প্রকৃতির প্রতিফলন

লেখক: ইব্রাহীম ফাত্তাহ্

শিল্পের সৃজন প্রক্রিয়ার ভেতরে ও বাইরে সবচেয়ে বেশি যা কিছুর প্রয়োগ দেখা যায় – তার মধ্যে প্রকৃতি প্রধান। মানুষ তো প্রকৃতিরই ভূমিপুত্র-ভূমিকন্যা। এই দুইয়ে মিলে শিল্পের রূপায়ণ হয়। সে-সৃজন যথার্থ ও সার্থক হয়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে নিসর্গের মিথস্ক্রিয়ায়। আমরা যদি তাকাই প্রাচ্যের পারস্যে, চীন কিংবা জাপানের চিত্রকলায়, যদি খেয়াল করি কাংড়া নামে ভারতীয় পাহাড়ি অনুচিত্রের দিকে – নিশ্চিত দেখা যাবে এসবে মানুষের সঙ্গে নিসর্গের কি নিবিড় সংযোগ! সেখানে পাশ্চাত্যের নিসর্গশিল্পী কনস্টেবল ও টার্নারের ভূচিত্রে প্রকৃতি ও মানুষ একেবারে সুনির্দিষ্ট। এই ভিন্ন দুটি রূপের দেখা মেলে সমকালীন চারুশিল্পে আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, এসএম সুলতান, সফিউদ্দীন আহমেদ, রশীদ চৌধুরী, কাইয়ুম চৌধুরী এই গুরুশিল্পীদের চিত্রপটে।

জয়নুল নদীকে বলেছেন মাস্টার মশাই, কাইয়ুম বলেছেন – প্রকৃতি আমার প্রথম শিক্ষক। তাঁদের চিত্রকর্মে এমন নিসর্গ আবেশ, প্রকৃতির প্রতি প্রবল অনুরাগ আমরা পেয়েছি। এর ধারাবাহিকতায় আমাদের অনেক তরুণ শিল্পীর চিত্রকর্মেও এমন প্রকৃতিপ্রীতি পাওয়া যায়। এছাড়া চিত্রবিদ্যার পাঠ্যধারায় ইম্প্রেশনিস্ট রীতিতে নিসর্গ-চিত্রাংকনের বিষয়টিও অনেকের মধ্যে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

নবীন শিল্পী সত্যানন্দ পাইক এমনই এক চিত্রকর যিনি নিসর্গের রূপকে নিসর্গবস্তুর সহযোগে বর্ণিল আভায় তুলে ধরেন। বাংলাদেশের দক্ষিণ প্রান্তের জেলা সাতক্ষীরার সুন্দরবনঘেঁষা থানা শ্যামনগরের এক গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব-কৈশোরের দুরন্ত সময়টা এখানেই কেটেছে তাঁর। শিল্পীর মানস গঠনে এ-অঞ্চলের উদার আকাশ, জলমগ্ন মাঠ, বৃক্ষ-মাটি-বনাঞ্চল, কলস্বরা নদী, বালুচর এসবের বড় ভূমিকা রয়েছে।

অনেক শিল্পীর চিত্রপটে প্রকৃতির বিচিত্রতার প্রকাশ ঘটে। সত্যানন্দ তাঁর চিত্রগঠনে আরো বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে বেছে নিয়েছেন বালুমাটি। একে নানা তাপমাত্রায় পুড়িয়ে কিংবা ঝলসে যে রংবদল হয় সেটি হয়ে উঠেছে এই শিল্পীর চিত্র-সৃজনের অন্যতম উপকরণ। বিস্ময়কর হলেও

সত্য যে, প্রাকৃতিক পিগমেন্টের সাহায্যে শিল্পী পঁচিশ ধরনের রঙের বালু তৈরি করতে সমর্থ হয়েছেন! আঠা প্রয়োগে সেই বালু ক্যানভাসে স্থাপন করে ছবি আঁকেন তিনি।

এভাবে স্বকৃত একটি চিত্ররীতি নিয়ে আভির্ভূত হয়েছেন নবীন শিল্পী সত্যানন্দ পাইক। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলায় স্নাতক সত্যানন্দ ২০১৭ সালে স্নাতকোত্তর করেছেন কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তাঁর প্রথম একক চিত্র-প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল কলকাতায়।

‘নিসর্গের শান্ত প্রতিফলন’ শিরোনামে আট দিনব্যাপী তাঁর দ্বিতীয় একক চিত্র-প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হলো ঢাকার ধানমণ্ডির দৃক গ্যালারিতে গত ১১ জুলাই, বুধবার থেকে ১৮ জুলাই ২০১৮ পর্যন্ত। এতে সাম্প্রতিককালে শিল্পীর আঁকা একত্রিশটি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়। এ-প্রদর্শনী বাংলাদেশের শিল্পী ও বোদ্ধাদের কাছে ইতিবাচকভাবেই  সত্যানন্দের পরিচিতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ছেলে সত্যানন্দের চিত্রকর্মে তাঁর এলাকার প্রকৃতি ও পরিবেশের প্রতিকৃতি প্রত্যক্ষ করি আমরা। শিল্পী

প্রকৃতিকে চিত্রিত করেছেন নানা পরিপ্রেক্ষিতে। পাখির চোখে দেখা নদী, নদীর বুকে নৌকা নিয়ে প্রকৃতির ঔদার্যকে আহ্বান করেছেন শিল্পী। সুন্দরবনের নানা গাছপালা, বনের ঘনত্ব নিয়ে কাছে-দূরের আলোছায়াকে কেন্দ্র করে প্রকৃতির মায়াবী রূপ ফুটে উঠেছে কোনো কোনো কাজে। আবার জলমগ্ন এলাকায় কাছাকাছি দু-তিনটি গাছের সখ্য মেলে ধরেছেন শিল্পী। ‘প্রকৃতি’ নামের এই সিরিজের চিত্রগুলোয় শিল্পী জলাভূমি কিংবা নদীসন্নিহিত অঞ্চলের নিসর্গ ও জীবনকে গভীর মমতায় তুলে ধরেছেন।

নদীতীরে রেখাচিত্রের মতো বিন্যস্ত অনেক ডিঙি নৌকা অংকিত চিত্রের নাম রেখেছেন ‘অবসর’। নদীমাতৃক বাংলার যে কোনো নদীর ঘাটে গেলে এ-দৃশ্য দেখা যায়। সাধারণত ঘোর দুপুরে নদীঘাট একটু অবসর থাকে। অলস বসে থাকা নৌকার সারিকে ওপর থেকে দেখলে নৌকার ফর্মের সঙ্গে আয়ত চোখের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।  সেই রূপটি শিল্পী উপলব্ধি করেছেন এবং তুলে ধরেছেন।

সাতক্ষীরার সত্যানন্দের সঙ্গে এ-অঞ্চলের সন্তান অগ্রজ শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীরের প্রকৃতি-দর্শনের অন্ত্যমিল লক্ষ করা যায়। বিষয়গত মিল থাকা সত্ত্বেও জাহাঙ্গীরের নীল-কমলা রঙের আকাশ, নদী আর মাটির পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট রীতির চিত্রকলার বিপরীতে সত্যানন্দ মাটির নানা রঙে কখনো নমিত, কখনো উদ্ভাসিত। আঁকার আকর থেকে গড়ার শ্রমসাধ্য ক্রাফটসম্যানশিপ দিয়ে সত্যানন্দের একেকটি চিত্র নির্মাণ হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বালুমাটির নানা বর্ণিল উপাদান ব্যবহার করে নিজস্ব একটি শিল্পভাষা নির্মাণের প্রয়াস পেয়েছেন শিল্পী। নিসর্গের লীলাময় রূপকে দর্শকের সামনে তুলে আনা, এর সঙ্গে দর্শকের আলাপের জায়গা করে দেওয়া এসব বিষয় মনে রেখে শিল্পী সচেতনভাবেই তাঁর ভূমিকা রেখেছেন।

সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে – এই শ্রমসাধ্য পদ্ধতি কতটুকু টেকসই? শিল্পী সত্যানন্দ আশ্বস্ত করলেন – দুই বছর আগে এই মাধ্যম প্রয়োগে করা তাঁর চিত্রের উজ্জ্বলতা এতটুকু বিবর্ণ হয়নি। শিল্পকে নিজের ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে তাকে গড়েপিটে নিতে দেশি উপাদান ব্যবহার করে রং বানিয়ে ছবি আঁকতেন নড়াইলের এসএম সুলতান। সেই দেশীয় উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি মনে নিয়ে সত্যানন্দ নানা রঙের বালুমাটি সহযোগে ছবি আঁকছেন। এই জায়গাটিতে তিনি কতটুকু সফলকাম হন সেটিই দেখার একটা আগ্রহ হয়ে রইল বটে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: