বিরামপুরে অবিরাম এগিয়ে চলা

বিরামপুরের যাত্রী

আল মাহমুদ

ঐতিহ্য,

ঢাকা, ২০০৪

দাম : ৫০ টাকাপরিশুদ্ধ বাসনাহীন জীবন আমার

তবে কেন আমার গতিরোধ করিতেছ?

ভিক্ষুণী শুভা (থেরীগাথা)

দিনেমার সাহেব কিয়ের্কেগার্দ (Kierkegaard) জানিয়েছেন, ‘A poet is an unhappy being whose heart is torn by secret suffering, but whose lips are so strangely formed that when the sighs and the cries escape them, they sound like beautiful music.’ কবির যন্ত্রণা, কাতরতা আর পাশাপাশি চমৎকার সংগীত – এই ব্যাপারটি খেয়াল করেই বোধকরি রিলকে (Rilke) কবির জন্য নিঃসঙ্গতার, নির্জনতার কথা বারবার বলে গেছেন। নতুবা তরুণ কবিকে কেন এমন উপদেশ দেবেন : ‘Love your solitude and bear with sweet-sounding lamentation the suffering it causes you.’ নির্জনতাকে ভালোবাসতে পারা এবং তার যন্ত্রণাকে বহন করবার উপদেশের পাশাপাশি এ-ও বলছেন, ‘Your solitude will be a hold and home for you even amid very unfamiliar conditions and from there you will find all your ways.’ যে-পথের কথা বলতে চেয়েছেন রিলকে, সেইটি অন্বেষণ করাই একজন কবির অন্যতম প্রধান ব্রত। বিরামপুরের যাত্রী হিসেবে কবি আল মাহমুদ তাই বুঝি সেই অন্বেষণের সাধনায় পুরো একটি জীবন (যে-জীবন মানুষের) কাটিয়ে দিচ্ছেন। আল মাহমুদ তাঁর অন্বেষণের কথা আমাদের জানান এইভাবে, ‘আমি মনে করি কবির মূল অন্বেষণ হচ্ছে আনন্দ। আমার মতো যারা দীর্ঘসময়ব্যাপী কবিতাচর্চা করছেন, আমার মূল অন্বেষণ হলো পরিতৃপ্তি। অবশ্যই সেটা মানবিক পরিতৃপ্তি।’ কবি আল মাহমুদ তাঁর অন্বেষণের সঙ্গে মানবিক পরিতৃপ্তিকে যেমন আস্বাদন করতে চেয়েছেন, তেমনি তার সঙ্গে সংযুক্ত করেছেন আনন্দকে। আর এইসব মিলিয়েই ‘একটা মানবিক অখণ্ডতা আবিষ্কারের চেষ্টা’ করে চলেছেন এই কবি। এই আনন্দের সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিকভাবেই কারো-কারো মনে পড়ে যেতে পারে :

‘আনন্দই ব্রহ্ম। কেননা আনন্দ থেকেই … সকল প্রাণীর জন্ম হয়। জন্মের পর তারা আনন্দের দ্বারাই বাধিত হয় এবং যখন তারা ধ্বংস হয়ে যায় তখন আনন্দেই ফিরে যায় এবং তাতেই লীন হয়। …

… এই সত্য রয়েছে হৃদয়াকাশের নিভৃতে’ (ত্তৈত্তিরিয় উপনিষদ : ৩/৬/১)

  সরলার্থ : স্বামী লোকেশ্বরানন্দ

আর কবির এই হৃদয়াকাশের নিভৃতেই কবিতার (এবং সকল শিল্প) জন্ম। রিলকে বলছেন, ‘Works of art are of an infinite loneliness’. দলবেঁধে সাহিত্য হয় না, কবিতা তো নয়ই। তার মানে এই নয় যে, একজন কবি তাঁর চারপাশের জগৎকে, সমাজবাস্তবতাকে অস্বীকার করবেন। না, সেটি তিনি কখনো করেন না। তাহলে তো ‘মানবিক অখণ্ডতা’-আবিষ্কারের চেষ্টা অর্থহীন হয়ে যায়। শিল্পের সিদ্ধিও তাতে বিনষ্ট হয়। মানবিক অখণ্ডতার ব্যাপারটি মাথায় রেখেই কবিকে নিজের ভেতরে তাকাতে হয়। কবি রিলকে ঋষির প্রজ্ঞা নিয়ে বলছেন, ‘The creator must a world for himself and find everything in himself.’ উপনিষদের ঋষি কিংবা রিলকেই শুধু নন, Sir Philip Sidney -র সেই বিখ্যাত লাইনটিও আমরা এখানে আরেকবার স্মরণ করতে পারি, ‘Fool! said my muse to me, look in thy heart and write.’ সে-কারণে একজন সৎকবির জন্য কোনো নির্দিষ্ট মতবাদে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব। এই কথা কবি আল মাহমুদের বেলায়ও সত্য। শিবনারায়ণ রায় সেইদিক বিবেচনা করেই বলতে পেরেছিলেন, ‘আল মাহমুদের… সাম্প্রতিক লেখা পড়ে সন্দেহ থাকে না যে তাঁর অন্তর্জীবনে একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে… আল মাহমুদ হাড়ে-মজ্জায় কবি, ধর্ম-বিশ্বাস অথবা রাজনীতি তাঁকে জীর্ণ করতে পারবে না। যাঁর রক্তের মধ্যে একটি সজনে গাছ, ভ্রƒর মধ্যে একটি পাখি… প্রতিটি রঙের মধ্যে অন্য রং না দেখে তাঁর উপায় নেই।’ কথাটি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ; কিন্তু আমাদের যেটি অবাক করে দেয়, তা হচ্ছে এ-ই, শিবনারায়ণ যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘হায়। সেই একদা প্রিয় কবি আল মাহমুদের সঙ্গে ভাবভাবনার ক্ষেত্রে এখন প্রায় অসেতুসম্ভব দূরত্ব’! এই ধরনের দীর্ঘশ্বাস যে অর্থহীন, সেটি আমরা বলছি না, তবে এই দীর্ঘশ্বাস কবিকে এড়িয়ে শুধু একজন ব্যক্তিমানুষের দিকেই নিক্ষিপ্ত হয়। অবশ্য এর মানে এ-ও নয় যে, একজন কবি ‘মানুষ’ নন, তিনি অন্যগ্রহের প্রাণী।

দুই

আল মাহমুদের বিরামপুরের যাত্রী কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে উপর্যুক্ত ভাবনায় স্বাভাবিকভাবেই আক্রান্ত হতে হয়। ‘বিরামপুর’টা কোথায়? এই ধরনের প্রশ্ন অবশ্য অর্থহীন। তবে, আমরা পঞ্চাশের দশকের আরেক কবি তারাপদ রায়ের একটি কবিতা পুরোটাই উদ্ধৃত করছি :

‘চলেছি নিঝুমপুর, নিঝুমপুর কোথায় কে জানে/ কে জানে?/ তবু যেতে হবে, শালবন,/ হয়তো ফুটেছে ফুল, শালফুল কখনো দেখিনি,/ শালফুল হয়তো ফোটে না,/ ফুটলেও যাবে না চেনা, কেননা এ পথ/ চলেছে নিঝুমপুর।/ পথের পাশে শোভা আকাশ বা পাখি/ বাদাম গাছের নিচে বাদামী আঁধার/ কিছুই দ্রষ্টব্য নয়।/  নিঝুমপুর গ্রাম না নগর/ কিছুই জানি না শুধু/ নিঝুম নিঝুমপুর চলো, চলো, চলো।’ (নিঝুমপুর/ ‘ছিলাম ভালোবাসার নীল পতাকাতলে স্বাধীন’)

অন্যদিকে কবি আল মাহমুদ, ত্রিকালদর্শী প্রাজ্ঞ ঋষির মতো, মন্ত্রিতস্বরে বলে ওঠেন :

‘আমার নাম কবি ছাড়া আর কিছু নয়। আমি বিরামপুরের যাত্রী/ পার হয়ে এসেছি কতগ্রাম, এই রামনগর অবধি/ কত নদী, কত গৃহস্থালি। জেনেছি নারীকে আগে, এইবার/ মাটির স্বাদ চাই। এই মাটি ঘামে ভেজা রক্ত সিক্ত কর্দম মাত্র নয়।/ এই মাটি পুরুষের বুক। এই মাটিকে কে বলে মৃত্তিকা?/ কত দরবেশ ঘোরাতে ঘোরাতে তসবীহ দানা পার হয়ে চলে গেছে/ পাথরের লৌহ কপাট। তারা ছিলেন বিরামপুরের যাত্রী/ এখন আমিও।’ (বিরামপুরের যাত্রী)

নিঝুমপুর আর বিরামপুরের মধ্যে দূরত্ব হয়তো অতি সামান্য; কিন্তু কবির উপস্থাপন-ভঙ্গি আমাদের জানিয়ে দেয় এই ‘সামান্য’ই যোজন-যোজন দূরত্বের স্মারক। যেন কহলিল জিবরানের চৎড়ঢ়যবঃ কিংবা নীটশের তধৎধঃযঁংঃৎধ-র মতো – বিরামপুরের যাত্রী – আল মাহমুদ ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টার মতো বলে যান :

অন্তর্হিত হওয়ার এই খেলা এই নাটক এই ধূপছায়া আমি দেখি/ সূর্য সাক্ষী। আবার সব ভেসে উঠবে যেমন হে আদিত্য প্রত্যহ তোমার/ অস্তগমনের পর তুমি আবার একটি সকাল নিয়ে আসবে।/ কে না জানে কাল সূর্য উঠবে? অথচ যারা ডুবে গেছে যারা/ অপসৃত তারা কিভাবে ভুলে যায় যে অদৃশ্যের পর্দা ছিঁড়ে আবার/ ফিরে আসবে সব। (‘সব আসবে সব ভাসবে’)

ঋগে¦দের ঋষি যেমন সূর্যের উদ্দেশে বলেন :

* Crossing space, you are the maker of light, seen by everyone, O Sun. You illumine the whole, wide realm of space.

* We have come up out of darkness, seeing the higher light around us, going to the sun, the god among gods, the highest light.

* This Aditya has risen with all his dominating force, hurling my hateful enemy down into my hands. Let me not fall into my enemys hand. (The Rig Veda : 1.50)

কবি আল মাহমুদ এই কাব্যের প্রায় সবকটি কবিতাতেই তার

অস্তিত্বের ভাঁজগুলো যেন খুলে-খুলে দেখিয়ে গিয়েছেন। এই যে আত্ম-উন্মোচন তার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে আত্ম-উত্তরণের স্বাভাবিক প্রচেষ্টা, যা একান্তই মনুষ্যত্ব-নির্মাণে মনোযোগী –

‘পৃথিবী মাঝে মাঝে তার নিজের পেট থেকে আত্মবিনাশী দৈত্যের জন্ম দেয়।/ যদিও কিছুদিন পর ওইসব দৈত্যের হাড়গোড় পৃথিবীর কাহিনীকাররা মাটি খুঁড়ে/ হাতড়ে হাতড়ে তালাশ করেও খুঁজে পান না, তবু দৈত্যের হুঙ্কারে মাঝে মধ্যে/ ব্রহ্মাণ্ডে চিড় ধরে যায়। তবু মানবতা কি হার মানে? পৃথিবী তার নিজের নিয়মেই/ মহাদেশগুলোর কন্দরে কন্দরে বসন্তের ফুল ফোটায়। কবিরা বদ্ধ কালা হয়ে/ গিয়েও কোকিলের কুহুধ্বনি ঠিকমতোই শুনতে পায়।

(‘ক্রাইস্ট ইজ কামিং’)

এই আশাবাদী মনোভাবই কবির আত্মবিশ্বাসের পথ-নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বলা যায়, এই আশাবাদিতা কবির আত্ম-উন্মোচনের (এবং আত্মস্বরূপেরও বটে) একটি অভিক্ষেপ। এক সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ জানিয়েছেন :

‘… আমার সাম্প্রতিক কবিতায় নিজেকে উদ্ঘাটন যেমন আছে, তেমনি নিজের অস্তিত্বের রহস্য ভেদ করার চেষ্টাটাও পুরোমাত্রায় আছে। আমি সাধারণ অর্থে একজন বিশ্বাসী মানুষ। এই বিশ্বাস আমার কবিতাকে আগের চেয়েও সহজ হতে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। …বর্তমানে …আমি গভীরভাবে গদ্যের সারাৎসার কবিতায় ব্যবহার করতে চাই। যদিও জানি, এতে সফলতালাভ খুবই দুরূহ ব্যাপার।’

কবি যাকে গদ্যের সারাৎসার বলেছেন, তার নমুনা এই কাব্যের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আমরা লক্ষ করি। এবং এই সারাৎসারের অন্তর্লীন সুরের সঙ্গে আমরা কবিতার স্বাভাবিকতাকে, তার নিজের নিয়মে, কিন্তু নতুনভাবে, অবলোকন করি। যে-দুরূহতার কথা বলেছেন কবি, সেটিই তো তাঁর কাব্য-পরিক্রমণের শক্তি। কবির সাধনা তো দুরূহতার সাধনা, যে-দুরূহতা আবার স্বাভাবিকভাবেই সহজ-সরল নির্মাণের মুখাপেক্ষী। এবং এর মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই, মানবিক অখণ্ডতা-নির্মাণে কবির আন্তরিক প্রয়াস। এই প্রয়াসের সাক্ষী তাঁর এই কবিতা –

‘ঋতুর অতীত আমি। কে জিজ্ঞাসে এটা কোন মাস?/ বাতাসে গড়িয়ে পড়ে বিদায়ের বিষণ্ন নির্যাস।/ শ্রবণেরও শক্তি নেই। কিন্তু ভাবি কোলাহল আছে/ প্রতিটা বাড়ির রন্ধ্রে, ইটে ইটে, আনাচে-কানাচে।/ এটা কি শরৎ সন্ধ্যা? বাংলাদেশ? কাঁশফুলে ছেয়ে গেছে চর?/ উদাম আকাশ তবে এখনও কি মাথার ওপর?/ এমন নির্গন্ধ বায়ু কোনকালে ছিল কি এদেশে?/ আমার পঙ্ক্তি শুনে, কারা হাসে? প্রেতের আদেশে/ মনে হয় মরে গেছে শরতের সন্ধ্যার শহর।/ আর কোনো স্মৃতি নেই, ভীতি নেই, নীতি নেই কাঁপে থরথর।

অস্তিত্বের কাঠামোখানি, হাড়গোড় রক্তের নহর।/ এভাবেই কাব্য হয় তর্কে তর্কে কেঁপে ওঠে/ কবির অধর।’

(‘একটি শরৎ সন্ধ্যা’)

আল মাহমুদ তাঁর সাম্প্রতিক কবিতায় একই সঙ্গে গদ্যের রূঢ়তা আর পদ্যের লালিত্যকে অতিযত্নে সরিয়ে রেখেছেন। এই প্রয়াসের কারণেই তাঁর কবিতা একই সঙ্গে অতি রূঢ়তা এবং অতি পেলবতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাঁর কবিতায় দেখা যায় এক নতুন ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা, যা এই কাব্যের প্রাণ-ভোমরা। এই যে সহজিয়া সুর তাঁর কবিতায় আমরা শুনতে পাই, সেখানে অনুভব করি, স্বাভাবিকতার স্পর্শ, সমন্বয়ের সাধনা, যার বিষয়ে কবি নিজেও ভীষণ সতর্ক এবং আন্তরিক। এই সতর্কতা, এই আন্তরিকতাই তাঁর বিশ্বাসের এবং সাহসের প্রধান ভিত্তি। কবি যেমন বলেন :

আমার কানের কাছে কলরবমুখর একদল কাক সবসময় কেমন প্রতিশ্রুতির কথা বলে/ কা, কা, কা। যেমন কাকস্য পরিবেদনা – তুমি প্রতিশ্রুত তুমি কমিটেড। কি সেই প্রতিশ্রুতি/ কি সেই কমিটমেন্ট?/ হ্যাঁ আমি জন্মেছি এই মাটিতে। হ্যাঁ, এই নদীগুলো আমার/ বুক চিরে আমার চোখ/ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আমাকে অন্ধ করে দিয়ে/ এই স্রোতের নাম হয়েছে নদী। হ্যাঁ/ এই নারীরা আমার বাসনার ডালপালা। এদের নাভী আমার চোখ। (‘কাকস্য পরিবেদনা’)

কবিকে যতটা নিঃসঙ্গ মনে হয়, তিনি ততটা নিঃসঙ্গ নন। কবিমাত্রেই নিঃসঙ্গতার মাঝেও প্রকৃতির চারপাশের বিভিন্ন বস্তুর সংস্পর্শে আসেন। আসতে পারেন। আল মাহমুদও পেরেছেন। যদিও তিনি জানান, ‘আমি তো বন্ধুহীন লোক।… ও ধস ধ সড়ফবৎহ সধহ. আর আধুনিক মানুষের কোনো বন্ধু হয় না।’ কিন্তু আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এই কবি শুধুই আধুনিক মানুষ নন, শুধুই আধুনিক কবি নন। তিনি হচ্ছেন এই মাটির মানুষ, এই মৃত্তিকার কবি, যা কিনা চিরদিনের। এ-কখনো নতুন হয় না, আবার তা কখনো পুরানোও হয় না। এইসব চিরন্তনতার সঙ্গে সংযুক্ত, সম্পৃক্ত। আল মাহমুদের কাব্যসাধনা তাই সেই চিরন্তনকে নানাভাবে উপস্থাপনের সাধনা। আর সেই সাধনার শক্তিতেই তিনি বলতে পারেন –

… আমার দৃষ্টিই জগতের/ তাবৎ ঐশ্বর্য অবলোকনের প্রতিচ্ছবি।/ হ্যাঁ, আমি প্রতিশ্রুত, আমি কমিটেড যতক্ষণ সদ্যজাত শিশুর/ কান্না …/ … ততক্ষণ আমার কলম; আমার কথা; আমার উপমা/ আমি মেঘ থেকে নির্গত করবো অবিশ্রাম, নিরবচ্ছিন্ন মা, মা ডাক।

…/ আমি কমিটেড, আমার প্রতিশ্রুতি এখন নিক্ষেপ যন্ত্রের মতো অপেক্ষমাণ। (‘কাকস্য পরিবেদনা’)

কবির নিরন্তর কাব্যসাধনা তাঁকে এই প্রত্যয়ে দৃঢ় করেছে। নিজের উপরও তিনি আস্থাবান। এই যে প্রত্যয়, আস্থা – এগুলো আল মাহমুদের স্বাতন্ত্র্যতার স্মারক। এই স্বাতন্ত্র্য একদিকে যেমন কবি হিসেবে, তেমনি অন্যদিকে মানুষ হিসেবেও আল মাহমুদকে মর্যাদাবান করে তোলে। তারপরও তাঁর ‘কবি’-পরিচয়টিই আমাদের কারো-কারো দৃষ্টিতে বড় হয়ে দেখা দেয়। যে-কবি বলেন, ‘কবিতা আমার জীবন, সেই কবি কবিতার প্রতি যে একশত ভাগ প্রতিশ্রুত, সে-বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই দেখি না। নিজের প্রতি কবি নিজেই আস্থাশীল। সেই আস্থা থেকেই তিনি বলেন,

আমি যদি হেরে যাই প্রভু তবে লক্ষ লক্ষ শিয়ালের ডাকে এ নরম বাংলাদেশের/

সবগুলো সবুজের আস্তর ফেটে যাবে।…/

আমি হেরে গেলে সবগুলো কোকিল আবার কাক হয়ে যাবে।…/ মৌমাছিদের মত আমারও সময়জ্ঞান আছে। আমি জানি একদিন হেরে যেতে হয়/ কিন্তু আমি না থাকলে শেয়াল ও বৃদ্ধ বাঘের হুঙ্কার ছাড়া এ ঢাকা মহানগরীতে/ আর কোন প্রার্থনার শব্দ অবশিষ্ট

থাকবে কি?…

যখন মানুষ পাখি ও পতঙ্গের মুখে আর আরাধনা নেই, তখন আমাকে হারিয়ে/ দাও প্রভু। সুন্দরবনের বুড়ো বাঘের কাশি মিশ্রিত হাসি তোমার ভাল লাগলে/ আমাকে হারিয়ে দাও প্রভু।

আমাকে হারিয়ে দেওয়ার সাথে সাথেই ঐ রূপালী চাঁদের মুখে আমার গিলাফ/ পরিয়ে দিও প্রভু। এদেশের সবগুলো নদীর ওপর থেকে যেমন পাল অপসৃত/ হয়েছে তেমনি সরিয়ে নাও ভৈরব ব্রিজ আর যমুনা সেতু। তারপর চন্দ্রনাথ/ পাহাড়ের ওপর দাও এক লাল রঙের পতাকা।

(‘আমি যদি হেরে যাই’)

কবি আল মাহমুদ তাঁর অন্য আরেকটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন :

‘সম্প্রতি আমি নিরাভরণ গদ্যে বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে কিছু কবিতা লিখতে চাইছি। এতে উপমা প্রায় কাহিনীর চুম্বক নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছে। যুদ্ধোত্তর গদ্যকবিতা আর আমার দীর্ঘ কবিতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক আছে। এ-ধরনের পরীক্ষা সার্থক হলে ভালো, না হলেও কিছু আসে যায় না।’

‘বিরামপুরের যাত্রী’ কাব্যে এ-ধরনের কবিতার নমুনা নানাভাবেই দেখতে পেয়েছি। কবির এই পরীক্ষা শুধু পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; সেইসঙ্গে হয়ে উঠেছে সার্থক কবিতার অন্য-এক উদাহরণ। কবিতা যে কতো বিচিত্র হতে পারে আল মাহমুদের কাব্য-সম্ভার থেকেই তার বিস্তর উদাহরণ মিলবে। তাছাড়া, আল মাহমুদের এই সাম্প্রতিক কাব্যে, কবিতাকারে, ‘কবিতা’-বিষয়ে কবির মনোভাবেরও একটি চিত্র পাই। তিনি বলছেন,

ক. কবিতা কোনো আশ্চর্য ব্যাপার নয়। প্রকৃতপক্ষে কবিতা কোনো অবস্থাতেই – একটিমাত্র মানবিক ভাষায় রচিত হয় না। আসলে কবিতা কি কোন ভাষা? কবিতা কি কোন সংগীত? কবিতা কি নির্ঝর? তাহলে কবিতা হলো ওযৌনীসম্ভব ওঙ্কারমাত্র। হয়তো হৃদয় থেকে নির্গত হয়ে হৃদয়েই সমাহিত হয়ে যায়। আমি তোমার কাছে সত্য কি তা জানতে চাই না।

(‘উজান ঠেলে’)

খ. কবিতা তো দৃশ্যকল্প কেবল তোমার সাথে আসঙ্গলিপ্সার কিছু অকপট ছবি – আর শুধু অপেক্ষায় থাকা, কখন বিলীন হবে

অস্তিত্ব আমার কিংবা ভাবে কখনও ছিল না কেউ সবি স্বপ্ন, সবি শূন্য মাঠে ভূমিহীন কৃষাণের অফুরন্ত নিঃশ্বাসের হাওয়া।

(‘জনশূন্য আমার বিবেক’)

দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি, দেশের ভাষার প্রতি কবি আল মাহমুদের যে-আনুগত্য, সে-বিষয়ে প্রশ্ন তোলা নিজেদের মানবিক দীনতারই স্বাক্ষর। কেননা কবি জানাচ্ছেন :

‘যে ভাষায়, যে জাতির জন্য লিখছি তাদের মনুষ্যত্ববোধ কোনদিন নিঃশেষ হবে না। হাজার বছরের ইতিহাসের পরীক্ষায় বাঙালি জাতির মনুষ্যত্ববোধ তথা কাব্যবোধ উত্তীর্ণ হয়ে এসেছে। আবহমানকাল থেকে তারা তাদের কবিদের শিল্পীদের যোগ্য সম্মান দিয়ে এসেছেন, ভবিষ্যতেও দেবেন। এটা এখন নিশ্চিত জানি, দেশের মানুষের জন্য লিখছি, তাদের প্রেম, কাম, সাহস, সহনশীলতা, ধর্ম, স্বাধীনতাপ্রিয়তা ও অপরিসীম দারিদ্র্য নিয়ে লিখছি – লিখছি বাঙালি জাতির সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে। একদিন সুন্দর ভবিষ্যৎ এসে আমাদের শ্রমের মূল্য দেবে, আমরা সুখে, সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকবো।’

যিনি এভাবে দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখেন, তাঁকে যোগ্য সম্মান না-দেয়ার অর্থ নিজেদেরকেই অসম্মান জানানো, যা আমাদের কারোরই নিশ্চয় কাম্য নয়।

‘বিরামপুরের যাত্রী’ কাব্যখানা পাঠশেষে যে-সুর আমাদের কানে গুঞ্জরিত হয়, সেটি হচ্ছে

‘নিঃস্তব্ধতার সুর’। সেইসঙ্গে নিশ্চুপতার স্বরও আমাদের অনেকক্ষণ আবেষ্টন করে রাখে, যার রেশ সহজে কাটে না। আল মাহমুদ তাই আমাদের রবীন্দ্রনাথের মতো এভাবে বলবার অধিকার রাখেন :

ÔWhen the voice of the silent touches my words/ I knwo him and therefore I knwo my self.Õ (ÔFire flies)

রিলকের যে-অধ্যাত্মবোধ আমাদের মুগ্ধ করে, সেই একই মুগ্ধতা আমরা অনুভব করি আল মাহমুদের কবিতায়। রিলকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে এটি বলবার অধিকার আছে আমাদের এই কবির, যা কিনা রিলকের নবম এলিজিতে শুনতে পাই। কী বলেছেন রিলকে? বলছেন,

‘Look, I am living on what? Neither

childhood nor future are growing less… Supernumerous

existence wells up in my heart.’

আল মাহমুদের কাছে চলাটাই মুখ্য, গন্তব্য নয়। কেননা, কবি ভালোভাবেই জানেন – চলা মানেই গতি আর গতি মানেই জীবন। এই জীবনের বন্দনা-গানই তো আমরা শুনি কবির কবিতায়। শুনি এইভাবে –

পানির প্রভুত্বে হাসে পৃথিবীর প্রাণের সঞ্চয়/ বলে জয়, জয়, জয়, জলময় বৃষ্টির বিজয়।

বিরামপুরের যাত্রী আমাদের এই কবি তাই একাগ্রচিত্তে সামনে এগিয়ে চলেছেন তাঁর নিজের শেকড় আর ডানার ডালপালায় ভর দিয়ে।কবি আল মাহমুদের কাব্যবাণীর তাৎপর্য, ‘যাহার শুনিবার কান আছে’, সে-ই শুনুক।