মাত্র কয়েকদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন কবি কাজী রোজী। বেশ কিছু সময় শয্যাশায়ী ছিলেন তিনি। তাঁর মেয়ে কবি সুমী সিকান্দার এসব তথ্য আমাদের জানিয়েছেন। কবিতার জন্য তিনি একুশে পদক অর্জন করেন। এর আগে তিনি কবিতার জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

কবি কাজী রোজীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম আমি। বহুদিনের চেনাজানা। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় থেকে। হয়তো এরও আগে থেকে। রোজীর সঙ্গে কত জায়গায় গেছি। কত জায়গায় দেখা হয়েছে রোজীর সঙ্গে। আমরা যেহেতু এক ভুবনের মানুষ সেজন্যে একই তারে বাঁধা ছিলাম। রোজী আমার বছর দুয়েকের ছোট। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দু-এক বছরের জুনিয়র। এখন কবিতার বইগুলো নাড়াচাড়া করতে গিয়ে মনে হলো, হয়তো একই আদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম আমরা। রোজী বেঁচে থাকতে কখনো এ-বিষয়ে আলাপ হয়নি। দেখা হলেই নানাবিধ জীবন্ত ও প্রবল বিষয়ে আলোচনা চলত।

কবি কাজী রোজীর কবিতা নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে মনে হলো, তাঁর কবিতার প্রধান সুরটি সংগ্রামমুখর। তাঁর কবিতার বইয়ের নাম লড়াই। তাঁর কবিতার চরণ উদ্ধৃত করি –

ভাইবোন মিলেমিশে এক সাথে খাই।

তারপর আবার লড়াই।

রোজী সকল সংগ্রামী মানুষের পাশে থেকেছেন। আমার স্বামী শ্রমিক নেতা নূরুল ইসলামকে নিয়ে ‘ভালোবাসবে যদি’ কবিতায় তিনি লিখছেন –

যারা ওঁৎ পেতে ঘাপটি মেরে বসে আছে

                        আগে ওদের নির্মূল করি।

নূরুল ইসলাম গুপ্ত আততায়ীর হাতে পুত্রসহ নিহত হন।

নারীনেত্রী নাসরিন হককে নিয়ে লিখেছেন ‘যে নদী হারিয়ে গেল’। কবিতা থেকে দু-চার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত

করি –

চোখভরা মানুষের প্রেমে উজ্জীবিত শপথ …

নাসরিন তুমি এমন এক নদী

         একবার বাঁক ফিরে তাকাতে যদি।

‘কোন সে আবাসে তুমি’ কবিতায় কবি সমুদ্র গুপ্তের জন্য রোজী লিখছেন Ñ

তুমি হেঁটে গেলে এক পথ-সভা জমে যায় …

তোমার বুকের সবটা জুড়ে যেন এক সাহসের আকাশ,

                                                    তোমার

পায়ের শব্দে আন্দোলন এগিয়ে চলে। …

সংগ্রামী কবিতা লিখেছেন কবি কাজী রোজী। তাঁর অধিকাংশ কবিতায় মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে। এই মানুষটিই আবার কবিতায় মৃত্যুচিন্তায় কম্পিত হয়েছেন। আমার পিরানের কোন মাপ নেই বইয়ের নামকবিতায় কবি লিখছেন –

দর্জি বলল : যেদিন মরে বাঁচবা,

সেদিন তোমার পিরান

বানায়ে দিবানে। মাপ লাগবি না।

নিরুত্তাপ গলায় কবি কঠিন সত্যটা জানালেন। মরে গেলে কাফনের মাপ লাগে না। আরো কবিতায় কবির মৃত্যুচিন্তা বিধৃত হয়েছে। ‘নির্মিত আমার ঘর’-এ কবি লিখছেন –

গর্ত মানে বিবর। বিবর মানে কবর।

যা আমার অস্তিত্ব দিয়ে নির্মিত ঘর।

‘আমার ঘরখানাতে দরজা জানলা কিচ্ছু নেই’ কবিতায় কবি

বলছেন –

সময় হলি যাতিই হবে – এ এক অন্য ডাক। এ এক নির্মম

                                                            ছক।

‘মহল’ কবিতায় কবি লিখছেন –

ভাইবোনগুলো আত্মীয়পরিজন বন্ধু-বান্ধব

মা-বাবার স্মৃতির সাথে

আমাকেও জড়িয়ে নেবে।

গ্রাম বন্দর শহর নগর

মুহূর্তকাল থমকে যেতে পারে।

তারপর যে যার কাজে ব্যস্ত হবে দুদিন পরে …

‘ভাড়া না দিয়েই থাকব এখন’ শিরোনামীয় কবিতায় কবি লিখছেন :

ভাড়া না দিয়েই থাকব এখন

                  অনন্ত আগামী ছুঁয়ে।

এসব কবিতায় কবিতাকে শাসন করছে মৃত্যুচিন্তা। কিন্তু কাজী রোজীর কবিতায় সংগ্রামী-সুরটি ঘুরে ঘুরেই মাথা তোলে। ‘কালো মানুষের কথা’ কবিতায় রোজী লিখছেন :

শ্রমিকের ঘাম খুঁজে পেল সেই চাবি

হাতুড়ি শাবল কাস্তের সম্মান

আট ঘণ্টার রোদ বৃষ্টির গান।

কাজী রোজীর কবিতায় রয়েছে কাব্যের কারুকাজ। তাঁর ‘গ্রীষ্মের দহন’ কবিতায় শিল্পের মাধুরী আর সৌকর্য ঝরে পড়তে দেখি পুরো কবিতা জুড়ে। তাঁর কবিতার মুখটা এমন –

গ্রীষ্মের ভালোবাসা গরম আনে না শুধু

                     দহন আনে

খর রৌদ্রের তাপে বৃক্ষ উজাড় হয়

                     পাবার গানে।

‘অন্য রোদ’ কবিতায় পাই শিল্পগুণসম্পন্ন চরণ –

তপ্ত প্রখর রোদে মধ্য গগন

আয়নার মত যেন ঝকঝকে মন।

ছন্দ-সফল কবিতা কাজী রোজী অনেক লিখেছেন –

আমায় যদি ডাকতে পারো

            বর্ষণে অন্তরে

আমি তোমার বর্ষা হব

            জনম জনম ধরে।

কাজী রোজীর কবিতার সুষমা টের পাই যখন তাঁর রচিত কবিতার পঙ্ক্তি : ‘তারও চেয়ে বেশি আছে না লেখার জীবন বাহার।’ – হীরক-দ্যুতি ছড়াতে থাকে।

কবি কাজী রোজীর কবিতায় মিশে আছে এমন এক সারল্য যা তাঁর কবিতাকে সুবোধ্য করে তুলেছে। তাঁর কবিতা পড়তে গিয়ে কখনো মনে হয়নি তিনি তাঁর অভিজ্ঞতার বাইরে কিছু লিখেছেন। এখানেই লেখকের সততা আর সারল্য নিয়ে কথা! কবি কাজী রোজী তাঁর কবিতা লেখায় সৎ আর সরল থেকে প্রমাণ করেছেন যে, কবির জন্য, লেখকের জন্য সততা আর সারল্যের চেয়ে মহান আর কিছুই নয়।