ছোট গল্প
-

ঘুমপাহাড়ের মেয়ে
ভোরে নেমেছিলাম মধুগঞ্জে। এখান থেকে মাইল দেড় অশ্রুনদী। অশ্রুনদীর ওপারে, উত্তর-পশ্চিমে একটি পাহাড় আছে। ঘুমপাহাড়। পুরাকালে পাহাড় হেঁটে বেড়াত। হাঁটতে হাঁটতে এই অশ্রুনদীর ধারে এসে দাঁড়ায়। গাঙের অশ্রুপাতে সে গাঙ পার হতে পারে না। মস্ত হাতির মতো পাহাড়েরও বুক ফাটল সেই অশ্রুধারায়। সে দাঁড়িয়েই থাকল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমপাহাড় ঘুমের ভেতরই একটু নাকি পিছিয়ে…
-

আমাদের রানি
আমার নাম বারবারা মরাল। আমি কানাডার অধিবাসী। আমার স্বামীর নাম ডক্টর রবিন মরাল। আমাদের বিবাহিত জীবন খুব সুখের ছিল। আমরা ইচ্ছে করে আমাদের বিয়ের আট বছর বাদে সংসারে প্রথম সন্তানটি এনেছিলাম। সন্তানটি ছেলে ছিল। তাই শখ করে তার নাম দিয়েছিলাম, জন। জন মরাল। ষাটের দশকে পৃথিবী যখন লোকসংখ্যার বিস্ফোরণে চিন্তিত, তখন আমরা দুজনে মনে মনে…
-

সঞ্চয়পত্রের হিসাব
নির্দিষ্ট দিনটিতে সঞ্চয়পত্রের কুপনদুটি তার বহুদিনকার পুরনো ফোল্ডার ব্যাগে কয়েকবার দেখেশুনে গুছিয়ে তবেই তাদের হাজারীবাগের বাসা থেকে পথে নামে কবীর। অন্য মাসে কুপন থাকে একটি। আর প্রতি তৃতীয় মাসে একবার তা হয় দুটি। আজ তার দুটি কুপন ভাঙানোর দিন। এই দিনে তার পকেট অন্য মাসের তুলনায় কিছুটা ভারি হয়ে যায়। সেই মাসে সে দেখেশুনে বেশি…
-

যুদ্ধশিশুর মুজিব-আকাশ
তিন দিন ধরে রায়ানের মন খুব খারাপ। স্কুলে গিয়েও মন খারাপ থাকে। ক্লাসে মন বসাতে পারে না। ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলা হয় না। ভাবে, ওর জীবনের গল্পটা ওদেরকে শোনানো দরকার। এখন চুপচাপ থাকাই ভালো। কিন্তু বাড়িতে আসার পরে দিনের বাকি সময় মনে হয় দাউদাউ পুড়ছে। কখনো দু-হাতে চোখের পানি মোছে। চোখের পানি লুকিয়ে…
-

পোট্রেটটা তোমার কাছে থাক
অপূর্ব, কেমন আছ? ফোনে কথাটা শুনে সে চমকে ওঠে। এই টোনে এই ঢংয়ে তাকে মাত্র দুজন ডাকত। এক. সাহিত্যিক আতিউর, দুই. মানসী। আতিউর সাহেবের বাড়ি কুষ্টিয়া। চোস্ত বাংলা বলতেন। তার মধ্যেও একটা শান্তিপুরি টান ছিল। তিনি মারা গেছেন তিন-চার বছর। তাহলে বাকি থাকে মানসী। কিন্তু কণ্ঠটা মেয়েলি নয়। পুরুষঘেঁষা। এটাই অপূর্বর সামনে দ্বিধা তৈরি করে।…
-

পুনরুদ্ধার
প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে মানস। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াচ্ছে। পালাচ্ছে সে আগুন দেখে, মালিবাগের অগ্নিদগ্ধ বাড়ি দেখে, জগন্নাথ হলের আগুনে পোড়া লাশ দেখে। দাউদাউ করে জ্বলছে নিজের জামা, মাথার চুল, গায়ের চামড়া। চিৎকার করে বলতে চাইছে, আমি তোমাদের লোক, এই পাড়া আমার, এই শহর আমার। আগুনঝরা ওই কৃষ্ণচূড়া গাছ, সেটিও আমার। আমাকে কেন তোমরা মারতে চাইছ? গলা…
-

হলুদ কুকুর
উর্দু থেকে অনুবাদ : সালেহ ফুয়াদ শেয়ালছানার মতো একটি বস্তু তার মুখ থেকে পড়ে যায়। সে সেটির দিকে তাকায়। এরপর পায়ের নিচে ফেলে মর্দন করতে থাকে। কিন্তু যতই মর্দন করে বস্তুটি ততই বড় হতে থাকে। যখন শায়খ এ-ঘটনা বর্ণনা করা শেষ করলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম, শায়খ, শেয়ালের বাচ্চার রহস্যটা কী, মর্দন করায় বড় হওয়ার মধ্যে…
-

গৃহযুদ্ধের বিবরণ
হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো। দেখা গেল বৃষ্টির বেগ দক্ষিণ থেকে ক্রমশ তেড়ে আসছে। নদীর জলও ভয়ানক কাদাগোলা হয়ে উঠেছিল, আর পারের ওপর আছড়েপড়া ঢেউয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল শ্মশান চত্বর বা আরো দূর থেকে। সকাল থেকে নদীর চরে কাঁটাঝোপের পাশে ২০-৩০টি কুকুর জড়ো হয়েছে। বৃষ্টি নামলেও ওরা পালিয়ে গেল না। জোয়ারের জল উঠে আসছিল বলে চরেও…
-

গুজবের গ্যাঁড়া
ও তমিরের বাপ, শুনিজেন, কী সব্বনাশে কদাগো। তুমি না হয় যাইও না। ছাতার মাথায় বাঁধা বোচকাটা রমজান ফকির কাঁধে তুলেছে মাত্র। এমন সময় পেছন থেকে বাধা পড়ল। তাকে আর থামায় কে। মুখ তো মুখ নয়, দুধারী করাত। রাগলে তার মুখে ভালো কথা কেউ শোনেনি কোনোদিন। নাম রমজান হলে কী হবে, তাকে রোজা করতে কেউ দেখেছে…
-

কায়েম মোল্লার ঘর
ফরসা সেই ম্যাডামের গায়ে বাবলার ডাল আটকে গিয়েছিল। আর এই শাড়ি বা কাপড়ে আটকে যাওয়া বাবলার ডাল ছাড়ানোর ব্যাপারটা তো আর একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হবে না! আটকে যাওয়া টের পেতেই তুমি ভাবলে, এ আর কী, একটু টানলেই …। তাঁর চারপাশে তখন বডিগার্ড, অফিসার, নেতা এঁরা কেউই নিশ্চিত শুরুতে বুঝতে পারেনি ব্যাপারটা আর যেমন হয়,…
-

অন্ধ্রের অপ্সরা
ভাদ্রের আকাশ। ভিক্টোরিয়ার মাথায় মেঘের ছায়া। আকাশ ঘোলাটে। শরৎ নির্বাসনে। পাঁচজনের দলে ফজল টিকিট কাউন্টার থেকে অনেকটা পেছনে। পথনির্দেশক মানিক সর্বাগ্রে। প্রহরায় পুরুষকর্মীর মধ্যে একজন যুবতী। একহারা চেহারা। হালকা খয়েরি ইউনিফর্মে বেশ সপ্রতিভ। টেপাপুতুলের অবয়ব। যৌবনের শ্রীশোভিত। ফজলের কানে আসছে … টিকিটমূল্যের দস্তুর। সঙ্গে চারজন বাংলাদেশি … একশ টাকা … পার হেড … ফজল মেয়েটির…
-

ছবি
দু-গদ্দনের ফাংড়ি গাছটার মগডালটা সরু গলা বাড়িয়ে নীল-সাদা রং চাপা দেয়ালটার যে-জায়গাটা ছুঁয়ে সটান উঠে গেছে, সেখানে আগে থেকেই খাড়া করা আছে ঘাড় টান করা একটা ঝলমলে ছবি। নীল পাড় ধবধবে সাদা রঙের শাড়ির ছবিটার চোখ নাক ঠোঁট চুঁইয়ে নামছে গালভরা হাসি। ছবিটি আড়েবহরে এত্ত বড় যে, সরকারি বিল্ডিংটার আধখানা দেয়াল ঢেকে আছে! ঠিক তার…
