উদ্ভট এক মানুষের স্বপ্ন : অলীক এক কাহিনি

লেখক:

ফিওদর দস্তইয়েফ্স্কি (১৮২২-৮১)

অনুবাদক : হায়াৎ মামুদ

আমি ভাঁড়জাতীয় লোক। মানুষ এখন আমাকে পাগলই বলে। এতে আমার পদোন্নতিই হলো বলা যায়। কারণ, বরাবরের মতো আমি আর ওদের হাসির খোরাক বলে এখন আর গণ্য হচ্ছি না। আমি তাতে আজকাল কিছু মনে করি না – এরা সবাই আমার হৃদয়ের কাছের মানুষ – এমনকি আমাকে নিয়ে যখন হাসাহাসি করে তখনো; আসলেই ঠিক ওই সময়টাতে আরো মজা পাই আমি। নিজেকে নিয়ে নয়, আমি ওদের নিয়েই হাসাহাসি করতে পারি, যদিও তা করি না। কারণ, আমি ওদের ভালোবাসি, ওদের রকমসকম দেখে মন খারাপ না হলে আমিও হাসতে পারতাম। যা মনে করে আমি দুঃখ পাই তা হলো – ওরা তো ‘সত্য’কে জানে না, অথচ আমি জানি। ‘সত্য’ জানার একমাত্র অধিকারী হয়ে-ওঠা কত যে দুঃসহ! অবশ্য এসব তো ওরা বুঝবে না। নাহ্, সত্যিই বুঝবে না।

আমাকে ওরা ভাঁড় মনে করে ভাবলে বড়ো কষ্ট পাই। ভাঁড়ের মতো দেখায় আমাকে কে বলে, আমি তো ভাঁড়ই। আমি সর্বদা এরকমই ভাঁড় ছিলাম এবং যেদিন আমি জন্মেছি সেদিন থেকেই এটা আমি জেনেছি। আমার বিশ্বাস, আমার যখন সাত বছর বয়স তখনই এটা আমি উপলব্ধি করি। আমি ইশ্কুলে পড়েছি, তারপরে বিশ্ববিদ্যালয়েও গেছি, কিন্তু তাতে কী? যতই পড়াশোনা করেছি ততই ক্রমশ টের পেয়েছি যে, আমি ভাঁড়ই বটে। এবং এর ফলে আমার বেলায় যা ঘটল তা হলো – বিজ্ঞান চূড়ান্তভাবে দেখিয়ে দিলো যে আমি একটি বিদূষক। জীবনও আমাকে সেটাই শেখাল।

একেকটি বছর যায় আর আমি আমার হাস্যাস্পদতা বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠতে থাকি। প্রত্যেকেই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে সব সময়! কিন্তু ওরা কেউই জানত না বা আন্দাজ করতেও পারত না যে, দুনিয়ার সকলের চেয়ে আমিই সব চাইতে উত্তমরূপে জানি কতখানি হাস্যকর আমি। এবং তারা এটাও জানত না, বিষয়টি আমাকে কতখানি আহত করে। অবশ্য দোষটা সম্পূর্ণত আমারই ছিল : আমি এতটাই দাম্ভিক ছিলাম যে কখনো তা নিজে স্বীকার করে নিতে বা অন্যের নিকট প্রকাশ করতে পারি নি। আমার এহেন আত্মম্ভরিতা দিন যত গেছে ততই উত্তুঙ্গ হয়ে উঠেছে, আর সে-কথা অন্যের কাছে বলতে যদি অস্বস্তি বোধ করতামও তো আমি একদম বেহেড হয়ে যেতাম। আমার তরুণ বয়সকালে সে যে কী রকম মানসিক যন্ত্রণার ভিতরে আমি দিন কাটিয়েছি, সব সময়ে ভয়ে ভয়ে থেকেছি পাছে বন্ধুবান্ধবের কাছে খেলো হয়ে যাই।  যুবা বয়সে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রতিটি বৎসর আমি এই খাম্তিগুলো ক্রমশ জেনে যেতে থাকি; তবু এ-সব সত্ত্বেও যে-কোনো কারণেই হোক আমি সহজভাবেই সবকিছু গ্রহণ করি। আমি ফের বলি – ‘যে-কোনো কারণেই হোক’, যেহেতু অদ্যাবধি এর কোনো কারণ আমি বের করতে পারি নি। হতে পারে এর মূলে ছিল আমার অসংশোধনযোগ্য বিষণ্ণতা যা কোনো কারণে বুকের ওপর ভারী হয়ে চেপে থাকত আমার আয়তনের চেয়েও বিরাটকায় হয়ে : এই ‘কোনো কারণে’ ব্যাপারটি হলো আমার ক্রমবর্ধিষ্ণু বিশ্বাস যে ‘কিছুতেই কিছু যায় আসে না’। অনেক আগে থেকেই আমি এ-ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে উঠলেও আমার ভিতরে অকস্মাৎ এক ইতিবাচক দৃঢ় বিশ্বাস জেগে ওঠে, সেটা গত বছরেই একটা দিনে ঘটে যায়। আমি হঠাৎ বুঝে ফেলি যে দুনিয়া রইল কি না-রইল তা  নিয়ে আমার চিন্তাভাবনা না করলেও চলবে। আমার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে আমি জেনেছি ও অনুভব করেছি যে, আমার উপস্থিতিকালে ‘কিছুই হয় নি’। প্রথমে আমি ভাবতে থাকি যে, ইতঃপূর্বে অনেক কিছু নিশ্চয়ই ঘটে গেছে, পরে বুঝতে পারি কোনো কিছুই ঘটে নি, কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয়েছিল কিছু-একটা ঘটেছে। ধীরে ধীরে আমার স্থির প্রত্যয় জন্মায় যে, কোনো কিছু ঘটবার কোনো ব্যাপার নেই। আর তারপরই হঠাৎ করে লোকজনের বলা-কওয়া কি এটা-ওটা করা না-করা ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করা ছেড়ে দিই এবং কাউকেই আর গ্রাহ্যের মধ্যে আনি না। হ্যাঁ, সত্যিই তাই, এমনকি তুচ্ছ বিষয়াদি নিয়েও আর মাথা ঘামাই না, যেমন ধরা যাক : রাস্তাঘাটে যেমন হাঁটাচলা করি তেমনি সহজেই লোকজনের ভিড়ভাট্টায় ঢুকে পড়ি। এমন নয় যে গভীরভাবে চিন্তামগ্ন থাকাতেই এমন ঘটল, কারণ চিন্তা করবার আছেটা কী! তদ্দিনে আমি চিন্তা করাই ছেড়ে দিয়েছি : কোনো কিছুতেই আমার কিছু যায় আসে না যে। আমি কোনো সমস্যা যে সমাধান করি এমন নয়, অথচ সমস্যার তো কম্তি নেই, বরং তা অজস্র। তবে কিনা, আমি কোনোকিছুই আর গায়ে  মাখি না; ফলে সকল সমস্যাই পিছনে পড়ে থাকে।

অনেক কাল পরে আমি ‘সত্য’ জানতে পারি। নভেম্বরের ঘটনা, সঠিক বললে ৩রা নভেম্বর : তখনই বুঝে যাই ‘সত্য’ কী এবং তারপর থেকে আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমার স্মরণে রয়ে যেতে থাকে। ভয়ানক এক বিষণ্ণ রাত্রে সেটি ঘটেছিল, বিষণ্ণতম রাত্রেই বলা ভালো। আমি বাড়ি ফিরছি, রাত দশটা পার হয়ে গেছে; আমার স্পষ্ট মনে আছে যে, তখন ধারণা হয়েছিল ওটা আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাত। এমনকি চতুষ্পার্শ্বের বাস্তবতাও সেরকমই ছিল। সারাদিন ধরে সমানে বৃষ্টি ঝরছে, সবচেয়ে ঠান্ডা ও বিষণ্ণতম ধারাপাতন, যাকে অশুভই বলা চলে। মনে আছে, লোকজনকে একেবারে পর্যুদস্ত করে দিয়ে অবশেষে দুম্ করে বাদলা থেমে গেল দশটার পরপরই, আর তখনই দুর্বিষহ এক স্যাঁতসেঁতে ভাব চেপে বসল – বৃষ্টির সময়ে যেমন ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি ঠান্ডা ও স্যাঁতসেঁতে, সবকিছু থেকে ভাপ বেরুতে লাগল, রাস্তার প্রতিটি পাথরের চ্যাঙ্গড় থেকে, সরু গলির একেবারে ভিতরের কোণ-ঘুপচির অন্ধকার থেকে। হঠাৎ আমার বেশ মজা লাগল ভেবে যে, রাস্তার  গ্যাসবাতিগুলো নিভে গেলে মন্দ হয় না; কারণ, গ্যাসের আলোয় আমাদের অনেক বেশি দুঃখী-দুঃখী লাগে। সেদিন তখন অবধি আমার পেটে তেমন দানাপানি পড়ে নি, পড়ন্ত বিকেল থেকে আমি এক ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোকের বাসায় তাঁর দুবন্ধুকে নিয়ে রয়েছি। সারা সন্ধেয় আমি একদম চুপ, মুখে একটাও রা কাড়ি নি, আমার ধারণা সবাইকে খুব বোর্ করেছি। তারা উত্তেজনাকর কিছু নিয়ে আলাপ করছিল, শেষে এক পর্যায়ে সকলের মেজাজ বিগড়ে গেল। আমি পরিষ্কার দেখলাম, তারা উচিত-অনুচিত কিছুই আমলে না নিয়ে একেবারে যেন ক্ষেপে উঠল। আমি তাদের কাছে গিয়ে অবিবেচকের মতোই ফোড়ন কাটলাম, ‘দাদারা, শুনছেন, আপনারা কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত করছেন।’ এ-কথায় তারা কিছু মনে করল না, আমার কথা হেসে উড়িয়ে দিলো। তারা এমনটি যে করতে পারল তার কারণ আমার কথায় কোনো ঝাঁঝ ছিল না। বলতে হয় বলে বলেছিলাম আর কি! তারাও দেখল আমি বলতে হয় বলে বলেছি, উদ্দেশ্যহীন; তাই তারাও হেসে উড়িয়ে দিতে পারল।

বাসায় ফিরছি যখন, গ্যাসবাতির কথা মনে পড়তে আকাশের পানে তাকাই। বিশ্রী রকমের অন্ধকারাচ্ছন্ন কালো আকাশ, তবু আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম খাব্লা খাব্লা মেঘের ছোপ আর তার ফাঁকে ফাঁকে অনন্ত কৃষ্ণগহবর। হঠাৎ চোখে পড়ে ওই গহবরগুলোরই একটার ভিতরে একরত্তি ছোট্ট একটি তারা মিটমিট করে জ্বলছে, আমি ভালো করে তাকিয়ে দেখার জন্যে দাঁড়িয়েই পড়লাম। দাঁড়ালাম, কেননা ওই ছোট্ট তারকাটি দেখে আমার মগজের ভিতরে একটা আইডিয়া গজিয়ে উঠল : আমি এই রাতেই আত্মহত্যা করব। দুমাস আগেই আমি নিজের প্রাণ নিজে নেওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছিলাম, আর সে-কারণে বিত্তহীন গরিব মানুষ হলেও আমি চমৎকার একটা রিভলভার কিনে তাতে সেদিনই গুলি ভরে রেখেছিলাম। এর মধ্যে দুমাস কেটে গেছে যদিও, অস্ত্রটি এখনো আমার টেবিল-দেরাজের ভিতরেই পড়ে আছে; সব ব্যাপারেই আমার ঔদাসীন্য তখন এতটাই প্রবল ছিল যে কেবল একটা শুভক্ষণের অপেক্ষায় ছিলাম, কেন যে বলতে পারব না। তাই দুমাস ধরেই প্রত্যেক রাত্রেই আমি ঘরে ফিরেছি মনের মধ্যে আত্মহননের বাসনা নাড়াচাড়া করতে করতেই। ঠিক সময়টি কখন হাজির হবে সে-অপেক্ষাতেই ছিলাম। এখন আকাশের ওই তারাটিই আমাকে জানিয়ে দিলো যে, এই রাত্রিই সেই মাহেন্দ্রক্ষণ হোক-না। কী জানি ওই তারকাই কেন আমাকে প্ররোচিত করল।

আমি উপরে তাকিয়ে আকাশ দেখছি। এমন সময় হঠাৎ একটি ছোট্ট মেয়ে কোত্থেকে এসে আমার হাত জাপটে ধরল। রাস্তা একেবারে ফাঁকা, জনপ্রাণী কেউ কোথাও নেই। কিছু দূরে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে তার চালক বসে বসে ঢুলছে।

মেয়েটি বছর আষ্টেকের হবে বড়ো জোর। এই ঠান্ডাতেও ওর গায়ে শুধু সুতির একটা ফ্রক আর মাথায় উড়ুনি বাঁধা, সারা শরীর ভিজে জব্জব্ করছে, কিন্তু আমার নজর বিশেষভাবে পড়ল ওর ভিজে আর ছেঁড়া-ফাটা জুতো জোড়ার ওপর।  আমি যেন এখনো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমাকে এ-দৃশ্য খুব নাড়া দিলো। মেয়েটি আমার কনুইয়ের সঙ্গে লেপ্টে গিয়ে কেঁদেই চলেছিল। সে ফোঁপাতে ফোঁপাতে কথা বলছিল, কিন্তু কিছু ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না তার কাঁপুনির জন্যে; খুব জ্বরে মানুষ যেমন কাঁপে তেমনিভাবে কাঁপছিল সে। কোনো কিছুতে ভীষণ ভয় পেয়েছে মেয়েটি, কেবলই সে বলছিল : ‘মা, আমার মা।’ আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখি, কিন্তু কিছু বলি না, যেমন হাঁটছিলাম তেমনি হাঁটতে থাকি; কিন্তু মেয়েটি আমার পিছন পিছন দৌড়ে আসতে থাকে, আমার কোটের একটা কোনা খামচে ধরে, আর তার গলা দিয়ে এখন আওয়াজ বেরুতে থাকে যেমনটা খুব ভয় পেলে অসহায় বাচ্চাদের মুখ থেকে বের হয়। আমি ওই আওয়াজ চিনি। তার কথার মাথামুন্ডু বোঝা না গেলেও আমি ঠিকই ধরতে পেরেছিলাম ওর মা বেচারি কোথাও কোনোখানে মুমূর্ষু পড়ে আছে, কিংবা অন্য কোনো আপদবালাই নির্ঘাত ওদের মাথায় ভেঙে পড়েছে, আর মেয়েটি উপায়ান্তর না দেখে রাস্তায় দৌড়ে এসেছে যদি কাউকে পায় কিংবা কোনো একটা উপায় দেখে মা বেচারিকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু আমি ওর সঙ্গে গেলাম তো না-ই, বরং আমার মনে হলো ওকে ভাগিয়ে দিই। আমি ওকে খেদিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, তাকিয়ে দেখি আশেপাশে কোনো পুলিশ-টুলিশ দেখা যায় কিনা। কিন্তু মেয়েটি তার দুহাত মুঠো করে মিনতি জানায়, ফোঁপাতে থাকে আর হাঁফায়, আমার পাশে পাশে দৌড়তে থাকে, আমার পিছু ছাড়ে না। আমি মাটিতে সজোরে পা ঠুকে ওকে ধমকে উঠি। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে এটুকুই শুধু বলতে পারে – ‘স্যার, স্যার!’ এবং পরমুহূর্তেই আমাকে ছেড়ে ধাঁ করে রাস্তার ওপাশে চলে যায়। সেখানে তখন আরেকটি লোক হাঁটছিল, আমাকে ছেড়ে ধাঁ করে ওর দিকেই সে দৌড়ল।

আমি একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। ঘরে যাব বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি। আমার ঘরটা দেখতে অর্ধবৃত্তাকার, তাছাড়া যেমন জঘন্য তেমনি পরিসরেও ছোট। দেয়ালের ওপর দিকে শুধু একটিমাত্র ছোট জানালা। আসবাব বলতে আছে অয়েলক্লথ মোড়ানো একটা সোফা, দুটো চেয়ার, বইভর্তি একটি টেবিল, এবং খুবই পুরনো আমলের কিন্তু অভিজাত ধাঁচের এক আরামকেদারা। আমি একটি মোমবাতি জ্বালাই, তারপর নিজের চিন্তায় ডুবে যাই। পাশেই যে-বাড়িটা রয়েছে সেটাকে যথার্থ পাগলাগারদ বললে অত্যুক্তি হয় না। গত পরশুদিন থেকে অবস্থা ঠিক তেমনই বৈকি। ওখানে যিনি থাকেন     সে-ভদ্রলোক চাকরি থেকে খারিজ হয়ে যাওয়া এক ক্যাপ্টেন, আরো জনাছয়েক লোক তাঁর সঙ্গে থাকে, সকলেই জাহাজি-জীবন থেকে ছিটকে-পড়া – প্রত্যেকে ভোদ্কা আর তাস খেলায় ডুবে থাকে। গত রাতেই ওদের ভিতরে একহাত লড়াই হয়ে গেছে, ওদের মধ্যে দুজন পরস্পরের চুল ধরে টানাটানি করেছে অনেকক্ষণ যাবত। ওদের বিরুদ্ধে বাড়িউলি ভদ্রমহিলার খুব ইচ্ছে হয়েছিল পুলিশের কাছে গিয়ে নালিশ করে, কিন্তু ওই ক্যাপ্টেনকে তিনি এমনই ভয় পান যে সে-সাহস আর হয় নি। এর বাইরে আর মাত্র একজন ভাড়াটে ছিলেন – ছোটখাটো রোগাপাতলা এক মহিলা, জনৈক অফিসারের গিন্নি, তিনি ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে শহরে নতুন এসেছেন, বাচ্চাগুলো সব সময়ে বড্ডো অসুখে ভোগে। মহিলা ও তার বাচ্চারা সবাই ক্যাপ্টেনের ভয়ে সর্বদা সিঁটিয়ে থাকে, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে প্রার্থনার ভিতর দিয়ে ওরা রাত কাটায়, আর সবচেয়ে ছোট বাচ্চাটি তো একবার ভয় পেয়ে হাত-পা খিঁচতে খিঁচতে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ওই ক্যাপ্টেনটি, আমি বিলক্ষণ অবগত আছি, নেভ্স্কি সড়কে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিক্ষে করে। তাকে বসানোর মতো কোনো খালি পদ কোথাও মেলে নি, কিন্তু ভারি তাজ্জবের ব্যাপার (আর সেজন্যেই আমি এসব কথা বলছি) যে, এত কটা মাস তিনি আমাদের সঙ্গে থাকলেও একবারও তাঁর ব্যাপারে আমার অসহিষ্ণু হওয়ার কোনো কারণ ঘটে নি। খুব স্বাভাবিক যে গোড়া থেকেই আমি তাঁর সঙ্গ এড়িয়ে চলেছি, তবে তিনিও আমাদের প্রথম সাক্ষাতেই আমাকে বিরক্তিকর মানুষ বলেই ঠাউরেছিলেন; তাই ঘরের ভিতরে তারা কতজন বসে আছে কিংবা বসে বসে গলা ফাটিয়ে কদ্দূর চেঁচাচ্ছে সে-সব নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। সারারাত আমি বসে থাকতাম, কিন্তু সত্যি বলতে কী ওরা যে রয়েছে তা এতটাই ভুলে যেতাম যে, ওদের গলার আওয়াজ পর্যন্ত আমার কানে ঢুকত না। আমি অনিদ্রায় ভুগি, বুঝতেই পারছেন; গত এক বছর ধরে আমার এমন অবস্থা। রাতভর আমি আরামকেদারায় বসে থাকি, স্রেফ বিনি কাজে। পড়াশোনোর ব্যাপারস্যাপার তো আমি দিনের বেলাতেই চুকিয়ে ফেলি। অগত্যা আমি ঠায় বসে থাকি, কোনো কিছু চিন্তা পর্যন্ত করি না। মাথায় যদি কোনো চিন্তা উঁকি দেয়ও, তো সে-সব এলোমেলো ভাসা-ভাসা, আমি তাদের যথেচ্ছ ঘুরে বেড়াতে দিই। প্রতি রাতেই মোমবাতিটা ক্ষইতে ক্ষইতে শেষ হয়। আর আমি আমার চেয়ারে চুপচাপ বসে থাকি, রিভলভারটা হাতে নিই, টেবিলের ওপরে রাখি। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করি, ‘তুমি কি নিশ্চিতই ঠিক করেছ?’ দৃঢ়চিত্তে নিজেই তার উত্তর দিই, ‘নিশ্চয়ই।’ মানে দাঁড়াল : নিজের জান আমি নিজে নেব। জানতাম, সে-রাত্রেই আমি নির্ঘাত আত্মহত্যা করব, কিন্তু টেবিলের সামনে কতক্ষণ ধরে যে বসে ছিলাম তা নিজেই জানি না। হ্যাঁ, নিজেকে নিজে খুন করতাম তো বটেই, কেবল যদি-না ওই মেয়েটি এসে উদয় হতো।

 

দুই

ব্যাপারটা কেমন ঘটেছিল বলি : কিছুতেই কিছু যায় আসে না হলেও এটা তো সত্যি যে, শারীরিক যন্ত্রণা সইতে কষ্ট হয়। কেউ আমাকে আঘাত করলে ব্যথা লাগছে ঠিকই টের পেতাম। মানসিকভাবেও ঠিক তেমনটাই : করুণ কোনো কিছু ঘটলে বড়ো মায়া অনুভব করতাম অবিকল যেমন হওয়া উচিত, অথচ আমি কিনা ভাবছি পৃথিবীর কোনো কিছুতেই আমার এসে যায় না। সে-রাত্রেও প্রথমে ওরকম মায়াই বোধ করেছিলাম : ওই বাচ্চাটাকে আমার সাহায্য করা উচিত ছিল বৈকি। তবে খুকিটিকে আমি কেন সাহায্য করি নি? কারণ, একটা চিন্তা আমার মাথায় এসেছিল; মেয়েটি যখন আমার কোটের কোণ অাঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে তখনই সমস্যাটি  সশরীরে আমার সামনে এসে হাজির হয় আর আমি তা সমাধান করতে ব্যর্থ হই। সমস্যাটি অলস মস্তিষ্কপ্রসূত হলে কী হবে, তার সমাধান করতে না পারায় আমার মেজাজ চড়ে যায়। কারণ হলো – সে-রাত্রেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে পৃথিবীর কোনো কিছুর ওপরেই আমার মায়া থেকে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেটাই যদি হবে, তাহলে হঠাৎ কেন মেয়েটার জন্যে দরদ উথলে উঠল আর কেনই-বা তার জন্যে মনটা অমন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল? আমার খুব মনে আছে, খুকিটির জন্যে ভারি মনখারাপ করছিল, অথচ আমার ওরকম মানসিক অবস্থায় তা কী পরিমাণ মর্মঘাতী ও উদ্ভট ছিল যে বলবার নয়। আমার তখনকার মনের অবস্থার এর চেয়ে জুতসই বর্ণনা আমি দিতে অক্ষম; কিন্তু আমার ঘরে ফিরে যাওয়া, চেয়ারে চুপটি করে বসে থাকা ইত্যাদি সমস্ত কিছুতে আমার সে-মনোভাবটিই বজায় ছিল, আর তাতে করে আমার মন ভারি খিঁচড়ে গিয়েছিল, অমন মানসিক অবস্থা বহুকাল হয় নি। একটা যুক্তির পরে আরেকটা যুক্তি এসে হাজির হয়। আমার কাছে চূড়ান্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে : যদি আমি মনুষ্যপদবাচ্য কোনো প্রাণী হয়ে থাকি, শূন্যগর্ভ কিছু না হই, না হতে চাই, তো জলজ্যান্ত একটা মানুষ হিসেবে কৃতকর্মের জন্যে উচিত আমার কষ্ট পাওয়া, ক্ষুব্ধ হওয়া, লজ্জা বোধ করা। ঠিক আছে, তা নাহয় হলো। কিন্তু আমি যদি ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে নিজেকে মেরেই ফেলি, তবে মেয়েটিকে নিয়ে ভেবে আর লাভ কী, লজ্জাবোধ কিংবা দুনিয়ার কোনো কিছু নিয়েই ভাবনাচিন্তাতেই-বা ফল কী? আমি তো একেবারে হাওয়া হয়ে যাব, স্রেফ হাওয়া। এমন কি হতে পারে যে, মেয়েটির জন্য মায়া জাগা কিংবা আমার দুষ্কর্মের জন্য লজ্জা তখন অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে, যেহেতু আমি নিজেই তো তখন অস্তিত্বহীন হয়ে যাব? ঠিকই তো, যখন আমি মাটিতে পা ঠুকেছিলাম, বেচারা মেয়েটিকে বিশ্রীভাবে বকুনি দিয়েছিলাম সে যেন এ-কথাই ঘোষণা করতে যে, ‘মনে মায়া-মমতা জাগা তো বহুত দূর, আমি অমানুষের মতো কিছু-একটা করে ফেলতে চাইলেও তা পারি, কেননা এখন থেকে ঘণ্টা দুয়েক পরেই তো সব মায়ায় মিলিয়ে যাবে।’ যদি বলি আমার চেঁচিয়ে ধমকে ওঠার পিছনে কারণ ছিল এটাই, তবে কি তা বিশ্বাস করবেন? আমি প্রায় নিশ্চিত, এটাই ছিল সেই কারণ। আমি যেন আন্দাজ করতে পেরেছিলাম : জগৎ ও জীবন নির্ভর করছে আমারই ওপরে। এমনকি এও বলতে পারি যে, দুনিয়াটা যেন আমার একার জন্য তৈরি হয়েছে : নিজেকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে পৃথিবীও নাস্তি হয়ে যাবে, অন্তত আমার বেলায়। আমি গত হয়ে গেলে সবই অস্তিত্ববিহীন হওয়ার সম্ভাবনা এবং আমার চৈতন্যে পৃথিবী ঝাপসা হয়ে যাওয়ায় সব মরীচিকাসদৃশ অলীক হয়ে যাবে, কারণ আমাদের পৃথিবী ও মানুষজন তো আমারই অস্তিত্বের অংশ। আমার মনে আছে, বসে বসে আমি যখন এসব যুক্তি পরম্পরা সাজাচ্ছি তখন নবোদ্ভূত সমস্যাদি ঘূর্ণির মতো পাক খেয়ে উঠে সম্পূর্ণ নতুন চিন্তার দিকে আমার মনকে ঠেলে দিলো। যেমন, অদ্ভুত এক ভাবনা জেগে উঠল : ধরা যাক – কখনো আমি চাঁদে কিংবা মঙ্গলগ্রহে থেকেছি, আর সেখানে বসবাসের কালে কল্পনা করা যায় এমন সব জঘন্য ঘৃণার্হ কাজকর্ম করেছি, যার ফলে শাস্তি ও অসম্মান ভোগ করার চিত্র দুঃস্বপ্নের ভিতরে দেখছি, যেমন দেখতে পাচ্ছি যে দুনিয়ায় বেঁচে থাকার সময়ে আমার দ্বারা সংঘটিত সকল অপরাধ মূর্তি ধরে এসে সামনে হাজির হয়েছে : কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করব না, তা জেনে যাওয়ার পরও আমার কীই-বা আসবে-যাবে তখন? আমি কি তখন আমার সকল কর্মকান্ডের জন্যে লজ্জা পাব, নাকি পাব না? এ-সব প্রশ্ন মগজের অলস চিন্তাজাত ও অনর্থক, কেননা রিভলভারটি তো আমার সামনে টেবিলের ওপরেই পড়ে আছে এবং আমি মনেপ্রাণে জানতাম – যা ঘটবার তা ঘটবেই, তথাপি জিজ্ঞাসাগুলো আমাকে উত্তেজিত করে তুলল এবং আমি যেন উন্মাদপ্রায় হয়ে গেলাম। প্রথমে কোনোকিছুর সমাধান না করে আমি মরতে পারব বলে মনে হচ্ছিল না। সংক্ষেপে, ওই বাচ্চা মেয়েটি আমার জীবন বাঁচিয়ে দিলো, কারণ অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো আমার কর্মসমাধা করতে দিলো না। ইতোমধ্যে ক্যাপ্টেন সাহেবের কামরার হইচই ধীরে ধীরে মিইয়ে এসেছে, তারা তাদের খেলা সাঙ্গ করেছে, শুয়ে পড়ার তোড়জোড় করছে, অসন্তোষের সুরে কীসব বিড়বিড় করে বলছে, খুব ঘুম পেয়ে যাওয়ায় পরস্পরের প্রতি উৎক্ষিপ্ত বাক্যবাণ ততক্ষণে প্রায় প্রশমিত। ঠিক তখনই এমন হঠাৎ করে আমার ঘুম পেয়ে গেল যে, চেয়ারে বসা অবস্থাতেই টেবিলে মাথা রেখে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম; এর আগে কক্ষনো এমন ঘটে নি – আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘুমে ঢলে পড়েছি। স্বপ্ন, আমরা সবাই জানি, ভীষণ অদ্ভুত একটা ব্যাপার : এই তুমি প্রতিটি জিনিসের খুঁটিনাটি সব দেখতে পাচ্ছ, আবার পরক্ষণেই হয়তো-বা স্থান-কাল তালগোল পাকিয়ে মুহূর্তের ভিতরে যেন ঝটিকাপ্রবাহ বয়ে গেল। আমার ধারণা, স্বপ্নকে যুক্তিবোধ নিয়ন্ত্রণ করে, করে ইচ্ছাশক্তি ও হৃদয়, কখনোই মন নয়; অথচ স্বপ্নের ভিতরেই কখনো কখনো যুক্তিবুদ্ধি কী অবিশ্বাস্য চালাকিই-না করে বসে! ঘুমের ভিতরে আমার বিচারবুদ্ধির যে-দশা হয় তা অবিশ্বাস্য। একটা উদাহরণ দিই। আমরা ভাই মারা গেছে পাঁচ বছর হলো। স্বপ্নে কখনো কখনো তাকে দেখতে পাই : আমার নানা ব্যাপারে সক্রিয় অংশ নিচ্ছে সে, আমরা দুজনে পরস্পরের ভারি ন্যাওটা, অথচ স্বপ্নের ভিতরেই পরিষ্কার বুঝতে পারছি, সে অনেক বছর হলো মারা গেছে, তাকে কবর দেওয়া হয়েছে। তা হলে তাকে আমার পাশে দেখে, আমার জন্য দুশ্চিন্তিত দেখে, কেন আমি অবাক হচ্ছি না? আমার যুক্তিবোধ বেশ খুশিমনে কেন তার সঙ্গে হাত মেলায়? যাক গে, যথেষ্ট হলো। এখন আমার স্বপ্নের কথায় ফিরে আসি। হ্যাঁ, ৩রা নভেম্বরে যে-স্বপ্ন দেখেছি, সেই কথায়। জানি, সবাই আমার পিছনে লাগবে এই বলে যে, আরে, ওটা তো স্বপ্ন কেবল, তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু স্বপ্নই হোক কিংবা না-ই হোক সেটা বড়ো কথা নয়, আসল কথা হলো – আমার চোখে সে আঙুল দিয়ে ‘সত্য’ কী তা দেখিয়ে দিয়েছে। আর, একবার তুমি যদি সত্যকে চিনতে বুঝতে শেখো তো দেখামাত্র উপলব্ধি করবে যে, ইহাই সত্য এবং এর বাইরে অন্য কিছু, এর কোনো ব্যত্যয়, কখনোই সম্ভব নয় – সে তুমি স্বপ্নাবস্থাতেই থাকো কিংবা জাগ্রতাবস্থাতেই থাকো। অতি উত্তম, স্বপ্নই না-হয় হলো – স্বপ্নই হোক, কিন্তু ঘটনার হেরফের তো ঘটছে না : যে-জীবনের প্রশংসায় সকলেই পঞ্চমুখ সেই জীবনকে আমি খতম করব, কেননা আমার স্বপ্ন, হ্যাঁ আমার স্বপ্ন, আমাকে আরেক জীবনের সন্ধান দিয়েছে, যে-জীবন পুনরুজ্জীবিত, চমকপ্রদ এবং মহীয়ান।

শুনুন তাহলে।

 

তিন

আমি তো আগেই বলেছি, বুঝে ওঠার আগেই আমি দুম্ করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কিন্তু জেগে না থাকলেও মাথা আমার চিন্তার কাজ ঠিকই চালিয়ে গেছে। স্বপ্নে দেখলাম, রিভলভারটা নিয়ে বুকের ওপর ধরে রেখেছি – বুকের ওপরে, মাথায় নয় কিন্তু, অথচ আমি নিশ্চিতভাবে ঠিক করে রেখেছিলাম যে গুলিটা আমি মাথায় করব, কপালের ঠিক ডান দিকের রগে। বুকের ওপর রিভলভার চেপে ধরার পর দু-এক মুহূর্ত মাত্র কেটেছে, হঠাৎ মোমবাতিটা, টেবিল, সামনের দেয়াল সব আমার চোখের সামনে দুলতে লাগল। দ্রুত আমি পিস্তলের ঘোড়াটা টিপে দিলাম।

স্বপ্নে যেমন হয়ে থাকে – অনেক উঁচু জায়গা থেকে তুমি নিচে পড়ে যাচ্ছ, কিংবা তোমাকে কেউ ছুরি মেরেছে কি মার্ডার করেছে, কিন্তু তোমার কষ্ট হয় নি, যতক্ষণ না চমকে উঠেছ কি খাটের হাতায় মাথা ঠুকে গেছে, ততক্ষণ কোনো ব্যথা বোধ করবে না; ব্যথা টের পাওয়া মাত্র তোমার ঘুম ভেঙে যাবে। আমার স্বপ্নের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার : আমি কোনো ব্যথাই বোধ করি না, অথচ আমার সমস্ত অন্তরাত্মা যেন ধাক্কা খেয়ে চমকে ওঠে আর আকস্মাৎ চোখের সামনে সব নিভে যায়, আমার চারপাশে ভয়ানক অন্ধকার এসে জমা হয়। যেন আমি অন্ধ ও বোবা হয়ে গেছি এমন বোধ করতে থাকি। আমি শক্ত কিছু একটার ওপরে চিৎপাত হয়ে শুয়ে ছিলাম, চোখে কিছুই দেখছিলাম না, সামান্যতম নড়াচড়া করতেও পারছিলাম না। আমার এপাশে-ওপাশে কারা যেন ভীষণ জোরে চেঁচামেচি করছে, মাটিতে পা ঠুকছে : ক্যাপ্টেন সাহেবের নিচু গলার গমগমে আওয়াজ, বাড়িউলির তীক্ষ্ণ কির্কিরে কণ্ঠস্বর – তার পরপরই পুনরায় হঠাৎ সব অন্ধকার : ওরা আমাকে কফিনে পুরে নিয়ে যাচ্ছে, কফিনের ঢাকনা পেরেক মেরে বন্ধ করা। কফিনের দুলুনি আমি টের পাচ্ছিলাম, আর এ নিয়ে ভাবতে শুরু করা মাত্র হঠাৎ প্রথমবারের মতো মাথায় একটা চিন্তা খেলে গেল : আমি মরে গেছি, নিরঙ্কুশভাবে মৃত একটা মানুষ আমি। নিঃসন্দেহভাবে ব্যাপারটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম – যদিও না কিছু চোখে দেখছি, না নড়াচড়া করতে পারছি। কিন্তু, অনুভব করতে ও যুক্তি দিয়ে বুঝতে পারছিলাম। অবশ্য অল্পক্ষণের মধ্যেই অবস্থাটা আমি মানিয়ে নিলাম, আর স্বপ্নে যেমন ঘটে – সবই নির্দ্বিধচিত্তে গ্রহণ করলাম।

আর এখন ওরা দেখছি আমার কবরে মাটি ফেলছে। নিঃসঙ্গ আমি পড়ে থাকলাম, একেবারে একাকী। আমার শরীরে এতটুকু চাঞ্চল্য জাগে নি। যখন ভেবেছি কবর দেওয়া হয়ে গেলে আমার কেমন লাগবে, তখন কেবল স্যাঁতসেঁতে আর কন্কনে ঠান্ডার কথাটাই মনে হয়েছে। সত্যিই ভয়ানক শীত বোধ করতে লাগলাম, পায়ের আঙুলগুলোর ডগার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ হয়ে দাঁড়াল, অনুভূতি বলতে এটুকুই কেবল  অবশিষ্ট ছিল।

কবরের ভিতরে পড়ে থাকলাম। অবাক কান্ড, মনের মধ্যে এতটুকু আশা জাগেনি; আমি এই ভেবে একেবারে গা ছেড়ে দিয়েছিলাম – মরা মানুষের  আবার আশা করবার কী আছে। কিন্তু কবরটা যে স্যাঁতসেঁতে। কতক্ষণ ধরে ওখানে পড়ে ছিলাম বলতে পারব না – এক ঘণ্টা নাকি এক দিন নাকি অনেক দিন। হঠাৎ কফিনের ওপর দিয়ে চুঁইয়ে আসা এক ফোঁটা পানি আমার বন্ধ-থাকা বাঁ চোখের ওপর পড়ল, মিনিটখানেক বাদে আরো একটা ফোঁটা, তারপর তৃতীয় ফোঁটা, এভাবে এক মিনিট পরপর পানির ফোঁটা পড়তেই থাকল। ব্যাপারটাকে ভারি একটা উপদ্রব মনে হতে লাগল, তারপর হঠাৎই শারীরিক কষ্টও যেন টের পেলাম। ভাবলাম – আমার ক্ষতের ব্যথা, সেই যে গুলি লেগেছিল, সেটা দেখছি রয়েই গেছে। জলের ফোঁটা কিন্তু টপ্ টপ্ করে পড়ছেই, প্রতি মিনিটে একটি করে ফোঁটা, সোজা আমার বন্ধ চোখের ওপরে। আমি অকস্মাৎ আমন্ত্রণ জানাই, – মুখ ফুটে কথা বলে নয়, কারণ আমার সবকিছু তো অবশ হয়ে আছে – আহবান করি আমার সমুদয় অস্তিত্ব দিয়ে, বিশ্ব-চরাচরের যিনি নিয়ন্তা তাঁকে বলতে থাকি :

‘তুমি যেই হও-না কেন, যদি তুমি থেকেই থাকো এবং বর্তমানে যেমন সব রয়েছে তদপেক্ষা অধিক মেধাবী কোনো বিন্যাস কোথাও থেকে থাকে যদি, কষ্ট করে এখানেও দেখা দাও। কিন্তু যদি আমার মূঢ় আত্মহত্যার কারণে আমরা ওপরে পরলোকে কুৎসিত ও উদ্ভট প্রতিশোধ নিতে তোমার ইচ্ছে যায়, তো কোনো নির্যাতনই আমার অনুচ্চারিত ঘৃণার সঙ্গে তুলনীয় হবে না, এমনকি যদি আমার আত্মাহুতির পর লক্ষ লক্ষ বৎসরও কাটে, তবুও।’

আমার আবাহন শেষ হয়, আমি চুপ করি। প্রায় মিনিটখানেক গভীর নীরবতা জেঁকে বসে, আরো এক ফোঁটা জলবিন্দু টুপ্ করে পড়ে; কিন্তু আমি অন্তহীন ও প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে হৃদয়ঙ্গম করি যে, এখন থেকে সবই পালটে যাবে। এরপর হঠাৎ করে আমার কবর হাঁ হয়ে খুলে যায়। আমি ঠিক জানি না কবরটা পুনর্বার খোঁড়া হলো কিনা, কিন্তু কৃষ্ণকায় ও অদ্ভুত কিছু-একটা আমাকে উপরে তুলে ফেলে আমাকে নিয়ে শূন্যে পাড়ি জমাল। অকস্মাৎ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলাম। রাত তখন সুগভীর আর অমন ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন আর কখনো দেখা যায় নি। মহাশূন্যে আমরা উড়ে চলেছি, পিছনে মাটির পৃথিবী শাঁ শাঁ করে সরে যাচ্ছে। যে আমাকে নিয়ে যাচ্ছিল তাকে আমি কিছুই বলি না, আমি অপেক্ষা করে থাকি, ভালোই দেমাগ ছিল বটে আমার বলতে হবে। আমি নিজেকে বোঝাই – তুমি তো মোটেই ভয় পাও নি বাপু। ভয় যে পাই নি সে-চিন্তাতে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠি, কতক্ষণ ধরে আমরা উড়ে চলেছিলাম তা বলতে পারব না, কিছু আন্দাজ করা সম্ভব হয় নি : সচরাচর স্বপ্নে যেমনটি ঘটে থাকে তেমনই ঘটছিল – স্থান ও কাল, জীবন ও যুক্তিজ্ঞানের যাবতীয় নিয়ম, লাফিয়ে লাফিয়ে পার হচ্ছে, থামছ কেবল তখনই যখন প্রাণ চাইছে। বিলক্ষণ মনে আছে, অাঁধারের ভিতরে হঠাৎ এক তারকাবিন্দু চোখে পড়ল। ‘ওটা কি সেই  মাঙ্গলিক তারকা নয়?’ প্রশ্নটা মুখ ফস্কে বেরিয়ে যায়, যদিও             এ-প্রশ্ন আমি করতে চাই নি। ‘না, তোমার বাড়ি যাওয়ার পথে মেঘের ভিতরে যে-তারা তুমি দেখতে পেয়েছিলে ওটি হলো সেই তারা’ – উত্তর আসে আমার বাহকের কাছ থেকে। যে আমায় নিয়ে যাচ্ছে তার সঙ্গে মানুষের চেহারার কোথায় যেন মিল রয়েছে। অদ্ভুতই বলতে হবে যে, ওকে আমার একটুও ভালো লাগে নি, বরং ওর প্রতি গভীর বিতৃষ্ণা বোধ করছিলাম। আমি পরিপূর্ণ অস্তিত্বহীনতা আশা করেছিলাম, আর সে-চিন্তার বশেই নিজেকে গুলি করি। অথচ এখন এমন একটা জিনিসের হাতে পড়েছি যে কোনোক্রমেই মানুষ নয়, কিন্তু তারপরেও অস্তিত্ববান কিছু-একটা তো বটে। ‘আমাদের নশ্বর জীবনের পরেও জীবন যে বর্তমান, এতে শুধু সেটাই বোঝাচ্ছে’, স্বপ্নের অদ্ভুত চাপল্যে মনে মনে বলি, কিন্তু আমাদের মনের ভাবটি অক্ষতই রয়ে যায়। ভাবতে থাকি, ‘যদি আমি আরেকবার ঠিক এমনটিই ‘হই’ এবং কারো অপরাজেয় ইচ্ছাশক্তির কারণে ফের জীবনধারণ যদি করতেই হয়, তো কখনো হার মানতে কি অপদস্থ হতে নিশ্চয়ই চাইব না!’ ‘শুনছ, আমি তোমার ভয়ে তটস্থ থাকি আর সেজন্যেই তুমি আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য কর’, আমি হঠাৎ বলে ফেলি নিজের মনোভাব চাপতে না পেরে, আমার ভিতরে অপমানিত হওয়ার খোঁচানি যেন অনুভব করি। এর কোনো জবাব নেই; কিন্তু আমি তখনই জানি যে কেউই আমাকে হেনস্থা করছে না, আমাকে নিয়ে হাসাহাসিও করছে না কেউ কিংবা করুণাও করছে না আমাকে; আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, মহাশূন্যের ভিতর দিয়ে আমাদের যাওয়ার পিছনে কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে, রহম্যময় ও দুর্বোধ্য হলেও তার কারণটা আমিই, অন্য কেউ নয়। বুকের ভিতরে ভয় কেবল বাড়তেই থাকে। নিঃশব্দে অথচ যন্ত্রণাকরভাবে কী যেন আমার ভিতরে কেটে কেটে ঢুকিয়ে দিচ্ছে আমার নীরব সঙ্গীটি। আমরা অন্ধকার ও অচেনা শূন্যতার ভিতর দিয়ে উড়ে চলেছি। যে-গ্রহনক্ষত্রপুঞ্জ দেখতে চোখ অভ্যস্ত তা আর দেখা যাচ্ছিল না। জানতাম যে, মহাগগনের বিশাল বিস্তারে কিছু গ্রহতারকা রয়েছে যাদের আরো পৃথিবীপৃষ্ঠে পৌঁছুতে লক্ষ লক্ষ বৎসর অতিক্রান্ত হয়। কে জানে, হয়ত সেরকম এলাকাগুলোর ভেতর দিয়ে আমরা উড়ে চলেছি। কিসের আশায় মন আমার বসে ছিল জানি না, আমার অশান্ত হৃদয়ের টুঁটি টিপে ধরেছিল নিদারুণ এক উৎকণ্ঠা। হঠাৎ পরিচিত ও খুব ঝাঁকুনি দেওয়ার মতো এক অনুভূতি আমাকে দখল করে নেয় : আরে, ওই তো আমাদের  সুয্যি মামা : পৃথিবীতে যে-সূর্য আমরা দেখি সেই সূর্য নিশ্চয়ই এটি হতে পারে না, আমাদের সূর্য থেকে অসীম দূরত্বে এই মুহূর্তে আমরা রয়েছি – এই বোধশক্তি আমার ঠিক ছিল; অথচ আমার পুরো অস্তিত্ব আমাকে বলছিল যে, এই সূর্য অবিকল আমাদের সূর্যেরই অনুরূপ, তারই নকল যেন, তারই যমজ সত্তা। আমার অন্তরাত্মা মধুর ও পরমানন্দ এক অনুভূতির আস্বাদ পেল : আলোকের এই চেনা উৎস, এই একই আলো আমাকে জীবন দিয়েছে, আমার হৃদয়ে এক প্রতিধ্বনির পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছে, এবং আমাকে মাটির নিচে সমাহিত করার পর প্রথমবারের মতো জীবনের স্পন্দন আমি অনুভব করলাম, পূর্বেরই জীবনস্পন্দন।

‘কিন্তু এটাই যদি সূর্য হয়, অবিকল আমাদের সূর্যের মতোই হয়, তবে পৃথিবী গেল কোথায়?’ – আমি চেঁচিয়ে উঠি। আমার সঙ্গী আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটা তারার পানে, যেটি অন্ধকারে ঝিকমিক করছিল পান্নার মতো। আমরা ঠিক ওর পানেই সোজা উড়ে যাচ্ছি।

‘বিশ্বব্রহ্মান্ডে এমন হুবহু নকল কি আদৌ সম্ভব? এই কি যথার্থ প্রাকৃতিক বিধান? এবং যদি ওই তারকাটি ধরিত্রী হয়ে থাকে, তো তা কি আমাদের ধরিত্রী হতে পারে – আমাদের হতভাগ্য ও দীনহীন ধরিত্রীমাতা, তথাপি কী আদরের কত ভালোবাসার ধন, চূড়ান্ত অকৃতজ্ঞ সন্তানেরাও যাদের জন্মভূমির প্রতি তীব্র ভালোবাসায় কি অনুপ্রাণিত হয় না?’ আমি আনন্দ-উচ্ছলতায় শিহরিত হতে-হতে, আমাদের যে প্রিয় ও পুরাতন পৃথিবী ছেড়ে এসেছি তার জন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করি। সেই দুঃখী বালিকার প্রতি অনুকম্পা বোধ না করার ব্যাপারটি চকিতে আমার মনে এসে হাজির হয়।

আমার সঙ্গী বলে ওঠে, ‘সবই তুমি দেখতে পাবে’; আমি ওর কথায় বিষণ্ণতার আভাস লক্ষ্য করি। আমরা ততক্ষণে গ্রহের কাছাকাছি দ্রুত চলে এসেছি। আমি সব সাগর মহাসগর ইউরোপ মহাদেশের রূপরেখা, স্পষ্ট শনাক্ত করতে পারছি, আর তখনই অকস্মাৎ বুকের ভিতরে এক বিশাল ও পুণ্যগর্ভ ঈর্ষার অস্তিত্ব টের পাই। ‘এ ধরনের অবিকল প্রতিরূপ কীভাবে আর কী কারণেই বা ঘটতে পারল? যাকে পিছনে ফেলে এলাম একমাত্র সেই পৃথিবীকেই তো আমি ভালোবাসি, ভালোবাসতে পারি। কল্জে ফুটো করে যে গুলিটা বেরিয়ে গেছে, অকৃতজ্ঞভাবে আমার রক্তে লাঞ্ছিত করেছি যে-মৃত্তিকা তাকেই আমি ভালোবাসি, ভালোবাসতে পারি। মাটির প্রতি আমার আসক্তি তো কখনো ঘোচেনি, যে-রাতে আমি তাকে ছেড়ে আসি তখনো মনে হয়েছে আগের চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসছি তাকে। এই যে নতুন পৃথিবী এখন দেখছি, এখানেও কি ভালোবাসার কষ্ট সহ্য করতে হয়? আমাদের পৃথিবীতে কষ্টভোগের ভেতরেই সত্যিকার ভালোবাসা সম্ভব হয়ে ওঠে। অন্য কোনোভাবে আমরা ভালোবাসতে পারি না, অন্য ধরনের ভালোবাসা কেমন জানি না। ভালোবাসতে হলে অবশ্যই দুঃখকষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা থাকতে হবে। এই মুহূর্তে আমি পিছনে ফেলে আসা এই একক ও নির্ভেজাল ধরিত্রীমাতাকে চুম্বন করতে চাই, কেঁদে বুক ভাসাতে চাই, জীবন যদি থেকেও থাকে অন্য কোনোখানে আমি তাকে চাই না, আমি তা অস্বীকার করি।’

কিন্তু আমার সঙ্গীটি এর মধ্যে আমাকে ত্যাগ করে চলে গেছে। এটা যে কেন ঘটল আমি জানি না। হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, দিনের ঝক্ঝকে আলোয় দুনিয়া ঝক্মক্ করছে। আমার বিশ্বাস, গ্রিসের দ্বীপপুঞ্জের কোনো একটি এটা হবে, কিংবা মূল ভূখন্ডের সংলগ্ন কোনো স্থান। আমাদের পৃথিবীতে যেমন ঠিক তেমনই এখানকার মাটি; মনে হচ্ছিল, ছুটির দিনের খুশির আবহাওয়া বিরাজ করছে, যে বিশাল ও পুণ্য দিবসের ঐশ্বর্য শেষ পর্যন্ত উজ্জ্বল হয়ে উঠল এ হলো তারই প্রকাশ। পান্নার মতো সবুজ শান্ত সমুদ্র হালকাভাবে ছুঁয়ে আছে তটভূমি এবং অনাবৃত, দৃশ্যমান, প্রায় চেতনাসম্পন্ন এক ভালোবাসা তাকে আলিঙ্গন করে আছে। উঁচু-উঁচু সুন্দর গাছগুলো ফুলে ছেয়ে আছে; তাদের অগুনতি ছোট-ছোট পাতা মর্মরধ্বনি তুলে আমাকে স্বাগত জানাচ্ছে, আমি নিশ্চিত – তারা তাদের ভালোবাসা জানাচ্ছে। সামনের মাঠ ঝিকমিক করছে রৌদ্রালোকে, সুগন্ধ ফুলে-ফুলে ভরে আছে। ঝাঁক বেঁধে পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে, আমাকে আদৌ ভয় না পেয়ে আমার কাঁধে হাতে এসে বসছে, তাদের চমৎকার কাঁপা-কাঁপা ডানা দিয়ে ঝাপটা মারছে। এই আনন্দমুখর জায়গাটির মানুষজনকে আমি শেষ পর্যন্ত দেখতে পেলাম, চিনতে পারলাম। তারা নিজেরাই আমার কাছে এগিয়ে এসেছিল, আমাকে ঘিরে ধরেছিল, চুম্বন করেছিল আমাকে। সূর্যের সন্তানেরা, তাদের নিজস্ব সূর্যের, – কী সুন্দর যে তারা দেখতে! আমাদের গ্রহে কোনো মানুষকে এত সুন্দর আমি দেখি নি। আমাদের ছোট ছোট ছেলেপিলেদের ভিতরে সম্ভবত এমন সৌন্দর্যের হালকা আদল দেখা যায়। এই সুখতৃপ্ত লোকগুলোর চোখ ঔজ্জ্বল্যে চক্চক্ করছে। জ্ঞানগম্যি ও বুদ্ধিমত্তায় উজ্জ্বল তাদের মুখমন্ডল বড়ো প্রশান্তিতে ভরে আছে, কিন্তু তার প্রকাশ খুব উচ্ছল, তাদের কথাবার্তা ও কণ্ঠস্বর শিশুসুলভ আনন্দে উদ্ভাসিত। হ্যাঁ, তাদের মুখের ওপর তাকিয়ে দেখতেই সবই আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গিয়েছিলাম। এ হলো তেমনি এক দুনিয়া যাকে কোনো পাপ স্পর্শ করে নি, এখানকার লোকগুলো কখনো কোনো পাপ করে নি, মানবজাতির ইতিহাসে যেমন স্বর্গের নন্দনকাননে আমাদের পূর্বপুরুষদের বসবাসের কথা বলা হয়েছে সেরকমই একটা জায়গায় তারা অবস্থান করছে, পাপ কাকে বলে তা তাদের জানা নেই; আমাদের এই ধরিত্রী কখনো কোনোকালে এমন নন্দনকাননই তো ছিল। আনন্দে হাস্যমুখর মানুষগুলো এসে জড়িয়ে ধরে আমাকে; আমাকে টেনে নিয়ে এমন জায়গায় যায় যেখানে স্বস্তি ও আরাম বোধ করতে পারি। তারা আমাকে কোনো কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে না, যেন-বা তারা সবই জেনে গেছে; আমার মুখচোখ থেকে বেদনার ছায়াটুকু পর্যন্ত তারা মুছে দিতে উৎসুক।

 

চার

আমি আবার বলি, দেখতেই তো পাচ্ছেন : স্বপ্নের মধ্যেই কেবল এমন কিছু ঘটা সম্ভব। কিন্তু ওইসব নিরপরাধ ও চমৎকার মানুষগুলোর চিরটাকাল আমাকে ভালোবেসে আমার কারণে যে-অনুভূতি আমার ভিতরে জাগ্রত হয়, যেমন এই মুহূর্তে হচ্ছেও, তা হলো – কেউ যেন উপর থেকে নিচে পড়তে থাকা ভালোবাসার ঝর্ণাধারায় আমাকে স্নান করাচ্ছে। ওদেরকে আমি স্বচক্ষে দেখেছি, জেনেছি ওদের এবং ওদের সঙ্গে একমত হয়েছি; আমি ওদের ভালোবেসেছি এবং ভালোবাসার কারণে যন্ত্রণাও ভোগ করেছি। হ্যাঁ, প্রথম থেকেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম, বহু ব্যাপারে ওদেরকে বুঝে উঠতে পারা সম্ভব নয় আমার পক্ষে, যেমন – সাংক্ৎ পিতের্বুর্গ্ শহরের একজন আধুনিক প্রগতিশীল দুস্থ নাগরিক হিসেবে আমার বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে, ওরা বহু কিছু জানলেও আমাদের বিজ্ঞানশাস্ত্রটি ওদের অধিকারে নেই। অথচ অনতিকালের মধ্যেই ধরতে পেরেছিলাম যে, আমাদের আয়ত্তাধীন যাবতীয় বিষয়ের বাইরে অবস্থান করলেও ওদের জ্ঞান সমৃদ্ধ হয়েছে অন্যতর বহু বিষয়ে। ওদের আশা-আকাঙ্ক্ষাও আমাদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। কিছু নিয়েই ওদের কোনো কামনা-বাসনা নেই, ওরা পুরোমাত্রায় পরিতৃপ্ত। আমরা জীবনকে জানার জন্য যেমন ছুটোছুটি করি ওরা তেমন করে না, কারণ ওদের জীবন পরিপূর্ণ। আমাদের বিজ্ঞান যেমন জীবনের অর্থ বোঝার চেষ্টা, গভীরতা বোঝার চেষ্টা করে, তার চেয়ে ওদের জ্ঞান সূক্ষ্মতর ও গভীরতর। জীবনে কীভাবে বাঁচতে হয় তা পরিমাপের চেষ্টা বিজ্ঞান করে থাকে, কিন্তু বিজ্ঞানের সহায়তা ব্যতিরেকেই ওরা বেঁচে থাকতে জানে। আমি ব্যাপারটি প্রত্যক্ষভাবে চাক্ষুষ করলেও তা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। ওরা ওদের বৃক্ষতরুলতা আমাকে দেখিয়েছে, কিন্তু যে-রকম মমতাভরে সে-সবের দিকে ওরা তাকাত আমি তার তেমন অর্থ বুঝি নি : ব্যাপারটা এমন – ওরা যেন ওগুলোর সঙ্গে কথা বলত। আরো মনে হয়, ওরা নিজেদের ভিতরে ভাব আদান-প্রদানের জন্য কোনো একটা ভাষা উদ্ভাবন করে নিয়েছিল, এবং আমি নিশ্চিত যে গাছপালাগুলো ওদের কথা বুঝতে পারত। প্রকৃতির সকল কিছুর সঙ্গে ওরা এরকমই আচরণ করত – প্রকৃতির সঙ্গে জীবজন্তুরা শান্তিতে সহাবস্থান করত, কখনো কারো ওপর চড়াও হতো না, থাকত সম্প্রীতিপূর্ণভাবে, মানুষের ভালোবাসা ওদের ভিতরেও সংক্রমিত হয়েছিল। তারা আকাশের দিকে আঙুল তুলে আমাকে গ্রহতারকা চেনাত, তাদের বিষয়ে বলে যেত, আমি সে-সব ঠিকমতো বুঝতে না পারলেও এটা নিশ্চিত বুঝেছিলাম যে, ওই চন্দ্র-সূর্য গ্রহ-নক্ষত্রাদির সঙ্গে কোনো এক রকম আত্মীয়তা বন্ধন, প্রত্যক্ষ জীবন্ত বন্ধন ওদের ছিল এবং আত্মিক যোগাযোগের বাইরেই। না, না, ওরা আমার ওপর কোনো জোরাজুরি খাটায় নি ওদের বুঝতে পারার জন্যে। যে-কারণেই হোক আমাকে ওরা খুবই ভালোবাসত; পরে বুঝতে পারি যে, ওরাও আমাকে মোটেই বুঝতে পারে না, আর সে-কারণে আমাদের মর্ত্যলোক নিয়ে কোনো কথা আমি তেমন বলতাম না। তারা ­যে-পৃথিবীতে বসবাস করে তার মৃত্তিকা চুম্বন করতাম, বিনা বাক্যে তার প্রতি ভক্তিপ্রণত হতাম – এসব তারা সোজাসুজি দেখতে পেত, এবং আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা  যেহেতু প্রচন্ড ছিল তাই আমাকে আদরযত্ন করাতে কোনো লজ্জা পেত না, আমার এমন ভক্তি-ভালোবাসা তারা অসংকোচে মেনে নিত। আমি আনন্দাশ্রু বিজড়িত চোখে কখনো যদি ওদের পায়ের ওপর পড়ে চুমু খেয়েছি তখন ওরা আমার জন্য কোনো তীক্ষ্ণ বেদনা অনুভব করে নি, আমি বুকের ভিতরে পরিষ্কার টের পেতাম কী অন্তহীন ভালোবাসায় ওরা আমার আবেগের উত্তর দিচ্ছে। আমি হতচকিতভাবে কখনো কখনো নিজেকে শুধিয়েছি : এটা কেমন কথা যে ওরা আমার মধ্যে কখনো ঈর্ষা বা বৈরী মনোভাব জাগিয়ে আমাকে অপমান করতে চায় নি? বারংবার নিজেকে প্রশ্ন করেছি আমা-হেন এক দাম্ভিক ও মিথ্যুক লোকও কেন নিজের অর্জিত জ্ঞান (যে-বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা ছিল না) জানান দিয়ে ওদেরকে তাক্ লাগাতে চায় নি, সে কি কেবল এ-কারণে যে আমি ওদের ভালোবেসে ফেলেছি। শিশুরা যেমন থাকে তেমনই আনন্দ ও দুষ্টুমি নিয়ে ওরা আছে। তারা ভারি সুন্দর সব ঝোপঝাড়ে বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মনের খুশিতে গান গাইছে, হালকা খাবার – গাছের ফলমূল – খাচ্ছে, মৌচাক থেকে মধু পাচ্ছে, গোয়ালের গরু-ছাগল থেকে দুধ দুয়ে নিচ্ছে। নিজেদের খাদ্য বস্ত্র সংগ্রহ করা নিয়ে খাটাখাটুনি তেমন করত না। তারা বিবাহ করত, সন্তানাদি হতো; কিন্তু কখনো তাদের মধ্যে ক্রূর ইন্দ্রিয়পরায়ণতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাই নি, অথচ আমাদের পৃথিবীতে আমরা সকলেই – একজনও বাদ নেই – তো ওই রিপুর কবলে বন্দি, এবং মানবজাতির যাবতীয় পাপকর্মের একমাত্র উৎস সেটিই। নবজাত শিশুদের তারা অভ্যর্থনা জানাত নিজেদের আনন্দের নতুন অংশীদার হিসেবে। কোনো কলহ বা ঈর্ষার অস্তিত্ব তাদের ভিতরে ছিল না, এ-শব্দগুলোর অর্থই তারা বুঝত না। কারো সন্তান জন্ম নিলে সে সকলেরই সন্তান হিসেবে গ্রাহ্য হতো, সবাই মিলেই একটি সংসার। লোকজনের মৃত্যু ঘটত ঠিকই, কিন্তু অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা ব্যাপারটি বেশ বিরলই ছিল, বৃদ্ধেরা মারা যেত শান্তিতে : মনে হতো যেন ঘুমিয়ে পড়েছে, যাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে তাদেরকে ও  চতুষ্পার্শ্বের সমস্ত কিছুকে হাসিমুখে আশীর্বাদ করতে করতে যাচ্ছে। আমি কোনো মনঃকষ্ট বা অশ্রু দেখতে পাই নি, দেখেছি শতগুণ বর্ধিত ভালোবাসার উল্লাস, কিন্তু সে-উল্লাস প্রশান্তিভরা, ধ্যানমগ্ন ও পূর্ণতাময়। ব্যাপারটা যেন এমন যে, মৃত্যুর পরে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হচ্ছে না, পৃথিবীর বন্ধন অটুটই থেকে যাচ্ছে। আমি যখন ওদের জিজ্ঞাসা করলাম অনন্ত জীবনে ওদের বিশ্বাস আছে কিনা, প্রশ্নটা যেন ওরা বুঝতেই পারল না; কারণ ওদের কাছে ঘটনাটা এত প্রত্যক্ষ সত্য যে, এমন সমস্যার অস্তিত্বই নেই ওদের কাছে। ওদের কোনো উপাসনালয় ছিল না, অথচ তারা বিশ্ব প্রপঞ্চের সঙ্গে অপরিহার্য, ঘনিষ্ঠ ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখত; তাদের কোনো ধর্মমত ছিল না বটে, কিন্তু তার বদলে এই নিরঙ্কুশ জ্ঞান তাদের ছিল যে : তাদের পার্থিব স্বর্গসুখ পৃথিবীর স্বভাবের চূড়ান্ত অবস্থার ভিতরে পরিপূর্ণতা পেলে যাবতীয় সমস্ত কিছুই – জীবিত ও মৃত – বিশ্বপ্রপঞ্চের নিবিড়তর সংস্পর্শে আসবে। সেই দিনটির জন্য আগ্রহ সহকারে তারা অপেক্ষা করে যাচ্ছিল এতটুকুও ধৈর্য না হারিয়ে বা অসুস্থ আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী না হয়ে। বরং মনে হতো, বুকের ভিতরে এর প্রাথমিক স্বাদ ওরা পেয়ে গেছে এবং নিজেদের মধ্যে তা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তারা গান গাইত, সকলের কণ্ঠনিঃসৃত সুরের সংমিশ্রণে এক যথার্থ ও আনন্দঘন সুরসঙ্গতি নির্মিত হতো। অপস্রিয়মাণ দিন তাদের যা অনুভব করিয়েছে তার কথাই গানে গানে তারা বলে যেত, স্বাগত সম্ভাষণে ও বিদায় কথনে। প্রকৃতি, ধরিত্রী, সমুদ্র, অরণ্যানী, সব কিছুকেই তারা স্বাগত জানাত। তারা নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে নিয়ে গান বাঁধত পরস্পরের প্রশংসা করে, ছোট ছেলেপিলেরা যেমন করে থাকে। সে-সব গান খুবই সাদামাটা হলেও গভীর অন্তস্তল থেকে বেরিয়ে এসে তাদের                অন্তরকে নাড়া দিত। কেবল বুঝি গানই? তাদের সমস্ত জীবন কাটত পরস্পরের সুখ্যাতি করে। যেন সকলে সকলের দ্বারা সম্মোহিত হয়ে রয়েছে, সর্বজনীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাদের কিছু কিছু গান বেশ ভাবগম্ভীর ও উল্লাসময়, কিন্তু সে-সব আমি ভালোমতো বুঝতে পারতাম না। গানের বাণীর অর্থ বুঝলেও অন্তর্নিহিত ভাব সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা আমার সাধ্যের অতীত। বুদ্ধি দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করার অতীত এ-সব গান কিন্তু স্বজ্ঞাপ্রসূতভাবে আমার মননে ক্রমান্বয়ে অনুকূল সাড়া জাগাত। আমি প্রায়শই বলতাম যে, অনেক আগেই আমি এদের আভাস দেখেছি; এই সুখ ও মহিমা আমার ভিতরে যন্ত্রণাবিধুর এক তৃষ্ণার তারে কম্পন তুলত যেখানে আমাদের এই নিজেদের গ্রহ সময়ে সময়ে অসহনীয় দুঃখ জন্ম দেয়; আমি আমার হৃদয়ের ও অন্তর্দৃষ্টির মধ্যে জেগে-ওঠা স্বপ্নের মাহাত্ম্য আন্দাজ করতে পারতাম; আমাদের পৃথিবীতে অস্তমান সূর্যের দিকে তাকিয়ে আমি প্রায়ই অশ্রু সংবরণ করতে পারতাম না…। পৃথিবীর মানুষদের নিয়ে আমার বিতৃষ্ণা দুঃখভারানত হয়ে থাকত : বিতৃষ্ণা ব্যতিরেকে আমি ভালোবাসতে পারি না কেন, কেন আমি সবই মার্জনা না করে পারি না, কেনই-বা তাদের প্রতি আমার ভালোবাসার ভিতরে দুঃখবোধ মিশে থাকে; কেনই-বা তাদেরকে ঘৃণা না করে ভালোবাসতে পারি না? তারা আমার কথা শুনত, কিন্তু বুঝতে পারতাম যে, যা বলছি তা ওদের মাথায় ঢুকছে না : তবু যা বলেছি তার জন্য মনে কোনো অনুতাপ জাগত না, যেহেতু আমি জানতাম পিছনে ফেলে এসেছি যাদের তাদের জন্য আমার তৃষ্ণা ওরা মনে মনে প্রশংসা করছে। যখন তারা মমতাপূর্ণ দৃষ্টি নিয়ে আমার পানে তাকাত, যখন আমি বোধ করতাম যে, ওদের মতো আমার হৃদয়ও নিষ্কলুষ ও বিশ্বাসপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তখন সেটাই পর্যাপ্ত জ্ঞান করেছি, এবং তাদেরকে বুঝতে না পারার জন্য মনে কোনো দুঃখ জাগে নি। জীবনের পূর্ণতার উপলব্ধিতে আমি নির্বাক হয়ে গেছি এবং নীরবে তাদের স্তব্ধ করাই শুধু সম্ভব হয়েছে।

দেখ দেখি, সবাই এখন আমাকে নিয়ে কেমন হাস্যমুখর হয়ে উঠেছে; বলছে যে, আমি এখন অনুপুঙ্খভাবে যা বলছি তেমনটি এমনকি স্বপ্নের ভিতরেও কেউ দেখতে পায় না; আরো বলছে, আমি নাকি কিছুই দেখি নি বা শুনি নি, আচ্ছন্নতার ঘোরে আমার মনের মধ্যে এসব নাকি তৈরি হয়ে উঠেছে, আর ঘুম থেকে জেগে ওঠার পরে বানিয়ে বানিয়ে এ-সব আমি বলছি। আমি যখন এরপর তাদের বলি যে, কে জানে তেমনটাও হয়তো ঘটে উঠতে পারে, তখন – হায় খোদা, সে যে কী অট্টহাসি তাদের, সাক্ষাৎ আমার মুখের ওপরে, আমার অজুহাতে কী মজাটাই-না ওরা করল! হ্যাঁ, ঠিকই যে, স্বপ্নের অভিঘাতে আমি আবিষ্ট হয়ে ছিলাম, সে-স্বপ্নই কেবল জেগে ছিল আমার আহত ও রক্তাক্ত হৃদয়ে : স্বপ্নের ভিতরে আমি সত্যি সত্যিই যে-সব ছায়াসদৃশ আকৃতি দেখতে পেয়েছি তা এতটাই সুসংগত, মোহনীয় ও সৌন্দর্যমন্ডিত ছিল, এতটাই সত্য মনে হচ্ছিল যে, ঘুম ভাঙার পরে মুখের কথায় তাকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়, কারণ তারা ততক্ষণে অস্পষ্ট হয়ে যায়। ফলে, এমন হতেই পারে –  তাদেরকে প্রকাশ করার জন্য অত্যন্ত অধৈর্য ও আগ্রহান্বিত হওয়ার কারণে হয়তো বর্ণনা করতে গিয়ে অচেতনভাবে কিছু বিকৃতি ঘটিয়ে ফেলেছি। কিন্তু তার পরেও আমি সন্দেহ করি কী করে যে অমনটাই ঘটেছিল। আমি যেমন বলছি তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি উজ্জ্বল ও আনন্দময় ছিল তা। না-হয় ধরেই নিচ্ছি – স্বপ্নই ছিল, তবুও তা ঠিক ও-রকমটাই ছিল।

এখন শুনুন, একটা গোপন কথা বলি : এমন তো হতে পারে যে ওটা আদতেই স্বপ্ন ছিল না! কারণ, এর ঠিক পরপরই এমন একটা ঘটনা ঘটল, এত ভয়ংকর সত্য যে স্বপেণ কখনো  তেমনটা ঘটে না। না-হয় ধরা গেল যে, আমার বুকের ভিতরেই স্বপ্নটা জন্মেছে, তথাপি এর পরেই যে ভয়ংকর ঘটনাটি ঘটবে তার জন্য আমার মনপ্রাণ কি তৈরি হয়ে ছিল? এটা কী করে সম্ভব যে, স-ব আমার মনে মনে বানিয়ে তোলা, বুকের ভিতরেই স্বপ্নটা গজিয়ে উঠেছে? নিশ্চয়ই আমার অগভীর হৃদয় ও খামখেয়ালি উচ্ছন্নে-যাওয়া মন সত্যের প্রকাশকে অমন উত্তুঙ্গে উন্নীত করে নি! নিজে নিজে বিচার করে দেখলেই তো হয় : এখন অবধি ব্যাপারটি আমি লুকিয়েই রেখেছি, কিন্তু এবার আমি হাটে হাঁড়ি ভাঙব। সত্যি ঘটনাটা এই যে, আমি… আমিই সবাইকে অধঃপাতে নিয়ে গেছি।

 

 

পাঁচ

হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই : ওদের সবাইকে আমার অধঃপাতে ঠেলে দেওয়াতে ব্যাপারটা চুকল! এমনটা কী করে ঘটতে পারল আমি জানি না, তবে পরিষ্কার মনে করতে পারি যে অমনটাই ঘটেছিল। হাজার হাজার বছর পার হয়ে আমার স্বপ্ন দৌড়াচ্ছিল, তার একটা সামগ্রিক প্রভাব পড়ছিল আমার ওপরে। আমি কেবল এটুকুই জানতাম যে, তাদের অধঃপতনের আমিই মূল কারণ। আমার আগমনের পূর্বে যে-পৃথিবী অপাপবিদ্ধ ও সুখী ছিল আমি প্লেগের মহামারিতে আক্রান্ত কোনো দেশের মতো সেখানে দূষণ ছড়িয়েছি : তারা মিথ্যা কথা বলা শিখে গেছে, মিথ্যা বলতে আনন্দ পাচ্ছে, মিথ্যাকথনের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হচ্ছে। খুব নির্মলচিত্তে তারা হয়তো শুরু করেছিল, হাসিঠাট্টা দুষ্টুমি কিছু-বা ছিনালিপনা দিয়ে মনে হয় আরম্ভ হয়েছিল; কিংবা সত্যি সত্যি এমন হওয়াও সম্ভব যে, মিথ্যার অণুকণা তাদের হৃদয়ে চুঁইয়ে পড়ে তাদের ভিতরে আবেদন সৃষ্টি করেছিল। অব্যবহিত পরে তাদের অন্তরে ইন্দ্রিয়পরায়ণতা জন্ম নেয়, এবং সেখান থেকে ঈর্ষা, ঈর্ষা থেকে নিষ্ঠুরতা… আমি জানি না, মনে করতে পারছি না। কিন্তু শিগগিরই রক্তপাতের ঘটনা ঘটল প্রথমবারের মতো : তারা স্তম্ভিত ও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে গিয়ে পালাতে থাকে, নানাদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তারা সম্মিলিত হয়ে সংঘ তৈরি করে, কিন্তু সে-সংঘগুলো পরস্পরের প্রতি বৈরিতাপূর্ণ। পরস্পরের প্রতি দোষারোপ, অভিযোগ ও পালটা-অভিযোগ শুরু হয়ে যায়। লজ্জিত হওয়া কেমন তা তারা জেনে যায়, সেটাকে তারা গুণ হিসেবে গণ্য করে। সম্মানবোধের অর্থ তারা জেনে যায়, আর প্রতিটি সংঘই এক-এক রঙের নিজস্ব পতাকা ওড়াতে থাকে। তারা জীবজন্তুর ওপর নিপীড়ন চালাতে থাকে, ফলে তারা অরণ্যে ফিরে যায় ও হিংস্র হয়ে ওঠে। তোমার জন্যে, আমার জন্যে, সর্বময় কর্তৃত্ব ও ব্যক্তিগত আধিপত্য বিচারের লক্ষ্যে সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। এখন থেকে তারা ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে থাকে। বিষণ্ণতার স্বাদ তারা জেনে যায়, তাকে ভালোবাসতে থাকে, যন্ত্রণাভোগের জন্য তৃষ্ণা অনুভব করে মনের মধ্যেও, আর বলতে থাকে যে, সত্যকে কেবল দুঃখভোগের ভিতর দিয়েই জানা যায়। এর পরে বিজ্ঞানকে নিয়ে আসা হলো। যখন তাদের ভিতরে শয়তানি বুদ্ধি জেগে উঠল তখন তারা বলতে লাগল, সৌভ্রাত্র ও মানবতার কথা এবং হিতোপদেশগুলো বুঝতে পারল। যখন তারা খুনখারাবিতে পোক্ত হয়ে উঠল তখন তারা সুবিচারের ধারণা উদ্ভাবন করল এবং তা বলবৎ করার লক্ষ্যে আইনকানুনের স্ফীতকলেবর মহা মহা কেতাব প্রণয়ন করল আর ওইসব আইন সুনিশ্চিত করতে গিলোটিনে শিরশেছদের বন্দোবস্ত করল। তারা যা হারিয়ে বসে আছে  সে-সবের ক্ষীণ স্মৃতিটুকুই কেবল মনে রয়ে গিয়েছিল, একদা যে তারা নিষ্পাপ ও সুখী ছিল তা আর তারা বিশ্বাস করত না। কখনো যে তারা খুব সুখে ছিল তেমন চিন্তাতেও তাদের হাসি পেত, বলত যে ও-সব হলো গিয়ে স্বপ্ন। তারা কোনো কিছু স্মরণে আনতে না পারলেও, খুবই অবিশ্বাস্য ও অদ্ভুত যে, পুরনো দিনের সুখশান্তি তারা বিশ্বাস করত না, রূপকথা বলে উড়িয়ে দিত; অথচ নিষ্কলুষ ও সুখী হতে এত চাইত যে শিশুদের মতো মজে থাকত সে-ভাবনাতেই, আর সে-বাসনাকেই শরীরী আকার দানের ইচ্ছা থেকে অসংখ্য মন্দির গড়ে তুলে তাতে নিজেদের ধ্যানধারণাকে কিংবা ‘মনোবাঞ্ছা’কে পুজো করতে শুরু করল, যদিও ভালোমতোই তারা জানত যে বাস্তবে কিছুই ঘটবে না কিংবা তাদের প্রার্থনা মঞ্জুর হবে না; তা সত্ত্বেও অশ্রুসিক্ত নয়নে ভাসতে ভাসতে পূজা-উপাসনা ইত্যাদিতে কম্তি ছিল না। কিন্তু তার পরেও, যদি তাদের ফেলে আসা নিষ্পাপ ও সুখী রাজ্যে তাদেরকে পুনর্বাসিত করা যেত, অথবা যদি কেউ আরেকবার এক নজর তা দেখতে পেত, এবং যদি জিজ্ঞেস করা হতো ওখানে তারা ফিরে যেতে চায় কি না, তাহলে সম্ভবত তারা অস্বীকৃতি জানাত। তারা আমাকে বলেছিল : ‘ধান্দাবাজ, খচ্চর, অসাধু হলেই বা কী, আমরা ব্যাপারটা ‘জানি’, তার জন্য কান্নাকাটি করি, জ্বালা-যন্ত্রণা পোহাই, আর নিজেরাই নিজেদের ওপরে যে-শাস্তি চাপাই তা সম্ভবত কঠিনতর হবে অজ্ঞাতনামা মহামান্য দয়ালু বিচারকের রায়ের চেয়ে। আমাদের হাতে বিজ্ঞান রয়ে গেছে, তার মাধ্যমে আমরা পুনরায় সত্যের অন্বেষণ করব, তার সাক্ষাৎ পাব, এবং এইবার সচেতনভাবে তাকে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হব। অনুভবশক্তির চেয়ে জ্ঞান উন্নততর, জীবন অপেক্ষা জীবনের চেতনা মহত্তর। বিজ্ঞান দিয়েছে জ্ঞান, আইনকানুন ও নিয়মাদির নিশ্চয়তা বিধান করে জ্ঞান, এবং সুখ লাভের উপায় বিষয়ে জ্ঞান হলো সুখের চেয়ে উন্নত।’ এ-কথাই তারা আমাকে জানিয়েছিল অথচ এমনটি বলার পরেও তারা নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতে থাকে, অন্যকে নয়; এবং এর এতটুকু হেরফের হয় না। প্রত্যেকেই তার অহংবোধ অাঁকড়ে থাকে এতখানি ঈর্ষাপরায়ণভাবে যে অন্যের অহংকে অপমান করতে ও নিচু চোখে দেখতে তার অসুবিধে হয় না। আর এটাই হয়ে দাঁড়ায় তার জীবনব্যাপী কর্মকান্ড। এর পরে আসে দাসত্ব, স্বেচ্ছায় দাসত্ব মেনে নেওয়ার ব্যাপারও রয়েছে : সবলের কাছে দুর্বল স্বেচ্ছায় নিজেকে সঁপে দেয় কেবল এই ভরসায় যে, সে নিজেও অত্যাচার করতে পারবে তার চেয়ে দুর্বলের ওপরে। ন্যায়পরায়ণ মানুষেরাও ওদের কাছে আসে, চোখের জলে ভেসে তারা ওদের গোঁয়ার্তুমির কথা বলে, তাদের সমস্ত মাত্রাজ্ঞান ও সুসঙ্গতি হারানোর সংবাদ জানায়, সমস্তই কতখানি লজ্জার। কিন্তু ন্যায়পরায়ণ মানুষদেরই তো লোকে ঠাট্টাবিদ্রূপ করে, তাদের দিকে ইটপাটকেল ছোড়ে। মন্দিরের চৌকাঠে পবিত্র রক্ত ঝরে। কতখানি চূড়ান্ত সফলতার সঙ্গে তারা আরেকবার সকলকে একত্রিত করার কৌশল আয়ত্ত করেছে, আর তা এমন কায়দায় যেন প্রত্যেকে নিজেকে অন্যের চেয়ে বেশি ভালোবাসতে পারে, অথচ তার পরেও অন্যের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, যেন অন্তত বাহ্যত মিলমিশ করে সবাই একসঙ্গে থাকতে পারে। এই চিন্তা থেকেই বড়ো বড়ো যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। যুদ্ধে ব্যাপৃত থাকলেও সৈনিকেরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে বিজ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আত্মরক্ষার স্বজ্ঞাজাত অনুভূতি মানবজাতিকে কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে বাধ্য করেছে, আর অন্তর্বর্তী সময়কালে সবকিছু দ্রুত নিষ্পন্ন করার লক্ষ্যে ‘প্রজ্ঞাবানেরা’ অবিশ্বাসী ও ‘মূঢ়’ ব্যক্তিদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে যত দ্রুত সম্ভব – যাতে তার এই ধ্যানধারণার বিজয় বাধাগ্রস্ত হতে না পারে। কিন্তু আত্মরক্ষার স্বজ্ঞাপ্রসূত অনুভূতি দ্রুত দুর্বল হতে থাকে, লোকে গোঁয়ার্তুমি বা ইন্দ্রিয়পরায়ণতার কারণে দাবি জানিয়েছে :           স-ব চাই, নইলে কিছুই না। সবকিছু আয়ত্ত করার ইচ্ছা থেকে তারা অন্যায় অপরাধ করেছে, আর যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন আশ্রয় নিয়েছে – আত্মহত্যার। এর পরে ধর্মগুলো নাস্তিবাদের ও আত্মহননের প্রথা চালু করল নাস্তির ভিতরে অনন্ত শান্তির কথা বলে। শেষ পর্যন্ত মানুষ নিরর্থক পরিশ্রমের পিছনে ছুটতে ছুটতে নিজেকে নিঃশেষ করল, তাদের চোখেমুখে যন্ত্রণার চাপ বসে গেল স্থায়ী হয়ে; তারা বলতে লাগল, যন্ত্রণাভোগের ভিতরেই সৌন্দর্য নিহিত, কারণ একমাত্র যন্ত্রণার ভিতরেই রয়েছে চিন্তন। গানের মধ্যে তারা যন্ত্রণার গুনগানে পঞ্চমুখ হলো। আমি তাদের ভিতরে দুহাত মোচড়াতে মোচড়াতে ঘোরাঘুরি করেছি, তাদের কষ্টে চোখের পানি ফেলেছি; তাদের চোখেমুখে যখন কোনো বেদনার প্রকাশ ছিল না, যখন তারা নিষ্পাপ ও কত সুন্দর ছিল সে-সময়ের চেয়েও এখন আমার ভালোবাসা তাদের প্রতি গাঢ়তর হয়েছে। ধরিত্রী যখন স্বর্গতুল্য ছিল তখনকার চেয়ে এখন  ওদের যন্ত্রণার কারণেই আমি ওদের দ্বারা কলুষিত পৃথিবীকে আরো বেশি ভালোবেসেছি। হায়, আমি দুঃখ ও সন্তাপকেই সর্বদা ভালোবেসেছি, তবে তা কেবল আমার নিজের ক্ষেত্রেই; অন্যের দুঃখে আমি এত মমতা বোধ করেছি যে কান্নাকাটি করেছি। নিজেকে দোষারোপ করতে করতে, অভিশাপ দিতে দিতে, ঘেন্না করতে করতে, নৈরাশ্যে আমি ওদের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়েছি। আমি ওদের বলেছি যে আমি একাই সব করেছি, আমি একা; আমিই হলাম সেই ব্যক্তি যে দূষণ, পাপাচার ও প্রতারণার বীজ এনেছে। আমি ওদের মিনতি করে বলেছি – আমায় ক্রুশকাঠে ঝুলিয়ে মারো, ক্রুশকাঠ তৈরি করাও আমি ওদেরকে শিখিয়েছি। আমি পারিনি, আত্মহত্যা করতে সাহসে কুলোয়নি, কিন্তু আমি চেয়েছি যে ওরা আমাকে যন্ত্রণা দিক, চেয়েছি যেন কষ্ট পাই, টপ্টপ্ করে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত যেন ঝরতে থাকে আমার শরীর থেকে। কিন্তু ওরা সোজা আমার মুখের ওপরে হাসি ছুড়ে দিয়েছে আর শেষ পর্যন্ত নির্বোধ দরবেশ হিসেবে আমাকে বিবেচনা করেছে। আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে নানান অজুহাত তারা তৈরি করেছে, বলেছে, তারা যা চেয়েছে তা তারা পেয়ে গেছে, পরিস্থিতির অন্যথা ঘটা তো সম্ভব ছিল না। অবশেষে ওরা প্রচার করে দিলো যে, আমি ক্রমশ ওদের বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছি, আমি যদি মুখ বন্ধ না করি তো ওরা আমাকে পাগলা গারদে বেঁধে রাখবে, এমন অবস্থায় দুঃখ এত ভীষণভাবে আমার বুক চেপে ধরল যে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হতে লাগল, মনে হলো মরে যাচ্ছি, আর ঠিক তখনই – আমার ঘুম ভেঙে গেল, আমি জেগে উঠলাম।

দিনের বেলা, কিংবা ভোর হয়ত হয়নি তখনো, তবে পাঁচটা বেজে গেছে। আরামকেদারায় শোওয়া থেকে জেগে উঠলাম, মোমবাতিটা শেষ হয়ে নিভে গেছে, ক্যাপ্টেনের ঘরের দরজা বন্ধ – সবাই ঘুমে, অস্বস্তিকর নীরবতা টের পাচ্ছি বাড়িতে। আমি হতবিহবল হয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে যাই : পূর্বে আমার ক্ষেত্রে এমনটা ঠিক কখনোই হয়নি, যেমন  ধরা যাক চেয়ারে বসেই ঘুমিয়ে পড়া। তখনই আমার জ্ঞানগম্যি কাজ করতে শুরু করে, রিভলভারটার ওপরে চোখ যায়, গুলিভর্তি ওটা আমার সামনেই পড়ে আছে। আমি হাত দিয়ে ঠেলে সেটা সরিয়ে দিই। না, জীবন দাও, জীবন চাই আমার! দুহাত ওপরে তুলে চিরন্তন ‘সত্য’কে যেন আবাহন করি, চোখে আনন্দাশ্রু এসে যায় – আমার সমুদয় অস্তিত্ব উল্লসিত, ভীষণভাবে আহ্লাদিত হয়ে ওঠে। হ্যাঁ, আমি বাঁচতে চাই এবং ‘বাণী’ প্রচার করতে চাই। প্রচারের সিদ্ধান্ত তৎক্ষণাৎই মনে জাগল, প্রচার – এখন থেকে এবং যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন। প্রচার করব, প্রচার করতেই হবে – কী সেটা? ‘সত্য’। কেননা, সত্য আমি স্বচক্ষে দেখতে পেয়েছি, দেখেছি তার পূর্ণ গরিমায়।

আর তখন থেকে ‘বাণী’ প্রচার করে যাচ্ছি। বাড়তি একটা ব্যাপার ঘটেছে : আমাকে নিয়ে হাসাহাসি যারা করে, তারাই এখন আমার বেশি প্রিয় হয়েছে অন্যদের চেয়ে। এমনটা যে কেন হলো বলতে পারব না, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। তারা বলছে আমি নাকি হোঁচট খেতে শুরু করেছি। তাই যদি হবে তো আমি সামনে পথ চলব কী করে? একেবারে খাঁটি কথা, আমি হোঁচট খেতে খেতে যাচ্ছি, ক্রমশ অবস্থা আরো সঙ্গিন হতে পারে। সন্দেহ নেই যে হোঁচট খাব, একাধিক বার পথ হারাব, এমন করতে করতেই শিখব সর্বোত্তমভাবে প্রচারের কায়দা – মানে কথা কী বলে আর কাজ কী করে, কারণ এ যে খুব কঠিন এক আবদ্ধ কর্ম। দিবালোকের মতো আমার কাছে এখন এটা খুবই স্পষ্ট; তবে কথা হলো, হোঁচট খায় না কে শুনি? তার পরেও সবাই একই দিকে ধাবিত হচ্ছে, অন্ততপক্ষে ধাবিত হতে চাইছে, সবাই – জ্ঞানী ব্যক্তি থেকে দুস্থ অসহায় লোকটি পর্যন্ত, তফাৎ কেবল এটুকুই যে প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন পথে এগোয়। এটি এক পুরাতন সত্য, তবে নতুনও কিছু রয়েছে বৈকি : খুব বেশি হোঁচট খেলে তো চলবে না। যেহেতু আমি ‘সত্য’কে দেখেছি, ‘সত্য’ কী জেনেছি, এবং জেনে গেছি যে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার সামর্থ্য নষ্ট না করে সুন্দরভাবে ও সুখের সঙ্গে মানুষজন থাকতে পারে। মানুষ স্বভাবতই দুষ্ট প্রকৃতির তা আমি মানতে, বিশ্বাস করতে পারি না। তথাপি আমার প্রত্যয় হলো, সবাই আমাকে দেখলে হাসিঠাট্টা করে। বিশ্বাস না করে আমার উপায় নেই যে; ‘সত্য’কে আমি দেখেছি, এটা আমার কল্পনাশক্তির কিংবা মনের আবিষ্কার নয়, আমি যে এ-বস্ত্তটি চিনি, জানি, আর জীবনভর আমার আত্মার ওপর এর ‘জীবন্ত উদ্ভাস’ চেপে বসে আছে চিরদিনের জন্য। আমি এমন সর্বৈব সম্পূর্ণতায় একে দেখেছি যে, মানুষের ভিতরে এর অস্তিত্ব নেই বলে আর আমি তা বিশ্বাস করি না। আর তা হলে, আমি পথ হারাতে পারি কীভাবে? একবার কি দুবার বড়োজোর দিগ্ভ্রম হতে পারে আমার, হয়ত অন্যের কাছ থেকে ধার করা কথাও আমি নিজের বলে চালাতে পারি, কিন্তু তা তো দীর্ঘকাল সম্ভব নয় : যে জীবন্ত উদ্ভাস আমি উপলব্ধি করেছি তা আমার ভিতরে রয়েই যাবে, সেটাই আমায় ভুল শুধরে দেবে, আমাকে সোজা পথে চালাবে। ওজস্বিতা ও শক্তিতে আমি পরিপূর্ণ। আমি পথ চলব, বাণী প্রচার করব, হাজার বছর ধরে হলেই বা কী? আমি প্রথম দিকে ব্যাপারটা আড়ালে রাখতে চেয়েছিলাম যে আমিই সকলকে কলুষিত করেছি। কিন্তু তেমন করলে তা ভুল হতো – দেখা যাচ্ছে ভুল হয়েই গেছে। সত্য আমার কানে ফিসফিস করে বলেছে – তুমি কিন্তু ‘মিথ্যে বলছ’। পরে সত্যই আমাকে বাঁচিয়েছে, রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু পৃথিবীকে স্বর্গ বানানো যাবে কী করে আমার জানা নেই। ব্যাপারটা কথায় কীভাবে বুঝিয়ে বলব ভেবে পাচ্ছি না। ঘুম ভেঙে জেগে উঠতেই মনের সব কথা হারিয়ে গেল। নিদেনপক্ষে সবচেয়ে প্রয়োজনীয়, সর্বাধিক জরুরি কথাগুলো। ঠিক আছে, কী আর করা যাবে! আমি আমার পথেই হাঁটব, ক্লান্তিহীনভাবে প্রচার করে বেড়াব, কারণ আমি তো স্বচক্ষে দেখেছি সব – যদিও কী দেখেছি ভাষায় তা ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। এটা এমন একটাকিছু যা বিদ্রূপকারীদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। তারা বলে যে : ‘কিছু না, এ হলো স্বপ্ন, আবোলতাবোল প্রলাপ এবং দৃষ্টিভ্রম।’ বলে কী? এরই নাম চালাকি। ওরা নিজেদের নিয়েই এত গর্বোন্মত্ত। তারা বলে, স্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্ন ব্যাপারটি আসলে কী? আমাদের জীবন কি একটা স্বপ্ন নয়? আমি আরো বলব : এ যেন কখনো, কখনোই সত্যি না হয়, মর্ত্য কখনো স্বর্গ হয়ে উঠবে না (আমি ব্যাপারটা বিলক্ষণ উপলব্ধি করি!), তবু আমি পথ-চলা থামাব না, ‘বাণী’ প্রচার করে যেতেই থাকব। আর সেটা তো সহজেই করে ওঠা যায় : এক দিনের ভিতরে কি ‘একটি ঘণ্টা’র ভিতরেই সব ঠিক করে দেওয়া যায়! ব্যক্তি মানুষ নিজেকে যেমন ভালোবাসে তেমনই ভালোবাসা দরকার অন্য সবাইকে, সেটাই হলো গিয়ে আদত ব্যাপার; ব্যস, এর অধিক কিছু নয়, এর বেশি কিচ্ছুটি চাই না, আর তখনই সঙ্গে সঙ্গে সবাই বিষয়টি উপলব্ধি করবে। এ তো নতুন কিছু নয়, কেবল এক পুরাতন সত্য – বারংবার কথিত বারংবার পঠিত, লক্ষ কোটি বার, অথচ পাকাপোক্তভাবে শিকড় গেড়ে বসতে পারে নি। ‘জীবন অপেক্ষা জীবনের চেতনা মহত্তর, সুখ লাভের উপায় বিষয়ে জ্ঞান হলো সুখের চেয়ে উন্নত’ – এর বিরুদ্ধেই আমাদের সংগ্রাম অবশ্যই চালাতে হবে। এবং তা চালাব। প্রত্যেকেই যখন এটি চাইবে তখনই তৎক্ষণাৎ তা ঘটিয়ে তোলা যাবে।

যে মেয়েটির কথা বলেছিলাম, তাকে অবশেষে খুঁজে পেয়েছি … এখন আমি আমার পথে হেঁটে যেতে থাকব। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই হাঁটতে থাকব।