নজরুল বিষয়ক
দশটি প্রবন্ধ
সুব্রত কুমার দাস
নতুন ধারা
ঢাকা, ২০০৪
দাম : ৮০ টাকা
বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) জীবনাবসানের প্রায় তিনদশক অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়-পরিসরে এবং জীবদ্দশায় তাঁর সৃষ্টিসম্ভার-মূল্যায়নে উৎসাহী ও মনোযোগী গবেষকদের ভূমিকা কিংবা অবদান নেহায়েত কম নয়। ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে বিশেষভাবে খ্যাত এই বিরল প্রতিভার সাহিত্যকর্ম-মূল্যায়নের বিচিত্র চিন্তনক্ষেত্র ইতোমধ্যেই পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। নীরোদ সি. চৌধুরী
যে-নজরুলের কাব্য-প্রতিভাকে ‘দুর্বল ও কৃত্রিম’ বলেছেন, একসময়ে (১৯৭২) পশ্চিমবঙ্গ সরকার যে-নজরুলের ‘জন্মোৎসব পালন করিবার প্রয়োজন নাই’ বলে মন্তব্য করেছিলেন বা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন – সেই নজরুলের একশত পাঁচতম জন্মবর্ষে আমরা তাঁকে নতুন নতুন ভাবনাবিশ্বে প্রকাশ পেতে দেখি। যে-নজরুল এদেশের মানুষের সমূহ অকল্যাণ-অবনতির আশংকায় অসম্ভব আত্মপ্রত্যয়ী থেকে এক অনন্য শক্তিসুধা দান করতে পেরেছেন, তাঁর প্রয়োজন শেষ হবার নয় – এ-কথা বোধকরি অনেক আগেই বিদ্বৎসমাজে অনায়াস-উপলব্ধ হয়েছে।
নজরুল-সাহিত্য-মূল্যায়নে নতুন সংযোজন সম্প্রতি প্রকাশিত নজরুল বিষয়ক দশটি প্রবন্ধ (ফেব্রুয়ারি ২০০৪) গ্রন্থটি। তরুণ ও প্রত্যয়ী গবেষক সুব্রত কুমার দাস তাঁর এ-গ্রন্থে নজরুল-সাহিত্যের কিছু অনালোচিত দিক ও প্রসঙ্গের প্রতি গভীর অভিনিবেশ নিবদ্ধ রেখেছেন। পাশাপাশি নজরুলপাঠের প্রক্রিয়া ও
তথ্য-যুক্তিনির্ভরতার প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন – প্রবন্ধের
বিষয়-নির্বাচনে এবং উপস্থাপন-কৌশলের অভিনবত্বে। এ-গ্রন্থে প্রাবন্ধিকের বিশেষ প্রবণতা হলো – তথ্যের প্রাচুর্য। আপাতভাবে তা পাঠককে মূল প্রসঙ্গের পাঠচিন্তন-জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বলে মনে হলেও তার পরিপ্রেক্ষিত ও প্রাসঙ্গিকতা যথার্থ ও প্রয়োজনীয়। ‘নজরুলের
গল্প-উপন্যাস : বহুবিধ অভিনবত্ব’ এ-গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ। এ-প্রবন্ধে লেখক নজরুলের কথাসাহিত্যের নানান বৈশিষ্ট্য, পরিপ্রেক্ষিত, মূল্যায়ন-অমূল্যায়নের বিষয়াদি বর্ণনা করেছেন স্বকীয় অভিব্যক্তির আলোয়। কবিতা ও গানের বিরাট-ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতার পাশে কাজী নজরুল ইসলামের কথাশিল্পী পরিচিতি না-পেয়ে ওঠার ব্যাপারটি লেখক একরকম মান্য করেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। সুব্রত লিখেছেন, ‘হয়তো আমরা একথা মানতে বাধ্য, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা কথাসাহিত্যের প্রথমশ্রেণির গল্পকার ও ঔপন্যাসিকদের তালিকায় পড়েন না। কিন্তু এর অর্থ এমন হওয়া অনুচিত যে, তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসগ্রন্থগুলোতেও অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অনুপযুক্ত। মাত্র উনিশটি গল্প এবং তিনটি উপন্যাসে তিনি এমন অনেক মেধাবী স্বাক্ষর রেখেছেন যা পূর্বসূরি, এমনকি সমসাময়িক শক্তিমান কথাসাহিত্যিকদের রচনাতেও দেখা যায়নি।’ (পৃ. ১৬) প্রাবন্ধিকের এ-মন্তব্যে
পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের ইঙ্গিত পাই আমরা। তবে নজরুলের কথাকাহিনীর বিষয়, ক্যানভাস, গঠনকৌশল এবং ভাষা-প্রয়োগের দক্ষতা-নিপুণতার বিচারে তাঁকে যথার্থ কথাশিল্পীর মর্যাদা দেবার পক্ষেই সুব্রত শেষত জোরকণ্ঠ।
প্রসঙ্গত বলে নেওয়া যায়, সুব্রত কুমার দাসের গবেষণার স্বচ্ছন্দ ক্ষেত্র বাংলা কথাসাহিত্য। তাঁর বাংলা কথাসাহিত্য : যাদুবাস্তবতা এবং অন্যান্য (২০০২) ওই বোধের পরিচয় ধারণ করেছে কতকটা। আর তিনি িি.ি নধহমষধফবংযরহড়াবষং.পড়স (২০০৩) প্রকাশ করে বাংলাদেশের কথাশিল্পীদের প্রাথমিক পরিচিতি তুলে ধরেছেন বিশ্বের অবারিত দরোজায়। তথ্যপ্রযুক্তির প্রবল প্রবাহের সময়ে তাঁর এই বিশেষ প্রয়াস আমাদেরকে, আমাদের কথাসাহিত্যের জগৎকে উপকৃত করেছে। বিশ্বসাহিত্যের প্রতি তাঁর উৎসুক দৃষ্টিরই প্রমাণ মিলবে এসব কর্মকাণ্ডের প্রেরণার উৎস খুঁজতে গেলে।
নজরুলের সৃষ্টিকর্ম নিয়ে কাজ করতে গিয়েও সুব্রত বিশ্বসাহিত্যের প্রশস্ত-পরিসরকে বিবেচ্য রেখেছেন। তাঁর
সে-ভাবনার প্রতিফলন বর্তমান গ্রন্থের ‘নজরুলের রচনায় ইউরোপীয় সাহিত্যের উল্লেখ’ এবং ‘অন-লাইন নজরুল এবং গ্লোবালওয়েবপোস্ট ডটকম’ প্রবন্ধ দুটি। এখানে প্রাবন্ধিকের বিবেচনা-দৃষ্টিভঙ্গি এবং ক্ষেত্র-নির্বাচন বিশেষত্বের দাবি রাখে। নজরুলের জ্ঞানভাণ্ডার সম্পর্কে যারা সন্দেহকাতর তাদের সকল ধারণা কিংবা কল্পনার প্রতিকূলে প্রথম প্রবন্ধটির সমূহ তথ্য ও প্রাসঙ্গিকতা অত্যন্ত মজবুত ভিত তৈরি করতে পারে নিঃসন্দেহে। আর প্রযুক্তি-প্রাবল্যের এ-বিশেষ প্রহরে দ্বিতীয় প্রবন্ধটির প্রয়োজনীয়তা অতি সহজেই অনুমেয়। ধারণা করতে পারি, সুব্রত কুমার দাস প্রাতিস্বিক
চিন্তাসুতোর অনুপুঙ্খ আড়ালহীন প্রকাশের মধ্য দিয়ে পাঠককে এক নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।
উনিশ শতকীয় রোমান্টিসিজমের রূপান্তরমূলক যে-অনুপ্রকাশ ঘটেছে বিশ শতকের মডার্নিজমের মধ্যে তারই
মেঘ-ছায়াতলে নজরুল-প্রতিভার প্রক্ষেপণ-প্রান্তর তৈরি হয়েছিল বিপুল আনন্দের ক্যানভাসে। জীবনানন্দ বলেছেন – ‘নজরুল ঊনবিংশ শতকের ইতিহাস প্রান্তিক শেষ নিঃসংশয়বাদী কবি।’ একুশ শতকের প্রথম প্রহরে এখন যখন মডার্নিজমের আক্ষেপ শমিত ও অবদমিত, উত্তর আধুনিকতাবাদ যা-যা এড়িয়ে-মাড়িয়ে গেছে, ধুলো ঝেড়ে তুলে নিতে প্রস্তুত পুনর্বার, তখন নজরুলের কাব্যজগতের সৌন্দর্যমণ্ডিত দরোজায় কড়া নড়ে ওঠে যেন অনিবার্যভাবে। হয়তো নজরুলের শিরা-শোণিতের সংক্ষোভ, ইতিবাচকতা আজ বাংলা কবিতায় বড় বেশি প্রয়োজন। আর প্রাসঙ্গিক কারণেই, যে-প্রশ্ন থেকে জাগ্রত হয় নজরুলের মূল্যায়ন, পুনর্বিচার কিংবা
যথার্থ-বিবেচনার জোরালো দাবি। এটি নিঃসন্দেহ যে, কবি
হয়ে-ওঠা এক ভিন্ন ধরনের ব্যাপার। কল্পনা, চিন্তা, অভিজ্ঞতা আর পারিপার্শ্বিকতার
ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া কবিতা-প্রক্রিয়ার জমিন নির্মাণ করে। আর তাই কবিরও থাকে নানান দায়-দায়িত্ব। বিদ্রোহী সত্তার অন্তরালে ব্যক্তি নজরুল যেমন ছিলেন আকর্ষণীয়, তেমনি তাঁর শিল্পালোকও পাঠককে-শ্রোতাকে আকর্ষণ করতে পেরেছে – উচ্চকণ্ঠ ধ্বনিনির্ভর ঝড়-বর্ষণ-কান্নার আওয়াজে মোড়া বহির্মুখী প্রবণতার পাথরকঠিন বাস্তবতায়। বিচিত্র অনুষঙ্গের মতো সুন্দরও
নজরুল-সাহিত্যে প্রবেশ করেছে ওই বাস্তবদেয়ালের অদৃশ্য সূক্ষ্ম ছিদ্রপথে। এ-অনুষঙ্গ তাঁর সাহিত্য-শিল্পভাবনার বিশেষ বিলোড়নসূত্র। বর্তমান গ্রন্থের “নজরুলের সাহিত্যচিন্তা এবং ক্রমপ্রকাশমান ‘সুন্দর” প্রবন্ধে তাঁর এই বোধের গলিমুখ-অন্বেষণের চেষ্টা করেছেন গবেষক সুব্রত। প্রসঙ্গক্রমে তিনি লিখেছেন – “শুধুমাত্র সাহিত্য বা এর প্রাণশক্তি নিয়ে আলাদাভাবে নজরুলের রচনার সংখ্যা কম। কিন্তু এসকল বিষয় নিয়ে নজরুল-সাহিত্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক মন্তব্য-মূল্যায়ন সংরক্ষিত হয়, যেগুলো থেকে সাহিত্য-বিষয়ে নজরুলের মানসিক গড়নটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। এমনকি নজরুল-মানসের যে-সকল ভাবনারাজি তাৎক্ষণিক কোনো ফসলও নয়। সাহিত্যে হিন্দু-মুসলিম-সম্প্রীতি, জনগণের জন্য সাহিত্য, সাহিত্যে সত্যের প্রকাশ, ইত্যাদি বিষয়গুলো যেমন নজরুল-রচনায় পৌনঃপুনিক, তেমনি ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে রয়েছে বৈশ্বিক
সাহিত্য-মূল্যায়নে তাঁর দীর্ঘ এক পর্যাবৃত্তি, যেমনভাবে ‘আমার সুন্দর’ নজরুলের দীর্ঘকালীন সুংঃরপ চেতনার এক চূড়ান্ত প্রকাশ।” (পৃ. ৩৩)
নজরুলের গদ্যেও আমরা তাঁর কবিতার মতোই জীবনসত্যের স্পষ্ট, রাখ-ঢাকহীন বিবরণ পাই। যেমন – ‘সেই রুদ্র আসিতেছেন, যিনি ধর্ম-মাতালদের আড্ডা ঐ মন্দির-মসজিদ-গীর্জা ভাঙিয়া সকল মানুষকে এক আকাশের গম্বুজ-তলে লইয়া আসিবেন।’ (মন্দির ও মসজিদ, রুদ্র মঙ্গল) সমাজের, জীবনের আর মানুষের বিচিত্র প্রবণতার শাঁস-সত্যটি তিনি অকপটে প্রকাশ করতে পেরেছিলেন কালের কাব্যরুচি, আর হৃদয়গত কাব্যবাণীর প্রকাশধর্মিতার প্রবল চাপের নিরন্তর তাগিদে। নজরুলের এ-বোধটিকে আলোচ্যগ্রন্থে প্রাবন্ধিক গ্রন্থিবদ্ধ করেছেন এভাবে – ‘সন্দেহ নেই নজরুলের গদ্যও কাব্যগন্ধী; এমনকি তা দৈনিকের সম্পাদকীয় হলেও। “সত্য-শিক্ষা” এরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাই বলে দেশপ্রেমিক কবির গভীর উচ্চারণ এখানে হ্রস্ব নয় মোটেও। সামাজিক-রাজনৈতিক এই বিপুল ডামাডোলের ভেতরও দেশবাসীকে তাঁদের কর্তব্য
স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সাংবাদিকসুলভ দায়িত্ববোধ থেকে কবি কিন্তু সামান্যতমও সরেননি।’ (পৃ. ৭২)
শিক্ষা-বিষয়ে বিশিষ্ট-প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের ধারণা ও অভিমতের প্রতি সচেতনমহলের আগ্রহ অত্যন্ত স্বাভাবিক। সে-তাগিদের অনিন্দ্য ভাষ্যরূপ এ-গ্রন্থের ‘নজরুল ভাবনায় জাতীয় (বিশ্ব) বিদ্যালয়’ শীর্ষক প্রবন্ধ। নজরুলের শিক্ষা-ভাবনা আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে কয়েকটি কৌণিক স্বর্ণশোভার বিকিরণে। তিনি অপরিণত বয়সে দারুণ পরিণত অভিমত প্রকাশ করেছেন এদেশের শিক্ষা-পরিসরকে চিন্তায় রেখে। দৃষ্টান্ত : ‘আমরা চাই, আমাদের শিক্ষা-পদ্ধতি এমন হউক, যাহা আমাদের জীবনশক্তিকে ক্রমেই সজাগ, জীবন্ত করিয়া তুলিবে। যে শিক্ষা ছেলেদের দেহ-মন দুইকেই পুষ্ট করে, তাহাই হইবে আমাদের শিক্ষা।’ (জাতীয় বিদ্যালয়)
নজরুল বিষয়ক দশটি প্রবন্ধ গ্রন্থের অন্যান্য বিষয়গুলো হলো – ‘ফরিদপুরে নজরুল’, ‘নজরুল সংযোগে সৈয়দ আবদুর রব এবং মোয়াজ্জিন’, ‘নজরুল-সাহিত্যে রবীন্দ্র-রচনার ব্যবহার; ‘মৃত্যুক্ষুধার প্রথম পরিচ্ছেদ পর্যালোচনা’ এবং ‘প্রসঙ্গ : ‘জিনের বাদশা’ ও ‘অগ্নিগিরি’। এ-প্রবন্ধগুলোর বয়নরীতি লক্ষ করলেই সুব্রত কুমার দাসের ভাবনাবিশ্ব এবং কল্পনাশক্তির চাতুর্য দৃষ্টিগোচর হয়।
তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে বিষয়গুলোর প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করেছেন – গবেষক-পাঠকের দরকার-দায়বিবেচনায় এনে।
এ-গ্রন্থে আমরা সুব্রত দাসের প্রাবন্ধিকপনার উৎকৃষ্ট নমুনাই পাই বলা চলে। শিল্প-প্রতিভা এবং নিবেদিতপ্রাণকর্মী নজরুলের জীবনচেতনা বিরল কৃতিত্বে ভাস্বর। তিনি ছিলেন তুখোড় সামাজিক। তবে তাঁকে একাকিত্ব গ্রাস করেছিল ক্রমাগত – চৈতন্যবিলুপ্তির সময়। বেশ কয়েকবার তিনি বক্তৃতায় তাঁকে গ্রাস করতে আসা এক হিমশীতল কুয়াশার কথা উল্লেখও করেছেন। সেই বিভীষিকাময় প্রেক্ষাপটের সুদীর্ঘকাল পরে নজরুলের সাহিত্যসভা-মূল্যায়নের কিংবা বিবেচনা-পুনর্বিবেচনায় সুব্রত কুমার দাস যে-পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন, তা অনায়াসে আমাদের অনুপ্রাণিত করবে, আর প্রমাণিত করবে নজরুল-গবেষণার পরিসরকে। প্রাবন্ধিক-গবেষক সুব্রতের এই নবযাত্রার প্রয়াসকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.