গর্জনফুল

‘ছায়ারানি নাকিন তোরতুনও ভালা অভিনয় করে।’

বাউকুড়ানির মতো এলো খবরটা। বুকটা ধক্ করে উঠল। বুকের কোথায় যেন চিনচিন করে ওঠে। লক্ষ্মীর ওপর শুবনীর মেজাজ খারাপ হতে চায়। কিন্তু সে রাগ করে না। এই চা-বাগানে ওর মতো সয়ানি আর মিলবে না। ও খুব বিশ্বস্ত। ওর খবর ভিত্তিহীন হয় না। শুবনী মুখে কিছু বলে না। বড় বড় চোখ মেলে ধরল। লক্ষ্মী সেই চোখের দিকে তাকিয়ে কী দেখল, কে জানে! সে-ও কেমন চুপসে গেল। হয়তো বুঝল, শুভ ব্যথা পেয়েছে।

সন্ধ্যাটা ঝুপ করে নেমে এলো। কয়েকটা প্যাঁচা চেঁচিয়ে উঠল। কয়েকটা বাদুড় পাখা ঝাপটাল। গর্জনগাছের মাথায় একঝাঁক পাখি উড়ে গেল। কারো ঘর থেকে উলুধ্বনি ভেসে এলো। ছনের চালা দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। পশ্চিম আকাশ লালিমায় ছেয়ে গেল। অটল বুড়া চা-বাগানের ঘণ্টা পিটাল। ঘণ্টার শব্দ ঢ্যাবার বুকে বাড়ি খেয়ে কানে ফিরে এলো। ঠিক তখন লক্ষ্মী শুবনীকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে নঅ মাইতে আছিস যে?’

‘কী বইলবো?’ শুবনী একটা দীর্ঘশ্বাস চাপল। লক্ষ্মীও যেন টের পেল। কিন্তু শুবনী পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। মন খারাপটা বাইরে দেখাতে নেই। লক্ষ্মীরও তখন মন খারাপ হবে। এটা সহ্য করা যায় না। শুবনী এটা সহ্য করতে পারে না।

‘কিছু একটা বলো।’

‘কী বইলবো, তুই তো দেখিস নাই।’

‘না, আমি দেখি নাই, শুইনেছি। ছায়ারানি বইলছে, বাবু ওকে বইলেছে তোর থাইকাও উয়াকে নাকিন ভালা মানাইতো।’

‘আইচ্ছা, বাবু যদি বইলে থাকে তাইলে আমি পালায় অভিনয় নাই কইরবো।’

‘তাইলে বড়বাবু রাইগে যাবে।’

‘যাগ গই। রাইগলে আমার কী হইলো!’

‘আইচ্ছা আমি যাচ্ছি গই ঘরে, কাম আছে।’

‘তুই রিহার্সেলে যাবি নাই আমার সাথে?’

‘হ, যাব। কাম সাইরে আইসবো তো!’

যখন একটা সুখ-সুখ ভাব মনের ভেতর প্লাবন বইয়ে দিচ্ছিল তখনই ঝড়ের মতো খবরটা না এলেই কি হতো না! মেজাজটা তিরিক্ষি হয় শুবনীর। তারপরও ধৈর্য ধরে থাকে। ঘরে এসব জানলে পালায় অভিনয় করতে দেবে না। কিন্তু বিন্দির মাকে কীভাবে সামলাবে। হারামখোরের বেটি তো মাইক নিয়ে নেমে পড়েছে। নিষেধ করলে তেড়ে আসবে ঝগড়া করতে।

সে মনে হয় শুনতে পাচ্ছে, পাড়ায় এখনো বিন্দির মা রসিয়ে রসিয়ে সবাইকে বলছে। এ-খবর আকাশে-বাতাসে না রটিয়ে কিছুতেই থামবে না সে। সকল রকমের খবর নিমিষেই সবার কাছে পৌঁছে না দিলে যার পিত্তি জ্বলে। কোনোদিন ওটা জ্বলেই মাগি মরে, সেদিনটা দেখার জন্যই সে ছটফট করে। একদিন রাতের অন্ধকারে বুড়িটার গলা টিপে দিতে পারলে সুখ হতো ওর। কিন্তু সেটাও পারবে না সে। আরো কত কিছু যে পারে না সে, তার হিসাব নেই।

শরতের এমন মিষ্টি বাতাস শুবনীর ভালোই লাগে। গর্জন গাছের মাথার ওপর থোক থোক ম্লান আলো মায়া ছড়ায়। আর লাইনের ওপর এসে দাঁড়ালে ঢ্যাবার দিকে চোখ যায়। কিছু হাঁস, ন্যাংটা ছেলেমেয়ে পানিতে দাপাদাপি করে।

এ-দৃশ্য দেখে প্রায়ই সে আফসোস করে। আহা, কী মধুর ছিল দিনগুলো!

দেখতে দেখতে তার দিনগুলো পাল্টে গেল। আরো কত কি যে করত, সেসবের হিসাব নেই। এর-ওর গাছের ফলপাকুড় সন্ধানও তো করত। ছাগলটা-গরুটা বেঁধে দিয়ে আসতে বললে বনের ভেতর পাখির বাচ্চার সন্ধানে ব্যস্ত থাকত। আছাড়গাছের পাতায় ল্যান্টানাগাছের ফল দিয়ে পান-সুপারির মতো খেতো। মাঝে মাঝে ফুটকীগাছের ফলগুলো পাকলে খেয়ে জিবটা কালো করে ফেলতো। কিংবা চা-গাছের ফুল থেকে মধু টেনে খেত। সবই ছিল নেশার মতো। সেই সময়টা ফুরুৎ করে হারিয়ে গেল?

‘তুই কি আর ছোট্ট আছিস নাকিন বড় হয়ে গেলি তো। এখন কি আর ঢ্যাবাতে ডুবাডুবি মানায়?’ লক্ষ্মীর কথাগুলো তাকে থমকে দেয়। কিন্তু তার মনটা তো আর বড় হলো না। সে যেমন ছিল, তেমনি আছে। মনটা কেন বড় হলো না? এই ভেবে সে অস্থির হয়। কিন্তু সেই অস্থিরতার কোনো সমাধান হয় না।

চা-বাগানের সবার মুখে মুখে এখন যাত্রাপালার গল্প। সবার আনন্দের একটাই উৎস পূজা। পূজা এলে কটা দিন ধুমধাড়াক্কা কাটবে। আর এ-সময় পরিবারের নিষেধাজ্ঞা তেমন থাকে না। মনে হয়, যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে। পূজা পূজা গন্ধটার জন্য সবাইকে আপন মনে হয়। মন্দিরকে ঘিরে চা-বাগানের মানুষগুলোর আনাগোনা তখন বেড়ে যায়। সপ্তাহান্তে যেখানে মন্দিরে আসতে সবার কোমর ব্যথা করে এখন আর তেমনটি শোনা যায় না। এখন এসে এসে প্রতিমা কতদূর হলো – এর খবরাখবর নেয়। কিংবা মন্দিরের বারান্দায় বসে গল্প করতে থাকে।

বছরজুড়ে ঝিম মেরে থাকলেও এ-সময় যেন সবার রক্তে বান ডাকে। পালায় কে করবে নায়িকার পাঠ? শুবনীর জন্য যখন ডাক পড়ল তখন সে আনন্দে আটখানা। অবশ্য আরো দুজন ডাক পেয়েছে – মালতি আর ছায়ারানি। কিন্তু শুবনীকেই যখন বাবু ঠিক করলেন, তখন তার ভেতরে আনন্দ টগবগ করে ফুটছে। সবাই তার দিকেই অন্যরকম করে তাকাচ্ছে। মালতি আর ছায়রানিও পাঠ পেয়েছে।

ঘরে ফিরলে অবশ্য মা আর দিদিরা মুখ ভার করে তাকাচ্ছিল। তখন সে ঝামটা মেরেছিল।

কী হবে পালা করলে? সবাই রাগ করছে কেন তার সঙ্গে? কিন্তু দিদিরা পরক্ষণেই হেসে দিলো। তাদের অনুরাগের কথা তারা জানাল। কিন্তু মা সহজে হাসে না। মায়ের মুখটা চিন্তিত দেখায়। রাতে খাওয়ার পরও যখন মা মুখটা ভার করে রাখে তখন সে মায়ের কাছে এসে বসে।

মা বলে, ‘আঁই তো রাগ করি ন; কিন্তু মনে মনে ভাবিয়ের তুই মাইয়্যা মানুষ বিয়া দওন লাইগদো না?’

চা-বাগানের সবার মুখের ভাষার সঙ্গে শুবনীদের পরিবারের ভাষা ঠিক মেলে না। ওরা সন্দ্বীপের মানুষ। সেই ভাষাটা কিছুতেই ভুলতে পারে না। বাইরে সবার ভাষার সঙ্গে তাল মেলালেও ঘরে নিজেদের অজান্তেই সন্দ্বীপের ভাষা চলে আসে। তাই চা-বাগানের কুলি-কামিনদের ভাষা ওরা কেউই রপ্ত করতে পারেনি। জাতে ধোপা। নিচু জাত বলে দিদিদের বিয়ে সহজে হচ্ছে না। তবে ওরা সবাই পরিশ্রমী।

বিয়ে-টিয়ে নিয়ে এত ভাবাভাবি করে না। যত ভাবে এসব নিয়ে তা ওর বুড়ো মা।

শুবনী চুপ মেরে যায়। তাহলে কি লক্ষ্মীর কথাই ঠিক, সে বড় হয়ে গেছে? যাক, এখন মায়ের কথা শুনে মনটা একটু হালকা হলো। পূজা শেষ হলে আবারো সবাই ঠিক হয়ে যাবে। আর মাত্র কদিন, দেখতে দেখতে পূজা তো চলেই এলো।

কাজল ফুরিয়েছে। দুটো টিনের কালো পাতে আঙুল ডলেও একটু কালি উঠল না। অগত্যা শুবনী কাজল তৈরি করতে চেষ্টা করল। বোতল থেকে সরিষার তেল নিয়ে তা বাতির আগুনে ধরে কাজল বানাতে গিয়ে হয়রান হয়ে উঠল। ততক্ষণে লক্ষ্মীও চলে এসেছে। এসেই তাড়া লাগাল।

‘কিরে তুই এখনো রেডি হইস নাই? ওইদিকে তো বাবুলালদা প্যাঁ-পুঁ শুরু কইরেছে।’

বাবুলাল হারমোনিয়াম মাস্টার। সে-ই তো সবার আগে যাবে। আর বাবুরা তো আসবে আগামীকালের প্রোগ্রাম সেরে। কাজেই সময় লাগবে। বাবুলালদা হারমোনিয়ামে একটু সুর তুলে রিহার্সাল রুম গরম করছে।

বেড়ার সঙ্গে ঝোলানো আয়নার সামনে দাঁড়াল শুবনী। চোখের সাদা জমিনে কালো মণি নয়, যেন কাজলবিলে শাপলা ফুটেছে। চোখ টিপে দুষ্টুমিভাবটা এনে দেখল নিজেকে কেমন লাগে। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে চোখে কাজল টানল। লাল ফিতায় চুলের বেণি করে নিয়েছে আগেই। এবার বেড়ায় রাখা গর্জনফুলের মালাখানি যত্নে তুলে নিল বেণির ওপর। সে দৃশ্য লক্ষ করে লক্ষ্মী আঁতকে উঠল।

‘হায় হায়, কী কইরলিরে শুব, এইটা তুই কী কইরলি?’

শুবনী লক্ষ্মীকে পাত্তা না দিয়ে বললো, ‘হায় হায় পরে করিস, আগে তাড়াতাড়ি চলো। বাবু রাগ কইরবে।’ বেরিয়ে পড়ল দুজন। ঢ্যাবারপার ধরে এগিয়ে চলল। লক্ষ্মীর মুখে আর কোনো কথা সরছে না। কেমন একটা বোবা ব্যথায় সে নীরব হয়ে রইল। কিন্তু কেন তা শোনার সময় শুবনীর নেই। লক্ষ্মীর কাছ থেকে পরে শোনা যাবে।

ব্যাপারটা পা চালাতে গিয়ে খেয়াল করল শুবনী। হাঁটতে হাঁটতে খেঁকিয়ে উঠলো, ‘কি রে মুখপুড়ি চুপ মাইরে আছিস কেনে?’

‘কী বইলবো আর! তুই তো নিজের বড় একটা ক্ষতি কইরে ফেলাইছিসরে শুব।’

‘বইলবি তো কি হইলো?’

‘গর্জনগাছের ফুল পইরলে তো তোর কপাল পুইড়বে।’

‘তুই কি গণকঠাকুর? এসব কথা কে বইল্লো তোকে?’

‘হ, শুইনেছি তো, চা-বুড়ি বইলেছে। ইয়ার আগে যারা যারা গর্জনফুল পইরেছে উয়ারা সব ভাইগে গেছে। তুই কোনো ভাইগে যাবি নাকিন?’

শুবনী হাসতে থাকে লক্ষ্মীর কথা শুনে। সে হাসি আর

থামতেই চায় না। লক্ষ্মী ভয় পেয়ে যায়। ‘কিরে তোর কী হইল? পেত্নি ধরে নাই তো?’

‘হ ধইরেছে, পেত্নি চাইপে ধইরেছে।’

‘যা ভাই, আন্ধার রাইতে এমুন কথা নাই বলিস, ডর লাগে।’

‘ডরাইকনে মইরে যা, ডর পিকনা।’

‘তুই চিতাখোলার সামনে মনোগিরির কথা কিল্লাই বইলছিস, উয়ার ভূতে ধইরলে তো মইরে যাব।’

দুই

দুর্গাপূজার সপ্তমী আর অষ্টমীর দিনে আছিয়া চা-বাগানে যাত্রাপালা হয়। বাবুরা আর চা-শ্রমিকরা মিলে অভিনয় করে। নিজেরাই চাঁদা দেয়। তাই দুর্গাপূজার আনন্দ আরো দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। আশেপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে মানুষ তো আসেই, তার সঙ্গে যত চা-বাগান আছে, সেখান থেকেও মানুষ আসে।

বাবুটার নাম সুহাস। ফর্সা মুখ। সরু গোঁফটা বেশ মানানসই। নতুন এসেছে বাগানে। একলা একটা বাসায় থাকে। বেশ হাশিখুশি। বড়বাবু ফর্ম মাস্টার। ডিরেকশন দেন। অনেক রাগি মানুষ। সবাই ভয় পায় বড়বাবুকে। আরো কয়েকটা বাবু আছে। উনারা সবাই অভিনয় করবেন। তার মধ্যে মানিকবাবু, নায়েববাবু, শহীদবাবু করবেন রাজা চরিত্র। আর সুহাসবাবু করবেন নায়ক। প্রথমদিন সুহাসবাবুর সঙ্গে অভিনয় করতে শুবনীর ভেতরটা কেমন কেঁপে উঠল। বাবুকে ধরতে গিয়েও ধরতে পারছিল না। বড়বাবু কষে একটা ধমক দিলেন। তারপর সে সুহাসের বুকে মাথা রাখার অভিনয় করল। কিন্তু রক্তের ভেতর ঠিকই বান ডাকল। সে-বানের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল অঙ্গে অঙ্গে। গান গাইতে গিয়ে কেমন বেসুরো হয়ে যাচ্ছিল। কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।

ছায়ারানি মজা পাচ্ছিল। ওদের ইচ্ছে ছিল বড়বাবু রাগ করে যেন শুবনীকে বাদ দিয়ে দেয়। কিন্তু বড়বাবু যদিও ধমক-ধামক দিয়েছেন, বাদ দেননি। সময় দিয়েছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে কী করতে হবে। কতটুকু কাছে আসতে হবে। কিন্তু কাছে এলেই শুবনীর ভেতরে কী যে হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে পারছে না সে। এ পরিবর্তনটা যেন তার কাছের মানুষ লক্ষ্মীও টের পেলো।

‘কী রে শুব?’ লক্ষ্মী ওকে শুব নামেই ডাকে।

‘কী?’

‘কী হয়েছে তোর?’

‘কই কী হইল?’

‘না দেইখছি তো। চোখের রং পাইল্টে যাচ্ছে। মুখের রং পাইল্টে যাচ্ছে। এই একটুখানি ধরাতেই এমন!’

‘দূর হ, মুখপুড়ি। তুই কলার ছড়াটা দেইখেছিস।’

‘হ, আমি কলার ছড়াটা দেইখেছি আর তুই রথ দেইখেছিস, তাই নারে?’

হাসতে থাকে ওরা দুজনে। প্রতিদিনের রিহার্সালে কী হয় তারই প্রতিক্রিয়া সবার মুখরোচক গল্প। সবার মুখে মুখে এসব কথা ছড়ায়। ছড়াতে থাকে। এসব থেকে রঙিন ডালপালাও গজায় এবং সে-গল্প শুধু আছিয়া চা-বাগানে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা ছড়িয়ে যায় হালদা ফেলে পঞ্চবটী, নেপচুন, দাঁতমারা, রাঙ্গাপানি, বারোমাসিয়া, এলাহিনূর ও উদালিয়ায়।

রিহার্সাল শেষ হতে সেদিন মধ্যরাত্রি পার হয়েছে। লক্ষ্মী বসে বসে ঝিমুচ্ছিল। সে-দৃশ্য অবশ্য শুবনী দেখছিল কিন্তু রিহার্সালে কথা বলা যায় না, তাই ওকে ডাকতে পারেনি। পথে পথে এগুলো নিয়েই দুজনে আলাপ করছিল। পেছন থেকে কারো গলার স্বর শোনা গেল। টর্চের আলো এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়াল। শুবনী বুঝতে পারল সুহাসবাবু। বাবু পাশে পাশে হাঁটছে আর শুবনীর একটা হাত অন্ধকারে তার হাতে দখল করে নিয়েছে। পাশে লক্ষ্মী টের পেয়েছে কি না তা বুঝতে পারছে না শুবনী। টের পেলে পাক, কী আর বুঝবে! খুব ভালো লাগছে শুবনীর। এখন মনে হচ্ছে, লক্ষ্মী যদি সঙ্গে না থাকতো! তাহলে ভালো হতো?

‘আয় কিছুক্ষণ কথা বলি। কী বলিস?’ বাবুর এমন প্রস্তাবে শুবনী কী বলবে ভেবে পেল না। শুধু একবার বললো, ‘লক্ষ্মী আছে তো সঙ্গে।’

‘তাতে কী? তোর বান্ধবী না? ও একটু বসবে আর কি!’ শুবনী চুপ মেরে থাকে। লক্ষ্মী কী উত্তর দেয় তার জন্য অপেক্ষা করে।

‘ঠিক আছে, বাবু খুব কইরে বইলছে যখন, যা না। আমি একটু বইসব আর কি!’ লক্ষ্মী একটা থামের সঙ্গে মাথাটা ঠেকা দেয়।

মন্দির ছেড়ে এগিয়ে গেলে বাবুর বাসা। একটা টিলার ওপরে। ছনের ছাউনি। বাঁশবেড়ার বাংলো। সব মিলিয়ে মনে হয় তিন-চারটে কক্ষ আছে। বাইরে একটা লাইট। চাঁদের মতো শূন্যে হলুদ আলো ছড়াচ্ছে। লাইটকে ঘিরে পোকামাকড়ের হোলি উৎসব শুরু হয়েছে। সেই দৃশ্য দেখতে থাকল লক্ষ্মী। ঘরের ভেতর থেকে শুবনীর হাসি ভেসে আসছে, ফিসফিস কথাও শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু ওদের গল্প আর শেষ হয় না। লক্ষ্মীর অসহ্য লাগে। একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে লক্ষ্মী ঘুমিয়ে পড়েছিল। কত সময় কেটে গিয়েছে, সে জানে না। টের পেল শুবনী যখন তাকে ধাক্কা মেরে ডেকে তুলল।

‘কী রে, পাঁচ মিনিট বইসে থাইকতে নাই পারিস?’

লক্ষ্মী কথা বলে না। মাত্র পাঁচ মিনিট! তার তো মনে হলো পুরো রাতটাই ফুরিয়ে গেল। যা হোক, একটু গম্ভীর হয়েই শুবনীর সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল লক্ষ্মী। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শুবনীও তেমন কথা বলল না। কিন্তু শুবনীর মধ্যে কী যে একটা বিদ্যুৎ খেলছিল, সেটা সে বলার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। লক্ষ্মী সে-খবর জানল না। তার চোখেমুখে ঘুমের লাই আর চেতনটাও কেমন ভোঁতা হয়ে আছে।

তিন

বাতাসে রুটিপোড়া গন্ধ। এখানে সকালটা এরকমই। কাজে যাওয়ার হুটোপুটি সবার। শিশিরভেজা ফুল। গর্জনতলায় ফুলের সমাহার। মনে হচ্ছে আকাশ থেকে অসংখ্য তারা পড়ে আছে মাটির বিছানায়। শুবনী কুড়িয়ে নেয়। তারপর হালকা গোলাপি ফুলে মালা হবে। সন্ধ্যায় সে-মালাটা খোঁপায় দিয়ে রিহার্সালে যাবে শুবনী। ছায়ারানিকে একটা উচিত শিক্ষা দিতে হবে। ওর লোভটা বেশি। বাবুর দিকে ও যেন চোখ না তুলে তাকায়।

শুবনী তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচ্ছে। মা রুটি ভাজছে। সে চা করে নিল। বড় দুই দিদি বেরিয়ে গেছে কাজে। দুপুরের জন্য কিছু নিয়ে আর কিছু মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে-ও। রাস্তার মোড়ে লক্ষ্মী দাঁড়িয়েছিল। শুবনী আসতেই লক্ষ্মীর একটা বাঁকা কথা শুনতে হলো।

‘এতক্ষণে আইসেছে নায়িকা!’

‘বেশি দেরি হয়ে গেল?’

‘না ঠিকাছে। কিরে দিন দিন কেমন হইয়ে যাচ্ছিস শুব।’

‘কেমন হইলাম রে?’

‘তোকে চিনছি নাই।’

‘যা, কী বলিস, কিল্লাই চিনবি নাই? কী কইরলাম।’

লক্ষ্মী আস্তে করে বলল, ‘কী যে করলি সেইটাই তো বইলতে নাই পাইরছি।’

সকালে সবাই কাজে বের হয়। পথে পথে অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়। গত সন্ধ্যার বিষয় নিয়ে কথা হয়। আবার কে কার উদ্দেশে কী বলেছে সেসবও বিনিময় করে। শুবনীর চোখজোড়া শুধু সুহাসবাবুকেই খোঁজে। জুতার শব্দ তুলে হালকাপাতলা লোকটা আসে। ঠোঁটে মৃদু হাসির ঢেউ তুলে রাখে। পান খাওয়া ঠোঁটের লালচে আভায় দুষ্টুমির ইঙ্গিতটুকু সে ঠিকই ধরতে পারে। মুখের কথাগুলো কী মিষ্টি! কোন জেলার মানুষ, কে জানে! হয়তো দক্ষিণের। তার

পৃথিবীজুড়ে তোলপাড় তুলে দিয়েছে এই বাবুটা। নিজেকে সে তৈরি করতে চায় বাবুর জন্য। কিন্তু বারবার এক জায়গায় এসে আটকে যায়। তার তো কোনো লেখাপড়া নেই। জাতে ধোপা।

বিয়ে করতে গেলে জাতপাত লাগে, আর প্রেমে এসবের কী দরকার? তাই এ-সম্পর্কে লেখাপড়ার বিষয়টি আসে না। মাথার ভেতর সব মিলিয়ে একটা কঠিন সমস্যা তৈরি করে নিল শুবনী। নিজের মনোজগতে এসব ভাবনায় তার মাথাটা গরম হয়ে উঠতে চায়। কিন্তু ধন্বন্তরি ওষুধের মতো কাজ করে সুহাসবাবুর মুখটা। নিজেকে সে প্রবোধ দেয় – অতো অধৈর্য হলে কী চলে? তোমায় আরো ধৈর্যশীল হতে হবে। আরো সহ্য করতে হবে তোমায়। লেখাপড়া সমস্যার একটা সমাধান সে বের করবেই। এটা বাবুই তো তাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে পারে, তাই না? সুযোগ পেলে কখনো এটা সে বাবুকে বলবে।

চার

যেন প্রতিমার মুখ। কথাটা বারবার তার কানে বাজে। বাবু তার মুখটা দু-হাতের কোষে ধরে কেন বলেছিলেন এ-কথা? এ কৌশল কি শুধুই পটানোর জন্য? কী জানি! শুবনীর ভেতরটা নানা সংশয়ে দোদুল্যমান। এমন দোলায় প্রায়ই তাকে চড়তে হয়।

মন্দিরে প্রতিমার গায়ে রং করা হচ্ছে। তার মায়াবি আলোর বিচ্ছুরণ যেন শুবনীর মুখ। কী যে বলে বাবুটা – শুবনী হাসে। পাগলটাগল নাকি! কোনোদিন বলে তার মুখটা নাকি চাঁদের মতো।

শুবনী জিজ্ঞেস করে লক্ষ্মীকে, ‘এই লক্ষ্মী বল না। আমার মুখটা কি চান্দের মতো? জানিস, বাবু বলে আমি নাকি চান্দের মতো। হাইসলে আমার গালে নাকি টোল পড়ে? টোল কি রে? এগুলা কী কথা? এইরকুম কথা আমি বাপের জন্মেও শুনি নাই। জানিস, বাবু আমাকে পান খাইতে মানা কইরেছে। বলে পান খাইলে আমার দাঁত নষ্ট হয়ে যাবে। হাইসলে নাকি দাঁতের তুন জোছনা পইড়বে। শুইনেছিস এমুন কথা?’

‘এর আগে তো এইরকুম পাগল দেখি নাই!’ লক্ষ্মী হাসে। তবে লক্ষ্মী এত নির্লিপ্তভাবে কথাগুলো বলে যে শুবনী বোঝে এসবে ওর কোনো আগ্রহ নেই। বাবুর সঙ্গে শুবনীর মেশাটা লক্ষ্মীর পছন্দ নয়। তাই অনেক কিছুই লক্ষ্মীর কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে হয়। আর এটাই শুবনীর কাছে খুব কষ্টের। কারণ চা-বাগানে এ-কথা বলার লোক আর সে দ্বিতীয়টি খুঁজে পাবে না।

চা-বুড়িকে খুঁজেই পাওয়া যায় না। কোথায় কোথায় যে থাকে বোঝা মুশকিল। অন্ধের যষ্ঠির মতো লেগে থাকে নিধিরাম। কী যে খাতির বুড়ি আর ছেলেটার, বলার মতো নয়। ছাগল চড়ায় গরু চড়ায় বনজঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় আর চায়ের গল্প শোনায় বুড়িটা। চা দিলে চোখ বন্ধ করে খায়। আর চমকে ওঠার মতো গল্প বানায়। তো সেদিন দুপুরে পেয়ে গেল চা-বুড়িকে। ডেকে নিল ঘরে। চা বানিয়ে বুড়ির হাতে ধরিয়ে দিলো। এবার বুড়ির বকবক শোনা যাবে। শুবনী বুড়ির মুখোমুখি বসেছে।

‘আইচ্ছা  পিসি, বলত গর্জনফুল মাথায়  দিলে কী হয়?’

চা-বুড়ি যেন শুবনীর কোনো কথাই শোনেনি। শুবনী আবার জিজ্ঞেস করলো। বুড়ি এবার মগের ভেতর থেকে মুখ তুলল।

‘ক্যানে তুই কি মাথায় গর্জনফুল পইরেছিস?’

‘হ, পইরেছি তো!’

‘ভালা কাম করিস নাই।’

‘এইটা কি সত্যি লাগে?’

‘এত কথা কেমনে জাইনবোরে বাপু, শুধু জানি গর্জনফুলের শক্তি অনেক বেশি। ভালা হইলে ভালা, নাইলে খারাপ হবে।’

‘খারাপ হইলে কী হবে?’

‘গলায় ফাঁসি লাইগবে। বুঝিস?’

কলজেটা কেঁপে উঠল। কী ভয়ংকর! বুড়ি বলে কী! ইচ্ছে করছে বুড়িটার মাথার ওপর দুই ঘা বসিয়ে দিতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। এমন অলক্ষুনে কথা বুড়ি পেল কোথায়? তাছাড়া, বুড়ির এসব কথায় বিশ্বাস করার কী দরকার আছে? দরকার নেই। বুড়িকে তাড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করল শুবনীর। বুড়ি চা শেষ করে নিজেই উঠে দাঁড়ালো। যাওয়ার সময় ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলে গেল, ‘খবরদার, বাইরের বেটাছেইলা নাই ধরিস। ধইরলে তোর কপালে দুঃখ আছে।’

বুড়ির পথের দিকে তাকিয়ে থাকে শুবনী। ঠিক তখনই তার আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলিটা চোখে পড়ে। চা-ফ্যাক্টরির ডায়ারের চিমনিটা থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। বাতাসে চা-পাতার একটা ঘ্রাণ আসে। মনটা কেমন উড়ুউড়ু করে। সময়টাই বুঝি এমন। রোদের ফিনফিনে শরীরজুড়ে মিষ্টি আমেজ। আকাশে সাদা সাদা মেঘ।

শুবনী কাজ করে আর সংলাপ মুখস্থ করে। সংলাপ বলে বলে লক্ষ্মীকেও শোনায়। লক্ষ্মী হা করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। শুবনী বলে, ‘এইরকুম নাই দেখিস মুখ লাইগবে।’

‘পানিপড়া দিব।’

‘হ, তুই তো গণকঠাকুর।’

মন্দিরের চারপাশে দোকানপাটের নকশা হয়ে গেছে। মঞ্চ তৈরিও শুরু হয়েছে। কাঠমিস্ত্রিরা খুব ব্যস্ত। ছেলেমেয়েরা ভিড় করে ওসবই দেখে। মানুষের আনাগোনা থামছেই না। হালদা পেরিয়ে নতুন নতুন মানুষ আসে। পালার খবর নিয়ে যায়। সপ্তমীর রাতে হবে ‘আপন দুলাল’ আর অষ্টমীতে ‘হিংসার পরিণাম’। ষষ্ঠীর দিন বিকেলেই ঝলমল করে উঠল চারপাশ। মনিহারি দোকানগুলোতে কিশোরীদের ভিড় লেগে গেল।

চুড়ি-ফিতা, আলতা-স্নো-লিপস্টিক আরো কত যে আছে, তার হিসাব নেই। সন্ধ্যায় সুহাসবাবু শুবনীর হাতে একটা কাগজের প্যাকেট ধরিয়ে দিলো। ভেতরে চুড়ি-ফিতা-লিপস্টিক আর সাজপ্রসাধন। বুকটা ভরে ওঠে আনন্দে। আজ রিহার্সাল নেই। আজ সবার বিশ্রাম। আগামী দিন সপ্তমীর রাতে পালা হবে। শহর থেকে ব্যান্ডপার্টি এসেছে। মন্দিরের কাছেই তাদের থাকার ব্যবস্থা। সেখান থেকেই মাঝে মধ্যে টুং-টাং ভেসে আসে। ভেসে আসে ঢোলের বোল। কর্নাটে পোঁ-পোঁ করে যেই সুর তোলে ছেলেমেয়েরা অমনি ছুট লাগায় ওদিকে।

পাহাড় থেকে আদিবাসী মেয়েরা নেমেছে। রঙিন থামিতে ওদের আনন্দ উপচে পড়ছে। দোকানগুলোয় ‘তিল ঠাঁই আর নাহিরে’। ছেলেমেয়েদের মুখে নানারকমের বাঁশি। প্যাঁ-পুঁ এ-ধরনের শব্দে কান গরম হয়ে উঠেছে। ওদিকে আকাশের রং পাল্টায়। মেঘ ওঠে। মেঘের আনাগোনা কাউকে কাউকে চিন্তিত করে।

সপ্তমীর দিন। সকাল থেকে পালার পাত্রপাত্রীদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হলো। শেষ সংলাপ আওড়ানোর পালা শুবনীর। ঘরে ওর দিদিরাই বিচারকের আসনে বসেছে। নানাভাবে সাহায্য করছে। লক্ষ্মীও মাঝে মধ্যে উঁকি দিচ্ছে।

দুপুরে খাওয়ার পর একটু ঘুমানোর চেষ্টা করল শুবনী। কিন্তু ঘুমোতে গিয়ে একটা খারাপ স্বপ্ন দেখে ফেললো। সে একটা অচেনা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কাউকেই চিনতে পারছে না। সুহাসবাবুকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না সে। মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল। কী যেন ভাবতে ভাবতে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। তারপর বাবুর ঘরের দিকে পা বাড়াল। মন্দির থেকে মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছে। রাস্তাঘাটে লোকজনের কোলাহল। সবাই শুধু ছুটছে।

সে-দৃশ্য দেখতে দেখতেই শুবনী টিলা বেয়ে বাবুর বাসায় উঠে গেল। বারান্দায় যখন বসল, তখন সে ভেতরে একটা মেয়ের কণ্ঠ শুনতে পেল। কণ্ঠটা তার চেনা।

ঝড়ের গতিতে বের হয়ে এলো ছায়ারানি। পেছনে ঠান্ডা হাওয়ার মতো ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে সুহাসবাবু এলেন। শুবনী এককোণে বসে ছায়ারানির চলে যাওয়া দেখল।  তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। এ সময়ে ছায়ারানি এখানে কেন? আর সুহাসবাবুই এত মিটিমিটি হাসছে কেন? ছায়ারানির পেছন থেকে দু-একবার ডেকে সুহাসবাবু ঘরে ঢোকার আগ মুহূর্তেই তার দিকে চোখ গেল।

‘কিরে এই সময়ে তুই এখানে? ঘুমাসনি?’

‘ঘুমাইছিলাম। স্বপ্ন দেখে মন খারাপ হয়ে গেছে।’

‘যা পাগলি, দুপুরবেলার স্বপ্নে কি বিশ্বাস আছে নাকি?’

‘কেন নেই?’

‘সুহাসবাবু মাথা নাড়ে। নেই।’

‘ছায়ারানি কিল্লাই আইলো বাবু?’

‘পাগলাপানি পেটে পড়লে কতই তো পাগলামি করে। পরোব বইলে দুপুরেই পাগলাপানি খেয়ে নিছে।’

বাবুর কথা শুবনী শোনে তবে মন থেকে খটকা যায় না। এই দুপুরে ছায়ারানি চোলাই গিলে বাবুর কাছে কেন এলো? প্রশ্নটা ঘুরপাক খায় মাথার ভেতর। কিন্তু সে-ভাবনা বেশিদূর এগোয় না, তার আগেই শুবনীকে নিয়ে ঘরে ঢোকে সুহাসবাবু। চানাচুর আর ফলে আপ্যায়ন করে যখন কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট দুটোকে দখলে নিয়ে নেয় তখন শুবনী নিজেকে টান মেরে সরিয়ে নিয়েছিল।

মাথার ভেতর এখন ছায়ারানি নেই। বাবুর সরল হাসিতে সব উবে গেছে। পথে যেতে যেতে সে ল্যান্টেনা গাছের ফুলগুলো নিয়ে মধুচোষার জন্য চেষ্টা করল। কোনোটায় পেল, কোনোটায় পেল না। মনের ভেতর একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া চলতে থাকল। কোনো সুর মধুর আবার তিক্ততায় ভরপুর!

পাঁচ

পালা শুরু হবে রাত নটায়। কিন্তু তার আগে সপ্তমীর আরতি দেখতে সবাই মণ্ডপে ভিড় জমাবে। সেই উদ্দেশ্যেই তৈরি হচ্ছিল শুবনী। হঠাৎ তার লক্ষ্মীর কথা মনে হলো। লক্ষ্মীর ঘরে এসে দেখল সে একটা নতুন কাপড় পরেছে। মাটির ঘরে লেপ দিয়েছে। আলপনা দু-একটা টেনেছে। চারদিকে তাকিয়ে লক্ষ্মীর ঘরের অন্ধকারটা বেশ ভালো লাগে শুবনীর। ইচ্ছে হয় মেঝেতে একটা গড়াগড়ি দেয়।

‘আয় আয়, বয়। আমার ঘরে নায়িকা আইসাছে রে।’

‘মাইর দিবো হারামি উল্টাপাল্টা কিছু বইললে।’

‘মায়ে পাক্কন পিঠা বানাইছে, খাবি?’

‘কই দেখি।’ একটা বাসনে লক্ষ্মী পাক্কন পিঠা তুলে দেয়। শুবনী কামড় দিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখে। লক্ষ্মী হাসে। বলে, ‘কিরে শুব খাওয়া যাইচ্ছে নাই?’

‘বহুত মজারে!’

‘চোলাই খাবি?’

‘আইজকা নাই খাব।’ বাবু শুইনলে রাগ কইরবে। ছায়ারানি চোলাই খেয়েছে শুনে বাবুর প্রতিক্রিয়াটা মনে পড়লো শুবনীর। লক্ষ্মী তাড়া লাগাল। এখন অন্যকিছু ভাবতে হবে না। আগে সে শুবর নতুন কাপড় দেখবে। কিন্তু চোলাই গিলে শংকরের নতুন গানটার কথা শুবনী ভুলতে পারছে না। বারবার সেটাই গুনগুন করছে।

‘লিলো পঙ্খি ঝিলো/ এই মাতাল মনকে বলো/ নিদ আসে নাই দুটি চোখে/ কি যে আমার হলো।’ এই গানের সঙ্গে শংকরের যে নাচ তা চোখে লেগে আছে।

ছয়

সন্ধ্যা হতেই সবাই সপ্তমীর আরতি দেখতে আস্তে আস্তে ভিড় জমছিল মণ্ডপে। কিন্তু আকাশের দিকে কারো চোখ পড়েনি। হাওয়া কেমন গুমোট হয়ে উঠছিল। খুশির ঠেলায় সেদিকে কারো খেয়াল ছিল না। ঢোলের বাড়ি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটু একটু বাতাস শুরু হলো। সে-বাতাস আরো বেগবান হলো বৃষ্টির সহযোগে। দোকানপাট ঝড়ের দাপটে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল। যাত্রাপালার মঞ্চের ওপরের অংশ ওপরে পড়ল। কয়েকটা মালাকানা আর চাক্কাগাছের ডাল ভেঙে পড়ল। গর্জনগাছের পাতায় মুহূর্তেই চারপাশে ধ্বংসস্তূপ দিলো। সকল আনন্দের অপমৃত্যু হয়েছে। সবাই মূক। কিন্তু ঝড়ের জন্য তো সব থেমে থাকবে না। রাত নটার দিকে ঝড় থামলে আরতি শুরু হলো। কিন্তু পালা কিছুতেই শুরু হতে পারল না। ঘোষণা হলো, আগামী দিন আবহাওয়া ভালো থাকলে পালা হবে। অষ্টমী আর নবমীর রাতে। অনেকের মন খারাপ হলো। হালদার জল ডিঙিয়ে অনেকেই এলো। কিন্তু সবাই ফিরে গেল।

অষ্টমীর রাতে অনেক দর্শক এসেছে। সবাই অপেক্ষা করছে।  মঞ্চে  যন্ত্রীরা বসেছে।  সুরের  মূর্ছনায়  মুখরিত  হচ্ছে।

যথাসময়ে শুরু হলো পালা। আসর বন্দনা করার জন্য মঞ্চে এলো একঝাঁক মেয়ে। একটানা ভোররাত পর্যন্ত চলল পালা। নবমীর রাতের পালাও শেষ হলো। দশমীর দিনে সবকিছু বিষণ্নতায় ছেয়ে গেল। শুবনীর মনে নৈঃসঙ্গ্য। সুহাসবাবুর সঙ্গে সে আর ঘনিষ্ঠ হতে পারবে না। এ ধরনের মনে হওয়ার কারণেই সে দেখা করতে গেল। বাবু তখনো ঘুমাচ্ছিল।

লাইনজুড়ে একটা নীরবতা কাজ করছে। বিসর্জন হবে বিকেলে। সবাই কাজ নিয়ে ব্যস্ত।

প্রতিমা বিসর্জনের পর সবাই প্রসাদ নিতে আসবে। সেই আয়োজনই চলছে। শুবনী তৈরি হয়েই এলো। লক্ষ্মীও বের হয়ে এসেছিল। শুবনীকে দেখতে পেয়ে একগাল হেসে দিলো। কিন্তু শুবনীর মুখে হাসি পেল না। লক্ষ্মীকে জড়িয়ে ধরল সে। লক্ষ্মী অবাক হলো, কেন শুবনী এমন করছে! তারপর দুজনেই বের হয়ে এলো মণ্ডপের উদ্দেশে। কিন্তু পথে লক্ষ্মীকে এগুতে বলে শুবনী ভিন্ন পথ ধরল। এ-পথ বাগানের ভেতর দিয়ে চলে গেছে অনেক দূরে। বিসর্জনের জন্য লোকজন সবাই ব্যস্ত থাকবে। শুবনীকে কেউ খুঁজবে না। এর মধ্যেই সে পৌঁছে যাবে গন্তব্যে।

তিন মাইল পথ। জোরে পা চালাল শুবনী। শেষ গাড়িতে সে বাবুর সঙ্গে চলে যাবে শহরে। দুজন মিলে সংসার পাতবে। লালকরোলির টিলা পার হয়ে নির্জন চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে চলে যাচ্ছে শুবনী। ভেতরে একটা কান্না গুমরে উঠছে। জন্মস্থান এভাবে অতীত হয়ে যাবে! মাকে কিছুই বলা হলো না। রাতেই খবর হয়ে যাবে সব। কোথায় কোথায় খুঁজবে ওরা তাকে। হঠাৎ গর্জনফুলের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল চা-বুড়ির কথা। কি অদ্ভুত! আসলেই তো শক্তিশালী গর্জনফুল। আর চা-বুড়ি? কে জানে এসব। সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে গেল পাহাড়ি স্টেশন ঝিংরিতে। পাহাড় আর গাছপালায় ঘেরা ঝিংরি। অন্ধকার জমে আসছে। শেষ বাসটা পেট পুরানোর জন্য ষাঁড়ের মতো গোঁ-গোঁ আওয়াজ তুলছে।

দৃষ্টিতে প্রদীপ জ্বালিয়ে শুবনী চারপাশে খুঁজল সে। না, কোথাও বাবুকে দেখা গেল না। চিন্তা হলো, মনটাও খারাপ হতে শুরু করলো। দেখতে দেখতে বাসটা যথাসময়ে ছেড়ে গেল। শুবনী এখন কী করবে? পথ জানা নাই। অন্ধকারটা বেশিক্ষণ একা থাকতে দিলো না। আকাশের চাঁদটাও পিছু নিল। চোখের নোনাজলের স্বাদ যে নোনতা তা আবারো জানা হলো তার। চেনা পথে ফেরা ছাড়া আর কিছুই করার নেই। রাত কটা বাজে! বাবুর ঘরে তালা। আক্রোশ বুকে চেপে ঘরে ফিরল।

একগাদা প্রশ্ন শুবনীকে জেঁকে ধরল। সে নিরুত্তর।

মাথায় কিছুই খেলে না। সকালে লক্ষ্মী এসে কাজে যেতে তাড়া লাগাল। হুম, কাজেই সে গেল। যাওয়ার পথে লক্ষ্মী শোনাল ছায়ারানি ভেগেছে সুহাসবাবুর সঙ্গে। নির্বিকার শুবনী। মুখে কোনো রা নেই। শুধু পায়ে দলে গেল ঝরে থাকা গর্জনফুলের হাসি।