কবিতা
-
এ তুমি চর্যাপদ
দুলাল সরকার হাজার ভাষার মধ্যে তোমাকে চিনি হাতে হাত রেখে অাঁধারেও বুঝি এ তুমি আমার মাতৃভাষা, বাংলাভূমি; হাজার ফুলের গন্ধের চেয়ে তুমি যে বিশেষ একটি গোলাপরানি লক্ষ বৃক্ষের মধ্যে আমার সে-দারুচিনি, তোমার নদীতে হাজার জলের ঢেউয়ে এ তুমি আমার বিশেষ তৃষা আবেগ পুড়নে অবগাহনের ভাষা মন খুলে তোমাতেই কথা বলি খুলে খুলে…
-
খাঁচা
তমিজ উদদীন লোদী খাঁচা থেকে উঁকি দিচ্ছে খাঁচার জীবন হায় খাঁচা! এ কেমন সীমাবদ্ধ, এ কেমন বাঁচা। শাগালের চিত্রের মতন উল্টো হয়ে ঝুলে আছে সব চারপাশে ইনফার্নো, জ্বলন্ত রৌরব। কুঁজো হয়ে হেঁটে যাচ্ছে হ্যাঞ্চব্যাক ছায়াদেহ, ছায়ার বিবেক। গডোর প্রতীক্ষা নিয়ে বসে আছে শতাব্দীর চোখ পড়ে আছে জীবাশ্মের স্তূপ, অলীক আলোক। আসক্তির অনুরাগে ঊর্ধ্বগামী…
-
পা দুটিকে বলি
মিনার মনসুর বন্ধুদের নিয়ে কে না গর্ব করে। একজন এইমাত্র বঙ্গোপসাগরকে ধরে এনে চেপেচুপে ঢুকিয়ে দিলো তার ব্যক্তিগত সুইমিংপুলে। দুর্গম দ্বীপে জনম। সমুদ্র তাকে কতভাবেই না হেনস্থা করেছে হতদরিদ্র শৈশবে! এখন তার শখ সমুদ্র পোষা। দ্বিতীয়জনের রক্তে মিশে আছে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্য। স্বভাবতই সে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে ঘটা করে ঘুড়ি ওড়াতে পছন্দ করে। তাই একদিন…
-
পথভোলা
শ্যামলকান্তি দাশ দিকে দিকে তোমার শতেক পথ, আমবনে জামবনে, কাঁঠালছায়ায়। রসে ভরা অঢেল সুচারু ফল, কাগা খায় বগা খায়, পোলাপান খায়। তোমার প্রতিটি পাতা একরোখা, ঢেউ তোলা ফুঁসে ওঠা, অনুমানে চিনি। ঢুকেছি নিজের মতো নিরিবিলি, কোথাকার পথভোলা – বেরোতে পারিনি!
-
কখন যে মুক্তি
কাজল বন্দ্যোপাধ্যায় কখন যে ছোট, খুব ছোট হয়ে গেছে আমার পৃথিবী টেরও পাইনি। এই তো সেদিন মহাবিশ্ব ছিল আমার ভাবনায়, বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ছিল আমার আকুল আগ্রহ, সাধারণ অণু-পরমাণুর নিয়ম-কানুনে, যাবতীয় ন্যায়-অন্যায়ে। তারপর একদিন হতভম্ব হয়ে দেখতে পেলাম ছোট-ছোট ঘরের ভেতরে কী জমে আছে দীর্ঘকাল, বাগাড়ম্বরকারী মানুষের ভেতরে, কতো পুরনো আর প্রায়-পাকা সব…
-
দুটি কবিতা
শিহাব সরকার এই নিয়ে রাত দুপুরে গ্লাস-ভাঙা কে কাকে মধ্যে রেখে না ঘুরে যায় কী না ঘোরে, ঘোরে সবকিছু, আমি ও তুমি মানুষ পতঙ্গ জন্তু জীব পাখি জলকণা, ঘোরে গ্রহতারা, কবে থেকে কেন ঘোরে আখড়ার উঠানে বসে বৃদ্ধ বাউল দিশাহারা। দেখি সূর্য ঘোরে, পৃথিবী নিশ্চল শনি মঙ্গল বুধ সমুদ্রে অস্ত যায়…
-
কার্তিকে কালো নদী
রাহমান ওয়াহিদ ঝিমধরা পাতার শুকনো ডানায় ঝরে পড়ে ঝুমকো বকুল। দুপুরের শাদা চাঁদা গিলে খায় হেমন্তী কাঁচা রোদ। আমি এ-ঘর থেকে ও-ঘরে যেতে চাই, যাবো একটুখানি। হাজারটা ঘর নাকি উঠেছে ঘরের ভেতর। ভাতগন্ধ বিকেল ও-ঘরে জ্বালাবে আজ নবান্ন ময়ূখ। যাবো আমি একটুখানি। শিশিরের গন্ধ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। কোথা পথ? এই কার্তিকেও পথের আদলে আশ্চর্য শুয়ে আছে…
-
হুর
মিজানুর রহমান বেলাল কেউ অরণ্যের কাছে যায় না – অরণ্যই ডাকে সবুজ বুকে যেখানে দুরন্তপাখিদের সমাবেশ, সবুজ পালকের ফলক স্থির দাঁড়িয়ে থাকে – কালের আবরণ ও রহস্য নিয়ে। মেঘের ছাউনিঘেরা ঘুড়ি-ওড়া গ্রাম, চোখের দেয়াল যুবতী বাঁশের খোড়লে ঘুমিয়ে থাকা হীরের জল সবই আমার একাকিত্ব ধার করা প্রজাপতিজন। যতদূর জানি – অরণ্যে কোনো…
-
মধুমতি খেয়া
সেলিম মাহমুদ প্রজা-বিদ্রোহের চেয়ে কঠিন সংবাদ মুহূর্তে ছড়িয়ে দিতে পারো রাজ্যেশ্বরী আমরা ভচকে যেতে পারি, তাতে কী তোমার মধুমতি খেয়া বন্ধ হবে রোজ রোববার! এমন কী দিন নেই, এমন কী নাম নেই যারা দ্বারা জালে জালে বিদ্যমান সড়ক ও জনপথ ট্রাফিক আইন মেনে চলা ট্যাক্সিক্যাব ট্রাক বলবে না আর, ন্যাড়া কি বারবার বেলতলা…
-
ভালোবাসার মতো কেউ
শিউল মনজুর ভালোবাসার মতো বিশেষ কেউ একজন আসছে; এই ভেবে কুয়াশাভোরে, বাসস্টপে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য প্রতীক্ষায় কাঁপন ধরে শরীরে, তবু অপেক্ষা করতেই হয়…। ভালোবাসার মতো বিশেষ কেউ একজন আসছে; ট্রেন এসে পৌঁছুতে পারেনি, ওয়েটিং রুমে গভীর রাত পর্যন্ত ঝিমুতে ঝিমুতে ক্লান্ত শরীর আর যেন চলে না, তবু অপেক্ষা করতেই হয়…। ভালোবাসার মতো বিশেষ কেউ…
-
আত্মমোচন
আহমদ আজিজ ক্ষরিত রক্তে রক্তলিখন হৃৎপত্রের সমাপ্তি হোক ভুল অভিলাষ দগ্ধপাঁজর ধুলোলাঞ্ছিত কল্পনালোক; রৌদ্রতাপিত মুগ্ধসকাল বর্ষামুখর উদ্যান-বন বিস্মৃত হোক কামনাচারিতা পুড়ে ছাই হোক স্মৃতির-বসন; করুণাকাতর মলিন সন্ধ্যা নির্বাক চোখ রক্তিমাকাশ প্রতিবিম্বিত রক্তপুকুর ক্ষতবিক্ষত বিমূর্ত হাঁস; দহনবিদ্ধ হৃৎকারিগর আজ তবে হোক গ্রন্থিমোচন দূরপ্রান্তর ডাকে আয় আয় হাতছানি দেয় আলোর নাচন।
