February
-

সালামতের সমস্যা
আটত্রিশ বছর আগে ঢাকার তখনো সেকেলে চেহারা, ওই জংধরা সময়ে হালকা গড়নের আটপৌরে জীবনের নিরীহ সালামতের সঙ্গে আমার পরিচয় ধীরে ধীরে জমাট হয়। বয়সে আমার চেয়ে খানিক বড় হলেও সে কিছুতেই তা মেনে নিতে রাজি না। অনিচ্ছায় আমি তাকে নাম ধরে ডাকি, সালামত আমাকে দাদা বলে। এই সালামতকে কাজ দেওয়ার পর তাকে একাধিকবার পইপই বোঝাতে…
-

ঘুমপাহাড়ের মেয়ে
ভোরে নেমেছিলাম মধুগঞ্জে। এখান থেকে মাইল দেড় অশ্রুনদী। অশ্রুনদীর ওপারে, উত্তর-পশ্চিমে একটি পাহাড় আছে। ঘুমপাহাড়। পুরাকালে পাহাড় হেঁটে বেড়াত। হাঁটতে হাঁটতে এই অশ্রুনদীর ধারে এসে দাঁড়ায়। গাঙের অশ্রুপাতে সে গাঙ পার হতে পারে না। মস্ত হাতির মতো পাহাড়েরও বুক ফাটল সেই অশ্রুধারায়। সে দাঁড়িয়েই থাকল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। ঘুমপাহাড় ঘুমের ভেতরই একটু নাকি পিছিয়ে…
-

আমাদের রানি
আমার নাম বারবারা মরাল। আমি কানাডার অধিবাসী। আমার স্বামীর নাম ডক্টর রবিন মরাল। আমাদের বিবাহিত জীবন খুব সুখের ছিল। আমরা ইচ্ছে করে আমাদের বিয়ের আট বছর বাদে সংসারে প্রথম সন্তানটি এনেছিলাম। সন্তানটি ছেলে ছিল। তাই শখ করে তার নাম দিয়েছিলাম, জন। জন মরাল। ষাটের দশকে পৃথিবী যখন লোকসংখ্যার বিস্ফোরণে চিন্তিত, তখন আমরা দুজনে মনে মনে…
-

সঞ্চয়পত্রের হিসাব
নির্দিষ্ট দিনটিতে সঞ্চয়পত্রের কুপনদুটি তার বহুদিনকার পুরনো ফোল্ডার ব্যাগে কয়েকবার দেখেশুনে গুছিয়ে তবেই তাদের হাজারীবাগের বাসা থেকে পথে নামে কবীর। অন্য মাসে কুপন থাকে একটি। আর প্রতি তৃতীয় মাসে একবার তা হয় দুটি। আজ তার দুটি কুপন ভাঙানোর দিন। এই দিনে তার পকেট অন্য মাসের তুলনায় কিছুটা ভারি হয়ে যায়। সেই মাসে সে দেখেশুনে বেশি…
-

যুদ্ধশিশুর মুজিব-আকাশ
তিন দিন ধরে রায়ানের মন খুব খারাপ। স্কুলে গিয়েও মন খারাপ থাকে। ক্লাসে মন বসাতে পারে না। ক্লাসের বন্ধুদের সঙ্গেও ঠিকমতো কথা বলা হয় না। ভাবে, ওর জীবনের গল্পটা ওদেরকে শোনানো দরকার। এখন চুপচাপ থাকাই ভালো। কিন্তু বাড়িতে আসার পরে দিনের বাকি সময় মনে হয় দাউদাউ পুড়ছে। কখনো দু-হাতে চোখের পানি মোছে। চোখের পানি লুকিয়ে…
-

পোট্রেটটা তোমার কাছে থাক
অপূর্ব, কেমন আছ? ফোনে কথাটা শুনে সে চমকে ওঠে। এই টোনে এই ঢংয়ে তাকে মাত্র দুজন ডাকত। এক. সাহিত্যিক আতিউর, দুই. মানসী। আতিউর সাহেবের বাড়ি কুষ্টিয়া। চোস্ত বাংলা বলতেন। তার মধ্যেও একটা শান্তিপুরি টান ছিল। তিনি মারা গেছেন তিন-চার বছর। তাহলে বাকি থাকে মানসী। কিন্তু কণ্ঠটা মেয়েলি নয়। পুরুষঘেঁষা। এটাই অপূর্বর সামনে দ্বিধা তৈরি করে।…
-

বাঙালির জীবনে একুশের দ্যুতি
একুশ মূলত একটি নিরীহ সংখ্যা। নানা মানুষের কাছে এর নানা তাৎপর্য। যেসব জ্যোতিষী সংখ্যানির্ভর ভাগ্যগণনার চর্চা করেন তাঁদের কাছেও নিশ্চয়ই এর পৃথক একটি ইঙ্গিত রয়েছে, যেমন রয়েছে অন্যান্য সংখ্যারও। কিন্তু সেসব ইঙ্গিতের তাৎপর্য ছাপিয়ে বাঙালির ভাবজগতে ও কর্মজগতে এই সংখ্যাটির যে গুরুত্ব ও আবেদন, তার তাৎপর্য ও প্রভাব নিশ্চয়ই অনেক বেশি ব্যাপক ও গভীর। স্বীকার…
-

পাবলো নেরুদার সঙ্গে আমার জীবন মাতিলদে উরুটিয়া
অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী আমি মেক্সিকো থেকে ফ্রান্সে এসেছি, রৌদ্রালোক ও আনন্দে পরিপূর্ণ। আমি এসেছি প্রেমিকের কুঞ্জে, অন্তরঙ্গ ও গোপন। আমি এসেছি বুকভরা আশা নিয়ে। এমনকি খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য এলেও পাবলোর সঙ্গে আমার দেখা হবে। প্যারিসের সঙ্গে আমার চেনাজানা হবে, আলোর এই শহরকে দেখার স্বপ্ন আমার অনেক দিনের। আমি আমার স্যুটকেসের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা…
-

কবিতা-গান-শিল্পের ঝরনাধারায়
মানুষ হলো নদীর মতো দুজনই তরুণ। একজন সুমনকুমার দাশ, অন্যজন নর্মদা দাশ – আমাদের সঙ্গে কাজ করে, পড়াশোনা-লেখালেখিতে আগ্রহ। তারা আমাকে বলল, ‘আপনি তো সিলেটে যাবেন। এক ঘণ্টা সময়ের জন্য যদি আপনার পুরোনো বন্ধুবান্ধবকে ডাকি, কথা বলেন, তাহলে কেমন হয়?’ বললাম, ভালোই হয়। রফিকুর রহমান আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু। এমাদ উল্লাহ্ শহীদুল ইসলাম, কবি তুষার করও…
-

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও জসীম উদ্দীনের পঙ্ক্তিমালা
হাজার বছরের বাংলা কবিতার ধারায় কবি জসীম উদ্দীন (১৯০৩-৭৬) একটি উজ্জ্বল ও বিশিষ্ট নাম। রবীন্দ্রযুগের কবি হয়েও রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে পল্লিজীবনকে অবলম্বন করে জসীম উদ্দীন নির্মাণ করেছেন স্বকীয় এক কাব্যভুবন। তাঁর সাধনায় খুলে গেছে বাংলা কবিতার নতুন এক সিংহদ্বার। বাংলা গীতিকা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে জসীম উদ্দীন আধুনিক দৃষ্টি দিয়ে চোখ ফেরালেন পল্লিজীবনের দিকে,…
-
‘গল্প-উপন্যাস’ – জীবন বিস্তৃতির এক সূত্রের নাম
আমি ল্যাটিন আমেরিকার উপন্যাস সম্পর্কে হাসান আজিজুল হকের প্রবন্ধের একটি লাইন দিয়ে শুরু করতে চাই, ‘ইতিহাস আর দর্শনের দুই প্রবল ঘোড়া উপন্যাসের কাছে বাগ মেনেছে।’ তিনি আগুনপাখি উপন্যাসের শেষে এসে এক নারীর জবানিতে বলছেন, ‘মানুষ কিছুর লেগে কিছু ছেড়ে দেয়, আমি কিসের লেগে কি ছাড়লম? অনেক ভাবলাম। শ্যাষে আমার একটি কথা মনে হলো, আমি আমাকে…
-

আবু সয়ীদ আইয়ুবের অগ্রন্থিত প্রবন্ধ সংস্কৃতিসংকট না সংস্কৃতিসংঘাত
বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যসমালোচক, দার্শনিক ও ভাবুক লেখক আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯০৬-৮২) খুব বেশি লেখেননি। মাত্র চারটি প্রবন্ধ-সম্ভার প্রকাশ পেয়েছে : আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৮), পান্থজনের সখা (১৯৭৩), পথের শেষ কোথায় (১৯৭৭) এবং ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক (১৯৯২)। সাময়িকপত্রে মুদ্রিত কয়েকটি প্রবন্ধের সন্ধান পাওয়া গেছে – সেগুলো কোনো গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ‘বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠাভূমি…
