ছোট গল্প

  • স্বর্ণতৃষা

    স্বর্ণতৃষা

    নাহ, এয়ারপোর্টে কোনো অসুবিধা হয়নি। যদিও ঢাকা এয়ারপোর্টে সমস্যা হতে পারে – এরকম একটা আশঙ্কা মেজর আজমত শিরওয়ানীর ছিল। তবে পাসপোর্টের তথ্যে তিনি তো কোনো ‘মেজর’ নন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাক্তন অফিসারও নন। স্রেফ ‘আজমত শিরওয়ানী’ নামে দুবাইয়ের এক ব্যবসায়ী। ফলে সমস্যা হওয়ার কথাও ছিল না। তবে ঢাকা এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে মেজর আজমত শিরওয়ানীর যে কোনো সমস্যা…

  • ভুখ

    ভুখ

    তোর বহুত ভুখ, তাই না রে বউ? জাবেদ আলি পাশে শুয়ে থাকা কমলার  তপ্ত পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো। প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না কমলা, তারপর বালিশ থেকে মাথা তুলে জাবেদ আলির মুখের দিকে তাকিয়ে আবার শুয়ে পড়লো। দুপুর পর্যন্ত চালকলে কাজ করে খুব ক্লান্ত। তার ওপর ফিরে এসে জাবেদ আলিকে গোসল করিয়ে খাইয়ে…

  • মজা নদীর মানুষ

    মজা নদীর মানুষ

    লু ঙ্গি পর্যন্ত খোলা পিঠটা চিকচিক করছে। ঘামের ওপর পড়ছে জ্যৈষ্ঠের রোদ। খালি গায়ে আছে কুদ্দুস। লুঙ্গিটা অবশ্য আঁটসাঁট করে বাঁধা। তার গিঁটের মতো কুদ্দুসের শরীরখানাতেও গিঁট পড়ে গেছে। যেভাবে নদীটা শুকিয়ে খোল পড়ে গেছে, তার শরীরটাও সেরকম একটা খোল। বিত্তির খিলের মতো হাড় বেরিয়ে এসেছে কবেই! এই হাড়গিলে শরীরটায় রোদ পড়লে বুকের বাতিগুলি স্পষ্ট…

  • শামুকখোল

    শামুকখোল

    অঘ্রান শেষে পৌষের কুয়াশার ভোর। বিলের শান্ত গভীর জলের ওপর অলস অজগরের মতো জমাট কুয়াশার চাদরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে আছে এক টুকরো রোদের আশায়। ওদিকে পুব কোণে কপট কুয়াশার আবরণ ভেঙে সূর্য উঁকি দিতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি। সেই অপেক্ষায় পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ঘোট পাকানো কুয়াশাটা হালকা হচ্ছে ধীরে ধীরে – যেন…

  • দীঘলার চরের হাহাকার

    দীঘলার চরের হাহাকার

    এম্নে চাইয়া রইছোস ক্যান? দেখতাছি তোমারে। আমারে দেহনের কিছু আছে? হ, আছে। তুমি য্যামনে ধোঁয়া ছাড়ো সোন্দর লাগে। টানবি? না। আরে টাইন্যা দ্যাখ। মনে হইবো সাম্পানে ভাসতেছোস। কী কও? রেজিয়া বেগম মিছা কতা কয় না বুজলি? আসমানের কালা মেঘরে জাদু কইরা এইটার ভেতর ভরছি। না টানলে বুজবি কেমতে কইলজার ভিত্রে মেঘের ধুমা কেমন কইরা ধাক্কা…

  • কেবলই ছবি

    কেবলই ছবি

    ল্যাম্পপোস্টের ফটকা আলোর নিচে দাঁড়ানো এক মহিলা। মাথার ওপর জন্ডিস রোগীর চোখের মতো  রাজধানীর সোডিয়াম বাতি। এসব বাতি সাধারণত সন্ধ্যাবেলায়  যেরকম ঝাপসা হলদেটে রং ছড়ায় চারপাশে, মহিলার মুখাবয়বও সেরকম ম্লান অস্পষ্ট আলোর প্রলেপে ঢাকা। কাছে এগিয়ে না এলে চটজলদি বোঝা মুশকিল মানুষ নাকি অন্যকিছু। রাস্তায় মানুষজন একেবারে হাতেগোনা। করোনা-মুখোশে সবার মুখ ঢাকা। বেশিরভাগ দোকান বন্ধ।…

  • ঘর ছাড়ার গান

    ঘর ছাড়ার গান

    কেরাসিন তো দ্যাশে মেলে না/ জামাই বিয়াই আইলে পরে/ সকাল করে খাওয়ায় তারে/ শুইতে নিয়া যায় উত্তরের ঘরে/ বলে, তাই তো, বাত্তি দিইতে পারলাম না/ কেরাসিন তো দ্যাশে মেলে না… গান গেয়ে গেয়ে বাউলের দল আসে ভিক্ষা করতে। দেশের অবস্থা খারাপ। একদিকে স্বদেশি আন্দোলন। আরেকদিকে যুদ্ধ। কেরাসিনের মতোই অনেক জিনিস উধাও হয়ে গেছে বাজার থেকে।…

  • অমানিশার কালে

    অমানিশার কালে

    হাশেম মিয়া এমনভাবে রিকশা টানছে যেন হাড্ডিসার রুগ্ণ কোনো গরু জোয়াল-কাঁধে চৈত্রের ভূমি কর্ষণ করছে। অথচ ভিআইপি এই সড়ক যেমন মসৃণ, তেমন তেলের মতো ঝাঁ-চকচকে। ইয়াসমিন উদ্বিগ্ন স্বরে বলে, ‘ও আব্বা আইজ কি তুমার শইলডা খারাপ? এবায় চালাইতেছ যে? দিরং হইব তো!’ ‘খারাপ না রে বেডি। তর ওজন বাড়তাছে মনে লয়! হা-হা-হা-হা …’ রাত বারোটা…

  • ম্যাঙ্গো কাঁকড়া

    ম্যাঙ্গো কাঁকড়া

    বিকেল পাঁচটায় ডিনারের শিফট রিসালের। মিজ রবার্টের ক্লাস শেষ হতেই সে এক দৌড়ে রাস্তায় পড়ল। লাফায়েট আর মালব্যারি ধরে সিক্সটিন্থ স্ট্রিট থেকে গ্র্যান্ড অ্যান্ড মটের কোনায় যেতে লাগে তিরিশ মিনিট। সে হেঁটেই যায়। রোজ রোজ উবারে যাতায়াত তার পক্ষে সম্ভব নয়। আর ম্যানহ্যাটনের ডাউন টাউনে বেশিরভাগ সময়েই গাড়িতে স্ট্রিটগুলির ওয়ান ওয়ের ঝক্কি, মেজাজ খারাপ করে…

  • পেয়ালা

    পেয়ালা

    ওজান এসেছিল। নিঝুমপুর স্টেশনে ট্রেনটা যখন দাঁড়াল, একে একে সবাই নেমে যাওয়ার পরে আমি নামতে গিয়ে দেখি সামনেই এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। মুখে মৃদু হাসি। ডেনিম জিন্স আর নীল রঙের পাঞ্জাবি গায়ে। ওজান আমার দিকে হাত বাড়িয়ে আছে। আমি ওর হাতের ওপর হাত রাখি। ওজান আস্তে আস্তে আমায় নিচে নামিয়ে আনল। প্ল্যাটফর্মে পা রাখলাম। নিঝুমপুর…

  • ক্যাশলেস লাইফ

    ক্যাশলেস লাইফ

    অ্যাডভান্স গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রধান কার্যালয়, যারে ব্যাপ্টাইজ করে আজকাল আবার করপোরেট অফিস বলা হয়, তাতে আমার পা পড়তেই পুরো রিসিপশন এরিয়া যেন সচলতায় পা দেয়। আগাগোড়া সবাই চঞ্চল হয়ে ওঠে। পিয়ন-দারোয়ান তো বটেই কাচের ঘেরাটোপ থেকে পুরোদস্তুর একজন রিসিপশনিস্ট, সাজেগোজে পুতুলের আদল নেওয়া চেহারার এক মেয়ে বের হয়ে আসে। একেবারে আমার কোলঘেঁষে দাঁড়ায় –…

  • কাঁথা               

    কাঁথা               

    মাঝেমাঝে মনে হয় হাওয়ায় শব্দ ওড়ে। কারা যেন গান গায়। নৌকা ভাসায়। আবছা হয়ে যাওয়া নীল জলে, ভেসে থাকা সমুদ্রের ফেনার মতো পুরনো সেসব দিন ঘুরেফিরে আসে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে নিজের ভাবীকাল, অতীত, বর্তমান একাকার করে দেখা বড় বেদনার। কেন এই জন্ম, এখানে কী পাওয়ার আছে? সব হারানোর আগে কোথায় দাঁড়াবে সে? কোন মাটিতে? তখন…