কোনো একসময় কাঁটাবনে কাঁটাময় লতাগুল্ম ঝোপঝাড় হয়তো ছিল, নইলে অমন ধারালো নাম কেন? নগণ্য সেই পড়ো অঞ্চলটি শোভন সাজসজ্জা আর কংক্রিটের রম্য ঘাড় তুলে এখন দাঁড়ানো। রাস্তা লাগোয়া দৃষ্টিনন্দন এক বহুতল ভবনের নিচের স্পেসে বসেছে অনেক বইয়ের দোকান। পায়েলের পছন্দসই জয়তী নামের দোকানটি ওখানে আলো করে আছে। অসহ্য জ্যামের শহরে চলাচলে ভোগান্তি, যাই যাই করেও যাতায়াতের ইচ্ছা আমার নস্যাৎ হয়। আজ মনস্থ করেছি যতই কষ্টদায়ক হোক পড়ে থাকা কাজের ফয়সালা করতে পায়েলের কাছে যাবই। অফিস যাওয়া আমার স্থগিত।

মাঘের দুপুরের ঘন হিমের ছোঁয়া, মাথার ওপর ধূমল আকাশের ছাদ রেখে বড় রাস্তায় এসে দেখি, সামনে-পেছনে কোথাও সিএনজি যান নেই। গ্যাসচালিত বাহন কি হাওয়া!

অন্যদিন গা-ঘেঁষে গাড়ি থামিয়ে যাব নাকি অযাচিতভাবে জিজ্ঞেস করে ড্রাইভার। কই তারা, ধর্মঘট করেছে? ধর্মঘটের নামে যখন-তখন কাজ খতমের প্রতিজ্ঞা রক্ষায় বেশ পটু এরা।

 শ্রীহীন রাস্তার বাঁ-পাশ ধরে সামনে পৌঁছতেই দাঁড়ানো দুটি সিএনজি দেখে মনে শান্তি গড়ায়। উঁকি দিই, দুটিই যাত্রীশূন্য – সিটে ড্রাইভার নেই। আমার আর ত্বর সয় না। মোটা গলায় আওয়াজ তুলি – ‘ড্রাইভার কই? যাবে নাকি?’ ফুটপাতের ওপর থেকে ট্যারা চোখ, থুতনিতে সামান্য দাড়ি, ভাঙা চোয়ালের একজন সাড়া দেয়। হাতে তার ক্রিম বান রুটি। ওই রুটিতে কামড় দিয়ে সে জানতে চায় –

– ‘কই যাইবেন?’

– ‘কাঁটাবন।’

– ‘কাঁটাবনের কোন হানে?’

– ‘ওই যে খাঁচার পাখি বিক্রি হয়। ওই খাঁচার রাস্তায় যাব।’

শুকনো গালে পাতলা ঢেউ তোলে ড্রাইভার – ‘খাঁচার রাস্তা! কইছেন বেশ। ভালা। খাড়ান দেহি।’

রুটি খেতে খেতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ খারিজ করে সে – ‘না, যামু না। আপনি যানগা। দেরি হইবে। খামু এখন।’

– ‘খাওয়া তো প্রায় শেষ। আমি দাঁড়াই।’ মরিয়া হয়ে ড্রাইভারের মন পেতে চাই।

– ‘না। যান গিয়া। অক্ষন চা খামু। পরে রেস্ট।’ বলে, রুটির টুকরো ধরা হাতে দাঁড়ানোর ইশারা রেখে অন্য সিএনজির ড্রাইভারকে সে খোঁজাখুঁজি করে। তাকে পাওয়া গেল না।

মন আমার খারাপ হয়ে যায়। সাবধানে জ্যামের পাশ কেটে, ভিড়ের ফাঁকে বিরক্ত পা রেখে ভাঙা ফুটপাতের নাগাল পাই। রোদের ঝিলিক দেখা দিয়ে তখুনি হারিয়ে গেল। শান্তিনগরে ফ্লাইওভার নির্মাণের খোঁড়াখুঁড়িতে চলাচলের রাস্তা পুরো অযোগ্য। মানুষ আর গাড়ির জটিল গিঁটে তালগোল চরমে। এদিকেও কোনো সিএনজি নেই। খালি রিকশাও নেই। রাস্তায় চলন্ত বাস-ট্যাক্সি-রিকশা, একটার পেছনে একটা – সব যাত্রীবোঝাই। হর্ন ও কোলাহলের দাপটে প্রস্তুত ত্রাসের পরিবেশ। অকেজো রাস্তার সঙ্গে যানবাহন চাকার ঠোকাঠুকিতে শোনা যায় মেশিন লোহালক্কড়ের লাগাতার তীক্ষè আওয়াজ।

শান্তিনগর বাজারে ঢোকার পশ্চিম মুখের চিপা পাশে খালি একটা রিকশা পাওয়া গেল। ফর্সা কাবু লুঙিপরা এক যুবক রিকশার সিটে বসা। গায়ে তার ঢলঢলে রংজ্বলা টি-শার্ট। আমার মুখটা নিশ্বাসের কাছাকাছির মধ্যে আগুয়ান দেখে কপালের ঘাম মোছে সে। ঠান্ডায় সে ঘামল কেমনে!

– ‘রিকশাসাহেব কি যাবেন? কাঁটাবন।’

নজর আমার ওপর স্থির রেখে সে রিকশা থেকে নেমে আসে। খানিক ঘাবড়ানো স্বরে এবার সে জিজ্ঞাসা জমা দেয় – ‘আপনে কি রাইগা আছেন?’

রাইগা মানে রাগ – বলে কী? রিকশাওয়ালা আমাকে পয়লা দেখছে, পুরো অচেনা আমি, হুট করে তার রাগের ধারণা কেন? আমার মুখচ্ছবি বুঝি রুষ্ট বুনো কিসিমের। কিন্তু বিন্দুমাত্র উল্টাপাল্টা ব্যবহার তো এর সঙ্গে করিনি – তাহলে!

রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রেখে যুবক রাগ অনুমানের ব্যাখ্যা দিতে উদ্যোগী হয় – ‘ওই যে আমারে রিকশাসাহেব, আবার আপনি কইলেন। আমি সাহেব আপনির উপযুক্ত না। মনে কয়, ঝগড়া-কাইজ্জা কইরা রিকশাঅলাদের নিয়া ক্ষেইপা আছেন। আমারে তাই -।’ কথা কেটে দিয়ে রিকশা চালাতে প্যাডেলে সে পা বাড়িয়ে দেয়।

মুসিবত, এ দেখি কথার খই ফোটানো আজব প্রাণী। এর রিকশায় চড়া কি ঠিক হবে? ইতস্তত করি আমি। কিন্তু যাব বলে আমার জন্য রাস্তায় প্রস্তুত গাড়ি, কি বাহন তৈরি হয়ে নেই। আর এক উপায় হাঁটতে হাঁটতে মন্ত্রিপাড়া হয়ে রমনা পার্কে ঢুকে পড়া, পার্কের ভেতরের অক্সিজেন টেনে দক্ষিণ-পশ্চিমের ফুটপাতে উঠে ফের হাঁটা। উঁহু, শহর ব্যস্ত। আমার মতো আনাড়ি মানুষের হাঁটাও এখন দুঃসাধ্য।

– ‘ভাড়া নেবে কত?’

– ‘আশি ট্যাকা। জটলা ভাইঙ্গা ইউনেভারসিটে যাইতে তো এহন একশ পাই। আপনের কাছে একবারেই ল্যাজ্য ভাড়া চাইছি। অতিরিক্ত না। ওডেন।’

আমার সিদ্ধ বিশ্বাস নড়ে ওঠে – ‘ভাড়া তো বেশি চাইছো।’

– ‘কী যে কন! টেরাফিকে এহন সব রাস্তাতে যাইতে দ্যায় না। যাইতে হইবে আমাগো ঘুইরা। গোলচক্করদে।’

গোলচক্কর! ভুরু বাঁকা হয় আমার। ওদিকে চক্কর কই? প্রেসক্লাব হয়ে পশ্চিমে ইউনিভার্সিটির মধ্য দিয়ে যাওয়া যায়। রেসকোর্সের পাশ দিয়ে শিশুপার্কের রাস্তা ধরে সোজা শাহবাগ, ওদিকে রাস্তা কম। তাড়াতাড়ি হয়।

আমার গোনাগাঁথা রিকশাওয়ালা তাড়া দিয়ে ভেঙে দেয় – ‘গ্যালে পর ওডেন।’

ভাড়া নির্ধারণে আপত্তি না করে রিকশায় আমি উঠে বসি। হয়তো তড়িঘড়ি কর্মব্যস্ত সময়ে কোনো যানই পরে পাওয়া গেল না।

ভাঙাচোরা রাস্তার ঝাঁকুনি চলন্ত রিকশার নিচ ধরে ওপরে উঠে বসার সিট পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। কাকরাইলের চৌরাস্তায় এসে দেখা গেল চরম জ্যাম। থাকো ঠায় এখন বসে। এক বিন্দু শস্য গড়ানোরও ফাঁক নেই। কিন্তু বুদ্ধু বলেই চালক বেপরোয়া, চাকা অচল রাখতে নারাজ। কিছুতেই থামবে না। জটের পাশ কেটে সে এগোতে চাইলে কাঁধে থাপ্পড় মেরে থামাই তাকে। – ‘পুলিশের ধোলাই খাবে তুমি। আমাকেও খামোখা গালি শোনাবে। দাঁড়াও এখানে।’

আমার রুক্ষ ধমকে কাজ হয়। পেছন ফিরে রিকশাওয়ালা অযথা ফ্যাকাসে মুখে চাহনি দেয়। বিপরীত লেনে পুব থেকে গাড়ি যাচ্ছে পশ্চিমে। এপারের পশ্চিমের লেন ধরে যানবাহন চলেছে পুবে। ভীষণ দ্রুতগতির গাড়ি চলাচলের মধ্যে সিগন্যাল অমান্য করে কেউ কি রিকশা চালাতে সাহস রাখে? নিয়ম ভেঙে দুর্ঘটনায় মরা বা চিরপঙ্গু হওয়া। দেখি, রিকশাওয়ালা সিটে বসে ছটফট করেই যাচ্ছে। যাব আমি, তাড়া যেন খুব ওর। পারলে উড়াল দিয়ে রিকশা রাস্তার ওইপারে দক্ষিণে সে নিয়ে ফেলে। স্থির থাকতে মাথা পাগলা যুবকের পিঠে আমি খোঁচা দিই – ‘ওই, স্যারদের দেখছো? বেশ কড়া ওরা।’ বলে, ওয়াকিটকি হাতের কর্মব্যস্ত পুলিশ দেখাই। – ‘হাড্ডিগুড্ডির  ওপর পেটাবে। টের পাবে, এই শীতে শরীরে ব্যথা হবে।’ আমার রসরঙ্গে মনে মনে একচোট হাসি – অন্য কোনো সিজনে মার খেলে বুঝি ব্যথা হয় না।

ডিউটি করতে করতে মোটা, মাংসভর্তি গোলমুখের বয়স্ক এক পুলিশ, তার ইউনিফর্মের কাঁধে ব্যাজ, জানি না কোন র‌্যাংকের অফিসার, এই তিনি কাছে এলে সঙ্গে সঙ্গে আমি বিনয়ের অবতার হয়ে যাই – ‘স্যার, আমার দোষেই দেরি হয়েছে, কোর্টে যাব স্যার। যাওয়ার সিগন্যাল পড়বে কখন?’ আমার মিথ্যা তার ধরার কথা নয়, তবে একজন ধোপদুরস্তের মুখে দুবার স্যার সন্বোধনে পুলিশকর্তা সহকর্মীদের প্রতি চোখের ফোকাস মারেন। তারা সশ্রদ্ধ এই স্যার সম্ভাষণ যথাযথ শুনেছে কি না সে নিশ্চিত হতে চাইছে। বোঝা গেল অফিসার এখন প্রসন্ন। খুশির প্রভাবে মুখের রং তার পাল্টেছে। সহসা রাস্তার এপাশ-ওপাশের ট্রাফিক পুলিশদের উদ্দেশে তিনি জোয়ানি কণ্ঠে হাঁক দেন – ‘থামান সব।’ তার উঁচু স্বরের অমোঘ অর্ডারে ডান-বাম সব পাশের গাড়ি ধীরে ধীরে থেমে যায়। আমরা পেছনে যারা এতোক্ষণ আটকে হাত তুলে তাদের চলে যেতে তিনি ইঙ্গিত দেন। তাঁকে একটা ধন্যবাদ দেওয়ার সুযোগ হয় না, আমার ক্ষ্যাপা রিকশাওয়ালা ঝড়োবেগে এগিয়ে গেছে। ব্যাপার কি – কাকরাইল ছেড়ে ডানে স্কুল-গির্জা-মসজিদ-রমনা পার্ক যে রাস্তায় রিকশা যাবে না সে বলেছিল সেই রাস্তা ধরেই তো আমরা যাচ্ছি। তাহলে? বানোয়াট কথার প্রয়োজন কি ছিল? রিকশার সিটে জমে যেতে যেতে কৈফিয়ত তলবের স্বরে জানতে চাই – ‘তুমি যে বলেছিলে রিকশা এদিকে যেতে দেয় না। যাচ্ছ যে -।’ রিকশা সেøা করে বাইলেন রাস্তায় দ্রুত নজর টেনে সে নিজের মীমাংসায় স্থির থাকে – ‘নাই তো রিকশা। ওই তো গাড়িগুড়ির ফাঁকে অ্যাকটাও রিকশা কি দ্যাখতাছেন? আমরাই শুধু। আর ডর কি, আপনে তো আছেন। যাওন যাইবো। পুলিশে আপনেরে ধরবে না।’ বলে কি শয়তানের সুমুন্দি? নিষেধ থাকলে পুলিশ রাস্তায় রিকশা আটকাবে না আগাম সে বুঝল কী করে? আর আমাকে ধরবে না, এর অর্থ কী?

– ‘তোমার মাথা মনে হয় নষ্ট।’

আমার আন্দাজ উড়িয়ে দেয় সে – ‘জে না। আমার মাথায় ময়লা নাই। কলকব্জায় বিবাদ নাই। পুলিশের লগে আপনে কথা কইলেই সব ফিনিশ। ছাড়ন পাইবো। আপনের কথায় মজা আছে।’

ছেলেটা নির্ঘাৎ ট্যাটন। মনভজানো গুল মারতে পটু। বলি – ‘ফিনিশের মানে জানো?’

– ‘জে। রাস্তা ফকফকা, মুশকিল-আসান।’

ধুর, এই উন্মাদের সঙ্গে বাতচিৎ মানে তার উটকো বকবকানিতে উস্কানি দেওয়া। হয়তো সারাপথে তার খিলশূন্য কথা মনের শান্তি বরবাদ করে দিলো।

শিশু পার্কের খানিক আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নতুন গেটের কাছাকাছি এসে ফের জ্যামে আটকে যাই। বাসের প্রায় পেছন ঘেঁষে বাস দাঁড়ানো – যাত্রী সব চিঁড়েচ্যাপটা। বাসের জানালায়, দরজায় ঝুলন্ত মুখগুলো কায়ক্লেশে নীল। পোড়া ডিজেলের গন্ধে শ্বাস টেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। বাতাসে ধুলোর ওড়াউড়ি। শীতের প্রহারে ঝরেপড়া গাছের মলিন পাতা রাস্তাময় ছড়ানো। স্টার্ট দিয়ে রাখা গাড়ির ইঞ্জিন তাপ ছড়াচ্ছে, হালকা গরমের আঁচ হঠাৎ হঠাৎ গায়ে এসে লাগে।

– ‘স্যার মনে কয় শিক্ষিতো?’

দ্যাখো, পুলিশের মন হাতানো সেই স্যার ডাক এখন আমার উদ্দেশেই সে পেশ করেছে। আসলে ছেলেটা অসম্ভব ছোটাছুটি স্বভাবের। নিতান্ত পেটের দায়ে তার এই রিকশা টানা। সামর্থ্য থাকলে ইয়ারদোস্তদের সঙ্গে গুলতানির ফোয়ারা বইয়ে দিত। আসর জাঁকানো আমুদে সে। কেবল ভোঁতা বোধের দোষে কোন কথা থেকে কোন কথায় সে টপকে যাচ্ছে নিজেই ধরতে পারে না।

– ‘বুঝলে কেমনে লেখাপড়া জানি আমি?’

অবলীলায় তার মুখ থেকে উত্তর যেন খসে পড়ে – ‘চেহারায়। দ্যাখলেই বোঝপার পারি। ’

ঘরে-বাইরে, দেশজুড়ে এতো চেহারা, আকৃতিবন্দি লম্বা-খাটো, মোটা-পাতলা, সাদা-কালো কত মানুষ, কোনো চরিত্রের ভেতর অবধি বোঝার উপায় আজো আয়ত্তে আসেনি আমার। মানুষ দেখা, খোঁজা, ধরার আলাদা যে-কায়দা আমি তার কিছুই জানি না। পুস্তকি অনুভব দিয়ে কি প্রকৃত সত্য ধরা যায়? আন্ধা-চক্কর ছেড়ে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা আজো কি হয়েছে আমার? নিজের নিরিখ অভাবের কথা ভাবতেই মনে মুহূর্তে চিড় ধরে। আমার কণ্ঠ ছিঁড়ে হাহাকার খসে আসে – ‘কিসের শিক্ষিত? শোনো, আমি হচ্ছি আস্ত একটা ফাঁপা মানুষ – হলোম্যান।’

– ‘কী কন!’ যেন উল্টাপাল্টা বয়ান শুনে হতাশায় রিকশাওয়ালা মাখামাখি হলো।

জ্যাম ছুটে ফের শুরু যানচলাচল। দুই বাসের প্রাণঘাতী চলন্ত পাল্লার বিপদ থেকে সরে ফুটপাত ঘেঁষে যুবক রিকশা চালায়। রাস্তাঘাটের চরম দুরবস্থার মধ্যে এই তিন চাক্কা চালানো, কি রিকশায় চড়া – দুই-ই কষ্টের। পাদানির কাঠে             জুতো-মোজা পরা ঠ্যাং দুটো আমি শক্ত করে চেপে রাখি। পেছনের আচমকা কোনো ধাক্কায় নিচে ছিটকে যেন না পড়ি। খেয়াল করি, সাবধানে রিকশার প্যাডেল ঘোরাচ্ছে সে, নীরব এখন। বাঁচা গেল। কিন্তু কিসের কী, আমার মনের কথা বুঝি টের পেয়েছে। গলায় তার আবার জিজ্ঞাসা  – ‘কী জানি ইংরেজি কইলেন। হলোগ্যালোম্যান। কেতাব-উতাবের বিদ্যা না থাকলে কইলেন ক্যামনে?’ এই প্রশ্নের সঙ্গে জোড়া লাগানো আর একটি প্রশ্ন তার চলে এলো – ‘তা আপনে কি চাকরি করেন?’

দারুণ আপদের কবলে আমি পড়েছি। সবকিছু জানার বাহাদুরি নিতে তার মাথার মধ্যে কি কৌতূহল আর প্রশ্ন একসঙ্গে তৈরি হয়? উঁহু, নতুন একটা বোধোদয় সহসা আমার ভেতর জেগে ওঠে। ঢাকার রাস্তার দুর্গতি আর সাংঘাতিক বিশৃঙ্খলা কেটে রিকশা চালানোর মেহনত লাঘবে গন্তব্য অবধি পৌঁছাতে হয়তো কথার সঙ্গে সে থাকতে চাইছে। কেউ কেউ কাজ করতে করতে গুনগুন করে। এই জোয়ানের বয়স আর কত, তার মন মচকে দেওয়ার মধ্যে তাই কিসের কৃতিত্ব! আমার উত্তর গ্রেফতার করে তার কাছে নিয়ে যাই – ‘শোনো, আমি যে চাকরি করি তার কোনো নাম নেই – ফালতু। ভারী পদের চাকরি করলে কি রিকশায় চড়ি?’

আমার মোলায়েম কণ্ঠের জবাব বানানো ভেবে তার পছন্দ হলো না। চাকরি করা কেউ বুঝি রিকশায় ওঠে না – এ কোনো উপযুক্ত কথা হলো! বিরক্ত হওয়ার বদলে রিকশাওয়ালা কোনো আশাভঙ্গের দুঃখে এবার জখম হয়ে যায় – ‘ইশকুল-টিশকুলে যাওনের সুযোগ হয় নাই।

মা-বাপের পড়াইন্নোর ক্ষ্যামতা ছিল না। তয়, আমার চাচাতো ভাই, আমার চাইতে ছোডো, ইন্টারে পড়ে। কত্ত সে ঘোরাঘুরি করছে, চাকরি তার হইলো না।’

লেখাপড়া শেখাতে সংসার স্বাবলম্বী ছিল না – এই দুর্দশার মর্মপীড়ার চেয়ে চাচাতো ভাইয়ের বর্তমান বেকার থাকার দুঃখে বুঝি গলে এখুনি সে রিকশা থেকে পড়ে যাবে। ভুলে চলন্ত বাসের সামনে হয়তো রিকশা নিয়ে ফেলে। মন তার চাঙ্গা রাখার উদ্দেশ্যে কথার উষ্ণতার মধ্যে আমি তাকে নিতে চাই – ‘তুমি প্যাসেঞ্জার নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আসো।’

– ‘না।’ নিশ্বাস ফেলার মতো একশব্দে সে নিকেশ চুকায়।

– ‘কী বলো?’ আমার মেজাজে সামান্য জ্বাল পায় – ‘আমাকে রিকশায় তোলার সময় বলেছিলে না বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাড়া একশ টাকা নাও।’

– ‘ও তো ইউনেভারসিটেতে আই।’ বলে, হাত তুলে সে বাঁয়ের এলাকা দেখায়।

– ‘এই আহম্মক।’ জব্দ করা স্বরে ধমকে উঠি আমি। – ‘ইউনিভার্সিটি আসো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসো না! উজবুক, তুমি আস্ত একটা চতুষ্পদ। ওটা ইউনিভার্সিটির বাংলা মানে।’

– ‘তাই কন।’

নতুন একটা বাংলা শব্দ শেখার তুষ্টি রিকশাওয়ালার মনে ক্রিয়া করেছে এমন টাটকা লক্ষণ বিন্দুমাত্র বোঝা গেল না। আমি বয়সে বড়, শরীরে তাজা, অন্য যাত্রীর মতো হাড়ে-বজ্জাতে লড়াইবাজও, অতএব, সদালাপের সুযোগ ছাড়তে নারাজ। – ‘ইউনিভার্সিটিতে পড়া ছেলেমেয়েরা তোমার চাচাতো ভাইয়ের চেয়ে ওপর ক্লাসে পড়ে। বুঝছো। মফস্বল থেকে এসে অনেকে এখানে বেশ কষ্টেসৃষ্টে থাকে। পাশ করে একটি চাকরির জন্য তারা জুতো ক্ষয় করে ফেলে। পাচ্ছে না। তোমার ভাই পড়ছে ইন্টারে, এখনো কাঁচা, কেমনে সে চাকরি পাবে! অভাবের বাজারে চাকরি পাওয়া সহজ না।’

আমার উচ্চারণে কি আঁচড় ছিল, নইলে রিকশাওয়ালা চট করে অমন চুপ হলো কেন? হতে পারে চাকরি পাওয়া না-পাওয়ার আগাগোড়া সে বুঝতে চেষ্টা করছে।

শাহবাগের পুলিশ বক্স রেখে সোজা মানুষ গিজগিজ মোড়ে থেমে থাকা বাসের পাশ কেটে যায় রিকশা। বাঁয়ে মিউজিয়াম, ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হল, পরে কাঁটাবন মসজিদ। পার হতে হতে স্বস্তির শ্বাস ফেলি – যাক বাবা, সহিসালামতে এসে গেছি। উদ্বেগমুক্ত আমার ভাবোচ্ছ্বাসের প্রতাপে মনের অতল থেকে আবেদনময় গান লতিয়ে ওঠে। মনের খেয়ালে হঠাৎ হঠাৎ গান গেয়ে আমি বাতাস পীড়ন করি। আমার উদ্ভট স্বভাবের দোষ। নিজের ওপর থেকে দখল হারালে, কখনো অজান্তে, কখনো খোশমেজাজে থাকলে গান আমার ঠোঁট ধরে ফেলে। একটা বয়স্ক মানুষের হেঁড়ে কণ্ঠ শুনে পথচারীরা আমাকে অবাক নজরে দেখে। ঘুরে-ফিরে আমার একটাই এবং এক লাইনের গান – জীবন যখন ফুরায়ে যায় করুণাধারায় এসো। প্রায়ই আমি বিবেচনা করি, মর্জিমাফিক গেয়ে উঠবো বলে গত শতাব্দীতে রবি ঠাকুর এই গানটা কেবল আমার জন্য রচনা করেছিলেন। গানের বাকি লাইনগুলো আমার জানা নেই। এক লাইনেই আমি সন্তুষ্ট।

গানের নামে আমার ঝুলে পড়া লয়ের নীরস চেঁচানি শুনে রিকশাওয়ালা ঘাড় ফেরায়। পরে দাঁতের মাড়ি অবধি দেখিয়ে সে এক অখণ্ড হাসি উড়িয়েই চলে। আঠালো কোনো আমোদ পেয়ে হাসি তার থামছে না – ‘এইবার বুঝছি, আপনে মনে কয় কবি।’

আমাকে নিয়ে এতোক্ষণে ফাইনাল ধারণায় পৌঁছতে পেরে তার পায়ের পেশিতে বুঝি জোর এসেছে। এই দ্রুত গতির পরিণামের সঙ্গে আমি কথা রেখে দিই – ‘শোনো, সম্ভবত আমি একমাত্র কবি যে কোনো কবিতা না লিখে কবি।’

রিকশাওয়ালা কাঁটাবনের রাস্তায় প্রবেশ করলে আমার তাৎক্ষণিক বাকোয়াজি তার মনোযোগ পায় না। বাঁয়ে পাখির দোকান। রিকশা সেøা হলে দেখি, ছোট-বড় নির্দিষ্ট ঘেরে কত পাখি, নানা রং, বিভিন্ন রকমের। ওই বুঝি একটা আকুল পাখি ডেকে উঠলো। মরমিয়া গোছের উছল উপলব্ধি সহসা আমার মতো এক দুর্বল হেরোজনকে বেঁধে ফেলে। রিকশাওয়ালার উদ্দেশে আমার বাণী উড়ে যায় – ‘দেখো, কেমন খাঁচার মধ্যে তুমি-আমি। রোজ আমরা বিক্রি হচ্ছি।’

রহস্যময় কঠিন কোনো কথা, তার মগজের জন্য কিছুতেই খোলাসা না, পেঁচানো গোলমেলে বিষয় ভেবে যুবক রিকশাওয়ালা নিরুচ্চার থাকে। হয়তো তার মনে হতে পারে, জামা-প্যান্ট পরা শিক্ষিতরা কথাবার্তা সবসময় জটিল করে ফেলে, এর চেয়ে রিকশা চালানো অনেক সহজ। রিকশা সে ঘাড় গুঁজে চালিয়ে যাচ্ছে যেন গোটা কাঁটাবন আজ তিন চাকা টেনে চষে ফেলবে। তার ভরাট নীরবতার মধ্যে আমি রিকশা থামাতে বলি। পরিষ্কার বুঝতে পারছি, কাঁটাবনে আসার আশি টাকা ভাড়া তার মেহনতের চেয়ে সে বেশি নিচ্ছে। কোথায় গোলচক্কর, ঘুরে ঘুরে অতিরিক্ত দূর ভেঙে সে এলো! সেই তো শর্টকাট, কমতি রাস্তা, ট্রাফিক পুলিশের বাধাও ছিল না। একমাত্র জ্যাম ছাড়া রাস্তায় কোথাও হাঙ্গামা ছিল না। তাহলে দাঁড়ালো কী? মুহূর্তে ভাড়া নিয়ে ঠকে যাওয়ার বহাল ভাবনা আমি বিলীন করে দিই। সিএনজিতে এলে ভাড়া আরো বেশি দিতে হতো। আর ভাবাভাবি কেন?

একশ টাকার একটা নোট রিকশাওয়ালাকে দিলে সে চোখের সামনে তুলে, পরে আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে কী যাচাই করে। টাকা আসল না নকল ধরার ক্ষমতা আমার নেই। মানুষ কীভাবে শনাক্ত করে তাও আমি বুঝতে পারি না। তবে ভেজাল টাকা দিয়ে কেউ আজো আমাকে ঠকায়নি। বিশ টাকা ফেরত দিতে আশ্চর্য, হাত তার বুঝি অলস ধীর হয়ে আসে। এর মানে তো একটাই – সামান্য বিশ টাকা আমি ফেরত না নিলেও পারি।

রাস্তার উল্টো পাশে চাহনি টেনে মনে হলো, আমার লক্ষ্যস্থলের উঁচু ভবনটি গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। ভবনটির নির্মাণ হয়তো বেশিদিন হয়নি। এপারে দাঁড়িয়ে পায়েলের জয়তী তো দূর, কোনো বইয়ের দোকানই দেখা যায় না। দোকানটি ভেতরের কোনো অংশে হবে। যানচলাচল ফাঁকা পেয়ে মন্থর পায়ে হেঁটে আমি ডিভাইডারের ওপর দাঁড়াই। শুনতে পাই রিকশাওয়ালার স্বরের আওয়াজ পেছন থেকে উড়ে আসছে। ব্যাপার কী! দেখি, তার ডান হাত আমার উদ্দেশে ওপরে তোলা। – ‘ফির আপনের সইঙ্গে দ্যাখা হইবে কই?’

আমি তাকে হতাশ করি না। আত্মীয় কণ্ঠে ফুকরে উঠি – ‘হবে, দেখা হবে। যে-কোনো দিন অলি-গলি-রাস্তায়, যে-কোনো সময়।’

আমার উত্তরে ভরসা পেয়ে হৃষ্টচিত্তে সে হাসতেই থাকে। পরে দোকানের সামনে ঝোলানো খাঁচার ভেতর ছটফট করা চেনা-অচেনা পাখি আঙুল তুলে সে দেখায়।

Leave a Reply