ছোট গল্প
-

বালাভাইয়ের অভিনয়
ট্রেন থেকে নেমে, স্টেশনের মূল ফটক পেরুলে, যে-রাস্তাটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে পুবদিকে চলে গেছে, সেই রাস্তার মুখে বালাভাইয়ের ঝলমলে স্টেশনারি দোকান। মূল ফটকের বাইরে এলে বালাভাইয়ের দোকান সকলের নজর কাড়ে। স্টেশনটা ছোট। এখানে মেইল ট্রেন থামে না। তারপরও এই স্টেশনের গুরুত্ব অনেক। প্রতিদিন শত শত মানুষ এই ট্রেনে যাতায়াত করে। এই এলাকার বিশাল অংশের মানুষের…
-

আড়ালে মহিমা
বৃষ্টিমুখর দুপুর ফুরিয়ে গেলে ধূসর আকাশের বিকেল হয়ে ওঠে কৃষ্ণময়। অযোগ্য ময়লা রাস্তার ভাঙা টুকরো টুকরো অংশে ওই বৃষ্টির জল জমে আছে। চামেলিবাগের সরু ঘুরপ্যাঁচে প্রয়োজন ছাড়া এলাকার মানুষও মরা দিনে তেমন চলাচল করে না। নতুন-পুরনো বিল্ডিংয়ের বারান্দা-দেয়াল-গেট ধরে ছাইছায়া সন্ধ্যা নীরবতা ছড়িয়ে নেমে আসে। সকালে ডানে মোচড় কাটা রাস্তার দেয়াল ঘেঁষে খণ্ডকালীন বাজার বসে।…
-

অপার
মতিবিবি বাড়ি এলো সন্ধ্যার দিকে। আগেই ফোনে জানিয়েছিল। বাড়িতে প্রস্তুতি ছিল। রাবেয়া পাঙাশ মাছ রান্না করে রেখেছে। নদীর পাঙাশ পাবে কোথায়? ম্যালা দাম। চাষ করা পাঙাশ এনে দিয়েছে বশির। বশিরের একটা পা খোঁড়া। এজন্য লোকে ডাকে ‘ল্যাংড়া বশির’। গৌধূলিয়া বাজারে তার একটা চায়ের দোকান আছে। তবে দোকানের আয়ে পাঁচজনের সংসার চলে না। সংসার ছিল ছয়জনের।…
-

চিতা বহ্নিমান
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে। আঠারো দিনের যুদ্ধ। আঠারো অক্ষৌহিণী সৈন্য নিধন হয়েছে। কুরুক্ষেত্রটি যেন যজ্ঞকুণ্ড। নরমেধ যজ্ঞ। প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ আঠারো হাজার সাতশো জন মানুষ বিসর্জিত হয়েছে এই নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডে। কুরুক্ষেত্রকে শুধু নরমেধ যজ্ঞকুণ্ড বললে ভুল হবে। এটি পশুমেধ যজ্ঞকুণ্ডও। এই যুদ্ধে হস্তি এবং অশ্বও কম নিহত হয়নি। মনুষ্য শোণিতের সঙ্গে পশুরক্ত মিশে কুরুক্ষেত্রে…
-

পক্ষী মারা
‘জয়নাল ঘুমাইছস? ও জয়নাল? পক্ষীটারে মারবি না?’ জয়নাল সারাদিন কেমন যেন ঝিম ধরে শুয়ে থাকে। ওর ঘুমটা নষ্ট করে মরতুজ আবার মিহিকণ্ঠে ডাকতে থাকে। ‘জয়নাল, মুবাইল আনছি। মুবাইল। আরে পিরিতের কতা কবি না! মুবাইল আনছি।’ জয়নাল তো তখন সেখানে ছিল না। শিউলী যেন কেবলি তার মাথায় হাত দিচ্ছে। ছোট্ট ছোট্ট আঙুলের স্পর্শ চুলের ভেতর দিয়ে…
-

নখ
বাংলাদেশের বিখ্যাত এক এনজিওর মাইক্রো ফিন্যান্স সেকশনের ডেপুটি ডিরেক্টর তানজিলা খানের পছন্দ তিন ইঞ্চি উচ্চতার হাইহিল। কিন্তু যখন গ্রামে গরিবদের আগামীদিনের স্বপ্ন দেখাবার জন্যে – ওই আগামী দিন ক্রমাগত আগামী হয় – ঋণের বোঝা দিতে সমিতির মিটিংয়ে তাকে যেতে হয়, তখন পায়ে থাকে দুই ফিতার ফ্লাট স্যান্ডেল এবং পরেন সাধারণ মানের সালোয়ার-কামিজ। সাধারণ মান দিয়ে…
-

শূন্যতার করতালি
পরকীয়া শব্দের ব্যুৎপত্তি মনে পড়ে স্যার? প্রশ্ন শুনে আমার পিলে চমকে ওঠার দশা। সোজাসুজি তাকাতেও পারি না, ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ি সংকোচে। টিচার্স কমনরুমে ইতস্তত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছি বেশ ক’জন সহকর্মী। সন্দেহবাতিকগ্রস্ত মোজাম্মেল সাহেবও আছেন উত্তর কোনায়, ভাঁজভাঙা খবরের কাগজের আড়ালে কোনোদিকে তার কুতুকুতে দৃষ্টি ফেলে রেখেছেন, ঠিক আছে! মুখ খুললেই নর্দমার কাদাপাঁকের মতো দুর্গন্ধ বেরোয়,…
-

এক জোড়া বিহ্বল দস্তানা
মেজদার কাঁধে ভর দিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন রবি। পা টলছে। নাকি জাহাজই দুলছে? বোম্বে ছাড়িয়ে কত দূর চলে এসেছে তাদের ‘পুনা’ স্টিমার? স্টিমার কি আরব সাগর পেরিয়ে লোহিত সাগরের মাঝবরাবর চলছে? সমুদ্রের ঢেউয়ের দোলায় তিনি দুলছেন? নাকি তাঁর পা টলছে! জাহাজের স্টুয়ার্ড ভায়া ডেভিড সুপের বাটি মুখের সামনে ধরে রোজই বলতেন, ‘খাও, কষ্ট করে…
-

নিজের ঠিকানা
লুৎফুন্নাহার সকাল আটটায় এসে গেল। সে বলেছিল সকালে আসবে, কিন্তু এত সকালে আসবে তা মনে হয়নি। আমি ডরমিটরি থেকে বের হয়ে ক্যাফেটেরিয়ার দিকে হাঁটতে শুরু করব, এমন সময়, ঠিক এই সময়টাতে ট্যাক্সি করে লুৎফুন্নাহার এসে গেল। ট্যাক্সিওয়ালাকে ভাড়া দিতে দিতে বললো, আমার কথা ভুলে গেছো? – ভুলিনি। – ডরমিটরি থেকে বেরিয়ে পড়েছ। কোথাও যাচ্ছো তো!…
-

একটি অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা
অন্ধ কিছু দেখে না, তার কণ্ঠ পারে ফুল ফোটাতে অন্ধকারে। অন্ধকারে যে গান বাজাই একলা হাতে সুদূর সরল এক তারাতে, সে গান কোথায় ভাষা পেল, স্বচ্ছ ভাষা? (‘পৌত্তলিক’, অরবিন্দ গুহ) বিশ্বাস করা যায় না এমন একটা গল্প বলি। মানে, এই জটিল জগৎ-সংসারের ঘূর্ণাবর্তে নাকানিচুবানির নানা অভিজ্ঞতার পর যে সহজ-সরল ঘটনাকেও আপনাদের অবিশ্বাস্য মনে হবে,…
-

আদিতে যে ছিল জিয়ন বালা
হয়তো সেটা ছিল ১৩১৪ বঙ্গ সন, বা হয়তো তার আগের অথবা পরের অন্য কোনো সনও হতে পারে। সনের সঠিক হিসাব স্মরণে পরখে চলাচলতি করা বেটাপোলা বা মাতারিসকল, তখন সেই তল্লাটে, মোটের ওপর ছিলই না। হিজরি-চান্দের হিসাব রাখলে রাখে মসজিদের হুজুরে। সেই মসজিদও এই শনখোলা গ্রাম থেকে অনেক দূরের, আরেক কোনো এক দেওভোগ গ্রামে আছে। সেই…
-

সমুদ্রের বিলাপ
সন্দ্বীপের আজিমপুর গ্রামের সৈকতে দাঁড়িয়ে আছি। সাঁঝের কোমল রোদ সাগরের ঢেউয়ের সঙ্গে মিলেমিশে ভাটির টানে চলে যাচ্ছে দক্ষিণে। মনে হচ্ছে কেবল রোদ নয়, রোদের ঢেউ বিষাদময় কাব্য-পঙ্ক্তি ছড়িয়ে সরে যাচ্ছে দূরে। কিছু কি বলতে চায় ওরা? মনে প্রশ্ন আসার সঙ্গে সঙ্গে মৃদু একটা শোরগোল শোনা গেল, স্পষ্ট নয়। কান পেতে মগ্ন হয়ে শুনতে চেষ্টা করলাম…
