শ্রদ্ধান্জলি
-

আমাদের একাত্তর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আনিস স্যারের সান্নিধ্যে
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে অর্থাৎ ১৯৫০-এর দশকে বাংলাদেশে যে-রেনেসাঁস বা নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল, সেই রেনেসাঁসের অগ্রণী পুরুষরা ছিলেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. কাজী মোতাহের হোসেন, ড. এনামুল হক, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, আবুল ফজল, সরদার ফজলুল করিম, আব্দুর রাজ্জাক, বদরুদ্দীন উমর, রেহমান সোবহান, ড. মাহমুদ, শওকত ওসমান প্রমুখ। পঞ্চাশের দশকেই এই অগ্রণী চিন্তানায়কদের সঙ্গে…
-

আনিসভাই
আনিসভাই, সারা পৃথিবীর বাঙালি এবং বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুরাগীদের কাছে অতি শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, গত ১৪ মে (২০২০) প্রয়াত হয়েছেন। সব মৃত্যুই মানুষের মৃত্যু, প্রিয়জনদের কাছে এক বিপুল বেদনাময় শূন্যতা, এবং মৃত্যু ক্ষুদ্রমহতের বাছবিচার করে না; তবু ভাবতে খারাপ লাগে যে, বিশ্বব্যাপী করোনার অতিমারি বাঙালির এই মহিমাপূর্ণ অভিভাবককেও তুলে নিল, তাঁকেও রেহাই দিলো না। পৃথিবীর অনেক…
-

এক ও অদ্বিতীয় আনিসুজ্জামান
বলতে পারি না, আমি কখনো তাঁর ঘনিষ্ঠ ছিলাম। গত দু-বছরে দেখা হয়নি একবারও। মফস্বলে থাকি। ঢাকা যাইনি অনেকদিন। এক সাহিত্য-সংস্কৃতি মেলায় তিনিই এখানে এসেছিলেন। তারপর আর না। ফোনালাপও নয়। সংকোচ ছিল আমারই। অকারণে তাঁকে বিরক্ত করা – মন চায়নি। তাছাড়া তাঁর শরীরের অবস্থা! সাবধান হতে হয় বইকি। তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান – আমাদের সবার…
-

আমার বন্ধু ও সহকর্মী আনিসুজ্জামান স্মরণে
প্রফেসর আনিসুজ্জামান আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও সহকর্মী ছিলেন। তিনি আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি, সমাজ ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ছিলেন একটি আলোকবর্তিকার মতো এবং একটি অবিস্মরণীয় নাম। তাই আজ অত্যন্ত দুঃখ-ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁকে স্মরণ করছি। অতি অল্পদিনের ব্যবধানে চলে গেলেন আমাদের সমাজের গর্বের মানুষ বেশ কয়েকজন – স্যার ফজলে হাসান আবেদ, ভাষাসৈনিক ও বাংলাদেশের প্রথম নারী জাতীয় অধ্যাপক ডা.…
-

আনিসুজ্জামান স্মরণ
আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় শিকাগোর ইন্টারন্যাশনাল হাউজে, ১৯৬৫-তে। আমার বন্ধু কে.এল. কৃষ্ণ তখন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পিএইচ.ডি করছেন; আমি ব্লুমিংটন, ইন্ডিয়ানা থেকে তাঁর কাছে বেড়াতে এসেছি। আনিসুজ্জামান ‘দক্ষিণ-এশীয় ভাষা ও সভ্যতা’ বিভাগে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো। কৃষ্ণই বোধহয় আলাপ করিয়ে দিলেন। ঢাকার মানুষ। নম্র। তাঁর বিদ্যাবত্তার কথা তখন কিছুই জানি না। কিন্তু পরে যখন ১৯৭০-এ…
-

তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা একুশের উত্তাল সময়ে
তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা একুশের উত্তাল দিনগুলোর মধ্যে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল তথা ‘মেডিক্যাল ব্যারাক’ প্রাঙ্গণে – ১২ নম্বর ব্যারাকের সামনে দাঁড়ানো দুই ভাষা-আন্দোলনকর্মী – আনিসুজ্জামান ও আহমদ হোসেন। ওঁরা দুই বন্ধু, জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। হালকা ও পাতলা, দীর্ঘকায় গড়নের তরুণ আনিসুজ্জামানের সঙ্গে সে-পরিচয় পরবর্তীকালের খ্যাতিমান, জাতীয় অধ্যাপক, সুসাহিত্যিক ও গবেষক, স্বল্পভাষী, কিছুটা গম্ভীর, রসবোধসম্পন্ন…
-

নীরবে নিঃশব্দে ইন্দ্রপতন
মাত্র কয়েকদিন আগে আনিসুজ্জামান আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন। আমি এই লেখায় আনিসুজ্জামান – এই নামটিই শুধু লিখতে চাই। কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই। তিনি নিজে ‘আনিসুজ্জামান’ লিখতেন, আগে কিংবা পরে কোনো উপাধি বা বংশপরিচয় উল্লেখ করতেন না। প্রথম জীবনে হয়তো স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচলিত চল হিসেবে এসব উল্লেখ করতেই হতো; কিন্তু কর্মজীবনে এসে সব উপাধিই…
-

বিদায়, প্রিয় রাজপুত্র
অনুবাদ : আশফাক স্বপন আনিসুজ্জামানের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের যে-প্রজন্ম জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে অংশ নিয়েছিল, তার মূল্যবোধকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছিল, সেটি আরো একজন সহযোদ্ধা ও আপনজন হারাল। আমাদের স্বাধীনতার চারটি মূল স্তম্ভ – গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা আর সমাজতন্ত্র – আনিসের মতো আর কেউ অমন অনড় দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রহণ করেছে, এবং নিজেই তার প্রতীক হয়ে উঠেছে, তেমন…
-

আনিসদা
আনিসদার চলে যাওয়ার খবর পেলাম বিকেলবেলায়। আমার তিনতলার ঘরের জানলায় বসে মরা রোদ দেখছিলাম, ঢাকা থেকে ফোন এল, আনিসদা নেই। তিনি খুব অসুস্থ, হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন চিকিৎসকরা, এই খবর আগেই পেয়েছিলাম। স্বীকার করছি, আমি বিচলিত হইনি। কারণ আমি জানতাম, এটা আর একটা প্রবল ঢেউ; কিন্তু আনিসদা যা সহজেই পার হয়ে এসে দেখা হলে…
-

আনিসুজ্জামানের চিন্তাধারার বিষয়-আশয়
আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০২০) ছিলেন সংস্কৃতি ও ইতিহাস-সচেতন লেখক-গবেষক-শিক্ষক ও মানবাধিকারমনস্ক চিন্তাবিদ। ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সদালাপী, সজ্জন ও রুচিমান ভদ্রলোক। ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার জন্যে এরচেয়ে বেশি গুণাবলি আর কী থাকতে পারে! এইসব বিষয় নিয়ে বিশদভাবে লিখতে গেলে একখানি বড়োসড়ো জীবনীগ্রন্থই লেখা প্রয়োজন। কিন্তু সদ্যপ্রয়াত হলেন তিনি, এখনো শোকজনিত আবেগ ও কাতরতামুক্ত মানসিক স্থৈর্য আমাদের অনায়ত্ত।…
-
মহাপ্রস্থান
সরস্বতীর বরপুত্রেরা বিদায় নেবার আগে ভাবতে বসেন শেষযাত্রায় কারা তাদের দেহ বহন করবে। সহসা দেখি আনিসুজ্জামান এভাবেই উপযুক্ত শ্মশানযাত্রীদের অপেক্ষায় নির্নিমেষ তাকিয়ে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাশফুলের প্রহর এলেই আমার দিকে সুস্মিত তাকিয়ে চলে গেলেন আমার বন্ধু অ্যাকাডেমিক অনুসন্ধিৎসায়।
-

একজন সম্পূর্ণ মানুষ
দেখতে দেখতে তাঁর মহাপ্রস্থানের দু-মাস পার হয়ে গেল। পরিবারের কয়েকজন ছাড়া তাঁকে সমাধিস্থ করার সময় তেমন কেউ ছিল না। টিভির পর্দায় দেখা গেছে সে-দৃশ্য; কেন যেন বাস্তব মনে হয়নি! বারবার মনে হয়, একটি সুশ্রী পাঞ্জাবি আর চওড়া পাজামা পরে স্মিত হেসে এখনই সামনে এসে দাঁড়াবেন, বলবেন, তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি। কিন্তু দিন যাবে, মাস যাবে,…
