অনুবাদ গল্প

  • ঘরে ফেরা

    মিলি জাফতা অনুবাদ : মেহবুব আহমেদ   বাস থামতেই যাত্রীরা সব হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়ল। সেদিন শুক্রবার, সপ্তাহের শেষ, মাসের শেষ, বছরেরও শেষ, আর উইন্ডহিক থেকে উত্তরের এই অফুরন্ত পথে কি গরম! এবার আমি আগের মতো তাড়াহুড়ো করলাম না, বাস খালি না হওয়া পর্যন্ত বসেই রইলাম। তারপর মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে দরজার দিকে এগোলাম। জানালা দিয়ে চোখে…

  • জাতীয় পক্ষপাত ফাতু দিয়ম

     অনুবাদ : মেহবুব আহমেদ মিস্টার বডার্সকে ধন্যবাদ – একেবারে নিঃশব্দে বদলে গেছে আইন : একজন ফরাসি নাগরিককে বিয়ে করে দুবছর টিকে থাকতে পারলে পাওয়া যাবে পুরনো পরিচয় মুছে ফেলার কাগজ এবং সঙ্গে ফ্রান্সের সৌরভ। আর আফ্রিকীয় মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রজনন ক্ষমতা নাগরিকতা অর্জনে বাড়তি সুযোগ করে দিতে পারে, অবশ্য জাতীয় পক্ষপাতের কথা ফরাসি ভ্রূণের কিছুই জানা…

  • গৃহবধূ

    ইসমত চুঘতাই অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী যেদিন মির্যার নতুন কাজের মেয়েটি ধীরগতিতে তার বাড়িতে ঢুকল, প্রতিবেশীদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। যে-সুইপার বরাবর কাজ ফাঁকি দিতে অভ্যস্ত, সে রয়ে গেল এবং গায়ের শক্তি খাটিয়ে ঘষে-ঘষে মেঝেটা পরিষ্কার করল। যে-গোয়ালা দুধে ভেজাল দেওয়ার জন্য কুখ্যাত, সেও নিয়ে এলো মাখন-ভাসা দুধ। কে তার নাম দিয়েছে লাজো – লাজুক…

  • দুটি গল্প

    মূল : এলিজাবেথ গুন্টার অনুবাদ : পঙ্কজ চট্টোপাধ্যায় জন্ম সরযূ দেয়ালের ধারে পড়ে থাকা ছোট্ট শরীরটা কদিন আগেই লক্ষ করেছিল; কিন্তু বিশেষ আমল দেয়নি। যদিও এ-অবস্থায় তার পক্ষে কেনাকাটা করা ক্রমশ কষ্টকর হয়ে পড়ছিল, তবু সে প্রতিবেশীদের বন্ধুত্বপূর্ণ সাহায্যের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। মা-বাবার মৃত্যুশোক তার মনে এখনো ভীষণ তাজা হয়ে আছে। সে-কারণেই ওঁদের ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকা…

  • জায়গিরদার ও তার কুকুর পান্নালাল প্যাটেল

    অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর জায়গিরদার এই প্রথম আমাদের গ্রামে আসছেন। সবাই তার আগমনের প্রতীক্ষায়। গায়ের তালাতি (হিসাবরক্ষক) সপ্তাহ ধরে দুধের ভাণ্ড ঠিক রাখছে। কে জানে, কখন বাপুজির অভ্যুদয় ঘটবে। চারপেয়ে চৌকি এবং কাঁথা স্তূপ করা হয়েছে। মুখির (গ্রামের মাতবর) ওপর হুকুম জারি হয়েছে এসময় তার গ্রাম ছেড়ে যাওয়া চলবে না। মুচি,…

  • খাঁচারটিয়া

    অনুবাদ : জাফর আলম [ভারতে ইংরেজি উপন্যাসরচনার পথিকৃৎ মুল্ক রাজ আনন্দ্ ৯৯ বছর বয়সে মুম্বাইতে মৃত্যুবরণ করলেন গত ২৮ সেপ্টেম্বরে। তাঁর জন্ম হয় ১৯০৫ সালে, পেশোয়ারে। শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয় পাঞ্জাব, কেমব্রিজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিছুকাল জেনেভার লিগ অফ নেশনস ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনার পর তিনি নানাধরনের কাজ করেন ভারতে ও ইংল্যান্ডে। ১৯৪৬ সালে স্থায়ীভাবে দেশে ফিরে এসে স্থিত হন মুম্বাইতে। তিনি শিল্পবিষয়ক পত্রিকা মার্গ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরে শিক্ষকতা করেন একাধিক ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর প্রথম উপন্যাস অস্পৃশ্যদের জীবন নিয়ে লেখা আন্টাচেবলস্ (অচ্ছুত, ১৯৩৫) ইংল্যান্ডে প্রকাশিত হয়ে সাড়া জাগায়। এর ভূমিকা লেখেন ই এম র্ফস্টার। তারপর একে একে কুলি (১৯৩৬), টু লিভস অ্যান্ড এ বাড (দুটি পাতা একটি কুঁড়ি, ১৯৩৭), দি ভিলেজ (১৯৩৯), অ্যাক্রস দি ব্ল্যাক ওয়ার্টাস (১৯৪০), দি সোর্ড অ্যান্ড দি সিক্ল (১৯৪২), প্রাইভেট লাইফ অফ অ্যান ইন্ডিয়ান প্রিনস (১৯৫৩) প্রভৃতি তাঁকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়। সাহিত্য আকাদেমির পুরস্কার, বিশ্ব শান্তি পরিষদ পুরস্কার এবং রাষ্ট্রীয় ‘পদ্মভূষণ’ খেতাবে তিনি ভূষিত হন। হিন্দি ও পাঞ্জাবি বাক্যরীতিকে ইংরেজিতে রূপান্তর করতে যে-দক্ষতা তিনি দেখিয়েছেন, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর লেখা এবং তাঁর সম্পর্কে লেখা বইয়ের সংখ্যা দেড় শতাধিক। মুল্ক রাজ আনন্দ্ ভারতীয় স্বাধীনতা-সংগ্রামে এবং স্পেনের গৃহযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দেশে সকল প্রগতিশীল আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।] রুকমানীই, নী রুকমানীই – খাঁচায় বন্দি কাকাতুয়া ডাক দেয়। রুকমানীর বান্ধবী এমনিভাবে লাহোরের কাচ্চা চাবুক সরণিতে প্রবেশ করে এভাবে ডাক দিত। কাকাতুয়া বারবার তাকে ডাক দেয়, যতক্ষণ সে পাখিকে কৌতুকবশে জবাব না দিচ্ছে ততক্ষণ সে ডেকেই চলে। সে কোনো জবাব দেয়নি বরং  রাস্তার পাশে বসেই ছিল। অমৃতসর কোর্ট দেড় মাইল দূরে, রাস্তার ধারে রুকমানী পা ছড়িয়ে বসেছিল। কাকাতুয়া আবার ডাক দেয়, ‘রুকমানীই, নী রুকমানীই’। রাস্তায় ধুলা উড়িয়ে মোটর, টাঙ্গা, এক্কা গাড়ি যাতায়াত করছে অবিরাম। সে ধুলায় আচ্ছন্ন আকাশের একদিকে তাকিয়ে থাকে। দোকানদার বলেছে রুকমানীকে, ওই দিক থেকে ডেপুটি কালেক্টর আসবে। কাকাতুয়ার ডাকাডাকি তার কানে যাচ্ছিল না। ‘রুকমানীই, নী, রুকমানীই’ – কাকাতুয়া অবিরাম ডাকতে থাকে! কাকাতুয়ার ধারণা, হরবোলা পাখির ন্যায় বারবার ডাকাডাকি করলে হয়তো সে একটিবার অবশ্যই উত্তর দেবে। ‘হ্যাঁ, বাবা হ্যাঁ’, ক্লান্তস্বরে জবাব দেয়। তার মাথার পেছনে চুলের খোপার নিচে ব্যথা ছিল। সেপ্টেম্বরের সকালের রোদে ব্যথাটি আবার চাড়া দিয়ে উঠে। তাদের এলাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় একদিন লোকজন অগ্নিসংযোগ, লুটপাট আর হত্যাকাণ্ডে মেতে উঠেছিল। সেই ভয়াবহ রাতের ঘটনার চেয়ে তার ঘাড়ের ব্যথাটি আরো বেদনাদায়ক। বয়সের ছাপ তার চোখে-মুখে আর কপালে। সে দুহাতে কপালে ছায়া মেলে সড়কের দিকে তাকায়, উদ্দেশ্য ডেপুটি কমিশনার আসছে কিনা নিশ্চিত হওয়া। তার দাঁতবিহীন মুখখানি ছিল উন্মুক্ত আর ঠোঁটের উপর বসেছিল কয়েকটি মাছি। সে বাঁ হাতে মাছি তাড়ায়। কিন্তু দুষ্ট মাছি কোনোমতেই পালাতে চায় না। ফলে বুড়ি কিছুটা উত্তেজিত হয় আর সে-উত্তেজনা যেন আর বুক থেকে পেটে গিয়ে তোলপাড় করছিল। ‘নী তু কিত্তে হ্যায়’, কাকাতুয়া আবার ডেকে উঠে। এই বাক্যটি কাকাতুয়া বুড়ির বান্ধবীর মুখে শুনেছে। সে বুড়ির বাড়িতে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ডাক দিত,…

  • চামড়া

    চামড়া

    অনুবাদ : সালেহা চৌধুরী ১৯৪৬ সালে দীর্ঘদিন শীত ছিল। এপ্রিল মাসে বড় রাস্তায় হিম ঝড়ো বাতাস বয়ে গেল। বাতাস বইলো প্রবল ও কঠিন গতিতে। বরফের মেঘ মাথার উপর। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত। ড্রিওলি নামের একজন মানুষ আস্তে আস্তে রুডি বিভলির রাস্তা ধরে এগিয়ে আসছে। করুণ শীতার্ত  অস্তিত্ব¡। শজারুর মতো লাগছে তার লম্বা কোট। কলার তোলা কোটের ফাঁকে…

  • মাতৃত্বের স্বজ্ঞা

    মাতৃত্বের স্বজ্ঞা

    অনুবাদ : পরাগ চৌধুরী আমার ধারণা লোরা বোধহয় বিশ্বরেকর্ডধারী। লোরার কাচ্চা-বাচ্চা মোট আটজন। এতে অবাক হবার কী আছে? এই আটটা বাচ্চার বাবা সাতজন। বুঝুন এবার! লোরার কাছেই আমার বায়োলজির প্রথম পাঠ। সে থাকত আমাদের পাশের বাসায়। আর আমি তাকে খুব গভীরভাবে লক্ষ করতাম। আমি দেখতাম মাসের পর মাস তার ভুঁড়িটা কেবল ঠেলে উঁচু হয়ে উঠছে।…

  • উদ্যান লণ্ঠন

    উদ্যান লণ্ঠন

    অনুবাদ : শাহীন কবির আমি যত বেশি বলি তত লোকজন আমাকে কম বিশ্বাস করে। যত লোকের সাথে আমার দেখা হয় তারা প্রত্যেকেই আমাকে দেখে কেমন সতর্ক হয়ে যায়। আমি যখন কারো বাসায় বেড়াতে যাই, শুধুমাত্র আরেকটি কোনো মানুষের মুখ দেখার জন্য, আমাকে দেখে ওদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে, ‘কী, কেন এসেছ’ এমন একটা ভাব। এসব কথা…

  • মুলতুবি রাখা জাদুবিদ্যা

    মুলতুবি রাখা জাদুবিদ্যা

    অনুবাদ: জি এইচ হাবীব সান্টিয়াগো শহরে ছিলেন এক ডিন১, বড়ই খায়েশ তাঁর জাদুবিদ্যা শেখার। তলেদোর দন ইলান এ-বিদ্যায় সবার চেয়ে বড় জানতে পেরে তিনি চললেন সেই শহরে তাঁর তালাশে। যেদিন সকালে সেখানে পৌঁছোলেন সেদিনই গিয়ে হাজির হলেন তিনি দন ইলানের নিবাসে, গিয়ে দেখেন ভদ্রলোক তাঁর বাড়ির পেছনের এক ঘরে বসে বই পড়ছেন। দন ইলান তাঁকে…

  • আর্নেস্টোর মা

    আর্নেস্টোর মা

    অনুবাদ : সুব্রত বড়ুয়া উনি যে ফিরে এসেছিলেন-কেন উনি ফিরে এসেছিলেন, সে কথা আর্নেস্টো কি জানতে পেরেছিল অথবা পারেনি-আমি তা কখনো জানতে পারিনি, কিন্তু আসল ঘটনাটা ছিল, এর অল্প কিছুকাল পরেই সে তালায় চলে গিয়েছিল এবং সে গ্রীষ্মে আমরা ওকে একবার কিংবা দুবারের বেশি কখনো দেখতে পাইনি। ওর চোখের দিকে তাকানো সত্যিই কঠিন ছিল। এর…

  • দু ডলার দামের পানি

    দু ডলার দামের পানি

    অনুবাদ : মেহবুব আহমেদ ঘোড়ার পিঠে চড়ানো গদি চেপে ধরে ছোট তুলে রেমিজিয়া বলল, ‘পারগেটরির আত্মাদের জন্যে এই নিকেলটা রাখ, ফিলিপা। বৃষ্টি হোক।” খরায় জ্বলে যাচ্ছে এ অঞ্চল, তাতেই রেমিজিয়ার এই বিলাপ। সিগারেট টেনে চলল ফিলিপা, কোনো উত্তর দিল না। শেষে চোখ তুলে আকাশটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। নিঃসীম পরিষ্কার আকাশ, সামান্য ছায়া পর্যন্ত নেই। অসহ্য…