না। তাঁর সান্নিধ্যে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা সবাই তাঁর প্রবাদতুল্য এই মহিমায় আকৃষ্ট হয়েছেন; যোগ্যতর যাঁরা, তাঁরা শুধু মুগ্ধ বা অনুপ্রাণিতই হননি, তাঁর চিন্তার আলোয় আপন আপন ভাবনার পথও খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, আহমদুল কবির। ১৯৪১ সালে অর্থনীতি বিভাগে অনার্স কোর্স নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হন। এখানে তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্যতে পড়ি, “- সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় যে-শিক্ষকটি ছিলেন তিনি ডক্টর অমিয়কুমার দাশগুপ্ত। ঋজুদেহের আমাদের এই শিক্ষকের অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। চোখের দিকে চাইলে মনে হতো আমার মাথায় কী আছে তা-ও দেখে নিচ্ছেন।… আমাদের সময় প্রত্যেক শিক্ষকই ভাগ করে কয়েকজন ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে সপ্তাহে একদিন টিউটরিয়াল ক্লাস নিতেন।… ডক্টর দাশগুপ্ত আলোচনার সমন্বয়সাধন করতেন এবং পরের সপ্তাহের বিষয় বলে দিতেন। এই টিউটরিয়াল ক্লাসগুলো করে ও ক্লাসে তাঁর লেকচারগুলো একটু মন দিয়ে শুনে পাঠ্যবইয়ের দিকে খুব বেশি নজর দিতে হয়নি আমাকে।… অনার্স পাশ করে এম.এ-তে ভর্তি হলাম। এম.এ. ক্লাসে ডক্টর দাশগুপ্ত যে-বিষয়টি আমাদের পড়াতেন তা সহজ ভাষায় দাঁড়ায় ঝড়পরধষরংস বনাম ঈধঢ়রঃধষরংস, কোনটি মানুষের জীবনের বিকাশে সম্পূর্ণতা এনে দেয়।… ডক্টর দাশগুপ্ত তাঁর অননুকরণীয় ভাষায় একদিকে যেমন সমাজতন্ত্র বুঝিয়েছেন, তেমনি ধনতন্ত্র বোঝাতেও তাঁর বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হয়নি।… এই দুই সমাজব্যবস্থার বিশ্লেষণ করে তাঁর মন্তব্য, যেটুকু মনে আছে, তা এই : ‘The minimum requirements of a person must be met by Society through the State thereafter Variety is the Spice of Life.’ আমার ষাটবছরের সমাজদর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি গুরুদেবের এই শেষ কথাটির ভিত্তির উপর। -’’ (পৃ. ১৫-১৬)
সমর সেনও জানাচ্ছেন, ‘- I had the good fortune to be his student from 1937 to 1939 and colleague from 1940 to 1945 in the economics department of the University of Dhaka. He was the most lucid, brilliant and inspiring teacher that I have ever met. When I went to the LSE in 1945 as a research student, I found fwe who excelled him in analysis and exposition and who could teach me something in the field of economic
theory which was
substantially more
uptodate than what I had already learnt from Dasgupta?’ (S.R. Sen, p. ৫৮-৫৯)
একই রকম ধারণা তাঁর অন্যান্য ছাত্রছাত্রীর, এবং যাঁরা গুণমুগ্ধ ঘনিষ্ঠজন, তাঁদেরও। অমিয় দাশগুপ্ত ও তাঁর সময় তাঁদের সমৃদ্ধ স্মৃতির মায়াবী আলোয় যেন চোখের সামনে ফুটে ওঠে। পরম সম্মানে ও গভীর অনুরাগে এ-বই তা সংগ্রহ করে আমাদের হাতে তুলে দেয়। আমরা ধন্য হই।
বইটি কেউ সম্পাদনা করেছেন, এমন কারো উল্লেখ নেই। ছাত্রছাত্রী ও অনুরাগীবৃন্দ, সবার পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, এইটুকুই আমরা জানতে পাই। তবে প্রকাশক হিসেবে দেখি অশোক মিত্রের নাম এবং ভেতরের দু-একটি মন্তব্য থেকে অনুমান, এ-বইয়ের পরিকল্পনা সম্ভবত তাঁর, এবং তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনিই। গুরু-প্রণামের এমন দৃষ্টান্ত আজ বিরল। যখন আরো পড়ি, অমিয় দাশগুপ্তের শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে তাঁর মুখাগ্নি করেন অশোক মিত্র এবং আর এক অশোক – অশোক রুদ্র, তখন আবেগ আমাদের কণ্ঠরোধ করে। আরো এক অসহায় দুঃখ তা জাগিয়ে তোলে, কারণ অশোক রুদ্রও আজ প্রয়াত। অশোক মিত্রের উদ্যোগে বিষাদের ছোঁয়া লাগে।
অমিয়কুমার দাশগুপ্তকে মনে করা এবং মনে রাখা, এই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই বইটির আয়োজন। স্বাভাবিকভাবে ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণা এখানে প্রাধান্য পায়। সেই সঙ্গে তাঁর কাজের মূল্যায়ন। আরো একটি বিষয় বইটিকে বিশিষ্ট করে তোলে, গুরুত্বও তার বাড়িয়ে দেয় অনেকগুণ। তা হলো, অধ্যাপক দাশগুপ্তের কিছু প্রবন্ধের সংযোজন। শুরুতেই এ-ব্যাপারে জানানো হয়, ‘- আমাদের ঈষৎ তৃপ্তিবোধ অধ্যাপক দাশগুপ্তের কয়েকটি প্রবন্ধ সন্নিবেশ করা সম্ভব হয়েছে বলে।’ স্বল্পপরিসরে বইটিতে পূর্ণের স্বাদ আমরা পাই। অমিয় দাশগুপ্তকে নিয়ে লেখা কিছু বাংলায়, কিছু ইংরেজিতে। অমিয় দাশগুপ্তের নিজের লেখাও কিছু বাংলায়, কিছু ইংরেজিতে।
শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনে যাঁরা এখানে শামিল হয়েছেন, তাঁদের অনেকের আছে ঢাকা-বাসের স্মৃতি, কেউ কেউ একান্ত আপন, কেউ বা তাঁর অনুপ্রাণিত ছাত্র বা ছাত্রী, অথবা তাঁর মুগ্ধ সহানুধ্যায়ী। এঁরা হলেন, মীরা বসু, আহমদুল কবির, ঊষা ভট্টাচার্য, রাধারাণী চৌধুরী, শোভনা দাশগুপ্ত, হীরেন্দ্রনাথ রায়, সমীর দাশগুপ্ত, সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত (মিত্র), অরুণ মজুমদার, আশিস দাশগুপ্ত, সুপূর্ণা দত্ত, নবনীতা দেবসেন, ভবতোষ দত্ত, নরেশ গুহ, অশোক মিত্র, অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়, এস. আর. সেন (সমর রঞ্জন সেন), অমিতা দত্ত, অম্লান দত্ত, আই.জি. প্যাটেল, অলকনন্দা প্যাটেল, পার্থ দাশগুপ্ত ও তবারক হুসেন। অলকনন্দা প্যাটেল তাঁর কন্যা। পিতৃস্মৃতিতে তাঁর লেখা ইংরেজি ভাষায় এক অসাধারণ রচনা। বাবার হয়ে ওঠার ও জীবনযাপনের প্রাকৃতিক-মানবিক পরিবেশ, সবটাই যেন স্মৃতির টানে প্রাণ ফিরে পায়। মমতায় ও মাধুর্যে ভরা। ব্যক্তিজীবনে আপনগুণেই পরিচিত, অবশ্য স্বামী আই.জি. প্যাটেলও বিশ্ববিশ্রুত। এতে কোনো ভান বা অহংকারের অবলেপন ঘটে না, যদিও বুদ্ধির আলো বিন্দুমাত্র ম্লান হয় না। আপন ব্যক্তিসত্তাও এখানে ফুটে ওঠে। তা নিজেকে চেনায়, বাবা-মাকেও চিনিয়ে দেয়। ছেলে পার্থ দাশগুপ্ত কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির প্রফেসর। পরিবেশ-অর্থনীতির অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক। বাবার কথাও লেখেন তত্ত্বজ্ঞানীর নিরাসক্তি নিয়ে। তারপরও নির্দ্বিধায় বলেন, ‘Ami“a Dasgupta was the most admirable person I have ever met.Õ Zvui K_v‡ZB Rvwb, ÔHe was an Agnostic. So I believe his children and their
children and the students he had taught over the years provided him with a means of self-transcendence, the widest avenue open to him of living through time. (p. 86)
সমীর, সুদেষ্ণা ও আশিস দাশগুপ্ত অমিয় দাশগুপ্তের ভাই-পো, ভাই-ঝি। কাছে থেকে দেখা ‘কাকামণি’ বা ‘জ্যাঠামশাই’য়ের অন্তরঙ্গ ছবি তাঁরা ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে সেসবেও জোর পড়েছে বুদ্ধিমনস্কতার ওপর। সুপূর্ণা দত্ত ও নবনীতা দেবসেন তাঁর বাড়ির মেয়ে যেন। অমর্ত্য সেনের বোন সুপূর্ণা, আর নবনীতা, প্রথম পরিণীতা। বাবা আশুতোষ সেন ছিলেন ভূমিবিজ্ঞানী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি এবং অমিয় দাশগুপ্ত একই সঙ্গে অধ্যাপনা করেছেন; একই বাড়িতে থেকেছেন। অমিয় দাশগুপ্তের প্রেরণাই অমর্ত্য সেনকে অর্থনীতি পড়ায় উদ্বুদ্ধ করেছে। দাশগুপ্ত-পরিবারের সঙ্গে নবনীতার পরিচয় অবশ্য বিয়ের আগে থেকে। অলকনন্দা তাঁর কলেজ-জীবনের সখী। প্রেসিডেন্সিতে একসঙ্গে পড়েছেন। সুপূর্ণা ও নবনীতা একেবারে ঘরের মেয়ের মতো কোমলপ্রাণের ছোঁয়া দিয়ে তাঁদের ঘনিষ্ঠ চেনাজানার কথা লিখেছেন।
এখানে আর যাঁরা স্মৃতিচারণে তাঁদের শ্রদ্ধার ও মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন, তাঁরা হয় তাঁর স্নেহভাজন ছাত্র বা ছাত্রস্থানীয়, বেশির ভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের, নয়তো অধ্যাপনায় তাঁর সহযোগী-সহকর্মী। অর্থনীতিচর্চায় তাঁর নিরলস উৎসাহের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। এইটিই ছিল যেন তাঁর প্রধান ধ্যান-জ্ঞান। পঠন-পাঠন তিনি ভালোবাসতেন। ছাত্রছাত্রীদের জন্যে তাঁর দরজা ছিল সবসময়ে খোলা – ঘরের তো বটেই, প্রাণেরও। মননশীল আড্ডাও তাঁর প্রিয় ছিল। তা জমিয়ে তুলতেন তাঁরই মতো প্রতিভাবানেরা। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়, শচীন চৌধুরী, সত্যেন বোস – এঁদের মতো মনীষীরাই জড়ো হতেন সেসব আড্ডায়। আকৃষ্ট হতেন মেধাবী তরুণরাও। তবে বোঝা যায়, নবাগতদের মুখ খুলতে হলে সেখানে প্রাণ হাতে নিয়েই তা করতে হতো। অগ্রজরা যে উৎসাহ দেখাতেন না, তা নয়। তাঁরা বরং নতুন কথা শোনার জন্যে কান পেতেই থাকতেন। কিন্তু নির্বোধের বাচালতা সেখানে বেমানান হতো। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো, এটি ছিল প্রফেসর দাশগুপ্তের শিক্ষাদান-পদ্ধতির ধরন। তাঁর ক্লাস-লেকচার মনোগ্রাহী হতো অবশ্যই। কিন্তু তিনি বেশি জোর দিতেন সেমিনারে তর্ক-বিতর্কে। ছেলেমেয়েরাও মাথাঘামানোয় যোগ দিতে বাধ্য হতো। মনের জড়তা এতে তাদের অনেকখানি কাটত। কখনো কখনো নতুন পথের ইঙ্গিতও আসত তাদের দিক থেকে। তাঁর সেমিনার অর্থবহ হয়ে উঠত এইভাবে। কাশী বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ছাত্রী ছিলেন রাধারাণী চৌধুরী। তিনি জানাচ্ছেন, ‘- আলোচনা যখন শেষ হতো, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিস্তব্ধ পথে অন্ধকার নেমে এসেছে, বড় বড় গাছগুলির ফাঁকে ফাঁকে জ্বলে উঠেছে রাস্তার আলো। আমাদের মনজুড়ে তখনও আলোচনার অনুরণন, মাস্টারমশাইর মন্তব্যাদির রেশ। প্রকৃত শিক্ষক শিখিয়েই ক্ষান্ত হন না, ছাত্রছাত্রীর মনে সৃষ্টি করেন জিজ্ঞাসা, জাগিয়ে দেন অনুসন্ধানের প্রবৃত্তি, আরো জানার ইচ্ছা।’ (পৃ. ১৯)
এটি উল্লেখযোগ্য, অমিয়কুমার দাশগুপ্ত শিক্ষকতায় যখন যেখানে থেকেছেন, তখন সেখানেই তাঁর ছাত্রছাত্রীদের ভেতরে রাষ্ট্র ও সমাজের আওতায় বসবাসরত মানব-মানবীর অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মের গতিপ্রকৃতির রহস্য খোঁজার আগ্রহ জাগিয়ে তুলেছেন। স্থান-কাল-পাত্রের ব্যবধান তাঁর কাছে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। চারপাশের বুধমণ্ডলীকেও তিনি সবজায়গায় একইভাবে আকৃষ্ট করেছেন। মনে হতে পারে, নিরপেক্ষ বিদ্যাচর্চাই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান; পরিপার্শ্ব কোনোভাবে তাঁকে অভিভূত করে না। শুদ্ধ তত্ত্বজ্ঞানীর মতো তা থেকে নিজে বিচ্ছিন্ন থেকে তিনি তাঁর ভেতরের মানবিক তাগিদগুলোকে অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে বোঝার চেষ্টা করেন। এতে যে কোনো সত্য নেই, তা নয়। কিন্তু সে-সত্য প্রত্যক্ষের। গভীরে তার যে-এক স্থিরবিন্দু আছে, তার দেখা এতে মেলে না। সেই স্থিরবিন্দু তাঁর বরিশালের গৈলা গ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁর চেতনার কম্পাসের কাঁটা ধরে রাখে তারাই। যেখানেই তিনি থাকুন না কেন, তাঁর মনকে নিয়ন্ত্রণ করে গৈলার নির্মাণ ও তাঁর সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ। পরবাসী-কাতরতায় তিনি তাই আক্রান্ত হন না। গৈলা ও ঢাকাকেই তিনি প্রতিটি জায়গায় পুনর্নির্মাণ করেন। অথচ ১৯৪৬-এ তিনি যে ঢাকা ছাড়েন, তারপর পঁচিশ বছর পেরিয়ে গেলেও এখানে আর ফিরে আসেননি। এসেছেন পরে বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে। সম্ভবত অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আগ্রহে। রাজ্জাক স্যার তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র ছিলেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘনিষ্ঠ সহকর্মী।
বিশ্বভারতীর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক ভবতোষ দত্ত জানান, ‘অধ্যাপক অমিয় দাশগুপ্ত মহাশয়কে আমি প্রথম দেখেছিলাম প্রায় ষাট বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমি তখন সেখানে ছাত্র।’ তারই সূত্র ধরে তিনি বলেন, ‘তৃতীয়-চতুর্থ দশকের শিক্ষকরা প্রায় কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছিলেন। আমরা যখন ছাত্র সেই দশকের শিক্ষকদের কথা বলতে পারি। ইতিহাসে রমেশচন্দ্র মজুমদার, কালিকারঞ্জন কানুনগো, সংস্কৃতে সুশীল কুমার দে, প্রবোধচন্দ্র লাহিড়ি, বাংলায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, মোহিতলাল মজুমদার, ইংরেজিতে সত্যেন্দ্রনাথ রায়, অমলেন্দু বসু, দর্শনে হরিদাস ভট্টাচার্য, পদার্থবিজ্ঞানে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, গণিতে নলিনীমোহন বসু, রসায়নে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। সকলের নাম করবার দরকার নেই। যে-নামগুলি আপাতত মনে এলো তাঁদের পেলে গৌরববোধ করবে না এমন বিশ্ববিদ্যালয় কী আছে ভূ-ভারতে?’ পরে যোগ করেন, ‘এঁদেরই মতো উজ্জ্বল ছিলেন অমিয় দাশগুপ্ত, দীপ্ত প্রতিভায় যিনি কারো থেকে কম ছিলেন না। পরবর্তীকালে ঢাকা ছেড়ে গেলেও তাঁর খ্যাতি ম্লান তো হয়ইনি, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পেয়েছে।’ (পৃ. ৪৫-৪৬)
এখানে আরো উল্লেখ করবার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সহপাঠী ছিলেন অমিয় দাশগুপ্ত ও শচীন চৌধুরী। গোটা উপমহাদেশে অর্থনীতি-পাঠকে সাবালকত্বে টেনে এনে তাঁর উন্নত চর্চার ভিত্তি গড়ে দিয়েছেন প্রধানত এই দুজনই। অমিয় দাশগুপ্ত যেমন বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে, শচীন চৌধুরী তেমনি একটি পত্রিকাকে হাতিয়ার করে। ১৯৪৯ সালে বোম্বাই থেকে প্রকাশিত সমীক্ষা ট্রাস্টের ঊপড়হড়সরপ ডববশষু-র এবং ১৯৬৬ থেকে নতুন নামে, Economic and Political Weekly-র তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। মানে ও মর্যাদায় গোটা পৃথিবীতে এর তুল্য সমাজ-অর্থনীতিবিষয়ক দ্বিতীয় কোনো সাপ্তাহিক পত্রিকা নেই। শচীন চৌধুরীর উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন অমিয় দাশগুপ্ত। তাঁর লেখা প্রবন্ধ পত্রিকাটিতে নিয়মিত রসদ যুগিয়ে চলে। সব মিলিয়ে এটি ছিল তাঁদের যৌথচিন্তার ফসল। এখানে আমাদের যা বলবার, তা হলো, ঢাকাই এই দুই মনীষীকে পরম যত্নে গড়ে তুলেছে। তাঁরা কখনো বিস্মৃত হননি, কিন্তু বিস্মৃত হয়েছি আমরা। এই স্মরণগ্রন্থটি হাতে না পেলে আমি জানতেই পারতাম না, শচীন চৌধুরীও ছিলেন এই ঢাকার সন্তান। কলকাতায় সত্যেন বোস-মেঘনাদ সাহার, অথবা অনেক পরে অমর্ত্য সেন-সুখময় চক্রবর্তীর কীর্তিকাহিনী নিয়ে যে-উপাখ্যানমালা রচিত হয়েছে, ঢাকায় অমিয় দাশগুপ্ত-শচীন চৌধুরীকে ঘিরেও তেমন হতে পারত, কিন্তু হয়নি। বিচ্ছেদ বিস্মৃতি ডেকে এনেছে। তাঁদের কীর্তিকাহিনী জানবার সুযোগও কারো আর মেলে না। আজ এখানে অর্থনীতি – অনার্স-এম এ-তে প্রথম শ্রেণি পাওয়া ছেলেমেয়েদের কাছেও শচীন চৌধুরী নামটি কোনো অর্থ বহন করে না। অমিয় দাশগুপ্তের লেখার সঙ্গেও তাদের কোনো পরিচয় ঘটে না। কবন্ধকাল তাদের কবন্ধ বানিয়ে রাখে।
অমিয় দাশগুপ্ত নিজে এই বিচ্ছেদকে অতিক্রম করেছিলেন। হৃদয়ে ও মননে ঢাকা ও গৈলাকে তিনি সারাজীবন একইভাবে সক্রিয় রেখেছেন। তার মানে
এ-নয়, তাঁর কোনো পিছুটান ছিল অথবা জীবনযাপনের নতুন পরিবেশে তিনি তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়েছেন। আসলে যেভাবে তাঁর মনোজগৎ এখানে তৈরি হয়ে যায়, তা-ই তাঁকে রক্ষা করে। তাতে নিরাসক্ত যুক্তিবাদ, নিরপেক্ষ ইতিহাস-চেতনা ও অভ্যাসে লালিত উদার মুক্ত মানবতাবোধ একসঙ্গে মেশে। মানসিক স্থিতি সেখানে নিশ্চিত করে তিনি চারপাশে দৃষ্টি প্রসারিত করেন। দীর্ঘদিন দেশের মাটিতে তিনি পা রাখেননি, কিন্তু উদ্বাস্তুও হননি; আপন ভূমিকে সবসময়ে মাথায় বয়ে নিয়ে চলেছেন।
মেয়ে অলকনন্দা বাবাকে ঠিকই বুঝতে পারেন। তাঁর চমৎকার লেখাটিতে পড়ি, ‘As I chatted with Baba in the last fwe years of his life, I realised hwo rich his life had been in Dacca with theatre, music and most of all sessions in the teachersÕ common room in the university with fine tuning of
economic theory or heated discussions on politics, where Professor Rayyak would on occasion go to the map on the wall and predict, ÔEverything will become red – the whole map’ (লালে লাল হয়ে যাবে). He recalled playing tabla with Satyen BoseÕs Esraj, young Birenjyatha (B.N. Ganguli) enriching life with his singing and all of them being involved in the theatre…’ (p. 80)। তিনি আরো লেখেন, ‘ _ Till the end of his life, to Baba, university meant Dacca University, home, his village Goila; for Ma, home was Gandaria or Purana Paltan, but I never heard them express a complaint or talk about the
injustice of breaking up the country, splitting families and friends, destroying the
permanence most families dreamt of. They never felt diasporic, may be because they both
considered partition as inevitable. … May be the inevitability helped them accept it, or may be, as people very rooted, they could live happily aûwhere. (p. 83-84).
অলকনন্দার কথায় জানতে পাই, বিদ্যাচর্চা ও পাণ্ডিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা মিশে আছে তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্যে। এ-ঐতিহ্য নতুন নগরসভ্যতার দান নয়, তাঁদের প্রাচীন গ্রাম গৈলার সংস্কৃতি-সাধনার ফসল। সাংখ্য-বেদান্ত-ব্যাকরণ-কাব্য, আর ভাষা নিয়ে পঠন-পাঠনের চল ছিল সেখানে বহু শতাব্দী ধরে। তারই প্রভাবে যুক্তিবাদের একটি ধারাও ছিল বহমান। বিশেষ করে তাঁদের বাড়িতে। প্রাত্যহিক পূজার্চনা বা উপোস রাখার চল সেখানে তেমন ছিল না। কারণ এ-সবের পেছনে কোনো যুক্তির আশ্রয় খুঁজে পাওয়া যায় না। ঠাকুরদা মূর্তিপুজোয় বিশ্বাসী ছিলেন না; ঠাকুরমার সিঁদুর-পরাতেও তাঁর আপত্তি ছিল, কারণ তার সঙ্গে মঙ্গলের যৌক্তিক সম্পর্ক তিনি কিছু খুঁজে পাননি (পৃ. ৮৪)। বুঝতে পারি, অমিয় দাশগুপ্তের চিন্তাভাবনায় যে-যুক্তির ঋজুতা আমাদের চমৎকৃত করে, তা তাঁকে বাইরে থেকে ততটা আহরণ করতে হয়নি, উৎস ছিল ভেতরেই – তাঁর বড় হয়ে ওঠার শুরুতে ওই গৈলা গ্রামে নিজের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিমণ্ডলেই। পাশ্চাত্যের এনলাইটেনমেন্টের শিখায় তাই তিনি সহজেই আলোকিত হতে পেরেছেন। তবে একই সঙ্গে রেনেসাঁর মানবমুখিনতাকেও স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে আত্মস্থ করেছেন। গৈলা গ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকূল পরিবেশ তার উপযোগী ছিল। আমরা লক্ষ করি, তাঁর শিকড়ের টান ও মনের মুক্তি পরবর্তী প্রজন্মেও সঞ্চারিত। দেখতে পাই, অলকনন্দার মেয়ের নাম ঋষিপর্ণা রেহানা (পৃ. ৮৬), ছেলে পার্থ দাশগুপ্তের দুই কন্যা, জুবেয়দা ও আয়েশা (পৃ. ৮৭)। সাংস্কৃতিক আবদ্ধতাকে তাঁরা অতিক্রম করেছেন। পুববাংলা ও উত্তর-ভারতের অন্য ধারাকেও অনায়াসে আপন করে নিয়েছেন। অনুমান করি, এটি সম্ভব হয়েছে তাঁরা অমিয় দাশগুপ্তের পুত্রকন্যা বলেই।
দূরে থাকলেও অধ্যাপক দাশগুপ্ত যে বাংলাদেশের চিন্তা ও কর্মভূমির সঙ্গে একাত্মবোধ করে এসেছেন, তার ইঙ্গিত পাই এই সংকলনে ছাপা তাঁর জীবনসায়াহ্নের এক রচনায়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গীয় অর্থনীতি পরিষদের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে (১৯৮২) সভাপতির ভাষণে তিনি প্রস্তাব করেন অর্থনীতি-বিষয়ে বাংলায় একটি সম্ভ্রান্ত পর্যায়ের ত্রৈমাসিক চালু করার। সেই সূত্রে তাঁর আন্তরিক আবেদন, ‘- আমরা কী এই বঙ্গীয় অর্থনীতি পরিষদের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থবিজ্ঞানীদের সঙ্গে আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করতে পারি না?’ এ পক্ষে তাঁর নিজের অভিমত তিনি অকপটে ব্যক্ত করেন, ‘আমি মনে করি
সে-ব্যবস্থায় উভয়পক্ষেরই লাভ। আমার নিজের এ-বিষয়ে একটুখানি দুর্বলতা আছে। ‘ওপার বাংলা’তেই আমার অর্থনৈতিক শিক্ষাদীক্ষা। বহুবছর অধ্যাপনাও করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওখানে আমার একটি ছাত্রসম্প্রদায় আছেন যাঁরা আজও আমাকে স্মরণ করেন এবং যাঁরা অনেকেই আজ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন। বাংলাভাষায় এঁদের অনুরাগও প্রচুর। আমাদের এপার থেকে সহযোগিতার আহ্বান জানালে এঁরা আন্তরিক সাড়া দেবেন এটা আমি খুবই আশা করি এবং এ-ও মনে করি এঁদের সহযোগিতার প্রয়োজন আছে – সাধারণভাবে পরিষদের, আর বিশেষভাবে আমার প্রস্তাবিত ত্রৈমাসিকের, সমৃদ্ধির দিক থেকে।’ (পৃ. ১০৫)
অর্থবিজ্ঞানীর নিরাসক্তির তলে তাঁর আপনত্বের ব্যাপ্তি ও মায়া অনাবিল প্রকাশ পায়। তবে এখানে যে ছাত্রসম্প্রদায়ের সঙ্গে সংযোগ তাঁর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অটুট ছিল বলেই আমাদের বিশ্বাস এবং যার ওপর তাঁর ভরসা ছিল অগাধ, আজ, ওই আবেদনের বাইশ বছর পর, তার কতটুকু অবশেষ আছে তা আন্দাজ করতেও সাহস পাই না। এদিকে বিশ্বব্যাংক ও অনুরূপ মুরুব্বিদের দাপটে অর্থবিজ্ঞান তার জ্ঞানমার্গ থেকে অনেকখানি বিচ্যুত। সওদাগরি হিসাব-নিকাশে ফায়দা লোটার তাগিদের অলজ্জ আড়ম্বরে সার্বিকভাবে মানুষের কল্যাণের ও ভবিষ্যৎ সুস্থিতির ভাবনা বিতাড়িতপ্রায়। তার সঙ্গে তাল মেলাতে অর্থবিজ্ঞানের চর্চাও দোকানদারির দিকেই ঝোঁকে। আধুনিকতর প্রযুক্তির ব্যবহারে তাৎপর্যহীন বক্তব্যও কৌলীন্য পায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অর্থনীতির প্রশ্ন-মীমাংসায় এই পার্শ্ব-পরিবর্তনকে অমিয় দাশগুপ্ত কি অনুমোদন করতেন? জানি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, তাঁর স্মৃতির বৃত্ত থেকে আমরা আজ অনেক দূরে সরে এসেছি এবং এই সরে-আসাকে ঢাক পিটিয়ে জাহিরও করছি।
বইটিতে অম্লান দত্ত তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য-নিবেদনে অমিয় দাশগুপ্ত যে অর্থনীতির ধ্যান-ধারণার পরিবর্তনের পর্ব-বিভাজন করেছেন, তার ওপর আলোচনা করেছেন। সমাজে মানুষের জীবনযাপন-প্রণালি যে অর্থনীতির তত্ত্বের উৎস, এটি প্রফেসর দাশগুপ্তের বিচার-বিবেচনায় প্রাথমিকতা পায়। অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর তত্ত্ব দাঁড়ায়। ক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতি ও নিওক্ল্যাসিক্যাল অর্থনীতির বাস্তব পটভূমি এক নয়। প্রথমটির ওপর পড়ে পুঁজির অধিকারে ও তার নেতৃত্বে শিল্পায়নের প্রারম্ভিক পর্বের ছাপ; দ্বিতীয়টি সুগঠিত পুঁজির দক্ষতা বাড়িয়ে তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে সমৃদ্ধ শিল্প-অর্থনীতি যে পরে গড়ে উঠতে থাকে, তার ওপর নির্ভরশীল। দুটিরই প্রেক্ষাপট পাশ্চাত্যে। তবে প্রকৃতিবিজ্ঞানের তত্ত্বের মতো একটিকে খারিজ করে অন্যটি উঠে আসে না। কারণ সমাজবিকাশের ধারা পৃথিবীজুড়ে একরকম নয়, একরৈখিকও নয়। পুরানো তত্ত্বই কোথাও কোথাও বেশি প্রাসঙ্গিক মনে হয়, যেমন, এই উপমহাদেশে, যেখানে শিল্প ও প্রযুক্তি তুলনায় অনগ্রসর, শ্রমের মজুরিহার কায়ক্লেশে শুধু বেঁচে থাকার মতো। এই প্রসঙ্গ অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখাটিতেও উঠে আসে। শিরোনাম, ‘পুরনো তত্ত্বের মৃত্যু নেই’। অমিয় দাশগুপ্তের ‘In economics old theories do not die’- এই মন্তব্যই এখানে তুলে ধরা। লেখাটি তারই ব্যাখ্যা।
তবে প্রফেসর দাশগুপ্ত এই জায়গাতে থেমে থাকেন না। বইটির শেষ পর্বে তাঁর যে-কটি মূল্যবান প্রবন্ধ সংযোজিত হয়েছে, তার একটি, ‘A Birds Eye Viwe of the Development of Economic Theory’। এতে আজকের উন্নয়নশীল দেশগুলো যে মৌলিক কিছু কিছু বিষয়ে ক্ল্যাসিকাল তত্ত্বকে অনুসরণ করে না, এটি খুব স্পষ্টভাবে তিনি উল্লেখ করেন। প্রথমত তথ্য, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ-ব্যবস্থা – কোনোটিই আগের জায়গায় স্থির নেই। এক অর্থনৈতিক-ব্যবস্থাতেও এ-সবে বৈচিত্র্য ও গুণগত পার্থক্য কোথাও কোথাও প্রকট। তাদের উৎসমুখ নির্দিষ্ট উৎপাদন-ব্যবস্থার ভেতরে না হলে বাইরে থেকে তারা ঢুকে পড়ে। সেই সঙ্গে আসে তাদের আনুষঙ্গিক ধ্যান-ধারণা, যা মূল্য-কাঠামোকে প্রভাবিত করে। পূর্ণ প্রতিযোগিতার বা অপূর্ণ প্রতিযোগিতার ছকে-বাঁধা চেহারাটি আর ধরা যায় না। জনসংখ্যা-বৃদ্ধির ক্ল্যাসিকাল তত্ত্বও খাটে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জন্মশাসন-ব্যবস্থার উন্নতিতে তা আর সবটুকু প্রকৃতিনির্ভর নেই, যদিও প্রকৃতির স্বেচ্ছাচারকেও সমাজের এক বৃহৎ অংশে উপেক্ষা করা যায় না। জনসংখ্যার নিবেশনে সমাজের নানা স্তরে নানা ধরন ফুটে ওঠে। শ্রমের মূল্যনির্ধারণও এক-এক কাজে এক-এক রকম। কায়েমি স্বার্থের নিয়ন্ত্রণের ছাপ তাতে অস্পষ্ট থাকে না। এ-অবস্থায় ভিন্ন অভিজ্ঞতার দাগ নিয়ে উঠে-আসা কোনো তত্ত্বই এখানে ঠিক-ঠিক খাপ খায় না। অর্থনীতিচর্চায় এটি চ্যালেঞ্জ হয়েই দাঁড়ায়।
এমন বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে গুনার মিরডাল সবরকম তত্ত্বের পিছুটানকে উপেক্ষা করতে বলেন। সহায়-সম্বল-বাধা-বিপত্তি যেমন আছে, সব নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গ্রহণযোগ্য সবচেয়ে ভালো পথটি খুঁজে নেওয়া এবং ভারসাম্যে বৈকুণ্ঠধামের কোনো স্বপ্ন মাথায় না রেখে শুধুই এগিয়ে যাওয়া, এইটিই তিনি বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন। প্রফেসর দাশগুপ্ত একমত হন না। আসলে
যে-চিন্তাপদ্ধতিতে তাঁর শিক্ষাদীক্ষা, তাতে তাত্ত্বিক সৌধনির্মাণ অথবা তত্ত্ব-শৃঙ্খলার আশ্রয় তাঁর কাছে অপরিহার্য ছিল। যতদিন না একটি সুসম্বন্ধ তত্ত্বকাঠামো উদ্ভাবিত হয়, ততদিন তিনি আগে পাওয়া বিভিন্ন তত্ত্বের প্রয়োগসাধ্য অংশগুলোর মিশ্রণ ঘটিয়ে কাজ চালানোর মতো একটি চিন্তাসূত্র গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিলেন। প্রবন্ধটির সমাপ্তি টানেন তিনি এইভাবে – ‘After all, there are elements in existing systems which can very profitably be assimilated into the economics of underdeveloped regions, SmithÕs Ôproductive labourÕ, RicardoÕs Ônet revenueÕ, MarxÕs Ôextended reproduction schemeÕ, KeynesÕs Ôinflationary gapÕ _ these are tools of
analysis which, be they of Western origin, are an indispensable aid to an understanding of the basic problems of underdeveloped regions. I would have them by all means. Nor would I leave out the general equilibrium
system altogether from my syllabus. First, the technique that it offers is a useful guide to
systematic thinking on the nature of economic interrelationships. Secondly, it does
provide a basis for the planning of production (at aû rate, in the
context of the short period) for the economy as a whole, given the constraints within which it is supposed to operate.Õ (p.114)
কিন্তু এটি কোনো সমাধান নয় এবং এ-ব্যাপারে তিনি যে সচেতন ছিলেন না, তা নয়। প্রতিটি তত্ত্বের পেছনে যে-প্রত্যয়, বা প্রত্যয়গুচ্ছ থাকে, তা তার গ্রহণযোগ্যতা-প্রমাণে সহায়ক হয়। আজকের বাস্তবতায়, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রত্যয়রাশির অধিকাংশই অস্তিত্বহীন অথবা অকেজো। তা সত্ত্বেও তাদের ওপর ভর করে যেসব তত্ত্বের নির্মাণ, সেগুলোর প্রয়োগসিদ্ধির মেকি উদাহরণ খাড়া করে তাদের নিয়ে হইচই
বিদ্যা-বাণিজ্যের কায়েমি স্বার্থের ওপরতলায় প্রশ্রয় পায় হয়ত, কিন্তু তাতে কাজের কাজ তেমন কিছু হয় না। বাস্তব ঘটনাশ্রয়ী প্রশ্ন-মীমাংসার পথ অজানাই থেকে যায়।
অমিয় দাশগুপ্তর মতো সৎ তত্ত্বজিজ্ঞাসুর কাছে এমন অবস্থা তৃপ্তিদায়ক হওয়ার কথা নয়। হয়ওনি। তাই দেখি, পরিণত বয়সে তিনি মহাত্মা গান্ধীর অর্থনৈতিক ভাবনার দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন। আমাদের বাস্তবতায় প্রকৃতি, মানুষ ও সম্পদের নিবিড় সম্পর্কের নির্ভেজাল উপলব্ধি তাঁর অবলম্বন। একে উপেক্ষা করা নিজের মনকেই চোখ ঠারা। প্রফেসর দাশগুপ্ত তা করেননি। ইচ্ছা ছিল তাঁর, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে গান্ধীর অর্থনৈতিক ভাবনার এক সুশৃঙ্খল ও পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক রূপ তিনি রচনা করবেন, কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি। হাতে যথেষ্ট ফাঁকা সময় ছিল না। তার চেয়েও যা গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়, তা হলো তাঁর
চিন্তাকাঠামোকে নতুন করে
ঢেলে সাজাবার প্রয়োজনীয়তা। পাশ্চাত্যের ক্ল্যাসিকাল ও
নিও-ক্ল্যাসিকাল চিন্তার ঐতিহ্যে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। বিদ্যাচর্চার পরিবেশ তা থেকে বেরিয়ে আসার অনুকূল ছিল না। অথচ গান্ধীর ভাবনাবিশ্ব তাঁকে প্রত্যাখ্যান না করলেও অনেক জায়গায় খণ্ডন করে। গান্ধী-ভাবনায় উত্তমায়ন-অপেক্ষকে আলাদা আলাদা ব্যক্তির তৃপ্তি বা লাভের চেয়ে কল্যাণই বেশি প্রাধান্য পায়। এই কল্যাণ একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; তারা পরস্পর নির্ভরশীল। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন পদ্ধতি-প্রকরণে কেবল তাকে সার্বিকরূপ দেওয়ার কথা ভাবা যায়। তবু গ্রামীণ অর্থনীতিতে চরকা ও তাঁতকে প্রতীকী অবলম্বন করে কর্ম, আয়
ও কার্যকর চাহিদাসৃষ্টির
যে-আয়োজন গান্ধী আন্দোলনের আকারে সামনে এনেছিলেন,
তা স্বল্পপুঁজির অতি দরিদ্র আর্থসামাজিক বাস্তবতায় উলটোদিকে উন্নত পুঁজির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় কেইনসীয় ভাবনারেখার প্রতিস্পর্ধী। এবং তা সবদিক থেকে মৌলিক। কেইন্সের পুরোগামীও বটে। অমিয় দাশগুপ্তের মতো প্রখর চিন্তার মানুষের কাছে যে তা আকর্ষণীয় মনে হবে, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যদিও তাকে সাজিয়ে উপস্থাপনের ইচ্ছা তাঁর অপূর্ণই থেকে যায়। অবশ্য অর্থনৈতিক-ব্যবস্থা যদি বদ্ধ না হয় এবং পুঁজি ও প্রযুক্তির স্বাধীন চলাচল যদি অব্যাহত থাকে, তবে অর্থনীতির মুক্তকাঠামোয় গান্ধী-ভাবনার সমন্বিত রূপের সুসামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া মুশকিলও বটে। প্রফেসর দাশগুপ্ত এই জায়গাতেও বাধা পেয়ে থাকতে পারেন।
‘On Lenin নামে তাঁর
যে-রচনাটি এখানে আমরা পাই, লেনিন জন্ম-শতাব্দীতে (১৯৭০) তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তা লেখা। তবু এখানেও মূল প্রশ্নগুলো তিনি ঠিক ঠিক চিহ্নিত করেন। তখনো আমরা জানতাম, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সমাধান করেছে। লেনিনই ওই সমাধানসূত্রের জনক। কালের নিষ্ঠুর পাশ-ফেরায় আজ দেখি, কোনো সমাধানই খাঁটি নয়। মার্কসের দূরদৃষ্টি লেনিন অতিক্রম করেননি। অতিক্রম করতে গিয়ে অনর্থের বীজই বুনে গেছেন। তার বিষময় ফল এতদিনে ফলতে শুরু করেছে। লেনিনের বিশালত্ব এতে অবশ্য ক্ষুণ্ন হয় না। তাঁর সাফল্য যে আজ আরো বড় ব্যর্থতা ডেকে আনল, তা এক অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন প্রবল প্রাণের প্রয়োগসিদ্ধির স্থায়ী না হওয়ার ব্যর্থতা।
অমিয় দাশগুপ্তের আরো কটি লেখা এখানে আছে। প্রতিটি আমাদের ভাবায়। প্রতিটিই প্রশ্ন করায়, উসকে দেয়। আপাতত সেদিকে আর যাচ্ছি না। যাঁরা পড়বেন, তাঁরাই আপন আপন দৃষ্টিকোণ থেকে তর্কের মল্লভূমিতে নামতে চাইবেন। এটি প্রফেসর দাশগুপ্তকে খাটো করা নয়। বরং তাঁর অভিপ্রায়কেই মূল্য দেওয়া। একজন জাত-শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলাকে তিনি তাঁর অন্যতম প্রধান কাজ বলে মনে করতেন। শ্রীমতী দাশগুপ্ত যাকে বলেছেন ‘কম্বলের লোম বাছা,’ এবং মেয়ে অলকনন্দা যা প্রফুল্ল কৌতুকের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, তাতে তিনি নিজে যেমন মশগুল হয়ে থাকতে পারতেন, তেমনি অন্যদেরও তাতে উৎসাহ যোগাতেন। ভক্তিমার্গের লোক তিনি ছিলেন না। তর্কে-বিতর্কে তাঁর মুখোমুখি হওয়াটাই তাঁকে একভাবে শ্রদ্ধা জানানো। তাঁর স্মৃতিকেও এইভাবে আরো জীবন্ত করে তোলা।
শ্রীমতী দাশগুপ্তের কথা না বললে এই বইয়ের আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। যাঁরা তাঁদের কাছে এসেছেন, তাঁরা প্রায় সবাই, দেখি, অমিয় দাশগুপ্তের কথা বলতে একই সঙ্গে সমান উচ্ছ্বাসে শান্তি দাশগুপ্তের কথা বলেন। অশোক মিত্র লেখেন,
‘- কাশীতে ওই কয়েকটা মাস থাকার সবচেয়ে বড়ো লাভ, অমিয় দাশগুপ্ত মশাইয়ের কাছে অর্থশাস্ত্রে হাতেখড়ি, যা সারাজীবন আমার পাথেয় জুগিয়েছে। অন্য যে-লাভের কথা সেই সঙ্গে বলতে হয়, তাঁর এবং তাঁর স্ত্রী শান্তি মাসিমার কাছ থেকে অপত্যস্নেহপ্রাপ্তি। ঘরের ছেলে হয়েই গিয়েছিলাম, ঘরের ছেলে হয়েই থেকেছি পরবর্তী চল্লিশটিরও বেশি বছর।’ (পৃ-৫৩) নবনীতা দেবসেন, সুপূর্ণা দত্ত – এঁরাও স্মরণ করেন তাঁর প্রসন্ন আনন্দময় ব্যক্তিত্ব, গভীর মমতাবোধ ও স্বতঃস্ফূর্ত স্নেহ। কন্যা অলকনন্দা জানান, ‘Mother was a livewire with an infectious laughter, hospitable and generous to the extreme, making everyone
comfortable and welcome whatever their status in the world. … Arun Majumdar, an economist at Vishwa-Bharati whom Baba and Ma were very fond of once asked Baba, ÔSir, all that you have achieved, name, fame, satisfaction, would you have got it, if you did not have Mashima and her support? Baba gave his open hearty laughter, shook his head vigorously and
said, Never, never, never (p.79).
শ্রীমতী দাশগুপ্তের প্রতি এই সমীহ ও সম্মান, এটি তাঁর আপন পরিপূর্ণতার স্বচ্ছন্দ প্রকাশে আর সবাইকে একাত্ম করে নেওয়ার পরিণাম। ক্ষুদ্র আত্মপরায়ণতা থেকে বেরিয়ে এসে পরার্থপরতায় নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে তিনি সার্থক হন, আর সবাইকেও সার্থক করেন। অন্যরা তা মনে রাখে। তাঁর প্রাপ্তির খাতা তৃপ্তির সত্যমূল্যে ভরে যায়। কিন্তু তাত্ত্বিক অর্থনীতির চর্চায় অমিয় দাশগুপ্ত একে মেলাবেন কী করে? তিনি বলেন, এটি শ্রীমতী দাশগুপ্তের ‘পযড়রপব’; কিন্তু এ-কোনো সদুত্তর নয়, বরং প্রশ্নটিই ফিরিয়ে দেওয়া। অমর্ত্য সেন যে ‘tamed housewifes preferences’-এর প্রসঙ্গ টানেন, তা দিয়েও এর সংগত ব্যাখ্যা মেলে না। আসলে ব্যক্তিকে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির একমাত্র একক ধরে এবং প্রত্যেকের তৃপ্তি পরস্পর অনপেক্ষ ধরে ব্যক্তির ও সমাজের সর্বোত্তম অবস্থার দিকে এগোবার পথ খুঁজলে শান্তি দাশগুপ্তের এবং তাঁর মতো আরো অসংখ্য মানব-মানবীর প্রকৃত তৃপ্তির কোনো পরিমাপই আমরা করতে পারব না। ব্যক্তিকে তার প্রাকৃতিক ও মানবিক পরিমণ্ডলে স্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়ে। আর সবকিছু একই রকম ধরে নিলে একটি যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছোনো সহজ হয়, কিন্তু সে-সমাধান শোচনীয়ভাবে শূন্যগর্ভ থেকে যায়। এই ফাঁকির ওপরে দাঁড়িয়েই কিন্তু আমাদের মূলধারার অর্থনীতি সগৌরবে নিজেকে জাহির করে চলেছে। তারই চর্চায় ও উৎকর্ষসাধনে অমিয় দাশগুপ্ত আজীবন নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। বিচিত্রপথে তিনি এগিয়েছেন সত্য, তবু যে-চিন্তাকাঠামোয় তাঁর উত্তরাধিকার, তা অনেক মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষা করে গেছে।
এই কথাগুলো বলা মানে কোনো ত্রুটি খোঁজা নয় – প্রকৃতপক্ষে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়ে অমিয় দাশগুপ্তের আদর্শের যোগ্য হয়ে ওঠার চেষ্টা করা এবং তার সুযোগ করে দিয়েছে এই শতবার্ষিকী শ্রদ্ধার্ঘ্য। আবেগের সততা ও বুদ্ধির প্রখরতা তাদের ছাপ রেখে যায় এই অসামান্য আয়োজনে। আগেই বলেছি, এ-এক অমূল্য অবদান। সেই জন্যেই কি বইটিতে কোনো দামের উল্লেখ নেই? এতে কিন্তু সংকীর্ণ আক্ষরিক অর্থে বইটি ‘অমূল্য’ হয়ে পড়ে। তার একটি অসুবিধা, দোকান থেকে আমরা কেউ বইটি কিনতে পারি না, আমার মতো আকস্মিক কেউ হাতে না পেলে এর অস্তিত্ব তার কাছে অজানাই থেকে যায়।
একই সঙ্গে কিন্তু এভাবে বইটি অধ্যাপক দাশগুপ্তের একটি সুচিন্তিত মন্তব্যকে খণ্ডন করে। এখানে প্রকাশিত তাঁর ‘মানুষ ও তার অর্থনৈতিক আবেষ্টনী’ প্রবন্ধে তিনি প্যারেটোর বরাত দিয়ে জানান, ‘- এই অর্থনীতির অলঙ্ঘনীয় নিয়ম – বিনামূল্যে খাবার সংস্থানের উপায় নেই। …শুধু খাবার কেন, আমাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, আসবাবপত্র, জীবননির্বাহের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রায় সবকিছুর জন্যই উপযুক্ত মূল্য দিতে হয়। এটা অর্থনৈতিক সমাজের বিধান।’ (পৃ. ১০০)
আসলে এটি বাজার-ব্যবস্থার বিধান। তাকে অতিক্রম করেও সমাজে কিছু কিছু ক্রিয়াকর্ম চলতে পারে, যাতে প্রয়োজন মেটানোয় বা তৃপ্তিবিধানে দামের প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই; কোথাও কোথাও তা আংশিক মাত্র। এমন অনেক আদান-প্রদানে আমরা অভ্যস্ত যেখানে উপহার অথবা সামাজিক বা পারিবারিক দায়ের পেছনে কোনো দাম মেটাবার ব্যবস্থা থাকে না। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বাজার যেখানে অকর্মণ্য বা পক্ষপাতমূলক, সেখানে ভর্তুকিও কোনো বিকার নয়। সার্বিক মূল্যমানে সামঞ্জস্য আনার জন্য তা সংগত ও অপরিহার্য হয়ে পড়তে পারে।
তবে এখানে বইটিতে প্রাপ্তিস্থান ও দামের কোনো উল্লেখ না থাকা আমাদের মুশকিলেই ফেলে। পাঠক কীভাবে বইটি সংগ্রহ করতে পারেন, তা বোঝা
যায় না।
সবশেষে একটি আক্ষেপের কথা। বইটিতে যাঁরা প্রফেসর দাশগুপ্তকে শ্রদ্ধানিবেদন করেছেন, তাঁদের ভেতর অনাত্মীয় তরুণ অর্থনীতিবিদ বা শিক্ষার্থী কেউ আছেন বলে মনে হলো না। তিনি কি তবে ওখানেও হারিয়ে যাচ্ছেন? যদি তা-ই হয়, তবে তা সমূহ ক্ষতির ও অপরিসীম বেদনার। অন্তঃসারশূন্যতায় অর্থনীতির যাত্রাকেও তা অনেকখানি চিনিয়ে দেয়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.