শ্রদ্ধান্জলি
-
আনন্দ বাগচী : ‘শেষ ইস্টিশান ছুঁয়ে যায়’
সৌভিক রেজা আনন্দ বাগচী (১৯৩৩-২০১২); বিস্মৃতিতে তলিয়ে-যাওয়া একজন কবির নাম। অথচ নিজের যৌবনের শুরুতে যিনি ছিলেন পঞ্চাশের দশকের উজ্জ্বলতম কবিদের একজন। কবি-সম্পাদক সুশীল রায়ের (১৯১৫-৮৫) ভাষায় : ‘স্বগত-সন্ধ্যা যখন বের হয় তখন আনন্দ বাগচী অসাধারণ খ্যাতি লাভ করেছিলেন। যে-কোনো সাহিত্যসভায় বা কবিসম্মেলনে যে-নাম নিয়ে সব-প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি আলোচনা হত।’ আর যে-কৃত্তিবাস (১৯৫৩) পত্রিকা, যা…
-
এক কিশোরের হুমায়ূন
মন্ময় জাফর হুমায়ূন আহমেদ পড়তে শুরু করেছিলাম ঠিক সে-বয়সেই, যখন বাঙালি কিশোর পড়ে শরৎচন্দ্র। শরৎচন্দ্রও পড়েছিলাম, সেইসঙ্গে বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ। আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টিতে এমন প্রাদুর্ভাব ছিল না টেলিভিশনের। বিবিধ দেশি-বিদেশি চ্যানেলের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্ত বয়ঃসন্ধিক্ষণের আমরা সুখ খুঁজে নিতাম ক্রিকেটে, বন্ধুবাৎসল্যে কিংবা বইয়ের জগতে। বরাবরের পড়–য়া চৌদ্দ বছরের নবীন কিশোর সেই…
-
আগুনের পরশমণি : এক চলচ্চিত্রকারের আবির্ভাব
শাকুর মজিদ ১৯৯২ সালে আমি বুয়েটের ফিফথ ইয়ারে উঠেছি। সিনেমা দেখা কমিয়ে দিয়েছি, ভালো লাগে না। একসময় সিনেমা দেখে যখন রিভিউ লেখা আমার প্রায় চাকরি ছিল, মূলত তখন থেকেই সিনেমা দেখার প্রতি আগ্রহ কমে যায়। একবার কাগজে দেখলাম শঙ্খনীল কারাগার নিয়ে ছবি বানানো হয়েছে। এটা মুক্তি পেয়েছে বলাকার ছোটভাই বিনাকা হলে। আমার রুমমেট আখতার। তাঁকে…
-
কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু
মাজহারুল ইসলাম চেয়ার টেনে নিয়ে তাতে দুপা তুলে একান্ত নিজস্ব এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে বসলেন তিনি। পাশের চেয়ারগুলোতে আমাদের বসতে বললেন। তারপর একের পর এক প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। ‘টিভি নাটকের ক্ষেত্রে আপনি যতটা আগ্রহী, সে-তুলনায় মঞ্চের ব্যাপারে আপনার আগ্রহ কম। এর কারণ কী?’ উত্তরে জানান, ‘একটি হিসাব দেখলেই বোধহয় পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের দেশে…
-
গল্পকথার জাদুকর ও তাঁর মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস
আহমেদ মাওলা চলে গেলেন বাংলা কথাসাহিত্যের জীবন্ত কিংবদন্তি, গল্পকথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২)। কোটি পাঠক ও ভক্তের চোখ আজ অশ্র“সজল, শোকে মুহ্যমান বাংলার শ্যামল প্রান্তর। বেদনায় শ্রাবণের আকাশ যেন কান্নায় ভেঙে পড়লো বৃষ্টিতে। বৃষ্টি তিনি খুব ভালোবাসতেন। লিখেছেন বৃষ্টিবিলাস উপন্যাস। নুহাশ পল্লীর একটি ঘরের নামও রেখেছেন ‘বৃষ্টিবিলাস’। যদিও নিউইয়র্কের আকাশে ১৯ জুলাই ছিল ঝকঝকে রোদ।…
-
নন্দিত নরকের কথাকার
শচীন দাশ চলে গেলেন বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা জনপ্রিয় কথাকার হুমায়ূন আহমেদ। কিছুদিন ধরেই কোলনের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। চিকিৎসার জন্য উড়েও গিয়েছিলেন আমেরিকা। কিন্তু শেষরক্ষা আর হলো না। চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে প্রায় বছরখানেক নিজের সঙ্গে লড়াই চালাতে চালাতে অবশেষে গত জুলাইয়ে তিনি প্রয়াত হন। তাঁর বয়স হয়েছিল চৌষট্টি। হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩…
-
একজন হুমায়ূন ও কথার শৈল্পিক চর্চা
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে নিজের কাছে সর্বতোই রেখেছেন; আবার যেন কিছুই রাখেননি। নিজেকে নিয়ে তেমন কথা তাঁর নেই। এই জনপদের এমন বাঙালি মধ্যবিত্ত পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনো না কোনো হুমায়ূন নেই। মাল্টিকালার হুমায়ূনের দেখা পাই আমরা। তিনি যে সাহিত্যের সেই কৌশলী কূটনীতিক, যেখানে তিনি প্রায় বাস্তবত সলাজ-নির্বাক থাকেন, আর তাঁকে নিয়ে তাঁর…
-
হুমায়ূন : এক আশ্চর্য প্রতিভার গল্
আনিসুল হক হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দুজন লেখকের নাম পাড়ব। একজন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আরেকজন সতীনাথ ভাদুড়ী। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও হুমায়ূন আহমেদ দুজনেরই অতি অল্প বয়সের লেখা আশ্চর্য পরিমিত ও পরিণত। এরকম উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে এবং বাংলা সাহিত্যে নিশ্চয়ই আরো পাওয়া যাবে, কিন্তু আমি হুমায়ূন আহমেদের সহজাত প্রতিভার কথা বলতে গিয়ে মানিককেই বেছে নিচ্ছি। মানিক…
-
জ্যোৎস্না, বৃষ্টি আর অন্ধকারের গল্প
পূরবী বসু ‘স্মৃতি সে সুখের-ই হোক আর বেদনার-ই হোক, সব সময়েই করুণ।’ হুমায়ূন আহমেদ (নন্দিত নরকে, ১৩৭৯, পৃ ৭১) প্রকৃতির কাছাকাছি যেতে এবং থাকতে হুমায়ূন আহমেদের প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। তাই নানান রকম গাছগাছালি, ফুলপাতা যেমন পছন্দ ছিল তার, তেমনি ভীষণভাবে তার পছন্দের ছিল জ্যোৎøা আর বৃষ্টি। গত জানুয়ারিতে দেশে যাওয়ার সময়, হুমায়ূন বিশেষভাবে বলে দিয়েছিল…
-
জর্জদার সেঞ্চুরি
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য রবীন্দ্রনাথের সার্ধশতবর্ষের উদ্যাপনে বাঙালি কেমন করেই জানি ভুলে রইল যে, এ-বছরটায় ১৫০তম জন্মদিন বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়েরও। এই বাইশে শ্রাবণে কবির সপ্ততিতম মৃত্যুবার্ষিকীও স্মরণ করল বাঙালি; কিন্তু এখনো কীরকম সে ভুলে থাকছে ৬ ভাদ্র তারিখটা (ব্রাহ্ম সমাজের পত্তনের তারিখও এটা), যেদিন এ-বছর শতবর্ষে পা দিচ্ছেন কবির গানের সেই যুগন্ধর শিল্পীটি – দেবব্রত বিশ্বাস।…
-
মৃত্যুই শেষ কথা নয়
সমরেশ মজুমদার আজ দুপুরে ঢাকায় এসেছি। প্রতিবারের মতো ঢাকা ক্লাবে স্থিতু হয়ে মুঠোযন্ত্রটা তুলে নাম্বার টিপতে গিয়েই শক্ত হলাম। না। এই নাম্বার টিপলে মুঠোযন্ত্র আমাকে সেইখানে কথা বলাতে পারবে না যেখানে হুমায়ূন আহমেদ এখন থাকতে পারেন। সাতাশি সালে পরিচয়। ঘনিষ্ঠতা বিরানব্বই থেকে। এর মধ্যে যতবার এসেছি, এসেই ফোন করেছি। সে উচ্ছ্বসিত গলায় বলেছে, ‘আরে সমরেশদা,…

