নবরাজের অন্তহীন রহস্য

সাম্প্রতিক সময়ে নবীন শিল্পীদের মধ্যে বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে শিল্পী নবরাজ রায়ের শিল্পকর্ম। ধানমণ্ডির অলিয়ঁস ফ্রঁসেসের লা গ্যালারিতে কিছুদিন আগে তাঁর দর্শকনন্দিত প্রথম একক চিত্র-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীর নাম ছিল ‘দি রিফ্লেকশন অফ এন্ডলেস মিস্ট্রি’, বাংলায় যার অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘অন্তহীন রহস্যের প্রতিফলন’।

পঁচিশটি চিত্রকর্ম ও তিনটি ভাস্কর্য যে রহস্যগল্প আঁকে মনের দেয়ালে শিল্পীর বক্তব্যে তা আরো প্রাঞ্জল হয়ে একটু একটু করে জট খুলতে থাকে আর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় দৃশ্য। আংশিক বিমূর্ত চিত্রকর্মগুলি নিশ্চিতভাবে শিল্পীর একটি নিয়মিত শিল্পযাত্রা উপস্থাপন করে। সেই যাত্রার সঙ্গী হয়েছে তাঁর ইচ্ছা, আকুতি, শংকা, চিন্তা, ভালো লাগার অনুভূতি এবং নানা রঙে তা কাগজে বা কাপড়ের ক্যানভাসে প্রতিফলিত হয়েছে চমৎকার চিত্ররূপে। মানুষের মনোজগতে প্রতিনিয়ত যে-চিন্তার আবেশ তৈরি হতে থাকে তা এক রহস্যময় গতিপথে চলে। অজানা সেই পথে ঘুরে বেড়ায় মানুষ, তৈরি করে এক নতুন জগৎ আর শিল্প কখনোবা রং, আকার ও গল্প খুঁজে পায়। দুর্ভেদ্য সেই সব মানসিক প্রক্রিয়া থেকে কিছুটা যখন ক্যানভাসে দৃশ্যমান হয় তখন তাকে হয়তো প্রতিফলনই বলা যায়। নবরাজের চিত্রগুলি তাঁর মনের অপূর্ব শৈল্পিক প্রতিফলন। ক্যান্দিনস্কির বিমূর্ততা আর ডাচ শিল্পী মন্দ্রিয়ানের

জ্যামিতিক নিসর্গতা পেরিয়ে এসে নবরাজের উপস্থাপনা একজন প্রশিক্ষিত শিল্পীর পরিচয় তুলে ধরে।

শিল্পী নবরাজ রায় তাঁর শিল্পশিক্ষা শুরু করেন ঢাকার অন্যতম বেসরকারি শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউডা চারুকলায়। অর্জন করলেও, মনের ভেতরে চিন্তাকে হবিতে উপস্থাপনের উপায় তখনো খুঁজে চলেছেন। সেখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর তাঁর সুযোগ ঘটে শিল্পী, শিল্প-শিক্ষক, লোকশিল্প গবেষক অধ্যাপক নিসার হোসেনের সান্নিধ্য লাভের। তাঁর সাহচর্যে লোকশিল্পের অন্যতম নিদর্শন মৃৎশিল্প সংগ্রহ করতে শুরু করেন নবরাজ। বৈচিত্র্যময় লোকশিল্পের এই ধারা চিরদিনই ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। সহজলভ্য উপকরণ এবং স্থানীয় চাহিদার ওপর নির্ভর করে এর রূপ তৈরি হয়। তাই সংগ্রাহক নবরাজ তাঁর চিরাচরিত বাংলাকে পরিবর্তিত হতে দেখেন মেলায়-পাওয়া শিল্পবস্তুর পরিবর্তনশীল অবয়বে।

 ভারতে স্নাতকোত্তর পাঠকালে তাঁর এই চিন্তাগুলি একটি চেহারা পেল বিমূর্ততার হাত ধরে। মনের অনুভূতিগুলিকে বিমূর্ত ঢংয়ে যেন আঁকতে শুরু করলেন শিল্পী। আইসিসিআর স্কলারশিপ নিয়ে সুযোগ পান কলকাতায় পড়াশোনা করার। সুযোগ হয় সেখানকার শিল্পচর্চার সঙ্গে সংযোগ ঘটানোর। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাঁকে শিখিয়েছেন কি করে চিন্তাকে মুক্ত করতে হয় রঙের ছোঁয়ায়। বিশেষ করে অধ্যাপক নিখিলরঞ্জন পাল নবরাজের পথপ্রদর্শক হন। গুরু সহজতর উপায় বলেন নবরাজকে। তিনি বলেন, ভাবনাগুলিকে কি করে উপস্থাপন করবে তা না ভেবে বরং সাবলীলভাবে যেমন আসে তেমনি আঁকতে শুরু করো। তখন থেকে নবরাজ তাঁর আধাবিমূর্ত স্টাইল নির্মাণ করেন নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য।

২০১৬ সালে তিনি এমএফএ শেষে দেশে ফিরে আসেন এবং স্বাধীনভাবে নিয়মিত শিল্পচর্চা শুরু করেন। নবরাজ ২০১৮ সালে ‘বার্জার তরুণ শিল্পী পুরস্কার’ পান। ২০২০ সালে লাভ করেন ‘এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন পুরস্কার’।

শিল্পীর বিমূর্ত ঢংয়ে রঙের ব্যবহার কখনো কখনো ল্যান্ডস্কেপের অনুভূতি দেয় আবার সেই বিমূর্ততা কেটে গল্প বলতে বেরিয়ে আসে বাংলার মৃৎশিল্পের বিভিন্ন মোটিফ। লোকশিল্পের মোটিফের ব্যবহার বাংলাদেশি শিল্পচর্চায় নতুন নয়, আবার নৈসর্গিকতাকে বিমূর্ততায় উপস্থাপনও নতুন নয়; তবু নবরাজের উপস্থাপনের কৌশল তাঁকে আলাদা করে অন্য শিল্পীদের থেকে। এর একটি চমৎকার দিক হলো বয়নবিন্যাস তথা টেক্সচারের ব্যবহার। শিল্পী নৈপুণ্যের সঙ্গে এমনভাবে তা ব্যবহার করেছেন যা গভীরতা এনে দেয় শিল্পকর্মে।

প্রকৃতির নিয়মে সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে পরিবর্তিত গ্রামবাংলার গল্পগুলি বলতে শুধু বিষয় নির্মাণেই নয়, বরং উপকরণ নির্বাচনেও শিল্পী ফিরে গেছেন আদিতে। অ্যাক্রিলিক ও জলরঙের সঙ্গে ব্যবহার করেছেন খনিজ ও ভেষজ রঙের গুঁড়ো, যা ব্যবহৃত হতো লৌকিক বাংলার শিল্পকর্মে। মোটিফ লোকশিল্পের হলেও উপস্থাপনকৌশলে পাশ্চাত্য ধারার ব্যবহার আবারও সেই সংস্কৃতির পরিবর্তনের চলমান প্রক্রিয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলিতে নানা বিষয়বস্তু দেখা যায়। মনোযোগ দিয়ে দেখলে খুঁজে পাওয়া যায় শহরের অস্থিরতা, মানুষের ভিড়, দূষণের কালো নদীর পানি। ‘ট্রান্সফর্মিং ল্যান্ডস্কেপ’ নামের অ্যাক্রিলিক রঙে ক্যানভাসে আঁকা শিল্পকর্মে তিনি যেন নদীর দুপাশে ক্রমশ বদলে যেতে থাকা দৃশ্য দেখে যে অনুভূতি হয় তা-ই তুলে ধরেছেন। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ক্রমাগত পরিবর্তনের পটভূমিতে আঁকা আর ‘স্ট্রাগল’ সিরিজের চিত্রগুলিতে তিনি যেন গ্রামবাংলার শ্রমজীবী মানুষের গল্পকথা বিবৃত করেছেন। কৃষক – সে যত বিমূর্ত হোক না কেন – দেশীয় দর্শকের চোখে ধরা দেয় সেই পরিচিত অবয়ব। নান্দনিক দক্ষতায় নবরাজ এঁকেছেন ফেরিওয়ালা, যে কাঁধে নিয়ে ফেরি করে ফেরে এদেশের গ্রামীণ সমাজের নির্মল আনন্দদায়ক নানা বস্তু। পরিবর্তনশীলতার এই সীমাহীন রহস্যরূপ শিল্পীর মনে যে ভাবের জন্ম দেয় তার প্রতিচ্ছবিই প্রকাশিত হয়েছে নবরাজের চিত্রকর্মে। প্রাণবন্ত রং, কখনো জ্যামিতিক আবার কখনো অর্গানিক রেখার ব্যবহার, বিভিন্ন টেক্সচার চিত্রকর্মগুলিকে ছন্দময় ও দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। 

মূলত তিনটি সিরিজে ভাগ করা যেতে পারে প্রদর্শনীর শিল্পকর্মগুলিকে।

শিল্পীর ভাষায়, শৈশব থেকে নান্দনিকতার ভিন্নতা তাঁকে আকর্ষণ করে আর তাই ‘একা আকৃতির’ ভিন্নতা তাঁকে সৃষ্টি করতে অনুপ্রাণিত করে। বৈচিত্র্যময় মৃৎশিল্প তাই বারবার তাঁকে টানে। যেহেতু মোটিফগুলির রূপ দেশীয় নিজস্বতাকে প্রকাশ করতে যথার্থ, তাই প্রতীকী ব্যবহারে নবরাজ একেই আপন করেছেন বারবার। নবরাজের বক্তব্যের রূপায়ণ তাঁর চিত্রে মোটিফগুলির ব্যবহারে যেমন দেখতে পাওয়া যায়, তেমনি তাঁর ভাস্কর্য নির্মাণেও দেখতে পাই। কোমল গ্রামের ধীরে ধীরে ইস্পাতকঠিন শহরে রূপান্তরের অনুভূতি শিল্পীকে আলোড়িত করে। তাঁর সে অনুভব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে লোহার পাত দিয়ে নির্মিত তিনটি ভাস্কর্যে। লোকশিল্পের কোমল মাটির তৈরি পুতুলগুলি ইস্পাতকঠিন, কিন্তু নান্দনিক হয়ে ধরা দিয়েছে  নবরাজের হাতে।

বেড়ে ওঠার সময় বিভিন্ন স্থানে থাকার কারণে শহুরে আর গ্রামীণ জীবন দুই-ই চেনা নবরাজের। যদিও তিনি শান্ত বাংলার মানুষ আর প্রান্তরের জয়জয়কার করেছেন, একই সঙ্গে জানান দিয়ে গেছেন তাঁর ওপরে শহুরে সভ্যতার অনস্বীকার্য প্রভাবকেও।

নবরাজের উপকরণ দেশীয় হলেও স্টাইলে বিদেশি প্রভাব ও ঔপনিবেশিক প্রভাবযুক্ত শিক্ষাপদ্ধতির কথা কিঞ্চিৎ হলেও ধরা পড়ে। সব মিলিয়ে লৌকিক জীবনকে বিন্দুমাত্র অস্বীকার না করে অনুভূতি ও নৈসর্গিকতার প্রতি মুগ্ধতা উপস্থাপন করেছেন নবরাজ রায়

তাঁর শিল্পকর্মে – সে-কথা বলা যায়।