ছোট গল্প
-

মহুয়া বনের পাখি
তাকে এখন খিদিরপুরের দিকে যেতে হবে। যেজন্য এসেছে এ-ঘটনার শুরু হয়েছে অনেক অনেক বছর আগে। একটা হ্যাপা। বলতে গেলে বড় হ্যাপাই আজ পোহাতে হচ্ছে দীপ্তকে। এটা সে ইচ্ছা করেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। না নিলেও পারতো। কাউকে সে বলেনি। বলার কথাও নয়। সাত-আট দিন আগে কলকাতায় এসেছে একটা ব্যবসায়িক কাজে। দীপ্ত ঢাকায় একটা বায়োমেডিক্যাল রিএজেন্টের…
-

উড়ে যায় মনপাখি
তুমি যাবেই? বিছানার পাশে বসে সুপ্তি রাতের প্রসাধন সারছে। শরীরে হালকা লাল নাইটি। ভেতরে সাদা ব্রা। পুতুলের মতো সাজানো শরীর সুপ্তির। রাতের এই প্রসাধনের মুহূর্তে শাকিল যেখানেই থাকুক, সুপ্তির জন্য বসে থাকে। বেশ সময় নিয়ে প্রসাধন সারে নিজের। এই সময়টুকু তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে সুপ্তিও। আগামী সপ্তাহে চলে যাবে সুইজারল্যান্ড, এক বছরের জন্য। শাকিল হাসানের…
-

বিদীর্ণ দর্পণ
ঢাকা টু লন্ডনের ফ্লাইটগুলি সব সময়ই যাত্রীবোঝাই থাকে। আজ পর্যন্ত যতবার এই ফ্লাইটে উঠেছি, ততবারই সেই একই চিত্র – ফ্লাইট কানায় কানায় পূর্ণ। তাই আশ্চর্য হলাম যখন দেখলাম ফ্লাইট ছাড়ার আগমুহূর্তেও আমার পাশের সিটটা খালি পড়ে আছে। সম্ভবত সারা ফ্লাইটে এই একটি সিটই এখন পর্যন্ত বেদখল আছে। কেবিন ক্রুরা ব্যস্ত হয়ে সবকিছু দেখে নিচ্ছে ঠিক…
-

রায়েরবাজার পাল বংশের ইতিহাস
রায়েরবাজারে একসময় যখন ঘরে ঘরে পাল বংশের কুমার শিল্পীরা মাটি নিয়ে কাজ করেছে, তখন এরা কাদামাটির মধ্যে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকত। সে হিসাবে এদের গায়ে, ঘামে ও রক্তে কাদামাটি মিশে গিয়েছিল। এখন রায়েরবাজার শেরেবাংলা রোড তার ১৫ ফুট প্রশস্ত ক্ষতবিক্ষত বুক থেকে যে ধুলোবালির জন্ম দেয় তা দুই পাশের হাইরাইজ বিল্ডিং হাউস অ্যারেস্ট করে রাখে…
-

ঘুমন্ত পাখি
বাজান খোলা বারান্দায় বইসা জাল বুনতাছে। আমারে ডাইকা কইল, এইদিকে একটু আয় মা। আমারে এক গ্লাস পানি দে। উর্মি একটা ইস্টিলের গেলাসে পানি দিয়া কইল, বাজান, জোনাকি ঘরে নাই। – ক্যান, কই গেছে ভরদুপুরে? – খালের ঘাটে পানি আনবার গেছে বাবা। বাজান হুঁক্কা খাইতাছে আর জাল বুনতাছে। – জাল বুনার সময় হুঁক্কা না খাইলে শরীর…
-

ডেথ সার্টিফিকেট
পরিবারটার ওপর যে একটার পর একটা এরকম বিপর্যয় নেমে আসবে এটা কেউই আগে ভাবতে পারেনি। প্রথমে মারা গেলেন এ-পরিবারের পিতা আবদুস সামাদ, যিনি পিডব্লিউডি অফিসের একজন হেড ক্লার্ক হলেও ধন-সম্পত্তি বেশ ভালোই করেছিলেন। পুরনো ঢাকার সূত্রাপুরে, যেখানকার ওরা আদি বাসিন্দা, সেখানে চারতলা একটা বাড়ি তৈরি করেছিলেন সামাদ সাহেব। নিজেরা একটা ফ্ল্যাটে থাকতেন আর বাকি সাতটা…
-

টেডিচাচি
‘চিইইইইইইই’ বলে বুড়ি না ছুঁতেই আমাদের ছি-বুড়ি খেলা যখন মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে থেমে যেত, সেরকম এক সিঁদুররাঙা সন্ধ্যায় আমাদের পাশের বাসার সামনে আসবাবপত্রভর্তি একটা ট্রাক এসে দাঁড়ালো। আমরা তিন বোন আর প্রতিবেশী বন্ধুরা হাঁ করে আসবাবপত্র নামানো দেখতে লাগলাম। আমাদের কারো বাসায় ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল, শোকেস ছিল না। আমাদের যে প্লাস্টিকের পুতুল,…
-

একজন উনপাঁজুরে
কাজীবাড়ির বৈঠকঘরের সামনে থেকে একটা সরুপথ দক্ষিণের বায়ু ঠেলে লাউয়ের মাচান ও পানাজলাটা ছুঁয়ে নদী আইলে গিয়ে উপুড় হয়ে পড়েছে। নদী আইলের উত্তরেই মূলত বসতবাড়ি। দক্ষিণে চরাভূমি। তবে বংশবিস্তারের হারানো তালে দক্ষিণের চরাভূমিতেও বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটা বসতবাড়ি উঁকি মারছে। এদের কতকটা পুরনো, কতকটা নতুন। জাহিদ কাজীবাড়ির সরুপথটা মাড়িয়ে নদী আইলে উঠে পুবে দৃষ্টি ফেলল। পৌষের উত্তুরে…
-

কহর আলীর অলীক সুখ
আষাঢ় মাসের বরষার ধারা শ্রাবণেও বয়ে চলে; বৃষ্টির মেজাজমর্জি বোঝা বড় দায়। শুধু দিনভর বৃষ্টির ব্যাকুলতা। পথ, মাঠ ও খাল-বিল তলিয়ে যায়। বৃষ্টির দিনের সেসব সময় ভেজা কাকের মতো চুপসে থাকে। স্থবির হয়ে থাকে গ্রামীণজীবন। এমন সময় প্রায় নীরবে বিপ্লব ঘটায় প্রকৃতি। সতেজতা পায় গাছপালা, লকলকিয়ে ওঠে তাদের যৌবন। রমিজ খাঁ জানালার কাছে দাঁড়িয়ে ভাবেন, এবারের…
-

পটভূমি হংকং
ভিক্টোরিয়া চূড়া থেকে ঝুঁকে নিচের দিকে তাকাতেই সমস্ত শরীর যেন শিরশির করে উঠল আকাশের। অনেক নিচে যতদূর দৃষ্টি যায় কিছুটা আবছা ধূসর বিশাল একটা ছবির মতো হংকং শহরটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। তার একদিকের অনেকটা জুড়ে ভিক্টোরিয়া হারবারের নীল জল ঘিরে আছে। দুপাশে কাউলুন আর হংকং – পুরনো আর নতুন শহর। বিশাল বিশাল আকাশছোঁয়া স্কাইস্ক্র্যাপার…
-

হোগলার বনে
শীতল বাতাসটা মাঠ থেকে এসে থেকে থেকে ঝটকা মারে। গাছের মগডালে পাখির ডাক মনটাকে উত্তুঙ্গ হাওয়ায় দোলাতে দোলাতে কোথায় যেন নিয়ে যেতে চায়। এমন সময় হারানো স্মৃতিরা ফিরে আসে। গ্রামে তাদের প্রতিপত্তি নেই বললেই চলে। পাড়ার মেয়েদের সঙ্গে হেসেখেলে বেড়ে ওঠা। স্কুলে যাওয়ার বালাই ছিল না। মায়ের জোড়াজুড়িতে পাড়ার মক্তবে আমসিপারা পড়েছে কিছুদিন। তাও বেশিদিন…
-

ডিডেলাস মিথ কিংবা অজগর বুড়ো
তিরিশটি বছর পার হয়ে গেল। তিনটি দশক! জীবনের ভেতরে আরেকটি জীবনের মতো সময়কাল। তিরিশ বছর আগে এক দগ্ধ দিনে শিকার করতে বের হয়ে খড়ম-পেয়ে বুড়োর দেখা পেয়েছিলাম। তারপর তিরিশটি বছর সেই বুড়ো আমার বুকের মধ্যে হেঁটে বেড়িয়েছে। আমার করোটির ভেতরে এঁকে দিয়েছে বিচিত্র জঙ্গম চিত্র …। … শেয়াল শিকারে বের হয়েছিলাম। গ্রামের গরিব লোকেরা পাগলা…
