শক্তিসাধন মুখোপাধ্যায়

হেনরি লুই ডিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯, ১৮ এপ্রিল-১৮৩১, ২৬ ডিসেম্বর) ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০, ২৬ সেপ্টেম্বর-১৮৯১, ২৯ জুলাই) বঙ্গীয় জীবনের দুই অবিস্মরণীয় চরিত্র; কিন্তু বিস্মৃতিপরায়ণ বাঙালি তাঁদের দুজনের ক্ষেত্রে একই রকম উদাসীনতার স্বাক্ষর রেখেছে তাই নিয়ে আজকের আলোচনা। আবেগ-বিহ্বল জাতি হিসেবে বাঙালি যেমন অদ্বিতীয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনতাতেও তেমনি দ্বিতীয় রহিত। মৃত্যু নিয়ে তার বিহ্বলতা যেমন অতুলনীয়, স্মৃতিরক্ষার ব্যাপারে তার অকর্মণ্যতাও তেমনি লজ্জাজনক। এটা তরুণবঙ্গের পথিকৃৎ ডিরোজিওর ক্ষেত্রেও যেমন দেখা গিয়েছিল করুণা সাগর বিদ্যাসাগরের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি।

কলেরা মরবাসে আক্রান্ত হয়ে ডিরোজিও যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স মাত্র বাইশ বছর আট মাস আটদিন। ছাত্রদের ‘ফ্রেন্ড, ফিলোজফার অ্যান্ড গাইড’ বলতে যা বোঝায় তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থে তাই, কাজেই তাঁকে ঘিরে যে-ছাত্রদের জীবন আবর্তিত হতো তারা নিঃসহায় হয়ে পড়েছিল। সংবাদ রত্নাকর লিখেছিল, ‘ড্রোজুর মরণে তাহারা জীবন্মৃত হইয়া থাকিবেক’১ – এতে একবিন্দু সন্দেহের কারণ ছিল না। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়ান নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সেই পত্রিকা তাঁর অকস্মাৎ প্রয়াণে হাহাকারের ভাষায় লিখেছিল – ‘কত আশা নিরাশায় পরিণত হয়ে গেল … অকস্মাৎ চুরি হয়ে গেল পত্রিকার সম্পাদকীয় কলমটাই’ ‘How many hopes, disappointed – how man expectations unrealizedÕ…2 প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন এই মহৎ প্রতিভার অকালমৃত্যুতে ইস্ট ইন্ডিয়ান সমাজের গহন ক্ষতি হয়ে গিয়েছিল, যা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়, তা তারা ব্যক্ত করেছিল একটি শোকসভায় মিলিত হয়ে।

করুণাসাগর বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতেও সেই হাহাকারময় বিষাদ ছেয়ে ফেলেছিল বাঙালির মনের আকাশ। বিদ্যাসাগর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ১২৯৬ সনের ১৩ শ্রাবণ ভোররাত্রিতে। ১৪ই শ্রাবণ সকাল ৭টার সময় নিমতলায় গঙ্গাস্নান করতে গিয়ে মানকুমারী বসু স্বচক্ষে তাঁর দাহদৃশ্য দেখে হৃদয়বিদারক ভাষায় লিখেছেন,

দেখিলাম মানবজগতের এক প্রদীপ্ত সূর্য খসিয়া পড়িয়াছে, ভারতবাসীর প্রধান অহংকার শেষ হইয়াছে, বঙ্গভূমির উচ্চ গৌরব ফুরাইয়াছে। … আজি আর কাঙ্গালের দাঁড়াইবার আশ্রয় নাই, হতভাগ্যের অশ্রু মুছিবার স্থান নাই, দগ্ধ হৃদয় জুড়াইবার উপায় নাই। আজি আমাদের বিদ্যাসাগর মহাশয় আমাদিগকে ছাড়িয়া গিয়াছেন।৩

ইন্ডিয়ন মিরর-এ ২৯ জুলাই এক পত্রলেখক লিখেছিলেন, ‘India has lost her brightest jewels, Pandit Iswar Chandra Vidyasagar in no more…4

বিদ্যাসাগরের এক জীবনীকার চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ঈশ্বরচন্দ্রের অন্ত্যেষ্টি-মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন এই ভাষায় –

ভাগীরথীতটে শ্মশান ক্রোড়ে শায়িত বিদ্যাসাগরকে দেখিবার জন্য যাঁহারা ছুটিয়াছিলেন, তাঁহারা সকলেই সাধের পুতুল ভাসাইয়া দিয়া নমুখে, অশ্রুপূর্ণ নয়নে ও শূন্য হৃদয়ে নিজ নিজ গৃহে গমন করিলেন।৫…

প্রিয় ব্যক্তির প্রয়াণন্তর শোকানুভবে ও শোকপ্রকাশে কোনো খামতি ছিল না কিন্তু খামতি ছিল তাদের স্থায়ী স্মৃতি রক্ষা প্রকল্পে। এখন আসব সেই প্রসঙ্গে।

প্রথমে ডিরোজিওর কথা।

ডিরোজিও মারা যান নিদারুণ কলেরায়। ১৮৩১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর। সেই দিনই সান্ধ্য সংবাদপত্র ক্যালকাটা গেজেট সেই মৃত্যুসংবাদ ছেপেছিল।৬

১৮৩২ সালের ৫ জানুয়ারি ‘পেরেন্টাল একাডেমি ইনস্টিটিউশনে’ সন্ধ্যায় এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে ইস্ট ইন্ডিয়ান সমাজের অনুরাগীরা ছাড়া ডেভিড হেয়ারসহ ডিরোজিওর কিছু ছাত্র উপস্থিত ছিলেন। সভার আলোচ্য বিষয় ছিল – to consider the propriety of erecting a monument to the memory of the late Mr. H.L.V. Derozio’।৭ সভায় সভাপতিত্ব করেন ইস্ট ইন্ডিয়ান সমাজের মুখ্যব্যক্তিত্ব জে. ডব্লিউ. রিকেটস্। প্রথম প্রস্তাবে বলা হলো ডিরোজিওর মৃত্যুতে সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন মি. কার্কপ্যাট্রিক। সমর্থন করেন মি. এম. ক্রো। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন ডিরোজিওর ছাত্র মহেশচন্দ্র ঘোষ, সমর্থন করেন মি. ওয়েল ব্রাইন। প্রস্তাবটি হুবহু তুলে

দিচ্ছি –

That a stone monument bearing an appropriate inscription be erected by public subscription to the late Mr. Derozio…৭

যথোপযুক্ত পরিচিতি-লেখসহ একটি প্রস্তরস্তম্ভ ডিরোজিওর স্মৃতিরক্ষার জন্য নির্মাণ করা হোক। জনগণের কাছে চাঁদা তুলে : ‘by public subscription’।

তৃতীয় প্রস্তাব উত্থাপন করলেন মি. জে. এ. লরিমার, সমর্থন করলেন কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জি। তাতে বলা হলো, এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হোক – তার সদস্যরা হবেন ওয়েল ব্রাইন, এ. ডি. সুজা, ডব্লিউ. আর. ফেনউইক, ডি. হেয়ার, ডি. এম. কিং, ডব্লিউ. কার্কপ্যাট্রিক, জে. ওয়েলচ। দক্ষিণানন্দ মুখার্জি এবং কৃষ্ণমোহন মুখার্জির ওপর দায়িত্ব দেওয়া হলো এই প্রস্তাব কার্যকর করার ব্যাপারটি দেখাশোনা করার। ডব্লিউ. আর. ফেনউইককে স্মৃতিরক্ষা কমিটির সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হলো।

মি. ব্রাইন মি. স্টেপলটনের পাঠানো একটা চিঠি পাঠ করলেন যাতে তিনি লিখেছেন, কোনো পারিশ্রমিক না নিয়ে মি. ডিরোজিওর একটি লিথোগ্রাফিক মিনিয়েচার তিনি প্রকাশ করতে চান যার বিক্রয়লব্ধ অর্থ স্মৃতিরক্ষা কোষে জমা পড়বে। কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জি বললেন, স্টেপলটনের এই প্রস্তাব গ্রহণ করা হোক। মি. আর. ডায়াস এ-প্রস্তাব সমর্থন করলেন।

সভাশেষে চাঁদা তোলার রসিদ বই তুলে দেওয়া হলো ‘and donation to the amount of 900 Rupees were enteredÕ’।৭ ৯০০ টাকার প্রতিশ্রুতি

নথিভুক্ত করা হলো সেই দিনই।

এবার দেখা যাক সেই প্রস্তাবিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কি হলো? ২৯ মার্চ, ১৮৩২ গভর্নমেন্ট গেজেটে স্মৃতিস্তম্ভ সংক্রান্ত কমিটির একটি বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে ‘arrangements for the erection of a chunar stone Pillar, enclosed by iron
railsÕ…৮-এর একটা ব্যবস্থা হচ্ছে। মি. পি. ডি. মেলোকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা করতে খরচা হবে ‘Rs 1,526-10-8’ – পনেরোশ ছাব্বিশ টাকা দশ আনা আট পাই। এর অর্ধেক টাকা অগ্রিম দিতে হবে সামনের মাসে।

চাঁদার রসিদ অনুসারে প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ ১৫৫৪ টাকা ৪ আনা যার মধ্যে ৬১৪ টাকা ৪ আনা আদায় হয়েছে।

প্রস্তাবিত স্মৃতিস্তম্ভে যে স্মরণলেখটি খোদাই করা হবে তার একটা প্রতিলিপি এখানে দেওয়া হলো। বলা হলো, এ-বিষয়ে যদি কোনো পরামর্শ থাকে ‘with a view to improve it’ তবে কমিটি তো পেলে আনন্দে প্রয়োজনমতো গ্রহণ করবে। স্মরণলেখটি এইরকম :

To

The Memory of

H.L.V. Derozio, ESQ

Author of the Fakeer of Jungheera,

suddenly cut off

in the prime of life, and

in the midst of a career of public

usefulness, which considering his rare and various

talents, promised to be eminently successful.

This

Monument in erected

by his countrymen and friends

In acknowledgement of his exertions

on their behalf, and as a tribute of their respect

and admiration for his acquirements and virtues

Calcutta

Born July-1808;

died December 26th, 1831

                            W.R. FENwich, Secretary

    Calcutta 26th March, 1832 8

স্মৃতিরক্ষা কমিটির দ্বারা প্রস্তাবিত এই স্মৃতিলেখাটি পড়ে বিস্মিত হতে হয়। কারণ এখানে ডিরোজিওর জন্মতারিখটাই ছিল ভুল। ডিরোজিওর জন্মতারিখ চার্চ রেকর্ড অনুসারে ১৮০৯, ১৮ এপ্রিল। এখানে লেখা হয়েছে জুলাই-১৮০৮। ডিরোজিওর সঠিক জন্মতারিখই যারা জানতেন না তাদের অপদার্থতার তুলনা কোথায়?

কয়েকদিন বাদে সমাচার দর্পণে (৪ এপ্রিল, ১৮৩২) এই বিজ্ঞাপনের সারমর্ম প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে লেখা হয়েছে – ‘কবর স্থানোপরি চন্ডালগড়ের প্রস্তরনির্মিত … এ স্তম্ভ গ্রন্থণের ব্যয় … [পনেরো চব্বিশ টাকা দশ আনা আট পাই] হইবে। আমরা শুনিয়া কিঞ্চিৎ চমৎকৃত হইলাম যে ১৫৫৮ টাকার চাঁদা হইয়াছে বটে তন্মধ্যে কেবল ৬১৪ টাকা আদায় হইয়াছে। ভরসা করি ইস্টিন্ডিয়ান মহাশয়েরা শীঘ্র ঐ টাকা প্রদান করিয়া আপনাদের বন্ধু ও স্বপক্ষ স্মরণার্থ অনবধানতা দোষ হইতে মুক্ত হইবেন।’৯

এর এক বছর বাদে ইন্ডিয়া গেজেটে ৪-৬ জুন, ১৮৩৩ বিজ্ঞাপন বের হয় ৭ নম্বর পার্ক স্ট্রীটে স্কুল-প্রেমিসেসে  (পেরেন্টাল একাডেমি)  ৬ তারিখ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় চাঁদাদানকারীদের একটা মিটিং ডাকা হয়েছে – The subscribers to the intendent monument to be erceted to the memory of the Late Mr. Derozio.10 ব্যস্! ডিরোজিও মনুমেন্ট সম্পর্কে স্মৃতিরক্ষা কমিটির সক্রিয়তার সংবাদ এখানেই শেষ।

এরপরের সংবাদ পাওয়া গেল দশ বছর বাদে। ১৮৪৩ সালে অক্টোবর মাসে ওরিয়েন্টাল ম্যাগাজিনে অস্বাক্ষরিত নামে (অনুমান সি. জে. মন্টেগুর লেখা) হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও সম্পর্কে চমৎকার একটি লেখা বের হয়। তাতে জানা যায়, ডিরোজিওর স্মৃতিস্তম্ভের জন্য ৮০০ টাকা চাঁদা উঠেছিল। কিন্তু সে-টাকা তছরুপ হয়ে গেছে। ‘The sum of money collected for a monument over his grave was about 800 Rupees. The amount was misappropriated, and Derozio’s grave is now undistinguished among the crowded tombs of the Park Street cemetery.Õ11

প্রায় অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ডিরোজিওর সমাধি লোকচক্ষুর অগোচরে ছিল।  The grave had remained indistinguisable for over half a century until attention was called to it in the Calcutta Newspapers some years ago, when an Indian gentleman (the late Durga Mohan Das, Vakil High Court) had it repaired and a brief inscription engraved on the cement.12 এ-লেখা ১৯১০ সালের বেঙ্গল পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্টে । জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে KND স্বাক্ষরিত একটি লেখায় EWM একটি সংযোজনী নোটে এই তথ্য জানিয়েছেন। সংবাদটা প্রথম জানা যায় ১৮৯২ সালে প্রকাশিত East Indian Worthies নামক গ্রন্থ থেকে। সেখানে সমাধি-সংস্কারকদের নামটা অনুল্লিখিত ছিল, বলা হয়েছিল ‘an Indian gentleman had the tomb repaired and a brief inscription engraved on it.Õ13

টমাস এডওয়ার্ড যখন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের ইতিহাস লিখতে এসে ডিরোজিওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ জীবনী (১৮৮৪) লেখেন তখনো ডিরোজিওর স্মৃতিবাহী কোনো কিছু চোখে পড়েনি তাঁর। তাই আক্ষেপ করে লিখেছেন,

There all mural tablets, portraits and busts in the various educational institutions of Calcutta, commemorating the worth and work of men who have laboured for the visitors looks in vain for any memorial of Henry Louis Vivian Derozio, the gifted Euasian Teacher, Philosopher and poet. …14

ডিরোজিও স্মৃতিস্তম্ভ গড়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য যে-কমিটি হয়েছিল তাতে সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ডব্লিউ আর. ফেনউইকের ওপর। ফেনউইক ডিরোজিও পরিবারের বিশেষ বিশ্বাসভাজন ছিলেন। ফলে ডিরোজিও-সম্পাদিত ইস্ট ইন্ডিয়ান পত্রিকা চালানোর ভার ও তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ গড়ার কাজ দেখভাল করার দায়িত্ব দুটোই পড়েছিল তাঁর ওপর। ফল হয়েছিল এই। পত্রিকা অবিলম্বে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্মৃতিস্তম্ভের টাকা তছরুপ হয়ে গিয়েছিল। ডিরোজিওর জীবনীকার ব্যথিত হৃদয়ে কঠোর ভাষায় লিখেছিলেন, ‘School, Newspaper and monument all came to nothingÕ.15… তিনি ফেনউইকের অপদার্থতাকেই দায়ী করেছেন এ জন্য। ‘This person who has been characterized little better than a European Loafer’ speedily brought the paper to ruin.15 তবে আমাদের মনে হয় ব্যক্তিবিশেষ নয়, এই তিরস্কার গোটা ইস্ট ইন্ডিয়ান সমাজেরই প্রাপ্য। এডওয়ার্ডস লিখেছেনও সে-কথা – ‘The memory of Derozio has been shamelessly neglected by his fellow Eurasian.16 প্রশ্ন উঠবেই, কী করছিলেন বাকিরা সেদিন? কি আর করবে? গড়পরতা বাঙালি যা করে তাই করেছিল।

এবার আসা যাক দয়ার সাগর বিদ্যাসাগর প্রসঙ্গে।

আগেই বলা হয়েছে, বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে বাঙালি জীবনের কোণে কোণে শোকের সাগর উথলে উঠেছিল। বিদ্যালয় ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বাংলার নারীসমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সামাজিক মানুষ, রাজা-জমিদার, সম্পাদক, লেখক-লেখিকা, এমনকি সাহেবমহলও তার বাইরে ছিল না। দ্য ইন্ডিয়ান নেশনস পত্রিকা লিখেছিল, ‘ঈশ্বরচন্দ্রের মৃত্যুতে বাংলাদেশের শত শত গৃহে যেভাবে চোখের জল পড়েছিল নিমতলা শ্মশানে তাঁর চিতা নেভানোর পক্ষে যথেষ্ট ছিল। ‘sufficed to quench the funeral pyreÕ|17 বিদ্যাসাগর-প্রতিষ্ঠিত কলকাতা মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনের ছাত্ররা ঠিক করেছিল তারা আগামী দশদিন খালি পায়ে চলাফেরা করবে। বিভিন্ন শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা মিলে মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন  শ্যামপুকুর ব্রাঞ্চ থেকে সাগর-শোকোচ্ছ্বাস নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিল, যাতে ছিল ২৭ জন ছাত্রের বিদ্যাসাগর-বন্দনা। সবই পদ্যে লেখা। ‘এব ছাত্রকূল আকূল হইয়ে/ তোমার বিরহে কাতর-প্রাণে/ অতি দীনভাবে যাপিতেছে দিন/ আর কি তাদের পড়িবে মনে?’ (জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়, এনট্রেন্স ক্লাস)১৮ বেথুন কলেজে ৮ আগস্ট শনিবার বেলা আড়াইটায় ‘স্বর্গীয় বিদ্যাসাগরের স্মরণার্থ মহিলা সভা’র আয়োজন হয়েছিল। যেখানে ‘তিনশত রমণী’ সমবেত হয়ে সাশ্রুপূর্ণ নয়নে বলেছিলেন, ‘যদি সংসারে তাঁহাকে চিরদিনের জন্য রাখা সম্ভব হইত আমরা বোধ হয় কেহই তাঁহাকে ছাড়িয়া দিতাম না।’১৯ (কামিনী সেন) ১২৯৮ সনের ৬ ভাদ্র অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর তিন সপ্তাহের মধ্যে স্টার রঙ্গালয়ে অভিনীত হলো অমৃতলাল বসুর লেখা নাটক বিলাপ! বা বিদ্যাসাগরের স্বর্গে আবাহন। নাটকের তৃতীয় দৃশ্যে দেখা যায় কার্মাটাঁড়ের সাঁওতালরা হা-হুতাশ করতে করতে গান গাইছে –

কি কঠিন জান তোর দেও রে।

যমরা হামরা বাপ ছিনি নিলি রে ॥

সাগর মোদের বাবা, সে সাগর মোদের মা;

গেল বাপ মাতারি মোরা কোথা যাই রে।২০

বিদ্যাসাগরের মৃত্যুতে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত শোকসভা হয়েছিল। বাংলা-ইংরেজি পত্রিকায় লেখা হয়েছিল শতেক মর্মবিদারী লেখা। বলা যেতে পারে, ঈশ্বরচন্দ্রের মৃত্যু যথার্থই জাতীয় শোক ছিল। এ-শোক ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। প্রান্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক এই হাজারো শোকসভার মধ্যে অপেক্ষিত ছিল কেন্দ্রীয়ভাবে একটি শোকসভাও হবে। হয়েছিল। এমন জমকালো শোকসভা কলকাতার নাগরিক সমাজে আগে কখনো দেখা যায়নি। আমরা এখন সেই সভাটির দিকেই কেন্দ্রীভূত করব আমাদের দৃষ্টি।

নাগরিক সভা ২১

স্থান : কলকাতা টাউন হল

সময় : বিকাল পাঁচটা

আহ্বায়ক : কলকাতার শেরিফ (প্রিন্স মহ. ফারুক শা)  

সভাপতি : স্বয়ং প্রাদেশিক শাসনকর্তা (স্যার চার্লস এলিয়ট)

উপস্থিতি : ‘5000 person were present’ 

এই সভায় শেরিফ ও প্রাদেশিক শাসনকর্তা ছাড়া বক্তা ছিলেন প্রধান বিচারপতি ডব্লিউ সি প্যাথেরুন, মহারাজা বাহাদুর যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, মহারাজা বাহাদুর নরেন্দ্রকৃষ্ণ লাহা, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশনের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার, বিচারপতি ও প্রথম ভারতীয় ভাইস চ্যান্সেলর গুরুদাস ব্যানার্জী, রাজা পিয়ারী মোহন মুখার্জী, কুমার দীনেন্দ্র নারায়ণ রায়, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, (১৮৯৩ সালে) শিকাগো ধর্ম-সম্মেলনে যোগদানকারী প্রতাপচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ।

দি বেঙ্গলী  (আগস্ট ২৯, ১৮৯১) লিখেছিল – ‘On Thursday last the Town Hall witnessed a unique demonstration of sorrow… The elites of the community were present. All that represented the talent, the learning and the wealth of the town were gathered.Õ22

 সেই মহতী সভায় কে কী বলেছিলেন সেই বিস্তারিত তথ্যে যাব না। আমরা শুধু খবর নেব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের স্মৃতিরক্ষার ব্যাপারে সেই সভায় কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং তার পরিণতি কী হয়েছিল সেই বিষয়ে।

তার আগে বলে নেওয়া দরকার টাউন হলের এই সভাটি বিদ্যাসাগর স্মরণার্থ একক সভা ছিল না, এটা ছিল যৌথসভা। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর তিনদিন আগে প্রয়াত হয়েছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত রাজেন্দ্রলাল মিত্র। তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর বাধ্যবাধকতা ছিল কলকাতার নাগরিক সমাজের। দুই মনীষীর জন্য দুটি আলাদা সভা না করে  it was decided the meeting should be amalgamated (Hindoo Patriot)|23 সুতরাং সব বক্তাকেই দুই মনীষীর কথা স্মরণে রেখে বক্তব্য রাখতে হয়েছিল; স্মৃতিরক্ষার প্রস্তাবেও হয়েছিল একই সমস্যা।

যাই হোক, সভাপতি স্যার চার্লস এলিয়টের মনোজ্ঞ ও ভারসাম্যযুক্ত ভাষণের পর চারটি প্রস্তাব শোকসভার পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হয়।

প্রথম প্রস্তাব প্যাথেরুনের। তিনি বলেন, দুই মহান মানুষের কাজ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি পূরণ করা হয় যেন। এ-প্রস্তাব সমর্থন করেন মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর। বলা বাহুল্য এটা একটা অর্থহীন প্রস্তাব।

দ্বিতীয় প্রস্তাব রাখেন মহারাজা নরেন্দ্রকৃষ্ণ লাহা। তিনি বলেন, প্রয়াত ওই দুজনের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হোক। এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেন স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেন, ‘এঁদের জন্য স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করলে আমরা লাভবানই হব।’২৪ প্রস্তাব সমর্থন করতে গিয়ে সংযোজনী হিসেবে বলেন, প্রয়াত মানুষটির স্মৃতিতে প্রকৃত অভাবী ছাত্রদের জন্য ছাত্রাবাস গড়া যেতে পারে। সুরেন্দ্রনাথ এ-প্রস্তাব সমর্থন করেন।

তৃতীয় প্রস্তাব রাখতে গিয়ে উত্তরপাড়ার রাজা পিয়ারী মোহন মুখার্জী যথেষ্ট কা-জ্ঞানের পরিচয় দেন। তিনি বলেন, যদিও রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে যৌথভাবে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে তবু এই সমস্ত প্রস্তাব কার্যকরী করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পর্ষদ গঠন করা যেতে পারে। এ-প্রস্তাব সমর্থন করেন সীতানাথ রায় ও রেভারেন্ড কালীচরণ ব্যানার্জী। সমর্থন করতে গিয়ে একটু কাঁচিয়েও দেন কালীচরণ। বলেন, দুই প্রয়াত মানুষের গুণসমূহ অনুসরণ করে চললে তাই হবে যথার্থ স্মৃতিসৌধ। চতুর্থ প্রস্তাব ছিল ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা পর্ষদ’ গঠন বিষয়ে। প্রতাপচন্দ্র মজুমদার এই প্রস্তাব আনেন। সমর্থন করেন জে. ঘোষাল ও কুমার দীনেন্দ্রনারায়ণ রায়।

তাহলে টাউন হলের সভায় দ্বিতীয় ও চতুর্থ প্রস্তাব অনুসারে গৃহীত সিদ্ধান্ত দাঁড়াল দুটি – এক. স্মৃতিসৌধ গড়া হবে। দুই. এই স্মৃতিসৌধ রূপায়িত করার জন্য ‘বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা পর্ষদ গঠন’ করা হবে। সভা মানে মানে শেষ হলো। স্মৃতিসৌধ গড়ার আগে ‘স্মৃতিরক্ষা পর্ষদ’ গঠন করতে হবে। সেটা বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মানানসই হওয়া চাই। অনুমান করতে অসুবিধা নেই হোমরা-চোমরারা সব তৎপর হয়ে উঠলেন সেই কমিটিতে কাকে ঢোকাতে হবে, কাকে কোন জায়গায় প্রতিনিধি ঠাউরানো হবে। কমিটি গঠনের সেই নেপথ্য নাটকটির হদিস কখনোই পাওয়া সম্ভব নয়। তবে যা দাঁড়াল তার হদিস আছে। সেটা এই রকম – টাউন হলের সভা হয়েছিল ২৭ আগস্ট, দি হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকা ৩১ আগস্ট চারদিনের মাথায় বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা পর্ষদের মাননীয় সদস্যদের দীর্ঘ তালিকা প্রকাশ করে।২৫ কিছু কম দুশোজন সদস্যের তালিকা। সে-তালিকা দেওয়া বাহুল্য। কিন্তু একটা আন্দাজ দেওয়া যেতে পারে।

এতে দিলেন অন্তত তিনজন যাঁরা একই সঙ্গে মহারাজা, স্যার ও রায়বাহাদুর উপাধিধারী। এছাড়া

মহারাজা – ৪

মহারানী – ১+১

রাজা – ১৭

কুমার – ৪

স্যার – ৫

রায়বাহাদুর – ১৪

বিচারপতি – ৪

ভাইস চ্যান্সেলর – ১

ডাক্তার – ৩

কবিরাজ – ২

হাকিম – ১

সি.আই.আই – ৩

প্রিন্স – ১

মহামহোপাধ্যায় – ৩

মৌলভী – ২

রেভারেন্ড – ২

পণ্ডিত – ৩

এম.এ. বি.এল – ৫

এম.এ – ২

এর মধ্যে ছিলেন সাহিত্যিক, অধ্যাপক, উকিল, সম্পাদকরাও। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূদেব মুখার্জী, শিবনাথ শাস্ত্রী, হেমচন্দ্র ব্যানার্জী প্রমুখের নামও তালিকায় মেলে। বিভিন্ন জায়গার প্রতিনিধিত্বও ছিল – একদিকে পুরী, কটক, রাঁচি, ভাগলপুর, মজঃফরপুর, মুঙ্গের; অন্যদিকে ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, শেরপুর, সিলেট। নবদ্বীপ, হুগলী, মেদিনীপুর, তমলুক, বহরমপুর, পুরুলিয়ার মানুষও ছিলেন এর মধ্যে। বীরসিংহের কেউ না থাকলেও ঘাটাল, জারার দু-চারজনের নাম পাওয়া যায়। দু-তিনটি জিনিস চোখে পড়ার মতো – এক. বামাবোধিনীর লেখিকা বা বেথুন কলেজের ছাত্রী-শিক্ষিকাদের প্রায় কাউকেই পাওয়া গেল না। দুই. স্মরণসভায় আসেননি এমন অনেক বিখ্যাত ও অপরিচিত ব্যক্তির নাম এতে অন্তর্ভুক্ত। তিন. স্মরণসভাতেও আসেননি, স্মৃতিরক্ষা কমিটিতেও অনুক্ত রইল এমন বিখ্যাত ও জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিও অপ্রতুল নয়। যেমন নবীনচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ। বিবেকানন্দ স্মরণসভায় এসেছিলেন কি না কে জানে?২৬

এখন দেখা যাক স্মৃতিরক্ষা কমিটি কী করলেন? স্মৃতিসৌধের কী পরিকল্পনা তারা গ্রহণ করেছিলেন? এমন মাথাভারি কমিটি শেষ পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের স্মৃতিসৌধ তৈরি করতে পেরেছিলেন কি না? শিক্ষা, সামাজিক প্রতিপত্তি, অর্থকৌলীন্যে দেশের অগ্রগণ্য ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এই পর্ষদ না গড়েছিল কোনো প্রতিষ্ঠান, না কোনো স্মরণসৌধ, দুস্থদের সাহায্যের জন্য বিদ্যাসাগরের স্মরণে কোনো ধনভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়নি। ঈশ্বরচন্দ্রের স্মরণসভায় উপস্থিত এক গৌণ লেখক শ্রীপতি চরণ রায় ভারতী ও বালক (আশ্বিন ও কার্তিক ১২৯৮) পত্রিকায় মাস চারেক বাদে ‘স্মৃতিচিহ্ন’ নামে একটি লেখায় নতুন একটি প্রস্তাব দেন। লেখেন, ‘বিদ্যাসাগরের স্মৃতি চিরস্মরণীয় করিবার জন্য দেশব্যাপিয়া এক অক্লান্ত উদ্যম ও আগ্রহের স্রোত বহিয়া যাইতেছে।’২৭ তিনি ‘প্রস্তরসৌধ’ নির্মাণ ও ‘প্রস্তরমূর্তি’ স্থাপনের বিরোধিতা করেছিলেন – ‘প্রস্তরমূর্ত্তি করিতে হইলে দেশের টাকা দেশে থাকিতে পারে আমরা তাই প্রতিমূর্ত্তি স্থাপনের বিরোধী।২৭

লিখলেন,

বিদ্যাসাগর গরীব-দুঃখীদের অন্ন-বস্ত্র দান করিয়া স্বীয়  মাসিক আয়ের অর্ধেকেরও অধিক ব্যয় করিতেন, আমরা যদি তাঁহার নামে এইরূপ এক ‘দুর্ভিক্ষ নিবারণী ভাণ্ডার’ স্থাপন করিয়া তাঁহার ঐ বিশেষ গুণটির সমুচিত গৌরব রক্ষা করিতে পারি, তাহা হইলে বিদ্যাসাগরের স্মৃতি ইহাপেক্ষা কোন উৎকৃষ্টতর প্রণালীতে কখনই স্থাপন করিতে পারিব না।’২৭

বছরখানেক বাদে ১৮৯২ সালে সেপ্টেম্বর মাসে সরকারি নেটিভ নিউজ পেপারসের ফাইল জানাচ্ছে – ‘Since the death of the Venerable Pundit Vidyasagar, people have been all talking loudly of raising mercy to perpetuate his memory but upto this time nothing has been practically.Õ28 এসব নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহাফেজখানার প্রাক্তন উপ-অধিকর্তা উদয়ন মিত্র লিখেছেন,

আগস্ট ২৭, ১৮৯১-এর এক অপরাহ্ণে অনেক মানুষের সামনে কলকাতার বিশিষ্ট মানুষজন প্রয়াত ঈশ্বরচন্দ্রের স্মৃতিরক্ষা নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত সে-কথা তাঁরা রাখেননি। … কেন সেদিন ঈশ্বরচন্দ্রের স্মৃতিসৌধ গড়া হয়নি আমাদের জানা নেই।২৯

আমরা স্মৃতিসৌধ বিষয়ক এই রচনাটির শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি দুটি প্রসঙ্গ না আনলে রচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে সেই বিবেচনায় ক্লান্ত পাঠকদের একটু ধৈর্য চেয়ে নিচ্ছি।

গোড়ায় গলদ

প্রসঙ্গ এক : ব্যর্থতার কারণ ভেদ। গোড়ায় গলদ প্রাদেশিক শাসনকর্তার পক্ষে পরপর দুদিন সময় দেওয়ার অসুবিধা আছে বলে রাজেন্দ্রলাল মিত্র ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্মরণসভাকে গ্রন্থিবদ্ধ করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটা দুর্বলতা থেকে গিয়েছিল। রাজেন্দ্রলাল মিত্র যতবড় পণ্ডিতই হোক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের স্থান বাঙালি মনে যে পর্যায়ে ছিল তার তুল্যমূল্য মাপতে যাওয়া বাতুলতা মাত্র। ফলে ঈশ্বরচন্দ্রের স্মৃতিরক্ষার প্রশ্নে রাজেন্দ্রলাল একটা মানসিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্রের জন্য যা করতে হবে রাজেন্দ্রলালের জন্য তাই করতে হবে এরকম একটা সৌজন্যমূলক পিছুটান থেকেই যায়। এ-কথা ৩০ আগস্ট দি ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার লিখেছিল, বিদ্যাসাগরের স্মরণসভাটি ঠিক সুরে লাগেনি – ‘The public felt differently for the two men for their activity were widely different and there was a marked difference in the work of the two as men’ :30 রাজা পিয়ারী মোহন মুখার্জী সমস্যাটা সামাল দেওয়ার জন্য দুটি আলাদা স্মৃতিরক্ষা কমিটি করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। তাতে প্রাথমিক অসুবিধাটা দূর হয়েছিল কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।

দুই.  স্বয়ং বিদ্যাসাগর তাঁর এজেন্ডা কার্যকরী করার জন্য সরকার হলে সরকার, জমিদার রাজা হলে জমিদার রাজা, ইয়ং বেঙ্গল হলে ইয়ং বেঙ্গল, গোষ্ঠীভুক্ত ভদ্রলোক হলে ভদ্রলোক, সাধারণ অশিক্ষিত মানুষ হলে অশিক্ষিত মানুষ – সকলের সাহায্য নিয়েছেন; তাঁর শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সংস্কার প্রয়াসে সকলকে নিয়েই চলেছেন। লাট সাহেব বা সরকারি সাহেবরা যার গুণমুগ্ধ ছিল স্বভাবতই রাজা-জমিদাররাও তার গুণমুগ্ধ ছিলেন। বিদ্যাসাগর যে-কাউকে স্বাগত জানাতে পারতেন, আদর্শে বা মতে না মিললে তাকে প্রত্যাখ্যান করতেও তিলমাত্র দ্বিধা করতেন না। বিদ্যাসাগরের স্মরণসভা চলে গিয়েছিল রাজা-জমিদারদের কবলে। উপস্থিতি ও কমিটি সদস্যদের তালিকা দেখলে তা মালুম হয়। রাজারা স্ব-স্ব প্রধান। তারা কারো কথা শোনার লোক নন। তারা নিজেদের বশংবদ লোক দিয়ে তালিকা ভারি করতে ব্যস্ত ছিলেন। সবাই মিলে একমত হয়ে কাজ করা তাদের ধাতে ছিল না। তাদের নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে বা প্রণালিতে পরিচালিত করতে পারে এমন কমান্ড এই বঙ্গে একজনেরই ছিল, তিনি বিদ্যাসাগর। তিনি নেই। এমতাবস্থায় সবাই স্ব-স্ব মত ও প্রতাপ প্রদর্শনে ব্যস্ত ছিলেন, ফলে যা হবার তাই হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে তারা পৌঁছুতেই পারেননি। রাজাদের অগ্রাহ্য করে বিদ্বানরা কিছু করবে – সে ক্ষমতা কমিটির বিদ্বানদের ছিল না।

তৃতীয় যে-ব্যাপারটি চোখে লাগে, সেটা হচ্ছে বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা পর্ষদের ‘চেয়ারম্যান’ বা সভাপতি মনোনীত করা হয়েছিল কুচবিহারের মহারাজা স্যার নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপত (১৮৬২-১৯১১) বাহাদুর জিসি আইইকে। সুরেন বাঁড়ুজ্জ্যে হয়েছিলেন সম্পাদক। সুরেন বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্যতা বা অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না কিন্তু এত রাজা-জমিদার সামলানোর ক্ষমতা তাঁর ছিল না, থাকার কথাও নয়, সে-কাজ চেয়ারম্যানের করার কথা। চেয়ারম্যানটি কে? কি তাঁর পরিচয়?৩১ বা যোগ্যতা? ইনি হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যাঁর সঙ্গে ব্রাহ্ম বিবাহবিধি ভেঙে অপ্রাপ্ত বয়স্কা (১৩ ব.) (ব্রাহ্মমতে) কন্যা সুনীতি দেবীর বিয়ে দিয়েছিলেন (১৮৭২) কেশব সেন। তিনি কেশব সেনের জামাই। এই বিয়ের কারণেই ব্রাহ্মসমাজ ভেঙে দুখানা হয়ে যায়। তাঁর পরিচয় বলতে কুচবিহারের রাজসিংহাসনে বসেন ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে (২১ বছর বয়সে)। ব্রিটিশ শাসকদের সঙ্গে অত্যন্ত সুসম্পর্কের কারণে মহারানি ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে ‘মহারাজা’ উপাধি, পদক ও  তরবারি পান। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারত সরকার কুচবিহার রাজপরিবারকে ‘মহারাজ ভূপত বাহাদুর’ উপাধি দেন। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে মহারানি ভিক্টোরিয়ার জুবিলি উৎসবে যোগ দিতে ইংল্যান্ড যান, সেই সময়ে তিনি জি.সি.আই.আই উপাধি পান। শুধু তাই নয়, তাঁর স্ত্রীও প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে সি.আই.আই উপাধি পান। তিনি সপ্তম এডওয়ার্ডের অনারারি এডিকং এবং ব্রিটিশ সেনাদলের লেফটেন্যান্ট কর্নেল হয়েছিলেন। রাজকীয় খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলেন। বিলিয়ার্ড, পোলো খেলতেন। শিকার নিয়ে ইংরেজিতে একটা বই লিখেছিলেন। কলকাতায় ইন্ডিয়া ক্লাব প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল। এতটা বিশদে তাঁর সম্পর্কে লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা দেখানো যে, বিদ্যাসাগর যে প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তাঁর মহত্ব অনুধাবন করার লোকই তিনি ছিলেন না। বিদ্যাসাগরের মতো দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তানের ‘One of her brightest jewels’32 স্মৃতিরক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল নৃপেন্দ্র নারায়ণকে, যখন তাঁর বয়স মাত্র ৩১ বছর। সাহেবদের অতি সুনজরে থাকায় এই মানুষটিকে দেশের রাজা-জমিদাররা খুবই সমীহ করতেন তাতে সন্দেহ নেই। কলকাতার অ্যাবসেন্টি ল্যান্ডলর্ডসরা তাই নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্কে জটিলতা ঢাকতে তাঁকে ছেড়ে দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা পর্ষদের চেয়ারম্যানের পদ। বিদ্যাসাগরের স্থান দেশের কোন হৃদমাঝারে স্থাপিত তা বোঝার ক্ষমতা তাঁর থাকার কথা নয়। বিদ্যাসাগরের সংস্কৃতি থেকে বহু দূরবর্তী, ব্রিটিশ মদতপুষ্ট এই ধনী তরুণের হাতে বিদ্যাসাগরের স্মৃতি রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করার মধ্যেই খোঁড়া হয়েছিল স্মৃতি পর্ষদের কবর। অথচ অনেক সুযোগ্য ব্যক্তি কলকাতার রাজা-মহারাজা মহলেই বিদ্যমান ছিলেন, যাঁরা জীবৎকালে চলতিপথে বিদ্যাসাগরকে দেখলে জুড়িগাড়ি থেকে নেমে সশ্রদ্ধ নমস্কার জানাতেন।৩৩ সম্ভবত নিজেদের অন্তর্কলহ এড়ানোর জন্য তাঁরা সরে দাঁড়িয়ে এগিয়ে দিয়েছিলেন নৃপেন্দ্র নারায়ণকে। সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের বহু প্রভাবশালী সক্রিয় ব্যক্তি নৃপেন্দ্র নারায়ণকে স্বাভাবিক কারণেই অপছন্দ করতেন। তার ফলে তাঁরাও সরে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলে যা হবার তাই হয়েছিল। কিছুই দানা বাঁধেনি।

সর্বোপরি বাঙালি চরিত্রের মৌলিক দুর্বলতা তো ছিলই। চিরকাল তারা বাক্যবীর। কার্যকালে তাদের দুর্বলতা ও অপারগতা সর্বজনবিদিত। এ-কথা ঈশ্বরচন্দ্রের চেয়ে ভালো কে জানত? জীবদ্দশায় তিনি স্বয়ং অবহেলার শিকার হয়েছিলেন। ডা. দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি স্বয়ং আক্ষেপ করে লিখেছিলেন –

আমাদের দেশের লোক এত অসার ও অপদার্র্থ বলিয়া পূর্বে জানিলে আমি কখনই বিধবাবিবাহ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিতাম না। … দেশহিতৈষী সৎসর্ম্মোৎশাহী মহাশয়দিগের বাক্যে বিশ্বাস করিয়া ধনেপ্রাণে মারা পড়িলাম। অর্থ দিয়া সাহায্য করা দূরে থাকুক কেহ ভুলিয়াও এ-বিষয়ে সংবাদ লয়েন না।৩৪

বিদ্যাসাগরের স্মরণসভায় এইসব দেশহিতৈষী সৎকর্ম্মোৎসাহী ভিড় করে এসেছিল। তারা তাদের পছন্দসই লোকদের দিয়ে দেখনশোভা স্মৃতিরক্ষা পর্ষদ বানিয়েছিল, পারস্পরিক আত্মকলহ এড়াতে বোড়ে ঠাউরেছিল কুচবিহারের তরুণ, ইংরেজ স্নেহধন্য মহারাজাকে। সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের মুখপত্র দি ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার (৩০ আগস্ট, ১৮৯১) ‘সাউন্ড অ্যাডভাইস’ নামক একটি নিবন্ধে বিদ্যাসাগরের নাগরিক স্মরণসভার যে-মূল্যায়ন করেছিল তা ছিল অভ্রান্ত – ‘জীবৎকালে বিদ্যাসাগরের প্রজ্জ্বলন্ত কর্মোৎসাহে যারা শীতল জল ঢেলে দিয়েছিল স্মরণ সভায় এসে তারাই ‘they are trying to make for their past neglect by kicking up a little dust of praise …Õ35 । স্মরণসভায় বাক্য বিচ্ছুরণ করে তারা ফিরে গিয়েছিল তাদের নিজস্ব অকর্মণ্যতায়। ফলে বিদ্যাসাগরের স্মরণসৌধ স্মরণসভার বর্ণমালা হয়েই থেকে গেছে, কলকাতার কোথাও তা দৃশ্যমান স্থাপত্য বা ভাস্কর্যরূপ পরিগ্রহ করেনি। (কলেজ স্কোয়ারে বাবু হয়ে বসে থাকা একটি মূর্তি বাদে। এ মূর্তিরও অনেক কাহিনি আছে।) বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা পর্ষদ তাদের অপদার্থতা দিয়ে বাঙালিকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধী করে দিয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। সেই কলঙ্ক মুছে নেবার ক্ষমতা একজনেরই ছিল, তিনি রবীন্দ্রনাথ। এবং তিনি তা করেছিলেন। কীভাবে? সেই প্রসঙ্গ দিয়েই শেষ করব এই নিবন্ধ। টাউন হলের বহু ঢক্কা নিনাদিত নাগরিক স্মরণসভায় রবীন্দ্রনাথ আসেননি। কেননা তিনি জানতেন সে-সভা কাদের মাতব্বরি দেখানোর আসর। বঙ্কিমচন্দ্র আসেননি তার কারণ ছিল। নবীন সেন আসেননি, তারও কারণ ছিল। নবীন সেন মনে করতেন, ‘আমাদের শোক বড় নিভৃত ও পবিত্র, উহা সভা করিয়া একটা তামাসার জিনিস করা আমি মহাপাতক বলে মনে করি।’ (আমার জীবনী)৩৬ বঙ্কিমচন্দ্রের নাম স্মৃতিরক্ষা কমিটিতে রাখা হয়েছিল। নবীন সেনের নাম ছিল না। রবীন্দ্রনাথেরও না। এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়ে নিলেন বিদ্যাসাগরের স্বরচিত অসম্পূর্ণ জীবনচরিত, তাঁর ভাই শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্নের বিদ্যাসাগরচরিত দুটোই প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর অনতিপরে (১৮৯১)। চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মভূমি পত্রিকায় রপ্টে রপ্টে লিখছিলেন বিদ্যাসাগর জীবনী।৩৭ সে-বই প্রকাশিত হলো ১৩০২ সনের ২রা জ্যৈষ্ঠ। সেটাও পড়ে নিলেন। বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষার নামে পর্ষদের লোকজনের কাণ্ডকারখানা তাঁর অজানা ছিল না। হতাশাজনক সেই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার সারাৎসার ও বিদ্যাসাগর চরিত্রের অন্তর্ভেদী উদ্ঘাটন নিয়ে তিনি বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর চতুর্থ বৎসরে (১৩ শ্রাবণ ১৩০২) কলকাতা এমারেন্ড থিয়েটারে অনুষ্ঠিত বার্ষিক স্মরণসভায় সন্ন্যাসী উপগুপ্তের মতো উঠে এলেন এবং বললেন, ‘আজি রজনীতে হয়েছে সময় এসেছি বাসব দত্তা।’৩৮ এখানে এসে পাঠ করলেন অসামান্য একটি নিবন্ধ ‘বিদ্যাসাগর চরিত’।৩৯ তিরস্কার ও পুরস্কার দিয়ে এমন ঘন বুনোটসম্পন্ন বিদ্যাসাগর মূল্যায়ন আগে কেউ করেননি। শ্রেষ্ঠ ভাস্কর পাথর কেটে যেভাবে বানায় শিল্পিত মূর্তি, শ্রেষ্ঠ স্থপতি যেভাবে নির্মাণ করে তার স্বপ্নের স্মৃতিসৌধ, ঠিক সেইভাবে তিনি এই রচনায় নির্মাণ করেছেন বিদ্যাসাগরের সত্যমূর্তি।

‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’৩৯ এই নিবন্ধে শুধু বিদ্যাসাগরের যথার্থ ভাষামূর্তিই স্থাপিত হয়নি, এতে অকৃতি অধম বাঙালির ‘কনফেশন’ও আছে। বিদ্যাসাগরের স্মৃতিসৌধ বানানোর নামে যারা অপমানের মন্দির বানিয়েছিল, তাদের হয়ে আত্মতিরষ্করণী স্বীকারোক্তিও তিনি অকপটে রচনা করে দিয়েছেন –

আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না; ভূরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহংকার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিতে থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান, পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স এবং নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য। এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল। কারণ, তিনি সর্ববিষয়েই ইহাদের বিপরীত ছিলেন। বৃহৎ বনস্পতি যেমন ক্ষুদ্র বনজঙ্গলের পরিবেষ্টন হইতে ক্রমেই শূন্য আকাশে মস্তক তুলিয়া উঠে, বিদ্যাসাগর সেইরূপ বয়োবৃদ্ধিসহকারে বঙ্গসমাজের সমস্ত অস্বাস্থ্যকর ক্ষুদ্রতা জাল হইতে ক্রমশই শব্দহীন সুদূর নির্জনে উত্থান করিয়াছিলেন; সেখান হইতে তিনি তাপিতকে ছায়া এবং ক্ষুধিতকে ফলদান করিতেন; কিন্তু আমাদের শত-সহস্র ক্ষণজীবী সভা সমিতির ঝিল্লিঝংকার হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ছিলেন।৩৯

কী আর বলতে বাকি রাখলেন রবীন্দ্রনাথ? গত চার বছরে বিদ্যাসাগর স্মৃতিরক্ষা পর্ষদ কী করেছেন তার সারাৎসার তুলে ধরে দেখালেন বিদ্যাসাগর এবং স্মৃতিরক্ষা পর্ষদ আসলে দুটি আলাদা পক্ষ, আলাদা সংস্কৃতি। স্মৃতিরক্ষা পর্ষদকে প্রেক্ষিত (perspective) হিসেবে রেখে তিনি বিদ্যাসাগরের সত্যমূর্তিটি খোদাই করে দিলেন। ‘সূক্ষ্মতম তর্কজাল ও স্থূলতম ভাঁড়ত্ব বিচ্ছিন্ন করিয়া’ বিদ্যাসাগর তাঁর ‘মহৎ চরিত্রের অক্ষয়বট বঙ্গভূমিতে রোপণ করিয়া গিয়াছেন।’৩৯

চার বছর আগে টাউন হলে অনুষ্ঠিত নাগরিক সভায় প্রাদেশিক শাসনকর্তা ছাড়া বিদ্যাসাগর বিষয়ে ওজস্বী বক্তৃতা করেছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,

ড. গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ডা. মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাদেশিক শাসনকর্তার উপস্থিতিতে বিদ্যাসাগরের স্মরণসভায় আশা প্রকাশ করেছিলেন। এই ধরনের সভা, শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর পক্ষে সহায়ক হবে – ‘to establish the solidarity between the rulers and the ruled.’ তাঁর মতে, বিদ্যাসাগর মনেপ্রাণে ছিলেন হিন্দু বিশ্বাস ও আদর্শের রক্ষক – ‘He was an accredited custodian of the Hindu faith|Õ40 হিন্দু ধর্মের বাতাবরণে বিদ্যাসাগরের এই মূল্যায়নে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি প্রয়াত ঈশ্বরচন্দ্রের জীবন ও কর্মকে স্থাপন করেছিলেন। ভাগবত গীতার সুমহান শিক্ষা ও মর্মবাণীর প্রেক্ষাপটে ভাগবত গীতার বাণীই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল।৪১ তুলনায় মহেন্দ্রলাল সরকারের বক্তব্য অনেকটা ভারসাম্যযুক্ত ছিল।৪২ কিন্তু বিদ্যাসাগরের বিদ্যাসাগরত্ব প্রতিষ্ঠা করার কেউ ছিলেন না সেখানে। সেই অকৃত, অসম্পন্ন কাজ যথাযথরূপে সম্পন্ন করার কাজটিই করলেন রবীন্দ্রনাথ। স্মরণস্তম্ভ প্রতিষ্ঠার চেয়ে অনেক বড় কাজ তাঁকে করতে হয়। এতে শুধু বাঙালি রক্ষা পেয়েছিল তা নয়, রক্ষা পেয়েছিলেন বিদ্যাসাগরও। ঘটনাক্রমে এমারেন্ড থিয়েটার রঙ্গমঞ্চে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সুলিখিত চরিতকথা পাঠ করেন যে-সভায় সেই সভার সভাপতি ছিলেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। টাউন হলের নাগরিক সভায় তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের স্মরণসৌধ স্থাপনের আনুষ্ঠানিক সমর্থক। তিনি এখানে সভাপতির ভাষণে বললেন, ‘কীর্ত্তিচিহ্ন প্রতিষ্ঠিত না হউক বিদ্যাসাগর বাঙালি মাত্রেরই হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত।’৪৩ ‘বাঁচিল গোবু রক্ষা পেল ধরা।’৪৪ সুবলচন্দ্র মিত্র তাঁর জীবনীগ্রন্থে এ-সম্পর্কে লিখেছেন :

The President in deep desponoleney said : ‘I see no harm in that we have failed to erect a monument; Vidyasagar himself is engraved in the heart of every native of Bengal.

This was no doubt an expression of helpless consolation arising out of heart-rending disappointment.45

কথাটা খেয়াল করবেন – ‘heart-rending disappointmentÕ.

১.   ‘ড্রোজু সাহেবের মরণ’, সংবাদ রত্নাকর, ২৪ পৌষ, ১২৩৮; Derozio Remembered, Birth Bicentenary Celebration Commemoration Volume, Sources and Documents, Vol. 1 (1830-1947), compiled & edited by Saktisadhan Mukhapadhyay, Derozio Commemoration Committee, Kolkata, 2008, pp13-14.

২.   ÔLamented Death of Mr. Derozio’, East Indian, rpt India Gazette, Dec. 29, 1931; Song of the Strong Petrel, Complete works of Henry Loius Vivian Derozio, Edited by Dr. A. Mukhapadhyay. A. Dutta, Adhir Kumar, Dr. S S Mukhapadhyay, Derozio Commemoration Committee, Progressive Pub, Feb 2001, pp 413-414.

৩.           ‘মহাত্মা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিয়োগে শোকোচ্ছ্বাস’, শ্রীমা (শ্রীমতি মানকুমারী বসু), বামাবোধিনী, ভাদ্র ১২৯৮ বঙ্গাব্দ; ঈশ্বরচন্দ্র এক নক্ষত্রের প্রয়াণ, উদয়ন মিত্র, (অতঃপর উ. মি.) (২০১৪), দ্বিতীয় সং ২০১৬, পৃ ২৮০-২৮২।

৪.   ÔLetter to the editor of the Indian Mirror, B. K. Mazumder’, The 29th July, 1891; The Indian Mirror, July 30, 1891, উ. মিত্র, তদেব,  পৃ ২০৪।

৫.            চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিদ্যাসাগর (১৩০২, ২রা জ্যৈষ্ঠ), তৃতীয় সং, ১৭ আষাঢ়, ১৩১৬, পৃ ৫৫২।

৬. ÔDeaths’, Calcutta Gazette, Monday Evening, Dec. 26, 1831.

৭.   ÔCondolence Meeting For Derozio, Govt. Gazette, January, 1832, Song of the Stormy Petrel (hence forth SSP) Ibid. pp 422-423.

৮. ÔProposed Inscription to the Monument, Govt. Gazette, March 26, 1832; SSP. Ibid, pp 423-424.

৯. ‘স্মৃতিস্তম্ভ’, সমাচার দর্পণ, ৪ এপ্রিল ১৮৩২, ২৪ চৈত্র ১২৩৮; SSP,
p 424.

১০. ÔDerozio Monument’, India Gazette, Tuesday, June 4-8, 1833, SSP, p 424.

১১.Henry Louis Vivian Derozio’, [A memoir by C. J. Montegue] The Oriental Magazine, Vol.1, No10. Oct. 1843; SSP, p 426.

১২.ÔHenry Louis Vivian Derozio’ by KND, Note by EWM, The Bengal Past & Present, Vol-3, Calcutta Historical Society, 1909; Derozio Remembered (hence forth D. R.), ibid, p 244.

১৩.        ÔH.L.V. Derozio (Bengali Bird), H. A Stark and E.W. Madge, East Indian Worthies, Being Memoirs of Distinguished Indo-Europeans Cambridge Steam Printing Works, 1892; D. R. p 213.

১৪. ÔHenry Louis Vivian Derozio’, Thomas Edwards, Calcutta Review, Vol. 72, 1881; D. R. p192.

১৫. Thomas Edwards, Henry Derozio (1884) Ridhi edition 1980, pp 182-183.

১৬.        Same as  14bs UxKv,  p181.

১৭. ÔIn Memorium’, The Indian Nation, 3 Aug. 1891; উ. মি. তদেব পৃ ৬৩।

১৮. সাগর-শোকোচ্ছ্বাস, পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিয়োগজনিত শোকোচ্ছ্বাস, ২৭ জন ছাত্রের লেখা কবিতার এই সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল – Published by the Students Metropolitan Institution, Shyampukur Branch, 63 Shambazar Street, 1891. উদ্ধৃত কবিতাংশটির রচয়িতা Jnanendra Nath Roy, Entrance উ.মি তদেব, পৃ ৩২৫।

১৯. ‘স্বর্গীয় বিদ্যাসাগরের স্মরণার্থ মহিলা সভা’,  বামাবোধিনী, ভাদ্র ১২৯৮, সংখ্যা ৩২০; উ. মি, তদেব, পৃ ১৪৫ – এই সভার আয়োজক ছিলেন চন্দ্রমুখী বসু, কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, কামিনী সেন (রায়), অবলা বসু, লাবণ্য প্রভা বসু,  বরদা সুন্দরী ঘোষ প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেছিলেন কামিনী সেন। ঠাকুরবাড়ির জ্ঞানদানন্দিনী ঠাকুরের পাঠানো চিঠিতে ‘তাঁহার (বিদ্যাসাগর) নামে অসহায়, অক্ষম অবলাদিগের জন্য একটি আবাস’ স্থাপনের প্রস্তাব ছিল।

২০.         অমৃত লাল বসু, বিলাপ! বা স্বর্গে আবাহন নাটক, গ্রন্থাকারে  প্রকাশ –  গ্রেট ইডেন প্রেস,  ৬ ভীম ঘোষ লেন; অভিনয়ের প্রথম রজনীতেই প্রকাশিত; উল্লেখ উ. মি., তদেব পৃ ১২৪।

২১.          উ. মি., তদেব, পৃ ১৫২-১৭০।

২২. The Bengalee, August 29, 1891, উল্লেখ উ. মি., তদেব, পৃ ১৫।

২৩.         The Hindoo Patriot, August 29, 1891; উল্লেখ উ. মি., তদেব, পৃ ১৫।

২৪.          উ. মি., তদেব, পৃ ১৫৬।

২৫. The Hindoo Patriot, August 31, 1891, ১৭৪ জনের সদস্য তালিকা মুদ্রিত হয়েছে উদয়ন মিত্রের গ্রন্থে পৃ ২২১-২২৬। লিখেছেন, ‘এই তালিকা যে সম্পূর্ণ এমন দাবি করব না।’

২৬.         শঙ্করী প্রসাদ বসু তাঁর বিবেকানন্দ সমকালীন ভারতবর্ষ গ্রন্থে জানিয়েছেন, মৃত্যুর দুদিন আগে ঈশ্বরচন্দ্রের ‘মনুষ্যমহিমা’ উল্লেখ করে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, ‘After Ramakrishna, I follow Vidyasagar’।

২৭.          ‘স্মৃতিচিহ্ন’ (একটি প্রস্তাব), ভারতী ও বালক, আশ্বিন-কার্তিক, ১৮৯৮, ১৫ সং, লেখক শ্রীপতিচরণ রায়; এ নিয়ে আলোচনা আছে উদয়ন মিত্রের গ্রন্থে – ‘ঈশ্বরচন্দ্রের স্মৃতিরক্ষা : দুর্ভিক্ষ নিবারণী ভাণ্ডার’ – একটি প্রস্তাব,  পৃ ১৭১-১৭৪। উল্লেখ্য শ্রীপতিচরণের নাম বিদ্যাসাগর প্রতিরক্ষা পর্ষদের সদস্য তালিকায় মেলে।

২৮.        গোপন সরকারি প্রতিবেদন – ‘নেটিভ নিউজ পেপারস্’ (রাজনৈতিক দফতর, সেপ্টেম্বর ১৮৯২; উল্লেখ উ. মি., তদেব, পৃ ৩৫৭। সেই নথিতে বেথুন কলেজের মহিলাদের উচ্চ প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে – ‘The ladies deserve great praise for having and carried noble proposal in the court of a year for doing honour to the memory of the great reformer who was once the Hon. Secretary of Ladies College.’

২৯.         উদয়ন মিত্র, ঈশ্বরচন্দ্র একটি নক্ষত্রের প্রয়াণ (২০১৪), দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৬, সোপান, পৃ ১৭৪।

৩০.        The Indian Messenger, Organ of Sadharan Brahmo Samaj (founded 1883), 30 August, 1891, উ. মি., তদেব।

৩১.        নৃপেন্দ্র নারায়ণ ভূপ (৪.১০.১৮৬২-১৮.৯.১৯১১), দ্র. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (মে ১৯৭৬) সংশোধিত তৃতীয় সংস্করণ, জুলাই ১৯৯১ …।

৩২.         B. K. Mazumder, Letter To The Editor of The Indian Mirror, July 30, 1891. ‘India has lost one of her brightest jewel, Pandit Iswar Chandra Vidyasagar in no more.’

৩৩.       ক্ষুদিরাম বসু; ‘বিদ্যাসাগর-স্মৃতি’, ‘পঞ্চপুষ্প’, আষাঢ়; ১৩৩৬। লিখেছেন, একদিন দোকানে কাপড় কিনতে এসে বিদ্যাসাগর তামাক খাচ্ছেন, এমন সময় মহারাজা যতীন্দ্র মোহন ঠাকুর দোকানের সামনে দিয়ে গাড়ি করে যাচ্ছিলেন। তিনি গাড়ি থেকে নেমে বিদ্যাসাগরকে সম্ভাষণ করে বলেন, ‘আপনাকে আমরা এত সম্মান করি আর আপনি খোলার ঘরে বসে এরকম করে তামাক খাচ্ছেন – এটা ভালো ঠেকছে না।’ বিদ্যাসাগর তার কি উত্তর দিয়েছিলেন তা এখানে বাহুল্য।

৩৪.        ডা. দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লেখা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পত্র, ইন্দ্রমিত্র, করুণা সাগর বিদ্যাসাগর (ডিসেম্বর, ১৯৬৯), দ্বিতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ এপ্রিল ১৯৯৭, পৃ ৪৮১-৪৮২।

৩৫.        Sound Advice’, The Indian Messenger, August 30, 1891, উদ্ধৃত উ. মি., তদেব, পৃ ১৬৬।

৩৬.       নবীনচন্দ্র সেন, আমার জীবন (৩), উদ্ধৃত উ. মি.; তদেব, পৃ ১৬৮।

৩৭.         যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুর জন্মভূমি পত্রিকাতে ১২৯৮ থেকে ১৩০১ বঙ্গাব্দে ধারাবাহিকভাবে ‘বিদ্যাসাগর’ জীবনী প্রকাশিত হয়।

৩৮.       ‘অভিসার’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কথা, সঞ্চয়িতা, দশম সং বৈশাখ ১৩৮৯, বিশ্বভারতী, পৃ ৩।

৩৯. ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ ১৩০২ সনের ১৩ শ্রাবণ অপরাহ্ণে বিদ্যাসাগর স্মরণার্থ সভার সাংবৎসরিক অধিবেশনে এমারেন্ড থিয়েটার রঙ্গমঞ্চে পঠিত। চারিত্রপূজা, প্রকাশ ১৯০৭, রবীন্দ্র রচনাবলী ১১ প্রবন্ধ, শ্রাবণ ১৩৯৬, প. ব. সরকার প্রকাশিত, পৃ ১৭২-১৮৫।

৪০.Babu Surendranath Banerjea’s speech at the Town Hall meeting, The Benglee, August 29, 1891.

৪১. উ. মি., তদেব, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য সার, পৃ ১৫।

৪২. Dr. Mohendra Lal Sircar’s Speech, The Bengalee, September 5, 1891.

৪৩. উ. মি., তদেব, পৃ ১৮০।

৪৪.         ‘জুতা আবিষ্কার’ (১৩০৪), কল্পনা, সঞ্চয়িতা, তদেব পৃ ৩১০। ৪৫. Subal Chandra Mitra, Iswar Chandra Vidyasagar, Story of His Life and Work (1907), Parul edition 2001, reprint 2013, p 440.

Leave a Reply