একটি অভিধানের জন্ম

The Professor and the Madman :

a tale of murder, insanity, and the making of the Oxford English Dictionary

Simon Winchester

HarperPerennial      Nwe York, 1999

Price: US $ 13.00

১৯১৫ সালের জুলাই মাসে একদিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডি সি শহরের সানডে স্টার পত্রিকায় আট কলাম হেডলাইনের একটি খবর সবাইকে, বিশেষ করে আমেরিকার বিদ্বৎসমাজকে, চমকে দিয়েছিল। খবরটি ছিল এই, AMERICAN MURDERER HELPED WRITE OXFORD DICTIONARY। চমক লাগানো এই হেডলাইনের নিচে যে-খবরটি লেখা হয়েছিল তা মোটামুটি এ-রকম :

১৮৯৬ সালের একদিন অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারির স্বনামধন্য সম্পাদক ডক্টর জেম্স মারে এই অভিধান-রচনায় যেসব বিদ্বান ব্যক্তি স্বেচ্ছায় বিভিন্ন শব্দ সংগ্রহ করে, সেগুলোর অর্থ এবং প্রয়োগ-ইতিহাস-রচনায় সহায়তা করে যাচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একজন, ডক্টর উইলিয়াম মাইনরকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে বলা হয় যে, যদিও গত সতেরো বছর ধরে ডক্টর মাইনর ডাক-মারফৎ এই অভিধান-রচনার কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহায্য করে যাচ্ছেন কিন্তু নানা কারণে তাঁদের দুজনের মধ্যে কখনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। ডক্টর মারে নিজেও সম্পাদক হিসেবে অভিধান-রচনা-তত্ত্বাবধানের কাজে ব্যস্ততার কারণে এর মধ্যে প্রায় কোনোদিনই অক্সফোর্ড শহরের বাইরে কোথাও যেতে পারেননি। ডক্টর মাইনর থাকেন অক্সফোর্ড থেকে মাত্র মাইল চল্লিশেক দূরে ক্রোথর্ন শহরে (ব্রডমুর, ক্রোথর্ন, বার্কশায়ার)। কিন্তু এত কাছে থেকেও ডক্টর মাইনর এই সতেরো বছরের মধ্যে একদিনের জন্যেও অক্সফোর্ড শহরে আসেননি। পত্র-মারফৎ ডক্টর মাইনরের পাঠানো হাজার হাজার শব্দের তালিকা, সেগুলোর উৎপত্তি এবং প্রয়োগ-ইতিহাস ইত্যাদি সম্বন্ধে এতদিন ধরে যদিও দুজনের মধ্যে নানারকম মূল্যবান মতামত আদানপ্রদান হয়েছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাঁদের কখনো দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। কাজেই ডক্টর মারে তাঁর চিঠিতে প্রস্তাব করলেন, ডক্টর মাইনর অনুমতি দিলে তিনি নিজে ক্রোথর্ন শহরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং এই অভিধান-প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য নিজের এবং এই অভিধানের উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে তাঁকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন।

পত্রের উত্তরে ডক্টর মাইনর যথারীতি বিনয় এবং গাম্ভীর্যের সঙ্গে জানালেন, ডক্টর মারে তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন, এটি তাঁর জন্যে অত্যন্ত আনন্দের কথা। তিনি কবে কোন ট্রেনে কতটার সময়ে পৌঁছাবেন তা জানালে তাঁর জন্যে স্টেশনে গাড়ি পাঠানো এবং অন্যান্য ব্যবস্থা করা হবে।

সেভাবেই সবকিছু ঠিক হলো। নির্ধারিত দিনে ডক্টর মারে ট্রেনে একঘণ্টার পথ অতিক্রম করে বিকেলের দিকে ক্রোথর্নে গিয়ে পৌঁছলেন। ট্রেন থেকে নেমে তাঁর জন্যে অপেক্ষমাণ ব্রুহ্যাম গাড়ি এবং উর্দি-পরা গাড়োয়ান দেখেই ডক্টর মারে বুঝতে পারলেন যে, ডক্টর মাইনর সম্পর্কে তাঁর ধারণাই ঠিক, মাইনর নিশ্চয়ই একজন বিত্তবান এবং হাতে-প্রচুর-সময়-থাকা অভিজাত শ্রেণির মানুষ। প্রায় গ্রামের মতো ছোটো শহরের পথ পেরিয়ে একসময়ে গাড়ি মোড় নিল শহর ছাড়িয়ে গ্রামের দিকে এবং অল্পক্ষণ পরেই দুদিকে সারি দেওয়া গাছের মধ্য দিয়ে একটি বাঁধানো সড়কের ওপর দিয়ে গাড়ি পৌঁছলো একটি বিরাট প্রাসাদের ফটকের সামনে। ডক্টর মারে নামলেন, তারপর এগিয়ে-আসা একজন দারোয়ানের পিছু পিছু গিয়ে বড় গেট পার হয়ে ঢুকলেন বিশাল বড় একটি ঘরে। সেখানে তাঁর অপেক্ষায় বসে রয়েছেন এক ভারিক্কি চেহারার, অফিসের বড়সাহেব-ধরনের একজন ভদ্রলোক।

ডক্টর মারে করমর্দনের জন্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন তাঁর দিকে। বললেন, আমি লন্ডন ফিলোলজিকাল সোসাইটির সদস্য এবং বর্তমানে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি-সম্পাদনায় নিয়োজিত ডক্টর মারে। আপনিই নিশ্চয় ডক্টর মাইনর? অবশেষে আপনার সঙ্গে দেখা করার সৌভাগ্য হওয়ায় আমি আনন্দিত।

কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। যাঁকে উদ্দেশ্য করে একথা বলা, তিনি একটু ইতস্তত করে বললেন, আমি দুঃখিত, স্যার, এই সম্মান ও গৌরব আমার প্রাপ্য নয়। আমি এই ব্রডমুর ক্রিমিনাল লুনাটিক অ্যাসাইলামের সুপারিন্টেন্ডেন্ট মাত্র। ডক্টর মাইনর একজন আমেরিকান এবং তিনি আমাদের এখানকার দীর্ঘস্থায়ী বাসিন্দাদের একজন। উনি খুনের অপরাধে অপরাধী এবং মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ।

অতঃপর সুপারিন্টেন্ডেন্ট মহোদয় একজন সহকারীকে নির্দেশ দিলেন ডক্টর মারেকে অপেক্ষমাণ উইলিয়াম মাইনরের ঘরে নিয়ে যেতে।

এভাবেই অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি, যেটি ইংরেজি ভাষার প্রথম পূর্ণাঙ্গ অভিধান এবং সর্বকালীন একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে সুপরিচিত, তার প্রথম ও প্রধান সম্পাদক জেম্স মারের সঙ্গে অভিধানের শয়ে শয়ে স্বেচ্ছায় অবদানকারীদের (voluntary contributors) মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিটির প্রথম সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হলো।

পাঠকদের চমকে দেওয়া এই রোমাঞ্চকর খবরটি কিন্তু ছিল বেশকিছু ভুলে ভরা। সম্পূর্ণ ভুল না হলেও, অর্ধসত্য এবং নানারকম কল্পনার রঙে মেশানো। আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগে প্রকাশিত সেই ভুল খবরটি, সেই অর্ধসত্য এবং সাংবাদিকের কল্পনার রং-মেশানো বিষয়টিই সম্পূর্ণভাবে ব্যাপক গবেষণা এবং তথ্য-অনুসন্ধানের পরে পাঠকদের উপহার দিয়েছেন সাইমন উইনচেস্টার দ্য প্রফেসর অ্যান্ড দ্য ম্যাডম্যান : আ টেল অফ মার্ডার, ইনস্যানিটি, অ্যান্ড দি মেকিং অফ দি অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি নামে আড়াইশ পৃষ্ঠার একটি বইতে। নিউইয়র্কের হার্পার কলিন্স পাবলিশার্স (১৯৯৮) প্রকাশিত বইটি ইতিপূর্বেই ব্রিটেনের পেঙ্গুইন বুকস্ থেকে প্রকাশিত হয়েছে The Surgeon of Crowthorne : a tale of murder, madness and love of words নামে। প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তা সাড়া জাগিয়েছে সবখানে। এতে বর্ণিত ঘটনা যেমন রোমাঞ্চকর, এর রচনারীতি তেমনি হৃদয়গ্রাহী।

রহস্য-উপন্যাসের মতো নামের এই বইটি উত্তেজনাপূর্ণ একটি খুনের বর্ণনা দিয়ে শুরু হলেও এতে আছে ইংরেজি ভাষার তথা পৃথিবীর যে-কোনো ভাষার অন্যতম বিস্ময়কর অভিধান-সৃষ্টির পূর্ণ ইতিহাস এবং সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত দুজন ব্যক্তির জীবনকাহিনী। এঁদের মধ্যে একজন স্যার জেম্স মারে, ব্রিটিশ জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে একটি চিরস্মরণীয় নাম। অপর ব্যক্তিটি আমেরিকার উত্তর-পূর্ব উপকূলের একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। জন্ম তাঁর সিংহল দ্বীপে (১৮৩৪ সালে আজকের শ্রীলঙ্কা ইংরেজি সিলোন এবং বাংলায় সিংহল নামেই পরিচিত ছিল), যেখানে তাঁর বাবা-মা গিয়েছিলেন ধর্মপ্রচারক হিসেবে।

এই বইটি আসলে এই দুই ব্যক্তিরই কাহিনী। বলা যেতে পারে, এ টেল অফ টু পারসোনালিটিজ। এবং অবশ্যই এঁদের মধ্যে যোগসূত্রস্থাপনকারী একটি অভিধানের।

জেম্স মারের জন্ম ১৮৩৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে স্কটল্যান্ডের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে। বাবা ছিলেন সামান্য একজন দর্জি এবং ছোটোখাটো বস্ত্র-ব্যবসায়ী। অনেক ভাইবোনের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা জেম্স অল্পবয়সেই লেখাপড়ায় উৎসাহের পরিচয় দেন। দীর্ঘকায় সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী এই ছেলেটি অতি দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে পনেরো বছর বয়স পেরোনোর আগেই শিখে ফেলেন ফরাসি, লাতিন, জার্মান এবং গ্রিক ভাষা। তাঁর জানার এবং শেখার কৌতূহল সবাইকে অবাক করে দেয়। ইতিহাস, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, প্রত্নতত্ত্ব এবং সর্বোপরি শব্দতত্ত্ব – সব বিষয়ে সমান কৌতূহলের অধিকারী ছেলেটিকে কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয় চোদ্দ বছর বয়সেই। তাতে অবশ্য থেমে থাকেনি তাঁর জ্ঞানচর্চা। সতেরো বছরে পৌঁছতেই তাঁকে ডেকে নিয়ে শহরের একটি স্কুলে অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টারের পদে নিয়োগ করে স্কুল-কর্তৃপক্ষ। বিশ বছর পার হতে-না-হতেই তাঁকে উন্নীত করা হয় হেডমাস্টারের পদে।

এই সময়ে তাঁর জীবনে আবির্ভাব হয় প্রেমের। ২৪ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করে ফেলেন বাচ্চাদের স্কুলের এক সংগীত-শিক্ষক তাঁর প্রেমিকা ম্যাগি স্কটকে। দুবছরের মাথায় তাঁদের একটি কন্যাসন্তান জন্মে এবং জন্মের কিছুদিন পরেই শিশুটির মৃত্যু হয়। এর পরেই ম্যাগি স্কটের যক্ষ্মারোগ ধরা পড়ে। আর্থিক অনটন এবং স্ত্রীর চিকিৎসার খরচের দায় মেটাতে না পেরে স্বামী-স্ত্রী চলে আসেন লন্ডন শহরে। জেম্স সেখানে চাকরি নেন চার্টার্ড ব্যাংক অফ ইন্ডিয়াতে। এই সময়ে তাঁর জ্ঞানচর্চা কিছুদিনের জন্যে বাধাপ্রাপ্ত হলেও লন্ডনে এসে তা আবার শুরু হয়। হিন্দুস্তানি ভাষা শিখে ফেলেন তিনি অল্পদিনের মধ্যে এবং আরো কয়েকটি প্রাচ্যভাষা শেখা শুরু করেন। ওদিকে ম্যাগির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে এবং তিনি মারা যান কিছুদিনের মধ্যে। অল্পকালের মধ্যেই আবার প্রেমে পড়েন জেম্স। এবারে বিয়ে করেন শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের মেয়ে অ্যাডা রুথভেনকে। এই বিয়ে দীর্ঘস্থায়ী পারিবারিক সুখের মুখ দেখায় জেম্স মারেকে, মুখ দেখায় এগারোটি সন্তানের।

ভাষাতত্ত্বে জেম্স মারের উৎসাহ, এখানে ওখানে এ-বিষয়ে লেখালেখি তাঁকে সে-সময়ে পরিচিত করে দুই বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে। এঁদের একজন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজের অঙ্কের শিক্ষক আলেকজান্ডার এলিস এবং দ্বিতীয়জন তখনকার একজন নামকরা ধ্বনিতত্ত্ববিদ (চযড়হবঃরপরধহ) হেনরি সুইট। বলা হয়, বার্নার্ড শ তাঁর পিগম্যালিয়ন নাটকের প্রফেসর হেনরি হিগিন্স-চরিত্রটি এই হেনরি সুইটের আদলেই এঁকেছিলেন। এঁদের মাধ্যমে জেম্স মারের পরিচয় হয় ফিলোলজিকাল সোসাইটির সঙ্গে। অল্পদিনের মধ্যেই, ১৮৬৯ সালে, এই ছেলেটি, যে-চোদ্দ বছর বয়সের পর আর কোনোদিন স্কুলে যায়নি, এই নাক-উঁচু স্বাতন্ত্র্যাভিমানী প্রতিষ্ঠানের একজন কাউন্সিল-সদস্য হয়ে যান। ১৮৭৩ সালে ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে লন্ডন শহরে মিল হিল স্কুল নামে একটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। প্রকাশিত হয় তাঁর গবেষণামূলক রচনা দি ডায়ালেক্ট অব দি সাদার্ন কাউন্টিজ অফ স্কটল্যান্ড। এই লেখাটিই তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করে ব্রিটিশ বিদ্বৎসমাজে। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার নবম সংস্করণে ইংরেজি ভাষার ইতিহাস-সম্বন্ধে একটি রচনার অনুরোধ পান তিনি। বন্ধুত্ব লাভ করেন ফিলোলজিক্যাল সোসাইটির সম্পাদক, ভিক্টোরিয়ান ব্রিটিশ-সমাজের নামকরা পণ্ডিত ফ্রেডারিক ফার্নিভালের।

এবারে যাওয়া যাক কাহিনীর অপর চরিত্রটির কাছে। সিংহল দ্বীপে বসবাসরত আমেরিকান ধর্মযাজক দম্পতির সেই ছেলেটি, উইলিয়াম চেস্টার মাইনর, দশ-বারো বছর বয়সেই হয়ে ওঠেন সিংহলি ভাষায় পারদর্শী। সেই সঙ্গে শিখে ফেলেন হিন্দি, তামিল এবং বর্মি ভাষাও। অবসরসময়ে এই সুদর্শন ছেলেটি বাপ-মায়ের চোখের বাইরে ঘুরে বেড়ান সমুদ্রের পাড়ে এবং সেখানে একগাদা সিংহলি মেয়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠেন। স্বল্পবসনা দেহে সমুদ্রতীরে তাদের নেচে-গেয়ে ঘুরে বেড়ানো উদ্দাম জীবন তাঁর জীবনে সৃষ্টি করে এক ধরনের অপরিপক্ব যৌনতার।

চোদ্দ বছর বয়সে বাপ-মা তাঁকে লেখাপড়ার জন্যে পাঠিয়ে দেন আমেরিকায়। পিতৃব্যের কাছে নিউ হ্যাভেনে থেকে কলেজে ভর্তি হন তিনি। চটপট সব পরীক্ষায় পাশ করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুলে ছাত্র হিসেবে নাম লেখান উইলিয়াম মাইনর। ছয় বছর পরে ডাক্তার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সেটি আমেরিকান গৃহযুদ্ধের ঠিক মাঝামাঝি সময়। ১৮৬৩ সালের ২৯ জুন তিনি যোগ দেন ইউনিয়ন সেনাবাহিনীতে, একজন সাময়িক সহকারী সার্জন হিসেবে। এর চারদিন পরেই ঘটেছিল গেটিসবার্গের সেই বিখ্যাত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

সার্জন মাইনরকে কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করতে হয় আরো মাসছয়েক পরে। যুদ্ধক্ষেত্রের নৃশংসতা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চয়ই বিষিয়ে দিয়েছিল এই তরুণ বিদ্যোৎসাহী, অন্তর্মুখী সুদর্শন এবং ভদ্র ডাক্তারটির মন। যুদ্ধের সেই পর্যায়ে ভয়াবহতা তখন ইউনিয়ন এবং কনফেডারেট দুপক্ষের সেনাবাহিনীতেই এমন এক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়াটা হয়ে উঠছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সে-সময়ে ডেজার্শনের এই অপরাধের শাস্তি ছিল কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড। পালিয়ে যাওয়া কোনো সৈনিক ধরা পড়লেই তাকে এক সংক্ষিপ্ত কোর্টমার্শালে দণ্ড দেওয়ার পরপরই সেই শাস্তি কার্যকর করা হতো। আর সবক্ষেত্রেই উপস্থিত থাকতে হতো ডাক্তারকে। রোজ হাসপাতালে আহত ক্ষতবিক্ষত সৈনিকদের চিকিৎসা করে তার ওপর আবার মাঝে মধ্যে মৃত্যুদণ্ডসহ নানারকম অমানবিক শাস্তি কার্যকর প্রত্যক্ষ করায় এই তরুণ ডাক্তারের সংবেদনশীল মনে কী প্রতিক্রিয়া হতো তা সহজেই অনুমান করা যায়। একটি ঘটনার কথা তাঁর চাকরির ইতিহাস বই থেকে জানা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পালিয়ে যাওয়া সৈনিকদের শাস্তি দেওয়া হতো তাদের শরীরে লোহার ছাঁচ গরম করে তা দিয়ে পুড়িয়ে। একে বলা হতো ব্র্যান্ডিং করা। সারাজীবন শরীরে সেই চিহ্ন ‘ডি’ (ডেজার্টার) বয়ে বেড়াতে হতো শাস্তিপ্রাপক সৈনিককে। সমাজে কোথাও আর তার স্থান হতো না। রেজিমেন্টাল ডাক্তারকেই করতে হতো এই কাজটি। উইলিয়ামকে একদিন এই গরম লোহার ছাঁচের চিহ্ন এঁকে দিতে হয়েছিল এক তরুণ আইরিশ ডেজার্টারের শরীরে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অবসন্ন ভীত-শঙ্কিত এই ছেলেটির শরীরে এই কাজটি করতে গিয়ে মনে মনে শিউরে উঠেছিলেন মাইনর। নিজের মনকে প্রশ্ন করেছিলেন, ডাক্তার হিসেবে মানুষকে সুস্থ করে তোলার যে-হিপোক্র্যাটিক শপথ নিয়েছিলেন, এই কাজটি কি তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ?

যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই কৃতিত্বপূর্ণ কাজের জন্যে পদোন্নতি পেয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর একজন নিয়মিত অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্জন হিসেবে নিয়োগলাভ করেছিলেন তিনি। তাঁর পোস্টিং হয়েছিল নিউইয়র্ক শহরের কাছে গভর্নর আইল্যান্ডে। এখানেই তাঁর সহকর্মীরা একসময়ে তাঁর আচার-আচরণে কিছু অসংগতি লক্ষ করতে শুরু করেন। শান্তশিষ্ট, পড়ুয়া এবং শিল্পকর্মের ভক্ত এই তরুণটি প্রায়ই রাতের বেলায় চলে যেতে লাগলেন নিউইয়র্কের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ নিষিদ্ধ পল্লী এবং শুঁড়িখানাগুলোতে। ফলে প্রায়ই তার প্রয়োজন হতো নানারকম যৌনরোগের চিকিৎসার।

এ-সময়েই, কথা নেই বার্তা নেই, তিনি একটি মেয়েকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসেছিলেন। মেয়েটি কে, তা অবশ্য কোনোদিন জানা যায়নি। কিছুদিন পরেই জানা গিয়েছিল যে, মেয়েটি তার মায়ের কথামতো এই বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। উইলিয়ামের মনে এর কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল জানা যায়নি। তবে তার রাত্রিকালীন উচ্ছৃঙ্খলতা কমেনি একটুও। এমনকি এই সময়ে তাঁর কথাবার্তাতেও একটু অসংগতি লক্ষ করতে পারছিল সহকর্মীরা।

ততদিনে ক্যাপ্টেনের পদে উন্নীত সার্জন মাইনরের এ-ধরনের আচরণের খবর কিন্তু চলে গিয়েছিল আর্মি হেড কোয়ার্টারে। ফলে একদিন তাঁকে বদলি করে দেওয়া হলো ফ্লোরিডার নির্জন ছোট একটি ক্যাম্পে, শহরের প্রলোভনের হাতছানির বাইরে। এতে উপকার হলো না মোটেও। সবসময়ের শান্ত মানুষটি কখনো কখনো ভীষণরকম মেজাজি হয়ে উঠতে শুরু করেছিলেন ইতোমধ্যে। সহকর্মীদের সঙ্গে মেলামেশাও কমিয়ে দিচ্ছিলেন। সবাইকে বলতে শুরু করেছিলেন, সহকর্মীরা ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। সমুদ্রের ধারে গিয়ে ছবি আঁকা শুরু করেন তিনি। এ-অবস্থার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছিল ১৮৬৮ সালের এক গ্রীষ্মের বিকেলে। সেদিন সারাদিন রোদে বসে ছবি এঁকে হঠাৎ মাথার প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতর হয়ে পড়েন উইলিয়াম। কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর অসুস্থতা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় নিউইয়র্কে তাঁর পুরানো ইউনিটে। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল যে, আর্মি ক্যাপ্টেন সার্জন উইলিয়াম সি মাইনর মানসিক বিকৃতিতে ভুগছেন। সে-যুগে মানসিক রোগের ব্যাপারে মানুষের জ্ঞান ছিল সীমাবদ্ধ। তাই নথিপত্রে রোগটির নাম লেখা হলো ‘মনোম্যানিয়া’ – আজকের দিনে যাকে বলা হয় ‘স্কিৎসোফ্রেনিয়া’। এরপর দ্রুতগতিতে ঘটে যেতে থাকে সব ঘটনা। পরিবারের প্রভাব ও অর্থবল খাটিয়ে চিকিৎসার জন্যে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ওয়াশিংটনের একটি বিখ্যাত মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে। কিন্তু সেখানেও তাঁর কোনো উন্নতি দেখা গেল না। বছরখানেকের মধ্যে সেনাবাহিনীকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলো এবং ক্যাপ্টেন সার্জন উইলিয়াম সি মাইনরকে পূর্ণ পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা দিয়ে অবসর দিয়ে দেওয়া হলো।

১৮৭১ সালে একদিন তাঁর পরিবারের লোকজন, তাঁর ভ্রাতা, পিতৃব্য এবং অন্য প্রভাবশালী সদস্যেরা জানতে পারলেন যে, উইলিয়াম মাইনর ওয়াশিংটনের মানসিক হাসপাতাল থেকে মুক্তি পেয়েছেন এবং এক চিকিৎসক বন্ধুর বাসায় উঠেছেন। সেখানেই থাকলেন কিছুদিন। তারপরে, সে-বছরের অক্টোবর মাসে, একটি টিকেট কেটে, তিনি লন্ডনের জাহাজে চেপে বসলেন। সঙ্গে নিলেন তাঁর কিছু কাপড়চোপড়, বইপত্র, ছবি আঁকার সরঞ্জাম, তাঁর বাঁশিটি এবং তাঁর পিস্তল। উদ্দেশ্য, ইংল্যান্ডে কিছুদিন থেকে তারপর প্যারিস, রোম ইত্যাদি জায়গায় বেরিয়ে, ছবি-টবি এঁকে, আবার আমেরিকায় ফিরে নতুন জীবনযাপন শুরু করা।

নভেম্বরের এক সকালে লন্ডন শহরে পৌঁছে তিনি একটি অভিজাত হোটেলে ঘর ভাড়া নিলেন। কিন্তু কী হলো, কিছুদিন পরে, বড়দিনের আগেই

সে- হোটেল ছেড়ে দিয়ে ল্যামবেথ পাড়ার কাছে একটি লজিং হাউজে উঠে এলেন।

এ-জায়গার একমাত্র সুবিধে হলো, ‘ইজি অ্যাকসেস টু ইজি উইমেন’। এখানেই মাসখানেক পরে, ১৮৭২-এর ফেব্রুয়ারি মাসের একরাতে প্রায় দুটোর দিকে খুন হলো এক কারখানায় মর্নিং শিফটের ডিউটিতে যাওয়া জর্জ মেরেট নামে এক তরুণ শ্রমিক। সেদিন গভীর রাতে ল্যামবেথের এক গলিতে গুলির শব্দ শুনে ছুটে এলো পুলিশ। তারা দেখতে পেল ঘাড়ে এবং শরীরের আরো দু-এক জায়গায় গুলি-খাওয়া মেরেট রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে রাস্তায়, আর তার কাছেই পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে আরেক যুবক। পুলিশ মেরেটকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়ে সেই যুবককে জিজ্ঞেস করল, কে গুলি করেছে? যুবকটি উত্তর দিল, সে-ই গুলি করেছে। তবে একটি মারাত্মক ভুলের কারণে সে একজনকে মারতে গিয়ে অন্য একজনকে মেরে ফেলেছে।

পরদিন কাগজে সব খবর বের হলো, একজন আমেরিকান ধনাঢ্য আর্মি ডাক্তার একজন দরিদ্র ব্রিটিশ শ্রমিককে মেরে ফেলেছে। আমেরিকান দূতাবাস ছুটে এলো। ব্রিটেনে বসবাসরত সব আমেরিকান এগিয়ে এলো মৃত শ্রমিক জর্জ মেরেটের বিধবা এবং তার আটটি শিশুসন্তানের সাহায্যার্থে।

কয়েকদিন পরেই বিচার শুরু হলো উইলিয়াম মাইনরের। আশ্চর্য সব কাহিনী বের হতে লাগল মামলার সাক্ষীদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। উইলিয়াম মাইনরের ল্যান্ডলেডি বললেন, মাইনর অত্যন্ত ভদ্র এবং বিনয়ী স্বভাবের লোক – এ-কথা ঠিক, তবে তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতা প্রকাশ পেত। সে প্রায়ই অভিযোগ করত যে, রাতে কারা তার ঘরে ঢুকে পড়ে এবং নানা ধরনের যৌন-নিপীড়ন করে তাকে। আইরিশরা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে … ইত্যাদি। অথচ ল্যান্ডলেডি হলফ করে বলল, তার বাড়িতে রাতে বাইরে থেকে কারো পক্ষে কোনো ঘরে ঢোকা সম্ভব নয়। আসামি দাবি করলেন, সে-রাতে তিনি ঘুম থেকে জেগে দেখতে পান একজন লোক তাঁর ঘরে ঢুকেছে। তাই পিস্তল নিয়ে তাকে তাড়া করে এবং রাস্তায় তার পেছনে দৌড়ে তাকে গুলি করেন। পুলিশ কিন্তু সরজমিনে গিয়ে তাঁর ঘরের দরজা খোলার কোনোরকম চিহ্ন দেখতে পেল না। নিচের সদর দরজা যেমন বন্ধ ছিল তেমনি বন্ধ দেখা গেল। কোন পথে প্রবেশকারী ঢুকেছিল এবং কোন পথে সে বের হয়েছিল তা কিছুই বলতে পারল না মাইনর। অবশেষে, প্রায় আড়াই মাস পর কোর্ট রায় দিল, মাইনর একজন মানসিক ভারসাম্যহীন পাগল। কাজেই তিনি যে-অপরাধ করেছেন, তার জন্যে তাঁকে কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না। তবে যেহেতু সমাজের পক্ষে তিনি বিপজ্জনক, কাজেই তাঁকে পাঠিয়ে দিতে হবে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে, যেখানে তিনি থাকবেন, ব্রিটিশ সরকার যতদিন পর্যন্ত তাঁকে সেখানে রাখা দরকার মনে করবে। এভাবেই ১৮৭২ সালের এপ্রিল মাসে একদিন শুরু হলো ব্রডমুর মানসিক হাসপাতালের ৭৪২ নম্বর রোগীর দীর্ঘ নতুন জীবন। তাঁকে দেওয়া হলো দুই কামরাবিশিষ্ট একটি সুইট। সেখানে দেয়াল-আলমারি বোঝাই করা হলো তাঁর বইপত্রে। তাঁর বাঁশিটি রাখা হলো একটি টেবিলের ওপর, ছবি আঁকার সরঞ্জাম রইল এক পাশে। পড়াশোনার জন্যে তাঁকে দেওয়া হলো টেবিল-চেয়ার। পছন্দমতো একটি পত্রিকারও ব্যবস্থা করা হলো তাঁর জন্যে, দেওয়া হলো নিজের টাকাতে অর্ডার দিয়ে বই কেনার অধিকারও। তাঁর যে টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই সেটি আগেই জানানো হয়েছিল কর্তৃপক্ষকে।

কাহিনীর তৃতীয় চরিত্রটির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক এবার। এতসব ঘটনা ঘটার বেশ আগে, ১৮৫৭ সালের গাই ফক্স দিবসে, লন্ডনের ফিলোলজিক্যাল সোসাইটির এক বিশেষ সভা বসেছিল। সভার এজেন্ডা একটিই: ইংরেজি ভাষার একটি পূর্ণাঙ্গ অভিধান রচনা। ‘পূর্ণাঙ্গ’ কথাটির ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল এ-কারণে যে, তার আগে সপ্তদশ এবং অষ্টাদশ শতকে বেশ কয়েকটি অভিধান রচিত হয়েছিল ইংরেজি ভাষায়, যার পরিণতিতে ১৭৫৫ সালে পাওয়া গিয়েছিল স্যামুয়েল জনসনের বিখ্যাত ইংরেজি ভাষার অভিধান। এরপরও কী দরকার ছিল নতুন একটি অভিধানের? ফিলোলজিকাল সোসাইটি কী ভাবছিল সেদিন এ-সম্পর্কে? উত্তরটি পাওয়া যাবে গ্রন্থকারের এই লাইন কয়টিতে, ‘While Johnson had presented a selection of the language… and an enormous selection at that, brilliantly fashioned… this nwe project would present all of it, every word, every nuance, every shading of meaning and spelling and pronunciation, every twist of etymology, every

possible illustrative

citation from every English author.

এক বিরাট মহাপরিকল্পনা বলা চলে। সেদিনের সেই সভার প্রধান বক্তা, বিখ্যাত ব্রিটিশ ধর্মযাজক ও বিদ্যোৎসাহী রিচার্ড শেনেভিক্স ট্রেঞ্চের বক্তৃতার বিষয়টি, ‘অন সাম ডেফিশিয়েন্সিজ ইন আওয়ার ইংলিশ ডিকশনারিজ’ সম্পর্কে নানা ধরনের হ্যান্ডবিল আর পোস্টারের মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল লন্ডনের সমগ্র ওয়েস্ট-এন্ড অঞ্চলে। একের পর এক বক্তারা বলছিলেন, কীভাবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি (ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যগনের দিনগুলোতে বেশিরভাগ ব্রিটিশই ভাবতেন, ঈশ্বর একজন ইংলিশম্যান এবং ব্রিটিশরাই মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন) হওয়া সত্ত্বেও, ফরাসিভাষীদের মতো, তাদের ভাষার কোনো অভিভাবক নেই, তাদের এমন একটি অভিধান নেই যাতে তাদের, এই ঈশ্বর-প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ ভাষার, সব শব্দের উৎপত্তি, প্রয়োগ প্রভৃতি একজায়গায় পাওয়া যায়… ইত্যাদি। সেই সভাতেই সিদ্ধান্ত হলো যে, এমন একটি অভিধান রচনা হবে যা ইংরেজি ভাষার সকল শব্দের ইতিহাস ধরে রাখবে। সকল শব্দের সংজ্ঞা হচ্ছে, যে-শব্দ অতীতে কোনো একসময়ে ব্যবহার হতো বর্তমানে ব্যবহার হয় না, সেটি কবে কোন অর্থে ব্যবহার হয়েছিল, কার লেখায় ব্যবহার হয়েছিল; যে-শব্দ বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে তা কবে প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল, কীভাবে বিভিন্ন লেখকের লেখার মধ্যে তার অর্থের পরিবর্তন হয়েছে ইত্যাদি।

এমন একটি অভিধান-রচনার দায়িত্ব কে নেবে? কাজটি হবে, গ্রন্থকারের ভাষায় – ‘gigantic, monumental, and… according to the  conventional thinking of the times… impossibl ব.’ কেননা এটি রচনায় প্রয়োজন হবে, ‘combined action of maû. It would be necessary to recruit a team… moreover, a huge one… probably   comprising hundreds and hundreds of unpaid amateurs, all of them working as volunteers.’ কাজেই শেষ পর্যন্ত প্রায় অরচিতই থেকে যাচ্ছিল অভিধানটি। ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করার আশা সুদূরপরাহতই রয়ে যাচ্ছিল প্রায়।

কাগজে-কলমে ১৮৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হলেও মাত্র বাইশ বছর লেগেছিল এই অসম্ভব প্রকল্পকে নিশ্চিত সম্ভাবনার পথে নিয়ে আসতে। আর সেই দায়িত্বটি পড়েছিল জেম্স মারের বন্ধু ফিলোলজিকাল সোসাইটির সম্পাদক ফ্রেডারিক ফার্নিভালের ওপর। প্রথমেই ঠিক করা হয়েছিল ভলান্টিয়ারদের কী করতে বলা হবে। তাঁদের বলা হবে, তাঁরা কয়েকটি বই পড়বেন এবং সেই বই থেকে শব্দ বেছে নিয়ে সেগুলোর তালিকা করবেন। তখন অভিধানের সম্পাদকের পক্ষ থেকে তাঁদের বলা হবে বিশেষ বিশেষ কিছু শব্দ দেখতে এবং সেইসব শব্দের প্রতিটিকে একটুকরো কাগজের স্লিপের ওপর শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করে শব্দটি কোন বছরে প্রকাশিত কোন বই থেকে নেওয়া হয়েছে তা লিখবেন এবং ওই শব্দ-ব্যবহৃত বাক্যটি উদ্ধৃত করবেন।

এতসব সত্ত্বেও কাজ এগুচ্ছিল না। কে ছাপবে এই অভিধান? ফিলোলজিকাল সোসাইটির পক্ষ থেকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের কাছে প্রস্তাব করা হলো। তাদের কর্তৃপক্ষ – ‘infamous for being dauntingly highbrow, irritatingly pedantic and fiscally mean’ – গড়িমসি করতে লাগল। তাদের অনেক আপত্তি, কে এই অভিধানের সম্পাদক হবেন? তাঁর যোগ্যতা কী? তারা ফার্নিভালের ওপর সন্তুষ্ট নয়। বলা হলো জেম্স মারের নাম। তারা দেখতে চাইল তাঁর কাজের নমুনা। ততদিনে জেম্স মারে কিছু কিছু শব্দের ওপর কাজ করতে শুরু করেছেন। তারই মধ্যে কিছু শব্দ, ‘arrow, carouse, castle, pursuade’-এগুলো সম্পর্কে যে-কাজ হচ্ছিল তারই নমুনা পাঠানো হলো তাদের কাছে। নানারকম দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে কাটতে লাগল দিন। অবশেষে ১৮৭৮ সালের ২৬শে এপ্রিলে জেম্স মারে ডাক পেলেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের বোর্ড অব ডাইরেক্টরদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের জন্যে। শুরু হলো চুক্তির খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা। শেষ পর্যন্ত ১৮৭৯ সালের ১লা মার্চ একটি ঐতিহাসিক চুক্তির মধ্য দিয়ে ঠিক হলো ফিলোলজিকাল সোসাইটি অব লন্ডনের জেম্স মারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হবে দ্য নিউ ইংলিশ ডিকশনারি অন হিস্টরিকাল প্রিন্সিপ্লস্ নামে প্রায় ৭০০০ কোয়ার্টো সাইজের পাতার চার খণ্ডের একটি অভিধান।

কয়েকদিনের মধ্যে মিল হিল স্কুলে একটি টিনের চালায় তাঁর ‘স্ক্রিপ্টোরিয়াম’ বানিয়ে কয়েকজন সহকারী নিয়ে কাজ শুরু করে দিলেন জেম্স মারে এবং চার পৃষ্ঠার একটি আবেদনপত্র লিখে দেশের উৎসাহী লোকদের কাছে এই প্রকল্পের জন্যে স্বেচ্ছায় কাজ করার আবেদন জানালেন সমগ্র ইউরোপ এবং আমেরিকার ইংরেজি ভাষাপ্রেমিককে। সব বইয়ের দোকানে, সব খবরের কাগজে, সব পত্র-পত্রিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো সেই আবেদন। সেই কাগজেরই একটি, হয় কোনো বইয়ের পাতার ফাঁকে অথবা খবরের কাগজের ভাঁজের মধ্যে, পৌঁছালো ক্রোথর্নের ‘ব্রুডমুর অ্যাসাইলাম ফর ক্রিমিনালি ইনসেনে’র ওপরের তলার ব্লক টুর বাসিন্দা মার্কিন সার্জন উইলিয়াম মাইনরের ঘরে। বন্দিজীবন শুরু হওয়ার প্রায় আট বছর পর মাইনর পেয়ে গেল নতুন করে বাঁচার পাথেয়।

এরপরের সতেরো বছরের ইতিহাস আগেই বলা হয়েছে। তবে সেখানে যে-অর্ধসত্যটুকু ছিল এখন তা দূর করার সময় এসেছে। আবেদনপত্রটি পেয়েই মাইনর যোগাযোগ করে ফেললেন মারের সঙ্গে। জানালেন তিনি অনেক দু®প্রাপ্য বইয়ের মালিক এবং এই প্রকল্পের জন্যে কাজ করতে ইচ্ছুক। প্রথমেই তাঁকে যে-কাজটি দেওয়া হলো তা হচ্ছে,

ইংরেজি ‘আর্ট’ শব্দটির ব্যবহার-সংবলিত যত উদ্ধৃতি আছে তাঁর পড়া বইগুলোতে সেগুলো পাঠাতে। ইতোমধ্যে মারে অনেকের কাছ থেকে আরো উদ্ধৃতি পেয়েছেন এই শব্দটির ওপর। কিন্তু মাইনরের পরিচ্ছন্ন হাতে লেখা উদ্ধৃতি-সংবলিত স্লিপগুলো দেখে বুঝতে পারলেন যে, এই উচ্চমানের কাজের সঙ্গে খুব কম লোকের কাজেরই

তুলনা হয়।

শুরু হলো তাঁদের মধ্যে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান। প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার শব্দের ওপর কাজ করে পাঠাতে লাগলেন মাইনর। আর স্ক্রিপ্টোরিয়ামে (প্রথমে লন্ডন শহরে, পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত) বসে সেইসব শব্দের সম্পাদনা করতে লাগলেন জেম্স মারে। মাইনরের কাজের উচ্চমান, তাঁর নিষ্ঠা দিনের পর দিন আশ্চর্য করে তুলতে লাগল অভিধানে কর্মরত পুরো টিমকে। মারে যত বেশি মুগ্ধ হতে লাগলেন তার চেয়েও বেশি ধাঁধায় পড়ে গেলেন। কে এই লোকটি, যাঁকে কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা যায় না, অথচ যাঁর কাজে কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। এরই মধ্যে অভিধানের প্রথম খণ্ডের এক অংশ (অ ঃড় অহঃ) ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ল অক্সফোর্ডের ক্ল্যারেন্ডন প্রেস। বারো শিলিং ছয় পেন্স দামের এই বইটি চমকে দিল পৃথিবীর সব ইংরেজি ভাষাপ্রেমিককে। সবাই বুঝতে পারল, কী কঠিন একটি কাজের দায়িত্ব নিয়েছে লন্ডন ফিলোলজিকাল সোসাইটি এবং জেম্স মারে। এই সময়েই একদিন, সেটি ১৮৮৯ সাল – জেম্স মারে আর উইলিয়াম মাইনরের মধ্যে চিঠিপত্রের আদান-প্রদান শুরু হওয়ার প্রায় আট-নয় বছর পরে – অক্সফোর্ডে এলেন এক আমেরিকান লাইব্রেরিয়ান। কারা তাঁকে এই শব্দসমুদ্র-মন্থনে সাহায্য করছে তাঁদের নামের প্রসঙ্গ ওঠাতে সেই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, আমি খুব খুশি হয়েছি জেনে যে, হতভাগ্য ডক্টর মাইনর আপনার কাজে অবদান রাখছে। কেন? হতভাগ্য কেন? জানতে চাইলেন মারে। তখনই কাহিনীটি জানতে পারলেন তিনি। দুঃখে-সমবেদনায় ভরে উঠল তাঁর মন। মনে মনে ঠিক করলেন, এই হতভাগ্য লোকটিকে দেখতে যাবেন তিনি। সেই যাওয়ার কাজটি করলেন তিনি ১৮৯১ সালের এক বিকেলে (১৯৯৬ সালে নয়)। যেমনটি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে সেভাবেই তাঁদের দেখা হলো, তবে রহস্য-রোমাঞ্চটুকু ততদিনে ছিল না।

এরপর পনেরো-কুড়ি বার ক্রোথর্নে গিয়েছিলেন মারে। প্রতিবারই মুগ্ধ হয়ে ফিরেছেন তাঁর এই বন্ধুটির জ্ঞান, জানার পরিধি এবং কর্মনিষ্ঠা দেখে।

এতকিছুর মধ্যেও কিন্তু হাসপাতালের মাসিক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছিল, মাইনরের মানসিক অবস্থা আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। যতক্ষণ অভিধান নিয়ে ঘরে বসে লেখালেখি করেন তিনি, ততক্ষণ তাঁর মধ্যে কোনো ভারসাম্যহীনতা ধরা পড়ে না। কিন্তু অন্যসময়ে, বিশেষ করে রাতের বেলা, তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। তিনি ঘুমাতে যান না, চিৎকার করে অভিযোগ করতে থাকেন যে, কারা তাঁর ঘরের মেঝের নিচ থেকে বের হয়ে আসছে, তাঁকে

নানাভাবে উৎপীড়ন করছে। খাওয়া কমতে থাকে তাঁর, শরীর দুর্বল হয়ে আসতে থাকে ক্রমশ। একদিন ছুরি দিয়ে নিজের যৌনাঙ্গ কেটে ফেলেন তিনি। চিকিৎসার জন্যে তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইনফার্মারিতে। অ্যাসাইলামের নতুন সুপারিন্টেন্ডেন্ট তাঁকে আরো কড়া পাহারায় রাখার নির্দেশ দেন এবং কিছু কিছু সুবিধে বন্ধ করে দেন। বছর গড়িয়ে যেতে থাকে, অবশেষে তাঁর কাজের পরিমাণও কমতে থাকে। ‘কে-এল-এম-এন’ বর্ণের পর থেকেই ভাটা পড়তে থাকে তাঁর

শব্দ-উদ্ধৃতির জোয়ারে। অবশেষে একসময়ে দেখা গেল যে, তিনি ‘কিউ’ বর্ণটির ওপর আর কোনো উদ্ধৃতি বা স্লিপ পাঠাননি। মারে বুঝতে পারছিলেন ব্যাপারটি। এদিকে ডাক্তার মাইনরের জীবনের শেষদিনগুলোতে তাঁকে ব্রিটেন থেকে আমেরিকায় আনার জন্যে ১৯০২ সালের দিক থেকেই আমেরিকায় জোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা। দুতিনবার ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট এই আপিল বাতিল করে দিয়েছিল। শেষে অনেকের সঙ্গে স্যার জেম্স মারেও (১৯০৮ সালে জেম্স মারেকে কৃতজ্ঞ ব্রিটিশ সরকার নাইট উপাধিতে ভূষিত করে, ইতিপূর্বে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রিও দিয়েছিল) এ-ব্যাপারে আবেদন পাঠাতে শুরু করলেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে শেষে এ-ব্যাপারে রাজি করিয়ে ছাড়লেন। ১৯১০ সালের এক দুপুরে জাহাজে করে ডক্টর মাইনরকে তাঁর এক ভাইয়ের হেফাজতে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

এরপরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। যদিও আরো পাঁচবছর এই অভিধানের সঙ্গে যুক্ত রইলেন মারে এবং মারা গেলেন ১৯১৫ সালে অভিধানের সম্পূর্ণ কাজ তখনও শেষ হয়নি। আমেরিকায় মানসিক হাসপাতালে বসে

এ-খবর পেলেন মাইনর। চিঠি লিখলেন মিসেস মারেকে শোকবার্তা পাঠিয়ে। অনুরোধ করলেন তাঁকে, যেন ব্রডমুরে রাখা তাঁর সব বইগুলো তাঁর (্উইলিয়াম মাইনরের) পক্ষ থেকে অক্সফোর্ডের বডলিয়ান লাইব্রেরিতে দান করে দেন মিসেস মারে। তা-ই করলেন মিসেস মারে। আজও বডলিয়ানের শেলফে সেই বইগুলো দেখা যাবে। অবশেষে ১৯২০ সালের মার্চের ২৬ তারিখে মারা গেলেন ডক্টর মাইনর।সম্পূর্ণ অভিধান বের হতে এর পরেও লেগেছিল প্রায় সাত বছর। ১৯২৭ সালের নববর্ষের দিনে নিউইয়র্ক টাইম্স খবরটা দিল বিশ্ববাসীকে। বারো খণ্ডে সমাপ্ত এই ডিকশনারিতে সংজ্ঞায়িত করা থাকল চার লক্ষ চোদ্দ হাজার আটশ পঁচিশটি (৪,১৪,৮২৫) ইংরেজি শব্দ এবং সেই শব্দ-সংবলিত আঠারো লক্ষ সাতাশ হাজার তিনশ ছয়টি (১৮,২৭,৩০৬) উদ্ধৃতি। নিউইয়র্ক টাইম্সের এই খবরের বর্ণনা দিয়েছেন সাইমন উইনচেস্টার এই বলে, ‘The making of the great book, declared the newspaper roundly and generously, was one of the great romances of English literature পাঠকদের অবগতির জন্য জানানো হচ্ছে, এরপরে ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত হয় এই বইয়ের একটি সংযুক্তি। তারপর ১৯৭২ থেকে ১৯৮৬-র মধ্যে দফায় দফায় চারবার এই অভিধানে সংযুক্ত করা হয়েছে আরো বেশকিছু শব্দ এবং অবশেষে ১৯৮৯ সালে বিশ খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে এই অভিধানের সম্পূর্ণ দ্বিতীয় সংস্করণ। মারে-মাইনরের স্বপ্নের বাস্তবায়ন আজও চলছে।