ছোট গল্প

  • সতীশবাবুর অন্তর্ধান

    সতীশবাবুর অন্তর্ধান

    আগে নাম ছিল তেঁতুলতলা। এখন হয়েছে শাপলার মোড়। শাপলার মোড় দিয়ে রিকশা এগোচ্ছে পশ্চিম দিকে। যাচ্ছি সতীশবাবুর সন্ধানে। যেখান দিয়ে রিকশা যাচ্ছে, এর আগে নাম ছিল চামড়াপট্টি। রাস্তা জুড়ে প্যাচপ্যাচে কাদা। তার ওপর পচা চামড়ার দুর্গন্ধ। নাক চেপে না ধরলে যাওয়া-আসা করা দুষ্কর ছিল। সেই আগের অবস্থা আর নেই। এখন পাকা রাস্তা। দুপাশে দোকানপাট, ছোট…

  • হাঁস

    হাঁস

    এই বিলের নাম কী, আমি জানি না। আমার একান্ত সহকারী আমাকে নামটা বলেছিলেন একটু আগে। আমি ভুলে গেছি। কারণ বিল দেখার জন্য এখানে আসিনি। এসেছি হাঁস দেখতে। অনেক হাঁস। বিলের জলে সাঁতার কাটছে। মাঝে মাঝে মাথা ডুবিয়ে খাবার খুঁজছে। মাঝে মাঝে কোনো কোনো হাঁস জলের গভীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর ছোট মাছ অথবা কাঁকড়া…

  • বাণভট্ট

    বাণভট্ট

    স্থাণ্বীশ্বর নগর । বাণভট্ট  দেখছে – শুধু চোখে-ঠোঁটে নয়, নগরের সকল অঙ্গে ছড়িয়ে আছে রেখা-রেখা আলোর হাসি। প্রশস্ত রাস্তা। মনে হয় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক মহিষের পিঠ।  বড় শোভাযাত্রা বেরিয়েছে। এতে নারীর সংখ্যাই বেশি। রাজবধূরা যাচ্ছেন দামি পালকিতে চড়ে। সঙ্গে পরিচারিকারা যাচ্ছে পায়ে হেঁটে। তাদের নূপুর ক্বণনে চারপাশ মুখর। পথ চলতে, ভুজলতা তোলার সময় মণিময়…

  • লাল টিপ ও মাতৃদুগ্ধ

    লাল টিপ ও মাতৃদুগ্ধ

    এখন বড়ো দুঃসময়! মৃত্যুর কাছে মানুষ ক্রমাগত হেরে যাচ্ছে, লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আর প্রাণবন্ত ও সাহসী মানুষেরা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। প্রাণবন্ত মানুষ চোখে পড়ে না, সবাই যেন নিস্তেজ, প্রাণহীন। এক মুহূর্তের জন্যও জীবনের ভরসা নেই, নেই বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। চারদিকে মৃত্যুদূত থাবা প্রসারিত করে আছে।  শ্রাবণের মাঝামাঝিতে পুরনো জীর্ণ-শীর্ণ ছেঁড়া কাঁথার মতো…

  • রূপ-কথা

    রূপ-কথা

    একরাশ বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে গোমড়ামুখে বৈকুণ্ঠবাবু সপরিবারে যখন শিমুলতলায় নামলেন, তখন অস্তগামী সূর্যটা স্টেশনের ধারে মস্ত ঝিলটায় ডুবসাঁতার কাটছে। ওঁর স্ত্রী সেদিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠলেন, দেখো, দেখো, জলের মধ্যে কী সুন্দর সূর্যাস্তের ছায়া পড়েছে! বৈকুণ্ঠবাবু এমনিতেই তেতে ছিলেন। একে ঘরকুনো, তার ওপর শ্রমবিমুখ এবং কৃপণ স্বভাবের মানুষ তিনি। নিজেকে বরাবর মিতব্যয়ী বলে দাবি করলেও…

  • ন্যায্য চালের হিস্যা

    ন্যায্য চালের হিস্যা

    এবার ভাদ্রের গরম এমন পড়েছে যে রাস্তার পিচ গলে যাচ্ছে। খালি পায়ে রাস্তায় পা ফেলা যায় না, তবে স্যান্ডেল ছাড়া লোকের সংখ্যাও খুব বেশি নেই শহরে। শহরের নেড়ি কুকুর এবং রনবী যাঁদের নাম দিয়েছিলেন টোকাই, তারাই একমাত্র খালি পায়ে রাস্তা দিয়ে দৌড়ে বেড়ায়। নূরবানু এতো কিছু বোঝে না, যেদিন মাদারীপুর থেকে লঞ্চে করে ঢাকা শহরে…

  • সুখ

    সুখ

    প্রতিবারের মতো এবারো ট্রেন থেকে নেমে খানিকক্ষণ দাঁড়াল রানা। ধীরপায়ে রাস্তার মোড়ের বটগাছটার কাছে এলো। পাশেই রিকশাস্ট্যান্ড। রিকশাওয়ালাগুলি যাত্রী ধরার জন্য হুটোপাটি করছে। কেউ আবার তুমুল দরদাম জুড়েছে। ওদিকে তাকিয়ে রানা মনে মনে হাসল। পুরনো স্মৃতি ডানা ঝাপটাল। স্টেশন চত্বরজুড়ে সযত্নে লালিত নানা রঙের বোগেনভেলিয়া। গন্ধ নয়, রং ছড়াচ্ছে তারা। রং দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মনের…

  • ভাত-বন্দনা

    ভাত-বন্দনা

    প্রণমিয়া পাটনী কহিছে জোড় হাতে। আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে॥ তথাস্তু বলিয়া দেবী দিলা বরদান। দুধেভাতে থাকিবেক তোমার সন্তান॥                      – ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর ভাত চিরকালই বাঙালির প্রধান খাদ্য। তাই  ‘ভেতো বাঙালি’ বলে বিশে^ আমাদের বদনাম আছে। আমরা ‘ভেতো’ বটে কিন্তু ভীতু তো নই – মহান মুক্তিযুদ্ধ সেই বদনাম ঘুচিয়েছে! নুনভাতই বলি আর পোলাও-পায়েসই বলি –…

  • রাশনা

    রাশনা

    দরজার সামনে ছায়া দেখে প্রাণ কেঁপে উঠল রেজাউরের। আবার সেই উৎপাত! আবার সেই মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছে দরজার সামনে। এমনিতে রেজাউরের নিজের শারীরিক অস্তিত্ব নিয়ে বর্তমানে টানাটানি। এ-বাড়িতে সে আশ্রিত। বা ঠিক আশ্রিত না হলেও সেই পর্যায়ে পড়ে। তার ফুপাজানের ফ্ল্যাটের একটা ছোট্ট কামরায় বইপত্র টেনে এনেছে হোস্টেল থেকে। ভার্সিটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হল থেকে…

  • ঘরের ছবি

    ঘরের ছবি

    লাল এক বালতি কাপড় নিয়ে আমলি তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। তার তুলনায় তানজুর সিঁড়িতে পা উঠছে না। তানজুদের কলেজ ছিল পাঁচতলা। হরহামেশা তিন-চারতলায় দলবেঁধে ওদের উঠতে হতো, ক্লাসে হোক কি ক্যাফেটারিয়ায় বসে আড্ডা, সবার  আগে তরতর করে সিঁড়ি ঘুরে ঘুরে উঠে যেত তানজু। মলি বলতো, তুই জিন, পরি, ওদের ঘুরে বেড়াতে পা লাগে…

  • চৈতন্যমঙ্গল

    চৈতন্যমঙ্গল

    চৈতন্যদা আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত। মাঝেমধ্যে দেখা হয়। দেখা হলেই গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে – নিজের কথা বলতে। নিজের সাফল্য, সমস্যা কিংবা পরিচিত কোনো ঘটনা। এমন নয় সে আত্মকেন্দ্রিক। আসলে কথা বলতে ভালোবাসে। যেহেতু তাঁর জগৎটা ছোট, ঘুরেফিরে তাই নিজের প্রসঙ্গ এসে যায়। নিজের সম্পর্কে তাঁর কোনো রাখঢাক নেই – সে দাম্পত্য কলহ হোক কিংবা অন্য…

  • জোছনা-প্লাবিত

    জোছনা-প্লাবিত

    মাঝে-মধ্যে ইচ্ছে হয় মাঘী-পূর্ণিমার রাতে বোধিবৃক্ষের জোছনামাখা ছায়ায় মুখোমুখি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। সে কে, যার সঙ্গে চন্দনার ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে? বয়সের এই মরা-কাটালের সময় নির্দিষ্ট করে কারো নাম এখন মুখে আনতে ভালো লাগে না। শুধু মনে হয়, কেউ একজন থাকলেই হলো। কিছুটা মানবিক বোধসম্পন্ন হলেই হলো। আহা, পাখির নামে তার নাম – চন্দনা!…