কবিতা
-
ঠিকানা
বাউলের আখড়া থেকে গুটিগুটি পায়ে হেঁটে এসে, মৃত্যুকে খোঁয়াড়ে বন্দি করে, যে-শিশু নাচছে আগুনলাগা গাছে, তার ঠিকানা জানে না এ তল্লাটের বাসিন্দারা … একটা পাখি তার নাম ধরে ডাকতেই, আজব শব্দের ডানায় চড়ে উচ্চারিত শব্দরা মিলিয়ে গেল আগুনের মেঘে; পোড়া গাছের ছাইগাদায় তলিয়ে গেল আস্ত গ্রাম; শিশুটি পাখির পালকে মুখ লুকিয়ে হেসে উঠতেই, সবুজে ছেয়ে…
-
গ্রীষ্মকে মনে আছে খুব
কেউ হেঁটে গেলে স্মৃতি তার পিছু পিছু হাঁটে কৃষ্ণচূড়ার দিন, বসন্তের হাওয়ায় ভেসে যাওয়া স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে স্মৃতি ছাড়া ঘুমাতে যায় কে? গ্রীষ্মকে মনে আছে খুব – কাঁঠালের ঘ্রাণের মতো অথবা সেসব সকালের তাণ্ডবের মতো যে-সকাল ইতিহাস হয়ে আছে আমার জীবনের পাতায় বোশেখের শেষের দিনগুলো – আমার ছায়া লেপটে আছে শরীরে ও মনে কত…
-
শিকড়নামা
একটি পুরনো গাছের শিকড় ধরেই আমাদের আগমন; গাছটি শেখালো কীভাবে বাঁচতে হয়। যখন আমরা বাঁচতে শুরু করলাম গাছটির জন্য হৃদয়ে মায়া জন্মালাম গাছটির তখন অজস্র অদৃশ্য পাখা হলো, উড়াল দিলো সপ্তম আসমানের দিকে। গাছটির জন্য আমরা কাঁদতে শুরু করলাম, আমাদের শোকের শিওরে খালি পাতিল আগুনহীন চুলা, শূন্য ঘর – ঘ্রাণ ও ভাঙা বাঁশি করুণ সুরে…
-
চাঁদ ভেঙে চুরমার
ঘুম থেকে আমার অশান্ত দুই চোখে রাজ্যের ঘুম নামুক, ঘুম হোক; ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের ভেতর আমি উঠে বসি, হাঁটতে থাকি তারপর প্রান্তরের ভেতর দৌড়াতে দৌড়াতে অসীমের কাছাকাছি এসে দেখি : তুমি আকাশে চাঁদের দেশে স্বপ্নের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে আরো দূরে আরো দূরে কোথায় যে হারিয়ে যাচ্ছ জানি না – যেখানেই যাও আমাকেও নিয়ে যাও…
-
পেছনে না-তাকানোই ভালো
পেছনে না-তাকানোই ভালো, পেছনে মজা-দিঘি, কাঁটা ঝোপঝাড় সাপখোপ, পেছনে ধুলোভরা পথ এসেছি পেরিয়ে, পেছনে মানুষেরা সব রংবাজ, ক্লাউন! তারা নিষ্প্রাণ পাথর, তাদের প্রতিহিংসায় ক্রমাগত রক্তাক্ত হয়েছি! পেছনে চাঁদের আলো কুয়াশায় ঢাকা, দেখা যায় না আকাশ – ফেটে পড়ে বজ্রঝড়! অন্ধকারে গর্জায় সাগরের ফেনিল জলরাশি! পেছনে রক্তচক্ষু পলিফেমাস সব দুর্দান্ত ভয়ংকর! এদিকে এখন নতুন খেলা, শব্দভেদী…
-
কবিতা-কোলাজ
(শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের জন্য) পড়ো, কবিতা-কোলাজ। বোধের সাক্ষাৎকার নিচ্ছে রাত্রিদিন। সুগন্ধী আঠাদের বন্ধনরীতি বহুমাত্রিক। দৃশ্যেরা নগ্ন। ধাতুগুচ্ছ নীরব আর কথা বলা অনন্ত তিমির। শাদাকবিতা : সূর্যালোকেও কুয়াশা তোমার জানালায়, লালের কোলাজ : অন্য এক আলোর খোঁজে ক’জন পড়ছে মাও সে তুং, নীলকবিতা : বেদনাবাহিত ঝরনা। পদাবলিপাড়ে আসে না সমদর্শিতা। হাত কুড়ায় অপস্রিয়মাণের বর্ণনা। হলুদকবিতা :…
-
মশা ও মশারি
মটকা, সিন্দুক ও ড্রয়ার থেকে যে-মশারি টেনে আনো না কেন? সেই মশারি কি ছেঁড়া ও ফুটা? দেখে নাও! মশারির চারধার ভালোমতো গুছিয়ে গুঁজিয়ে দাও, না হলে মশা মশাই হয়ে মশারিতে ঢুকে পড়বে! যে-পোশাক পরেই ঘুমাও না কেন? মশা কামড়াবেই! যে-কক্ষেই থাকো না কেন? মশা কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না! একা শোও কিংবা প্রিয়জনের…
-
ইচ্ছা
খুব দ্রুত ভুলে যেতে হবে সব। খুব দ্রুত ভুলে যেতে হবে এই চিরচেনা পথ। এই আবীর মাখানো স্বপ্ন স্বপ্ন দিন। এই রাতভর জেগে থাকা। এই বইয়ের পাতায় ছড়িয়ে থাকা ঝকমকে বুকের কাঁপন। ভুলে যেতে হবে কোকিলের ডাক শুনে জানালায় উঁকি দেওয়া ভোর। ভুলে যেতে হবে নীল শাড়ি পরা মেয়েটির দেওয়া অকারণ প্রতিশ্রুতিগুলো। কে কাকে প্রশ্রয়…
-
সুবর্ণ প্রভাতে
বিবর্ণ বিস্বাদ আজ আমাদের প্রগাঢ় নিশ্বাস কালি আজ হয়ে গেছে দূরান্বয়ী নিবিড় কালিমা আমাদের সুঁচালো কলম আজ একান্ত বঙ্কিম রশিতে যায় না বাঁধা চিন্তাময় প্রান্তরের সীমা। কত যে স্বপ্ন আর রাশিরাশি ফলন্ত বাগান নিমেষে গুঁড়িয়ে দেয় বাত্যাহত অনাত্মীয় ঝড় টুনটুনি চিত হয়ে শুয়ে যেন দু-পায়ে ঠেকায় আকাশের ভেঙে-পড়া, সেই দশা দেখি অতঃপর। আকাশ পড়ে না…
-
পুঞ্জীভূত মেঘ
সব দেখাই দৃশ্য নয়, কোনো কোনো দেখা দৃশ্য হয়ে যায়। দৃশ্যের ভেতর দিয়ে দেখি, অনেক মানুষ ছিল দৃশ্যপটে পরে যারা নেই হয়ে গেছে। হেঁটে বেড়ানো চলিষ্ণু মানুষের কবরস্থান পুরোপুরি সুনসান, স্থির, খোদিত-না-খোদিত এপিটাফের বাগান! অনেক দৃশ্যের মধ্যে এই দৃশ্যও থেকে যেতে পারে, কেউ একজন এপিটাফ পড়তেই বাগানে আসে কবিতা ঘনিয়ে এলে ভারাক্রান্ত প্রেমিকের দীর্ঘশ্বাসগুলো জমে…
-
নিসর্গের চিঠি
শালুকচোখা রাত্রি মুখ ডুবিয়ে ছিল জোছনাজলে, ঝিঁঝিঁর কণ্ঠে মিশে যায় সেকালের মৌনতা। আমি হেঁটে যাই নিসর্গ-শালিকের ছায়ায়, চোখে পড়ে এক জলমগ্ন প্রণয়ের কাগজপোকা ছায়া নেই, তবু চেনা কুয়াশা ছুঁয়ে যায় গ্রীবাদেশ। অলক্ষে সরে যায় নিচু-গলায় নদী – তার ঠোঁটে লেগে থাকে অপরাহ্ণের ভেজাপ্রান্তর। চোখে এখন ঘুম নয়, শুধু মেঠোপথের আর্দ্রতা – অদেখা পাখির পায়ে জড়িয়ে…
-
তোমরা আমায় কাঁদতে বোলো না
আমি নদীর কাছে রেখে এসেছি প্রেমময় অশ্রুজল, পাহাড়ের ওই ঝর্ণার কাছে ফেলে এসেছি বেদনার ক্রন্দন! বৃষ্টির জলে ধুয়ে নিয়েছি অব্যক্ত যন্ত্রণা, আমি যামিনীর কাছে দিয়ে এসেছি সমস্ত অঙ্গীকার। অনলের কাছে বিসর্জন দিয়েছি অভিশপ্ত অহংকার, আমার কোনো প্রেম নেই, কষ্ট নেই, হিংসা নেই! তোমরা আমায় কাঁদতে বোলো না। আমি দিশাহীন এক অনন্ত পথের যাত্রী, শিখা অনির্বাণের…
