ব্রিটিশবিরোধী লেখার জন্য বাংলাভাষার দণ্ডিত কবি-সাহিত্যিক 

ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল একটি পরিব্যাপ্ত, একত্রীভূত বিভিন্ন জাতীয় এবং আঞ্চলিক আন্দোলন-সংগ্রাম এই অন্দোলন অহিংস ও বৈপ্লবিক উভয় দর্শনের প্রচেষ্টায় এবং জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছিল। উনিশ শতকের প্রথম দিকে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা সংগ্রামে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো ভারতীয় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে কবি-সাহিত্যিকরাও শামিল ছিলেন সমানভাবে। প্রাপ্ত তথ্যে ব্রিটিশবিরোধী লেখার জন্য স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাভাষার ছয়জন কবি-সাহিত্যিকের দণ্ডভোগের কথা জানা যায়। তাঁদের লেখাগুলি সাহিত্যগুণে কতটা উত্তীর্ণ সে-বিতর্কে না গিয়ে বলা যায় স্বাধীনতার সরণিতে সময়ের দাবিপূরণে এগুলো ছিল একেকটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। চাষিদের ওপর নীলকরওয়ালাদের অত্যাচার-নির্যাতনের বীভৎস রূপ চিত্রায়িত হয়েছে বাংলার মরমী কথাশিল্পী দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ নাটকে। ১৮৬০ সালে এই নাটক ঢাকা থেকে প্রকাশিত হওয়ার পর সম্ভবত মাইকেল মধুসূদন দত্ত কর্তৃক এর ইংরেজি অনুবাদ  ছেপে এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও হাজার টাকা জরিমানার দণ্ডে দণ্ডিত হন আইরিশ মিশনারি ফাদার জেমস লঙ। ইংরেজি অনুবাদে লেখক, প্রকাশক বা অনুবাদক কারও নাম ছিল না। সূত্র : সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান ও ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই – শিশির কর, দ্বাদশ (ক) অধ্যায়। 

পরবর্তী ৯০ বছরে, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত শরৎচন্দ্র চট্টোপ্যাধায়ের পথের দাবিসহ ব্রিটিশশাসনের  রোষানালে পড়ে বাজেয়াপ্ত হয়েছে বাংলাভাষার অসংখ্য গ্রন্থ পত্র-পত্রিকা এবং ইস্তাহার। ইংরেজদের চোখে আপত্তিকর লেখার জন্য দণ্ডিত হয়েছেন অনেক লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রক। বন্ধ হয়ে গেছে অনেক প্রেস ও প্রকাশনা। কিন্তু কোনো কবি ব্রিটিশবিরোধী কবিতা লিখে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে জেল খেটেছেন, বাঙালির কাছে এই প্রশ্নের উত্তর একটাই – বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম

(১৮৯৮-১৯৭৬)! অধিকাংশ নজরুল জীবনীকার ও গবেষকের লেখায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এযাবৎকালের প্রাপ্ত তথ্যসূত্রে দেখা যায় উনিশ শতকের প্রথম দশকে অন্তত তিনজন কবি ও একজন সাহিত্যিক ব্রিটিশবিরোধী লেখার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দণ্ডিত হয়ে সাজা খেটেছেন। তখন নজরুলের বয়স ছিল নয় কি দশ। ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে আফজালুুল হক কর্তৃক মুদ্রিত ও প্রকাশিত এবং কাজী নজরুল ইসলাম কর্তৃক-সম্পাদিত ধূমকেতু পত্রিকায় নজরুলের ব্রিটিশবিরোধী কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ ছাপা হয়। ফৌজদারি মামলায় কবি রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। ১৯২৩ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। আনন্দময়ীর আগমনে কবিতাটির সংক্ষিপ্ত রূপ নিম্নে প্রদত্ত –

‘আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?

স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।

দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,

ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?

মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি

খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।

ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,

মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা।

তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে

রক্ত-তৃষার ‘ময়-ভুখা-হু’র কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে। –

অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,

আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা।

দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা

দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।…

‘ময় ভুখা হুঁ মায়ি’ বলে আয় এবার আনন্দময়ী

কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ি!’

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে, মাত্র ২১ বছর বয়সে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখে কবি একাই হয়ে ওঠেন একশ।

‘স্বরাজ-টরাজ বুঝি না’ – দ্বিতীয়বার ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উচ্চারিত হয় নজরুলের লেখনীতে। এই দাবি প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল উর্দুকবি হজরত মোহানির কণ্ঠে ১৯২১  সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের আহমেদাবাদ অধিবেশনে।    

খুলনার সেনহাটি জাতীয় বিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক হীরালাল সেনগুপ্ত (অনুমান ১৮৮১-১৯১২) ২৪ পৃষ্ঠা সংবলিত হুঙ্কার নামে একখানি দেশপ্রেমের গীত-সংকলন রচনা করেন। বইয়ের প্রথমে বঙ্কিম চন্দ্রের ‘বন্দেমাতারম’ ও শেষে রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল’ লেখা দুইটি জুড়ে দেন। অজ্ঞাতপরিচয় হীরালাল পুস্তিকাখানি উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে। এই বইয়ের এক কপি গ্রন্থাকার রবীন্দ্রনাথকে পাঠালে রবীন্দ্রনাথ তা পাঠ করে স্বভাবগতভাবে প্রাপ্তিস্বীকারসহ হীরালালকে একখানা চিঠি লেখেন। ফৌজদারি মামলা শুরু হলে হীরালাল নিজ গ্রাম সেনহাটি থেকে গ্রেপ্তার হন এবং পুলিশি তল্লাশিতে তাঁর বাড়ি থেকে রবীন্দ্রনাথের পত্রখানি পুলিশ উদ্ধার করে। এভাবেই ঘটনাচক্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই স্বদেশী মামলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ছোটলাট অ্যান্ড্রু ফ্রেজারের মতলব ছিল রবীন্দ্রনাথকে আসামি করা। প্রসিকিউটরদের পরামর্শে  শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথকে এই মামলার সাক্ষী করা হলে তিনি ৪ ডিসেম্বর, ১৯০৮ তারিখ খুলনার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য হন। ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট জনস্টোন একই মাসের ৮ তারিখ মঙ্গলবার হীরালালকে রাজদ্রাহে দোষী সাব্যস্ত করে ১৮ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। রবীন্দ্রনাথের সাক্ষ্যে ভারত সরকার মোটেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি। খুলনা কোর্টের জনৈক বৃদ্ধ উকিলের কাছ থেকে শোনা বিবরণী মতে লেখা কালীপদ রায়ের ‘খুলনার ফৌজদারি আদালতে একটি স্বদেশী মামলায় ভারত সরকারের পক্ষে সাক্ষী রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধ থেকে জানা যায় তিনি নাকি তাঁর প্রদত্ত সাক্ষ্যে বলেছিলেন – ‘স্বাধীনতাকাক্সক্ষী তরুণের পক্ষে উত্তেজক কবিতা বা গান লেখা আদৌ অস্বাভাবিক নয়। ওকালতি তাঁর পেশা নয়, সুতরাং কবিতা বা গান কী পরিমাণ উত্তেজক হলে সেটা আইনত দণ্ডনীয় হবে সেটা তাঁর জানা নেই।’ সরকারের উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের মুখ থেকে বলিয়ে নেওয়া যে হুঙ্কার-এ প্রকাশিত লেখাগুলো খুবই উত্তেজক এবং রাজদ্রোহকর। কারামুক্তির পর রবীন্দ্রনাথ তঁঁকে শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রমে নিয়োগ দিলেও গোয়েন্দাদের তাড়ায় ১৯১২ সালের গোঁড়ায় দিকে তাঁকে জমিদারির কাজে সরিয়ে দেওয়া হয়; শান্তিনিকেতন ছাড়ার পর হীরালালের আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। সূত্র : রবিজীবনী, প্রশান্ত কুমার পাল – ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৪সহ লেখক নির্দেশিত অন্যান্য পৃষ্ঠা, রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ : চিন্মোহন স্নেহানবীশ ও এই প্রসঙ্গকথার লেখকের ব্যক্তিগত অনুসন্ধান।  

বিধুভূষণ বসু (১৮৭৪-১৯৭২) তৎকালীন খুলনা জেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের সন্তান। তিনি ছিলেন বাগেরহাট থেকে প্রকাশিত পল্লী চিত্র পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক। তিনি সংবাদপত্র জগতের অন্যতম পথিকৃৎ। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি জমিদার ও ইংরেজদের দ্বারা বারবার নির্যাতনের শিকার হন। গ্রেপ্তার হন একাধিকবার। স্বদেশী যুগে বিধুভূষণ বসুর অগ্নিবর্ষী লেখনী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উৎসাহ ও প্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর সততা ও স্পষ্টবাদিতা কিংবদন্তি হয়ে আছে। সংগ্রামী এই লেখক অসংখ্য গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক রচনা করেছেন। হিন্দি ও গুজরাটি ভাষায় তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি অবিরাম লিখে গেছেন। ১৯০৯ সালে পল্লী চিত্র পত্রিকায় ‘শিকার’ নামে ব্রিটিশদের প্রতি ব্যঙ্গোক্তিমূলক তাঁর একটি গল্প প্রকাশিত হলে তিনি ব্রিটিশশাসনের রোষাগ্নির শিকার হয়ে পড়েন এবং তাঁর ওপর নেমে আসে ব্রিটিশ সরকারের খড়গহস্ত। তিনি ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং বিচারে তাঁকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অমৃতে গরল, লক্ষ্মীমেয়ে, লক্ষ্মীমা, লক্ষ্মীবউ তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস এবং তাঁর বিখ্যাত নাটক রক্তক্ষয়, মীরকাশিম ও দাদা। দাদা নাটকে চারণকবি মুকুন্দদাস অভিনয় করেন। সূত্র : সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান।

বিধুভূষণ বসু ‘শিকার’ গল্পের যে অংশটুকুর জন্য ব্রিটিশদের রোষানলে পড়ে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে দণ্ডিত হন, তা নিম্নরূপ – ‘ভূদেব উত্তর করিল – ‘তাই করিব গৌরী। তোমার মনস্টষ্টি, তোমার ভালবাসা লাভের জন্য আমি তাই করিব। তুমিও সঙ্গে যাইবে।’ শুনিয়া গৌরী বড়ই সুখী হইলেন। পত্মীকে সঙ্গে করিয়া ভূদেব কাশী যাত্রা করিলেন। দুইদিন নৌকাযোগে কলিকাতা যাইয়া গাড়ী ধরিতে হইবে। পথিমধ্যে এক স্থানে নৌকা বাঁধিয়া অপরাহ্নে ভূদেব গৌরীকে সঙ্গে লইয়া একটি নির্জন নদীতীরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। সহসা পাশর্^বর্তী বনান্তরালে একটি বন্দুকের আওয়াজ শুনিতে পাইলেন। মুহূর্তের মধ্যে শোনা গেল, কোন শিশু চিৎকার  করিয়া উঠিল – ‘মাগো যাইগো।’ পতি-পত্নী সেই দিকে ছুটিলেন। ব্যস্ততাবশত, ভুদেব গৌরীকে রাখিয়া যাইতে ভুলিয়া গেলেন। একটু পরে আবার রোদন ধ্বনি শোনা গেল। ‘হায়। হায়। কে আমার সর্বনাশ করলে গো।’  ব্যস্তভাবে যাইয়া ভূদেব দেখিতে পাইলেন, মৃত পুত্রকে জড়াইয়া ধরিয়া এক অভাগিনী চিৎকার করিয়া কাঁদিতেছে। পাশে এক বন্দুকধারী সাহেব হাতে একটি ১০০ টাকার নোট লইয়া বলিতেছে – ‘বুড়ি। এই নাও তোমার পুত্রের মূল্য।’ ভূদেব ও গৌরীকে দেখিবা মাত্র এ-সাহেব দ্রুতবেগে সে-স্থান ত্যাগ করিল। ভূদেব অবশেষে সকল তত্ত্ব জানিতে পারিলেন। এই অভাগিনী শিশুপুত্রকে লইয়া মাঠে ছাগল চরাইতে আসিয়াছিল। সাহেবের বন্দুকের গুলি লাগিয়া শিশুটির মৃত্যু ঘটিয়াছিল। সাহেব টাকা দেখাইয়া জননীর শোক ভুলাইবার চেষ্টা করিতেছে।’ 

‘দেখিয়া শুনিয়া গৌরী মুর্চ্ছিতা গেলেন। ভূদেব মহাবিপদে পড়িলেন। একদিকে শোকতুরা জননী, অপরদিকে মুর্চ্ছিতা প্রিয়তমা গৌরী। ভূদেব কোন দিক রক্ষা করিবেন। মুক্ত বাতাসের উপর গৌরীর শুশ্রƒষার ভার দিয়া ভূদেব অনাথিনী পুত্রহারা জননীর সেবায় নিযুক্ত হইলেন। অনেকক্ষণ পরে গৌরীর যখন চৈতন্য লাভ ঘটিল তখন বলিলেন ‘একি কাণ্ড।’ উত্তেজিত কণ্ঠে ভুদেব বলিলেন – ‘এ আর কি অভিনব কাণ্ড! এইরূপ অহরহ ঘটিতেছে। বিদেশিদের হাতে দেশীয় হতভাগ্য দরিদ্রদের প্রাণ শৃগাল-কুকুরের ন্যায় এমনিভাবে হত হইতেছে। সাহেবদিগের নির্মম স্বেচ্ছাচারিতায় এমনভাবে শত শত অভাগিনী পুত্রহীনা হইতেছেন। এ আর নূতন কি? আমি একটি পায়রা বধ করিয়া প্রায়শ্চিত করিতে যাইতেছি, এরা শত শত নরহত্যা করিতেও পাপ মনে করে না।’ উত্তেজিত কণ্ঠে গৌরী বলিলেন – ‘এর কি কোনো প্রতিকার নাই?’ ভুদেব বলিল – ‘আমাদের কি প্রতিকার করিবার শক্তি আছে?’ এ কথা শুনিয়া পুত্র-শোকতুরা জননী রোদনের সুর শক্তি রূপান্তরিত করিয়া কহিলেন – ‘কি বল্লে তুমি? তোমার হাতে বন্দুক দেখিতেছি। গায়েও বল আছে বলিয়া বোধ হয়। এই দেখ তোমার ভাইয়ের বুকে গুলি মারিয়াছে। তুমি তার প্রতিকার করিতে পারিবে না?’     

‘সেই বাক্যের প্রতিধ্বনি করিয়া গৌরী বলিলেন – ‘যথার্থ কথা। বন্দুক ধরিয়া নিরিহ পায়রা বধ করিতে পার। আর

ভ্রাতৃঘাতি অত্যাচারির প্রতিশোধ লইতে পারিবে না? তবে ওসব কেন? চল দেশে ফিরিয়া যাই। কাশীতে গিয়া স্বর্ণদান করিয়া প্রাশ্চিত্তের আবশ্যক নাই। আমার মনের গ্লানি গিয়াছে। এর চাইতে উৎকৃষ্টতর প্রায়শ্চিত কি হইবে। এইসব রাক্ষসের অত্যাচার হইতে মাতা-ভগিনীদের জীবন রক্ষা করিবার চেষ্টা করিতে হইবে।’ ভূদেব কিছুক্ষণ নীরব রহিলেন। তার পর মৃদু সুরে কহিলেন – ‘তাই ঠিক। আমি আজ এই পুত্র শোকাতুরা জননীর সম্মুখে আর প্রিয়তমা পত্নীর পার্শ্বে দাঁড়াইয়া প্রতিজ্ঞা করিলাম। আমি আমার সর্বস্ব দেশের এই অত্যাচার নিবারণের জন্য উৎসর্গ করিলাম।’    

‘ছিল ধান গোলাভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা’ – বরিশালের ভবরঞ্জন মজুমদার-সম্পাদিত ‘মাতৃপূজা’

গীত-সংকলনে এই ছিল চারণকবি মুকুন্দদাস (১৮৭৮-১৯৩৪) এর ইংরেজদের প্রতি শ্লেষাত্মক ও দেশাত্মবোধক গানের প্রথম লাইন। স্বদেশমন্ত্রে দীক্ষিত কবি গানে ও যাত্রায় সারা বরিশাল মাতিয়ে তোলেন। গ্রামে গ্রামে দেশাত্মবোধক গান ও স্বদেশী যাত্রাভিনয়ের জন্য তিনি ইংরেজ সরকারের কোপদৃষ্টিতে পড়েন। ‘ছিল ধান গোলাভরা’ – গানের জন্য মুকুন্দ দাস ১৯০৮ সালের নভেম্বর মাসে দ্বিতীয় বারের মতো গ্রেপ্তার হন। পরের বছর তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে রাজদ্রোহের অভিযোগে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ‘ছিল ধান গোলাভরা’ গানটি নিচে দেওয়া হলো –   

‘ছিল ধান-গোলা ভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা,

তোর পর পরণে নাই রে কাপড়, দেখতে নারা!

ছিল ধান-গোলা ভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা,

কপালগুণে সব হারালে, পর-প্রতারণে ভুলে,

তোর সোনার ভুবন ছারখার হলো, তুই রইলি চেয়ে বসে!

তোর ছিল অন্ন, ছিল বস্ত্র, ছিল কত সুখ-শান্তি,

আজ পরের দ্বারে কেঁদে মরিস, মেটে না তো ক্লান্তি!

ওরে, মা ছিল তোর জগৎ-পূজ্যা, তুই যে রে তার পুত,

আজ পেটের জ্বালায় ঘুরিস ঘুরে হয়ে পরের ভূত!

শ্বেত ইঁদুরে কাটল দড়ি, ভাঙল ঘরের খুঁটি,

তোর নিজের হাতে নিজের কপাল ভাঙলি কুটি কুটি!

জেগে ওঠ রে বাছা এবার, চাইিস নে আর পাছে,

যা গেছে তা যাক না মুছে, এখনও যা আছে –

নিজের হাতে ধর রে লাঙল, নিজের সুতো কাট,

তবেই আবার সোনার বাংলায় বসবে সুখের হাট!

ছিল ধান-গোলা ভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা…’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক ‘সন্তান’ আখ্যায় এবং পরবর্তী সময়ে কাজী নজরুল ইসলাম কর্তৃক ‘চারণ-সম্রাট মুকুন্দ’ এই উপাধিতে ভূষিত হন। মুকুন্দদাসের উল্লেখযোগ্য রচনা সাধন সংগীত, পল্লীসেবা, ব্রহ্মচারিণী, পথ, সমাজ, কর্মক্ষেত্র প্রভৃতি। সূত্র : বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান ও ব্রিটিশ শাসনে বাজেয়াপ্ত বাংলা বই – শিশির কর। 

সৈয়দ আবু মহম্মদ ইসমাইল হোসেন সিরাজী

(১৮৮০-১৯৩১) সাধারণ পাঠকের কাছে যিনি শুধু ইসমাইল হোসেন সিরাজী নামে পরিচিত। একাধারে কবি তিনি কবি, রাজনীতিক, সমাজ-সংস্কারক, ধর্মনেতা ও চিকিৎসক। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের এই শীর্ষস্থানীয় নেতা বঙ্গ-ভঙ্গবিরোধী আন্দোলন (১৯০৫-১৯১১) এ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা না উর্দু এই বিতর্কে তিনি বাংলাভাষার পক্ষে দৃঢ় অবস্থানগ্রহণ করেন। খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনেরও তিনি ছিলেন অন্যতম সৈনিক। অনলবর্ষী সাহিত্য সৃষ্টি ও জ্বালাময়ী বক্তৃতার কারণে তিনি বেশ কয়েকবার কারারুদ্ধ হন। স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত স্বদেশের স্বাধীনতার পটভূমিতে লেখা তাঁর ‘অনলপ্রবাহ’ কাব্যগ্রন্থটির ১৯১০ সালে দ্বিতীয় সংস্করণ বের হলে ইংরেজ সরকার তা বাজেয়াপ্ত করে এবং তিনি  ব্রিটিশদের প্রহসনের বিচারে রাজদ্রোহের অভিযোগে দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। তাঁর এই কাব্যটি প্রকাশের দায়ে একই সালের সেপ্টেম্বর মাসের আট তারিখ ‘নব্যভারত’ প্রেসের মালিক দেবীপ্রসন্ন রায়চৌধুরীকেও জরিমানা অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য অন্যান্য কাব্য : উচ্ছ্বাস, উদ্বোধন, নব উদ্দীপনা, স্পেন-বিজয় কাব্য, সঙ্গীত সঞ্জীবনী, প্রমাঞ্জলি। উপন্যাস : তারাবাঈ, রায়নন্দিনী, নূরউদ্দীন, ফিরোজাবেগম এবং তার প্রবন্ধগ্রন্থ : সুচিন্তা, স্বজাতিপ্রেম, আদব-কায়দা শিক্ষা, স্পেনীয় মুসলমান সভ্যতা, মহানগরী কার্ডোভা, তুর্কী নারী-জীবন ও তুরস্ক ভ্রমণ।   রংপুর জেলার ডোমার থানাধীন সোনারাই সাকিনের মহম্মদ আশানুল হক আফেনদির বর্তমান সংকট ও মুসলমানদের কর্তব্য গ্রন্থটি ১৯৩৯ সালে ইংরেজ সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং তাঁকে কারারুদ্ধ করে। ইংরেজদের গঠিত রংপুর সদর মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট রায় সুরেন্দ্রনাথ রায়ের আদালত বিচারের নাটক শেষে ৩১ মে ১৯৪০ সালে তাঁকে দেড় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইংরেজরাই ভারতবর্ষের মুসলিম সম্প্রদায়ের হাত থেকে ইসলামের ঝাণ্ডা ছিনিয়ে নিয়েছে এবং ইংরেজরাই মুসলিম সম্প্রদায়ের সমূহ ক্ষতিসাধন করেছে; যা ভারতীয় দণ্ড বিধি আইনের ১২৪ক/১৫৩ক ধারার অভিযোগ এবং যা রাষ্ট্রদ্রোহ ও বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির শামিল। লক্ষ্যণীয় বিষয়, রাজদ্রোহ বা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দণ্ডিত ছয় জনের মধ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে বাদ দিলে বাকি পাঁচজনই পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা।