অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন বহুমাত্রিক মানুষ। বহুরকম প্রকাশের মধ্যে সাহিত্য গবেষণার দিকে চোখ রাখলে প্রথমেই নজরে পড়বে তাঁর প্রথম ও সাড়া জাগানো মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য বইটির দিকে। সামাজিক ইতিহাসের পটভূমিকায় এতে বাঙালি মুসলমানদের সাহিত্যকর্মের (১৭৫৭-১৯১৮) আলোচনা আছে। অজ্ঞাত পূর্বতথ্য তুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে ভাষা, সাহিত্য ও ধর্ম, রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্পর্কে সে-সময়ের লেখকদের ভাবনা এতে উদ্ঘাটিত হয়েছে। সেসকল ভাবনার সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ছিল। মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও চরিত্রের রূপান্তর ঘটে।
পরবর্তীকালে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের আরেকটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ্য, বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে। এ-বইয়ে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন যে, উনিশ শতকের নবজাগরণ থেকে শুরু করে আধুনিক কাল পর্যন্ত নারীর অবস্থান কীভাবে গৃহের অন্দরমহল থেকে বাইরের বৃহত্তর জগতে বিস্তৃত হয়েছে। বইটির শুরুতেই গ্রিক নাট্যকার অ্যারিস্টোফিনিস ও পরশুরাম খ্যাত রাজশেখর বসু-রচিত নারীসম্পর্কিত দুটো উক্তির নিরিখে ২৪০০ বছরের ব্যবধানে সমাজে নারীর অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। বইটির ভূমিকায় একদিকে তিনি যেমন বলেছেন, ‘নারী একইসঙ্গে প্রকৃতির ফুল ও ভুল; বিধাতার দ্বিতীয় ভ্রান্তি; শুধু বিধাতার সৃষ্টি নয়, আপন অন্তরের সৌন্দর্য দিয়ে পুরুষের গড়া’, আরেকদিকে, পুরুষের ‘মনের মাধুরী মিশিয়ে’ নারীকে রচনার বিপক্ষে গিয়ে লিখেছেন, ইতিহাসে নারীর আরো এক পরিচয় আছে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে তার আধিপত্য ছিল, সমাজের অর্থনৈতিক জীবনে ছিল তার ভূমিকার প্রাধান্য। পিতৃতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরে নারীর নিয়ন্ত্রণ গেল পুরুষের হাতে – তার ভূমিকা অনেকখানি পালটে গেল। সংসার করা ও সন্তানপালন করার পাশাপাশি কোনো এককালে নারীর অংশীদারিত্ব ছিল কৃষিকর্মে। তারপর যখন তার স্থান হলো গৃহকোণে, তখন সে গড়ে তুলল কুটিরশিল্প। সেই শিল্পজাত দ্রব্যের চাহিদা কমে এলে সে ফিরে এসেছে কৃষিতে, কিন্তু এবারে সহায়কের ভূমিকায়। কলকারখানার বিকাশের সঙ্গে সে কাজ করেছে অল্প মজুরিতে। রক্ষিতা হয়ে থেকেছে, পতিতাবৃত্তি মেনে নিয়েছে। … কেউ কেউ আত্মনিয়োগ করেছে সৃষ্টিশীল কাজে : সাহিত্য-দর্শন, সংগীত-চিত্রকলা, ভাস্কর্য-স্থাপত্যে তার প্রতিভার সাক্ষর রেখেছে। ধীরে ধীরে সমাজ ও সংসারে নিজের অবস্থা উপলব্ধি করেছে নারী – তখন সে মাথা উঁচু করে তুলতে চেয়েছে। সে দাবি করেছে নিজের অধিকার – পারিবারিক মর্যাদার, সামাজিক সম্মানের, ভোটের। সে চেয়েছে পুরুষের সমকক্ষতা – জীবিকা গ্রহণ করেছে পুুরুষের মতোই। রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছে, কারাগারে গেছে, দেশ চালিয়েছে।
আনিসুজ্জামানের বাঙালি নারী : সাহিত্যে ও সমাজে বই থেকে আমরা সাহিত্যে প্রাচীন যুগে নারীর অবস্থান এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে পরিবারে তথা সমাজে নারীর অবস্থানটি বদলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে পারি। জানতে পারি মূলত পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত কল্পকাহিনি থেকে। একে আমরা সাহিত্যে নারীর অবস্থানের ‘সেকাল’ বলতে পারি। তারপর এর সঙ্গে তুলনা করতে পারি উনিশ, বিশ আর একুশ শতকে, অর্থাৎ ‘একাল’-এর সাহিত্যে নারীকে কী রূপে তুলে ধরা হলো। সাহিত্য সমাজের দর্পন। তাই সমাজে যদি নারীর অবস্থান, বেঁচে থাকার লক্ষ্য বদলে যায়, তবে তৎকালীন সাহিত্যেও তা বদলাতে বাধ্য।
‘সেকাল’
বাংলা সাহিত্যের শুরুর দিকে, অর্থাৎ নারীবাদ আলোচনায় আসার আগপর্যন্ত সাহিত্যে নারী সম্পর্কে যে-ধ্যানধারণা পাওয়া যায়, তা মূলত একমুখী। তবে ক্ষেত্রবিশেষে যে সেই ধারণা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে কেউ কেউ নারীর চরিত্র নির্মাণ করেননি, তা বলাও অনুচিত হবে। নারীর সম্পর্কে তাই সাহিত্যে তথা সমাজে যে-ধারণা বিদ্যমান ছিল তাকে একদিকে যেমন বলা যেতে পারে ‘প্রচলিত ধারণা’, আবার অন্যদিকে ‘নতুন ধারণা’। আনিসুজ্জামান একটি উদাহরণ দিয়ে এই দুই ধারণার বিপরীতধর্মী আচরণকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, যেমন, প্রচলিত ধারণা হতে পারে, ‘লেখাপড়া শিখলে মেয়েরা বিধবা হয়।’ অন্যদিকে নতুন ধারণাটি হলো, ‘বিধবার বিয়ে হওয়া উচিত’। বাঙালি সমাজে তো বটেই, পিতৃতান্ত্রিক অন্য সমাজেও নারী সম্পর্কে এই দ্বৈত মনোভাব বিদ্যমান। ইতিহাসবিদ ব্যাশম বলেছেন, প্রাচীন ভারতে নারীকে দেখা হতো একাধারে দেবী, ক্রীতদাসী, সন্তান জন্মদানকারী, কিংবা গণিকা হিসেবে। তাই সাহিত্যে নারীর বিপরীতধর্মী চিত্র এবং নারী সম্পর্কে পরস্পরবিরোধী মনোভাবের পরিচয় বিধৃত হয়েছে।
সাধারণভাবে বলা যায় যে, পুত্র ও কন্যা সন্তানের মধ্যে পার্থক্য করাটা প্রচলিত রীতি। পুত্রসন্তান পরিবারের সম্পত্তির রক্ষক, পক্ষান্তরে কন্যাসন্তান আর্থিক দায় বয়ে আনে। তাই কন্যাসন্তান জন্মালে পিতামাতা হতাশ হন, অসন্তুষ্ট হন। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্য, পুরনো অনেক সাহিত্যে এর সমর্থন পাওয়া যায় না। পঞ্চদশ শতাব্দীতে পিপিলাইয়ের মনসাবিজয়, ষোড়শ শতাব্দীতে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমণ্ডল, একই শতাব্দীতে দ্বিজ মাধবের মঙ্গলচণ্ডীর গীত, সপ্তদশ শতাব্দীতে আলাওলের পদ্মাবতী এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে মানিকরাম গাঙ্গুলীর ধর্মমঙ্গল কাব্যে কন্যাসন্তান জন্মের কথা আছে। কিন্তু এই কন্যা জন্মের কারণে এর কোথাও নিরানন্দের সঞ্চার হতে দেখা যায় না। বরং এসব কাব্যগ্রন্থ কন্যার জন্মকে একরকমের আনন্দ-উৎসবে পরিণত করেছে। যেমন, আলাওলের পদ্মাবতী কাব্যগ্রন্থে রাজকন্যা পদ্মাবতীর জন্ম হলে রাজ্যে সাতদিন ধরে আনন্দ-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। উপরন্তু মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পদ্মাবতী ছেলেদের সঙ্গে একত্রে পাঠশালায় শিক্ষালাভ শুরু করে। একইভাবে, দৌলত উজির বাহরাম খাঁর লায়লী মজনু কাব্যে দেখা যায় যে, ছেলেমেয়েরা একই পাঠশালায় শাস্ত্রপাঠ করে, সেখানেই কএস ও লায়লীর দেখা হয় আর তাদের প্রেমের সম্পর্ক শুরু হয়। অন্যদিকে, ষোড়শ শতাব্দীতে সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে দোনা গাজীর সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল কাব্যগ্রন্থে বিদুষী কন্যার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বিদুষী ছিলেন হয়তো অষ্টাদশ শতাব্দীতে রচিত ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল কাব্যগ্রন্থের সরস্বতী। বিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন ব্যাকরণ, অভিধান, সাহিত্য, নাটক, পুরাণ, সংহিতা, আরো অনেক কিছু। তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, যে-পুরুষ তার সঙ্গে বিচারে প্রবৃত্ত হয়ে জয়ী হবে, তিনি তাকে বিয়ে করবেন। বলা বাহুল্য নায়ক সুন্দর ছাড়া আর কেউ তাকে পরাজিত করতে পারেননি। এতে অবশ্য তৎকালীন সমাজে নারীর পুরুষের কাছে পরাজিত হয়ে থাকার বাসনা, আবেগার্থে হলেও প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া, অষ্টাদশ শতাব্দীতে শেখ সাদীর গদা-মল্লিকাসম্বাদ ও শেখ সেবরাজ চৌধুরীর মল্লিকার হাজার সওয়াল কাব্যগ্রন্থের নায়িকারাও বিদ্যা-বুদ্ধির জোরকে প্রধান করে তুলতে একই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন।
সুতরাং প্রাচীন এই সময়টিতে সমাজে যে স্ত্রী-শিক্ষার প্রচলন ছিল, সাহিত্যে তার ছাপ আছে। তবে এটুকু বলা যেতে পারে যে, এই প্রচলন হয়তো কেবল উচ্চবিত্তের জন্য প্রযোজ্য ছিল। নিম্নবিত্তদের মধ্যে কোনো না কোনো কারণে তা পুরুষ নারী দুইয়ের জন্যই সীমাবদ্ধ ছিল। যেমন, মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমণ্ডল কাব্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনি সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের কাহিনি। কাহিনি অনুযায়ী কালকেতু পূর্বজন্মে স্বর্গের দেবতা ইন্দ্রের পুত্র নীলাম্বর ছিলেন। শিবের পূজক হওয়া সত্ত্বেও ফুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কীটের কামড়ে শিবের পা কেটে যাওয়ায় শিবেরই অভিশাপে তিনি মর্ত্যে ব্যাধ বা শিকারি রূপে পুনর্জন্ম লাভ করেন। কালকেতুর বিদ্যাশিক্ষার কোনো উল্লেখ কবিরা করেননি, তবে পুত্র হিসেবে পৈতৃক বৃত্তি সে পেয়েছিল। ওদিকে ব্যাধের কন্যা ফুল্লরার লেখাপড়ার কোনো প্রশ্নই ওঠেনি।
আবার ঊনবিংশ শতাব্দীতে প্যারিচাঁদ মিত্রের রামারঞ্জিকায় দেখা যায় পদ্মাবতী তার স্বামীকে বলছে :
মেয়েমানুষ লেখাপড়া শিখে কী করবে? সে কি চাকরি করে টাকা আনবে? মেয়েছেলে লেখাপড়া শিখলে বরং লোকে নিন্দা করবে? মেয়েমানুষ লেখাপড়া শিখলে বিধবা হবে। … কায নাই বাবু আর কায নাই! মেয়ে আমার এমনি থাকুক। যে কয়েক দিনে পাঠশালে গিয়াছিল তার দোষ কাটানোর জন্যে ঠাকুরের কাছে তুলসী দেওয়াবো।
প্যারিচাঁদ মিত্র আরো বিস্তৃত জানিয়েছেন,
মেয়েদের শিখতে হবে গৃহকর্ম : রান্নাবান্না, ভাণ্ডারের হিসাব রাখা এবং দাসদাসীকে শাসনে রাখা। শিখতে হবে অর্থকরী বিদ্যা, অর্থাৎ শিল্পকর্ম – যাতে যাতে অবস্থার বিপর্যয় ঘটলে কিছু রোজগার করা যায়। স্বাস্থ্যতত্ত্ব জেনে সন্তানকে পরিষ্কার থাকা শেখাতে হবে, কেননা সুমাতা না হলে সুসন্তান হয় না।
এবারে আসি নারীর জীবিকা অর্জনের প্রসঙ্গে।
সপ্তদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর চর্যাগীতিতে ডোমনীদের কথা আছে। নিম্নশ্রেণির মেয়েরা কেউ তাঁত বিক্রি করত, চাঙারি তৈরি করত, গণিকাবৃত্তিতেও নিযুক্ত হতো। শুণ্ডিনীরা চোলাই মদ তৈরি করত। তাদের দরজায় এঁকে রাখা চিহ্ন দেখে লোকে সেখানে যাতায়াত করত। নারীরা নাচগানের সঙ্গেও জড়িত হতো, তবে সেসব পেশা বা অভ্যাস সমাজে নিন্দনীয় ছিল। আবার চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দীতে বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যগ্রন্থে পরিচারিকাবৃত্তির ব্যাপক উল্লেখ পাওয়া যায়। কৃষ্ণের অন্তত আটজন এবং রাধার সাতজন পরিচারিকার কথা জানা যায়। চণ্ডীমণ্ডলে ফুল্লরা হাটে হাটে মাংস বিক্রি করে আয় করে। ভারতচন্দ্রের কাব্যে কেবল বড়োঘরের দাসীদেরই পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় ঈশ^রী পাটনীকে, যে কি না নৌকা পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করত। সপ্তদশ শতাব্দীর দৌলত কাজীর সতী ময়না ও লোর চন্দ্রানী কাব্যে নায়ক-নায়িকার মধ্যে খবর আদানপ্রদানের জন্য দূতী চরিত্র পাওয়া যায়। এরকম চরিত্র ভারতচন্দ্রের কাব্যেও মেলে। আবার মৈমনসিংহ গীতিকার মলুয়া অংশে নেতাই কুটুনী ও কমলার চিকন গোয়ালিনীও একই জাতীয় চরিত্র। পঞ্চদশ থেকে অষ্টদশ শতাব্দী পর্যন্ত সাহিত্যে শুঁড়ি বা বারবণিতা হিসেবে নারীর উল্লেখ ছিল সাধারণ ব্যাপার; গায়িকা আর নর্তকীও ছিল। যদিও সমাজের মতোই সাহিত্যেও ভদ্রঘরের মেয়েরা সেসব পেশায় গ্রহণীয় ছিল না। তবে বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রভাবে কীর্তন গান আর তার সঙ্গে নৃত্যভঙ্গি সমাজে জনপ্রিয় হয়েছিল। আহমদ শরীফ তাঁর বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য গ্রন্থে বলেছেন, চট্টগ্রামে আরাকানী শাসনের শ্রেষ্ঠ দান ছিল মঘা চিকিৎসাশাস্ত্র, যেখানে নারীরাও ওই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতেন।
মেয়েরা কি বাড়ির বাইরে যেত?
সমাজে মেয়েরা যেখানেই জীবিকা নির্বাহ করে, সেখানেই তাদের বাইরে যেতে হয়। সমাজের বাস্তবতার মতো সাহিত্যেও মেয়েদের পেশার ক্ষেত্রে অবরোধ ছিল না।
নারীর সতীত্ব ও দাম্পত্য সম্পর্কে নিষ্ঠা ছিল তৎকালীন সাহিত্যের একটি প্রধান দিক। রামায়ণের সীতা ও মহাভারতের সাবিত্রী সতীত্বের মাধ্যমে নারীত্বের প্রতীক হিসেবে বরাবর বিবেচিত হয়েছেন। মনসাবিজয়ে বেহুলা সাবিত্রীর সঙ্গে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছেন :
সাবিত্রী যেমন সতী ব্রহ্মার বণিতা
তাহার অধিক আমি সতী পতিব্রতা।
দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর একনিষ্ঠা ও পরনির্ভরতার প্রয়োজন চণ্ডীমণ্ডলেও নানাভাবে প্রচারিত হয়েছে :
স্বামী বণিতার পতি স্বামী বণিতার গতি
স্বামী বণিতার হয় ধাতা
স্বামী সে পরম ধন স্বামী বিনে অন্য জন
কেহ নহে সুখদুঃখদাতা।
মৈমনসিংহ গীতিকা থেকে পদ্মাবতী, শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা, লাইলী মজনুসহ নানা কাব্যগ্রন্থে দাম্পত্য সম্পর্ককে জন্ম-জন্মান্তরের বলে প্রচার করা হয়েছে। সঙ্গে এও প্রতিফলিত হয়েছে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্যই সংসার টিকিয়ে রাখার মূল শর্ত। ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে শেখ সুলায়মানের অসিয়তনামা, সৈয়দ নুরুদ্দীনের দাকায়েকুল আখবার ইত্যাদি গ্রন্থে উপদেশ দেওয়া হয়েছে যে, নারীকে স্বামীর প্রতি সর্বদা ভক্তিভাবাপন্ন থাকতে হবে। স্বামীর আহ্বানে সময়োচিত সাড়া দেওয়া স্ত্রীর কর্তব্য, স্বামীর অনুমতি না নিয়ে বাইরে বেরোনো পাপ, স্বামী ক্রুদ্ধ হলেও স্ত্রী জবাব দেবে না, বরং করজোড়ে বা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। স্ত্রীদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, স্বামীর প্রতি কটূক্তি করলে জিহ্বা সত্তর গজ লম্বা হয়ে যায়, এবং তাকে দুর্বল বা দরিদ্র বললে সত্তর বছরের পুণ্য নষ্ট হয়ে যায়।
সতী সাবিত্রীর আদর্শ যেখানে সমাজে ও সাহিত্যে প্রচারযোগ্য ও অনুকরণীয় হিসেবে টিকে ছিল, সেখানে সেই আদর্শের ব্যতিক্রমেও ভরা ছিল সাহিত্য, যেন এর মধ্যে দিয়ে কবিরা নারীর জন্য এক বিকল্প জীবনদর্শনের চিহ্ন রেখে যাচ্ছেন। ধর্মমঙ্গল কাব্যে ছদ্মবেশী দেবীর আচরণ তেমন, ওদিকে বারুই রমণীরা প্রত্যেকেই পরপুরুষে, বিশেষত বিদেশি পুরুষে আসক্ত। শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন মূলত গ্রামীণ পটভূমিতে একটি পরকীয়া প্রেমের কাহিনি। এরই উলটোপিঠে তাকালে দেখতে পাই, আলাওল নিষেধ করেছেন পরনারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে। চৌদ্দ শতকের সাধক গদা ইউসুফ-রচিত ফারসি তুহফাত-উন-নিসায়েহ অবলম্বনে সপ্তদশ শতাব্দীতে আলাওল লিখেছিলেন তোহফা, যেখানে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, ‘পরনারীর দিকে কামভাবে তাকাবে না।’ তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ক্রীতদাসীদের তিনি পরনারী বলে গণ্য করেননি, তাই দাসীসম্ভোগের অনুমতি দিয়েছেন।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে শুকুর মামুদের গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস কাব্যগ্রন্থে দেখা যায়, স্ত্রী হচ্ছে সাধনার বিঘ্ন। রামের দুর্গতি সীতার কারণে, রাধার জন্য নারায়ণের বিড়ম্বনা, আর সংসারে পুরুষ কেবল নারীর জন্য বেগার খেটে মরে। অন্যদিকে, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে দেবরাজ ইন্দ্রের আদেশে ঋষি বিশ্বামিত্রের কঠোর তপস্যা ভঙ্গ করতে পাঠানো হয়েছিল ইন্দ্রের সভার শ্রেষ্ঠ সুন্দরী মেনকাকে। তিনি তা পেরেছিলেনও বটে।
প্রাচীন সাহিত্যে বিবাহ বা প্রণয়ের সময়ে নারীর বয়স চিন্তার উদ্রেগ করে। পুরুষের ভোগাকাক্সক্ষা বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রচলিত হওয়ার একটি কারণ হতে পারে বলে ধরে নেওয়া যায়। তবে দেখা যায়, কন্যার বয়স পাঁচ-ছয় হতেই পিতামাতা তার বিবাহের জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছে। চণ্ডীমণ্ডলে খুল্লনার বয়স ছয় বছর হতেই তার
বাবা-মা বিয়ের জন্য উতলা হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে কৃষ্ণ যখন রাধাকে প্রণয়নিবেদন করেছিল তখন রাধার বয়স এগারো। তবে তার আগেই আইহনের সঙ্গে তার বিবাহ হয়ে গিয়েছিল। শুধু বাল্যবিবাহ নয়, নারীর সতীত্বে সন্দেহ ওই সময়কার বহু কাব্যগ্রন্থে এসেছে। এসেছে তার অল্পবুদ্ধি, অস্থিরমতি, বিশ্বাসের অপাত্র এবং ধর্মজ্ঞানশূন্য হওয়ার কথা।
তৎকালীন সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পরে অনেক স্ত্রী স্বেচ্ছায় সতী হতে চাইতেন। আত্মীয়দের প্ররোচনা বা বলপ্রয়োগের দৃষ্টান্ত যেমন আছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বয়স হওয়ার আগেই সতী হওয়ার উদাহরণ যেমন পাওয়া যায়, তেমনি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে সহমৃতা হওয়ার নিদর্শনও কম নয়। সেই জায়গা থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করে বিধবা বিবাহের রীতি চালু করা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের এক দীর্ঘ সংগ্রাম ছিল। আইন পাশ হওয়া সত্ত্বেও উচ্চবর্ণের হিন্দু সমাজে এর প্রচলন সহজ ছিল না। যেমন, পৌত্র বলেন্দ্রনাথের কিশোরী বিধবা সাহানা দেবীর পুনর্বিবাহের সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে পিতৃগৃহ থেকে আনিয়ে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ অবশ্য পুত্রের বিয়ে দিয়েছিলেন বিধবার সঙ্গে, কিন্তু সে মহর্ষির মৃত্যুর পরে। আবার, সমাজে তথা সাহিত্যেও বিধবাকে মানসিকভাবে দৃঢ় বিবেচনা করা হতো না। এরকমটা অবশ্য পরেও ঘটেছে, বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ উপন্যাসে লম্পট দেবেন্দ্র ছদ্মবেশে বিধবা কুন্দনন্দিনীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল এই আশায় যে, কুন্দ যখন বিধবা তখন তাকে মানানো সহজ হবে। কৃষ্ণকান্তের উইলে হরলাল বিয়ের লোভ দেখিয়ে রোহিনীকে উইল চুরি করতে বলেছিল এই ভরসায় যে, বিধবার পক্ষে এমন লোভনীয় প্রস্তাব অস্বীকার করা কঠিন হবে।
যা হোক, আঠারোর পরে উনিশ শতকর সাহিত্যিকদের সৃষ্টিতে বাঙালি নারীর যে রূপ দেখা দিয়েছে তা নানারৈখিক। পুরুষেরা নারীকে মানবী বলে ভালোবাসবে, দেবী বলে পূজা করবে, নাকি দাসী বলে পিছনে রাখবে – তা প্রায়ই ঠিক করতে পারেনি। তবে উনিশ শতকের আগপর্যন্ত সাহিত্যে নারীর যে অবস্থানই আমরা পাই না কেন, তার কিছু ঐতিহাসিক ভূমিকা আছে। কারণ অতীতের ধারণাই মানুষকে ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যায়।
‘একাল’
সাহিত্যে নারীর জীবন ও পরিসর সুদীর্ঘকাল ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর অবদমন, অন্দরমহলের সংগ্রাম এবং ধীরে ধীরে আত্মপ্রতিষ্ঠার দুর্ধর্ষ দলিল। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে, এবং বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীতে নারীবাদের প্রথম ঢেউ আসার পর বাংলা সাহিত্যে নারী-চরিত্র কেবল ভোগ বা অলংকারিক রূপে নয়, বরং যুগের প্রয়োজনে দায়িত্বশীল, সংগ্রামী এবং আত্মসচেতন সত্তা হিসেবে বিকশিত হয়েছে।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ শাসকের ভাষা, জীবনাচরণ ও সাহিত্যে ক্রমশ অভ্যস্ত হয়ে ওঠা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ততদিনে কিছু কিছু ইংরেজি সাহিত্যের স্বাদ পেতে শুরু করেছে। হয়তো নিজের অজান্তে বাংলা সাহিত্যে তার ছায়াও খুঁজতে শুরু করেছে। প্যারিচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল প্রকাশের আগে থেকেই সমাজে সতীদাহ প্রথা রহিত, হিন্দু বিধবা আইন প্রবর্তন ইত্যাদি যুগান্তকারী বিষয় নিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত কিছুটা মিশ্র কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। তাই মধ্যবিত্ত প্রথম বাংলা উপন্যাসটিকে সমাদর করেনি, এবং উচ্চবিত্ত তাকে অশ্লীলতার দায়ে ফেলেছে। তবে রীতি বিচারে বা নানা সীমাবদ্ধতায় বলা যেতে পারে যে, আলালের ঘরের দুলাল নয়, বরং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দুর্গেশনন্দিনী বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস। পরবর্তীকালে বঙ্কিমের বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইলে কাহিনিগত মিল থাকলেও রবীন্দ্রনাথের চোখের বালির জীবনদর্শন ও শিল্পভঙ্গি আলাদা। বঙ্কিম তাঁর নারীচরিত্র রোহিণীর হাতে দ্বিধাহীনভাবে বিষের কৌটা তুলে দিতে পেরেছেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে দিয়েছেন। একজন সমাজসংস্কারকের দৃষ্টি দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র পাপকে চিহ্নিত করেছেন কিন্তু পাপের উৎস বা কার্যকারণকে সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে, বিষবৃক্ষ উপন্যাসে বউদি-ননদিনীর কথোপকথনে বিদ্যাসাগরকে নারীশিক্ষা আন্দোলনের জন্য কটাক্ষ করা হয়। তবে উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অশিক্ষা, অবরোধ, কুসংস্কাররের বেড়াজালে বন্দি নারীর বাল্যবিবাহ, অকাল বৈধব্যের যন্ত্রণা, বহুবিবাহ, সতীদাহ, কৌলীন্য প্রথার কাছে প্রেমের পরাজয়, নারীর সতীত্বের মাহাত্ম্য, নারীর জাগরণ ইত্যাদি উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে প্রাধান্য পেয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ধীরে ধীরে বাঙালি নারী নিত্যনতুন পরিচয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে যেসব কর্মকাণ্ড শুরু হয়, নারীর অংশগ্রহণ সেখানে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। নারী তখন পুরোদমে সংসারে আর সংসারের বাইরে কাজকে সমন্বিত করতে গিয়ে অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হিসেবে নানারকমের দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে প্রধানত এই দ্বন্দ্বের চিত্রায়ণ ঘটেছে সফলভাবে। লেখক সমাজ-সংস্কারের উদ্দেশ্যে কল্পকাহিনি লেখেন না, কিন্তু সমাজ-সংস্কারের ইঙ্গিত মহৎ সাহিত্যে সাবলীলভাবে এসে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরের মূল উপজীব্য হলো, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে একজন গৃহবধূ যেভাবে বাইরের মানুষের সঙ্গে এবং নতুন করে ঘরের সঙ্গে পরিচিত হলেন, তার সমস্যাগুলো। বাইরের কর্মক্ষেত্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে খলনায়ক হিসেবে দেখানোতে বিমলার যে বাস্তবতা এসেছিল, তা হলো, বিমলা না পারল বাইরে অর্থপূর্ণ কর্মে অবদান রাখতে, না পারল ঘরকে আলোকিত করতে। প্রকৃতপক্ষে তার মোহভঙ্গ ও আত্মোপলব্ধির মধ্যে দিয়ে কাহিনি এগিয়েছে। আবার, বলা যেতে পারে ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পের কথা। নারীর মুক্তি বা নারীর আত্মোপলব্ধির প্রতীক হতে পারে এই কাহিনি, যা এসেছে অনেকটা রূপকের ভঙ্গিতে। মৃণাল একদিন তার ‘মেজো বউ’য়ের খোলস ছিন্ন করে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। তার ভাবনা আসে, তোমার এমন ভুবনে আমার এমন জীবন নিয়ে কেন ঐ অতি তুচ্ছ ইটকাঠের আড়ালটার মধ্যেই আমাকে তিলে তিলে মরতেই হবে। কততুচ্ছ আমার এই প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, কত তুচ্ছ এর সব বাঁধা নিয়ম, বাঁধা অভ্যাস, বাঁধা বুলি, এর সমস্ত বাঁধা মার – কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই দীনতার নাগপাশ বন্ধনেরই হবে জিত? … আজ বাইরে এসে দেখি আমার গৌরব রাখবার জায়গা নেই।
রবীন্দ্রনাথ সব ধরনের রচনায় নারীকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন, রক্তকরবী বা চিত্রাঙ্গদায় চরিত্রগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নারীচেতনা ও মানবিকতার উত্তরণ, সর্বোপরি মুক্তি। স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানবিক শক্তির প্রতীক রক্তকরবীর নন্দিনী, কাজেকর্মে সমাজব্যবস্থার জড়তা ভাঙার অগ্রদূত। অন্যদিকে চিত্রাঙ্গদা চেয়েছিল অর্জুনের ‘দক্ষিণ বাহু’ হতে, যেখানে তার রূপের চেয়ে ব্যক্তিত্ব বড়। সমাজে বা পরিবারে নারীর স্থান নির্দিষ্ট করার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ সচেষ্ট ছিলেন। আবার অপর পক্ষের যুক্তিও তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন, যেমন, শেষের কবিতায় অমিতের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন, ‘পুরুষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু করবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ঙ্কর।’ মূলত আধিপত্যের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর অবস্থান। উপন্যাসে নারীচরিত্র লাবণ্য বিদুষী ও স্বয়ংসম্পূর্ণা। প্রেমের ক্ষেত্রে সে বিরহের মাধুর্য আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে বেশি মর্যাদা দিতে জানে। চোখের বালির বিনোদিনী হতে পারে চিরকাল মনে রাখার মতো মনস্তাত্ত্বিক আবরণে নির্মিত নারীচরিত্র। সে ওই সমাজে বিধবা হয়েও নিজের কামনাবাসনা ও মেধার স্বীকৃতি চেয়েছে। সমাজের বিধিনিষেধের বিপরীতে সে যেন এক ধূমকেতু। চারুলতায় কেন্দ্রীয় চরিত্রের নারী শিক্ষিত, রুচিশীল এবং একাকী। বঞ্চিত হৃদয়ে জাগরণের বার্তা নিয়ে সে বেঁচে থাকে। স্বামীর অবহেলা থেকে দেবর অমলের প্রতি আকর্ষণে তৎকালীন সমাজের তথাকথিত সতীত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজস্ব মানসিক চাহিদাকে সে সামনে আনে। তুলনামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে বলা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে পুরুষতন্দ্রের কাছে নারীকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথের নারীচরিত্রগুলো সেখানে আত্মপ্রত্যয়, আত্মগরিমায় উজ্জ্বল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা পুরুষকে অস্বীকার করে আত্মপ্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে, এমনকি পুরুষতান্ত্রিক সংসার ছেড়ে নিজের পথ নিজে খুঁজে নিতে বৃহত্তর পৃথিবীর পথে পা বাড়িয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সামাজিক সংকট এবং বিশেষ করে নারী-মানসকে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীলতার পরিচয় দেওয়ার কারণে দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তিনি অবস্থান করেছিলেন। নারী নির্যাতন, নারীর ত্যাগ আর প্রাপ্ত বঞ্চনার প্রামাণ্য দলিল শরতের একেকটি উপন্যাস। তিনি একদিকে নারীকে যেমন স্নেহময়ী মা, আত্মত্যাগী বোন হিসেবে দেখিয়েছেন, অন্যদিকে বিদুষী ও সমাজবিদ্রোহী রূপে তুলে ধরেছেন। একদিকে তারা সামাজিক দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে কখনো সমাজকে অবজ্ঞা করে নিজেদের ভালোবাসাকে বেছে নিয়েছে, অন্যদিকে আবার সামাজিক চাপে মেনে নিয়েছে সমাজের রায়। তবে শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো, তিনি সমাজের চোখে ঘৃণিত ‘পতিতা’ বা ‘নিষিদ্ধ’ নারীকে অত্যন্ত মানবিক ও সম্মানজনক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, একজন নারী যে পেশাতেই থাকুক তার মনের শুদ্ধতা বজায় রাখতে পারে। তাই তো শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মী ও দেবদাসের পার্বতী নিজেদের ছাপিয়ে এক অনন্য আধ্যাত্মিক উচ্চতায় চলে গেছে।
এবারে আসি এই অঞ্চলের নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের রচনায় নারীচরিত্রগুলো নিয়ে। আজকের দিনে এসে ১৯০২ সালের দিকে তাকালে রোকেয়ার পদ্মরাগ উপন্যাসের দিকে চোখ পড়ে, আর তখন বিস্মিত হতে হয়। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নির্যাতিত অসহায় নারীর চিত্র ফুটে উঠেছে উপন্যাসে। দেখা যায় তারিণী ভবনে আশ্রিতা বিভিন্ন ধর্মের ও শ্রেণির নারীর অবমাননার কাহিনি একই। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সিদ্দিকা স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়ে স্বামী তার ভুল বুঝতে পেরে তাকে সংসারে ফিরিয়ে নিতে এলে সে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। সংসারধর্মই যে জীবনের সারধর্ম নয়, একথা উপলব্ধি করে সে উচ্চারণ করে, আমি যদি উপেক্ষা লাঞ্ছনার কথা ভুলিয়া গিয়া সংসারের নিকট ধরা দেই তাহা হইলে ভবিষ্যতে এই আদর্শ দেখাইয়া দিদিমা ঠাকুমাগণ উদীয়মনা তেজস্বিনী রমণীদের বলিবেন, ‘আর রাখ তোমার পণ ও তেজ, ঐ দেখনা এতখানি বিড়ম্বনর পরে জয়নব আবার স্বামী সেবাই জীবনের সার করিয়াছিল।’ আর পুরুষ সমাজ সগর্বে বলিবেন, ‘নারী যতই উচ্চশিক্ষিতা, উন্নতমনা, তেজস্বিনী, মহীয়সী, গরিয়সী হউক না কেন ঘুরিয়া ফিরিয়া আবার আমাদের পদতলে পড়িবেই পড়িবে।’
পরবর্তী রচনা সুলতানার স্বপ্ন এক বিপ্লবের প্রতিভূ। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মাধ্যমে নারীর উত্থানের এক ইউটোপিয়া দেখানো হয়েছে সেখানে। সমাজ-নির্ধারিত লৈঙ্গিক দায়িত্ব অদলবদলের মাধ্যমে সমাজে নারীর অবদমনের চিত্র ফুটে উঠেছে। এ যেন প্রত্যেকটি নারীর পক্ষ থেকে সমাজের অবহেলা-অবদমনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব, যা যুগের পর যুগ ধরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে নারীর দুই রূপ পরিলক্ষিত হয়। একটি বাংলার প্রথাবদ্ধ আচরণকেন্দ্রিক, অন্যটি প্রথাবিরোধী। নারীকে স্বেচ্ছাচারী ধর্মান্ধ পুরুষ সমাজ নিজেদের প্রয়োজনে যেভাবে মাতা, কন্যা, ভগিনি ও স্ত্রী রূপে ব্যবহার করেছে – তার ফিরিস্তি পাওয়া যায় নজরুলের ‘নারী’, ‘বারাঙ্গনা’ প্রভৃতি কবিতায়। ‘নারী’ কবিতায় তিনি নারী-পুরুষের সমানাধিকারের কথা ঘোষণা করেছেন, প্রমাণ করেছেন নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক।
বিশে^র যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নারীচরিত্ররা রোমান্টিক কল্পনার ঊর্ধ্বে, বিশেষ করে পদ্মানদীর মাঝির কপিলা আর পুতুল নাচের ইতিকথার কুসুম লোকলজ্জার তোয়াক্কা করে না। তারা বাস্তবতার তাড়নায় বাঁচে। নারীর শরীরী চাহিদাকে মানিক নিছক জৈবিক হিসেবে না দেখে মানবিক সংকট হিসেবে দেখেছেন। কপিলার মধ্যে যে-সাহস তিনি দেখিয়েছেন তা বিরল। অন্যদিকে, কুসুমের ক্ষেত্রে অকপটে নিজেকে প্রকাশ করার ভঙ্গি নারীকে নতুন এক অবয়ব দেয়।
সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ নারীকে দেখেছেন দুর্দমনীয়, নিজস্ব ইচ্ছায় উজ্জীবিত হিসেবে। লালসালু উপন্যাসে মজিদ গ্রামসুদ্ধ মানুষকে বোকা বানাতে পারলেও স্বাধীনচেতা ছোট বউ আমিনাকে কিছুতেই বশে আনতে পারে না। তাই সেখানে মজিদের সব বুজরুকি আর সাজানো অহমিকা ব্যর্থ হয়। নারীর কাছে পুরুষের পরাজয় হিসেবে সাহিত্যে এ এক নতুন সংযোজন।
অন্যদিকে, সমরেশ মজুমদার নারীকে এঁকেছেন এক অনন্য সংগ্রামী স্বাতন্ত্র্য দিয়ে। সাতকাহনের দীপাবলী বালবিবাহসহ নানা নিগ্রহের শিকার হয়েও ধীরে ধীরে একদিন নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক হয়ে ওঠে। দুর্ভাগ্য, সামাজিক বাধা কোনোকিছুই যে নারীর উত্থানকে ঠেকাতে পারে না, তার অনন্য দলিল সাতকাহন তথা দীপাবলী চরিত্র, যা বাঙালি নারীপাঠকদের জীবনের পথে দীর্ঘকাল ধরে উজ্জীবিত করেছে। সমরেশের গর্ভধারিণীর জয়িতাও একইরকমের সাহসী, আত্মনির্ভরশীল ও আধুনিক। যদিও কালবেলা (উত্তরাধিকার-কালপুরুষ-কালবেলা) ট্রিলজির মাধবীলতা চরিত্রের মাঝে এক অনন্য মায়া আর সহমর্মিতা তিনি সৃষ্টি করেছেন, যা নিতান্তই সর্বকালের নারীসুলভ আচরণ। হ্যাঁ, নারী তো নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিতেই পারে, যদি সে সত্যিই তা চায়। তাই মাধবীলতার মতো সঙ্গীর জন্য জীবন উৎসর্গ করা নারীরও এই সমাজে অভাব নেই। সমাজ থেকেই এই চরিত্রের সৃষ্টি, আবার উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কারণে চরিত্রটি বাস্তব জীবনে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিলও বটে।
মৈত্রেয়ী দেবীর ন হন্যতের ‘রু’ সবরকমের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথা ভাঙার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল বাবার বাড়িতে ভিন্ন ধর্মের একজনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কেই সেই প্রথাভাঙা শেষ হয়নি, দীর্ঘ বিবাহিত জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বামীর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দূরদেশে পুরনো প্রেমিককে দেখতে যাওয়া সামাজিকভাবে অবান্তর আর ক্ষেত্রবিশেষে অশালীন বিষয় বটে। কিন্তু ‘রু’ চরিত্র ঠিক তাই করতে পেরে নারীকে ইচ্ছা-অনিচ্ছাসমেত একজন মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
দেশভাগ এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি। এই বিয়োগান্ত ঘটনায় কত নারীর জীবন বদলে গেছে কিংবা থেমেই গেছে, তার ইয়ত্তা নেই। দেশভাগ, দাঙ্গা আর বাস্তুচ্যুতির পরে নতুন নিবাস আর সংগ্রামে অতুলনীয় চরিত্র আবু ইসহাকের সূর্য দীঘল বাড়ির জয়গুন। হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখির সিতারা আর শাহীন আখতারের অসুখী দিনের সাবিনা বা অনিতা। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষপটে অস্তিত্বরক্ষার লড়াইয়ে নারী যে কী প্রবল শক্তি, তা এই চরিত্রগুলো বুঝিয়ে দেয়।
দেশভাগের মতোই মুক্তিযুদ্ধের ক্ষতও এই অঞ্চলের নারীর স্মৃতি থেকে কখনো যাবে না। রাবেয়া খাতুন, রাজিয়া রহমান, দিলারা হাশেম, রিজিয়া রহমান, মকবুলা মঞ্জুর, বা শাহীন আখতার মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে টিকে থাকা নারীদের পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়ে তারপর স্বাধীন দেশের মাটিতে নিগৃহীত হওয়ার বিড়ম্বনা ধরে রেখেছেন বিচিত্র নারীচরিত্রে। এই চরিত্রেরা জানায়, একদিকে দীর্ঘ নির্যাতন, আরেকদিকে নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব যেন আরেক মানসিক ও সামাজিক নির্যাতনের শুরু। একইভাবে ওয়াসি আহমেদের বরফকল উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শেফালি বেগম যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবের বিপরীতে সামাজিক লড়াই করে টিকে থাকার এক জ¦লন্ত উদাহরণ। এই বিড়ম্বনা নিয়েই তার গর্ভের যুদ্ধশিশুকে বড় করে তুলতে গিয়ে পদে পদে নিগ্রহের শিকার হন তিনি। বীরাঙ্গনা উপাধিই তার প্রধান দোষ হিসেবে গণ্য হয় এবং তাকে অনবরত পালিয়ে বেড়াতে হয়। অন্যদিকে, উপন্যাসে রেখা এমন এক চরিত্র যিনি নির্যাতিত মেয়েদের পুনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনা করেন। মায়া-মমতাই যেন তার সংগ্রামের অস্ত্র। ওয়াসি আহমেদের আরেক উপন্যাস তলকুঠুরির গান। নানকার আন্দোলনের পটভূমিতে গ্রামীণ পরিবেশে শোষণ, বঞ্চনা ও প্রতিরোধের কাহিনিতে ওয়াসি আহমেদ প্রথমেই রাতের অন্ধকারে মিছিলের অগ্রভাগে এক নারীচরিত্রের হাতে হারিকেন ধরিয়ে দেন। অন্ধকারের মধ্যে নারীরাই যেন আন্দোলনের পথ দেখান। সফল আন্দোলনের ইতিহাস-আশ্রয়ী উপন্যাসটির পরতে পরতে লেখা থাকে প্রান্তিক নারীর সংগ্রামগাথা।
আবারো মুক্তিযুদ্ধের কাহিনিতে নারীর সংগ্রামে ফিরে আসি, সেলিনা হোসেনের হাঙর নদী গ্রেনেড উপন্যাসে বুড়ি চরিত্রটি নিজের প্রতিবন্ধী সন্তানকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচানোর যে চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা মাতৃত্বের চিরাচরিত সংজ্ঞাকে ছাপিয়ে দেশপ্রেমের এক মহৎ প্রতিবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এভাবে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সামাজিক পরিবর্তনের ধারক ও বাহক হয়ে ওঠে নারী – সাহিত্যে সেটাই প্রমাণিত। আবার, মতিজানের মেয়েরা গ্রন্থে সেলিনা হোসেন গল্পে গল্পে নারীর জৈবিক ও মানবিক অধিকার সম্পর্কে নারীকে সচেতন করে তোলেন। মতিজানকে তিনি মোটেও দুর্বল নারী হিসেবে দেখেননি, বরং মানবিক অধিকার প্রত্যাশী, সমাজের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো এবং স্বাধিকারের চেতনায় উজ্জীবিত একজন মানুষ হিসেবে দেখিয়েছেন। অন্যদিকে, সেলিনা হোসেনের ‘লিপিকার বিয়ে এবং অতঃপর’ গল্পে লিপিকা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে দেখা গেছে যে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীকে কীভাবে পরনির্ভর করে রাখতে চায়, যাতে তার ব্যক্তিসত্তা বা আমিত্ব গঠনে বাধা পড়ে। সেখানে লিপিকা স্বাধীনচেতা, নারীর স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে আত্মপরিচয় তৈরি করতে চায়।
ওদিকে মহাশ্বেতা দেবীর বেশিরভাগ সংগ্রামী চরিত্রেরা আদিবাসী, দলিত বা মূলত প্রান্তিক নারী, যারা শ্রেণি ও জাতিগত শোষণের শিকার, আর অবশ্যই প্রতিবাদী। তাঁর কাহিনির দৌপদী চরিত্রের কথা নিশ্চয় অনেকের মনে থাকবে, যে পুলিশি হেফাজতে ধর্ষণ ও অমানুষিক নির্যাতনের পরেও নগ্নদেহে রাষ্ট্রপতির সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। আবার শহরের অভিজাত বাড়িতে নকশাল আন্দোলনে নিহত সন্তানের মা শিক্ষিত নারীর প্রতিকৃতিও তিনি তুলে ধরেছেন হাজার চুরাশির মা উপন্যাসে। আধুনিক, চৌকষ, দৃঢ়, একইসঙ্গে সন্তানের জন্য ভিতরে ভিতরে তীব্র আর্তনাদ তার। মহাশ্বেতার অনেক চরিত্রের মতো প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামে নারীর ভূমিকা দেখতে পাই পাপড়ি রহমানের বয়ন উপন্যাসে। উপন্যাসটি বাংলাদেশের একটি বিশেষ গোষ্ঠী, তাঁতশিল্পী, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের জামদানি শিল্পীদের জীবনভিত্তিক সাহিত্যকর্ম। কাহিনিতে নারীরা তাঁতশিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মনোদৈহিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে। মোহিতন, পয়রন বিবি শিল্পে পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করে। হাল আমলে আধুনিক প্রযুক্তির আগ্রাসনে তাঁতশিল্পের ভেঙে পড়ার টানাপড়েনের ভেতর দিয়ে যায় তারা। প্রান্তিক মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করে টিকে থাকে নারীচরিত্রগুলো।
অন্যদিকে, আশাপূর্ণা দেবীর চরিত্রেরা সামাজিক; চার দেয়ালের ঘেরাটোপে পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই নিজের অস্তিত্বের দাবি জানায়। তবুও প্রথম প্রতিশ্রুতির সত্যাবতী যখন প্রথাগত শিক্ষার অভাব সত্ত্বেও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়, সুবর্ণলতায় মা-মেয়ে-নাতনির ট্রিলজিতে সুবর্ণলতা ও বকুল যখন নারীর আত্মসচেতনতা ও পুরুষের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, তখন সেই চরিত্রগুলো নারীর চিরকালীন প্রেরণা হয়ে ওঠে। বাল্যবিবাহ আর একান্নবর্তী পরিবারের কঠোর বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যায় এই নারীচরিত্ররা। তৎকালীন সময়ে পাঠকের মাঝে তাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
পাখির মতো ডানা নেই বলে কি আমাদের ওড়া হবে না? মানুষের ওড়া তো তার স্বপ্নে, তার স্বাধীনতায়।
নাসরীন জাহানের উড়ুক্কু উপন্যাসে নারীচরিত্র নীনা সামাজিক আর পারিবারিক বন্ধনের ভেতরে থেকে আর্থিক অভাব ও সব ধরনের অবদমনের মধ্যে দিয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। উড়তে শেখে স্বাধীনতার আকাশে। সম্পর্কের বিশ^াসঘাতকতা থেকে নারীর উত্তরণ নীনা চরিত্রের মধ্যে দিয়ে হঠাৎ এমনভাবে ফুটে ওঠে, যা তৎক্ষণাৎ বাংলা ভাষাভাষী বহু পাঠকের নজরে আসে।
অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী উপন্যাস তথা ব্যতিক্রমী চরিত্র রাতভরে বৃষ্টির মালতি। বুদ্ধদেব বসুর এই উপন্যাসটি একদিকে যেমন কালজয়ী, আরেকদিকে নারী স্বাধীনতার চরম প্রকাশ হিসেবে বিতর্কিতও বটে। কলকাতার মধ্যবিত্ত দাম্পত্য জীবনের জটিলতা, যৌনতা, বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান এই উপন্যাস। তখনকার সময়ে অশ্লীলতার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও পরে উচ্চ আদালত তা খারিজ করে দেয়। উপন্যাসের নারীচরিত্র মালতী, আর বিষয়বস্তু মালতীর দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি ও স্বামীর বন্ধুর প্রতি তার শারীরিক ও মানসিক আকর্ষণ। ঘটনার প্রবাহ ও চরিত্রের উত্থান প্রথাগত নৈতিকতা, বিশেষ করে যৌন-নৈতিকতার উপরে তীব্র আঘাত বটে। উপন্যাসে বিষয়টিকে যতই কাব্যিকভাবে উপস্থাপন করা হোক না কেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের যে বহুগামী হওয়ার অধিকার আছে বলে ধরে নেওয়া হয়, তা একজন নারী ভোগ করছে, বিষয়টি মেনে নিতে সমাজ তখনো তৈরি ছিল না, আজো তেমন তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে বহুগামিতাকে উৎসাহিত করার জন্য এই চরিত্র সৃষ্টি হয়নি, হয়েছে মানুষ হিসেবে চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দাবি নিয়ে।
ওদিকে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খল ভেঙে আসা আত্মসচেতন, সাহসী ও স্বাবলম্বী নারীচরিত্র এঁকেছেন তসলিমা নাসরীন। চরিত্ররা এই সময়ের অনেক নারীর মতো সামাজিক গোঁড়ামি, বৈষম্য ও ধর্মীয় নিগড়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। চরিত্রগুলো পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে যায় এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রথাগত সাহিত্যের বাইরে চরিত্রের আবেগ, যৌনতা ও শারীরিক চাহিদা সরাসরি উপস্থাপিত হয়। চরিত্রগুলো কেবল ভুক্তভোগী নয় মোটেই, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম এক নতুন বিপ্লবী নারীর প্রতিকৃতি হয়ে ওঠে। মানসিক ও শারীরিক দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে উঠে, সাহসী ও স্পষ্টভাষী একবিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ নারীর মতো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বেড়াজাল ডিঙিয়ে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করে। শোধ উপন্যাসে ঝুমুর দাম্পত্যজীবনে স্বামীর সন্দেহ ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে ভুগতে ভুগতে এক পর্যায়ে প্রতিশোধ নেয়। লজ্জা উপন্যাসে মায়ার জীবনসংগ্রামের মধ্যে দিয়ে উগ্রবাদ ও দাঙ্গার শিকার হওয়া নারীর অসহায়ত্ব উঠে আসে। সমাজ নারীকে যে চেহারায় দেখতে চায় তার ব্যতিক্রম ঘটলেই সমাজ চমকে ওঠে, যেমন – নারীর মাতৃরূপের অসম্মান বা অবহেলা। মা হওয়ার পরে যদি নারী তার নিজের জীবনের আনন্দ-খুশি-ব্যস্ততার চর্চা করে তবে সমাজের চোখে তা শিশুর প্রতি অবহেলা। তিলোত্তমা মজুমদারের নারীকেন্দ্রিক উপন্যাসের নারীচরিত্রগুলো সমাজের তৈরি চিরচেনা নারীর চেহারায় চির ধরায়, তাই কখনো তা হয়ে ওঠে অস্বস্তিকর। বসুধারা উপন্যাসে নারীচরিত্র বলে, ‘মা হওয়া মানেই কি নিজের সব স্বপ্ন বিসর্জন দেয়া? আমি আমার সন্তানকে ভালোবাসি, কিন্তু তার জন্য নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই না।’
আবহমানকাল ধরে আমাদের সমাজে পুরুষের প্রাধান্য চলে আসছে, নারী তাই সাহিত্যেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। পুরুষ যেহেতু সমাজে নারীর জীবন নিয়ন্ত্রণ করেছে, তাই নিজস্ব সত্তা হিসেবে গড়ে না উঠে নারী পুরুষতন্ত্রের অধীনে জীবন নির্বাহ করেছে। নারী-পুরুষের সহজ-সাবলীল সম্পর্ক কি বাংলা সাহিত্যে অসম্ভব? সাহিত্যের গতিপথ একদিন হয়তো বলে দেবে তাদের মধ্যে বিরোধাত্মক বিষয়টির কোনো ফয়সালা হবে কি না, বলবে সমাজও। তবে আধুনিক যুগে পৌঁছতে পৌঁছতে পুরুষতন্ত্র সমাজে তথা সাহিত্যে প্রাধান্য হারাচ্ছে। তবে এতকিছুর পরেও নারী কিন্তু এখনো পুুরুষের সমানাধিকার পায়নি। না সমাজে, না সাহিত্যে। লৈঙ্গিক সম্পর্ক বা নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ লেখক রক্ষণশীল, প্রায় শতভাগ স্থানে তারা সমাজ-অনুমোদিত সম্পর্কের বাইরে নারী-পুরুষের অন্য কোনো বৈপ্লবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উৎসাহী নন। একের পর এক নারীমুক্তির ঢেউ আসার পর থেকে এর পক্ষে বহু লেখক লিখে গেছেন; কিন্তু রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের লেখায় যেভাবে ‘জেন্ডার রোল’ প্রতিস্থাপিত হয়েছে, তা অন্য কোথাও দেখা যায়নি। রোকেয়ার পরে দীর্ঘদিন কোনো নারী লেখকও পাওয়া যায়নি – এটিও চিন্তার উদ্রেক করে।
আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে নারী সংসারে শিশুর দেখাশোনা করে, আয় করে, নিজের মতো করে মত প্রকাশ করে। আজকের নারীচরিত্ররাও তাই একালের মতো, একইসঙ্গে বহুদিকে তার নজর রাখতে হয়। তাদের সমস্যাও বিচিত্র : সামাজিক, দাপ্তরিক বা পারিবারিক চাপ তো আছেই, প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে সাইবার বুলিং। এখনকার সাহিত্যে এই নারীর ছবি আঁকছেন এখনকার সাহিত্যিকরা। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ছবি হয়তো আরো বদলাবে। শিক্ষা আর প্রকাশের প্রতিবন্ধকতায় সেকালে নারীর গল্পটাও পুরুষকে বলতে হতো। এখন নারীই নারীর গল্পটা বলে। তবে এ হয়তো চিন্তার উদ্রেক করতেই পারে যে, কবে কখন পুরুষেরা নারীচরিত্র-প্রধান কাহিনি লেখা কমিয়ে দিলেন। নারীরা আগের চেয়ে বেশি বলছে বলে? সে যাই হোক, একালে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ^জুড়ে নারীকে নিয়ে সাহিত্য রচনার জয়জয়কার। যাঁরা প্রতিনিয়ত নারীর সমসাময়িক সংগ্রাম সাহিত্যে তুলে আনবেন তাঁরা সমাজে নারীকে অবলোকন করেই তা করবেন। তাই নারীচরিত্র বরাবর তৎকালীন সমাজের নারীর কথাই বলবে।
গ্রন্থপঞ্জি
১. আহমদ শরীফ, বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য, দ্বিতীয় খণ্ড, ঢাকা।
২. ফারজানা সিদ্দিকা, নারীর উপন্যাসে ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ দেশভাগ ও মুক্তিযুদ্ধ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০২৩
৩. সেলিনা হোসেন, বিশ্বজিৎ ঘোষ, মাসুদুজ্জামান, সাহিত্যে নারীর জীবন ও পরিসর, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৭।
৪. অদিতি ফাল্গুনী, বাংলার নারীসংগ্রামের ইতিহাস, অন্বেষা প্রকাশন, ঢাকা, ২০১০।
৫. দেবেশ রায়, উপন্যাস নিয়ে, দে’জ পাবলিকেশিং, কলকাতা, ১৯৯১।
৬. মোরশেদ শফিউল হাসান, পূর্ব বাংলায় চিন্তাচর্চা ১৯৪৭-১৯৭০ : দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০৭
৭. হাসান আজিজুল হক, কথাসাহিত্যের কথকতা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ১৯৮১।
৮. বাঙালি নারী সাহিত্যে ও সমাজে, আনিসুজ্জামান, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০২৩ (প্রথম প্রকাশ ২০০০)।
৯. আহমদ সিরাজ, সাহিত্যের অন্তর্লোক যাত্রা, হোসনে আরা চৌধুরী, মৌলভীবাজার, ২০২৬।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.