চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে

লেখক:

আনিসুল হক

মেয়েটি এই মুহূর্তে একটা সাদা পাঞ্জাবি আর একটা থ্রি-কোয়ার্টার পায়জামা পরে ডাইনিং রুমে নড়াচড়া করছে।

চন্দ্রমল্লিকা।

আমার নাতনির বন্ধু। চন্দ্রমল্লিকার জন্ম কলকাতায়, এখন বোস্টনে গেছে পড়তে। কলকাতা থেকে বোস্টন, এবার বোস্টন থেকে ঢাকা।

তার বয়স, যদি আমার নাতনির বয়সীই সে হয়, তাহলে ১৯ হওয়ার সম্ভাবনা।

আমি ঘুম থেকে উঠে ডাইনিং চত্বরে আসি, তখন আলোর বিপরীতে তার শরীরের বাঁক আমার চোখ ঝলসে দেয়। গুড মর্নিং, চন্দ্রমল্লিকা বলে।

আমি গুড মর্নিং বলে বারান্দায় এসে দাঁড়াই।

আমার বাসার জানালা দিয়ে হাতিরঝিল লেক দেখা যায়। সকালবেলার রোদ এসে পড়ে ঝিলের জলে, তিরতির করে কাঁপা জলে রোদের ঝিলিক, ইলিশ মাছের পিঠের মতো। আমি সেদিকে তাকিয়ে থাকি। সন্ধ্যার সময় আমার বারান্দায় এসে বসি। নিচে সরাসরি তাকালে ভয় লাগে, ১২ তলার ঝুলবারান্দা থেকে মাটির পৃথিবীর দিকে তাকালে বুকটা ধড়াস করে ওঠে, আমার যে উচ্চতাভীতি আছে, সেটা টের পাই। কিন্তু লেকের জলে অস্তরাগের প্রতিবিম্ব, আমার কাছে তুলির টান বলে মনে হয়। আমি তাকিয়ে দেখি। গুনগুন করে গান গাই – তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা। রবীন্দ্রনাথের এই গানটা অবলম্বন করে পাবলো নেরুদাও একটা কবিতা লিখেছেন, আমার মনে পড়ে।

আমার সারাদিন কাটে আলসেমি করে। মাঝে মধ্যে ইজেলে রং চড়াই, ক্যানভাস জুড়ি, হামিদ আলী আমাকে সাহায্য করে কায়িক শ্রমের কাজগুলো করে দিয়ে। যখন ছবি আঁকি, মগ্ন হয়ে যাই। হামিদ আলী অভিযোগ করে, চা-টোস্ট সব পইড়া আছে, আপনে তো খান নাই। আমি তখন তার দিকে শূন্যদৃষ্টিতে তাকাই।

আমার দু’ছেলে, এক মেয়ে। তারা সবাই আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। আকাশচুম্বী এই ফ্ল্যাটটাতে আমি একা থাকি। বছরের তিন মাস। তারপর আবার বেরিয়ে পড়ি। আমেরিকার বোস্টনে মেয়ের বাড়িতে যাই। অস্ট্রেলিয়ায় ছেলের ওখানে। তারপর কারো কাছে নয়, স্পেন। ছেলেদের মা অস্ট্রেলিয়ায়, মেলবোর্নে।

দেশে থাকলেই আমার ছবি অাঁকাটা হয়।

দেশের বাইরে গেলে, জানি না কেন, কোনো কাজই হয় না। খালি আলসেমি হয়। নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটানো হয় অবশ্য। বেবি-সিটিং করি। নাতিকে স্কুল থেকে আনি। ডায়াপার বদলে দিতে হলে দিই। সব করি। কখনো কিছু করি না। ঘুম দিই। কিন্তু ছবি আঁকাটাই হয়ে ওঠে না।

চন্দ্রমল্লিকা কফি বানাচ্ছে। ও খুব ভালো কফি বানাতে পারে। আমি কালো কফি খাই। দুধ-চিনি কিছুই দিতে হয় না। এই ধরনের কফি বানানোর জন্য বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের দরকার পড়ার কথা নয়। তবু আমার মনে হয়, চন্দ্রমল্লিকার বানানো কফিটাই সবচেয়ে সুস্বাদু হয়। একটু আগে ও যখন কাপের মধ্যে চামচ দিয়ে নাড়ছিল, টুংটাং শব্দ হচ্ছিল, কফির ঘ্রাণ এসে আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয়কে জাগিয়ে তুলছিল, তখন আমার পঞ্চেন্দ্রিয়েই যেন সাড়া পড়ে গিয়েছিল।

চন্দ্রমল্লিকা সিডি প্লেয়ারের রিমোটে চাপ দেয়।

গান বেজে ওঠে।

সেই পুরনো রবীন্দ্রসংগীতই। ‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে – নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে।’

চন্দ্রমল্লিকা দুকাপ কফি আনে। বারান্দায় চেয়ার আছে। গার্ডেন চেয়ার, রোদে-বৃষ্টিতে নষ্ট হবে না এমন। আমি গিয়ে চেয়ারে বসি। ও রেলিং ধরে দাঁড়ায়। বর্ষাকাল। তবু আজকের আকাশ রোদে ঝিকমিক করছে।

ঝিলের জল যেন সদ্য মাজা কাঁসার বাসন।

চন্দ্রমল্লিকাকে এই সাদায় খুব মানিয়েছে।

আর রোদের বিপরীতে তার যৌবনের সৌন্দর্য বর্ষাপ্লাবিত নদীর মতো বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসছে। এত সুন্দর দৃশ্য আমি কখনো দেখিনি।

‘জীবন মরণ সুখ দুখ দিয়ে

বক্ষে ধরিব জড়ায়ে।’

আমি বলি, কফিটা খুব ভালো হয়েছে।

ও বলে, আজ বৃষ্টি হবে না! ওয়েদার ফোরকাস্ট কী?

আমি কফির কাপে চুমুক দিই, বলি, আমরা ওয়েদার ফোরকাস্ট দেখে চলি না।

আমরা কলকাতায় থাকলে দেখি না। বোস্টনে থাকলে দেখতেই হয়। এই রোদ, আবার এই বৃষ্টি। কিন্তু ওয়েদারে ঠিক বলে দিতে পারে, বৃষ্টিটা কখন হবে।

‘স্খলিত শিথিল কামনার ভার বহিয়া-বহিয়া ফিরি কত আর’

চন্দ্রমল্লিকার শরীরটা এত সুনদর, আমি এর আগে দেখিনি কি?

ও যখন ঢাকা এয়ারপোর্টে নামল… ওর ছবি মিতি, আমার নাতনি, আগেই পাঠিয়েছিল ই-মেইলে অ্যাটাচ করে, ফলে  এয়ারপোর্টের আগমন লাউঞ্জের স্টিলের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থেকে যখন ওকে ট্রলি হাতে বেরিয়ে আসতে দেখি, তখন ওকে চিনে নিতে আমার একটুও অসুবিধে হয়নি, আর কাছে এসে ও যখন আমাকে জড়িয়ে ধরল, আমি নিষ্কাম চোখে ওর দিকে তাকালাম, আমার নাতনির বন্ধু, আমার চোখে পড়েছিল ওর চোখ-দুটোই। দুটো চোখ এমন হাসতে পারে।

হ্যালো দাদু…

হ্যালো চন্দ্রমল্লিকা…

চন্দ্রমল্লিকা কফির কাপে আঙুলে টোকা দিয়ে তবলা বাজায়। গুনগুন করে।

‘নিজ হাতে তুমি গেঁথে নিয়ো হার, ফেলো না আমারে ছড়ায়ে\’

আমি বলি, বাংলাদেশটা বর্ষাতেই সুন্দর। ঢাকায় খুব ধুলাবালি তো। বর্ষাকালে আকাশটা পরিষ্কার থাকে।

চন্দ্রমল্লিকা বলে, তোমাকে তো আর আমার মতো বস্তিতে- বস্তিতে ঘুরতে হচ্ছে না। তুমি এই বারান্দায় বসে ঝিলের জলে রোদের খেলা দেখবে। বৃষ্টি দেখবে। ও মা। সায়েদাবাদ বস্তিতে কী রকম কাদা হয় জানো! আমার স্নিকার কাদায় গেঁথে গিয়েছিল সেদিন।

কী করতে হয় তোমাকে বস্তিতে?

আরে আমার ওয়াটার এইডের প্রজেক্ট না? স্লাম ডুয়েলার্সদের হাইজিন, ওদের রাইট টু ড্রিংকিং ওয়াটার, ওদের পার ক্যাপিটা ওয়াটার কনজাম্পশন – এইসব কালেক্ট করি।

কোশ্চেনিয়ার আছে?

হ্যাঁ। আছে। আইপ্যাডটা নিয়ে যাই। ওখানেই ডাটা এন্ট্রি করি। ফটো তুলি। দেখবে। তোমাকে দেখাব। দাদু শোনো। তোমারও আমার সঙ্গে বস্তিতে যাওয়া উচিত। তুমি একেবারেই আইভরি টাওয়ারে বাস করছ। এখান থেকে ওই দেখা যাচ্ছে সোনারগাঁও হোটেল, তোমাদের ফাইভ স্টার। তাই না। তুমি জীবন দেখবে না। জীবন ছানবে না?

ওর ঠোঁটে একফোঁটা কফি ঝুলে আছে, তাতে রোদ এসে ঝিলিক দিচ্ছে, আমি তাতে জীবন দেখতে পাই। মনে হয়, ঠোঁট দিয়ে ওই কফিফোঁটাকে মুছে দিতে পারলে ভালো হতো।

মেয়েটার স্তনদুটো এত গোলাকার, এত আকাশমুখী।

‘চিরপিপাসিত কামনার বেদনা বাঁচাও তাহারে মারিয়া।’

ইন্দ্রানী গাইছে ভালো।

দাদু, আজকে তুমি চলো আমার সঙ্গে। দেখবে, একটা ছোট্ট ছইয়ের নিচে সাতজনের একটা পরিবার কীভাবে থাকে। ওখানে ওদের বাচ্চা-কাচ্চাও হয়। টেলিভিশন আছে, ডিভিডি প্লেয়ার আছে।

আমার জয়নুল আবেদিনের কথা মনে হয়। স্যার বলতেন, যাও, ঢাকার বাইরে যাও, নদীতে যাও, নৌকায় থাকো কয়েকদিন,           ঘাটে-ঘাটে যাও, বউ-ছেলেমেয়েরা আসবে ঘাটে, বেদেনিরা আসবে…

বলতে ইচ্ছা করে, জীবন কম তো ঘাঁটিনি চন্দ্রমল্লিকা। অনেক ঘেঁটেছি। ভালোবেসে দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে, অবহেলা করে আমি দেখিয়াছি মেয়েমানুষেরে। সেই যে জেলেনৌকায় রাতদিন কাটানো, ইলিশ মাছের তেলে ইলিশ মাছ ভেজে খাওয়া, আর ছবি আঁকা, বাঁকা জল, ক্রূর জল, জেলেডিঙ্গি, রাতের নদীতে টিমটিম করে জ্বলছে জেলেডিঙ্গিতে আলো, আর বেদেনির বাঁকা কোমরের মতো নদী, নৌকার পালের মতো বুক, সাপের মতো ঊরু…

আমি বেরিয়ে পড়ব। আজকে একটু তাড়াতাড়ি যাই। চন্দ্রমল্লিকা বারান্দা থেকে ওঠে।

আমি বলি, হামিদ আলী আসুক। ভাত খেয়ে বের হও। বাজার করতে গেছে। ইলিশ মাছ আনবে। ভেজে দিতে বলো।

সে হাসে। উফ্। মার মতো বলছ কেন দাদু। আমরা বাঙালিরা কেন লাঞ্চকে বলি ভাত খাওয়া। ভাত না খেয়েও তো লাঞ্চ করা যায়।

এক হাতে লাল কাপ, আরেক হাতে নৃত্যপটিয়সীর মুদ্রা, আমার কী যে ভালো লাগে।

আমি বলি, চন্দ্রমল্লিকা, তুমি আমার মডেল হবে? আমি তোমার ছবি আঁকতে চাই।

চন্দ্রমল্লিকা বলে, যা। আমি কি দেখতে সুন্দর? দাদু, তুমি সুন্দর কাউকে মডেল করো।

তুমি সুন্দর না? এই ধারণা তোমার হলো কী করে?

আমার গায়ের রং ময়লা না?

কী বলছ তুমি চন্দ্রমল্লিকা? গায়ের রং ময়লা মানে কী! ময়লা কথাটা এখানে আসে কোত্থেকে? তোমার গায়ের রং শ্যামলা। বাঙালি মেয়েরা তো শ্যামলাই হবে। তুমি আমেরিকা গেছ, বোস্টনে থাকো, তবু তুমি গায়ের রং নিয়ে কথা বলো! ওখানে এইসব কথা রেসিস্ট বলে গণ্য হবে।

আর আমেরিকার কথা বোলো না দাদু। ওরা তো আমাদের বাঙালিদের সবচেয়ে ফর্সাটাকেও কালোই মনে করে। যদিও আমাদের নাম দিয়েছে ব্রাউন।

শোনো। তোমার চেয়ে রূপবতী কোনো নারী আমি এই জীবনে দেখি নাই। আর আমার জীবন কিন্তু ছোট নয়। আমার দেখাও কম নয়। এবার আমি ৭৯ হচ্ছি।

৭৯। তোমাকে দেখলে একদম ৭৯ মনে হয় না দাদু।

আরে রোজ অ্যালো-ভেরা খাই না?

চন্দ্রমল্লিকা বেরিয়ে যায়।

আমি গুনগুন করি। ‘শেষ জয়ে যেন হয় সে বিজয়ী তোমারি কাছেতে হারিয়া।’

দুপুরে আমাকে ছবিতে পায়। আর বৃষ্টিও বইতে থাকে তুমুল বেগে। অনেক নিচে, আমি জানালা দিয়ে তাকাই, গাছগুলো কী যে মাথা নাড়ছে। মনে হচ্ছে, কার্টিজ পেপারে এইমাত্র পানি ঢেলে দিলেন কামরুল হাসান। ওয়াশ।

বারান্দায় আসি। সকালে মেয়েটি যে-চেয়ারে বসেছিল, সেটায় বসি। বৃষ্টির ছাঁটে চেয়ারটা ভেজা। বৃষ্টির ছাঁট এসে আমার চোখেমুখে লাগে।

আমি ঘরের ভেতরে যাই। চন্দ্রমল্লিকা যে-ঘরে থাকে, সেটায় ঢুকি। ওর পাঞ্জাবিটা ও বিছানায় ফেলে রেখে গেছে। পায়জামাটাও। আমি সেটা হাতে তুলে নিই। ঘ্রাণ শুঁকি।

আবার ছবি আঁকায় বুঁদ হই।

জলরঙের ওয়াশ। দূরে একটা মুখ। আভা। চন্দ্রমল্লিকার।

তেলরং ধরব। তাহলে খুব অন্ধকার থেকে ওর বিদ্যুৎরেখা হাসিটা ধরতে চেষ্টা করা যাবে।

না। ভালো লাগে না। অস্থির লাগে। আমি রেড ওয়াইন বের করি।

ও আসে। ভিজে গেছে। হামিদ আলী রান্নাঘরে ইলিশ ভাজছে। ওর হালকা নীল ফতুয়ার নিচে ব্রা।

আমি বলি, একটু ওয়াইন নাও। ইলিশ মাছ ভাজার সঙ্গে রেড ওয়াইনের কোনো তুলনা নাই।

ও বলে, কাপড় পালটে আসি।

আমি বলি, একটা মাছ মুখে দিয়ে যাও। তারপর এসো।

না, স্নান করতে হবে আগে। ও মা, কোথায় গিয়েছিলাম যদি জানতে।

বোস্টন থেকে ফোন আসছে। ওদের মা। আমি ফোন ধরি। গিন্নি বলেন, সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো। তোমার ব্লাড প্রেশার। ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছ। হামিদ আলী যত্ন নিচ্ছে।

মিতি ফোন করে। দাদু, আমার ফ্রেন্ডের কোনো কষ্ট হচ্ছে না তো। ওর মুখে বাংলা শুনতে আমার ভালো লাগে। ভাঙা-ভাঙা। কিন্তু ওর বাবা-মা ওকে বাসায় ইংরেজি বলতে দেন না।

আমি হ্যাঁ-হ্যাঁ করি।

স্নান সেরে এসেছে মল্লিকা। চুল তোয়ালে দিয়ে বাঁধা। থ্রি কোয়ার্টার জিন্স পরেছে। টি-শার্ট। ঢোলা।

আমার হাতে তুলি।

আমি বলি, তুমি ওখানে বসে থাকো। আমি তোমাকে আঁকি।

ও বলে, আচ্ছা। কালো মেয়েকে আঁকতে চাও। শখ করেছ। আঁকো।

হামিদ আলী চলে যায়। ডাইনিং টেবিলে খিচুড়ি হয়েছে। গন্ধ আসছে। আমরা রেড ওয়াইনের বোতলে চুমুক দিই।

আমার ঘোর-ঘোর লাগে।

আমি রিমোট টিপে আবার ওই গানটাই প্লে করি।

‘চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে – নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে’

আমি গলা ছেড়ে গান ধরি। তারপর উঠি। চন্দ্রমল্লিকার কাছে যাই।

আমি ওর চরণ ধরি। ওর পায়ের পাতায় চুমু দিই।

সে আমার চুল নেড়ে দেয়। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। বিজলি চমকায়।

আমি বলি, তোমার যা ফিগার, এটা ন্যুড সেশন করলে ভালো হতো।

সে বলে, আমার গায়ের যা রং, আমি কোনোদিনও সেটা তোমাকে দেখাব না। তুমি আর্টিস্ট।

আমি বলি, গায়ের রং নিয়ে অবসেশনটা কি কলকাতার মেয়েদের বেশি থাকে?

সে বলে, জেনারালাইজ করে কোনো কথা বোলো না।

আমরা চুপ করে থাকি।

তারপর সে টিভির রিমোট হাতে নেয়।

একটার পর একটা চ্যানেল সে সার্ফ করে।

টেলিভিশনের আলো একবার তার মুখে পড়ে, একবার তার বুকে পড়ে। নাকি আমার চোখ ওঠানামা করে।

‘চিরপিপাসিত বাসনাবেদনা বাঁচাও তাহারে মারিয়া।’

নেলসন ম্যান্ডেলার ওপরে একটা ফিচার দেখাচ্ছে কোনো এক চ্যানেলে। সে এই চ্যানেলটায় স্থির হয়।

ম্যান্ডেলা কি মারা গেছেন?

আমি তাকে জিগ্যেস করি। সে আমার কাছে আসে। আমাকে জড়িয়ে ধরে। আমার কানে মুখ এনে বলে, ম্যান্ডেলা কোনোদিনও মারা যাবে না। ম্যান্ডেলা মরে না।

চন্দ্রমল্লিকার গায়ের রং চন্দ্রমল্লিকার মতো উজ্জ্বল নয়।

বরং শালকাঠের মতো।

আমি একহাতে তার কোমর পেঁচিয়ে ধরি। নদীর বাঁকের মতো তার কোমর।

সে আমাকে বলে, দাদু, আই স মাই মাদার হ্যাংগিং ফ্রম দি সিলিং। মা আত্মহত্যা করেছিল। মার গায়ের রংটা আমি পেয়েছি। আই ক্যান নট ফরগেট দ্যাট সিন। আমার মা ঝুলে আছে আকাশ থেকে। তার কালো পায়ের নিচটা সাদা। আমি ছোট, সেই পায়ের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। চিৎকার করে ডাকছি, মা, মা… আমার ঠাকুরমা, আমার পিসিরা এলেন। বললেন, পোড়ামুখী বেঁচে থাকতেও জ্বালাল, এখন মরে গিয়েও জ্বালাবে…

নেলসন ম্যান্ডেলাকে দেখানো হচ্ছে। কী এক কনসার্টে। আমি ৭ পেগ খেয়ে ফেলেছি। ওকে চুমোয়-চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে আমি বলি, আমি তোমার গায়ের রং খুব পছন্দ করেছি চন্দ্রমল্লিকা। এদেশে শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি।

‘বিকায়ে বিকায়ে দীন আপনারে

পারি না ফিরিতে দুয়ারে দুয়ারে –

তোমার করিয়া নিয়ো গো আমারে

বরণের মালা পরায়ে।’

ইন্দ্রানী সেন গেয়ে চলেন। খুব ভালো গেয়েছেন তিনি গানটা।

চন্দ্রমল্লিকা তার পাপড়ি মেলে ধরে। তার টি-শার্ট তার থ্রি কোয়ার্টার মেঝেতে স্তূপীকৃত হয়। সে দূরে দাঁড়ায়। বিজলি চমকায়। সে বলে, ডোন্ট ডেয়ার ইউ টাচ মি। দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে অাঁকো। কিন্তু আমাকে ছুঁতে পারবে না।

‘শেষ জয়ে যেন হয় সে বিজয়ী তোমারে কাছেতে হারিয়া।’ আমি গলা ছেড়ে গাই। তুলি চালাই শক্ত হাতে।

আমি তার আর আমার মধ্যের দূরত্বটা অতিক্রম করতে পারি না। কিন্তু আমার ক্যানভাসে তাকে আমি নির্মাণ করি। ভাঙি, গড়ি, ছানি। মাখি।

কিন্তু সে আমার স্পর্শের নাগালে আর কোনোদিনও আসে না।