নদী কারো নয়

লেখক:

সৈয়দ শামসুল হক

\ ৩৫ \

 উন্মাদ কাল। উন্মাদ মানুষ। আমরাও এতাবধি এসে এক ধরনের ছন্ন কথক বটে। অধিক কী, নদীও উন্মাদ! কিন্তু না, সাতচল্লিশের এ আগস্ট মাসের শেষভাগে বর্ষাকালের ঢল নামা উন্মত্ততা আধকোশার এখন নয়। এখন ভরা ভাদ্র। আষাঢ়-শ্রাবণের উন্মত্ত পাটল পানির কাল শেষ। নদীর বুকে এখন টানের পানি, রোদ্দুর এখন সূর্যোদয় থেকেই দিনমান তেজালো। এমনকি সূর্যাস্তকালেও তার আগুনের রোখ। দিনমান এখন ধারের মুখে শান দেওয়া চকচক করে নদীর বুক, নদী যেন এক উদ্যত খাঁড়া, সময় যেন এখন গলা

পেতে আছে বলির অপেক্ষায়। কৃষ্ণকাল এখন বুঝি রক্তই চায়। মাড়োয়ারী পট্টির পাশেই কালীবাড়ি, মাকালীর রক্ত জিহবা ওই লকলক করছে। হাতে তাঁর রক্তাক্ত খাঁড়া। পায়ের নিচে নির্বিকার মহাদেব যেন এই জগৎ রূপে সে পতিত হয়ে আছে। চরাচর এখন স্তব্ধ এবং মৃত্যুমুখী। কিন্তু এ সবই আমাদের অনুভবে মাত্র। অনুভবেই জগৎ স্বরূপ প্রকাশ পায়। তবে শেষ পর্যন্ত কথা এই যে, প্রকৃতি নির্দয় নয়। প্রকৃতি জননীর মতো। দুঃখ সহন তার অসীম। দুঃখের বুকে পা দিয়েই সুখকালের যে উত্থান, এটিও মানুষের গভীরে বর্ষাকালের বীজের মতো রোপিত হয়ে আছে অংকুর ধরে ওঠার অপেক্ষায়। তাছাড়া, এটিও তো দেখি যে, বিপুল পৃথিবীর কোলে এই যে জলেশ্বরী এর পরতে পরতে জননীর মায়াময় হাত, নইলে জীবন চলছে কী করে?

জলেশ্বরীর ইতিহাসে কোনোকালে হিন্দু-মুসলমানে বিবাদ ছিল না। বাজার সড়কে বাবা শাহ কুতুবুদ্দিনের মাজার, সে কতকালের কথা তিনি এ-মুলুকে এসেছিলেন, ভালোবেসেছিলেন হিন্দু আর প্রকৃতিপূজক এই জনপদের মানুষ সকলকে। আজো বার্ষিক ওরসকালে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আসে মাজারে, তারা সিন্নি চড়ায়, দুঃখময় জীবনের সুসার তারা প্রার্থনা করে বাবার কাছে। বুড়ো বটগাছের পাশ দিয়ে উঠে গেছে প্রাচীন সিঁড়ি, নামলেই  মাজার-চত্বর। এই সিঁড়ি বেয়েই তো বাবা কুতুবুদ্দিন নেমে যেতেন তাঁর হুজুরাখানায়। এই সিঁড়িতেই আজো প্রণিপাত করে দূরদূরান্ত থেকে আসা হিন্দু মানুষেরা। মুসলমানেরা তাদের ডেকে লয় – সিঁড়িতে ক্যান বা! আইসো, আইসো, বাবার থানে আইসো, বাবার দর্শন করো হে! যা দিবার বাবার মাজারে দিয়া যাও। বাবায় দেখিবে! বাবা জাগ্রত হয়া তোমার আশা পূরণ করিবে!

মাজারের পাশেই জলেশ্বরীর বড় মসজিদটি। এই যে বাজার সড়ক, এই সড়ক দিয়ে বিসর্জনের প্রতিমা যায় আধকোশার দিকে। মসজিদের শ্রুতি নিকটেই বিসর্জনের মিছিল থেকে ঢাকের বাদ্যিও হয়েছে – নিকটে আসতেই অর্জুন ভূপতি রাজেশেরা হাত তুলে ঢাকিদের বলে – ওরে থাম্ থাম্ থামা! আজিজদা লাঠি হাতে ওই দ্যাখ খাড়েয়া! মিছিল তাকিয়ে দ্যাখে – না, আজিজের হাতে লাঠি নাই। আর সকলের মতো সেও পথের পরে দাঁড়িয়ে দেখছে বিসর্জনের মিছিল। তবে, আজিজই বটে। ওই তো ওই দাঁড়িয়ে। আর কথা কী! তার ওপর চোখ পড়তেই নিমেষে সব শান্ত। নাটকের মতোই যেন নেমে আসে যবনিকা। মানুষের সুবুদ্ধি আর ভ্রাতৃভাবের জাগরণ ঘটে। বাদ্যি থেমে যায়। গো-গাড়ির ওপরে প্রতিমা চলনের টালে টলমল করে, প্রতিমার চোখে দীপ্তি, ঠোঁটে স্মিতহাস্যের বিচ্ছুরণ, যেন বলতে চায় – বাবা কুতুবুদ্দিনও আমার সাথেই স্বর্গ হতে নামি আসিছিল একদিন! মানুষেরা যদি মুহূর্তের জন্যে উত্তেজনায় পড়েছিল, অচিরে নিবৃত্ত হয়েছে হিন্দু-মুসলমান বিভেদের এ সব শংকা সত্য নয় জেনে, তারা জানে সত্য যে-গভীরে থাকে সেখানে বিবাদের পাঁক নয় অমৃত থইথই করে, অমৃতের সিক্ততায় সত্যের পচন নাই, অতএব যদিওবা হিন্দু-মুসলমানে কখনো কোলাহল উঠেছে মুসলিম লীগের নজির মিয়া আর কংগ্রেসের রাজেনবাবুর কারণে, মঞ্চ থেকে মৃতেরা হাসতে হাসতেই উঠে দাঁড়িয়েছে আবার, মুখের রং তুলেছে, যে-যার বাড়ি ফিরে গেছে কলরব করতে করতে। আহা, সেই ফিরতি পথে তোমরা কি দ্যাখো নাই হিন্দু-মুসলমানে কোলাকুলি? আর, এখন কিনা সেই                হিন্দু-মুসলমানের জলেশ্বরীর মহকুমা হাকিম নেয়ামতউল্লাহ্ মন্মথ দারোগাকে বলছেন, শহরে দাঙ্গা লাগিবার উপক্রম! যাও, যায়া দ্যাখো!

দারোগাকে এই কর্তব্য তাড়না দেবার পরপরই আমরা ঔপন্যাসিক মকবুল হোসেনের কাছে গিয়েছিলাম সময় উন্মত্ত এই কথার টানে। কিন্তু আমরা তার কাছে আবার যাবো আরো কিছু পরে। সে থাকুক নদীর পাড়ে বাংলাবাড়িতে শেষরাতের আসরে সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টরের কেয়ারটেকার সোলেমানের সঙ্গে গল্পকথায়। দেশভাগের উন্মত্তকালে মকবুলের বাবা মইনুল হোসেন মোক্তার আধকোশার ঘূর্ণিজলে প্রাণ দেয় – আত্মহত্যা কিংবা দুর্ঘটনা, এখনো তার নির্ণয় নাই মকবুলের কাছে। সাইদুর রহমানের অতিথি হয়ে আধকোশার পাড়ে এই বাংলাবাড়িতে মকবুল যতই গল্পের আসরে জমিয়ে বসুক কি সন্ধ্যাকালে হুইস্কির গেলাশ হাতে তলিয়ে যাক সময় বিভ্রমে, তার মনের মধ্যে সারাক্ষণ আধকোশার বুকে ঘূর্ণি ওঠে আর একটি লাশ ভেসে যায় – তার বাবার লাশ! কিন্তু এ সকল আবার আমরা বলবো। আপাতত থাক। আরো একজন এই শেষ নিশীথে থুমো হয়ে বসে থাকুক রেললাইনের পাড়ে কন্ট্রাক্টরের জিপের ভেতরে। হাফেজ আবুল কাশেম বলরামপুরী! গভীর নিশীথে কন্ট্রাক্টর সাহেবের জরুরি ফোন পেয়ে সোলেমান তাকে এনে জিপে মওজুদ করে রেখেছে। এখনো অর্ডার হয় নাই হুজুরের তাকে হাজির করার। সোলেমান অনুমান করে, এত রাতে হাফেজকে তলব করার একটাই কারণ – কুসমির ব্যাপারে কিছু একটা আজ রাতেই ঘটাবেন তার মনিব সাইদুর রহমান। চাইকি, এই নিশীথে নিকাও হয়ে যেতে পারে হিন্দুর বিধবা যুবতী কুসমির। কার সঙ্গে? আর কার? সাইদুর রহমান কন্ট্রাক্টর ছাড়া পাত্র আর কাউকে তো চোখে পড়ে না সোলেমানের। কিন্তু এ-কথা ভাবতেও তার শরীর শিউরে ওঠে আতংকে কি কুসমির শরীর-কল্পনায়, কোনটা যে সোলেমান ঠাহর পায় না। কিন্তু ঘড়িয়াল সে। পুরুষ তো বটেই। কুসমির কল্পনায় শরীর তারও গরম হয়। কিন্তু মনিবের চোখ সেখানে! অতএব, নিজের ভেতরটাকে কব্জায় রাখতে সে বাংলাবাড়িতে এসে গল্প জুড়ে দিয়েছে। হাতের মুঠোয় মোবাইল। কখন যে মনিবের ডাক ঝনাৎ করে বেজে ওঠে, ঠিক কী! কিন্তু এ সকল বহু পরের কথা।

এহেন দশায় আপাতত তাকে ছেড়ে আমরা মন্মথ দারোগার কাছে যাই সাতচল্লিশের সেইকালে যখন সে হাকিমের বাংলো বারান্দায় দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে। আসা তার হয়েছিল হরিষালে স্বাধীন রাজ্যের রাজা হিসেবে নিজেকে ঘোষণাকারী ওয়াহেদ ডাক্তারের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযান চালাবার হুকুম নিতে, এর মধ্যে হাকিম সাহেব এক নতুন কথা তুলে বসেছেন – শহরে দাঙ্গার সম্ভাবনা! এ বিষয়ে তার বিন্দুবিসর্গ জানা নাই। গতকালও অর্জুনের চায়ের দোকানে দেখা গেছে ভূপতি রাজেশ ক্ষিতীন এরা সবাই আজিজ মিয়াদের সঙ্গে আড্ডা মারছে। সন্ধ্যাকালে ঘোড়া দাবড়াতে নিত্যকারের মতো বেরিয়েছিল মন্মথ দারোগা, নিজের চোখেই ওদের আড্ডা সে দেখেছে। দাঙ্গার ব্যাপার হলে তো মুসলমান আজিজ আর হিন্দু ভূপতি এ দুটোই আগে লাফিয়ে উঠতো। কিন্তু সেটাই বা কেমন কথা! দুজনেই এক আখড়ায় কুস্তি করে, আর কুস্তির ওস্তাদ যে থানার রামখিলাওন সিপাহি, সেও তো গত বিকালবেলা থানার পেছনে বসে তাদের সঙ্গে এক থালায় ছাতু ডলে খেয়েছে, কোয়ার্টারে যেতে যেতে এটাও সে নিজের চোখেই দেখেছে। না, হাকিম সাহেবের কাছে খবরটা ভুল এসেছে বলেই সন্দেহ করে মন্মথ দারোগা।

ওদিকে, মন্মথ দারোগার সাথে কথা বলতে বলতে পুরনো বেতের চেয়ারে বসা হাকিম নেয়ামতউল্লাহ্ ছারপোকার বাঘা কামড়ের পর কামড়ে অস্থির! পাকিস্তান পড়ে থাক, আর শহরের হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা লাগবার পরিস্থিতি যা হয় হোক, দৌড়ে তিনি দোতলায় উঠে যান পশ্চাৎদেশে ছারপোকা কামড়ের জ্বলুনিটা  থামাতে। ছারপোকাও যে এমন বিষ ঢালতে পারে নেয়ামতউল্লাহ্র আগে জানা ছিল না। তিনি দোতলায় উঠে একটানে কাপড় খুলে উলঙ্গ পশ্চাৎ ক্ষতবিক্ষত করে চলেন নখের অাঁচড়ে। তাতেও কি শান্তি আসে! যত খামচান ততই যেন জ্বলুনিটা আরো বেড়ে যায়। অচিরে তিনি উন্মত্তের মতো আর্দালি বশিরকে ষাঁড়ের চেল্লানি তুলে ডাকতে থাকেন। সমুখে সাক্ষাৎ যম মন্মথ দারোগা, ওপর থেকে হুজুরের প্রাণঘাতী ডাক, হুড়মুড় করে বশির দৌড় লাগায়। সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠেই তার চক্ষুস্থির! জীবনে সে এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে নাই, দুঃস্বপ্নেও এমন দৃশ্য কখনো তার দেখা হয় নাই – বহু হাকিমের সে আর্দালি ছিল, কিন্তু কোনো হাকিমেরই নগ্ন নিতম্ব দর্শন তার ভাগ্যে ঘটে নাই। তদুপরি অকুস্থলটি নখের অাঁচড়ে ফালা ফালা, রক্তমাখা! এ ঘটনা কী করে ঘটলো তার বোধে আসে না। ছারপোকা সম্পর্কে তার ধারণা মোটে নাই, কারণ হাকিমের এ-চেয়ারে বসার অভিজ্ঞতা তার নাই। কী কর্তব্য নির্ধারণ করতে না পেরে বশির হতভম্ব হয়ে পড়ে। – চুন হলুদ! চুন হলুদ! হাকিমের চিৎকারে তার সম্বিত ফেরে। – এক দন্ড! এক দন্ড অপেক্ষা করেন, ছার! বলে সে হাকিম সাহেবকে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তারপর দৌড়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচের তলায় সুড়কির পথ ধরে ছুটতে ছুটতে রসুইখানায় সে যায়।

হাকিমের বাংলোর পেছনে আম জাম বাবলা আর নিমের গাছ, তারই ভেতর দিয়ে পথ, পথের শেষে বড় একটা টিনের চালাঘরে রসুইখানা। সেখানে বারান্দায় থেবড়ে বসে গোপালের মা রুই মাছের গাদা পেটি বঁটির মুখে আলাদা করছিল। হরেনমাঝি আজ সকালে আধকোশা থেকে শেষরাতের ধরা সাড়ে তিন সেরি এক রুই মাছ নামিয়ে দিয়ে গেছে। বিধবা মানুষ, নিরামিষ ছাড়া বিধবার কোনো ব্যঞ্জন নাই, কিন্তু গোপালের মার মাছ চলে, শুধু মাছ, মাংসটা তার রুচিতে সয় না, মাংস রান্নার ঝাঁজও তার সহ্য হয় না। ওয়াক ওঠে! মাংসকে যে বুড়া বাবুর্চি গোশত বলে, সেই শব্দটাও তার উচ্চারণে আসে না! হাকিমের রসুইখানায় গোপালের মা শুধু মাছ আর সবজি রাঁধে, মাংস রান্নার ভিন্ন বাবুর্চি – সফেদ মিয়া। কিন্তু এ-মিয়ার বড় ডাঁট, হবেই তো! ইংরেজি খানা মোগলাই খানা তাকে ছাড়া হয় না।

এই সেদিনও ছিল ব্রিটিশ আমল, ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, জলেশ্বরী তখন সয়লাব গোরা সৈন্যে। মাঝে মাঝেই তাদের আড্ডা বসতো মহকুমা হাকিমের বাংলোয়। মানুষেরা তখন যুদ্ধকালের নিষ্প্রদীপ শহরে নিজ নিজ ঘরে নিঃশ্বাস রুদ্ধ করে সংসার করছে। রেশনের চাল প্রয়োজনের পক্ষে অপ্রতুল, চালও সেদ্ধ হতে না হতেই তরল বিষ্ঠার রূপ নেয়, প্রেতলোকের দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে, ক্ষুধা তখন জীবের এক অভিশাপ বলে মানুষ দেখতে পায়, তবু, তবুও সেই তরল দুর্গন্ধ ভাতের লেই মুঠোয় তুলে মুখে ঠেলে দেয়া। বস্ত্রও বিরল। রেশনে বস্ত্রের থান মাড়োয়ারীর দোকানে আসে কর্কশ এবং এক রঙা, ম্যাড়মেড়ে হলুদ ছোপ ধরা শাদা। নিষ্প্রদীপ কালে শাদাই সরকার অনুমোদিত, কারণ অাঁধারে ঠাহর হয় – ওটা কে যায়! এই যখন জীবনধারা সেই যুদ্ধকালে, জলেশ্বরী যখন জাপানি হামলার মুখে দিবসরাত্রি থরোথর, তখন মহকুমা হাকিমের বাংলোয় জমে ওঠে আসর। নিষ্প্রদীপ, তাই হাকিমের বাংলোতেও আলো নাই, কিন্তু যুদ্ধভীতির লেশমাত্র নাই সেখানে। পথচারীরা হাসির হুল্লোড় শোনে, তাদের খিন্ন জীবনের ওপর দিয়ে বহে যায় ইংরেজি আর হিন্দি কথার অচিন তোড়।  লে আও শরাব, লে আও কাবাব, জাপান কা গাঁড় মে বাম্বু! ইয়ে বাবা আংরেজকা লড়াই হ্যায় লড়াই!

তখন সে লড়াইয়ের কাপ্তানদের পোলাও কোরমা মুরগি রেঁধে খাওয়াতো কে? এই সফেদ মিয়া। বলতে কী, গায়ের রংটা তার দুধে ধোয়া বলেই না বাপমায়ে সফেদ নামটা রেখেছিল! তবে, এ-নামটা নিয়ে বাজারে পুরনো মানুষদের মুখে এখনো মাঝেমধ্যে মুখরোচক একটা গল্প শোনা যায়। পাটের কারবারি জেমস কোম্পানির ম্যানেজার ছিল এক সাহেব, মরিসন সাহেব, সেই মরিসন সাহেবের সাথে তার কাজের বেটির মেলামেশার গর্ভে নাকি সফেদের পয়দা! প্রমাণ হিসেবে সফেদের ওই গায়ের রংটা ছাড়া আর কিছু নাই। সফেদের মা জেমস কোম্পানির ম্যানেজারের বাসায় কাজ করতো কি করতো না, এটাও এখন বিস্মরণের অতলে, তবু প্রাচীন গুজবটা এখনো উঠে পড়ে, বিশেষ করে সফেদ যখন বাজারি আড্ডায় ইংরেজের গুণগান গেয়ে ওঠে। পাকিস্তান হবার ঘোষণা আষাঢ় মাসের ঘোর বৃষ্টিকালে যখন জলেশ্বরীতে শোনা যায় তখন সফেদ বাবুর্চিকে কী ভূতে পায়, বাজারের আড্ডায় সে বলে – ইংরাজ তো হটাইলেন, ইংরাজের মতোন মানুষ কি আর পামো? হাত ভরি বকশিশ দিছে। খানা খায়া খুশি হয়া মোক হাত ধরি হ্যানশেক করিছে। আর এলায় ভারতবাসী যারা মটুক মাথায় পিন্দিলো তারায় পারিলে হামাকে শুয়ারের বাচ্চা বলি ডাকে। নত্তুন যে হাকিম আসিছে, নামখান বা কী তার –  নেয়ামতউল্লাহ্, শুনিলে চাপরাশি বলিয়া মনোতে খায়! তার এ-হুতাশ শুনে প্রাচীন লোকেরা বলাবলি করে, ইংরাজ যে উয়ার বাপ লাগে, বাপের কথা শতখান করি সে না বলিবে তো কাঁই বলিবে!

আমরা এসব কথায় কান দেবো না। আমরা দেখি সফেদ মিয়ার নাম সফেদ হলে কী হয়, মন তার পরিষ্কার নয়, সকল সময় চুরির ধান্দা তার। আজ পনেরো বছরের ওপর সে হাকিমের রসুইখানায় বহাল, চাকর-বাকর আর্দালি সিপাই কারো কাছে অজানা নাই যে বাজারের পয়সা চুরির ধাত তার। কেবল কি এই চুরি, হাকিমের এই একখানা আলোয়ান হারানি গেলো, রোইদে মেলি দেওয়া হইছিল আশ্বিন আসি যায় দেখি, এলা উধাও! দ্যাখো যায়া, কোন্ ব্যাপারীর কাছে বা বেচি দিছে! নেয়ামতউল্লাহ্র আগে যে মিস্টার বসুরায় হাকিম আসিছিল, তার শখের হাত-আয়নাটা পাওয়া যাচ্ছে না? খোঁজ করে দ্যাখো, সফেদের ঘরে গেলেই পাবে। চোরের চোর! তার ওপরে এই এক কীর্তি তার – নিত্যদিনের ভোজন শেষে হাঁড়ি থেকেও যা বাঁচে সমুদয় সে পোঁটলা বেঁধে বাড়ি নিয়ে যায়। এ নিয়ে গোপালের মা যদি উচ্চবাচ্য করে – পাপ হইবে তোমার! তো সফেদ মিয়াও ছাড়বার পাত্র নয়, সে বলে, আর তুই যে হিন্দুর ঘরের বিদ্বা মানুষ, চাকুমচুকুম করি মাছ খাইস, তার বেলা!

গোপালের মার নির্মল জবাব – কোনকালে সোয়ামি গেইছে, তার সাথে সাথে কি নদীর মাছও চিতায় উঠি পড়িছে যে মাছ না খামো! ইদানীং সফেদ মিয়া বলে, খাবুই তো! মাছ কেনে না খাবু তুই! হিন্দুর রাজত্ব শ্যাষ হয়া এলা মোছলমানের রাজত্ব যে আসি গেইছে! পাকিস্তান! হেথায় এলা মোছলমানেরই চলন চলিবে। মোছলমানের বিদ্বার কাছে বাছবিচার নাই, সমুদয় তারা খায়!  নিকাও বসে! তোর তিনকাল গেইলেও বেটিছাওয়ার শাউয়া বলি কথা! বুড়িকালেও হাঁ করি থাকে! নিকা করিবার টাইম তোর যায় নাই। এলা পাকিস্তানের দিন, হিন্দুরও নিকা এলা চলিবে। করি ফালা!  – আউ আউ ছি ছি! নিকার কথা শুনে আঁতকে উঠে গোপালের মা মুখে ছি-ছি করে ওঠে বটে, কিন্তু এর অধিক ভাষা তার ফোটে না। সফেদ মিয়াকে সে বঁটি হাতে ভয় দেখায় বটে, কিন্তু বাজুতে সে জোর পায় না। হাত অবসন্ন হয়ে কোলের কাছে ফিরে আসে।

গোপালের মা একটা আতান্তরে পড়ে যায়। অনেক ভেবে দেখে সে। হাঁ, পাকিস্তান হয়েছে, ঠিক! তাই বলে এখানে হিন্দুর সব এখন থেকে অচল? নিজে সে হিন্দুর বিধবা হয়েও মাছ খায়, তাই বলে যাওয়া-আসার পথে কালীবাড়িতে নমো করা তো সে ত্যাগ করে নাই! পূজার মন্ডপে হাত বাড়িয়ে প্রসাদি ফুল নিতে তো তার হাত নুলো হয়ে যায় নাই! খুব একটা ধন্দে পড়ে মনটা আছড়াতে থাকে গোপালের মার। কাছারির মাঠে ব্রিটিশের নিশান নামিয়ে পাকিস্তানের নিশান ওঠানোর এক মাসও হয় নাই, এর মধ্যেই সফেদ মিয়া ঘুরে ঘুরেই তাকে বলতে শুরু করেছে, হরিষালের ওপারেই হিন্দুস্থান! চলি যাইস না কেনে? আসলে, সফেদ মিয়ার চুরির হাতটা এই গোপালের মার জন্যেই যা কিছু বাধা পায়। তার রান্নার হাতটা ভালো বলেই হাকিম সাহেবদের কাছে সে গোপালের মার নামে কূটকচালি করেও এতদিন জুৎ করতে পারে নাই। কিন্তু এখন পাকিস্তান, জিন্না এখন সফেদ মিয়ার রক্তের আগুন, যেন পাকিস্তানের লড়কে লেঙ্গে সিপাই সে একজন। এখনই তো সুযোগ গোপালের মার দাঁত ভাঙার। তাই হিন্দুস্থানে চলে যাবার তাড়া সে গোপালের মাকে নিত্য লাগায়। তবে হাঁ, এ-কথার একটা জবাব আছে বটে। জবাবটা দেয়ও গোপালের মা – হয়! হয়! মুই গেইলে চোরের চোর তোমার ভান্ডার লুটিবার সুবিদা হয়! পাকিস্তান কইরছেন এই কারণে! মোকে হিন্দুস্থান দেখান এই কারণে!

আজ সকালে রসুইখানার বারান্দায় বসে নধর কার্তিকের মতো রুই মাছটা কাটতে কাটতে গোপালের মা মনে মনে পদ আন্দাজ করে নিচ্ছিলো – এই দু’খানা ভাজা হবে, এই ক’খানায় কালিয়া, আর মাথিটা – মাছের মাথাকে গোপালের মা আহ্লাদ করে মাথি বলে – এটা আস্তই মুগডালে ঘন করে করবে সে। জলেশ্বরীর মানুষ জীবনে বিলাতি বেগুন দ্যাখে নাই, এ অঞ্চলে তার চাষ নাই, তবে অধিক শীতকালে বিহারি কাত্যায়নীর বাপ যে হাটের দিনে শৌখিন আনাজ সাজিয়ে বসে, তার কাছে বিলাতি বেগুন কখনো বা পাওয়া যায়। এখনো শীত পড়ে নাই, তবে রংপুর থেকে রসগোল্লার মতো টমাটোর চালান তার কাছে আসে। রংপুরে কৃষি বিভাগের আদর্শ খামার থেকে নাকি অকালের টমেটো কয়েকটা কাত্যায়নীর বাপের কাছে এসেছে। আরে বাপ্, দাম কী! এক হালির দাম আট আনা! কাঁই কিনিবে? তবে, হাকিমের বাড়িতে ভেট পাঠিয়েছে ক্যাত্যায়নীর বাপ। সেই বিলাতি বেগুন কি সাহেবরা যাকে কয় টমাটু, তাই দিয়ে আলুর সাথে মাছের কালিয়াটা করবে সে। মাছটা দেখেই হাকিম সাহেব নিজে এই ফরমাশ করেছেন সেই ভোর সকালেই। গোপালের মা মাছ কোটে আর মনে মনে নিজের সাথেই কথা বলে, কালিয়া না হয় হলো, ঘন মুগডালে মাথিটা যে সে চড়াবে, মাথির ওই একটুখানি হয়তো ভেঙে নেবেন হাকিম সাহেব, ঘিলুর ওই একটুখানি পাতে তুলবেন, কিন্তু ফুলকোটা নেবেন আস্তই। মাছের ফুলকো তিনি বড় ভালোবাসেন, চুষে চুষে ছিবড়ে করে খান। তবে মাছের লেজটা তিনি ভালোবাসেন না, এটা রান্না হবে কালিয়ার সাথেই, আর এটি ভোগে যাবে বশিরের, সেই সাথে মাছের মাথিটারও যতটুকু বাঁচে।

বশিরকে খুব মায়া করে গোপালের মা। সকলের খাওয়া শেষে বশির যখন রসুইখানার বারান্দায় পাত পেড়ে বসে, গোপালের মা সমুখে বসে তাকে খাওয়ায়। চোখ ভরে তার খাওয়া দেখে সে। হাঁ, বশিরটা অবিকল তার গোপালের মতোই দেখতে। হাঁ, গোপাল বেঁচে থাকলে এতদিনে বশিরের মতোই ডাগরটি হতো। এমনই জোয়ান হতো আর ভাত খেতো এমনটাই থালার ওপর ভাতের পাহাড় ভেঙে। গোপাল বেঁচে থাকলে বশিরের জায়গায় সে-ই হতো হাকিমের খাস আর্দালি। মাছ কাটতে কাটতে বুক ভেঙে দীর্ঘশ্বাস পড়ে গোপালের মার। বুক ভাঙি এই যে শ্বাসখান ঠেলি ঠেলি ওঠে, অভাগী মুই চিতায় না চড়ি পজ্জন্ত আর যাবার নয়! এই দীর্ঘশ্বাসটিও বড় ভালো লাগে গোপালের মার নিজেরই। যেন এই শ্বাসের ভেতরেই গোপালকে সে খুঁজে পায়। শ্বাস তো বুকের বাতাস। বুকের ভেতর থেকে বের হয়। বুকের ধন যদি ভগমানে নিয়া গেইছে তো তার শ্বাসখান জননীর বুকে রাখি গেইছে।

ধারালো বঁটির মুখে গোপালের মার হাত দুখানা মাছের তাজা রক্তে রাঙা। ছুটে এসে বশির তার সমুখে থমকে দাঁড়ায়। মাছের গোটা গোটা খন্ড দেখে মোহিত হয়ে যায় সে। এখন দ্যাখো রক্তমাখা, ঝোলের ভেতরে যখন সাঁতরাবে এই মাছ তখন দেখো এর সোনার বরণ! জিভে পানি এসে যায় তার। হাঁ, আজ একটা ভোজনই হবে তার। কিন্তু মনের মধ্যে সে-কথা রেখে সে হাসতে হাসতে বলে, মাছের অক্ত বা কতখান্! দেখি আইসো হাকিমের পাছার অক্তে পায়জামা ভাসি যায়। কথাটা ঠিক ঠাহর করে ওঠে না গোপালের মা, হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সে বশিরের দিকে। বলে, অক্ত! হাকিমের পায়জামায়? – হয়! হয়! চুন হলুদ গরম করি দেও দিদি! অতঃপর বশির বিশদ করে বলে ব্যাপারটা। – কবার না পাও, ক্যামনে পাছার হাল এমন হইলো!

এ-কথার বিপরীতে গোপালের মার কথা শুনে হাঁ হয়ে যায় বশির। মাছের টুকরোগুলো খাঞ্চায় সাজিয়ে রাখতে রাখতে গোপালের মা ধীরস্থির কণ্ঠে বলে, জ্বইলবার দে! পাকিস্তানের রব তুলি দ্যাশ দুই টুকরা কইরছে এই মোছলমানের দল! ইয়ার শাস্তি ভগমানে দিবার ধইরছে! অন্য কেউ হলে বশির এ-কথার জবাব লাথি ঝেড়ে দিতো! কিন্তু গোপালের মা বলে কথা! রান্নার হাত, বিশেষ করে মাছ রান্নার হাত তার এক নম্বর। সেই কোনকালে বিধবা হয়েছে, কোনকালে এক বিজন সন্ধ্যায় সাপের দংশনে গোপাল তার চিতায় উঠেছে, সে যে সেই কোনকাল থেকে হাকিমের বাংলোয় রসুইখানায় রান্নাবাড়ার কাজে লেগেছে তারও কোনো নির্ণয় নাই। তবে যেদিন থেকে বশির হাকিমের বাংলোয় আর্দালি হয়ে ঢুকেছে, সেই প্রথম দিন থেকেই মুসলমানের ছেলে তাকে নিজ গর্ভের বেটার মতো দেখে আসছে হিন্দুর এই বিধবা। না, কোনোকালে হিন্দু-মুসলমান নিয়ে একটি কথাও তার মুখে বশির শোনে নাই। অধিক কী, বাবা কুতুবুদ্দিনের মাজারে এই বশিরের হাত ধরেই কতদিন সে সিন্নি চড়াতে গেছে। – বাপ মোর, তুই সাথে থাক। গোপাল থাকিলে গোপালকে ধরি আসিতোম! গোপালের সেই যে সর্প দংশন হয়, বাবার থানে ধরনা দিছিনু, হইলে কী হয়, কাল সর্প বলি কথা, উপরে যাঁই বসি আছে, মানুষ সৃজন করিছে যাঁই, তার ইচ্ছায় ভগমানে টানি নিলো মোর গোপাল। ফির সেই উপরআলার দয়াও মুই দেখিনু – তোকে আনি দিলে রে বছির। চল্, যায়া বাবার কাছে কান্দাকাটি করি আসি।

বশির হতবাক হয়ে যায় গোপালের মার কথা শুনে। হাকিমের ঘটনা শুনে কোথায় সে ব্যস্ত হয়ে উঠে চুন হলুদের জোগাড় করবে, তা নয়! তার বদলে নির্বিকার মুখে এই কথা – জ্বইলবার দে! দ্যাশ দুই টুকরা কইরছে! বিষয়টার তল খুঁজে পায় না বশির। একটা দেশ কী করে দুটুকরো হয়ে যায়? মাটি তো সেই মাটিই আছে। তবে? হরিষালের পরে নাকি এখন হিন্দুস্থান। তা হলেই বা হিন্দুস্থান, মাটির রং তো পালটায় নাই! আকাশ তো দুই ভাগ হয়ে যায় নাই। আধকোশা যে উত্তর থেকে নেমে এসেছে জলেশ্বরীতে, সেই উত্তর দেশ নাকি এখন আর আমাদের নয়, এখন সেটি হিন্দুস্থান! কিন্তু পানির রং তো সেই একই। নদী তো ভিন্ন রঙের পানি ধরে জলেশ্বরীতে এখনো আসে নাই। সেই একই পানি। একই ঢল। একই শীতল। তবে?

তবে এ কোন্ কথা আজ গোপালের মার মুখে? বশিরকে গোপালের মা কতদিন বলেছে, মোর হাউস হয় তুই মোকে দিদি না বলিয়া মাও বলি বোলাইস। – আরে ধুরো! মা কি যাকে তাকে কওয়া যায়? – ক্যান না যায়? হাঁ, বশিরের মনে পড়ে যায়, একবার তখন হিন্দু-মুসলমানের কথাটা তুলেছিল এই হিন্দুর বিধবা। বলেছিল, মুই হিন্দু বলিয়া আর তুই মোছলমান বলিয়া মাও বলিতে আটকায় তোর? তখন বশির বলেছিল, জোর মাথা নেড়ে, না, না, এগুলা কোনো কথা নয়! – তয়? তোর মায়ের গর্ভে যদি গোপাল আসিতো আর তুই মোর গর্ভে! সন্তান সন্তানে রে! তার হিন্দু-মোছলমান নাই। সক্কলে সমান।

হাঁ, বশির তখন মা বলে হঠাৎ এই হিন্দু বিধবাকে একবার ডেকে উঠেছিল। তবে ধমকের স্বরে! – চুপ যা, মা! চুপ যা! মোর মরা মায়ের কথা মনে না করাও। বড় দুঃখে তাঁই কববরে গেইছে। মুই অধম তার সন্তান যুদ্ধের বাজারে তাকে না খায়া মরিতে দেখিছোঁ, মোকে এতিম করিয়া বালক হামাকে দুনিয়ায় রাখি গেইছে। সক্কলে যদি সমান তবে এই ভুখের কাছে, মা, ভোক্ নাগিলে ইয়ার কোনো হিন্দু-মোছলমান নাই। r (চলবে)