কবিতা

  • গেরো

    জাহিদ হায়দার   অনেক অনেক দিন আগে যখন  রাত্রিরা  সূর্যালোকে ফরসা হয়ে যেত, প্রহরগুলির নাম মানুষ তখনো রাখেনি, বলতো না : হয়েছে সকাল।   দিন গাছের পাতায় আর ঊর্মিপথে ঘুরে দিন শেষে পাতাদের সবুজে, নদীবক্ষে কালো পাতা হয়ে শুয়ে পড়তো, মানুষরা বলতে শেখেনি : নামছে রাত।   মেঘেরা পাহাড়ের মাথায় হেঁটে গেলে কেউ বলতো না…

  • শব্দবিষয়ক (কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে নিবেদিত)

    মাহমুদ কামাল যথাশব্দ শব্দহীন নয় শব্দের বিবাহ যদি হয় শব্দবিদ্যা তখন অক্ষয়।   সারাদিন যত ধ্বনি ঠোঁটে সেভাবেই গাছে ফুল ফোটে সেভাবেই সূর্য হেসে ওঠে।   সে-হাসির অন্তরালে কেউ সে-হাসির অন্তরালে ঢেউ সে-হাসির অন্তরালে সে-ও।   তার নাম খুঁজে বের করো যদি কাঁপে দৃঢ় অন্তরও না পারলে কণ্ঠ চেপে ধরো।   সাধিত জীবন সেই মতো…

  • উৎকণ্ঠা

    মারুফুল ইসলাম   সেই সকালেও সূর্য উঠেছিল নিয়মমাফিক ঠিক পুবদিকেই অভিযোগহীন রুদ্রপলাশ গাছের ডালে বসে মধুকণ্ঠী কোকিলটা গান গাইছিল শুদ্ধ সুরে ফাল্গুনের বাতাস ছিল যথারীতি স্নিগ্ধ বইয়ের পাতার বাংলা স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণগুলো ছিল অবিকল   উপমা আর উৎপ্রেক্ষার ভিড়ে কবি খুঁজেছিল রূপক প্রতীক এবং চিত্রকল্প ছোট্ট শিশুটি কৌতূহলী নিবিড় নয়নে জগৎ দেখার ফাঁকে একটু করে…

  • দূরত্ব

    হাবীবুল্লাহ সিরাজী   যে সমান্তরাল তাকে উচ্চতায় স্পর্শ করা অসম্ভব জেনে বাজপাখি উড়িয়েছিলাম, স্তন এবং ওষ্ঠের মধ্যবর্তী আস্থায় অববাহিকায় প্রবাহিত হতে দিয়েছিলাম নীলস্রোত – মিল তো মাথার পুলকেই জমতে পারতো!   যে অসাবধান তার শাখা-প্রশাখা বিস্তারের পূর্বাহ্নেই স্থিত করতে চেয়েছিলাম সম্ভোগের সাফল্য, অগ্নিশিখা ও বৃষ্টিধারা প্লাটফর্মে একত্রিত হ’লে বর্ণনার জন্য প্রস্ত্তত রেখেছিলাম যোগ ও বিয়োগ…

  • মাদলকন্যার ডাক

    রাতুল দেববর্মণ আঠারো বছর বয়সেই ঘর থেকে পালিয়ে উত্তরের এক চা-বাগানে ধ্রুপদি হাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছিলাম, ষাট-সত্তরের টালমাটাল সময় সমস্ত শরীর জুড়ে আছে তপ্ত অপমান আমি এক পাহাড়ি সন্তান, ঘরের বন্ধন, ভালোবাসাহীন ঘরে রাত জেগে বসে থাকে মা,   তবে কী ভালোবেসে ফেলেছিলাম চা-পাতার ঘ্রাণ, দুটি হাতের মুদ্রায় ক্ষুধার বিপুল সংকেত,   বাগান বস্তির অদূরেই ব্রিটিশ…

  • মোহাম্মদ রফিকের একগুচ্ছ কবিতা

    পাওয়া না-পাওয়া বহুকিছু ছেড়েছি জীবনে এমনকি তোমাকেও, অথচ তুমিই করে গেলে দান অন্ধকূপে প্রায় অন্ধ যাত্রা তুমি শুধু রয়ে গেলে আলোর বর্তিকা দিগ্বিদিক শূন্য পথে-পথে কখন ছড়িয়ে গেলে মণিমুক্তাসম মাঝে মাঝে মুমূর্ষু শ্বাসের মতো নুড়িবালুপাথরের শব্দ চিত্রকল্প পঙ্ক্তির সংঘাত দ্বিখন্ডিত মস্তকে দিকভ্রান্ত আশীর্বাদ পারাপারহীন ওপারের আদিগন্ত রেখা হাতছানি কোনো এক অক্ষয় ছায়ায় তুমি তবু দিনরাত্রি…

  • দুটি কবিতা

    উৎপলকুমার বসু উপ্ত বীজ উপ্ত বীজ, তাকে আমি পারি না বোঝাতে বেশ আছো অন্ধকারে, মাটির গভীরে – বাইরের উষ্ণতার খোঁজে, সামান্য জলের জন্য, রোদের জন্য তাকে ফুটে উঠতে দেখি, ভোরের পাখির ডাকে সাড়া দেয়, খাদ্য হিসেবে নিজেকেই মেলে ধরে – না-লেখা কবিতা যেন – নিজেকে নিজেই বোঝে না, মানে না।     নিরুদ্দিষ্টের প্রতি  …

  • আমানুল হক : তাঁর কাছে ঋণ

    মফিদুল হক আমানুল হক নিভৃতচারী মানুষ, তবে নিভৃতে যাঁদের বিচরণ, তাঁরা সাধারণত গণ্য হন জীবন থেকে সরে যাওয়া অথবা জীবনবিবাগী মানুষ হিসেবে। অথচ তেমন মানুষ তো আমানুল হক কখনোই ছিলেন না, ছিলেন প্রবলভাবে জীবনবাদী। জীবনের অর্থময়তা খুঁজেছেন বড়ভাবে এবং ক্যামেরার লেন্সে বিপুলা জীবনের রূপচ্ছবি মেলে ধরবার আকুতি বহন করেছেন সর্বদা। তারপরও তিনি যে নিভৃতচারী হিসেবে…

  • পাথরের চোখ

    শামীম হোসেন পাথরের চোখ – অশ্রু পড়ে না, দুঃখ ঝরে না গাবগাছের নিচে জালবোনা দিনে কুড়িয়ে আনি কিছু নিমপাতা রঙের মনের ময়না! পাথরের চোখ শুধু চেয়ে থাকে, পলক পড়ে না…   অনেক নিশুতিরাতে যখন হরিণশিশু লুকিয়ে থাকে বনের ভেতর আর খাঁ-খাঁ প্রান্তরজুড়ে শোনা যায় না কোনো শুকনো পাতার মর্মর – ডানা ঝেড়ে বিরহীঘুঘু ফেলে যায়…

  • পিরিতি পূজারি

    মিজানুর রহমান বেলাল এ কোন অভিনব চিন্তামগ্নে শূন্যে উঠালি – জলের উপর গৃহস্থালি লুকানো আগুনে পুড়িবে যখন পিরিতি রসে রসিকরঞ্জিত অঙ্গখানি।   পিরিতের পিদিম বিবাগী সন্ধ্যায় নিভে গেলে বাঁচিবো কেমনে সখি যদি পৃথিবীর ভূমিতে-বিভেদ পুড়ে যায় – উড়ুউড়ু উড়ন্ত মনপঙ্খি; যদি কলঙ্কের কালিমা কান পেতে শোনে উদাস নিশিরাত্তির চাঁদপ্রহরী।   ভয়ে কাঁপে থরথর পিরিতিগীতি, কণ্ঠে…

  • যে মা তার সন্তান বিক্রি করে এসেছেন

    তুহিন তৌহিদ যে মা তার কোলের শিশুটিকে অর্থের বিনিময়ে এইমাত্র বিক্রি করে এসেছেন, তার জন্য আমার চোখে কোনো জল নেই আমার শোক হতভাগা সেই শিশুটির জন্য, কারণ সে তার মাকে ভালোবাসতে চাইবে – মধ্যরাতে কেঁপে, কেঁদে উঠলে সে চাইবে মা তাকে জড়িয়ে ধরুক বুকে, সে ‘মা’ বলে ডাকতে চাইবে কাউকে   উন্মাদ অশ্বদের পিঠে চড়েছি…

  • মনিষা ও বেদনাগুচ্ছ

    শিউল মনজুর বুকের ভিতর যে বেদনাগুচ্ছ পাথরের মতো ভারী হয়ে বসে থাকে নীরবে, তা মাঝে মধ্যে ধ্বনির কারুকাজে পঙ্ক্তিমালায় ছড়িয়ে পড়ে চোখের জলে। মাঝেমধ্যে মনে হয় এইসব বেদনা নিয়ে যেন ছেলেখেলা করেন স্বয়ং বিধাতা। বুকের ভিতর এই বেদনা যখন চাপা দেয় ভারী পাথর, তখন দেখি মনিষা হাসতে হাসতে উড়ে যাচ্ছে বাতাসের বেগে। নাটাই ঘুড়িও পারে…