নিরপেক্ষ স্বাদ, রং, শব্দ এবং আগামীকাল – এই যদি হতো জীবন? কথাটা ভাবতে ভাবতে মৃত পোষ্যের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল প্রায় সুমনা। পেট ডক্টর গ্লাভস খুলতে খুলতে হাসিমুখে সুমনার সামনে একটা ট্যাব রাখলেন।

এখানে দারুণ সব ব্রিড পাবেন। কবে নিতে চান জানাবেন।

গাম্ভীর্য ধরে রেখে সামান্য হাসলো ও। আঙুলের ডগা ছুঁয়ে ক্যাটমার্কেটের পেজ উল্টেপাল্টে নিল একটু।

ওয়েল ইটস্ ডান। কথা হচ্ছে তাহলে।

নিশ্চয়ই। ক্যাট থেরাপি সেন্টার থেকে যে-কোনো সার্ভিস আপনার জন্য কিন্তু ফ্রি। কেবল টাইমটা জানালেই হবে।

একশবার ডক্টর।

সুমনা অ্যাপ্রোন, হাতের গ্লাভস সব খুলে ক্রমাগত আসতে থাকা ফোন কলটা রিসিভ করলো। অপরপ্রান্ত থেকে উত্তেজিত ভঙ্গিতে যা যা বলা হচ্ছে তাতে যে তার কালঘাম ছুটেছে বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু সুমনা স্থিরচিত্তে লিফটের সহযাত্রীদের সঙ্গে হাসিবিনিময় করলো। পার্কিংয়ে এসে গাড়িতে ওঠার পর কথা শুরু করলো।

ফোনটা রাখো আর তুহিনকে কল দাও। ওকে বলবে রাতের ভেতর বাংলাদেশে ঢোকা চাই। বাই। হাফিজ, ট্রাফিকের অবস্থা কী? ধানমন্ডি যাওয়া যাবে আধা ঘণ্টার ভেতর?

অফিস যামু না তাইলে?

না, আনাসের স্কুলে চলো আগে।

ব্যাগ থেকে ট্যাব বের করে নির্দিষ্ট মেইল খুললো সুমনা। ঝাড়া নয় মিনিটের একটা ভিডিও তাতে। এরকম ভিডিও দেখে অভ্যস্ত ওর চোখ। ঘাবড়ে যাওয়ার বয়সও পেরিয়ে এসেছে; কিন্তু আজই এমন কিছু নিয়ে ব্যস্ত হতে হচ্ছে? বিরক্তির ভাঁজ দেখা দিলো কপালে, ভ্রুতে। এই তো গত সপ্তাহে পঞ্চাশ পূর্ণ করেছে মহাধুমধামে। সর্বশেষ ভার্সন অ্যালেক্সা উপহার দিয়েছে তুহিন ওকে। সেদিনও বনি অসুস্থ ছিল। ওর লোম ঝড়ে যাচ্ছিলো। খাচ্ছিলো না। সারা বাড়ি বেলুনে আর রঙিন আলোতে মোড়ানো ছিল। পুরনো ঢাকা থেকে খোদ ইলিয়াস বাবুর্চিকে দিয়ে রাঁধানো, এরপর বন্ধুদের নিয়ে হইহই – সবই প্রাণ জুড়িয়ে দিয়েছিল সুমনার। তুহিন মালদ্বীপে যাওয়ার পরদিন থেকেই বনির রক্তবমি। বাচ্চাটা ছিল বলেই একটা কিছু নিয়ে কথা বলতে পারতো ওরা সহজে। আনাসের সঙ্গে কীভাবে কথা শুরু করবে তাই নিয়ে একটু ভাবলো সুমনা। মনে করার চেষ্টা করলো শেষ কবে কথা বলেছে আসলে।

হাফিজ, তোমার ছেলেটা কোন ক্লাসে এখন?

নির্ভার হাসিতে হাফিজের মুখ উজ্জ¦ল হলো প্রশ্নটা শুনে।

ম্যাডাম পড়া তো ছাড়ান দিছি সেই করোনার সময়ই! হেই সময়তেই গ্রামে মাছের খামারে কাজ নিছিলো। বিয়াও কইরা নিছে পোলা!

কী বলো তুমি? আনাসের বয়সের না তোমার ছেলে?

ম্যাডাম বিশ চলে আর কী। গ্রামে থাকে। পরিবার ছাড়া চলতো ক্যামনে? জিনিসপত্রে হাত দেওন যায় না এমুন দাম। ওরটা ও কইরা খাইলে একটু তো বাঁচন যায়।

সুমনা আর কথা বাড়ালো না। এলাচ রঙের রেমিকটনের টপস পড়েছে, সঙ্গে ডেনিম। অতি আদরে রাখা ত্বকে আলো পিছলে যায় – এমন মুখে সুন্দর চোখটা জন্মগত। পঞ্চাশে পড়েছে বটে কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই। চুলে ট্রেন্ডি কাট তাতে সি-গ্রিন শেড।

গাড়ি থেকে নামতেই স্কুলের দেয়ালে হেলান দেওয়া ছেলেদের থেকে কেউ একজন উফ্ বলে উঠলো। বাকিদের মুখ যথারীতি ফোনের স্ক্রিনে নামানো। পার্কিংয়ে আনাসের গাড়িটা খুঁজলো সুমনা। না নেই। বজ্জাতটা নিশ্চয়ই খ্যাপ মারতে গেছে। সবে বেলা এগারোটা বাজে। আড়াইটা নাগাদ ছুটি হবে স্কুল। সোজা প্রিন্সিপালের অফিসে চলে এলো সুমনা, ওকে দেখে অফিসঘরটায় একটা আলোড়ন উঠলো যেন। সরাসরি জানালো, আনাসকে নিয়ে যেতে এসেছে। স্মিত হেসে ফোনে নির্দেশ দিলেন তিনি। হালকা সৌজন্য আলাপ সারতেই আনাস চলে এলো। সুমনাকে দেখে বেশ অবাক, চোখে-মুখে তাচ্ছিল্যের ছায়া টেনে বললো, আন্টি আপনি?

বাড়ি চলো, কাজ আছে।

বাপি ফিরেছে?

চলে আসবে, সেসব নিয়েই কথা আছে।

তুহিনের মতো ভয়ানক রূপ ছেলেটার। লম্বায় এখনি বাপকে ছাড়িয়ে গেছে। পাতলা গোঁফের রেখা না থাকলে আরো সুন্দর লাগতো। বেশ ফাঁপানো চুল। স্কুল ড্রেসে অনেকদিন পর দেখলো আনাসকে সুমনা। হাফিজ গাড়িতে বসে নাক খুঁটছিল। ওদের আসতে দেখে তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিল হাত। মুখে অভিনব কায়দায় অনুগত ভাবটুকু ফুটিয়ে তুলতে ভুল হলো না তার।

দুই

রংপুর শহর থেকে ষোলো মাইল দূরে গঙ্গাচড়া গ্রাম। অটো নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে কালামের প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। সামনে নির্বাচন। মানুষের উত্তেজনাও বিপুল। শুধু ওরই কোনো কিছুতে যায়-আসে না। যাত্রীরা কত কিছু নিয়ে রংতামাশা করে। রাগ হয়ে গালাগাল ছুড়ে মারে। কিন্তু কিছুতেই বিকার নেই ওর। ইউটিউবে নতুন কোনো ভিডিও ফাঁস হলে আজকাল গ্রামের কৃষকও উল্লাসে ফেটে পড়ে। চায়ের দোকানে আগের মতো টিভির টক শো দেখে না তারা। ঠ্যাঙের ওপরে ঠ্যাং তুলে গামছা দিয়ে মাছি মারে আর একে অপরের গায়ে টোকা দেয় ভিডিও দেখতে দেখতে!

শালার ব্যাটা, বড় বড় কথা এ্যাঁ! পাছার কাপড় তুলি মারা দরকার।

পাঁচ সিটের অটোতে কত কিছু ফাঁস হয়। এসব ক্ষেত্রে একদম বোবা-কালা কালাম। একসময় নামি হাউজের অনলাইন সেকশনে কাজ করতো। মগবাজারে দুই বেডরুমের সুন্দর বাসায় গোছানো সংসার ছিল ওর। কিস্তিতে ফ্ল্যাটও কিনেছিল বসুন্ধরায়। সেখানে ওঠার আগেই বানের জলের মতো ভেসে গেল সব। এক সকালে জানতে পারলো চাকরিটা নেই। সব বিক্রি-টিক্রি করে রংপুর চলে এলো। এখানে আসার এই চার বছরে একবারো মনে করতে চায় না ওই জীবন। একদলা থুথুর মতো ফেলে এসেছে যে-জীবন, সে-জীবনের গল্পও করতে চায় না কালাম। পচা, মাছিবসা গন্ধওলা চামড়া গায়ে ঘুরছে মানুষ সেখানে। হাবিয়া দোজখের আগুনে পুড়েও তারা বলছে – চমৎকার আছি, সুখে আছি।

কালামের অটোতে থাকা যাত্রীদের গা থেকে ঘামের দুর্গন্ধ আসছে ভুরভুর করে। সস্তা বিড়ি ফুঁকছে কেউ কেউ। এরা জমিজমা বণ্টনের হিসাব করে, পাটের দাম নিয়ে কথা বলে। সারের জন্য, বীজের জন্য ছোটাছুটি করে। আয়রন করা জামা গায়ে, সুগন্ধি মেখে পলিশ জীবনের ফাঁক-ফোকর থেকে নোংরা ঘাঁটাঘাঁটি করতো যখন, এই মানুষগুলোর মতো হাসতে জানতো না কালাম। অফিসে ওর কলিগদের একজন সেফুদার ছবি কম্পিউটারের ওয়ালপেপার করে রেখেছিল। সেফুদার ভিডিও এলেই সারা অফিস হাসিতে ফেটে পড়তো। সঠিক না ভুল তা নিয়ে কারো বোধ কাজ করতো না। কে কার আগে হলিডে রিসোর্টে গিয়ে ছবি দেবে সোশ্যাল মিডিয়ায় – সেই প্রতিযোগিতা চলতো নীরবে। কালাম যখন ফ্ল্যাট কিনলো, মোটরসাইকেল কিনলো, সবাই পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু ভেতরে ভেতরে জ্বলছিল ওদের বুক। কালামেরও জ্বলতো অন্যদের সুখ, সমৃদ্ধি দেখে। যাত্রীরা যে যার গন্তব্যে চলে গেছে। কালামকে আরো সামনে যেতে হবে। পরিবেশ অধিদফতর থেকে নোটিশ এসেছে এক মাস হলো। অটো উঠিয়ে দিচ্ছে সরকার রংপুর থেকে।

কালাম জানে, নির্বাচনের পর আবার ঠান্ডা হয়ে যাবে সব। একটা মহল টাকা খাচ্ছে এই সুযোগে, এই যা। গত বছর আলুর ব্যবসায় মার না খেলে আর একটা অটো নামাতে পারতো রোডে। বিধি বাম! সেই বিধিই ডান দিকে ঘুরে যাওয়ার একটা ফোন এসেছিল আজ সকালে। ভাবতেই পারেনি তুহিন শালা ওকে খুঁজে বের করবে। ইঁদুরের বাচ্চাটাকে এবার নখে, দাঁতে কামড়াবে কালাম।

অটোর ইঞ্জিন গোঁ-গোঁ শব্দ করে

থামলো যখন পাড়ায় শেয়ালের ডাক দ্বিগুণ হলো। বাড়ির প্রবেশমুখে হাসনাহেনার ঝোপ। গোটা পাড়ায় ছড়িয়ে গেছে সে-ফুলের মাতাল গন্ধ। কালামের মাথা ধরে যায় যদিও। সেমিপাকা দেয়াল আর টালির ছাদ দেওয়া তিনটে ঘরের কাঠামো নিয়ে ছোট্ট বাড়ি। গ্যাসের দাম চড়া। পল্লী বিদ্যুতের বিলের দিকে তাকালে চোখই জ্বলে যায় এমন। ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে কালাম আর ওর বউ নিজেদের যে-জীবনে সঁপে দিয়েছে, তার কথা কেউ ভাবতে পারেনি আগে। পাতা-খড়ির চুলা আর স্থানীয় এনজিওর দেওয়া সৌরবিদ্যুতে বাড়ির নিত্য কাজ চলে। কালাম সন্তর্পণে ঘরে ঢোকে। যেন কারো ঘুম না ভাঙে। আলমারির একদম ওপরের তাক থেকে বিস্কুটের কৌটা নামায়। কম্বলের পেছনে থাকায় নাগাল পাচ্ছিল না প্রথমে। শব্দ করবে না করবে না তবু একটা বিশ্রী আওয়াজ হলো। গভীর ঘুমে সবাই, ফলে নিশ্চিন্তে শ্বাস ছাড়লো একটা। কৌটাটা নিয়ে অটো রাখার বারান্দায় চলে এলো। ভেতরে একটা নিরীহ মেমোরি কার্ড আছে। কিন্তু কালাম জানে মোটেও নিরীহ কাজ করছে না ও।  কত কিছু হারালো, নষ্ট হলো – এই চিপটা কেন যেন এখনো ওর কাছে যত্নে আছে। এর বিনিময়ে পাওয়া পয়সা দিয়ে একটা মাইক্রোবাস কিনবে। রোজগার বাড়াতে টাকা চাই, অনেক টাকা। তুহিন চামার হোক, শয়তান হোক; কিন্তু ঠিক সময়ে কালামের কাজে লাগছে – এটাই এই মুহূর্তে সত্য।

তিন

বিশ্রী তেতো একটা সন্ধে পার করে সুমনা গলায় ক্রিম মাখছে। কতক জায়গায় নখের আঁচড়ে ছিলে গেছে চামড়া। জ্বলছে খুব। নিজের বুদ্ধির জোর ছাড়া কোনো কিছুকে ভরসা করে না সুমনা। পুরো দিনটা কুরুক্ষেত্র ছিল একেবারে। বড় পাপ হয়ে গেছে ওর বাপ-ছেলের ভালো করাটা। কুলাঙ্গারের ছেলে কি আর মহাদেব হয়ে জন্মায়! গোল্লায় যাক। ভস্ম হয়ে যাক সব। রাগে গজগজ করছে সুমনা। এই মুহূর্তে কাউকে বলতেও পারছে না কিছু। শহরে সবাই ওত পেতে থাকে কখন কার সর্বনাশ হয় সেই আশায়। কখন কোন দুর্বল মুহূর্ত ফাঁস হয় – সেই সময়ের জন্য সবাই লালা ফেলতে থাকে। সুমনা কাউকে বিশ্বাস করে না। আর করবে কী করে? দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণের পাপ তো সবার হাতে লেগে আছে। আর সেসব পাপদৃশ্য সংরক্ষণ করাটা ওর পেশা। মোটা অঙ্কের বেতন জমা পড়ে ব্যাংকে সেজন্য। ওর চারপাশের সবকিছু নকল সোনার জলে ধোয়া। শীতকালের বিকেলের মতো বিষাদের কুয়াশায় যেন ঘেরা। সুমনা তবু চেষ্টা করে বাইম মাছ হতে। পারে না। পারা যায় না। পারতে দেওয়া হয় না। ঠিক লালবাগ কেল্লার মতো সেই ইমারত আছে, কিস্তু সেই মানুষ নেই। এখানে সত্য কাচের ঘরে সাজানো থাকে। দর্শনার্থীরা দেখবে, ঘুরবে শুধু। এই কাচ কোনো প্রকারে ভেঙে যাতে না যায় এই দায়িত্বটুকুই সুমনার। ওর মতো আরো অনেকের।

বিকেলে যখন আনাস হিংস্র নেকড়ের মতো ওর গলায় দশটা আঙুল গেঁথে দিচ্ছিলো তখন এক মুহূর্তের জন্যে মনে হয়েছিল – ইস্! ছোট আপার মতো স্কুলে পড়ালেই বুঝি ভালো করতো। কিন্তু পরক্ষণেই যুদ্ধে পরাস্ত আনাসের কদাকার আঙুল সরে গেল যখন গলা থেকে সুমনা নিজের অস্ত্রের ধারে মুগ্ধ হয়ে গেল! ক্লিওপেট্রার মরণঘাতী সাপের চেয়েও বিষাক্ত সাপ পোষে সুমনা। তা হলো এই অথর্ব সম্পর্ক।

সুমনার কাগজে-কলমে এটা দ্বিতীয় সংসার। তুহিন ছেলেকে নিয়ে একা থাকতো। ওর প্রথম বউ এষা বাইরে চলে গেছে প্রবাসী বিয়ে করে। ওদের বিভিন্ন জায়গায় ডেট করতে করতে তখন মনে হয়েছিল একসঙ্গে থাকা যায় এবারে। কিন্তু আনাস মোটেও বিয়েটা মেনে নেয়নি। সুমনার নিজের মেয়েকে কাছে রাখতে সাহস পায়নি পর্যন্ত। দার্জিলিংয়ের বোর্ডিং স্কুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। আজ বুঝতে পারছে কত সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল সেটা। তুহিন এখনো ফেরেনি মালদ্বীপ থেকে। ছেলের কুকর্মের কথা জেনেও ফেরেনি যখন বুঝতে পারলো শক্ত কোথাও দাঁও মেরেছে তুহিন। বেশ ভালোভাবেই সুমনা শুরু করেছিল আলাপ আনাসের সঙ্গে।

তুমি জানতে না ওখানে ক্যামেরা বসানো ছিল আনাস?

চকলেট ড্রিংকে চুমুক দিতে দিতে আনাসের কাঁধ নড়েছে প্রশ্নটা শুনে শুধু।

এই যে ভিডিওটা দেখলে। এটার জন্য কী কী হতে পারে সেটা বুঝতে পারছো তুমি?

আজকাল সবার এরকম আছে। এসব কেউ দেখেও না। হ্যাভ ফান আন্টি!

তোমার সামনে স্কুল ফাইনাল! তাছাড়া তোমার বাপির অফিস সমিতির ইলেকশন আছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো তুমি অন্যায় করেছ। ভুল করেছ।

আচ্ছা! তাহলে কত টাকা দিতে হবে আপনাকে আন্টি? বাপি কাল আসছে। টাকা পেয়ে যাবেন। এখন যান তো মুখের সামনে থেকে।

মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল সুমনার। সপাটে চড় বসিয়ে দিয়েছিল আনাসের গালে। অমনি আনাস এসে গলা চেপে অকথ্য গালাগাল শুরু করে দিয়েছিল।

হারামজাদি! এসব দেখিয়ে দেখিয়ে টাকা কামাস। ব্ল্যাকমেইল করিস, জানি না আমি। বাপি তো তোর বুক ছুঁয়েও দেখে না। পেত্নি! সিলিকন দেওয়া তোর বুক, তোর পাছা। তাই দেখিয়ে পার্টি করিস, জানি না মনে করিস। বেশ করেছি, আরোও ভিডিও পাবি তুই।

দম বন্ধ হয়ে আসছিল সুমনার। তবু বলতে পেরেছিল, মাই এয়ার রিং ইজ অ্যা পাবলিক আই, আই হ্যাভ ক্যামেরাস দেয়ার। ডু ইট আনাস। নিউ ভিডিও আর কামিং টু …

বাথরুমে ঢুকে চুল গুছিয়ে নিয়ে এসে ঠিক ঠিক জায়গায় কয়েকটা ফোন করেছে সুমনা। অনেক হয়েছে সংসারে সং সাজার খেলা। তুহিন কার কার সঙ্গে গিয়েছে, কবে কোথায় গিয়েছে বিজনেস মিটিংয়ে তার সমস্ত তালিকা, ভিডিও তথ্যাদি কব্জা করা সুমনার কাছে। হ্যাঁ, ওদের অফিস সবার তথ্য সংগ্রহ করে রাখে। যত্নে রাখে। এটাই নতুন বিজনেস পলিসি। নিরাপত্তার নতুন ইন্স্যুরেন্স। সবখানে মানুষের গোপনীয় কারসাজি চলছে। আর সেই গোপনকে নিরাপত্তা দেওয়ার কতর্ব্যরত পেইডম্যানও হাজির। সুমনার নখদর্পণে সবার সবকিছু। ওর একটু হাসিতে মানুষ ভরসা পায়। নির্মল ফুর্তিতে ভেসে যায় মানুষ।

সবকিছুই পণ্য এখন। ভরসা, নির্ভরতা, বিশ্বাস, গোপন কর্মকাণ্ড সমস্তই এখন বিকিকিনির ময়দান।  গত বছর সুমনার ইমিডিয়েট বস বিরাট এক কেউটেকে ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে ফেলেছিল। কিন্তু কেউটের ছোবলে শেষ রক্ষা হয়নি। আত্মহত্যার আশ্রয় নিতে হয়েছিল তাকে। এটা এমনই মরণখেলা। এখানে সবার হাতেই কম-বেশি অস্ত্র মজুদ থাকে। সাধু তো সুমনা কখনো ছিল না। কিন্তু ননি চুরির মাত্রা বরাবরই কম ওর। তুহিনের সর্বগ্রাসী চেহারা আর প্রেমে ভুলে গিয়েছিল একদিন সুমনা, এরা সবাই এক গর্তের শেয়াল! ওদের প্রেমের শীর্ষ সময়েও তুহিন যেত ইরার কাছে। সেসব কাঁদাতো, ভোগাতো অফিসের ছাদে একসময়। ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে বলেছিল সে-কথা।

সেও ছোরা বসিয়ে দিয়েছে সময়মতো সুমনার পিঠে। ক্ষতগুলো ওকে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। মানুষের বৈশিষ্ট্য বুঝতে সেসব ধোঁকা, যন্ত্রণা, তিরস্কার খুব দরকারি ছিল। নইলে আজকের আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোম্পানির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা হতে পারতো না সুমনা। নিজের নামের সামনে ভারি ভারি শব্দ জুড়ে দিতে গিয়ে ওকে একই কাদা দিয়ে সমানভাগে দেবতাও বানাতে হয়েছে, অসুরও বানাতে হয়েছে।

পাঁচ

রাজ্যের নিরাপত্তাবলয় পেরিয়ে তুহিনের অফিসের কনফারেন্স রুমে বসে আছে কালাম। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের প্রথম শ্রেণির কামরা বুক করে দিয়েছিল তুহিন নিজেই। ঢাকায় এসেই ধুলোর মুখে পড়তে হয়েছে। ভালো তো হয়নি বরং আরো বাজে শহরে পরিণত ঢাকা এখন। কালাম করোনাকে আশীর্বাদই মনে করে। তখন ঝড় না পোহালে মরা ডালে কচি পাতার জীবন ফিরে পাওয়া হতো কি এ-জন্মে? সেই দুঃসময়ে ফিরেও তাকায়নি তুহিন। সেসব কথা ভোলেনি কালাম। কত দিন-রাত পাহাড়ে, বনে, জঙ্গলে ওরা ঘুরেছে একসঙ্গে। তথ্য সংগ্রহ করেছে। খুব ভালো ছবি তোলার হাত কালামের। ওর তোলা ছবি গোপনে বিক্রি করে তুহিন বিদেশেও গেল টেকনোলজির কোর্স করতে। কত মানুষকে যে ফাঁকি দিয়েছে এভাবে। কিন্তু তুহিন সেই পাহাড়ে ঘোরার দিনগুলোর ছবি চাইছে কেন? বাড়িতে বসে দেখতে পারেনি বিদ্যুৎ নেই বলে। এখানে কার কাছেই বা যাবে? তাছাড়া সামান্য কটা স্থিরচিত্রই তো, তার বিনিময়ে কাঁড়িখানেক পয়সা জুটছে কপালে।  লক্ষ্মী পায়ে ঠেলবে – এতো বোকা নয় সে। তবু ঘিলুর ভেতর চক্কর উঠছে থেকে থেকে। ছবিগুলো একবার দেখা দরকার ছিল। সেই কবেকার কথা। ভার্সিটিতে আন্দোলন চলছে তখন। সরকার বদল হবে হবে ভাব। তুহিন আর ও একটা গ্রুপের সঙ্গে বান্দরবান সফরে বেরিয়ে পড়েছিল। তুহিনের হলের এক বড় ভাই সেখানে বিদেশি প্রজেক্টের প্রধান কর্মকর্তা। তিনিই থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। ইন্টারনেট ছিল না, ফেসবুক ছিল না, এমনকি ফোনের নেটওয়ার্কও ছিল না ভালো। এসবের চাইতেও বড় জিনিস, দুশ্চিন্তা ছিল না কোনো। সে এক দুর্বার সময়।

সেখানেও তুহিন এক পাহাড়ি মেয়ে পটিয়ে ফেলেছিল। ওর সেই হলের বড় ভাই তো রীতিমতো সংসার পেতেছিল একজনের সঙ্গে। অমন মেয়ে সহজে চোখে পড়ে না। সে-সময় কালামের সাহসে কুলায়নি বনে-বাদাড়ে প্রেম করার। ছবি তোলাই ছিল ওর প্রধানতম কাজ। যতদূর মনে পড়ে, সেই বড় ভাই যার সঙ্গে সংসার পেতেছিল তাকে ফেলে চলেও এসেছিল। মেয়েটার খোঁজ পাওয়া যায়নি বছর দুয়েক পর। খুব লেখালেখি হয়েছিল পত্রিকায় এই নিয়ে। ফাইনালের চাপে আর পার্টটাইমের দৌড়ে কালামের ওসবে চোখ বুলানোর ধৈর্য্য হতো না। আজ অনেককিছুই আবছা স্মৃতি মাত্র। ঘরে ঢুকেই তুহিন সহাস্যে বলে উঠলো,

কী রে চা, কফি খেয়েছিস বন্ধু?

রুমটা দামি সুগন্ধে ভরে গেল যেন। কালাম খেটে খাওয়া মানুষের মতো সোজা কথায় জবাব দিলো, এসব কফি-টফি পেটে পোষাবে না। তোর যা লাগবে তুই নে। আমারটা আমাকে দে। ফালতু আলাপের সময় নাই!

রেগে আছিস মনে হচ্ছে। রাগ দিয়ে জীবনে কিছু হয়, এ্যাঁ?

 প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে পায়ের তলা থেকে বিস্কিটের একটা প্যাকেট বের করে টেবিলে রাখলো। তুহিনের কব্জির স্মার্ট ঘড়িতে ফোন কল আসছে ক্রমাগত। তুহিন কারো সঙ্গে ফোনে কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে। কিন্তু পুরো মনোযোগ ধরে রেখেছে কালামের দিকে। বিস্কিটের প্যাকেটটার মুখ টেপ দিয়ে প্যাঁচানো। তুহিন জানে, এটার ভেতর কোনো এক বিস্কিটের সঙ্গে মেমোরি কার্ডটা আছে। ফোন রেখে পকেট থেকে একটা ডেবিট কার্ড বের করে কালামকে দিলো। পিনকোডও লিখে দিলো কাগজে। আগের মতো ছবি-টবি তুলিস এখন?

কুমিরের লেজের বাড়ি খাওয়া মানুষ আর নদীতে নামে না, জানিস না।

দ্যাখ এই টাকায় কিছু করতে পারিস কি না। বেশি সমস্যা হলে এখানে জয়েন করতে পারিস কিন্তু।

কালাম কথা বাড়ায় না। এই রাক্ষসপুরী থেকে যত দ্রুত বের হতে পারবে ততই ওর জন্য ভালো।

চলি, তোর কোনো দরকার হলে বলিস।

ছয়

সুমনার চারপাশে অনেক মনিটর। সবগুলিতে বিস্ফোরিত আলোর ছড়াছড়ি। সেখানে সারাক্ষণ বার্তা আসছে, যাচ্ছে। সেসবে তীক্ষè নজর রেখে চলেছে সুমনার দক্ষ টিম। এতো নজরদারি তবু দুর্ঘটনা ঘটে। সেসবের নিষ্পত্তির জন্য আরো একদল লোক কাজে নেমে পড়ে। ভিডিও, ফোন কল, ছবি, গুরুত্বপূর্ণ ফাইল – সবই সুমনার দল খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সার্চ করে। কোথাও ওদের ক্লায়েন্টের বিরুদ্ধে কিছু হলেই দ্রুত তৎপর ব্যবস্থা নিয়ে ফেলে। মোটা ইন্স্যুরেন্স পলিসির কারণে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যাবতীয় গোপন কীর্তিকলাপ ফাঁস হয় না বটে, কিন্তু প্রতিদিন আপডেট হচ্ছে অ্যাপস। নতুন নতুন কোডিং চালু হচ্ছে। কিন্তু মানুষ তো সেই এক। যন্ত্রের লোভ নেই, ওপরে ওঠার প্রতিযোগিতা নেই, বিপদ নেই। মানুষের আছে। সিক্রেট পলিসির লোকেরা পা পিছলে যে যায় না, তা নয়।

সুমনা আজ মহাব্যস্ত। বিশাল স্ক্রিনের সামনে দাঁড়িয়ে দু-হাতে নির্দেশ দিয়েই চলেছে – কোনটা কত দ্রুত লক করে ফেলতে হবে। এই যে একদল মানুষ নিশ্চিন্তে থাকে, সেটা ওদের কঠোর পরিশ্রমের কল্যাণেই। আর যারা সাধারণ মানুষ, যাদের ফোন কল, ভিডিও এসবের সিকিউরিটি ব্যাংক নেই, আইডি নেই, তাদেরটা দেদার ফাঁস হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। সেদিন আনাসের ভিডিওটা ওর টিমই লক করতে পেরেছে; কিন্তু সেটাও কতক্ষণ? নতুন আইডি থেকে ভিডিওটা ছড়িয়ে দেওয়া হলে সুমনার কিছু করার থাকবে না তাতে। অথচ বাপ-ছেলের এই নিয়ে বিকার নেই পর্যন্ত। সুমনার সঙ্গে তুহিন কথা বলছে না। ফ্ল্যাটেও আসছে না। তবে এই সম্পর্কে থাকবে না, মনস্থির করা হয়ে গেছে ওর। আজকে সারাদিন জবর খেটেছে ওর টিম। ভিডিওতে থাকা প্রত্যেকটি মানুষের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে ওরা। চারটে ছেলেই আনাসের বন্ধু। একই স্কুলের তিনজন। আর একজন অন্য স্কুলের। মেয়েটার পরিচয় পেতে বেগ পেতে হয়েছিল সামান্য। সেটাও হাতে এসে গেছে এখন। অফিসের গাড়ি নিচ্ছে গত সপ্তাহ থেকে। নিজেই ড্রাইভ করে ফিরছে বাড়ি। পুরো অ্যাপার্টমেন্টের পাসওয়ার্ড বদলে ফেলেছে ও। এমনকি তুহিনের দেওয়া অ্যালেক্সাকেও বাতিল করে দিয়েছে। ফলে তুহিন চাইলেও এ-বাসায় ঢুকতে পারবে না।

সুমনার গলায় কালশিটে দাগটা মিলিয়ে যাচ্ছে প্রায়। তবে এর শোধটা এতো করুণ হবে জানা ছিল না ওর। রোজই এরকম সংঘবদ্ধ রেপের ভিডিও ফাঁস হচ্ছে কোথাও না কোথাও। কেউ মামলায় বিচার পাচ্ছে, কেউবা পিছিয়ে গিয়ে মীমাংসা করে নিচ্ছে দু-তরফা। একটু পর সুমনার সাংবাদিক বন্ধু তানভি আসবে। কফি মেকারে গ্রিস থেকে আনা বিন ঢাললো ও। এককালে ওরা কাজ করতো একই অফিসে। এমনকি মেয়েটা হওয়ার পর প্রথম তানভিই কোলে নিয়েছিল। সেই তানভির সঙ্গেই ওর বর গোপনে ডেট করতো। সংসারটা ছেড়েছে ফলে সুমনা। তানভিকেও ক্ষমা করে দিয়েছে শেষ পর্যন্ত। তবে আগের মতো সেই যোগাযোগটা নেই ওদের। আলমারি খুলে দুটো শাড়িতে হাত বুলালো সুমনা। ওর প্রেগন্যান্সির সময় দিয়েছিল তানভি। সেখান থেকে একটা শাড়ি পরেও নিল চটপট। তানভি আধঘণ্টা পর এলো। দরজা খুলেই সাদরে জড়িয়ে ধরলো সুমনা। একটু ভারী হয়েছে শরীরটা যদিও মুখের মিষ্টি ভাবটা একদম বদলায়নি। সুমনা হাত ধরে নিয়ে বসালো। তানভি কিছুটা অপ্রস্তুত হাসলো।

চিনতে পেরেছিস শাড়িটা? আরে তনা পেটে থাকতে তুই দিয়েছিলি। আজকাল এরকম রং বুননের শাড়ি পাওয়াই যায় না। দাঁড়া কফি আনি আগে।

কফির মগ নিয়ে চুমুক দিতে দিতে তানভি ফোনটা দেখিয়ে বলতে শুরু করলো, সব রেকর্ড করে এনেছি সুমনা। ছেলেটার মা বিশ্বাসই করছিল না প্রথমে। তুই ঠিকই ধরেছিস, এটা একটা ব্ল্যাকমেইলের কেস। আসলে মেয়েটা নাকি একসময় আনাসের ঘনিষ্ঠ ছিল। সেদিন জন্মদিনের পার্টি ছিল ছাদে। মেয়েটার নতুন বন্ধুই নিয়ে গিয়েছিল ওখানে। মেয়েটা কি তোর পরিচিত  কেউ?

না। তবে তানভি এরকম কিছু আমাদের বাচ্চাদের সঙ্গে ঘটুক সেটা তো চাই না আমরা, বল?

তানভি একটা লম্বা করে শ্বাস ফেলে বললো, তুই তো তবু পেরেছিস মেয়েটাকে ভালো স্কুল, পরিবেশ দিতে। আমি ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি।

কেন তোর তো দুটোই ছেলে, ভয়ের কী?

সেটাই তো ভয়। কখন কী কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলে! মাঝেমধ্যে মনে হয় চাকরিটা ছেড়ে দিই। ওদেরকে সময় দিই পুরোটা। কী হবে এতো খেটে, মানুষই যদি না হয়! এদের শাস্তি পেতেই হবে সুমনা।

সেজন্যই তো পাশে চাই তোকে, তুহিন আমলে নেবে ব্যাপারটা দেখিস! সত্যটা খুব ভয়ংকর যে। জানি না আনাসের মা কি করে সামলাবে সবকিছু।

কী সত্য সুমনা? ভয়ার্ত শোনালো প্রশ্নটা।

সুমনা তানভিকে জড়িয়ে ধরে। সমস্ত চাপ যেন নিমিষে নিঃশেষ হলো দুজনের। তানভির উপস্থিতি, এই

রক্ত-মাংসের কথোপকথন সবই যেন নতুন গজানো দূর্বাঘাস। পা ফেলতে বড় আরাম! চোখ বুজে আসে সুমনার।

সাত

নীলফামারী থেকে দিনাজপুর যাওয়ার রাস্তাটা কদিন আগেও নির্বাচনের ব্যানারে ঢাকা ছিল। গ্রামের ছেলের দল সব নামিয়ে নিয়ে গেছে। পথের দুধারে ধানক্ষেত। কদিন পর পাক ধরবে ধানে। সেখানে হেমন্তের হাওয়া দোল খাচ্ছে। ঠিক এখানেই কালামের মাইক্রোবাসের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে। সৈয়দপুর থেকে ইদ্রিস মিস্ত্রি এসেছে ঝড়ের বেগে। যাত্রীরা সবাই গাঁও-গঞ্জের মানুষ। দিনাজপুরে যাচ্ছে বউভাত খেতে। পথে গাড়ি নষ্ট হয়েছে তাতে করে কালামের মন খারাপ। যাত্রীরাই তাকে সাহস দিচ্ছে উল্টো। ইদ্রিস মিস্ত্রি আধঘণ্টার ভেতর ঠিক করেও দিলো গাড়ি।

ন্যাও, তোমরার গাড়ি ইবার প্যাল প্যাল করি চলবি। কিসের যে গাড়ি কিনলা বাহে, দুইদিন পরপর সারান লাগে।

ধানক্ষেতের ভেতর একটা ব্যাঙ আর্তনাদ করে উঠলো তখন। যাত্রীদের ভেতর  একজন বললো, শালার জান আর রাখবিনানে।

মুরুব্বি গোছের একজন বলে উঠলো, বৃষ্টি আসিবে। বাতাসের ভাও ভালো না।

কালাম গাড়ি স্টার্ট দিলো ঝটপট। ব্যাঙটার শেষ কোঁকানিটা শোনা গেল না আর। সাপটার তলপেট ফুলেফেঁপে গেছে আজকের মতো। গত ছয় মাস ধরে এই মাইক্রোটা চালাচ্ছে কালাম। কখনো বিয়ের বর টেনেছে। কখনো হবু মা নিয়ে ছুটেছে হাসপাতালে। মরাও টেনেছে দু-একবার। বাড়িতে বিদ্যুৎ নিয়েছে। অনেকদিক থেকে ওর উন্নতি হচ্ছে; কিন্তু রাতে ঘুমোতে গেলে আর ঘুম আসে না আগের মতো। প্রশ্নের একটা সাপ প্রতিরাতে ওকে খপ করে ধরে ফেলে। গেলেও না,  ছাড়েও না। বোবা গোঙানিতে ওর ভেতরটা ফেটে পড়ে প্রতিরাতে। দিনাজপুরে আসতে আসতে বেলা বারোটা। কিন্তু ঢোকার সব পথ বন্ধপ্রায়। অসংখ্য গাড়ি, মোটরবাইক দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও নড়ন-চড়ন নেই। যাত্রীরাও এইবার অসহিষ্ণু হয়ে উঠলো। কালাম সামনে শোনার চেষ্টা করলো কী হয়েছে। কেউ বললো, বেশিক্ষণ লাগবে না। কেউ বলছে, জানে না রাস্তা কখন ফাঁকা হবে। কালামের গাড়ির সবাই নেমে গেল। তারা হেঁটেই যাবে বাকি পথ। কালামকে গাড়ি নিয়ে আসতে বলে তারা রাস্তা থেকে নেমে চলা শুরু করলো। অনেকেই মোটরসাইকেল ঘুরিয়ে নিয়েছে এরই ভেতর। একটা ছোট ছেলে দৌড়ে দৌড়ে পানি বিক্রি করছে। ছেলেটার কাছ থেকে পানি কিনে কালাম জিজ্ঞেস করলো, রাস্তা ছাড়বে কখন জানিস কিছু?

আল্লায় জানে!

হঠাৎ ছেলেটার গায়ের টি-শার্টে চোখ পড়ে কালামের। টি-শার্টটায় একটা মুখের ছাপ। নিচে সেøাগান লেখা সম্ভবত।

এই দাঁড়াতো। এই জামা কোথায় পাইছিস?

সামনে যান। ওইখানে খাড়াইলেই পাইবেন।

একটা তুমুল হাততালি আর হট্টগোল বেঁধে যায় সামনে। ট্রাকের পর ট্রাক দাঁড়িয়ে। কালামের সামনে এগোনোর ইচ্ছে নেই। গাড়িতে উঠে চোখ বুঁজে থাকলো। কিন্তু টি-শার্টের মুখটা পরিচিত ওর। কোথায় দেখেছে তাকে মনে করতে পারলো না। ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে এসেছিল বোধহয়। একসঙ্গে অনেক গাড়ির হর্নে সজাগ হলো ও। রাস্তা ছেড়ে দিয়েছে। কান্তনগর মোড়ে তেভাগা আন্দোলনের মনুমেন্টের মাঝে থাকা ইলা মিত্রের মুরালের সামনে ফুলে ফুলে ভরে আছে। এখানেই ফুল দিতে এসেছিল মন্ত্রী। কালাম একটা চায়ের দোকানের পাশে গাড়িটা রেখে ভালো করে ব্যানার দেখতে লাগলো। নামটা পড়ে চিনতে পারছে না তেমন। আশেপাশের প্রায় সবার গায়ে মন্ত্রীর মুখওয়ালা টি-শার্ট। সবার প্রসন্ন মুখ। বিয়েবাড়ির যাত্রীরা ফোন দিতে শুরু করেছে ইতোমধ্যে। সন্ধের আগেই তারা ফিরতে চায়, দেরি করলে চলবে না। একসময় কালাম খবরের পেছনে ছুটতো ক্যামেরা হাতে। প্রায় সবার ঠিকানা, ফোন নম্বর, নাম মুখস্থ থাকতো। আর নির্বাচন হয়ে গেছে। নতুন মন্ত্রী এসেছে।

কোনো খবরই জানে না ও। ওর কাছে এখন শুধুই মিস্ত্রির ফোন নম্বর। পুলিশের ফোন নম্বর আর যাত্রীদের ফোন নম্বর। এই এলাকার কোন নেতা মন্ত্রী হয়েছে সেই খবরটুকুও অজানা কালামের। শেষমেশ বৃষ্টিটা নামলো। মুরুব্বি ঠিকই বলেছিল। দুপুরের খাবারটা কপালে এবার জুটলে হয়। দ্রুত গাড়ি ছোটালো কালাম।

মগজের জটও খুললো এক পলকে বুঝি, তুহিনের সেই বড় ভাই! বান্দরবানে যে কি না ওদের থাকার বন্দোবস্ত করেছিল! বৃষ্টির জল যেন মগজের মরিচা ধুয়ে সাফ করে দিচ্ছে আজ। সাংঘাতিক কিছু ছবি তুলেছিল জঙ্গলে সেবার। এখন মনে হচ্ছে বিরাট ভুল করে ফেলেছে আসলে ও। ইঁদুরগুলো সব বেড়াল এখন। আর বেড়ালগুলো সব বাঘ! মেঘের চাইতেও কালো মুখ হয়ে গেছে কালামের।

আট

মেঘে মেঘে বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে। সুমনা আর তুহিন আলাদা এখন। তুহিনের ক্ষমতা-প্রভাব আগের থেকে আরো তুঙ্গে। ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর সকল প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে সে। তুহিনের খুব কাছের বড় ভাই টেলিকমমন্ত্রী এখন। ফলে কথায় কথায় ঠাট-ঠমক। চালচলন সবই মন্ত্রীর পর্যায়ে। তুহিনের সুন্দর মুখটা দেখলে ঘিনঘিন লাগে সুমনার এখন। ওর কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছিল সুমনার ফ্ল্যাটে এতোদিন। সেসব নিয়ে যেতে এসেছে। আগে থেকেই কিছু জিনিস গুছিয়ে রেখেছিল যদিও। দেয়ালের যুগল ছবিগুলি সরিয়ে ফেলেছে। সেসব জায়গায় সুমনা কলেজজীবনের বেশ কিছু ছবি টানিয়েছে। কুড়ি মিনিটের ভেতর সব নিয়ে-টিয়ে চলে গেল তুহিন। ধুলোর ঝড় থেমে যাওয়ার পরও সেই ধুলো ঝেড়ে ফেলতে সময় লাগে। খুব ভালো করে ঘরটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করলো সুমনা। তুহিনের শেষ কথাটা বাতাসে যেন ভাসছে, সেটা পরিষ্কার করার একটা মেশিন যদি থাকতো! পিশাচের মতো শোনাচ্ছিল ওকে, আনাসের চুল স্পর্শ করার ক্ষমতা কারো হবে না আর!

সুমনা আঁচ করতে পারছে খুব শিগগির ওর পজিশনের বদল হবে। নতুন সরকারের কারণে যতটা না তারচেয়ে তুহিনের নোংরা চালে সুমনার অবস্থান পাল্টাবে – বুঝতে বাকি নেই ওর। কিন্তু সুমনার হাতের ব্রহ্মাস্ত্রটা এখনো তুহিনের ওপর ব্যবহার করেনি ও। ভাবছে কাল সকালে ফোন করে জানিয়ে দেবে। এরপর একটা লম্বা ছুটি কাটাতে কোথাও যাবে সুমনা। ডাইনিং টেবিলের ওপর একটা সুন্দর প্যাকেট দেখে অবাক হলো ও। গোলাপ ফুল রাখা পাশে। সঙ্গে ছোট্ট একটা নোট ‘ইটস ইয়োর নিউ প্লেবয়! এনজয় ইওরসেলফ!’ পড়েই রাগে গা রি রি করে উঠলো। প্যাকেটটা ছুড়ে মারলো দেয়ালে। এক মুহূর্ত দেরি করলো না আর সুমনা। ফোনটা দিতেই তুহিনের কুৎসিত হাসি ভেসে এলো ওপাশ থেকে।

একদম লেটেস্ট! পছন্দ হয়েছে তো! বাজারে দারুণ ডিমান্ড কিন্তু …

জানোয়ারের বাচ্চা! তুই কি জানিস? এষা ওয়াজ প্রেগন্যান্ট দ্যাট টাইম হোয়েন ইউ লেফট হার!!! জাস্ট টেল ইউর সান, দ্যাট শি ইজ ইয়োর ডটার; ইউ বাস্টার্ড! বলেই ফোনটা কেটে দিলো সুমনা। রাগে পায়ের তালু পর্যন্ত জ্বলছে। অন্ধকারের শেষ মাথায় আলোটা খুঁজে পেল যেন। বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারটা ছেড়ে দিলো ও। অজস্র জলের ধারা সুমনার মাথায় ঝরছে, নিরেট বাথরুমটা মাধবকুণ্ডের সবুজ নির্জন ঝিরি হয়ে উঠলো মুহূর্তে। কোথাও ক্লেশ নেই, বন্ধন নেই যেন।

Leave a Reply