পুতুলনাচের ইতিকথা ও মানিকের শিল্পমন

লেখক:

শহীদ ইকবাল

পুতুলনাচের ইতিকথার বীজশক্তি কোথায়? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯ মে ১৯০৮-৩ ডিসেম্বর ১৯৫৬) কোন দৃষ্টিকোণে রচনা করেন এ-উপন্যাস। ‘কলমপেষা মজুর’ আখ্যায় আর প্রতিনিধিত্বশীল এক গ্রামের ‘ব্রাত্য’ প্রতিনিধি জনৈক হারু ঘোষের বজ্রপাতে  মৃত্যুর ঘটনায় প্রারম্ভিক পর্বের যে বিবিক্ত ইশারা শহরফেরত শশী ডাক্তার পায়, তাতে প্রতীক্ষিত আখ্যান নির্ণয় অভিপ্রেত হয়ে ওঠে। করুণ সে-বর্ণনপ্রয়াস : ‘বটগাছের ঘন পাতাতেও বেশিক্ষণ বৃষ্টি আটকাইল না। হারু দেখিতে দেখিতে ভিজিয়া উঠিল। স্থানটিতে ওজনের ঝাঁঝালো সামুদ্রিক গন্ধ ক্রমে মিলাইয়া আসিল। অদূরের ঝোপটির ভিতর হইতে কেয়ার সুমিষ্ট গন্ধ ছড়াইয়া পড়িতে আরম্ভ করিল। সবুজ রঙের সরু লিকলিকে একটা সাপ একটি কেয়াকে পাকে পাকে জড়াইয়া ধরিয়া আচ্ছন্ন হইয়াছিল। গায়ে বৃষ্টির জল লাগায় ধীরে ধীরে পাক খুলিয়া ঝোপের বাহিরে আসিল। ক্ষণকাল স্থিরভাবে কুটিল অপলক চোখে হারুর দিকে চাহিয়া থাকিয়া তাহার দুই পায়ের মধ্য দিয়াই বটগাছের কোটরে অদৃশ্য হইয়া গেল।’ রাগী চোখের নির্মম বর্ণন-পর্যবেক্ষণে, কথকের কেন্দ্রে প্রোট্যাগোনিস্ট শশী, আর তারই (কথক বয়ানে) দ্রুত সঞ্চরণশীল উদ্যোগে চলমান আখ্যান-সময়ের ঘণ্টা দুই ব্যবধানে মৃত হারুর সৎকার-কার্যের বক্ষ্যমাণ প্রয়াস। হারু কে? কোন সমাজের প্রতিনিধি সে? তার সচিত্র গ্রামভূমিটুকুর বীক্ষণ কেমন! এ-গ্রামে এ-উপলক্ষে ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র গল্প সৃষ্টি হয়। তাতে তৈরি হয় মন ও মনের অন্তঃপরিকাঠামো। গড়ে ওঠে আর্থ-তুচ্ছ দারিদ্র্যক্লিষ্ট জন্মান্ধ-সৌধমিনার। সেখানে ঘিরে চলে একপ্রকার বীভৎস কৌতুকরস। কুসংস্কার আর অনগ্রসরতার অভিশাপে আটকানো প্রতিসরিত সমাজ। তাতে ঘিরে আছে যাবতীয় অবিশ্বাস, অন্যায্য সন্দেহ, কুতর্ক, গ্রাম্য কূটনীতি, বাড়ন্ত অহং, অনৈতিক জেদ-অভিমান আর ধেয়ে চলা যত অসম্প্রসারণের অগতির আস্থা ও টেকসই স্থবিরত্বের স্বীকৃত অবসর। কেন মানুষ এমন? কোথায় পায় এসব ধারণা আর বুদ্ধিহীন বুদ্ধি? শশীর প্রশ্নগুলো চলতি মানুষ তুলে  নেয়, নির্দ্বিধায়। বিস্মিত শশী আরো বিস্মিত হয়, চলতি জীবনযাপন দেখে, পাঠকও তা দেখে, এবং সে-কারণেই, শশীর প্রশ্ন পাঠক তুলে নেয়। পাঠক তা গ্রহণ করে। আখ্যানসূত্রে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কাহিনি গড়েন, প্লট নির্মাণ করেন, একের পর এক গৃহীত সমস্যার আনয়নের ভেতর দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন মানুষকে। একপ্রকার সাক্ষাৎও ঘটে মানুষের, শশীর সঙ্গে। এতে কাহিনিও নির্ধারিত পথ ধরে এগোয়। মুখোমুখি হয় দ্বন্দ্বের। যুদ্ধও একপ্রকার। বাঁচার, সংগ্রামের, তা হয়তো ভেতরের এবং বাইরেরও। তাতে পুনর্গঠিত হয় জীবন-জঙ্গমতার ক্ষুরধার বিধানাবলি। প্রথা পালটায়, হোক ভেতরে বা ওপরতলে। আচরণ ও মূল্যবোধের দ্বন্দ্বে পড়ে। বাধা পায়। প্রগতির পথ তৈরির নিমিত্তে। মূল্যবোধ গড়ার নিমিত্তে। তা যে গড়ে ভাঙচুরের ভেতর দিয়েই। সম্মুখে চলতে গেলে, গতি তৈরি করতে গেলে ভাঙতে হবেই। ফেলে আসতে হবে পুরনো, জীর্ণ, মলিন সবকিছু; কিন্তু তা তো ছাড়া যায় না সহজেই। বিরাট পাথরসম সে-স্থবিরতা। নিশ্চলতার, জড়তার, আড়ষ্টতার অভিমুখ তো পালটায় না। সে পেছনে টানে, টেনে ধরে পুরনোর পরতে, পরাকাষ্ঠাও তাতে টিকে থাকে যেন। এ-পাথর নড়ানো সহজ নয়। শশী গাঁওদিয়ায় এসে স্থবিরত্বের নিশ্চল রূপটি দেখে নিজেও স্থবির হয়ে পড়ে। সংস্কারের ভেতরে সেও পা দেয়। দেয় কেন বলছি, হয়তো গোপালপুত্রের রক্তেমাংসেই তা বহমান। চাইলেই ভিন্ন হয়ে আলাদা রকমে এক লহমায় তা ছাড়তে পারে না। সে বিব্রত হয়, দ্বিধায় পড়ে। কালিমা বা কলঙ্ক, আস্থা বা অনাস্থা, বিশ্বাস বা অবিশ্বাস, যুক্তি বা আড়ষ্ট সবকিছুই তাকে ঠেলে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আর এ-সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তারও চিত্তে বাধা পড়ে, পুরনো মায়াজালে। কর্তব্যের ভেতরে অপূর্ণ আবেগে। তরল ক্লিন্ন আবেগ আর আহৃত প্রাচীন আলো-হাওয়ার ধৃত কণ্ঠ তাকে পলায়নের পথই দেখায়। ভাঙার বদলে পলায়নের; কিন্তু কোথায় পালাবে সে! বৈজ্ঞানিক উপাদানে গড়া অর্থদন্ডে পাওয়া ডাক্তারি মন কেন তাকে কবিরাজ আর সূর্যবিজ্ঞানের ভুঁইফোঁড়, অনৈতিক, দায়হীন, মনগড়া, ভ্রান্ত, ছলনা-প্রতারণায় বিশ্বাসহন্তারকপ্রসূত চিকিৎসায় স্থির করবে। এ-স্থিরতা প্রাণান্তকর হয়ে ওঠে পুনর্বার, একাধিকবার প্রতিটি পদক্ষেপে মুখোমুখি হওয়ায়। বিব্রতই শুধু নয়, এর জন্য গ্লানি আর লাঞ্ছনা যেন প্রতিমুহূর্তে প্রতীক্ষিত হয়ে থাকে। শশী এ-প্রতিনিধিত্বশীল গ্রামের আলো-হাওয়া-জল বায়ুকে কীভাবে ফেরাবে? কতকালের এ-প্রতিকৃতি, যে-মুখ বিকৃত-ক্লিন্ন-অপদস্থ তার চিকিৎসা সে করবে কোন উপায়ে? কীভাবে তা সম্মুখের পথ পাবে? এসব প্রশ্ন জ্বলন্ত হয়ে উঠলে মানিক আরো বহুবিধ মনচিন্তায় অগ্রবর্তী হয়ে পড়েন। সূক্ষ্মতর মনের কোণের পরিলেখটুকু খুঁজতে থাকেন। অনেকদূর তার রূপ ও রেখা – সে ঘনতল রং ও রূপের কাঠামোটুকু চিনিয়ে দিতে চান। সমস্যার জট চেনা শুধু নয়, খোলার কারণ ও অভিমুখও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একের পর এক সুকুমার-সনিদগ্ধ চিত্তের পরত আর প্রান্তসমূহ বিশ্লেষিত হতে থাকে। একপাক্ষিক নয় এর কাহিনি। উপন্যাস বিরস নয়, সাপেক্ষ-অনপেক্ষ হিসাব করে চলাও নয়, সামগ্রিক দর্শনবুদ্ধিতে বিকাশপ্রাপ্ত এবং পুনর্গঠিত। লয়প্রাপ্ত যেমন নয়, শেষও নয় কিছুতেই, সত্যিকার রূপটি তুলে ধরে তার অবারিত প্রেক্ষণটুকু গড়ে তোলা। পরোক্ষ সম্পনণ মানসিকতায় শুধু নয়, দ্ব্যর্থহীন চিন্তায়, সমাজভাঙনের ভেতরের যুক্তিতে, সমাজযুক্তির সত্যে চিহ্নিত মানসে। বায়বীয় নয় যেমন, তেমনি অসম্ভব উচ্চাশাতেও নয়। সম্পূর্ণ জীবন ও জীবনের জঙ্গমতাকে যুধ্যমান জয়ের অভিমুখ করে তোলে, যেখানে শেষাবধি জীবনই সত্য। আর সে-সত্যে দ্বন্দ্বই মুক্তি। সেটি তত্ত্বের তত্ত্বে নয়, ব্যক্তির আবেগ-অনুরাগ-প্রণয়-প্রেম আর উচ্ছল বৌদ্ধিক (ট্রান্সসেন্ডেন্টাল) আস্থার কেন্দ্রকে ইতিবাচক গুণে মেনে। কারণ, বেড়ে-ওঠা বৃক্ষের সমস্ত রস-মাটি-উদ্গম আলো-হাওয়ার মুক্তিটুকু অস্বীকার করে এ-গ্রাম বা তথাকথিত অনাস্থাজ্ঞাপক পুঁজির শহরতলির মানবচিত্ত তার মনকে গড়ে না, বাঁচাতেও পারে না। শশীই এর দৃষ্টান্ত। শশীর চিকিৎসা এ-উপন্যাসে কে পেল না পেল তা মুখ্য নয়, কে তার কথা শোনে বা শোনে না তাও মুখ্য নয়; কিন্তু তার নিজের মন-মনস্তত্ত্ব, শিক্ষা-সংস্কৃতি আর গাঁওদিয়ার অশিক্ষা আর কুসংস্কারের তারে বাঁধা নিশ্চল-প্রচল অবরুদ্ধ সংস্কৃতি দ্বন্দ্বে লিপ্ত; কিন্তু মনটুকু তো এদেশেরই ঋষি-মুনির নাতিশীতোষ্ণে ভাবের বৃন্তে আটকানো। সেটি অনস্বীকার্য তো বটেই। সুতরাং মানিকে সে-ট্রিটমেন্টও আছে। উপন্যাসে সে-দৃকপাতও আকর্ষণীয় ও ইঙ্গিতবাহী। তাই পুতুলনাচের ইতিকথা এক দারুণ সাক্ষ্য নিয়ে পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত হয়। সে-প্রস্তাবনায় গড়ে ওঠে মন ও মনের ভেতরের কাম-প্রেম-বাসনা অনুষঙ্গ – যথাস্থিত অভিপ্রায়সমূহ। সে-অভিপ্রায়ে মধ্যবিত্ত প্রবণতা, প্রান্তিকতা, ভাবপ্রবণতা আর অদৃশ্য-প্রেরিত বিশ্বাস-সংস্কার এক চরিত্ররূপে প্রতীয়মান। ব্যবচ্ছেদিত ও চিকিৎসারত। মানিকের শিল্পমন কী ভেবে যেন বুঝে যায় এটিই ঔপন্যাসিকের কাজ। সম্পূর্ণ উপন্যাসে কাহিনি বলা বা চরিত্র বানানোই লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য জীবনবেদ – অলক্ষে থাকে মাটি ও মানুষের শ্রেণিমনের দর্শন, যেখানে আখ্যান হয়ে ওঠে অভিপ্রেত দ্বন্দ্বের, স্থবিরত্বকে মুখোমুখি করে কুৎসিত উপসর্গ চিহ্নিতকরণে, পরের কাজটুকু লোকোত্তর পৃথিবীর। প্রসঙ্গত স্মর্তব্য, এ-উপন্যাসের নির্মিত মন যে সমাজের দ্বন্দ্বের ভেতর থেকে চিহ্নিত, তাতে একটি শ্রেণিমনের তিলকও এঁটে দেওয়া আছে। তাই এতে যা কিছু ঘটে চলে তা শ্রেণি-সংস্কৃতির বিবর্তমান রূপকাঠামোকে অবলম্বন করেই। তাতেই জীবনের বিশ্বস্ত চলকগুলো চিহ্নিত হতে সমর্থ হয়। উপন্যাসটির পরিচর্যার স্থলটুকুও তাতেই নির্ধারিত হতে সমর্থ।

দুই

গল্পগ্রথিত চরিত্রসমূহ গড়া একপ্রকার সামন্ত অবকাঠামোয়। তা বিশ শতকের প্রথমার্ধের দৃষ্টিপাত। গাঁওদিয়া, বাজিতপুরের বসতভিটা। সেখানকার সমাজ-মানুষের সম্পর্ক। ওর দ্বন্দ্বজাল, কথকের দৃষ্টিকোণ ও পরিপ্রেক্ষিত। তীব্র তাপে শ্রেণিমানুষের তীক্ষ্ণ সংঘাত ও সন্তাপ। ব্যক্তি-সমাজের দ্বন্দ্ব, সমাজ ও ব্যক্তিরও। প্রথম অংশেই লেখকের সমাজচশমার যে-বিবরণী তা কোনো আঞ্চলিক বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপবাসী মানুষের নয়। এ প্রকৃতিহত মানুষ। নিয়তিনির্দিষ্টও। সে-নিয়তি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কারুণ্যে – অমোঘ বিধিলিপি। মরীচিকার মায়ায় অভিসম্পাতি অভিমুখ। রহস্যজাল কালধৃত। এমতে প্রশ্ন জাগে, এই কি মানিকের শিল্প? মানুষের মন খোঁজা – মানিক কোনো চরিত্রকেই খন্ড করে দেখেননি। অখন্ড ও সর্ববিচারী দৃষ্টিকোণে – শ্রেণি-সমাজ-রাজনীতি-সংস্কার-কুসংস্কার সবকিছু দিয়ে। চরিত্র তার আগুনচেতা, ক্ষরিত; পুড়িয়ে ওঠা সমাজ মেরামতির কাজে স্পন্দিত। উদ্বায়ী মনটি প্রবৃত্তিজাত ছায়ালোকে তড়পায়। তার সামগ্রিক সার্বভৌম শিল্পধাতও তাই। সেটি চিনে-বুঝে নেয়, ওই শ্রেণি-জাত সম্বল করে। এমন সমাজ ও সমাজস্পন্দনে মোড়ানো ব্যক্তির ব্যবচ্ছেদ, সেটি তার দন্ড। তাঁর সময়ে এ-প্রয়োজনটুকু অন্য ঔপন্যাসিকরা কতটুকু করেছেন কিংবা কোন ধারায় সকল গ্রামসমাজের মানুষকে দেখেছেন সে-বিচার এক্ষণে অবকাশ কম কিন্তু এটি সত্য যে, এক বৈজ্ঞানিক দৃঢ়পাতে বাঙালির সমাজ-অভিঘাতটুকু বিশ্বস্ত করে তোলাতেই তাঁর পূর্ণ প্রয়াস। এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট দর্শন বা তত্ত্বের প্রতি আস্থা বা অনুমতি থাকতে পারে কিন্তু নিশ্চয় সেটি ব্যক্তিমানুষের স্বরূপে বা তার বিবর্তিত সমাজ পরিপ্রেক্ষিতটুকুতে অবিচ্ছিন্ন রেখেই। এখানে শশী একক, পরে যাদব-গোপাল-সেনদিদি একপ্রকার ‘হাপাইয়া হাপাইয়া’ সমাজে ভারে চলমান, এ-প্রকারে আনন্দ-নিরানন্দের দস্ত্তরও এ-প্রয়াসে এক সুতোয় বাঁধা।

যে-উদ্ধৃতিতে হারু ঘোষের অবস্থান ও আবিষ্কার, কাহিনিটির গ্রন্থিমুখ (exposition), সেটি নিছক কোনো ব্যাপার নয়; কিন্তু তাতেই অমোঘ। শিল্পীর চোখে দেখা অমোঘ বাস্তব। আশ্চর্যই হতে হয় সে-রূপটি অবলোকন করে। ‘ইতিহাসচেতনা, সমাজ-অভিজ্ঞতা ও কালজ্ঞান – এই বোধ যখন কোনো ব্যক্তিমানস সংবেদনার স্তর থেকে চেতনাপ্রবাহের নিগূঢ় আবেগ ও বিশ্বাসের ঐক্যবিন্দুতে সুগঠিত করতে সমর্থ হয়, সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞা হিসেবে তখনই তার সিদ্ধি।’ মানিকের সাফল্যের উৎস ও সীমানা এ-প্রস্তাবে নির্ণীত, প্রথম দুটি বাক্যে। মৃত হারুর অবস্থান ও পরিচয়ই নয় শুধু, ভাগ্য এবং দুর্গতিও পারম্পরিক সমগ্রতায় ব্যঞ্জিত। কটাক্ষ করে তাকে প্রকৃতি-বৃক্ষ-সমাজ এমনকি ছোট্ট প্রাণীটিও। এর কারণ কী? কারণটুকু মেলে আরো ডিটেলে এ-বিষয়ক আলাপচারিতা ধরে এগিয়ে চললে। অনেক মানুষের সঙ্গে গ্রামের প্রকৃতিকে জুতসই বেঁধে দেন মানিক, শতবর্ষী বৃক্ষ, বৃষ্টি, বজ্র, প্রাণিকুল – একাকার তাতে। প্রেক্ষণদৃষ্টিতে (point of view) নিয়তিও একরূপ – সেও ছাড়ে না। শশী এ-অমোঘতার পরিচয় ‘প্রথম দর্শনেই প্রেম’ ভাবে মনে গেঁথে নেয়। গ্রামের মানুষের সান্নিধ্য সংবেদনের তাড়নায় প্রখর হয়ে চলে, এ সংবেদন-স্বরূপটি তো শিল্পীর, যে গোবর্ধনের মনকে চিনে ফেলে, মৃত হারুর জন্য করুণা নয়, মৃত্যুর কারণও খুঁজে বের করা নয়, জাত-পাতের বিচার আর ছোঁয়াছুঁয়ির ভয়, সম্মানের ভয়, কানাকানির ভয়। চলমান বিশ্বাসের বাইরে, প্রতিকূলতায়। তার প্রতিবেশে প্রকৃতির পুনর্গঠন। বাস্তবতাও সে-প্রকারে চিহ্নিত। শশী একপ্রকার বাধ্যই করে গোবর্ধনকে – কিন্তু সমাজমন! বাধ্যটি, তার সমাজধর্মের বাইরের বৃত্ত। ‘মুক্তি হারুর গোবর্ধন ছুঁইলেও নাই না ছুঁইলেও নাই’ – তাই তো পাড়াজুড়ে তার অনেক উপচার। প্রতিটি শব্দই হারু-অভিমুখী। অবস্থাপন্ন হারু এ-গ্রামের বাইরে গিয়েছিল, কন্যা মতির জন্য সচ্ছল মানসম্পন্ন পাত্র দেখতে। ফিরবার পথে বজ্রাঘাতে এ-দশা হলে তা হয়ে ওঠে নানা সংকেতাশ্রয়ী এবং তীব্র কটাক্ষপূর্ণ। এ-কটাক্ষের আড়ালে আছে ঘাত-প্রতিঘাতে লুপ্ত সামগ্রিক জনজীবন। এটি প্রতিকৃতি নয়, বাস্তবও নয় লেখকের অন্তস্তলের সমগ্রতায় জীবনার্থের পর্যাপ্ত প্রতিমান। এরপর কাহিনি যেন আর থেমে থাকে না। ক্রমবর্ধিত বয়ে চলে এ-তটের জীবনঘাটের নানা প্রান্ত ধরে। এগিয়ে চলে, চলে আসে, একে একে প্রতিকূল উপচানো বিশাল ও বিপুল জনমানবকুল। শশীর সান্নিধ্য চোখ ক্রমাগত অধিকার করে জনপদসমূহ ও তার প্রতিটি মানুষের আচরণ। ডাক্তার হিসেবে আরো কাছের তিনি – ঘরের বা বাইরের, গোপন বা নির্গোপনের, অন্তরের-বাইরের, সত্য বা মিথ্যার – আর পূর্বাপর ইতিহাস, পুরাণের তো বটেই। যেন মাখামাখি জীবনের, পূর্ণাবয়ব পরিবেশনা, যার তল বহুকৌণিক, বহুদৃকপাতে আলোড়িত। সে-আলোড়ন সমাজমনে, শ্রেণিতে কিংবা পরিস্রুত ঘাত-প্রতিঘাতের কলরোলে দীপ্তিময়। মানিকের ভাষ্যে এমন বিষয়টিও মোটা দাগের; কেননা ইতিহাসের ভেতরের ইতিহাস, বিপরীতাত্মক দ্বন্দ্বের আরো ভেতরের দ্বন্দ্ব তাই তার কাছে প্রধান প্রতীয়মান। পর্যবেক্ষণ ছাড়ে না তাঁকে, বরং তাই গড়ে তোলে কাঠামো-বয়ানে। শশীকে কেন্দ্র করে সে-মনস্তত্ত্ব, সেটি গতিমান ও প্রবহমান, দ্বন্দ্বপ্রসূত মন ও আধারকে কেন্দ্র করে। কিছু উদাহরণ :

ক) এবার কার্তিক মাসে পূজা। সেনদিদির সর্বাঙ্গে ব্রনগুলি পাকিয়া উঠিতে উঠিতে গ্রামের পূজার উৎসব শুরু হইয়া গেল। উৎসব সহজ নয়, গ্রামের জমিদার শীতলবাবুর বাড়ি তিনদিন যাত্রা, পুতুলনাচ, বাজি পোড়ানো, সাতগাঁর মেলা – পূজা তো আছেই। গ্রামবাসীদের ঝিমানো জীবনপ্রবাহে হঠাৎ প্রবল উত্তেজনার সঞ্চার হইয়াছে, কেবল শশী এবার সেনদিদিকে লইয়া বড় ব্যস্ত।

খ) খালের কুমির শুধু নয়, ভূতোর কথায় ভূতের কথাও আসিয়া পড়িল। তার পর বাজারের সন্ন্যাসী, বাজার দর, একাল-সেকালের পার্থক্য, নারী হরণ, পূর্ণ তালুকদারের মেয়ের কলঙ্ক, বিদেশবাসী গাঁয়ের বড় চাকুরে সুজন দাস, এই সব আলোচনা। শশী কি এত উঁচুতে উঠিয়া গিয়াছে যে এই সব গ্রাম্য প্রসঙ্গে তাহার মন বসিল না, শান্ত অবহেলার সঙ্গে নীরবে শুনিয়া গেল?

গ) বিশ্বাস হয় না, তবু শশীর মনের আড়ালে লুকানো গ্রাম্য কুসংস্কার নাড়া খাইয়াছে। এক এক সময় তাহার মনে হয়, হয়তো আছে, বাঁধা যুক্তির অতিরিক্ত কিছু হয়তো আছে জগতে, যাদব আর যাদবের মতো মানুষেরা যার সন্ধান রাখেন। দলে দলে লোক আসিয়া যে যাদবের পায়ে লুটাইয়া পড়িয়াছে, এদের সকলকেই বিশ্বাস কি মিথ্যা?

শশী ডাক্তারের মন আর গ্রামীণ মনের দ্বন্দ্বের প্রকৃতিটুকু এখানে অাঁচ করা যায়। এর ভেতরে সর্বজ্ঞদৃষ্টিজাত মানিকের মনকে কিছু নিরূপিত বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করা যায় : (১) গ্রামের মানুষের গলিত সমস্যার উদ্দিষ্ট প্রতিকার ও সুস্থ পুনর্বাসনে শশীর নিযুক্তি, (২) নিযুক্তির পর কর্মসাধন ক্ষেত্রে তার মন ব্যর্থ ও বিক্ষুব্ধপ্রায় কিন্তু তা ‘নীরবভাবে’ গণসমাজে অপ্রকাশ্য, (৩) নিজের ভেতরেও প্রলুব্ধ কুসংস্কারগুলো এমন কর্মপ্রয়াসে তাকে গতিহীন করে তুলছে, (৪) দীর্ঘ কুসংস্কারের প্রাকারে শশী যাদব বা যামিনীর গণপ্রণিপাত একপ্রকার ভীত ও ভয়ংকর বার্তা দেয়, যেখানে শশী নিজেও আটকে আছে সে-ব্যবস্থার মধ্যে (৫) বিবরবাসী গ্রাম্যজনতা পরের অব্যয়ী-প্রলাপে সন্ধিৎসু, বিষয়বুদ্ধিহীন, অদৃষ্টবাদী, অনর্থ পরশ্রীকাতরতায় উন্মুখ – সেখানে শশী মূল্যহীন (৬) সামন্ত ব্যবস্থায় ‘ব্যক্তি’র মুক্তি নাই, যুক্ত-করের বন্ধনে নিবন্ধিত, সেখানে উৎসব জমিদারের, আর গ্রামের যে-উত্তেজনা তা বাইরের – উপরিস্তরের, উপায়হীনের উপরের আনন্দ (৭) গ্রামের বিপুল অন্ধ-প্রাকারে মধ্যবিত্ত ভাবাবেগী-স্ববিরোধকাতর শশীও উদ্বিগ্ন – নিজের প্রশ্নশীল শিথিল আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে, (৮) বিজ্ঞান আর বৈজ্ঞানিক বুদ্ধিতে শশী নিজে যেমন আলাদা, তেমনি তার গ্রামময় প্রসার ঘটলে প্রবল অন্ধকারের কর্কট প্রতিবিম্ব তাকে প্রহেলিকায় আবদ্ধ করে – যেখানে নিজেও হয়ে ওঠে অবরুদ্ধ-তিরোহিত। এরূপ প্রস্তাবনায় লেখক দৃষ্টিকোণ, অভিপ্রেত হয়ে ওঠে – স্মরণে নিতে চাই নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিটুকু :

Art itself may be defined as a single-minded attempt to render the highest kind of justice to the visible universe, by bringing to light the truth, manifold and one, underlying its every aspect. It is an attempt to find in its forms, in its colours, in its light, in its shadows, in the aspects of matter and in the facts of life what of each is fundamental, what is enduring and essential…

আর্ট সৃষ্টির প্রেরণায়, ‘enigmatic spectacle’ রচিত হয়, সমাজের দ্বান্দ্বিক অভিপ্রায়ে, বৈশ্বিক বিচারের মাত্রায়। তাতে নিয়তি নির্দিষ্টতার বাইরে ব্যক্তি-পরাণের জাগতিক প্রতিজ্ঞা গড়ে ওঠে। সৃজিত চরিত্র অর্জন করে বহুমাত্রিক বিভা। রং ও রূপের নির্দিষ্ট মাত্রা বাস্তবতাকে করে তোলে বাঙ্ময়। তাতে প্রত্যাদেশও রয়, প্রত্যাশিত শর্তের। শশীর মাধ্যমে গ্রাম-সমাজের পক্ষ-বিপক্ষ, সত্য-মিথ্যা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নির্দ্বন্দ্ব রূপটি আধারবন্দি হয়। বাইরের সত্যটিতে যেমন তাৎপর্যে প্রগাঢ়তা পায়, তেমনি ভেতর সত্তার অলৌকিক-অবচেতন আবর্তসমূহও প্রকটিত হয়। শশীর মুখোমুখি যাদব, যামিনীর মুখোমুখি শশী, প্রতিপাদ্য হারু ও সেনদিদি, ঘনানো কারুণ্যে উত্তাপময় মতি ও কুসুম, সর্বদা সারল্য-স্পৃষ্ট পরাণ আর পাগলাদিদি; এর অন্তরআখরে পুনর্গঠিত বাস্তবতা, প্রখর উত্তাপমাখানো – জন্ম-মৃত্যু, জীবন-জৈবিকতা, স্বর-প্রতিস্বর, বস্ত্ত-নির্বস্ত্ত, রাজ্য-রাজনীতি, সংস্কার-কুসংস্কার প্রকটরূপে পরিগণিত। এই পল্লিগ্রামকে রূপ দেওয়া, তাবৎ প্রতিজ্ঞার রঙে গড়ে তোলা কম কথাটি নয়! সেটি ‘এক হাতে’ রচিত, ও নির্মম বুননিতে বহুবিষয়ক মনের সপক্ষ করে তোলা – কাজটি এতটুকু নয়। আশ্চর্য না হয়ে উপায় নেই, উপপাদ্যটুকুর ভেতরে না ঢুকে। এই করণকৌশলে ‘enigmatic spectacle’, উদ্ধারকৃত অনেক আখ্যায়। আখ্যানের ভেতরের আখ্যান কথায়। বর্ণনাও তাতে আখ্যান গড়ে। নির্মিত করে, বিস্তার ঘটায়, স্বাদে-আস্বাদে বিপুল করে তোলে, অলৌকিকত্বের মর্মপ্লাবী কারুণ্যে। যাদব কিংবা যামিনী এই ভূপ্রকৃতির রঙে নির্মিত, অহং আর নিশ্চিন্ততার প্রহরায় ঘেরা তাদের চেতনার স্তর। গাঢ় ও ঘন সে-মুখরাপ্রদাহ। অনড় আর অনভিপ্রেত আস্বাদে লালিত। প্রতিরোধ নয়, এমন অন্তঃসারের কেন্দ্রে নিমীলিত চক্ষুতে প্রিজমিক রশ্মির বর্ণালী চিনে নিতে চায়, কেন্দ্রাতিগ শশী। কেন? জোসেফ কানরাড (১৮৫৭-১৯২৪)-কথিত The Task of the Artist থেকে বলি : ‘To snatch in a moment of courage, from the remorseless rush of time, a passing phase of life, is only the beginning of the task.’ এই টাস্কটুকু গভীর হয়ে ওঠে, শশী শুধু বাইরেরটুকু দেখে না, নিজেকেও দেখে, চেনে, জানতে চায়। প্রকরণের সারাৎসারটুকু গড়ে ওঠে, নির্বিবাদে, প্রবহমানতায়, কৃষ্টিমুখরিত আচ্ছন্নতায়। হতাশা বা নিরাশার দোলাচলতায় তার সমগ্রতার লয়টুকু ধরা পড়ে, সময়খন্ড ও স্বতঃস্ফূর্তজাত, সম্মুখগামী বিবর্তন-দ্বন্দ্বও দর্শনদায়ে সৃজিত। শশী গোপালকে দেখে তার অভিপ্রায়টুকু জানায়, সেটি মানস-সংস্কারজনিত, প্রতিজ্ঞাঋদ্ধ তাপে ঐতিহ্যিক :

ডাকাতের মতো দেখায় গোপালকে, খুনে দাঙ্গাবাজের মতো শোনায় তার কথাবার্তা। অমূল্যের ঘরে যে বিচিত্র কথোপকথন চলে, তার কিছুই শ্রান্ত শশীর চেতনায় পৌঁছায় না; জীবন সম্বন্ধে যে অমন তীব্রভাবে সচেতন, সে হইয়া থাকে পুতুলের মতো চেতনাহীন! তাকেই বাৎসল্য করে বলিয়া মধ্যরাত্রে গোপাল আজ যে বিচিত্র দৃশ্যের অবতারণা করে, যে সব অদ্ভুত কথা বলে, তা দেখিলে ও শুনিলে একটা অভিজ্ঞতা জন্মিয়া যাইত শশীর।

আসলে ‘জীবনের গতি দুজনের বিপরীতগামী’, দুজনের পথ দুদিকে। কিসে পার্থক্য তাদের! সে-পার্থক্যই তার অভিজ্ঞতা। আর ওই অভিজ্ঞতাই তার ইতিহাস। সংস্কারে-পুরাণে আটকানো। গভীরের গহনে তুমুল দৃকপাত। পিতাপুত্রের সম্পর্কের একটা রূপ এতে পুনর্গঠিত। গোপাল ছেড়ে যায়, বিত্ত-সম্পত্তি শশীকে অর্পণ করে, কী এক কানাকানি অস্পষ্ট অনেক মানুষের চুপচাপ কথাবার্তায়। স্থির সেসব কানকথা, কিন্তু তাতে লজ্জা বা ‘চলিয়া যাওয়ার’ অভিপ্রায় কেন, এতেই কি সে মুক্তি খোঁজে, সে তো হরোস্কোপের দলে নয় কিন্তু লীন-আত্মার মুখপানে কোনো অদৃশ্য আস্তানার পথে – হোক সে কাশী বা কোনো পুণ্যস্থানে। কিন্তু এটিই কি শেষ কথা! শেষ যাত্রারথ। কিন্তু ফেলে যায় কি? পড়ে থাকে কত স্মৃতি, মুগ্ধতা আর অনেক অজানা প্রশ্ন কিংবা সমাজ-সংসারের প্রভূত হাসি-কান্না-আনন্দের চিরকালীন বার্তা। সেটি তো মুছে যায় না, না শশীর বা গ্রামবাসীর অন্তর থেকে। হয়তো আলোড়ন একেকজনের একেক রকম, আলোড়নের স্পন্দন বা স্বরে আছে মিহি ও মোটা অভিপ্রায়, কিন্তু গোপাল গাঁওদিয়ায় অচ্ছিন্ন – এ তো অনস্বীকার্যও বইকি। একই অঙ্গে তুলে আনি আরো আলোড়ন-স্পন্দিত যাদব বা যামিনীকে – বিশেষ করে যাদবকে। উপন্যাসে তার পরিচয়পর্ব থেকেই এক আগ্রহী ও অভিনব মনরূপে তাকে চিনে নিতে হয়। সম্মান তার অনেক। গ্রামে তার প্রতিদ্বন্দ্বী কে! তার সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা কার সাধ্য। সে-সাধ্যটি শশীই বা পায় কোনভাবে! আদৌ তো ঠেকাতে পারে না কেউ, অচল-অবিচল বিশ্বাসের পারাবতে কে হবে তার মুখোমুখি, কেউ কি তার সিদ্ধান্ত দিতে পারে কিংবা পাল্টে দিতে পারে তার সিদ্ধান্ত। মহীরুহ, কিন্তু কোন ভিত্তিতে তার শ্রদ্ধা, কিসের কারণে তিনি শ্রদ্ধার পাত্র! একে কি বিশ্বাস করা সম্ভব। গুঞ্জন অনেক প্রকারে। প্রশ্নও নানা মতো। আত্মহত্যা বা আত্মসংস্কার, পরম্পরা, বিদেহী শান্তি, জন্মচক্রের অবসান ও আত্মলীনতা – ইত্যাকার প্রশ্নে কিনারায় আরো জমাট বাঁধা অনেক প্রশ্ন। শর্তসাপেক্ষ প্রশ্ন। তা ছড়িয়ে যায় বস্ত্তনিরপেক্ষতা, নৈর্ব্যক্তিকতায়। পৌঁছায় স্থান-কালনিরপেক্ষ বিম্বে। কিন্তু সত্যিই তা সবকিছু কার্যে পরিণত হলে, কোনোকালেই এ-গ্রামের মানুষ কেউ তা গ্রহণ না করলেও এ-‘গ্রহণধরা’ মানুষটি হারান না, হারিয়ে যান না। নানাভাবে গুমোট আলোচনার কেন্দ্রে হয়ে ওঠেন জীবিত। সেটি কাজেরও অংশ করে কেউ। আলাপ-আড্ডা-মারাত্মক সব ব্যাখ্যা এই তো জীবনের অংশ। উপন্যাসটির শুরুতে যে হারুর মৃতশরীর সম্মুখে প্রকাশপর্ব তৈরি করে, তা তো অনেককাল মুখে থাকে, আলাপে-আড্ডায় সার্বক্ষণিক অবিচল। আবার নিত্য কর্মপ্রবাহের সমারোহে কোনো অচেতন মুহূর্তে তা হারিয়েও গেছে। এক ঘটনার ভেতরে চাপা পড়ে যায়, গড়ে ওঠে অন্য ঘটনা, প্রাধান্য তো বর্তমানকে ঘিরে, বর্তমান যাকে গ্রহণ করে সেই তো গুরুত্ববহ, গুরুতররূপে এ-অঞ্চলে, আঞ্চলিকতা ছাড়িয়ে পুরাণে-ইতিহাসে বর্তায়। কিন্তু সমাজটুকুর মালিক কে? কে কর্তৃত্ব করে, শ্রেণিই বা তৈরি করে কে। মর্যাদার বৃত্তটি কীভাবে রচিত হয়! আধার সংস্কার-কুসংস্কার-বিশ্বাস-অদৃষ্ট-নিয়তিনির্বন্ধ তাই আঁধার করে তোলে প্রত্যেকের জীবন, অর্থাৎ এ-গ্রামের অনেককাল বসতির জীবন। এ-জীবন যাদের হাতে বাঁধা, তা ওই অাঁধার-অন্ধকার। বিপরীতে আলো দিতে চায়, ফোটাতে চায় নতুন বিশ্বাস, আলোকিত মনে ভরাতে চায় অনাগত রূপ – শশী, তাইতো তার সবকিছু ছেড়ে এ-গ্রামে ফেরা, গ্রহণ করা সবকিছু – কিন্তু সেটি তো শেষ পর্যন্ত এক বিদিত রূপ ধরে না। বোধ করি নিজের প্রশ্নেই, নিজের জগতেই – যেটি এ-গ্রামে না ফিরলে সেও খুঁজে পেত না। শশী তো মানিকের মনরূপ ধরে এসেছেন! নইলে এত আলোময় আলোড়িত প্রশ্নের উৎস কী? পাশাপাশি সমাজ-শ্রেণি-কর্তৃত্ব আর তার ভেতরের জটিল মন, সূক্ষ্ম তারে বাধা মন, প্রণয়ী মন, প্রেমপ্রবণ সত্তা – সবকিছু মিলে দাঁড়াবার শক্তি! শশী সবকিছুরই মুখোমুখি হয়েছে। মুষ্টিমেয় নয়, অনেককিছুতে। সাড়াশব্দে উদ্যোগী, উত্তোলিত অনেকানেক। আর তার কেন্দ্রে গূঢ় রহস্যময় নিয়তিসাধিত মন। তবে সমাধান নয়, তার তো দরকারও নেই। মানিক দরকারে গড়েননি তাঁর শিল্প। প্রবণতায় যা অধিকতর তাই লেপন করেছেন, বিস্তারিত প্রয়াসে।

 তিন

পুতুলনাচের ইতিকথার আখ্যানভাগের বড়ো অংশ শশী ও কুসুমের অভ্যন্তরীণ প্রবৃত্তি-প্রণোদনা। এটি গড়ে ওঠে কার্যকারণ সম্পর্কের দ্বন্দ্বময় অভিমুখের তাৎপর্যে। প্লটের প্রথমাংশে গৌণ-চালে প্রবাহিত হলেও ক্রমশ তা হয়ে ওঠে কাহিনিকেন্দ্রের মুখ্যবিন্দুতে। কার্যত, শশীর জীবনই যেন চালিত হয় কুসুমকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বে, যেটি এখানে উল্লেখ হয়েছে, পুতুলনাচের ইতিকথা শুধু বহির্দেশীয় সমাজ-ক্রিয়ার স্তম্ভিক-সাক্ষ্য নয়, এটি মনের এবং অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিমনের – বিশেষ করে শশীর। ফ্রয়েড-কথিত অবদমন এর উৎস : ‘repression is the most important, … when a person experiences an instinctual impulse to behave in a manner which the super-ego deems to be reprehensible, then it is possible of the mind to push this impulse away, to repress it into the unconscious’ শশী গূঢ়তর এ-প্রতিক্রিয়ায় অপেক্ষা করে কুসুমের, কুসুমের আচরণিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বায়ুবাহিত আবেগ-রেণুর উৎস তার পুরুষমন, শশী অনুরাগ-বাঞ্ছায় সম্মুখগামী, ‘the repressed instinctual drive, as an energy-form, is not and cannot be destroyed when it is repressed – it continious to exist intac in the unconscious, from where it exerts a determining force upon the conscious mind, and can give rise to the dysfunctional behaviour characterstic of neuroses.’ সত্যিকার অর্থে, এ-প্রসঙ্গটি বুঝে নেওয়া যায় উপন্যাস-কথকের অভিজ্ঞানে : ‘খোলা মাঠে বিলীন কায়েতপাড়ার নির্জন রাস্তাটি আজো শশীর জীবনে রাজপথ হইয়া আছে, যে তাকে যতটুকু নাড়া দিয়াছে এই পথে তাদের সকলের পড়িয়াছে পদচিহ্ন। তাহাদের মধ্যে অবশিষ্ট আছে শুধু কুসুম, এ পথে আজ শুধু কুসুম হাঁটে।’ তার পরে অনেকবার সে বিস্তর কর্মের ভেতরেই কুসুমের পদচিহ্ন খুঁজে পায়। অনাবশ্যক-আবশ্যক নয়, এক অনপেক্ষ শক্তির ইঙ্গিতে, দৃঢ়তর সচেতন মনোবাঞ্ছায়, সত্যিকারের তপ্ত প্রণোদনায়। এতে আচরণের অসংলগ্নতা, ব্যক্তিত্বের-অনাসক্তি, এলোমেলো মনের প্রান্ত-কাঠামো, বিকার-অবিকারের ভেতরে ভয়, কষ্ট, কৌতূহল দুর্দমনীয়রূপে প্রকাশিত। কাহিনি তার এক প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক চরিত্রকে খুঁজে পায়। যে-কল্যাণের কারণে সে উচ্চাশী আবার এক ‘কুসুম-কামিনী’র মধুর ধূপে তা সংরক্ত, বিবিক্ত; নিশিকুটুম্বর সান্নিধ্যই অগ্রভাগে, তাতে ক্ষতিপূরণ আর কেমন! পুরো কাহিনির বিস্তর ধারাটি এমন চরিত্রের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হলে, কুসুমের স্বামী পরাণ, তার চিকিৎসা আর অন্যদিকে ‘ছেলের মতো ভালোবাসিবার জন্য নিজস্ব একটি’ সেনদিদির সন্তান, রটনা-ঘটনায় এক উৎফুল্ল উদ্যাপন, এটিও প্রত্যক্ষ ও আকর্ষণীয়, তাতে চিনে নেওয়া যায় জৈবিক মন  – আর মানিকের লেখকমন, বিস্ময়কর সব অবিশ্বাস্য কর্মকান্ডের গভীর প্রান্তমুখ!

‘মনটা কেমন করিয়া ওঠে শশীর। হয়তো পরশু, তার পরদিন কুসুম গাঁ ছাড়িয়া যাইবে, আর আসিবে না।’ – মনের ভেতরের পুনর্গঠিত সত্তা, পরতে পরতে তার প্রজাপতি-রঙিন পাখা, অনুরাগের স্তরে স্তরে অতিক্রম করা সামাজিক অবগুণ্ঠন, ভেতরে কামনার প্রসারিত তরঙ্গ, গড়ে ওঠে বিস্তর জোনাকি ঝলমল অনুভব – প্রশ্নদীর্ণ অনুভব – কেন সে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে, এই পরিচিত জীবনরাস্তায় যে কুসুমকে সচক্ষে দেখে, আলিঙ্গনের বাঁধনে জড়িয়ে থাকে – যে-দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছে তার জীবনে – সে কীভাবে তাকে ‘ছাড়িয়া যায়’! শশী ভাবতে পারে না, এ-প্রকৃতির সবকিছু বিসর্জিত মনে হয়, বিস্তর আনন্দ-পাখা অস্বীকারের পালে বাতিল হয়ে যায়, শশী যে-পথের পদচিহ্নে গরবিনী ছিল, সে-পথ এখন দুর্বিষহ, বহু উন্মত্ততার স্মৃতিতে ক্রুদ্ধ, বিবাগী, বাত্যাতাড়িত নন্দনের ধস। এভাবে আচরণে পাল্টায় শশী। অভিব্যক্তি হয়ে ওঠে বিষণ্ণতার, দুর্মর হতাশার। কোনো পেছন ফেরা মানুষ নয়, কিন্তু কেন সে সবকিছু অাঁকড়ে ধরে আছে! এই গ্রামের সাফল্য, নিজের জীবনের সাফল্য, মানুষের উপকার-অভিপ্রায়, হাসপাতাল গড়া, ঘরে ঘরে জীবনের আলোর পথ খুলে দেওয়া, তর্কে-বিতর্কে মানুষের সদা-আনন্দের অভিনন্দন – সবকিছু কার জন্য, শশীর জীবন কেন এত উজ্জ্বল ছিল – সবকিছুর কেন্দ্র কি কুসুম! কুসুমই কি তাকে এতদূর পর্যন্ত টেনে আনে, সেই কি তার প্রেরণা? এই প্রেরণাই কি তার জীবনের সমস্ত স্বপ্নগুলোকে খুব বড়ো দামে কিনে নিয়েছিল! এখন কুসুমের গ্রাম ছাড়লে তার কী? পরানের বউ গ্রাম ছাড়লে শিক্ষিত শশী কেন এত অনাচার করে নিজের ওপর! সে ডাক্তার, তার সেবা-কর্তব্য সবকিছুই কি কুসুমের জন্যই সম্মুখে চলছিল? এ প্রণয় বা সংসর্গের দূত কেন শশীকে দুর্বল করে ছাড়ে! এমন প্রশ্নবিদ্ধ প্রতীকপ্রবণ সমাজ, প্রতিনিধিত্বশীল বঙ্গীয় গ্রাম গাঁওদিয়ায় যে ঘন ও গূঢ় কাহিনি গড়ে তোলে – সেখানে শশী ডাক্তার শুধুই গ্রামের সংস্কার-কুসংস্কার-কূপমন্ডূকতার অন্ধরাশিতে আটকানো গণপ্রতিনিধি নন, ব্যক্তির রহস্য আর নিজের অভ্যন্তরীণ সংকটের মাত্রাটুকু ধরিয়ে দেওয়ারও আকাঙ্ক্ষা তার, তাতেই সদ্য পুঁজির-প্রসারে পুনর্গঠিত একটি শ্রেণি-চরিত্রের সন্ধান মেলে। এছাড়া নিশ্চল ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত সমাজ-কাঠামোর ভেতরে বহু পুরনো নিস্তরঙ্গ সময়, জীবনপ্রবাহের অবিনাশী উপচার, আরাধ্য জীবনের প্রতুল আকর্ষণ, ঋষি-তাপিত জমিনে পেটানো ভাববাদী আদর্শ, নিয়তির শিরোধার্য কুশল আর জৈবিক প্রবারণার প্রতাপশীল ইঙ্গিত এ-উপন্যাসে চিরন্তন ও চলতি সমাজের চাকাটিকে প্রকাশিত করে ফেলে। এটি স্থবির সমাজের সচল চাকা (রথ)। এই সচল রথটি এ-সময়ে এই একুশ শতকের গ্লোবাল বিশ্বেও সংজ্ঞার্থ অর্জন করেছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত তার তাপ ও ভাপ। এই বৈষম্যময় সমাজকাঠামোয়  এখনো গ্রাম এই গাঁওদিয়ার নিয়তি-ভূতে অবিনশ্বর। সে গাঁওদিয়ায় যামিনী-যাদব যেমন আছে, তেমনি আছে পরাণের বউ, মতি, হারু, গোপাল বা সেনদিদি। একইরূপে, একই সংস্কারে তারা কি অপরিবর্তনীয়? মৌল কাঠামোতে দেখা যায় কি কোনো পরিবর্তন? উপরকাঠামোর পরিবর্তন ও প্রসার আছে, হাতে হাতে ইলেকট্রনিক উপাদান বা স্যাটেলাইটের ক্যাবলে আটকে গেছে দাপুটে বিশ্বের কর্পোরাল নানা ক্যারিকেচার। কিন্তু মৌল কাঠামোটি কেমন? এই চরিত্ররা কি অদৃষ্টকে অস্বীকার করে? মানিক মৌল-কাঠামোতে নিঃশঙ্ক নন্দনের ছোপ এঁকে দেন। গড়ে তোলেন শঙ্কিত সমাজের দৃপ্ত ইমারত। প্লটের কার্নিশে বুনে তোলেন অভিপ্রেত ব্যক্তি-প্রণোদনা। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দোলাচলতা, অদৃষ্টের অপচিত অবভাস, জড়তা-স্থবিরত্বের সংকেত ও তার ব্যক্তিদায়, নেতি-অহংকে। সেটি পেরোনোর অভিমুখে কর্মস্রষ্টার এই অশেষ কঠিন ও অসামান্য সৃজনপ্রণালী। কিন্তু এমনটি কি প্রকরণ-পদ্ধতিতে পরিস্রুত? সেটিতেই শশীর আচরণিক প্রয়াসটি অভিপ্রেত করে তোলেন লেখক। যাবতীয় কর্মকান্ডের ভেতর চলমান শশীর বাধা ও বিঘ্নতার অতিক্রমণ-প্রয়াস। বহুকালের নিশ্চল ক্ষেত্রটির চিহ্নিতকরণ এবং সেটির জড়ত্ব-দ্বিধাজর্জর আস্তরণভেদী অভিপ্রায়, অদৃষ্টের অপচয়কে বাতিলগণ্য করে তোলা – এরূপ কর্মের প্রণালিটুকু শশীর প্রত্যয়ে বৃদ্ধি পেতে চাইলে সেও মধ্যবিত্ত ভাবাবেগে জড়িয়ে পড়ে – তার ভেতরেই। আভ্যন্তরিক প্রকাশ মিইয়ে পড়ে। সেটিও গড়ে ওঠে কুসুমকেন্দ্রিক কামরাগবাসনার মঞ্জুলিতে। সেটি বিস্তারিত হয়, বিস্তরণ লাভ করে – ওইরূপ অভিপ্রায়ের ভেতর দিয়ে। মনোবিকলন স্বতঃধার কিনারায় ধাবিত। সমাজদ্বন্দ্বের কাঠামোতে উপরিস্তর গড়ে, ভেতরতলের চলমান রূপান্তরিত অভিমুখ ক্রিয়ায়। পুতুলনাচের ইতিকথার প্রণালিতে ধরা পড়ে কুসুমকেন্দ্রিক প্রশ্ন-জিজ্ঞাসার নানা অন্তরাল ও অভিব্যক্তির সঞ্চরণ। এই আচরণ, চারিত্র্যময় আবর্ত-অভিমুখ, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আখ্যানে দুটি কৌশলকে চিহ্নিত করে। এক. বঙ্গীয় গ্রামসমাজের দ্বান্দ্বিক বস্ত্তকেন্দ্রিক বিবর্তনবাদী ইতিহাস নির্ণয়, যেখানে সামগ্রিক সমাজের চ্যুতি-উন্নতির দিক-নির্ণয়, দুই. প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিশাসিত ব্যক্তির ভাবাবেগের বৈজ্ঞানিক পরিকাঠামো চিহ্নিতকরণ। উপন্যাসের প্রথমোক্ত বিষয়টি চিহ্নিত হয়ে দ্বিতীয়োক্ত কর্মকৌশলের ভেতর দিয়ে। সেখানে শশীর মন-মনন-মনস্তত্ত্ব বিচিত্র বীক্ষণে পুনর্গঠিত। এ বিচিত্রতার একটি নতুন স্বর ধরা পড়েছে। জৈবিক মন ও তার মনস্তরের ইগো-তাত্ত্বিক অনুষঙ্গসমূহ। তত্ত্বটির চেয়ে এতে স্বতঃস্ফূর্তময় অমোঘ কার্যকারণসিদ্ধি। সমাজ ভাঙনের কারুণ্যে শশী-কুসুম সম্পর্কের সংশ্লেষ-বিশ্লেষ, জারণ-বিজারণ। মানিকের শিল্পের কর্মপ্রয়াস চিত্রটি কোনো তত্ত্ব-ভারাক্রান্ত না করেও এর উচ্ছল আশ্বাস আর উজ্জ্বল জীবনবিন্যাসের সূত্র আবিষ্কার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে না। তাই শশী ১২-১৩ পর্বাংশে ‘মনটা কেমন করিয়া ওঠে’রূপে অভিব্যক্তময়। কুসুমের চাক্ষুষ সংশ্রবে শশীর পরোক্ষ বিষণ্ণবদন-আভা, তাতে তার অনুরাগ বা বিবাগী জড় অস্থির অসংযত অনভিপ্রেত হৃদয়মুখটুকু অপ্রকাশ্য হয়। কাহিনির ন্যারেশনে প্রবহমান থাকে, তাতে ইতিহাস-পরম্পরা বা ঐতিহ্যিক কর্মকুশল অনিবার্য প্রয়াসে বর্ণিত হয়, আর তপ্ত দর্শনটি তো থাকেই :

কেন চোখ ছলছল করিল না কুসুমের? একবার বাপের বাড়ি যাওয়ার নামে আছাড় খাইয়া তাহার কোমর ভাঙিয়াছিল, যদি বা শেষ পর্যন্ত গেল, ফিরিয়া আসিল পনের দিনের মধ্যে। এখানে এমনভাবে হয়তো এই তাদের শেষ দেখা, এ জীবনে হয়তো আর এতো কাছাকাছি তারা আসিবে না, আর আজ একটুও কাঁদিল না কুসুম, গাঢ় সজল সুরে একটি আবেগের কথা বলিল না? কুসুমের মুখে ব্যথার আবির্ভাব দেখিতে শশীর দুচোখ আকুল হইয়া ওঠে, অস্ফুট কান্না শুনিবার জন্য সে হইয়া থাকে উৎকর্ণ। কে জানিত কুসুমের দৈনন্দিন কথা ও ব্যবহারে মেশানো অসংখ্য সংকেত, অসংখ্য নিবেদন এত প্রিয় ছিল শশীর, এত সে ভালবাসিত কুসুমের জীবনধারায় মৃদু এলোমেলো, অফুরন্ত কাতরতা? চিরদিনের জন্য চলিয়া যাইবে, আর আজ এই তালবনে তার এত কাছে বসিয়া খেলার ছলে কুসুম শুধু বাজাইবে চাবি! কি অন্যায় কুসুমের, কি সৃষ্টিছাড়া পাগলামি!

এর মধ্যে শশীর আকর্ষণ বা কুসুমের ‘ব্যর্থ’ অভিপ্রায় মুখ্য নয়, গ্রামসমাজের আভ্যন্তর শক্তির সংস্কার-অহংকার, ভাবানুরাগ, স্মৃতি-নস্টালজিক নার্সিসাস প্রতিশ্রুত। সমাজধৃত জীবনের উপলক্ষটি ধরা দিয়েছে – সংহারমূর্তিতে। সেখানে ‘such behavioral symptoms are highly irrational, but are completely beyond the control of the subject because they are driven by the now unconscious repressed impulse’-এটুকু চেতনস্তরের কাঠামো, সে-চেতনস্তর নিশ্চয়ই সমাজধৃত সংহারমূর্তির প্রচল প্রবাহ। অচেতন সত্তাটিও গড়ে ওঠে অভিজ্ঞতার সারাৎসারিক মৌলখন্ডে, সেটির ভেতর-ওপর দুস্তরেই যৌক্তিক পরিসর রচিত হয়, প্রাত্যহিক দ্বান্দ্বিক প্রচ্ছন্ন বা প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। তাই শশীর মনোজগৎ যে-রূপে উপন্যাসটিতে অভিব্যক্ত তার একটি ফ্রয়েডীয় দাবি যেমন আছে, তেমনি এর বাইরেও সমাজভিতের দ্বন্দ্বসূত্রটি অভ্রান্তরূপে উৎকীর্ণ হতে সমর্থ হয়। পুতুলনাচের ইতিকথার মূল্যজ্ঞান সে-পরিসরেই বিবেচ্য।

 চার

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিছক কোনো চরিত্র সৃষ্টি করেননি, উপন্যাসও তাঁর তুচ্ছ আখ্যানে প্রতিশ্রুত নয়। এক সূক্ষ্ম দৃষ্টিকোণে যেমন তিনি কাহিনি বানান, তেমনি চরিত্র সৃষ্টি করেন। পুতুলনাচের ইতিকথার শিল্পী শিল্পের আত্মা খুঁজেছেন, অনাদ্যন্ত অভিপ্রায়ের প্রত্যাশায়। দৃষ্টিকোণে গড়ে দিয়েছেন ভঙ্গুর সমাজ আর রোগগ্রস্ত উপসর্গের রাশিকৃত আকরণপুচ্ছকে। তাতে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি নয়, সামগ্রিক অন্তর্বয়ন যৌক্তিক আবর্তমাফিক ভূমি-বায়ুর সংশ্রবে তপ্ত হয়ে উঠেছে। এতে নায়ক শশী তার দৃশ্যমান সমাজের সবটুকু যেমন বিবেচনায় এনেছে, তেমনি তার নিজের সমস্যাতেও হয়ে উঠেছে প্রশ্নজর্জর। এক্ষেত্রে শিল্পের তুলিতে আড়াল হননি কেউ। কোনো বিষয় একপাক্ষিকও হয়নি। ভেতর-বাহির, আলো-অন্ধকারের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াটুকু হয়েছে নির্মম ফ্রেমবন্দি। সমাজরোগের খুঁত ধরে এক অমোঘ জীবনের পরোক্ষ প্রতিশ্রুতি গড়েন লেখক – কাঙ্ক্ষিত দৃষ্টিকোণে। এটিই মানিকের দৃষ্টিকোণ। এর ভেতরেই নির্ধারিত শিল্পের অমলিন কাঠামো স্পষ্ট হয়। এক্ষেত্রে একটু অনিমেষ অভিপ্রায়ে স্বীকরণে আনা যায় : ‘Art is long and life is short’, and success is very far off. And thus, doubtful of strength to travel so far, we talk a little about the aim – the aim of art, which, like life itself, is inspiring, difficult — obscured by mists. It is not in the clear logic of a triumphant conclusion; It is not in the unveiling one of those heartless secrets which are called the laws of nature. It is not less great, but only more difficult. মানিক তো এমন শিল্পের শিল্পী! অনেক বড়ো লেখক তো এই কাজটুকুই বুঝিয়ে দেন। অবশ্য, এই একটি উপন্যাসে তার সে-বিচার চলে না, কিন্তু মহৎ আর্টের অভিমুখটুকু তো এতে বুঝে নেওয়া সম্ভব।

শেয়ার করুন

Leave a Reply