ছোট গল্প

  • গভীর অশ্রু

    গভীর অশ্রু

    দোতলা বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে আছেন মঞ্জুর সাহেব। তার দৃষ্টি নিচে গলির দিকে। তার ক্লান্ত চোখদুটো কী যেন খুঁজছে। তার বাসার ঠিক সামনেই তিনতলা বাড়ির ছায়া এসে পড়েছে রাসত্মায়। সেখানে একদল ছেলে ক্রিকেট খেলছে। শহরে আজকাল খেলার মাঠ হয়ে গেছে দুর্লভ বস্ত্তর মতো। মঞ্জুর সাহেবের প্রায়ই এদের দেখে নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে। তাদের সময়…

  • দড়ি

    দড়ি

     রানু হাঁটছে। সবার নজর তার সরু সরু দুটো পায়ে জড়িয়ে থাকা সাদা টাইটসের দিকে। তার হাঁটায় যেমন অনায়াস আছে, তেমনি সতর্কতাও আছে – বোঝা যায়, অনেকদিন ধরে এর অভ্যাস করেছে সে। যেখানে এক পা পড়ে, অন্য পা-টি সেই বরাবর সামনে পড়ে, একটুও ডানে বা বাঁয়ে পড়ে না, কোমর দুলতে গিয়েও দোলে না। ও হেঁটে কুড়ি…

  • আনন্দগাথা

    আনন্দগাথা

    পার্থ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের সামনে এসে গাড়িটা দাঁড়াল। পেছনের সিটে বসা বিজ্ঞানী ড. রবার্ট স্মিথ মৃদু স্বরে একবার জানতে চাইলেন, এটাই কি দুই নম্বর গেট? গাড়ির চালক রজার ঘাড় নেড়ে তার কথার উত্তর দিলো। রবার্ট ফুল সিস্নভ সোয়েটারের হাতাটা একটু টেনে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিজের মনেই বললেন, আমরা তো তাহলে অনেকটা আগেই চলে এসেছি। পেছনের ডিকি…

  • নীলকণ্ঠলতা

    নীলকণ্ঠলতা

    বেঁটে-কালো নীলকান্তবাবুর স্বভাব অটল পাহাড়ের মতো। চলাফেরায় যেমন ধীরস্থির, কথাও বলেন তেমনি নিচু স্বরে, থেমে থেমে – অনেক মেপে, তবে বেশ গুছিয়ে। তার আচরণ বা চারিত্রিক বিন্যাসের পারিপাট্য তার পেশাগত কাজের সঙ্গে মানানসই নয় – পরিচিত মহলে এমন ধারণা চাউর হয়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। গলার স্বরে সংগীতের রাগিণীর মতো আশ্চর্য এক মাদকতা রয়েছে তার। সারাক্ষণই…

  • প্ল্যানচেট

    প্ল্যানচেট

    কথা হয়েছিল এক বছর পরে আসার। কিন্তু তা হলো না। ফিরে আসতে এক বছর পার হয়ে গেল। গতবার এসেছি বর্ষা আসার মুখে মুখে। দক্ষিণবঙ্গে অসহ্য গরম তখন। কিন্তু এখানে বাতাসের তাপ হালকা হয়ে এসেছিল। এখানে কালচে মেঘ জমতে শুরু করেছিল পাহাড়ের মাথায়। সারাদিন ধরে বোঝা নিয়ে চলা মেঘের সারি, তার নিচে পাহাড়ের সবুজ যেন বৃষ্টির…

  • একটি রহস্যভেদের গল্প

    একটি রহস্যভেদের গল্প

    শুক্কুরবারের কা-টা ঘটানোর আগে কাশেম আমাদের গ্রামে পাত্তা পাওয়া কেউ ছিল না। অথবা এটা বললে ভালো হয়, কাশেমকে নিয়ে বহুকাল আমাদের মাথা ঘামাতে হয়নি। কিন্তু শুক্কুরবার আসর ওয়াক্তের পর থেকে কাশেমকে পাত্তা দিতে শুরু করতে হয় আমাদের। শুক্কুরবার দুপুরের একটু পরপর কাশেম গলায় ফাঁস নেয়। তার জিহবা বের হয়ে যায় আধহাত এবং সে মাটি হতে…

  • কায়েসের অজ্ঞাত লাশ

    কায়েসের অজ্ঞাত লাশ

    কাফনে মোড়া লাশের পাশে হাঁটু ভাঁজ করে বসে আছেন ওয়ালীউল্লাহ। কেতাদুরস্ত এই মানুষটি কখনো এভাবে মাটিতে বসেন না। নাকি বসেছেন, কবে? মনে করা হয় না। সকল চিন্তা মিলিয়ে যায় কোনো এক কৃষ্ণগহবরে। এমন বারবার হচ্ছে। কোনো বিষয় তার চিন্তায় জায়গা করে নিতে পারছে না। এই যে তিনি তাকিয়ে আছেন, দেখলে মনে হবে তার দৃষ্টি ওই…

  • চামড়া

    চামড়া

    ‘বাবা,আমার বিস্কুট এনো।’ মায়ের এক পাশে শোয়া ছোট্ট মেয়েটি মাথা তুলে বলে। অপর পাশ থেকে বড় ছেলেটা চোখ কচলাতে কচলাতে জিজ্ঞেস করে, বাবা, পরীক্ষার ফি দিতে হবে, টাকা আছে? স্ত্রীও ক্ষীণস্বরে কাছে ডেকে বলে, ওষুধ তো ফুরিয়ে গেছে গো! সবার আবদারে শুধু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ে জগা। মুখে কোনো কথা নেই, দুচোখ জুড়ে দুনিয়ার দুশ্চিন্তা এসে…

  • শেষ বিছানা

    শেষ বিছানা

    আমি পঙ্কজ এবং ওর বিছানার কথা বলতে বসেছি। কিন্তু একটা ঘটনা বলতে গেলে আরেকটা চলে আসে, এর পেছনে মানুষের ইতিহাস, তার মস্তিষ্কের গঠন অথবা আমার ব্যক্তিগত স্বভাব দায়ী হতে পারে। মানুষের জীবনের ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। রাজনীতিতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে একটা বিশেষ পদবাচ্য শব্দ আছে। জীবনে নেই, যদিও জীবন একটা রাজনৈতিক বাস্তবতা। তাহলে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’র…

  • রাত্রিমা ও ঘুমগাছের বন

    রাত্রিমা ও ঘুমগাছের বন

    এই গল্পটা আমার মায়ের। এটাকে গল্প বলা যাবে কিনা বুঝতে পারছি না; কিন্তু গল্পের মতোই। এখনো ভাবলেই সব দৃশ্য হয়ে যায়। আমাদের ছিল ঘুমগাছের বন। সেই বনের ভেতর আমাদের কাঠের দোতলা বাড়ি, টিনের ছাউনি। ওখানে থাকতো আমার রাত্রিমা, আমি, আমার ভাইবোনেরা, একটি ভয়ানক রূপবতী বৃদ্ধ দাদি, আর মধ্যে মধ্যে বাবা। বাবা তো দূর বনের সরকারি…

  • মরিচপোড়া

    মরিচপোড়া

    আমি যখন বাড়িটির সামনে এসে দাঁড়ালাম, সূর্য তখন মধ্যগগন থেকে অল্প একটু হেলে পড়েছে পশ্চিমে। চারদিকে ঝাঁঝাঁ সোনা গলানো রোদ। আমিও এসেছি বহু পথ অতিক্রম করে। কত হবে? হাজার লাখ ক্রোশ। মাপজোখ নেই। আমি কিছুটা ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত। যদিও রোগ, শোক, জরা আমাকে তেমন একটা ছুঁতে পারে না। তারপরও এই নশ্বর পৃথিবীর সবকিছুই যেহেতু একদিন…

  • শৈশবের বানরেরা কোথায় হারাইয়া গেল

    শৈশবের বানরেরা কোথায় হারাইয়া গেল

    যদিও সায়েন্স ল্যাবের ভিড়মগ্ন রাস্তাঘাট মানুষ এবং নানা কিসিমের (বাস, জিপ, প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টেম্পো, মোটরসাইকেল, রিকশা ইত্যাদি …) যানবাহনে বিপর্যস্ত, যদিও এলিফ্যান্ট রোডের দোকানগুলো শাড়ি, বস্নাউজ, ব্রা, পাঞ্জাবি, বাহারি জুতা, চশমা, ঘড়ি, শোপিসে ঠাসা এবং এসবের প্রাচুর্যে যদিও বানরবিষয়ক ভাবনা অপ্রাসঙ্গিক মনে হয় তবু আবুল কাসেমের মাথায় এ-ভাবনাই লাফঝাঁপ মারে। এমনকি শৈশবে দেখা সেই…