মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর কাল

মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী/ আত্মজীবন

শামসুজ্জামান খান

সম্পাদিত

পাঠক সমাবেশ

ঢাকা, ২০০৪

১৯০ টাকা

বাঙালি মুসলমানের

চিন্তাধারা-বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ এক পর্বে প্রবল সক্রিয়তায় বেঁচে ছিলেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান – মৌলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী (১৮৭৫-১৯৫০)। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে একদিকে ‘মুসলিম সংস্কৃতি’-পরিচয়ে আরবি-ফারসি ভাষা ও সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি, অন্যদিকে হিন্দু পুনর্জাগরণবাদীদের প্রবল স্রোত – এ দুয়ের টানাহেঁচড়ার বিচিত্র চিহ্ন নিয়ে যে-কজন বাঙালি মুসলমান ঔপনিবেশিক আবহের জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে শামিল হতে পেরেছিলেন এছলামাবাদী তাঁদের একজন। তাঁর বেড়ে-ওঠা মনোজগতে আমরা পাঠ করে নিতে পারি ওই কালের নানা আলোড়ন-বিলোড়নের চরিত্র। উনিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকে পশ্চিমা জ্ঞানজগতের সংস্পর্শে শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুসমাজে সাহিত্য, শিক্ষা, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্বসহ সর্বক্ষেত্রে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্মেষের তুলনায় পিছিয়ে থাকা বাঙালি মুসলিম সমাজের আরো অনেকের মতো এছলামাবাদীও কলকাতাকেন্দ্রিক ওই জোয়ারে আলোড়িত ও উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন। প্রায় বিপরীত মেরুর ইসলামি রীতি ও ঐতিহ্যের শিক্ষাপদ্ধতি দিয়ে জীবন শুরু করেন তিনি। কিন্তু সমগ্র মুসলমান-সমাজের উন্নয়নের প্রয়োজনে অত্যন্ত সীমিত সুযোগের মধ্যেও দুর্মর আকাক্সক্ষা ও অধ্যবসায়ের বলে সমকালের আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ধারার মর্মার্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। পশ্চাদ্পদ নিজ জাতির মনোজগৎকে যুগোপযোগী শিক্ষায় অনুরক্ত করার জন্য তিনি পত্রপত্রিকায় লেখালেখি ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা, কনফারেন্স অনুষ্ঠান এবং রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এ-সবই একজন মানুষের বহুমুখী কর্মতৎপরতার পরিচায়ক, যার ব্যক্তিক ও পারিপার্শ্বিক পটভূমি ও এ-দুয়ের মিথস্ক্রিয়ার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ নিয়ে শামসুজ্জামান খানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর স্বরচিত জীবনীকথা আত্মজীবন।

কর্ম ও চিন্তাযোগী মানুষ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী আমাদের জাতীয় মানসে ক্রমশ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর এলাকায় সংকুচিত হচ্ছেন। অবশ্য প্রচারমাধ্যমের বিপুল বিস্তারের এ-যুগে যে-কোনো ঘটনা বা ব্যক্তিত্ব বিস্মৃতির করাল গ্রাসের শিকার হতে পারেন। তাই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারাশি ও গতায়ু ব্যক্তিদের বয়ান বাঁচিয়ে রাখা আধুনিককালের বুদ্ধিজীবী-সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। আমাদের জাতীয় মানসের প্রভাবক সূত্রগুলোয় মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীকে বাঁচিয়ে রাখার একরকম প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে আত্মজীবনের প্রকাশনাকে। আত্মজীবনে এছলামাবাদী তাঁর

জন্ম, বাল্য ও কৈশোর, পড়াশোনা এবং ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত কর্মজীবন বর্ণনা করেছেন। অপরদিকে, তাঁর সচল পরিপার্শ্ব ও তার রূপ-রূপান্তরকেও স্পর্শ করেছেন নিমগ্ন ভাবুকের দৃষ্টিতে। গ্রন্থটি ১৯৩১ সাল থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে লিখিত হওয়ায় তাঁর জীবনের পরবর্তী পনেরো বছরের ঘটনাবলি এতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ওই পর্ব নিয়ে আত্মজীবনীর আরেকটি অংশ লেখার পরিকল্পনা ছিল হয়তো। এ-কারণেই আলোচ্য গ্রন্থটিকে ‘প্রথমভাগ’ আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত এছলামাবাদী রচনাবলীর সম্পাদক মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন লেখকের আত্মজীবনীর আরো কিছু খণ্ড খণ্ড অংশস্বরূপ পাণ্ডুলিপি আছে, যেমন : আত্মপরিচয়, রোজনামচা, হতাশ জীবন। শামসুজ্জামান খান এ-বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

বাংলা ভাষায় আত্মজীবনী-রচনার দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। বাংলায় লিখিত প্রথম আত্মজীবনী শ্রীমতী রাসসুন্দরী দাসীর আমার জীবনীর (১৮৬৮) গুরুত্ব হয়তো নারীর রচনা হিসেবে এবং কালগত কারণে। তবে বাংলা ভাষার দ্বিতীয় আত্মজীবনী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিদ্যাসাগরচরিত – স্বরচিত নানা মাপে শিল্পোত্তীর্ণ রচনা; দোষ এর একটিই – আত্মজীবনীটি সম্পূর্ণ নয়। এতে বিদ্যাসাগরের জীবনের প্রথম অংশ বর্ণিত হয়েছে মাত্র। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মচরিত (১৮৯৮) দার্শনিক রীতির আত্মজীবনীর ধ্রুপদী উদাহরণ, যদিও তার সামাজিক মূল্য বেশি নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনস্মৃতি (১৯১১-১২) এবং সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার বাল্যকথা ও বোম্বাই প্রসঙ্গ (১৯১৫) অসম্পূর্ণতা ও একপার্শ্বিকতার দোষে দুষ্ট। তবে অনেকের মতেই শিবনাথ শাস্ত্রীর আত্মচরিত (১৯১৮) আদর্শ আত্মজীবনীর দৃষ্টান্ত। এটি প্রায় সবদিক থেকেই দোষমুক্ত, ব্যক্তির সংগ্রামী আত্মবিকাশের ইতিবৃত্তরূপে সুখপাঠ্য, আবার স্বকাল ও

স্বসমাজের প্রতিফলন হিসেবেও মূল্যবান। লেখকের সামনে আত্মজীবনীর আরেকটি প্রভাবশালী উদাহরণ ছিল : মীর মশাররফ হোসেনের আমার জীবনী (১৯১০)। জাতিগত নৈকট্যের কারণে এ-গ্রন্থটি তাঁকে প্রাথমিকভাবে আকৃষ্ট করার কথা, যদিও মশাররফ হোসেনের রচনাটিকে আদর্শ আত্মচরিতের মূল্য দেওয়া হয় না; এটি ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব গণ্ডির বয়ান, কালের প্রবণতা ও রূপান্তর তাতে খুব একটা আঁচড় কাটেনি। যাই হোক, আত্মজীবনী-রচনার এই ঐতিহ্যের আলোকে এবং তাঁর কাল ও পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনিরুজ্জামানের আত্মজীবনকে বিবেচনা করতে পারি।

আত্মজীবনীর গুরুত্ব কেবল ব্যক্তির আত্মকাহিনী বয়ানের মধ্যে নয়, সমকাল ও পরিবেশ-পরিপার্শ্বের তথ্যগত ও বিশ্লেষণাত্মক উপস্থাপনের কারণেও এ-ফর্মের সাহিত্যিক সৃষ্টির মূল্য। আত্মজীবনী সমাজ ও মানবীয় সত্তার বিকাশ-সম্পর্কিত তত্ত্বের প্রায়োগিক উদাহরণ বা নমুনা। বাংলা সাহিত্যে আত্মজীবনী (১৯৫৬) গ্রন্থে সোমেন বসু বলেছেন, ‘আত্মজীবনী মানুষের হয়ে ওঠার কাহিনী’ (পৃ ৩)। এ-জাতীয় রচনায় আমরা যেমন আকাক্সক্ষা, ধৈর্য, অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির উত্থানের কাহিনী পাঠ করে উদ্দীপ্ত হই তেমনি তাঁর কালের সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রবণতাসমূহ সম্পর্কে তাঁর পর্যবেক্ষণ এবং এর সঙ্গে তার মিথস্ক্রিয়ার কথাও জেনে নিতে চাই। যে-কালে জন্মেছিলেন এছলামাবাদী তা বাঙালি মুসলমানের জন্য বিশেষ অর্থবহ। সে-কাল ও কালের ধর্ম আমাদের প্রবল আগ্রহের বিষয়। তাঁর আত্মজীবনীতে এসবের যথাযথ প্রতিফলন দাবি করাও স্বাভাবিক।

মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর আত্মজীবন বিভিন্ন শিরোনামে বর্ণিত। যেমন, ‘বংশপরিচয়’, ‘জন্ম ও শৈশব : পাঠারম্ভ’, ‘হুগলীর পাঠ্যজীবন’, ‘ছাগল কোম্পানী ও ভূমিকম্প’, ‘শিরাজি’, ‘সমাজের মনোবৃত্তি’ প্রভৃতি। গোটা গ্রন্থটির পাঠ আমাদের মধ্যে এমন ধারণা দৃঢ় করে যে, মৌলানা মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী সব দিক থেকেই

স্বনির্মিত এক ব্যক্তিত্ব। চট্টগ্রামের মুসলিম সমাজে ধর্মমুখী আবহ অনেক পুরোনো। উনিশ শতকের শেষে ওখানে ‘মুসলমান ভদ্রলোকে’র সন্তানের জন্য লেখাপড়া ও জ্ঞানার্জনের সূচনা হতো আরবি ও ফারসি শিক্ষায় হাতেখড়ি দিয়ে। বাড়িতে ওস্তাদের কাছে পাঠ এবং মাদ্রাসায় শিক্ষাগ্রহণ – এই ছিল স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। বাল্যকালে তাঁর পড়াশোনার বেশির ভাগ সময় ব্যয় হয় ফারসি শিক্ষায়; একবছর আরবি ও কোরআন শিক্ষায়, আর বাংলা শিক্ষার জন্য একবছর ব্যয় করা সম্ভব হয় তার পক্ষে।

মুসলমান সমাজের তখনকার শিক্ষা-ব্যবস্থার চমৎকার চিত্র আছে লেখকের পাঠারম্ভের বর্ণনায়। তখনো গ্রামাঞ্চলে কোনো অবস্থাপন্ন মানুষের বাড়িতে একজন শিক্ষক রেখে গ্রামের ছেলেমেয়েদের পড়ানোর ব্যবস্থা করা হতো। এটি এদেশের মধ্যযুগীয় শিক্ষা-ব্যবস্থার একটি ধরন। এছলামাবাদী এ-রীতিতেই পার্শ্ববর্তী কেশুয়া গ্রামের হাকিমউল্লাহ মাস্টারের বাড়িতে নীলমনি মাস্টারের কাছে একবছর বাংলা শিক্ষা করেন। তিনি জীবনী লেখার সময়ের সঙ্গে তাঁর বাল্যকালের তুলনা করে লিখেছেন : ‘তখনো গ্রামে লেখাপড়ার চর্চা বর্তমানের তুলনায় অনেক অধিক ছিল। আমাদের গ্রামে আমি এমন পরিবার দেখি নাই যেই পরিবারে ছেলেমেয়েরা অন্তত কোরআন শরীফ পড়া সমাপ্ত না করিয়াছে। অল্পাধিক বাঙ্গালা অনেকেই শিখিত। উর্দু পার্শী কেহ কেহ পড়িত’ (পৃ ২১)। লক্ষণীয় যে, এখানে এছলামাবাদীর তথ্য-অনুযায়ী জানা যায়, চট্টগ্রামের মুসলিম সমাজেও প্রাথমিক স্তরে ‘উর্দু-পার্শী’র তুলনায় বাংলা শিক্ষার প্রতি আগ্রহ ছিল বেশি। কিন্তু আমাদের প্রচলিত ধারণায় মনে করা হয়ে থাকে, মুসলমান সমাজে প্রধানত আরবি-ফারসিই শিক্ষা দেওয়ার রেওয়াজ ছিল; বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি ছিল অনীহা। এছলামাবাদীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, প্রচলিত ধারণার গোড়ায় কোথাও একটি গুরুতর প্যাঁচ রয়ে গেছে।

মনিরুজ্জামান অকপট আন্তরিকতায় তাঁর পড়াশোনার যে-বিবরণ তুলে ধরেছেন তাতে মনে হয় তাঁর শিক্ষাজীবন যথেষ্ট কষ্টকর ছিল। আর্থিক অনটন ছাড়াও ওই যুগের রীতিনীতি ও সীমিত সুযোগের কারণেও কঠোর শ্রম দিয়ে তাঁকে পড়াশোনা করতে হয়েছে। এখানে দু-একটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে। ছেলেবেলা থেকে মোল্লাগিরির প্রতি প্রবল ঘৃণা ছিল তাঁর। এমন প্রতিজ্ঞা ছিল তাঁর যে, জীবনে মোল্লাগিরিকে কখনো পেশা হিসেবে গ্রহণ করবেন না। এজন্য হুগলিতে থাকাকালে তিনি হাকিমি বিদ্যাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে মনস্থ করে জনৈক মাদ্রাসা-শিক্ষকের কাছে তালিম নিতে শুরু করেন। এজন্য তাঁকে প্রতিদিন দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে যাওয়া-আসা করতে হতো। শুক্রবারে যাওয়া-আসায় প্রায় ষোলো মাইল পথ পায়ে হেঁটে শিক্ষকের বাসায় গিয়ে পড়তে হতো। এ-থেকে শিক্ষার প্রতি তাঁর অনুরাগ ও অধ্যবসায় আন্দাজ করা যায়।

ছাত্রাবস্থায় বাংলা শিক্ষার ঘাটতি পূরণের জন্য তিনি রংপুরে কর্মজীবনে রীতিমতো শিক্ষার্থীর ধৈর্য নিয়ে বাংলা চর্চা করেন এবং মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি লেখেন : ‘বাল্যকালে ৬/৭ বৎসর বয়সে শিশুশিক্ষা ও বোধোদয় নামক দুইখানি পুস্তক মাত্র পড়িয়াছিলাম। সেই অবধি বাংলা ভাষার চর্চা করার সুযোগ পাই নাই। বাংলা সংবাদপত্র পড়িতে যাইয়া পদে পদে বাধা পাইতে লাগিলাম। অনেক শব্দ বুঝিতে পারি না। ভৌগোলিক জ্ঞান না থাকায় বহু বিষয় আয়ত্ত করিতে পারিতাম না। ইহার প্রতিকারকল্পে মাদ্রাসার বাংলা শিক্ষক ও বোর্ডিং-এর ম্যানেজার মুনশী কেরামত উল্লাহ ছাহেবের

নিকট “মিহির ও সুধাকর” পাঠ্যপুস্তকরূপে এক এক কলম করিয়া পড়িতে লাগিলাম’ (পৃ ৪৭)।

পরিপার্শ্বের সঙ্গে এছলামাবাদীর পরিবর্তন-উন্মুখ মনোজগতের মিথস্ক্রিয়া এবং ক্রমশ রূপান্তরেরও সুস্পষ্ট বিবরণ পাওয়া যায় আত্মজীবনে। তিনি জ্ঞানচর্চার ইসলামি রীতি ও ঐতিহ্যকে অঙ্গীকার করেছিলেন পারিবারিক পরিবেশের প্রভাবে। হুগলির বহুমাত্রিক পরিবেশে পড়াশোনা এবং পরে কর্মজীবনের সূচনায় রংপুরে সংবাদপত্রের সংস্পর্শ তাঁর উপলব্ধি ও বোধের সীমা বিস্তৃত করে। মুসলমান সমাজ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি আরো বাস্তবমুখী ও প্রগাঢ় হয়। মুসলমানদের পশ্চাদ্পদতার করুণ অবস্থা পরিষ্কার চিত্রের মতো প্রতিভাত হয় তাঁর কাছে। তিনি বুঝতে পারেন যে, যুগধর্মের মানদণ্ডে ইসলামি রীতির শিক্ষায় অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে।

এ-সময়ে উপমহাদেশের মুসলমানদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য ভিন্ন ধারার আন্দোলন সম্পর্কেও জ্ঞাত হন তিনি। এর ফলেই মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি ও শিক্ষা-পদ্ধতিতে পরিবর্তনের কথা ভাবতে থাকেন। মনিরুজ্জামানের মনোজগতের বিকাশে এ-সময়পর্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নিজের বর্ণনাতেই স্বীকারোক্তি রয়েছে : ‘রংপুরে পৌঁছিয়া পাঞ্জাবের উর্দু সংবাদপত্র পাঠে আমার অনেকটা ভাবান্তর উপস্থিত হইল। দেশসেবা ও সমাজসেবা যে মানুষের একান্ত কর্তব্যকার্য – তাহা আমি ক্রমে বুঝিতে পাইলাম। … আমি উর্দু ও বাংলা সংবাদপত্র পাঠে একদিকে যেমন দেশ ও সমাজসেবার প্রতি অনুরাগ বর্ধন এবং চিন্তার ধারা প্রশস্ত করার সুযোগ পাইতে লাগিলাম, অন্যদিকে সংবাদপত্রে প্রবন্ধ ও সংবাদাদি লিখার আকাক্সক্ষাও দিন দিন বৃদ্ধি পাইতে লাগিল’ (পৃ ৪৮-৪৯)। এবং

এ-সূত্রেই তিনি শেখ আবদুর রহিমের মিহির ও সুধাকর, মুনশী মোহাম্মদ রেযাজুদ্দীনের এছলাম প্রচারক প্রভৃতি পত্রিকা মারফত ইসলাম-বিষয়ক বিধি-বিধান সম্পর্কে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে সারাদেশে বেশ পরিচিতি অর্জন করেন। অপরদিকে, পত্রিকার মাধ্যমে সংবাদ পেয়েই তিনি ১৮৯৮ সালে সৈয়দ আহমদ খানের নেতৃত্বে কলকাতায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারতীয় মোসলেম শিক্ষা সমিতির কনফারেন্সে যোগ দিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন। এ-ঘটনা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। তাঁর নিজের ভাষায় : ‘সেই কনফারেন্স হইতেই আমার সামাজিক জীবনে নতুন যোগ আরম্ভ হইল’ (পৃ ৬১)। এখান থেকেই তাঁর মধ্যে এছলাম মিশন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক মোছলেম শিক্ষা সমিতি গঠনের ধারণা সূচিত হয়ে থাকবে।

সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিপার্শ্ব সম্পর্কে এছলামাবাদী পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তাই আকাক্সিক্ষত পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। মুসলমানের জাতীয় উন্নতির অন্তরায় যে শিক্ষার ঘাটতি – প্রধানত বিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস, প্রভৃতি বিষয়ে আধুনিক শিক্ষার অভাব – তা বুঝতে পেরেছিলেন বলেই মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়নে অব্যাহত চেষ্টা করে গেছেন তিনি। সংগঠন ও তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য-প্রচারণার প্রয়োজনে তাঁরই তৎপরতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সোলতান সাপ্তাহিক পত্রিকা। এসব কাজ করতে গিয়ে তাঁকে কী কঠিন সময় অতিক্রম করতে হয়েছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রক্ষণশীল ধর্মীয় মৌলবাদীদের কীরকম ভয়াবহ আক্রমণ প্রতিহত করতে হয়েছে, অনেকের কাছে কীরকম হীন হতে হয়েছে তার বিবরণ পাওয়া যায় আত্মজীবনের শেষদিকে সংশ্লিষ্ট অংশে।

স্বজাতি সম্পর্কে তাঁর ভাবনার গভীরতা ও দূরদৃষ্টির প্রকাশ আছে মুসলমান-সমাজে বিদ্যমান আর্থিক অবস্থার বিশ্লেষণে। ব্রিটিশ বৈষম্যনীতি এবং উপমহাদেশীয় অর্থনীতির স্বভাব ও বিন্যাস-পরিবর্তনের ফলে উনিশ শতকের প্রথম থেকেই মুসলমানদের সম্পদ হিন্দুদের হাতে চলে যেতে থাকে। অনেক মুসলমান পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে। যেসব শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মুসলিম পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হতো সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। এ-অবস্থায় মুসলমানরা চাইলেও নতুন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিল না। অর্থনীতির এই মারপ্যাঁচে গোটা জাতি যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা বেশ ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন এছলামাবাদী। এ-বিষয়ে তাঁর নিুোদ্ধৃত বিশ্লেষণ আমাদের মনোযোগ দাবি করে :

‘বঙ্গের মুসলমানগণ প্রায় সকলেই ঋণগ্রস্ত। জমিদার, জোতদার, তালুকদার ও ব্যবসায়ীগণ ঋণের দায় হইতে কেহই মুক্ত নহে। … সাব্যস্ত করিলে প্রত্যহ অন্তত ৩০০ মোকদ্দমা মুসলমানের বিরুদ্ধে নিষ্পত্তি হয়। ইহার অন্য অর্থ এই যে, প্রত্যহ ঐ পরিমাণ মুসলমানের জোতজমা নীলামে বিক্রি হইয়া অন্য জাতির কবলে চলিয়া যাইতেছে। বাঙ্গলাদেশের পনর আনা মহাজন বা উত্তমর্ণ হিন্দু। অন্যদিকে পৌনে ষোল আনা মুসলমান খাতক …। হিন্দু সমাজে যাহারা ঋণগ্রস্ত হয় তাহারা স্বজাতীয় মহাজনদের নিকট ঋণ গ্রহণ করে বলিয়া তাহাদের সম্পত্তি হস্তান্তরিত হইলেও

তাহাতে ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়

বটে, কিন্তু জাতিগত ক্ষতি হয় না’ (পৃ ৯৫-৯৬)।

ভাষার সারল্য ও প্রাণময় প্রবহমানতা এবং আত্মপ্রকাশের আন্তরিক ও অকপট সরস ভঙ্গি বিদ্যাসাগরের আত্মচরিতকে অনুপম করেছে। এছলামাবাদীর আত্মজীবন বিদ্যাসাগরের রচনার তুল্য বলি না, তবে ভাষার সারল্য ও আত্মপ্রকাশের অকপটতার কমতি নেই তাতে এবং সেইসঙ্গে সময়ে সময়ে যথোপযুক্ত স্থানে হাস্যরসাত্মক আবহও সৃষ্টি হয়েছে। এ-সবই আত্মকাহিনীর বড় গুণ বলে মনে করা হয়। অধিকাংশ আত্মজীবনীতে লেখকের শতভাগ অকপট প্রকাশ সম্ভব হয় না বলে সমালোচকরা যে-মন্তব্য করেন তার আলোকে এছলামাবাদী প্রায় নির্দোষ বলেই মনে হয়। কারণ এছলামাবাদীর গ্রন্থটির বড় একটি গুণই হলো এর অকপট স্বীকারোক্তি ও সরল বর্ণনাভঙ্গি। আমরা প্রাসঙ্গিক একটি অংশ উদ্ধৃত করছি :

‘আমি গ্রাম্য ছাত্র – কখনো টাউনে বাস করি নাই। টাউনের পোষাক-পরিচ্ছদের সহিত পরিচয় নাই। গ্রামের লুঙ্গি, কোর্ত্তা ও চাদরই আমাদের পোষাক। তবে আমার সম্বলের মধ্যে আমার ভ্রাতা হাকিমউল্লাহর ব্যবহৃত আচকানের অনুরূপ ছিটের একটা জামা ছিল। লুঙ্গির উপর তাহা পরিয়া মাদ্রাছায় ভর্তি হইতে গেলে শহুরে ছাত্রেরা হাস্য করিতে লাগিল। আমি হাসির কারণ কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। আমার অদ্ভুত পোষাক দেখিয়াই তাহারা হাসিয়া আকুল। বাসায় ফিরিয়া আসিলে অন্যদের মুখে হাসির কারণ জানিতে পারিলাম। এখানে আসিলে আচকান পায়জামা পরিতে হয় – ইহাই বুঝিতে

পারিলাম। কয়েকদিনের মধ্যে আচকান পায়জামা সিলাই করিয়া লইয়া তথাকথিত শহুরে ভদ্রলোকের মধ্যে গণ্য হইয়া পড়িলাম;’

(পৃ ২৩)।

এ-রকম অকপটতার মধ্যেও মনিরুজ্জামান তঁাঁর স্বভাবসুলভ তীক্ষè বিবেচনাবোধ ও আত্ম-অহমিকাবোধের প্রমাণস্বরূপ ‘শহুরে ভদ্রলোক’ শব্দটির আগে ‘তথাকথিত’ শব্দটি জুড়ে দিতে ভুল করেননি। অকপট হওয়ার সাহস থাকার কারণেই তিনি তঁাঁর আর্থিক অসংগতির কথা বলতে কিংবা পীর-ফকিরে তঁাঁর প্রবল বিশ্বাস ও ভক্তি-শ্রদ্ধার কথা স্বীকার করতে দ্বিধা করেননি, এমনকি নিজে মাদ্রাসাশিক্ষিত মৌলবি হওয়ার কারণে পাশের গ্রামের কোনো এক কন্যার পিতা কর্তৃক জামাই হিসেবে তঁাঁকে না পছন্দ করার বিষয়টিও চেপে যাননি। বরং তাঁর কাছ থেকেই জানা যায় যে, প্রত্যাখ্যানের বিষয়টি তাঁর মধ্যে প্রথমে একরকম সংকোচ, পরে প্রচণ্ড প্রতিজ্ঞার জন্ম দেয় যে, তিনি কখনো নিছক ধর্মীয় কর্মকাণ্ডকে জীবিকারূপে গ্রহণ করবেন না। আপন অসংগতি, ত্রুটিবিচ্যুতি, দুর্বলতা নিয়ে কথা বলা এবং ব্যঙ্গ করার সৎসাহস খুব কম লোকেরই হয়। আত্মজীবন এ-গুণের কারণেও সুপাঠ্য।

এছলামাবাদীর আত্মজীবন যে খণ্ডিত তা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। গ্রন্থটির শেষ অংশটিতে পূর্ণ মনোযোগের অভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। ওখানে কোনো কোনো ঘটনার সন-তারিখ উল্লেখ করতেও ভুলে গেছেন লেখক। তাঁর জন্ম অর্থাৎ ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৩০ বছরের ঘটনাবলির বর্ণনায় ব্যয় করেছেন শতাধিক পৃষ্ঠা। আর ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাকি তিরিশ বছরের বয়ান শেষ করেছেন সালসহ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করে, মাত্র ৩/৪টি পৃষ্ঠার মধ্যে। এ-দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গভঙ্গে তাঁর বিরোধিতার উল্লেখ করেছেন কেবল, কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করেননি, কিংবা সমাজের সার্বিক মনোভাবের গভীরতর উপলব্ধির কথাও আমাদের জানাননি। তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতার ব্যাপারেও তিনি প্রায়-নীরব। চট্টগ্রাম নেজামপুর অঞ্চলে কনফারেন্স, আঞ্জুমানে ওলামা প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি বড় বড় ঘটনাও কয়েক বাক্যের উল্লেখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গ্রন্থের শেষে পদ্যে লিখিত পরিশিষ্টে মধ্যযুগের কাব্যিক রীতিতে কিছু কিছু প্রধান ঘটনা পুনরায় বর্ণনা করা হয়েছে, তুলে ধরা হয়েছে কিছু ব্যক্তিগত স্বপ্ন-পরিকল্পনার কথা। এই আশ্চর্য সংক্ষেপণ গোটা আত্মজীবনের শিল্পমান মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করে।

বাংলা আত্মজীবনীগুলোয় অনেকেই নিজবংশ ও পরিবারের গৌরবগাথা বর্ণনা করে আনন্দ পেয়েছেন। এছলামাবাদী সেই প্রবণতার শিকার। নিজ বংশের কুলীন-পরিচয় বারবার প্রমাণের মধ্যে তাঁর উদ্বেগ লক্ষণীয়। আবার নিজে যে মেধাবী ছাত্র ছিলেন তাও কেবল প্রয়োজনীয় উল্লেখের মধ্যে শেষ না করে বিভিন্ন পর্যায়ে বর্ণনা করার চেষ্টা করেছেন তিনি। অবশ্য এ-দুটো বিষয় উপেক্ষা করলে আত্মজীবনকে অতিরঞ্জনের দোষ থেকে মুক্তই বলা যায়।

সম্পাদক শামসুজ্জামান খান গ্রন্থটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে ভূমিকায় একটু বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয়। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর জীবনের পরবর্তী পনেরো বছর সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত পাঠকের জ্ঞান সমৃদ্ধ করত, যেহেতু আত্মজীবনে সে-পনেরোটি বছর বিবৃত হয়নি। তাছাড়া, এছলামাবাদীর জীবিত বংশধরদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, দেয়াঙ পাহাড়ে তাঁর প্রকল্পের ভাগ্য প্রভৃতি বিষয়ে টীকা-আকারের তথ্য সন্নিবেশিত হলে আমাদের কৌতূহল নিবৃত্ত হতো।ত্রুটি-বিচ্যুতি যাই থাকুক সাবলীল ভাষা ও অকপট প্রকাশের গুণে মনিরুজ্জামান এছলামাবাদীর আত্মজীবন আমাদের আগ্রহ ধরে রাখে। একজন মানুষের হয়ে-ওঠার কাহিনী হিসেবে তার গুরুত্ব আমাদের স্বীকার করতে হবে, তেমনি সে-কালের প্রবণতার সীমিত বিবরণের মূল্যও উপেক্ষণীয় নয়। অসম্পূর্ণতা এবং শেষাংশের অতি সংক্ষেপণের দোষ না থাকলে এছলামাবাদীর আত্মজীবন বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ আত্মচরিতের মর্যাদা পেত বলে মনে করি আমরা।