কবিতা
-
কফিনের নীরবতা
কফিন – শব্দহীনতার চাদর মুড়ে পোশাক চেটে খায় বিষাক্ত অমাবস্যা। আলোর শ্বাস নেই। কারাগারের শিলালিপিতে জমে থাকা কান্নার মতো বয়ে চলে একটি নদী – স্রোতহীন, স্মৃতিবহ। ধূসর ছায়া ঘষে ঘষে ঘুম পাড়ায় অতীত। মৃত বিবেক ধরে রাখা তামাটে এক দেহ – হেঁটে চলে দোদুল্যমান গুমোট কফিন হয়ে। তারপর – বুক চিরে উঠে আসে একটি পলেস্তারা-মাখানো…
-
শুধু মুখেই বলেন
আপনি শুধু মুখেই বলেন বৃষ্টি এলেই ভিজবেন হিজল, জারুল, সোনালু, কৃষ্ণচূড়ার সাথে সবুজ মাঠ, বৃষ্টি জমা জল, গোড়ালি ডুবিয়ে প্রিয় উপন্যাসের নায়িকা যেন – ভিজবেন, মন উড়িয়ে। সারাটা দুপুর, সারাটা বিকেল, সন্ধ্যা – রাতভর ভিজলো একটা শহর ওই দূর কোনো গ্রামের একলা একা তালগাছটার মতন আপনি শুধু মুখেই বলেন বৃষ্টি এলেই ভিজবেন…
-
আত্মজা
কাঠগোলাপের শুভ্র উচ্ছ্বাসে নিজেকে ছড়িয়ে দাও। দীর্ঘশ^াস, সংকট, জরাজীর্ণ ব্যথা শূন্যে উড়িয়ে দাও। তুমি বেরিয়ে এসো বন্ধনমুক্ত বিহঙ্গের পাখায় ভর করে। পাণিতে সন্ধ্যাবাতি আলোকবর্তিকাসম, দেখাও পথ আঁধারে ঢেকে যাওয়া গ্রহটিকে। দেহসৌষ্ঠবে বুনোফুলের সৌরভ, কণ্ঠে বজ্রনিনাদ, বেজে যাক রণতূর্য, আহবের ডঙ্কাধ্বনি ছড়িয়ে পড়ুক দিকে-দিকে। ঘুঙুরে, চুড়িতে, অলংকারে, আভরণে প্রতিধ্বনিত হোক প্রতিবাদ। অন্যায়, বৈষম্য, লাঞ্ছনার আবেষ্টনী ছত্রখান…
-
কতিপয় চিত্রকল্প
হঠাৎ উঠেছে ঝোড়ো তাণ্ডব! উথলে উঠলো সমুদ্রে জল, ভয়াবহ কল্লোল! একটি জাহাজ দুলছে প্রবল ঝড়ে বিপজ্জনক এমন ঝড়ের ক্রোধে কেঁপে ওঠে পাহাড় ও সমতল! জ্যোৎস্নায় জ্বলে কী যে লেলিহান! ভয়ে থেমে গেছে রাত্রির ঝিঁঝিপোকাদেরও গুঞ্জন! রাত্রির গাঢ় নৈঃশব্দ্য ছিঁড়ে ফালিফালি করছে সাগর! অন্ধ রাত্রি! আকাশে তীব্র বিদ্যুৎশিখা! ঢেউয়ের ওপর ঝলসে উঠছে আগুনের ক্রোধ বিশাল তিমির…
-
কবিতার জন্য
আত্মহননের জন্য একটি কবিতা হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে অরণ্যের অগ্নিকুণ্ডলীতে সাক্ষী এই বনভূমি আর তার শোকার্ত প্রকৃতি। হায়! হায়! করে উঠল সারি সারি বৃক্ষ আর লতাগুল্ম দোলানো বাতাস বাঁচানো গেল না সেই অভিমানী কিশোরী কবিতা। কেঁদে উঠলো পশুপাখি বনের যত বাসিন্দা! সীমাহীন সবুজের মর্মমূলে কে জ্বেলেছে এই ভয়াল আগুন? প্রশ্নে নিরুত্তর যখন সভ্যতা তখন কী করে…
-
বেহুলা বাংলা : সনেট
তোমার মন্দিরের বাহির দুয়ারে দাঁড়িয়ে রয়েছি এক কোণে হয়তো একদিন ডেকে নেবে তুমি সেই আশা নিয়ে মনে কত ভক্ত কত ভণ্ড কত না বাজারি ব্যবসায়ী সন্ন্যাসী আমি ছাড়া ঢোকে ভেতরে সবাই যদিও দৈনিক আসি কত কোলাহল কত ধূপধুনো কত না কান্নার রোল কখনো বা বাজে মহাহট্টগোলে ঢাকের নানান বোল এত মানুষের এত প্রেম বাণী কান…
-
আমি চলে যাচ্ছি
অনাগত কবিতাগুলির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি তাদের লিখতে পারলাম না বলে। না-দেখা স্বপ্নগুলির কাছে আমার দুঃখ প্রকাশ এই ভাবে তাদের দেখতে পারলাম না আমি। তারা থাক গোলাপ কলির কাছে মেঠোপথের সুরের বাঁকে পাখিদের ঝাঁকে ঝাঁকে চাঁদ সূর্যের বুনে যাওয়া কিরণ কলমের আঁকে। এখনো অনেক পথ ছিল যাওয়ার ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি পথগুলির কাছে যেতে পারলাম না…
-
চাঁদ ও শূন্যতা
এই হাত, এই মুখমণ্ডল, দেখার চোখ সব একই রকম! শুধু বোধের দরোজা দৃষ্টিসীমানা থেকে সরে যেতে যেতে আলোহীন অন্ধকারে ভ্রমণের নেশায় মরে যেতে থাকে। মানুষকে কী নামে ডাকা যায়? কোনো ঋতুই এখন পক্ষে থাকে না মানুষের! সব ঋতুতেই সমান বিপদ! বরফ ও মেঘের কাছাকাছি গেলেও রক্তাক্ত হতে থাকে হৃদয়, আলোর বল! তাহলে কোনদিকে গেলে বিপদ…
-
হেমকুড়া, একটি হারানো নদী
এখানে একদা এক নদীর জীবন ছিল প্রিয় নাম, হেমকুড়া! সরলা মাতৃময়ী বুকে তার জমা রেখে আমার শৈশব প্রগতি বিশে^র পথে কত ক্রোশ পেরিয়ে এলাম!… শিকড় উপড়ে নিয়ে শহরে এসেছি যেদিন মনে পড়ে পোড়া ডিজেলের ভুরভুর গন্ধ এসে বিঁধেছিল নাকে এখন নিঃসাড় চেতনা যাপনের নষ্ট অভ্যাসে প্রতিবাদহীন সেই থেকে ত্রিসন্ধ্যা সয়েছি পতন দূষণের নিত্য…
-
স্নানবিহীন
লাঙল আর বলদের ছায়া খেয়ে খেয়ে জীবন যায় কৃষকের, পৃথিবীর উৎকণ্ঠিত ভিড়ে কৃষক নেই – কৃষক জানে চাষবাসের কেরামতি। কৃষক জানে শস্য ও ফলনের খবরাখবর। সহিষ্ণু নিভৃতে থাকে কৃষক এক-একজন কৃষক এক-একজন নীরব লোক – শস্যক্ষেত্রের পরমাত্মীয়। বিলের আলাপি জলের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মৎস্যশিকার করে যেজন – একদিন এই মৎস্যশিকারি হয়ে যায় বালুঘড়ি; হয়ে…
-
বৃষ্টিসূত্রে রচিত পঙ্ক্তিমালা
বৃষ্টি এলে মন-ময়ূরের পাখা নাচে গমকে গমকে বৃষ্টিসূত্রে তাকে তুলে নিই বুকে! বিজন সৈকতে ডাকে বুঝি চোরাবালি! ঘোরলাগা ঝাউবনও উসকে দেয় স্মৃতি; সবুজ পাহাড়গুলি যেন ভ্রমণের নিত্য প্রণোদনা – ফেরি করে রাশিরাশি মেঘের ঘুঙুর; পায়ে বাজে তারামাছ, শামুক ঝিনুক আর রোদেপোড়া মীনের মেয়েরা; কী নাম দেবে গো তার? সুস্বাদু শুঁটকি? প্রোটিনের গল্পে কাঁদে ব্যক্তিগত মৎস্য-সমাচার!…
-
উদ্বোধক
অরো এই মুহূর্তে ভীষণ ব্যস্ত তুমি উড়াচ্ছো আমন ধান কুলার বাতাসে উড়ে যাচ্ছে চিটে এই দৃশ্য যেন ফিলিস্তিনেই দেখা যায়! গাদা সাদা নুড়িপাথরের কণার মতোই তোমার নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম কাকে উদ্দেশ করে ছুড়ছো পাথর? তুমি ভীষণই ব্যস্ত এই দৃশ্য দেখতে দেখতে আমিও মহা হুলস্থূল!
