বিমূর্ত ছবির কবি

লেখক:

জাহিদ মুস্তাফা

প্রকৃতির বিচিত্র রূপের সঙ্গে শিল্পীর দেখা, তার রং-রস নিজের মনের ভেতরে নেওয়া, তার সৌন্দর্যকে অনুভব করা এবং দর্শকের চোখের সামনে সেসবের নির্যাস তুলে আনা দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়া। সেই দীর্ঘপথে দীর্ঘকাল ধরে চলছেন শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস। প্রকৃতির অন্তর্গত রূপ, তার অভিব্যক্তিকে কবিতার মতো তুলে ধরেন শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস। প্রকৃতির প্রেমে পুষ্ট শিল্পী তাঁর সৌন্দর্য-চেতনাকে অনুবাদ করেছেন বহুমাত্রিক ফর্ম, টেক্সচার, স্বতঃস্ফূর্ত ওয়াশ ও রেখায়। শিল্পীর চোখে জায়গা নেওয়া প্রকৃতিকে নিজের মানস চোখের আলোয় তুলে এনেছেন। অন্য এক প্রকৃতি বহুরূপে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর চিত্রপটে। গুলশান লেক-সংলগ্ন প্রকৃতির নন্দিত আবহে আধুনিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন বে ওয়াটার এজ ভবনে প্রতিষ্ঠিত এজ গ্যালারিতে আয়োজিত হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ এ-প্রদর্শনী।

বাংলাদেশের সমকালীন চারুশিল্পে বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদী চিত্রকরদের মধ্যে মোহাম্মদ ইউনুস আপন বৈশিষ্ট্যে দেদীপ্যমান। গত শতকের সত্তরের দশকে তাঁর শিল্প-অভিযাত্রার সূচনা। ১৯৭৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে চিত্রকলায় স্নাতক এবং ১৯৮৭ সালে তিনি জাপানের তামা চারুকলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে তিনি গবেষণা ফেলোশিপ লাভ করেন। সে-সময় আমরা দেখেছি, শিক্ষার্থী-শিল্পী হয়েও ছবি আঁকার পারদর্শিতার জন্য তিনি সুধীমহলের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিলেন। আশি ও নববইয়ের দশকে তাঁর বেশ কয়েকটি একক চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে ঢাকা ও টোকিওতে। এ-সময় শিল্পী হিসেবে তাঁর অবস্থানটি বেশ পোক্ত হয়।

দেশে-বিদেশে গত আটত্রিশ বছরে তাঁর একক প্রদর্শনী হয়েছে চলিস্নশটি। ১৯৭৯ সালে তাঁর প্রথম একক অনুষ্ঠিত হয় ঢাকার গুলশানে সাজু আর্ট গ্যালারিতে। এবার ছয় বছর পর আয়োজিত হয়েছিল শিল্পীর একক প্রদর্শনী। ‘বিমূর্ত সম্পর্ক’ শিরোনামে আয়োজিত বর্তমান প্রদর্শনী শিল্পীর একচলিস্নশতম একক। এতে সাম্প্রতিককালে আঁকা শিল্পীর অর্ধশত চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে।

শিল্পীর কাজের ধরনের সঙ্গে আমরা এক ধরনের মিল খুঁজে পাই চলিস্নশ ও পঞ্চাশের দশকের সুপরিচিত পাশ্চাত্য শিল্পী জ্যাকসন পোলক, মার্ক রথকো, উইলিয়াম ডি কুনিং প্রমুখের। এদেশের মোহাম্মদ কিবরিয়া, মাহমুদুল হক প্রমুখের বিমূর্ত প্রকাশবাদী চিত্রকলার সঙ্গে একতা লক্ষ করা যায়। তবে ইউনুস নিজগুণে ও দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সে-প্রভাব অতিক্রম করেছেন।

নিয়মিত ছবি আঁকা সৃজনশিল্পীর কাছে ভ্রমণতুল্য এক অভিজ্ঞান। শিল্পী ইউনুসের কাছে এই ভ্রমণ ঠিক নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা নয়, বরং যাত্রাপথে নতুন কিছু অনুসন্ধান কিংবা আবিষ্কারের চেষ্টা। শিল্পীর কাছে শিল্পসৃজন একধরনের গবেষণা। প্রতিনিয়তই নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে শিল্পীর নিজের সৃজনের স্বকীয় জায়গাটা বের করে নিতে হয়। এজন্য শিল্পী ইউনুসের চিত্রপটে অনেকগুলো বর্ণপর্দার আবির্ভাব ঘটে। একেকটি বর্ণপর্দার পরতে পরতে যে রং থাকে, তার কোনো কোনো অংশ ক্রমান্বয়ে স্বচ্ছ হয়ে চিত্রের উপরিভাগে উঠে আসে। ফলে নানা বর্ণপর্দার মিথস্ক্রিয়ায় দৃষ্টিনন্দন রূপ লাভ করায় অনন্য হয়ে ওঠে তাঁর সৃজন। দেয়ালের গল্প সিরিজের কাজগুলোয় তাঁর এই বিশেষ টেকনিকের প্রয়োগ দেখা যায়। একটি দেয়াল প্রথমে পরিচ্ছন্ন থাকে, পরে সময়ের পরিবর্তনে প্রাকৃতিকভাবে যেমন এটি বদলে যেতে থাকে, তেমনি রক্ষণাবেক্ষণের কারণেও এর অবয়ব বদলে যায়। এই বদল প্রক্রিয়াকে নন্দিতভাবে তুলে ধরেছেন শিল্পী।

সৃজনশিল্পীদের আলাদা একটা জগৎ থাকে। সেই জগৎটার নির্মাণ আর লালন-পালন শিল্পীকেই করতে হয়। না হলে তো অন্যের সঙ্গে নিজের জগৎটার ব্যবধান থাকে না। প্রকৃতিকে বিষয় করে ছবি আঁকেন না এমন শিল্পী বিরল, অন্তত আমাদের দেশে। এখানে একজনের কাজের ধরন ও টেকনিকের সঙ্গে দৃশ্যত অন্যদের কিছু বিষয়ের সাদৃশ্য ঘটা বিচিত্র নয়। শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস এ-বিষয়ে সচেতন থেকেই দীর্ঘকাল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিজের এক চিত্রভাষা ও প্রকরণ নির্মাণ করেছেন।

কালো, ধূসর, ছাই যেন ইউনুসের নিজের রং। এসব রং পাওয়া যায় আমাদের মাটিতে – শুকনো কিংবা কাদামাটিতে, খড়ির চুলা থেকে নদীতীরবর্তী বালুকাবেলায়। এই রং নিয়ে শিল্পী খেলেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। আমরা দেখতে পাই জন্মস্থান দূর-মফস্বল শহর ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি ও প্রকৃতির রং যেন নতুন করে আবিষ্কৃত হয়েছে শিল্পীর চিত্রপটে। ২০১৫ সালে ‘আঁকা ডার্ক ইমেজ’ নামে চিত্রে ধূসর বর্ণের মায়াময় আবহের দক্ষ ব্যবহার করেছেন শিল্পী।

ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামাঞ্চলের মাটির ঘর, কৃষকের খননযন্ত্রের ইমেজ ও টেক্সচার যেন তুলে এনেছেন তাঁর চিত্রপটে।

তাঁর কিছু ছবিতে আমরা শিশুদের আঁকা ছবির অঙ্কনবৈশিষ্ট্য দেখতে পাই। ‘অসহজ অবসর’ শিরোনামে তাঁর আঁকা নীলাভ ধূসর আবহে এক নদীবক্ষি পাঁচটি নৌকার ছবি শিশু আঁকিয়ের সরলতায় এঁকেছেন ইউনুস। ‘গ্রীষ্ম’ নামের সিরিজ চিত্রেও শিশুচিত্রকলার কতক অঙ্কনবৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। শিশুদের রেখাচিত্রের সাবলীল ও সহজ পদ্ধতিতে তিনি প্রায়শই ভর করেছেন। এ-প্রসঙ্গে শিল্পীর স্বীকারোক্তি – শিশুদের সরল অঙ্কন তাঁকে আকৃষ্ট করে। এজন্য তিনি সচেতনভাবে শিশুদের আঁকার ধরনকে শিশুর সারল্যেই তাঁর চিত্রপটে তুলে ধরেন।

শিল্পী তাঁর চিত্রকর্ম প্রসঙ্গে নিজেই কবুল করেন – কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন, এটা কী এঁকেছেন, আমি এর মানে বোঝাতে পারব না। তবে অনুভব করার জায়গাটি তাঁকে ধরিয়ে দিতে পারব। আমার কাজ প্রকৃতির অভ্যন্তরের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করা। শিল্পীমনের আধ্যাত্মিক অনুভূতির সংমিশ্রণ নিয়ে রং-রেখা-টেক্সচার নিয়ে আমার আঁকা, যা মনের ক্ষুধা নিবারণ করে, ধ্রম্নপদী সংগীতের মতো শরীর ও মনকে আন্দোলিত করে, হৃদয়কে স্পর্শ করে।

এবারের প্রদর্শনীতে বড় আকারের কয়েকটি ক্যানভাসে শিল্পী অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল রং ও টেক্সচার এঁকেছেন। সেগুলোও ভারি দৃষ্টিনন্দন হয়েছে শিল্পীর দক্ষ হাতের কাজে ও টেকনিক প্রয়োগের মুনশিয়ানায়। এর একটি কাজের শিরোনাম ‘কসমোপলিটন রেড’। এটি ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা। এ ছাড়াও প্রদর্শনীর কাজগুলো শিল্পী করেছেন তেলরং ও মিশ্ররঙে। ছাপচিত্রীদের অঙ্কন টেকনিকও প্রয়োগ করেছেন শিল্পী। ফলে বেশ বৈচিত্র্য এসেছে প্রদর্শনীতে। শিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক পদে কর্মরত।

আলোচিত বিশাল এই প্রদর্শনী শুরু হয় গত ১৮ মার্চ। এটি চলে ৩১ মার্চ পর্যন্ত। r