কবিতার অর্থময়তা

লেখক: সরকার আবদুল মান্নান

কবিতা অর্থময় হওয়া জরুরি কি না – এ-প্রশ্ন বহুদিনের। ‘অর্থ’ সবসময়ই নির্দিষ্টতার দাবি রাখে। মানে অর্থের সঙ্গে কোড ও ডিকোডের সম্পর্ক। যেমন একটি ফলবিশেষকে আমরা কোড করেছি ‘আম’। ইংরেজি ভাষায় এ-ফলটির কোড হলো ‘সধহমড়’। এখন কেউ যদি ‘আম’ শব্দটি উচ্চারণ করে তাহলে বাংলা ভাষাভাষী যে-কেউ তা ডিকোড করতে পারে। অর্থাৎ, তারা বুঝতে পার যে এটি একটি ফল। কবিতা শব্দের শিল্প। সুনির্বাচিত শব্দের বিস্ময়কর অন্তর্জালের বিন্যাস নিয়ে রচিত হয় কবিতা। সুতরাং কবিতা শব্দ ছাড়া আর কিছু নয়। এ-শব্দ আমাদের ভাষিক জগতের বাইরে থেকে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। সুতরাং ভাষিক জগতে প্রতিটি শব্দেরই একটি কোডিং ও ডিকোডিং সত্তা আছে। তার মানে প্রতিটি শব্দের সুনির্দিষ্ট অর্থময়তা আছে। তাহলে কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের নির্দিষ্ট অর্থ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কবিতায় কি তেমন কোনো অর্থময়তা থাকে – যে অর্থ সুনির্দিষ্ট, ব্যক্তি ও সময়ের ব্যবধানে যার অর্থ পরিবর্তন হয় না?

দীর্ঘ এক সময় আমরা অতিবাহিত করেছি, যখন ছন্দোবদ্ধ পঙ্ক্তি ছাড়া গদ্য থেকে কবিতার আর কোনো পার্থক্য ছিল না। ভাষিক চালাকির মাধ্যমে কখনো কখনো রহস্যময়তা তৈরি হলেও তা একান্তই বাহ্য। এর সঙ্গে কবি-কল্পনার কোনো মাহাত্ম্য ছিল না। যেমন বড়– চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে কয়টি পঙ্ক্তি ‘কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নই কুলে।/ কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি এ গোঠ গোকুলে ॥’ এই কবিতার মধ্যে কবির কল্পনাপ্রতিভাগত কোনো রহস্যময়তা নেই। এই ভাষা এখন আমাদের কাছে সময়ের ব্যবধানের জন্য ভাষিক দূরত্ব তৈরি করেছে – এই যা। কিন্তু এর ভাষাগত সংগঠনের মধ্যে – তাল, লয় ও সুরের মধ্যে – এমন এক মমত্বের জগৎ তৈরি হয়েছে, যার আবেদন চিরকালীন। কিন্তু জ্ঞান দাস লিখেন :

সুখের লাগিয়া                    এ ঘর বাঁধিনু

অনলে পুড়িয়া গেল।

অমিয়া-সাগরে                  সিনান করিতে

সকলি গরল ভেল ॥

সখী কি মোর করমে লেখি।

শীতল বলিয়া                     ও চাঁদ সেবিনু

ভানুর কিরণ দেখি ॥

এ-কবিতার মধ্যে জ্ঞান দাস ঘর, অনল, পুড়িয়া, সাগর, সিনান, গরল, ভেল, সখী, শীতল, চাঁদ, ভানু, কিরণ ইত্যাকার যে কাব্যভাষা ব্যবহার করেছেন তার কোনোটিই প্রথাগত অর্থে বা আভিধানিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। প্রতিটি শব্দই প্রতীকী অর্থব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে এবং একটি মায়ার জগৎ তৈরি করেছে। এই প্রতীকী অর্থব্যঞ্জনার মধ্যে অনিশ্চয়তার অবকাশ নেই বললেই চলে। কিন্তু সবদিক থেকেই আধুনিক কবিতা অনিশ্চয়তার শিল্প। এ-সময়ের কবিতা সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। বিশেষ করে, কবিতার অর্থময়তার দিকটি এই অনিশ্চয়তার ঐশ্বর্য নিশ্চিত করে। ভাষিক জগতের আটপৌরে একটি শব্দ যখন কবিতায় আবির্ভূত হয়, তখন তার দেহে বিচিত্র রং ও রেখা, বিচিত্র তাল ও লয়, বিচিত্র সুর ও ছন্দ এবং আলো ও আঁধার এবং গন্ধ ও গতি নিয়ে ঘনীভূত হয়ে ওঠে। তখন শব্দের দেহে অনেক রূপ, অনেক ঐশ্বর্য, অনেক আনন্দ, অনেক কষ্ট। আর এসব নিয়ে সে রহস্যময় অন্য কিছু। তখন তার দেহে না থাকে আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্টতা, না থাকে আটপৌরে ব্যবহারের সংকীর্ণতা। তখন শব্দের দেহজুড়ে রঙের আয়োজন এবং তখন সে দ্যুতি ছড়ায় সবদিক থেকে। বহুতর গতি ও গন্তব্যে তার শরীর তখন মুখর হয়ে ওঠে। তাকে ভর করে ঋদ্ধ হয়ে ওঠে কবির অনুভবপুঞ্জ। কল্পনাপ্রতিভার বহুতর বোধে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে শব্দের দেহ ও আত্মা। তার গায়ে লাগে আনন্দের আবির আর বেদনার রং। তখন সে একদম অচেনা কেউ। সে চিরতরে অর্থের নির্দিষ্টতার গণ্ডি অতিক্রম করে যায়। তখন বাংলায় শব্দের নাম হয় ‘কাব্যভাষা’ বা ইংরেজিতে বলে ‘ডিকশন’। কিন্তু আভিধানিক অর্থের কোনো চিহ্ন, কোনো কংকাল কিংবা ফসিলমাত্র কি তার দেহে থাকে না? উদাহরণ দিই। জীবনানন্দ দাশের লেখা ছোট একটি কবিতা ‘যেইসব শেয়ালেরা’। পুরো কবিতাটি উদ্ধৃত করি।

যেইসব শেয়ালেরা – জন্ম জন্ম শিকারের তরে

দিনের বিশ্রুত আলো নিভে গেলে পাহাড়ের বনের ভিতরে

নীরবে প্রবেশ করে, বার হয়, – চেয়ে দেখে বরফের রাশি

জ্যোৎস্নায় পড়ে আছে; – উঠিতে পারিত যদি সহসা প্রকাশি

সেইসব হৃদ্যন্ত্র মানবের মতো আত্মায় :

তাহলে তাদের মনে যেই এক বিদীর্ণ বিস্ময়

জন্ম নিত; – সহসা তোমাকে দেখে জীবনের পারে

আমারও নিরভিসন্ধি কেঁপে ওঠে স্নায়ুর আঁধারে।

এ-কবিতায় কয়েকটি চরিত্র আছে। চরিত্রগুলো হলো শেয়াল, মানব, তুমি ও আমি। অভিধানে প্রতিটি শব্দের স্পষ্ট অর্থ আছে।  বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে শিয়াল বা ‘শেয়ালের’ অর্থ লেখা আছে শৃগাল। এটি যে একটি চতুষ্পদ প্রাণী – কোনো অভিধানেই তা লেখা নেই। ‘মানব’-এর অর্থ লেখা হয়েছে মানুষ, মনুষ্য ইত্যাদি। আর ‘তুমি’, ‘আমি’ কোনো বিশেষ্যের সর্বনাম।

কিন্তু কবিতায় উল্লিখিত শব্দগুলো কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং সে-অর্থময়তা সৃষ্টিতে শব্দগুলো কী রূপ পরিগ্রহ করেছে তার পরিচয় নেওয়া যায়। শেয়াল শিকারি প্রাণী। শিকার করা তাদের সহজাত বৈশিষ্ট্য। শিকারের জন্য তারা নীরবে পাহাড়ের বনের ভেতরে ঢুকবে এবং বের হবে – এটা অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। এ-পর্যন্ত অর্থময়তায় তেমন কোনো রহস্য নেই। কিন্তু যখন বলা হয় ‘- চেয়ে দেখে বরফের রাশি/ জ্যোৎস্নায় পড়ে আছে;’ তখন শেয়াল চরিত্রটি নিয়ে আমরা সংশয়ে পড়ি – ভাবি, এ আবার কোন শেয়াল, কোন দেশ, কোন সময়? এবং ‘শেয়ালেরা’ এই শব্দটির সঙ্গে মিশে যায় আমাদের কল্পনাপ্রতিভার নানা রং, আমাদের বোধের বিচিত্র মাত্রা। ঝরা পালক কাব্যগ্রন্থে কবি যে ‘অতন্দ্র দূর কল্পলোক’কে আহ্বান করেছিলেন, কবিতায় প্রতিটি শব্দের মধ্যে আমরা সেই অতন্দ্র দূর কল্পলোকের আস্বাদ পাই। পাহাড়ের বনে রাতের রহস্যময় চন্দ্রালোকে শৃগালেরা দেখতে পায় বরফের রাশি। এবং সেই সময় যদি এসব শৃগালের হৃদযন্ত্রে মানবিক আত্মা জেগে উঠত জাদুমন্ত্রে, তাহলে ‘তাদের মনে যেই এক বিদীর্ণ বিস্ময়/ জন্ম নিত; – সহসা তোমাকে দেখে জীবনের পারে/ আমারও নিরভিসন্ধি কেঁপে ওঠে স্নায়ুর আঁধারে।’ সুতরাং ‘শেয়ালেরা’ শব্দটি যে-তাৎপর্যে ব্যবহৃত হয়েছে তার সঙ্গে আভিধানিক অর্থের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং মানুষের ‘বিদীর্ণ বিস্ময়’কে কল্পনাপ্রতিভার দুর্জ্ঞেয় স্তরে উপনীত করে বিস্ময়ের যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণের এক মায়াবী আলেখ্য রচনা করার জন্য শব্দের অবয়বে শব্দাতীত এক জগৎ নির্মাণ করা হয়েছে।

এ-কবিতায় ‘শেয়ালেরা’ – এই বিশেষ্যের সর্বনাম হলো ‘তাদের’। ‘আমারও’ অর্থাৎ আমার বলতে যদি কবির – জীবনানন্দ দাশের – মনে করে নেওয়া যায়ও কিংবা পাঠকের কিন্তু ‘তোমাকে’ – এই সর্বনাম দিয়ে কাকে বোঝানো হয়েছে তা অনিশ্চিত। কিন্তু প্রতিটি শব্দের সঙ্গে অনুভবের এতসব মাত্রা যুক্ত হয়েছে, তার প্রতিটি রেখা ও রং, সুর ও লয় আলাদা করা সম্ভব নয়। দিনের আলো খুব পরিচিত শব্দ। কিন্তু এর পূর্বে বিশেষণবাচক ‘বিশ্রুত’ শব্দটি ব্যবহার করে কবি দিনের আলোকে অনির্দেশ্য এক বোধে উপনীত করেছেন। ‘বিশ্রুত’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো প্রখ্যাত, বিখ্যাত, প্রসিদ্ধ। মানুষের কথনবিশ্বে বা ভাষিক জগতে আলোর পূর্বে বিশেষণবাচক ‘বিশ্রুত’ শব্দ ব্যবহার একেবারেই অসম্ভব। দিনের আলো নিঃসন্দেহেই প্রবলভাবে বিপুল রূপ পরিগ্রহ করে। কিন্তু তার বিশেষণ যে ‘বিশ্রুত’ হতে পারে, তা আমাদের জানা ছিল না। ‘বিশ্রুত’ শব্দটি ব্যবহার করে কবি দিনের আলোর এমন এক রূপ নির্মাণ করেছেন, যার সঙ্গে মিশে আছে বহুতর অর্থভাবনার অনিবার্য প্রবণতা। ‘নীরবে প্রবেশ করে’ সংস্কৃতপ্রবণ এ-শব্দপুঞ্জের ভাষিক অনিবার্যতা মান্য। কিন্তু তার পরই ব্যবহার করেছেন ‘বার হয়’ – ‘প্রবেশ করে’র সঙ্গে যা কিছুতেই যায় না। প্রবন্ধের ভাষা হলে আমরা কিছুতেই এ-ধরনের ব্যবহার মেনে নিতে পারতাম না। কিন্তু কবিতায় সব যায়। প্রয়োজন শক্তির – কাব্যপ্রতিভার দাপট। ‘প্রবেশ করে’-এর পর যদি ‘নিষ্ক্রান্ত হয়’ লেখা হতো, তাহলে যা ঘটত তা আর কহতব্য নয়। এই যে শব্দ বা শব্দপুঞ্জের কথা উল্লেখ করা হলো – কবিতার দেহে এগুলোর অর্থ কী – কোনো অর্থ আছে কি? নিশ্চয় আছে – আভিধানিক অর্থের একটি প্রতœরূপ, যে-অর্থ কবিতা বিচারে ন্যূনতম কাজে লাগে। আর বাকি যা আছে তা তুলনাহীন, অনন্য।

আরো দুটি শব্দ ও শব্দপুঞ্জের উদাহরণ দিই। ‘সহসা তোমাকে দেখে জীবনের পারে/ আমারও নিরভিসন্ধি কেঁপে ওঠে স্নায়ুর আঁধারে।’ ‘অভিসন্ধি’ শব্দের অর্থ হলো গুপ্ত অভিপ্রায়, মতলব, উদ্দেশ্য ইত্যাদি। ‘নিরভিসন্ধি’ নামক কোনো শব্দ অভিধানে নেই। কিন্তু কবি ‘অভিসন্ধি’ শব্দের পূর্বে ‘নির’ উপসর্গ ব্যবহার করে নতুন একটি শব্দ ‘নিরভিসন্ধি’ তৈরি করেছেন, যার অর্থ অভিপ্রায়ের চেয়ে বেশি কিছু। কিন্তু সেই বেশি কিছু কী, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। আর ‘স্নায়ুর আঁধার’ বলে যে-শব্দযুগল ব্যবহার করা হয়েছে তার মধ্যে ‘স্নায়ু’ আভিধানিক শব্দ, কিন্তু ‘স্নায়ুর আঁধারে’ আমাদের মধ্যে এক ধরনের বোধ তৈরি করে, যা স্পষ্টভাবে অর্থময় নয়। কিন্তু বোধের সে-জগৎ  মায়াময়; অনেক রূপাবয়বে, ছন্দে এবং তাল ও  লয়ে যার একটি চিরকালীন গড়ন তৈরি হয়ে যায়। একটি কবিতাকে খ- খ-ভাবে দেখলে কাব্যভাষার মাহাত্ম্যের সম্পূর্ণ রূপ অনুভব করা যায় না। বরং সমগ্র কবিতাটির মধ্যে একটি শব্দ বা শব্দপুঞ্জ কোন তাৎপর্যে অপরাপর শব্দ ও শব্দপুঞ্জের সঙ্গে লীন হয়ে থাকে তার স্বরূপ ধরতে পারলে শব্দের রূপাবয়ব বোঝা যায়।

অমিয় চক্রবর্তীর একটি কবিতার নাম ‘সংগতি’। কবিতার একটি অংশে লেখা আছে :

দুপুর ছায়ায় ঢাকা,

সঙ্গীহারানো পাখি উড়ায়েছে পাখা,

পাখায় কেন যে নানা রঙ তার আঁকা।

প্রাণ নেই, তবু জীবনেতে বেঁচে থাকা

মেলাবেন।

জীবনের ধর্মই হলো শুধু মেলানো – বিপরীতের ঐকতান ও সংগতি স্থাপন। এই কবিতার মধ্যে খুব সহজ – প্রায় নিত্যদিনের কিছু শব্দের ভেতর দিয়ে শব্দহীনতার বিপুল এক জগৎকে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এবং সেই জগৎ শব্দের সীমানায় আবদ্ধ নয়।  ‘দুপুর ছায়ায় ঢাকা’ – এই শব্দ ত্রয়ী নিশ্চয় খুব নিরীহ, খুব সহজ, খুব নৈমিত্তিক। কিন্তু আলো-আঁধারের ব্যবহারে, রঙের ব্যবহারে, বিস্তারের অনুভবে এবং বিপুলতায় শব্দ তিনটি অন্য এক বৈভব লাভ করেছে। আর এই ছায়াঢাকা দুপুরের বিস্তার গভীর বেদনা নিয়ে সঙ্গীহারা পাখিটির নিঃসঙ্গ উড়ালে গিয়ে মিশেছে। পাখির পালকে রং আঁকা থাকেই। অসাধারণ সব রঙের মিশেলে পাখির পালক

প্রকৃতির ঐশ্বর্য। কিন্তু কবি একটিমাত্র সংশয়বাচক শব্দ ব্যবহার করে এই নিশ্চয়তার সৌন্দর্যের জগৎটিকে অনিশ্চয়তার অফুরন্ত বিস্তারে উপনীত করেছেন। ‘সঙ্গীহারানো পাখি উড়ায়েছে পাখা,/ পাখায় কেন যে নানা রঙ তার আঁকা।’ এই অনিশ্চয়তার আবহে পঙ্ক্তিটির প্রতিটি শব্দের অর্থময়তা ব্যক্তি পাঠকের ভাবনার অনুকূল হয়ে যায়।

বিষ্ণু দে-র একটি বিখ্যাত কবিতা ‘ঘোড়সওয়ার’। কবিতাটির প্রথম চারটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করি।

জনসমুদ্রে নেমেছে জোয়ার,

হৃদয়ে আমার চড়া।

চোরাবালি আমি দূরদিগন্তে ডাকি –

কোথায় ঘোড়সওয়ার?

এই পঙ্ক্তিগুলোতে বারোটি শব্দ আছে। বিভক্তি-প্রত্যয়সহ শব্দগুলো হলো : জনসমুদ্রে, নেমেছে, জোয়ার, হৃদয়ে, আমার, চড়া, চোরাবালি, আমি, দূরদিগন্তে, ডাকি, কোথায়, ঘোড়সওয়ার। লক্ষণীয়, এখানে কবি কর্তৃক উদ্ভাবিত কোনো নতুন শব্দ নেই। সব শব্দই আভিধানিক এবং সুনির্দিষ্ট অর্থবাচক। আভিধানিক এই অর্থ কবিতাটির বিষয়গত ঐশ্বর্য বুঝতে কিছুমাত্র সাহায্য করে কি না তা আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পারি। এবং সেখানে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হবে যে, শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ তেমন কোনো কাজে আসছে না। কবি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, সৃষ্টি-উন্মাদনার কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে কলমের প্রায় এক টানে তিনি কবিতাটি লিখে ফেলেন এবং তারপর যতিচিহ্ন উঠিয়ে দিয়ে প্রথাগত অর্থবাচকতার জগৎটিকে দুর্বোধ্য করে তোলেন। কবির এই স্বীকারোক্তির কোনো মানে হয় না। কারণ আপনা থেকে সৃষ্টি হয়ে যাওয়া কোনো কবিতা সহজবোধ্য বা দুর্বোধ্য করে তোলার কোনো অবকাশ থাকে না। বরং বলা যায়, কাব্যপ্রতিভার যে-জটিল এক অন্বয়ে কবিতা সৃষ্টি হয় তার মধ্যেই আভিধানিক অর্থকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রবণতা নিহিত থাকে।

সাম্প্রতিককালের কবিতায় শব্দের ব্যবহার অধিকতর বিমূর্ত অবস্থায় পৌঁছেছে। এ-বিমূর্ততাকে আমরা দুর্বোধ্যতা অর্থে ব্যবহার করছি না। কাব্যপ্রতিভাহীন মানুষের কবিযশ লাভের আকাক্সক্ষা থেকে কাব্যচর্চার ফলে দুর্বোধ্যতার সৃষ্টি হয়। সে-দুর্বোধ্যতাকে বিবেচনায় নিয়ে কি আমরা বুঝে নেব যে, কবিতায় শব্দের কোনো অর্থময়তা নেই এবং কবিতা পড়ার কোনো মানে হয় না। নিশ্চয় নয়। সকল শিল্পের শিল্প কবিতা। যার মধ্যে কবিপ্রতিভা আছে তিনি চিত্রশিল্পী হতে পারেন, ভাস্কর্যশিল্পী হতে পারেন, কথাসাহিত্যিক হতে পারেন, নাট্যকার হতে পারেন, সংগীতশিল্পী হতে পারেন। এমনকি একজন বিজ্ঞানীকেও প্রথমে কল্পনাপ্রতিভার এক ধরনের কাব্যিক অনুভব লালন করতে হয়। অর্থাৎ সকল শিল্পের মূলে আছে কবিতা, সকল সৃষ্টির মূলে আছে কবিতা। সুতরাং কবিতা অর্থহীন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এর অর্থের স্বরূপ ভিন্ন প্রকৃতির। আর সেই প্রকৃতির সঙ্গে জড়িত কবির বহুবিচিত্র ও জটিল এক জীবনালেখ্য।

কবিতায় ব্যবহৃত শব্দের অর্থময়তা নিহিত থাকে শব্দের ধ্বনি ও ধ্বনিময়তার মধ্যে; তাল, লয় ও ছন্দময়তার মধ্যে; চিত্রকল্প, রূপকল্প ও দৃশ্যকল্পের মধ্যে; আলো-আঁধার ও রঙের ব্যবহারের মধ্যে এবং জীবন সম্পর্কে কবির দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃষ্টিকোণের মধ্যে।

প্রতিটি কবিতার একটি কনটেক্সট বা অনুবন্ধ থাকে। যেমন, কবিতাটি কে লিখেছেন? ওই কবির জীবনাদর্শের স্বরূপ কী? অর্থাৎ রাজনৈতিক আদর্শ, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, পেশাগত পরিচয় এবং সংগীত ও চিত্রশিল্প, মিথ বা পুরাণ বা বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ ইত্যাদি। যেমন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের অধ্যয়নের বিপুল জগৎ জুড়ে ছিল প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পুরাণ এবং পাশ্চাত্যের জ্ঞান। ফলে তাঁর কাব্যচর্চায় এ-জ্ঞান বিপুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরাণ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকলে মধুসূদনের কবিতা বুঝতে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না। কারণ কবিতা তখনো রহস্যময়তার জগতে পৌঁছেনি। আবার ধর্মীয় মিথ ও আরবি-ফারসি শব্দের জগতে বিচরণ থাকলে কবি ফররুখ আহমদের কবিতা বোধগম্য হয়ে ওঠে এবং একই ধারাক্রমে তাঁর প্রতীকের ব্যবহারও অর্থময়তার অনুকূলে সহায়ক হয়ে ওঠে। এই আরবি-ফারসি শব্দের ব্যবহার এবং ভারতীয় ও ইসলামি পুরাণের ব্যবহার কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়ও ব্যাপক স্থান পেয়েছে। কিন্তু জীবনাদর্শগত ভিন্নতার জন্য নজরুল ও ফররুখ বিপরীত কাব্যাদর্শের কবি। এভাবে ব্যক্তি কবির জীবনাদর্শের আলোকে কবিতার অর্থময়তা বোঝা যায়।

বিশেষ কিছু দার্শনিক প্রত্যয় ও তৎসম শব্দের বিচিত্র ব্যবহারে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা মহিমামণ্ডিত হয়ে উঠেছে আর প্রগতিশীল ও বাম রাজনৈতিক ধারার এক জটিল ভাবনানিচয়ের বিস্ময়কর প্রেরণার অন্বয়ে বিষ্ণু দে-র কবিতা অর্থময়তা লাভ করেছে। আফ্রিকান-আমেরিকান কবি আমিরি বারাকার (১৯৩৪-২০১৪) কবিতায় সংস্কারবাদী (জধফরপধষরংস) মনোভাবের স্পষ্ট পরিচয় আছে। কেননা, তিনি নিজেই ছিলেন সংস্কারপন্থিদের পুরোধা। টিএস এলিয়ট বিশ শতকের প্রতিনিধিত্বকারী ব্রিটিশ কবি। কিন্তু ধর্মীয় বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি অহমষরপধহরংস-এ প্রত্যাবর্তনের দিকে গুরুত্বারোপ করেছেন। ফলে তাঁর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কবিতার মধ্যে এ-বিশ্বাসের পরিচয় মেলে।

কবিতা ব্যক্তি কবির কল্পনাপ্রতিভা ও ভাষিক অনন্যতার শিল্প। সুতরাং কবিতার মধ্যে কবির বেড়ে ওঠার স্থান ও সময়, তাঁর জীবনযাত্রা এবং সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

কবিতায় শব্দের অর্থময়তার এই তাৎপর্য কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। শামসুর রাহমানকে নাগরিক কবি বলা হয় এবং জসীম উদ্দীনকে বলা হয় পল্লিকবি। এই দুজন কবির বেড়ে ওঠার পটভূমি ছিল শহর ও গ্রাম। ফলে তাঁদের মনোগড়নে ও বোধের জগতে যে-অনন্য পটভূমি বিরাজমান – কবিতার মধ্যে তার স্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। অভিজাত পরিবারের সন্তান সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার প্রতিটি শব্দের মধ্যে যে নির্বাচন ও রুচির পরিচয় পাওয়া যায়, কাব্যভাষার প্রগাঢ়তা ও বক্তব্যের দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়, বন্দে আলী মিয়ার কবিতার মধ্যে সেই দার্ঢ্য ও প্রগাঢ়তা খুঁজতে যাওয়া নিতান্তই বোকামি। আবার জীবনানন্দ দাশের কবিতার মধ্যে বিস্ময়কর যে নির্জনতার আস্বাদ পাওয়া যায়, নজরুলের কবিতার মধ্যে তা নেই। এখানে আছে অসাধারণ এক কোলাহলের জগৎ, মানুষ যাকে বরণ করে নিয়েছে প্রেমে ও দ্রোহে। কবিতার ভাষার অর্থময়তার সঙ্গে কবির এই মনোগড়নের নিবিড় সম্পর্ক বিরাজমান। এবং যে-সাংস্কৃতিক পরিম-লে একজন কবি বেড়ে ওঠেন, বিচিত্রভাবে তাঁর কল্পনাপ্রতিভার মধ্যে সেই পরিম-লের কোনো-না-কোনো প্রভাব থাকেই।

সময়ের চাপ ও তাপ কোনো শিল্পীই অস্বীকার করতে পারেন না। বিংশ শতকের প্রথম তিন-চারটি দশকজুড়ে বাংলা কবিতার জগতে বুদ্ধিবৃত্তি ও মনন চর্চার যে-ধারা শুরু হয়েছিল বহুদিন তার প্রভাব থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। প্রেম, রাজনীতি, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, মেহনতি মানুষের মুক্তি-ভাবনা, প্রকৃতি-ভাবনা, মনস্তত্ত্ব ইত্যাকার বিচিত্র ভাবনায় এ-সময়ের কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছিল। এই ভাবনানিচয়ের স্বরূপ অনুভব করলে তিরিশের দশকের কবিতা বুঝতে তেমন কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বিশেষ করে এই সময়ের অধিকাংশ কবি অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন এবং তাঁদের কবিতার মধ্যে বিচিত্র সঙ্গে-অনুষঙ্গে এই পাণ্ডিত্যের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। ফলে অনিবার্যভাবেই কাব্যভাষার অর্থময়তা নির্ধারিত হয়ে যায় জ্ঞানকা-ের বিচিত্র বিষয়ের অনুষঙ্গে। অনুরূপভাবে আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের পূর্ববর্তী বছরগুলোতে কাব্যচর্চার যে-জগৎ তৈরি হয়েছে, তার প্রেরণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল স্বাধীনতা। এই সময়ের কবিতায় যে-কাব্যভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তার প্রতীকে, চিত্রকল্পে, রূপকল্পে – তার রূপে, রসে, গন্ধে, বর্ণে ব্যবহৃত হয়েছে স্বাধীনতাকামী বাঙালির অনুভব ও বিশ্বাসের সর্বাবয়ব। ফলে এই পটভূমির সবটুকু আয়ত্তে না থাকলে এবং দেশপ্রেম ও বিশ্বাসের জগৎটি পরিপুষ্ট না হলে কবিতার অর্থময়তা আপন স্বভাবে ধরা দেবে না।

একইভাবে কবির মতাদর্শ ও শিল্প-আন্দোলনের প্রভাব থাকে কবিতার অর্থময়তার মধ্যে। বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, এমনকি কাজী নজরুল ইসলামের কোনো কোনো কবিতার মধ্যে মার্কসবাদী জীবনাদর্শের পরিচয় পাওয়া যায়। এঁদের কোনো কোনো কবিতার অর্থময়তা নির্ভর করে মার্কসীয় জীবনাদর্শ ও তত্ত্বের ওপর। অসাধারণ সমাজ-সচেতন ও মার্কসবাদী কবি বিষ্ণু দে-র কবিতার মধ্যে মেহনতি মানুষের প্রতি তাঁর মর্মবেদনা এমন এক আদর্শে শিল্পোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে, যা সহজ নয়, সাধারণ নয়, সেøাগান নয়, প্রত্যক্ষ কোনো বক্তব্য নয়, বরং দার্শনিক প্রত্যয়ে বিস্ময়কর প্রগাঢ়। মার্কসবাদ সম্পর্কে সামান্য জ্ঞান নিয়ে তাঁর কবিতার বোধগম্যতা আবিষ্কার করা দুরূহ। জীবনানন্দ দাশ কোনো মতাদর্শ বা শিল্প-আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর নিজস্ব রীতির জগৎ এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ যে, আলাদা করে তাঁকে আবিষ্কার করতে আমাদের তেমন কোনো বেগ পেতে হয় না। কিন্তু সেই অনন্য রীতির জগতে শব্দের অর্থময়তার স্বরূপ আশ্চর্যরকমভাবে জটিল। আপাত সহজবোধ্য ও লাবণ্যময় কাব্যভাষার মধ্যে এমন এক রহস্যময়তা আছে, যার তাৎপর্য আবিষ্কারের জন্য জীবনানন্দীয় বোধের সঙ্গে পরিচিত হওয়া অনিবার্য।

গল্প, উপন্যাস কিংবা প্রবন্ধ-সাহিত্যে চিন্তার শৃঙ্খলা যেভাবে নির্ধারিত হয়, কবিতায় সেভাবে হয় না। এখানে ভাবনার আলো ফেলতে হয় খুব ছোট জায়গায়, কিন্তু তার বিচ্ছুরণ ঘটাতে হয় বিস্তৃত পরিসরে। একে তুলনা করা যায় ফটিকস্বচ্ছ হীরকখ-ের সঙ্গে। হীরকের ওপর আলো পড়লে যেমন প্রতিবিম্বিত আলোকরশ্মি চারদিক উজ্জ্বল করে তোলে, তেমনি ছোট একটি ভালো কবিতার মধ্যে ভাবনার এতসব স্ফুরণ থাকে, যার ভেতর থেকে বহুতর ভাবনার বিচ্ছুুরণ হতে পারে। ফলে কবিতায় উল্লম্ফন অনিবার্য। এই উল্লম্ফনের জন্য মনে হতে পারে যে, কবিতায় চিন্তার শৃঙ্খলা স্থাপিত হয় না। এবং কবিতা বুঝতে পারা যায় না।

চিন্তার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয় ভাষিক শৃঙ্খলাকে আশ্রয় করে। কবিতায় যেহেতু ভাবনার প্রথাগত পারম্পর্য রক্ষিত হয় না, সেহেতু ভাষিক শৃঙ্খলাও এখানে পরাভূত। ফলে অনিবার্যভাবেই কবিতায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দ প্রথাগত শব্দভাণ্ডার থেকে নেওয়া হলেও সার্থক বাক্যের তিনটি শর্ত – আকাক্সক্ষা, আসক্তি ও যোগ্যতা অনুসরণ করে কবিতা রচিত হয় না। ফলে শব্দের আভিধানিক অর্থ জানা থাকলে এবং মানসিক শব্দভাণ্ডারের (গবহঃধষ খবীরপড়হ) সঙ্গে মিল থাকলেই কবিতার অর্থবাচকতা নিশ্চিত হয় না। এমনকি গদ্য কবিতার ক্ষেত্রেও এ-কথা সত্য। এখানেও অনন্য ভাষিক সংগঠন অনুসরণ করা হয়।

ছন্দের আশ্রয়ে কবিতা শাশ্বত রূপ ধারণ করে। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ ভারতচন্দ্র রায় এই পঙ্ক্তি রচনা করেছেন মধ্যযুগে। বাঙালি মায়ের চিরকালের এই আকাক্সক্ষা শাশ্বত রূপ লাভ করেছে ছন্দের আশ্রয়ে। তাই ছন্দকে বলা হতো কবিতার প্রাণ। ছন্দগত সংযম ও হিসাব-নিকাশের জন্য পরিবর্তন আনতে হয় কাব্যভাষায়। ফলে কাব্যভাষা চিরকালই আলাদা একটি ভাষা  এবং এ-প্রক্রিয়ার মধ্যেও আছে কবিতার অর্থময়তার অনন্যতা। গদ্যকবিতার মধ্যেও এক ধরনের ছন্দ আছে। সেই ছন্দ হিসাব-নিকাশের ছন্দ নয়, সেই ছন্দ বোধের ছন্দ, ভাবনা-স্রোতের ছন্দ, বক্তব্যের প্রবাহের ছন্দ কিংবা বক্তব্যহীনতার ছন্দ, চেতনাপ্রবাহের ছন্দ। অনেক সময় এই ছন্দকে আশ্রয় করে শব্দের অর্থময়তা নিরূপিত হয়।

কবিতার প্রকৃতির মধ্যেও শব্দের অর্থময়তা নির্ভর করে। মাইকেল মধুসূদনের মেঘনাদবধ কাব্যের প্রতিটি শব্দের অর্থ যেভাবে নিরূপিত হয় তাঁর চতুর্দশপদী কবিতা কিংবা গীতিকবিতার শব্দের অর্থময়তা সেভাবে নিরূপিত হয় না। তেমনিভাবে কাহিনিকাব্য, গদ্যকবিতা, বিবরণধর্মী কবিতা, দুই-তিন পঙ্ক্তির ছোট কবিতা, ব্যক্তিগত স্মৃতিকাব্য ইত্যাকার বিচিত্র ধরনের ওপর অনেক সময় নির্ভর করে কবিতার অর্থময়তা।

কবিতার শিরোনাম কি এর অর্থময়তার ইঙ্গিতবাচক? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি কবিতার শিরোনাম উল্লেখ করি। ‘নিষ্ফল কামনা’, ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’, ‘বিজয়িনী’, ‘স্বপ্ন’, ‘উদ্বোধন’, ‘বলাকা’, ‘পৃথিবী’, ‘আফ্রিকা’, ‘ঐকতান’, ‘তোমার সৃষ্টির পথ’ ইত্যাদি কবিতা না পড়ে শুধু এই শিরোনাম থেকে কি কবিতার বিষয় নিয়ে কোনো ভাবনা তৈরি হয়? কবিতার শিরোনাম থেকে অর্থময়তার একটি ক্ষীণ ভাবনা তৈরি হতে পারে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা বিভ্রান্তিকর। কেননা, অনেক সময় শিরোনাম একাধিক অর্থ ধারণ করতে পারে। তবে শিরোনামের মধ্যে কবি কবিতাটির অর্থময়তার একটি সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এ-কথা সবসময় ঠিক নয়। শিরোনামের মধ্যে প্রহেলিকার আশ্রয় নিতে পারেন কবি। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় এ-ধরনের শিরোনাম প্রচুর দেখতে পাওয়া যায়। তবে শিরোনামটি ভালো করে বুঝে নিতে পারলে কবিতার দিশা পাওয়া সহজ হতে পারে।

কবিতায় কোনো একটি বা একাধিক পঙ্ক্তি, শব্দ বা শব্দগুচ্ছ, চিত্রকল্প, প্রতীক, রূপকল্প বা কোনো একটি অলংকার বারবার আসতে পারে। এই পুনরাবৃত্তির সঙ্গেও কবিতার অর্থময়তার সম্পর্ক থাকতে পারে। এরকম ব্যবহারের মধ্যে কবির ভাবনানিচয়ের আলোকবিন্দুগুলো চিহ্নিত করা যায় এবং কবিতাটি বোঝার কিছু নির্দেশনা পাওয়া যায়। ‘উদ্বোধন’ শীর্ষক কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছু পঙ্ক্তি, কিছু আলোকিত শব্দ এবং কিছু অলংকারের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছেন। এর মাধ্যমে কবি তাঁর ভাবনার একটি বলয়কে বিস্ময়করভাবে নির্মাণ করে দিয়েছেন, যেখানে পাঠক নিশ্চিন্ততার সঙ্গে ভাবতে পারেন এবং ভাবার সেই বলয় পরিপুষ্টি লাভ করতে পারে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম বারবার ‘আমি’ সংজ্ঞাটি ব্যবহার করেছেন। সংজ্ঞা বললাম এজন্য যে, এখানে ‘আমি’ সর্বনাম মাত্র নয়, বরং এ হলো এমন এক অহং, যার সঙ্গে মানবীয় মর্যাদা ও অফুরন্ততার সম্পর্ক। এবং ভাবনার বিচিত্র বিন্যাসে অহংয়ের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানোর জন্য ক্রমাগত এই অভিধাটি ব্যবহার করেছেন কবি। ফলে কোনো একটি শব্দ কবি যখন বারবার ব্যবহার করেন তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ওই শব্দটিকে ঘিরে কবির ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু ও বিস্তার রচিত হতে পারে।

কবিতায় শব্দের অর্থময়তার সঙ্গে প্রারম্ভিক পঙ্ক্তি ও সমাপ্তি পঙ্ক্তি কখনো কখনো তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। আর চতুর্দশপদী কবিতায় তো ভাবনার এই বিস্তার সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ। ভাবনার শৃঙ্খলা (ড়ৎফবৎ ড়ভ ঃযরহশরহম) কবিতায় নিশ্চয় অনিবার্য নয়। কিন্তু তবু কোনো কোনো কবি পঙ্ক্তি-বিন্যাসের ভেতর দিয়ে ভাবনার এক ধরনের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে চান। পাঠক যদি সেই শৃঙ্খলা ধরতে পারেন তাহলে কোনো কোনো কবিতার অর্থময়তা আবিষ্কার করা সহজ হয়ে ওঠে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কবিগণ এমন একটি পঙ্ক্তি সৃষ্টি করে কবিতাটি শেষ করতে চান, যেখানে তাঁর কল্পনাপ্রতিভার একটি তৃপ্তিকর পরিসমাপ্তি তিনি দেখতে চান কিংবা কবিতাটির অন্তরাত্মার কোনো স্ফুরণ তাৎপর্যময় করে তুলতে চান। ফলে অনেক সময় শেষ পঙ্ক্তি কোনো কোনো কবিতার পূর্ববর্তী পঙ্ক্তিগুলোর অর্থময়তার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করে।

 

কোনো একটি কবিতায় বক্তা কে? এ-প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, বক্তাকে বা বক্তাদের কেন্দ্র করে কবিতায় এক ধরনের অর্থময়তা তৈরি হয়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘শাশ্বতী’ কবিতায় আছে, ‘মিলনোৎসবে সেও তো পড়েনি বাকী/ নবান্নে তার আসন রয়েছে পাতাঃ’ […] ‘কিন্তু সে আজ আর করে ভালোবাসে।/ স্মৃতিপিপীলিকা তাই পুঞ্জিত করে/ আমার রন্ধ্রে মৃত মাধুরীর কণাঃ/ সে ভুলে ভুলুক, কোটি মন্বন্তরে/ আমি ভুলিব না, আমি কভু ভুলিব না।’ তৎসম শব্দের আধিক্যে এবং সংস্কৃত ভাষা-সংগঠনের আবহে রচিত সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অসাধারণ এই কবিতাটিতে যখন সে, তার, আমার, আমি ইত্যাদি সর্বনামবাচক অভিধার সঙ্গে আমরা পরিচিত হই, তখন এর অর্থময়তার দুর্বোধ্যতা অনেকাংশে কমে যায়। আমরা এক ধরনের মীমাংসা খুঁজে পাই। কবিতার মধ্যে এরকম সর্বনাম বা নামবাচক কাব্যভাষা আমাদের কবিতার অর্থময়তা অনুভবে এক ধরনের নির্দেশনা দেয়। গল্প-উপন্যাসে বিশেষ্য ও সর্বনামের এক ধরনের নির্দিষ্টতা থাকে। এগুলো গল্প-উপন্যাসের চরিত্র। কাহিনি-কাব্যে এ-ধরনের চরিত্র থাকে। কিন্তু সেগুলো যত বেশি কাহিনি ততটা কাব্য নয়। কিন্তু কবিতায় কিংবা গীতিকবিতায় এ-ধরনের কাব্যভাষা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে যায় এবং একটি সর্বমানবীয় বোধের উদ্বোধন ঘটায়। আর পাঠক তার নিজের মতো করে ভাবনার আশ্রয় পেয়ে যান।

কবির মনোভাব (সড়ড়ফ) কাব্যভাষার প্রতিটি পরতে উষ্ণতা জোগায়। পাঠক বুঝতে পারেন, কবি একটি আনন্দিত অভিজ্ঞতাকে শব্দের মায়াজালে ধরতে চেয়েছেন কিংবা জীবনের কোনো রহস্যময় অধ্যায়কে উন্মোচনের জন্য কবি সৃষ্টি করেছেন প্রতীকী ভাষার অনবদ্য স্থাপত্য। সমাজ-সভ্যতার কোনো অন্যায়, অবিচার বা অসংগতি নিয়ে কবি প্রচ- রকম উত্তেজিত হয়ে আছেন অথবা তিনি দুঃখভারাক্রান্ত কিংবা নিঃসঙ্গ ও হতাশাগ্রস্ত। কবির এই মনোভাব কবিতার অর্থময়তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জীবনানন্দ দাশ যখন ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ শীর্ষক কবিতাটি লেখেন তখন সমালোচনার প্রতি তাঁর বিতৃষ্ণার মাত্রা সহজেই অনুমান করা যায়। বিশেষ করে সজনীকান্ত দাসসহ আরো কয়েকজন সমালোচক যে-ভাষায় এবং চরম অযৌক্তিকতায় কবিকে অক্রমণ করেছেন তার কোনো তুলনা হয় না। নির্জনতাপ্রিয় ও অন্তর্মুখ স্বভাবের কবি এই বিরূপ সমালোচনায় কতটা কষ্ট পেয়েছেন, কবিতাটির মধ্যে তাঁর সেই মনোভাবের পরিচয় আশ্চর্য শিল্পপ্রকরণে মূর্তিমান হয়ে উঠেছে।

প্রত্যেক কবিরই জীবনকে দেখার ভঙ্গি (ঃড়হব) আলাদা। ফররুখ আহমদ জীবনকে দেখেছেন ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মানুষের মর্যাদা সবার ওপরে এবং তিনি অসাম্প্রদায়িক ও মানবীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রেমের দৃষ্টিকোণ থেকে জীবনের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর দ্রোহ মূলত প্রেমেরই আরেক রূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাবিশ্বলোকের পটভূমিতে জীবনের বিচিত্র রূপ আঁকতে চেয়েছেন। আবার জীবন সম্পর্কে জীবনানন্দের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি আধুনিক মানুষের যন্ত্রণার বিচিত্র অধ্যায়ে আলো ফেলে তার অন্তর্গত স্বভাবের চেতন, অচেতন ও অবচেতনের স্বরূপ তুলে আনতে চেয়েছেন। এক্ষেত্রে তাঁর বোধের জগৎ অবিশ্বাস্য তীব্রতায় সর্বত্রভেদী। কবির দৃষ্টিভঙ্গির এই অনন্যতার ভেতর দিয়ে কবিতার অর্থময়তা তৈরি হয়। যাঁরা নিষ্ঠাবান পাঠক তাঁরা বিচিত্রভাবে কবিতায় শব্দের বা কাব্যভাষার অনুসন্ধান করেন।

প্রত্যেক কবির একমাত্র সম্পদ শব্দ। তাঁর অনুভবে শব্দ, বোধে শব্দ, কল্পনায় শব্দ, আনন্দে শব্দ, যন্ত্রণায় শব্দ, একাকিত্বে শব্দ,  প্রেমে শব্দ, দ্রোহে শব্দ – শব্দই তাঁর সর্বস্ব। তিনি চেতন-অবচেতনে নিরন্তরভাবে কবিতার মধ্যে থাকেন এবং তাঁর সঙ্গী হলো শব্দ। শব্দ নিয়ে এই নিরন্তর খেলায় তিনি সেই ব্রহ্মত্ব লাভ করেন, যেখানে প্রতিটি শব্দের ভেতরে তিনি বহুতর শব্দের বিপুল কোলাহল সৃষ্টি করতে পারেন। ফলে একটি আটপৌরে শব্দ যখন কবিতায় আমন্ত্রিত হয় তখন তার মর্যাদা অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছায় এবং শব্দটি নিজেই হয়ে ওঠে সৃষ্টিশীল। আর কবিতায় শব্দের সৃষ্টিশীলতার মধ্যেই নিহিত থাকে এর অর্থময়তার রহস্য। কাব্যভাষার এই সৃষ্টিশীলতার মধ্যে কবির সাফল্য, মাহাত্ম্য ও অনন্যতার চিরায়ত জাদু নিহিত থাকে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: