কবিতা

  • লসঅ্যাঞ্জেলেসের পথে

    কাইয়ুম চৌধুরী কুয়াশা কেটে যাওয়া রোদ মাখা শস্যক্ষেত যতদূর চোখ যায় দ্রুত অতিক্রম করে যাই জলপাই বাগান হেমন্ত হাওয়ায়। দূর পাহাড়ের সারি সোনালি তৃণে ঢাকা মুক্ত আকারে নীলাভ সবুজে জল টলটল তুলির ডগায় স্বচ্ছ রঙেতে আঁকা। সারি তোলা দ্রাক্ষাকুঞ্জ সমান্তরালে অপস্রিয়মাণ তৈরি করে উল্লম্বরেখা সিঞ্চিত জলধারা ঘূর্ণায়মান। বাড়িঘর, নদীনালা বিদ্যুৎ টাওয়ার, গোলাবাড়ি দিগন্তছোঁয়া চারণভূমি হলুদ…

  • না, শোকগাথা নয় (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উৎসর্গিত)

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত কখনোই তুমি চাওনি তোমার মৃত্যুসংবাদ চৌদিকে চাউর হয়ে যাক, সেজন্যেই বুঝি তোমার চলে-যাওয়ার সময়টায় পর-পর চারদিন জুড়ে কলকাতায় কোনো কাগজ বেরোয়নি, বেরোলেও বিলি হয়নি, আর হকারের সেই অপ্রত্যাশিত ছুটির উল্লাসে সুন্দরবনের আশেপাশে সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছিল সবুজে সুনীলে পিকনিকের মহানন্দে Ñ তুমি যেরকম চেয়েছিলে। আমি তখন এলাহাবাদে প্রবাসী বাঙালিদের পূজার মণ্ডপে তোমার কবিতা নিয়ে…

  • প্রিয়ভাষিণীর টিয়ে

    মারুফ রায়হান একটা নিষ্পত্র গাছে বসেছিল কি মিষ্টি টিয়েটি উজাড় বৃক্ষের দেশে কবিমন সবুজরহিত বীজ বন্ধ্যা হলে বুঝি মৃত্যুথাবা, বিস্তৃত বিপন্ন সুগন্ধে ভরুক মৃতপুষ্প – চেয়েছিল বৃক্ষসখা বাতাস বিনষ্ট হলে, বিষ মিশ্লে স্নেহার্দ্র মাটিতে মুছে যাবে উদ্ভিদের সুপ্রকাশ – জন্মইতিহাস মেঘে মেঘে ডানা মেলা পাখির ঠিকানা দৃঢ় ডাল বাঁচে যদি প্রাজ্ঞ গাছ, সুরও জাগে টিয়ের…

  • স্বপ্নের সূর্যটা যেন মুক্ত হয়

    নাসির আহমেদ স্বপ্ন সমাহিত! সব শেষ? বাঁশঝাড়ে জ্বলছে শোকার্ত জোনাকিরা। স্তব্ধতার অন্ধকারে ঝিঁঝিরাও নীরবতার শয্যায় ক্লান্ত মেঘের ভারে নুয়ে পড়েছে আকাশ। হয়তো কান্নার প্রস্ত্ততি নিচ্ছে। দুঃখের সমুদ্র ফুলে উঠছে আমার বুকের মধ্যে। অথচ তোমার জন্য, হ্যাঁ স্বপ্ন, শুধু তোমার আমন্ত্রণেই আসা এতটা কণ্টকাকীর্ণ পথ। তোমার দ্যুতিতে ঝলসে উঠেছিল সমস্ত পরিপাশ^র্, তীব্র স্বপ্নের উপমা যদি বাঁধভাঙা…

  • পরদেশি

    পিনাকী ঠাকুর পেটে লাথি মারল তবু বলতে হবে, ‘দোয়া করো পির’! শহর-বাজারে ঘুরছি পরদেশি ব্যর্থ মুসাফির। কামান, নাগরিভাষা, সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ, তাপ্পি মারা আলখাল্লা, এই দেহে ফকিরের সাজ মনে আজ বেঁধে রাখছি করুণ সংলাপ, জারিগান ‘কল্যাণের দিকে এসো’ – মুয়াজ্জিন দিচ্ছেন আজান এই দিল্ মরুস্বর্গ, কারবালায় আজও ঝরছে খুন আশরফি ছুড়ে দিলে আমাকেই, জুলেখা খাতুন?

  • দেখা

    আশিস সান্যাল দেখা হলো পুনর্বার বরাকের পাশে তখন নদীর জলে ছড়ায়েছে গোধূলি রোদ্দুর ঘরে ফেরা পাখিদের শোনা যায় চারদিকে নিবিড় কূজন। বললাম মৃদু হেসে : আবার এখানে তুমি? তার চেয়ে ভালো এই বেঁচে থাকা পৃথিবীর দুই দিকে আমরা দুজন। শীর্ণা হীরার মতো হাত তার মুখে তার অপরূপ উদ্ভাসিত রোদের প্লাবন, চোখে তার স্বচ্ছ আভা যেন…

  • কেন যে তোমার সঙ্গে

    হায়াৎ সাইফ কেন যে তোমার সঙ্গে দেখা হলো এমন অনুর্বর দিনে বৃষ্টির মৌসুম চলে গেছে বহুদিন শুষ্ক বাতাসে চামড়াও ফেটে যায় রক্ত ঝরে সর্বত্র শরীরে, কেন যে তোমার সঙ্গে দেখা হলো এমন বেমক্কা দিনে চারদিকে যখন মন্বন্তরের মতন সমূহ রণন খেলা করে, তবু কেন প্রতিটি অঙ্গে তোমার অরণ্যের মাদকতা, সবুজের চিকন আভাস লাবণ্যের দৃপ্তি ঝরে…

  • কূজন

    পিয়াস মজিদ মেঘ ও রৌদ্রের গ্রন্থিমূলে বয়ে যায় কত কবরদ্যোতনা। সে হাওয়ার কূলেই তো যাবতীয় কৃষ্ণ জাগরী, স্বপ্নের দ্গি¦লয়। এমন ঈমনকল্যাণ-বসন্তভৈরবী! তবু রাত্রি দুপুরের রাগ ওই তো আমার অনন্ত নিদ্রাবেদিতে। কাননে কাননে জলকরবীর ঢেউ; পুষ্পবহ্নি বেজে ওঠে কারো সুবাসিত করতলে। বন্দরে ভিড়ল রক্তমুখী চাঁদনী।

  • বোট স্টেশন ফায়ার স্টেশন

    জলধি হালদার এই জলপ্রান্তরের গোধূলিসন্ধিতে দুরকম ঘণ্টি বাজে একটি লাগাতার, একটি সেভেন শর্ট ওয়ান লং। ঘণ্টি বেজে উঠলেই জাহাজের আনিতে স্পষ্ট রবিনসন ক্রুশো। বুকে লাইফ জ্যাকেট বেঁধে দৌড় দৌড়। বোটের প্ল্যাগ এঁটে, ল্যাসিং খুলে স্টার্নসিট, বোম্যানেরা তৈরি হারবার পিন সরিয়ে বকের গলার মতো ডেভিট ঝুঁকে পড়ে জলের দিকে। আনিতে গোঁফদাড়িওলা ঝাঁকড়াচুলো ক্রুশো আপন মনে হাসছে।…

  • কথোপকথন

    তমিজ উদদীন লোদী গোলপোস্ট থেকে খানিকটা দূরে। পায়ে পায়ে ঘুরছে বল। ছায়া ছায়া রোদ এসে হামা দিচ্ছে পেভমেন্টে, ঘাসের ফরাসে ঘাপটি মেরে বসে আছে উৎসুক বেড়াল নৈরাজ্য ঝেঁটিয়ে উঠে আসে ঔৎসুক্য, কথোপকথন। নিসর্গচিত্রের মতো খুব ম্লান অতন্দ্রপ্রহরী চাঁদ সূর্যাস্তের রং এঁকে ঢলে পড়ছে সূর্যের ঝাঁজ খুব দ্রুত হর্ষধ্বনি, করতালি, ঊর্ধ্বমুখী জনতার হাত টানটান উত্তেজনা, স্নায়ুজুড়ে…

  • সৌন্দর্যবিষয়ক (হুমায়ূন আহমেদকে)

    কামরুল হাসান আপনি এখানে নির্মাণ করে দিন তো সুন্দর! নিশির ডাকে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে অস্থির যুবতীদল, জ্যোৎøার ঢেউয়ে কাঁপে বাতিঘর, নিসর্গ, বসতি দয়ার্দ্র শিশির ঠোঁটে রাত্রি ঘষে মাঠের চিবুক স্থূল শব্দ ভুলে খুনসুটি তুলে নিল ক’জোড়া প্রেমিক। জ্যোৎøা-প্লাবনে স্বপ্ন আর জাগৃতি হারাচ্ছে সীমানা এ-পৃথিবীর, তবু যেন এ-পৃথিবীর চেনা দৃশ্য নয়, স্থাণুর রেখাপাত্র কম্পমান ঢেউয়ে…

  • বিষবৃষ্টি

    সুহিতা সুলতানা চারদিকে এতো বৃষ্টি বৃষ্টি টিনের চালে তা তা থই থই মন ক্যামন করে; সিংহরাশির জাতিকা তুই বৃষ্টি ভালোবাসিস? আয় বৃষ্টি প্রেম বৃষ্টি বিষ নামাতে পারিস? শরীরব্যাপী ব্যাপক বৃষ্টি স্বপ্ন ভিজছে স্বপ্ন ডুবছে দেহের ভেতর শীতল হাওয়া আগুন খাচ্ছো? প্রেমিক তুমি বিষ নামাতে পারো? ভালোবাসার মধুবনে টলতে টলতে পড়বি কি পড় সাপের ঘাড়ে সর্বনাশা…