মেয়াদকাল

এক সকালে বাহাত্তর  বছর বয়স পার করে ফৈয়াজ খান হঠাৎ করে রাস্তায় মরে পড়ে থাকেন।

উত্তরা মডেল টাউনের প্রশস্ত রাজপথ পেরোচ্ছিলেন। ব্যস্ত রাস্তা – সকাল, বিকাল, রাত্রি বলে কথা নেই – শা-শা করে নানা পদের দ্রুতগতির যানবাহন সব সময় ছুটছে। অত্যাধুনিক জীবনের ফরমেট বদলাচ্ছে। কেবল বদলাচ্ছে না, গতি বাড়ছে। এটা ঠিক, ফৈয়াজ তাল মেলাতে পারছিলেন না এই তীব্র বেগের সঙ্গে। ফুটওভার ব্রিজ তৈরি করে দেয়নি নগরীর মেয়র, চান না মনে হয় এ-পথ পথচারীর হোক। ফৈয়াজ মনে করেন না যে তার স্নায়ু, অনুভূতি দুর্বল হয়ে এসেছে বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমে এসেছে।

ফুটওভার ব্রিজ নেই, জেব্রা ক্রসিং নেই, এই রাস্তার দুই প্রান্তের ট্রাফিক সিগন্যাল যথেষ্ট দূরে দূরে। পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে গতিপথের দ্রুতগতির চলন্ত গাড়িগুলোর ফাঁক গলিয়ে জিমন্যাস্টের মতো প্রায় কোমর দুলিয়ে একটা পর্ব শেষ করলেন। রাস্তার মাঝখানের আইল্যান্ড প্রায় দেড় ফুটের মতো উচ্চতার। চমৎকার কসরত দেখিয়ে তাতে উঠে পড়েন। এবার পশ্চিম থেকে পূর্বে আসার গাড়িগুলোর দিকে তাকাতে হয়। এপার থেকে ওপার যেমন মনে হয়, ওপার কখনো সেরকম নয়। এপার আর ওপার বরাবর একই। কে কোথা থেকে দেখছে সেটা আসল। মজা হচ্ছে ফৈয়াজ খানকে আটকাতে বা মজা করতে বা বিপদে ফেলতে মোকাবিলা করার গাড়ির বহর ও গতি আরো বেড়ে যায়।

মুচকি হাসেন ফৈয়াজ। হাসিটা মনে আছে তাঁর।

চোখ বুজে চলন্ত গাড়ির তিন-চার সারি পেরিয়ে আসেন, বোঝেন যে হঠাৎ করে কাউকে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে হয়, কাউকে ব্রেক চাপতে হয় ঘ্যাস শব্দ করে।

যাক সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে তিনি সফল হতে পেরেছেন।

এবার ফুটপাতের ওপর উঠবেন বলে একটা পা তুললেন, সেই পা ফুটপাতের নাগাল পেলে তাতে ভর করে পেছনের পা-টা তুলবেন; কিন্তু কি হলো দুই পা-ই যেন মাটি পেল না। তিনি পড়ে গেলেন ও মরে গেলেন। মরে যেতে বেশি বেগ পেতে হলো না। শরীরের ভেতর কোথায় কি ছিঁড়ল তা ভালোভাবে বুঝে ওঠা গেল না।

বেঁচে থাকতে থাকতে চোখের সামনে, চোখের আড়ালে অনেক রকমের মৃত্যু দেখতে হয়। ফৈয়াজের মা বা বড় বোনের এই রকমের নিঃশব্দ মৃত্যু হয়েছিল। মা ঘুমের ভেতর মরে পড়ে ছিলেন। বড় বোন নিজের সংসারে রাতের খাবার খেয়ে সুস্থির হয়ে টেলিভিশন দেখছিলেন, চেয়ারে বসা, মাথাটা কাত হয়ে পড়ে যায়। পানি খাবেন, হাতে তুলে নিয়েছিলেন ভরা গ্লাস, হাত থেকে পড়ে কাচের টুকরোগুলো মেঝেতে নাচতে থাকে। বাবা অবশ্য মৃত্যুর আগে দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন; সত্যি বলতে সবাই মৃত্যুটার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।

যার যেমনই মৃত্যু – মৃত্যুতে নাম, পরিচয়, আইডেন্টিটির খোলস ছাড়িয়ে পরিণতি একটা লাশ। বেডরুম থেকে লিভিং রুম থেকে সরাও লাশ, বাইরে নিয়ে যাওয়ার দরজার কাছাকাছি নিয়ে রাখো সাদা কাফনে জড়ানো লাশ।

ফৈয়াজ মরে গেছেন। তবে যেমন কাফনে মোড়া পড়েননি তেমনি শরীরও সব অনুভব-অনুভূতি ছেড়ে যায়নি। মৃত্যুর কত কত ঘণ্টা পর পর্যন্ত যেন কোন কোন অর্গান কার্যক্রম চালু রাখে। তাঁকে এখনো লাশ ডিক্লেয়ার করা হয়নি, তাই তাঁর পক্ষে যতটুকু সম্ভব চারপাশে যা কিছু আছে সেসবের তাঁর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।

সময়ের চলার সঙ্গে একজন-দুজন এসে দাঁড়ায়। ফৈয়াজের ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করে। নিজেদের করণীয় নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে। ফৈয়াজ আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেন, ভাই এটা খুনের কেস না। পুলিশ-কোর্ট কেসে জড়াতে হবে না। সুইসাইড কেসও না। জীবনে আমার বহুবার যে সুইসাইড করার ইচ্ছা হয়নি তা নয়। তবে এটা সুইসাইড কেস নয়। সামনের হাসপাতালে নিয়ে যান, ডাক্তার পাকস্থলী ওয়াশ করলেই বুঝতে পারবে। গাড়ি চাপা পড়লেও ওইরকম কিছু একটা সন্দেহ করতে পারতেন। ভাবনা ও গভীর অনুসন্ধানের খোরাক পেতেন – দুর্ঘটনা, না নিজে চলন্ত গাড়ির সামনে পড়েছে। ফৈয়াজ বুঝতে পারেন তাঁর আলাপচারিতায় কিছু কাজ হচ্ছে। দুই-তিনজন টেনেটুনে আধভাঙা অবস্থা থেকে তুলে সোজা করে ফুটপাতের একপাশে নিয়ে শুইয়েছে তাঁকে। ফৈয়াজ এর ভেতরই তাঁর পকেট হাতড়াহাতি টের পান। তাঁর মোবাইল ফোন, হাতের ঘড়ি, পকেটের মানিব্যাগ শরীর হাতানোর কৌশলে হাতবদল হয়ে গেছে। মানিব্যাগের খোপে জাতীয় পরিচয়পত্র, দুইটা ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড। এগুলো হারিয়ে ততোটা খারাপ লাগছে না – এইসব জাগতিক হিসাবের বাইরে ভাবতে ভালোই লাগছে। তবে প্রকৃতই পরিচয়হীন হয়ে পড়লেন। তিনি কে – পরিচয় খুঁজে পাওয়াটা কঠিন হয়ে পড়ল।

মারা যখন গেছেন, নিজেও তিনি নিজেকে ভুলে যেতে থাকবেন।

লাশ কাছের হাসপাতালে ঢোকার সুযোগ পেল। কিন্তু ঢোকার মুখে রিসিপশনে আটকালো – এটা যদি রোগী হয় তাহলে রোগীর সঙ্গে অ্যাটেনডেন্ট কে, চিকিৎসার বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা আছে কি না।

জবাব পাওয়া গেল, ফুটপাতে পড়ে ছিল, নিয়ে এসেছি। আমরা এই লোকের কেউ না, চিনি না। দয়াপরবশ হয়ে নিয়ে এসেছি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলল, এখানে দানছত্র খোলা হয়নি। ফেলো কড়ি মাখো তেল। রোগীর নিজের টাকা-পয়সা দেওয়ার সংগতি থাকতে হবে। না-হয় দায়িত্ব নেওয়ার কেউ থাকতে হবে। এই লোকের পকেটে কিছু থাকলেও আপনারা নিশ্চয়ই সেসব সরিয়ে ফেলেছেন।

ফৈয়াজ খানের সঙ্গে যারা এসেছে, তারা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে।

তারপর ভস্ম করে দেওয়ার দৃষ্টিতে তাকায় – আমাদের চোর, ছিনতাইকারী ভাবছেন, এত দুঃসাহস!

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলে, এটা লাশ হলে আমাদের করণীয় কিছু নেই।

– এটা জানতেই এসেছি, আপনারা বুকে স্টেথিস্কোপ, হাতের নাড়ি টিপে দেখেন, লাশ কি না!

ফৈয়াজ বলেন,  আমি লাশই। এখান থেকে আমাকে নিয়ে চলেন, উত্তরা থানা কাছে। ওদের কাজকর্মটাও দেখি। এখন তো ওটিটি, থ্রিলার ওয়েব সিরিজের যুগ। কিছু গল্প মাথায় তো ভনভন করবেই। আমি একবারে ফেলনা কেউ না। দেখি তৎপর হয়ে কিছু বের করতে পারে কি না। পুলিশ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা।

দিন বদলেছে। ফৈয়াজ তাঁর ধারণায় যে থানা পুলিশ চিনতেন বাস্তব থানা পুলিশ এর চেয়ে অনেক বেশি কাজের দায়িত্বে জড়িত এখন।

গরু খোঁজার কাজে নামবে না কেউ।

ফৈয়াজ মর্গের টেবিলে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পান। বাহ্  মরে গিয়েও দিব্যি
শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে।

ফৈয়াজ বেশ ধীরেসুস্থে ভাবতে পারেন, এবার হিসাব-নিকাশের কিছু কাজ করা যাক নিরুপদ্রবে।

ফৈয়াজ কিছু বোঝার আগে মর্গের টেবিলে পৌঁছে গেলেন। বেশ কয়েকটি ওটিটি ওয়েব সিরিজে‌ ফৈয়াজ মর্গ দেখেছেন তাই জায়গাটা তার চেনা।

তড়িঘড়ি করে সংসারের ঝুট-ঝামেলা থেকে বের করে এনে মর্গে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করল যে, তাকে মনে হয় ফৈয়াজ চিনতে পেরেছেন। মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ এই লোকের হাতে গেছে।

ফৈয়াজ বেশ ধীরেসুস্থে ভাবতে পারেন, এবার হিসাব-নিকাশের কিছু কাজ করা যাবে নিরুপদ্রবে।

কয়েকদিনের জন্য ঝর্না দেশে এসেছিল – স্বামী-স্ত্রীর পাসপোর্টের মেয়াদ সব সময় একসঙ্গে শেষ হয়। আবার রিনিউ করা। সারাজীবন ছড়ি ঘুরিয়েছে ঝর্ণা, কিন্তু কাজ করে যেতে হয়েছে  ফৈয়াজকে। অনলাইনে বাংলাদেশের পাসপোর্টের দরখাস্ত করতে গিয়ে টের পান, এই প্রথম অন্যরকম কিছু একটা ঘটছে। দুজনের নতুন পাসপোর্টের মেয়াদকাল হবে দুই রকমের। ঝর্না পাবে দশ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট। ৭২ বছর বয়সের ফৈয়াজের পাঁচ বছর। এর অন্যথা হওয়ার নয়। বোকা বোকা চোখ করে ঝর্নার দিকে তাকিয়েছিলেন – ঝর্ণার চোখের উপহাসটুকু দেখতে।

এবার ধরা পড়ে গেছো মিয়া। তোমার খেল খতম।

এমনিতে আর ফৈয়াজের দেশ-বিদেশ ঘোরাঘুরি নেই। উল্টো অবস্থা ঝর্ণা দেশে এসে থাকে না বছরে দুই মাসও। ফৈয়াজের  কারণে ঝর্নার অন্য কোনো দেশের গ্রিন কার্ড/ পিআর কার্ড, নাগরিকত্ব নেওয়া হচ্ছে না।

ছেলেমেয়েরা বলেছে মাকে, বাবার সঙ্গে মিলাচ্ছো কেন? তোমার জন্য দরখাস্ত করে ফেলি – তোমারটা হয়ে যাক।

রহস্যটা জানে না ফৈয়াজ, এই একটা জায়গায় স্বামীর সঙ্গে সুতোর গিঁট বেঁধে আছে কেন ঝর্না?

এটা ঠিক যে, ছেলে ও মেয়েকে প্রতিপালন করেছে, গড়ে নিয়েছে ঝর্নাই। টাকা জুগিয়েছেন ফৈয়াজ, দিনরাত পরিশ্রম করেছেন; লেখাপড়ার জোরে সরকারি চাকরি জুটেছিল। ঘরসংসার শুরু করতে দেখলেন বাঁধাধরা আয়ে ঝর্নার মন ভরাতে পারছেন না। ঝর্নার কাঁধে দায় চাপানো সহজ। ছাপোষা জীবন নিজেরও পছন্দ হচ্ছিল না। এই-ওই কোম্পানির হয়ে কাজে নামলেন। নামে কোম্পানি – ওয়ানলেনম্যান শো। একেকজন ধুরন্ধর-ক্ষমতাবান-সাংঘাতিক পরিশ্রমী মানুষের সামনে যা সবকিছু দখল করে ফেলা। মুখে বুলি – দখল করো – সব বাধা উড়িয়ে দেওয়ার জন্য পথ পয়দা করো। কোনো কিছু হবে না নেই। ফৈয়াজ যে কয়জনের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন তাদের কমান্ড ছিল এটুকুই – টাকা উপার্জনের পথে কোনো কিছুই বাধা নয়, কোনোটাই অপরাধ নয়। মালিকের সঙ্গে তাঁর টিউনিং হয়ে যায়। মাথা খোলে, তাঁর বুদ্ধিতে কোম্পানি লাভবান হয়। তাঁর আয় বাড়তে থাকে, সংসারের শ্রীবৃদ্ধি  হয়। সংসার তাঁকে পায় কম। যে ফৈয়াজ দুধ খাওয়া ছেলে ও মেয়ের শরীরের গন্ধ না শুঁকে ঘুমাতে পারতেন না, একসময় টের পান, ওদের সঙ্গে দেখা, কথা, ভাববিনিময় হয় কম। ঝর্না ছেলে ও মেয়ের মালিকানা নিয়ে নেয়। তাঁকে ঝর্না যে ছেলে ও মেয়ের কাছে একটা অমানব, ভিলেন বানাতে থাকে তা কি দখলদারির লোভে? নিয়ম-অনিয়ম নানা পথে ফৈয়াজদের কোম্পানি অপরাধ করে আয়-উপার্জন করে। অপরাধ আর আয়ে দুটোতেই তাঁর শেয়ার। আয়ের টাকাটা নেয় ঝর্ণা আর ময়লাটা লেগে থাকে তাঁর গায়ে।

ঝর্ণা ছেলে ও মেয়েকে বাবার এই ময়লামাখা চেহারাটা দেখাতে চায় না। ২৪ ঘণ্টা মদ খেয়ে মাতাল একটা লোক, দলবল নিয়ে ফুর্তি, মেয়েমানুষের শরীরও আনন্দের একটা বড় উপকরণ।

ছেলে বড়, মেয়ে ছোট। কিন্তু মেয়ে তাড়াতাড়ি পরিণত হয়ে উঠছে। মেয়ের চোখে তার প্রতি ঘৃণা বেশি। ছেলের কেন মনে হয়েছে বাবাকে দরকার, তাই পুরো মুখটা একেবারে ঘুরিয়ে নেয়নি।

বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বানাতে হয়নি, ফৈয়াজ জানে ঝর্ণা যে ন্যাকড়া বা ত্যানার মতো ছুড়ে ফেলে দিতে চেয়েছে বা দিয়েছে তাঁকে যত না স্বামীর কুৎসিত কর্মকাণ্ড, দানবীয় আচরণ এসবের জন্য – সে মানতে পারেনি কোন বেলায় কার সঙ্গে বাল্যপ্রেম ছিল, কার সঙ্গে কী শরীর টেপাটেপি করেছে তা ঝর্নার জীবনে টেনে আনা কেন?

ফৈয়াজের মেয়ে থাকে কানাডায়। ফেসবুকে দেখেন মেয়ের ঘরের নাতি-নাতনি বড় হচ্ছে। তাঁর ছেলেমেয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা হলো না। এর পরের প্রজন্মের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার কোনো সুযোগই আর নেই। মেয়ে চায় না, বাবা তার বাড়িতে বেড়াতেও আসুক। বয়স মানে না। আত্মীয়স্বজন মানে না। যার সঙ্গে যা বলা যায় না, তা নিয়ে কথা বলে। অহংকারী, হামবড়া ভাবের একটা লোক। যার মসজিদ, ওয়াজ-মিলাদে গিয়ে বসে থাকার বয়স, সে খুঁজে বেড়ায় কোথায় দামি মদ পাওয়া যায়। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছে মুখ দেখানোর উপায় থাকে না।

ছেলের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট হয়ে গেল। ছেলেকে অনেক টাকা খরচ করে আমেরিকায় পড়তে পাঠিয়েছেন। ভালো করছে সেখানে। বাবার মতো মেধাবী। ঝামেলা বাধল, যার সঙ্গে কাজ করছিলেন ফৈয়াজ তাঁর ভাইয়ের মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেওয়াতে চাইছিল ছেলের, মেয়ে তাহলে তাড়াতাড়ি গ্রিন কার্ড পেয়ে চলে যেতে পারবে। ফৈয়াজ দেখেছিলেন মেয়েকে। বড়লোকের মেয়ে হলে যা হয় আর কি ডল ডল টাইপ।
দেহ-মুখ সুন্দর আর কী চাই!

ছেলেকে চাপ দিতে গেলে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো, তার বাবার টাকা-পয়সা আর দরকার নেই।

লিভ টুগেদার করছে কোনো সাদা মেয়ের সঙ্গে – এই তথ্যও ঝর্ণার কাছ থেকে পাওয়া। তবে দেখেছেন ঝর্ণার ততটা বিরাগ নেই ছেলের প্রতি। ছেলের কাছে গিয়ে থাকে ঝর্না বছরের অনেকটা সময়। ওরা নিজেরা কি ইকুয়েশন করে নিয়েছে কে জানে?

কিন্তু ফৈয়াজের কারো সঙ্গেই বনল না, কোনো ইকুয়েশন ঠিক ঠিক ফল দিলো না।

লাশে পরিণত হলে এই একটা সমস্যা চিত হয়ে টানটান শুয়ে থাকতে হয়। বুঝতে পারেন লোহার ফ্রেমের ওপর স্টিল শিট দিয়ে তৈরি বেঞ্চে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তিনি একা নন। সারি সারি আরো কয়েকটা বেঞ্চ। খালি থাকে না মনে হয় একটাও। হতে পারে দৈনিক যত বেওয়ারিশ লাশ জমে তার তুলনায় মোট বেঞ্চের সংখ্যা কম। যাদের ঠাঁই মিলল না এর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় তাদেরও ত্বরিত একটা গতি নিশ্চয়ই হয়ে যায়। তবে সে-কাজটাও সহজ-সরল নয়। দেখা গেছে মানুষ গুম হয়ে যেতে পারে; কিন্তু কোনো লাশই লাপাত্তা হয় না। লাশ কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল তা নিয়ে কত হিট সিনেমা।

একটা সময় তো কারো জানা প্রয়োজন পড়তেই পারে, জলজ্যান্ত  লোকটা যতই এক্সপায়ারি ডেটের কাছাকাছি হোক, অপ্রয়োজনীয় হোক, গেল কোথায়? ঝর্ণা বা তার ছেলেমেয়ের এই খোঁজের কথাটা দরকার পড়বে, কে জানে? পড়বে না।

 ঝর্না এটাও প্রচার করে দিতে পারে, এই লোক ৭২ বছর বয়সে আরেকটা বিয়ে করে ফেলেছে। পুরনো প্রেমিকা মরে বেঁচেছে না হয় তার কাছে যেত। ঝর্ণা তাকে এবার এসে বলেছে সে কোনো একটা উপন্যাস পড়েছে নাকি ফেসবুকে দেখেছে একটা জনপ্রিয় উপন্যাসের উদ্ধৃতি – মরে গেলেও সামনে দিয়ে মেয়েমানুষ গেলে যে চোখ তুলে তাকাবে সে পুরুষ মানুষ। ঝর্ণা যোগ করে পুরুষ মানুষকটা একজনই – ফৈয়াজ।

পরীক্ষাটা হয়ে গেলে হয় এখন। আর তখনই একটা মেয়ের গলার ডাক শুনতে পেলেন – আঙ্কেল।

মরে যাওয়ার পরে এই একটা সুবিধা পাওয়া যায়। চোখ খোলা, চোখ বন্ধ – আলো বা অন্ধকার কোনো তফাৎ হয় না। একই রকম চাঁদের আলোর মতো ফকফকা। মৃতের অন্ধকারের দরকার নেই। সে কোনো কিছু লুকায় না। যতক্ষণ বেঁচে থাকে ততক্ষণ গোপনচারিতা।

ডাকটা আরো কাছ থেকে শুনলেন ফৈয়াজ – আঙ্কেল।

আঙ্কেল সম্বোধন যখন মেয়ের বয়সী হবে কেউ। কণ্ঠ শুনে তো বয়সটাও বোঝা যায়।

যা হওয়ার কথা ছিল সব হয়ে গেছে – আর রোমাঞ্চকর খুব বেশি কিছু হওয়ার উপায় নেই তাঁর জীবনে।

বেশি আগ্রহ না দেখেও জবাবটা দেন, জবাব না বলে প্রশ্ন করাই বলা যেতে পারে।

– আঙ্কেল বলছ, কে তুমি বলো তো!

– এখন এরকম ভান করছেন কিছুই জানেন না, বোঝেন না।

ফৈয়াজ বুঝতে পারেন মেয়েটার জোর খাটানোর অধিকার আছে তাঁর ওপর, না হলে এভাবে বলছে কেন!

চুপ করে থাকা শ্রেয়। জীবনে এত বেশি ভুলভাল হয়ে গেছে।

– চুপচাপ সটকে পড়বেন ভেবেছিলেন, আঙ্কেল আপনাকে আমি নিতে এসেছি।

– কোথায় নেবে বলো তো! তোমার সঙ্গে যাবোই বা কেন আমি?

– ভেবেছিলেন সব গোছানো শেষ, ভাবছিলেন একই ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়া গেছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা হয়ে যাচ্ছে দুজনে।

এরকম একটা কিছু ভাবছিলেন যেন ফৈয়াজ। ধরা পড়ে গেছেন অল্প বয়সী একটা মেয়ের কাছে।

– কার কথা বলছ বলো তো!

– যার কথা জপেন দিনভর। ভাবেন যে তাকে পেলেন না বলে জীবনে কিছু হলো না। জাঁক করে বলতেন আমার মাকে, আপনার জীবন যাপন করাটাই হলো না।

– ও তুমি লতার মেয়ে, বিনতা?

– চিনতে পারছেন তাহলে? দিনরাত্রি ফেসবুক ঘাঁটাঘাঁটি করে একজনের প্রোফাইল থেকে আরেক প্রোফাইলে ঢুকে আমাকে, আমার ভাইকে, বাবাকে খুঁজে বের করলেন।

– লতা অসুখে পড়ে চলে গেল। ফাঁকা লাগত। একটা কিছু খুঁজতাম।

– আপনি আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান, মেসেজ দেন তোমার মায়ের একটা ছবি দাও। ওর মুখটা ভুলে যাচ্ছি, তোমার মায়ের কোনো ভিডিও নেই, ওর গলার স্বরটা ভুলে যাচ্ছি। আপনাদের দুজনেরই কত ঢং! মা বেঁচে ছিল, তখন বলেছি, এত যদি ভালোবাসা তুমি, তাহলে ভালোবাসার লোকটাকে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তোমার ওই লোকটাকে বিয়ে করলে না কেন?

ফৈয়াজ একটু ফ্রেন্ডলি হওয়ার চেষ্টা করেন, কোনো জবাব পেয়েছিলে লতার কাছ থেকে?

– বলত, বুঝতে পারেনি, সংসার করার জন্য ওই লোকটা কেমন হবে! আবার বুঝতেও পারেনি দুজনকে ছাড়া দুজনে চলবে না।

– মা ও মেয়েতে তোমাদের ফাইন সম্পর্ক ছিল তো!

– মাকে খুব মিস করি আমি।

– মৃত্যু তাহলে খারাপ না, জীবনের ভুলগুলি শুধরে নেওয়া যায়।

– এত তাড়াতাড়ি খুশি হওয়ার কিছু নেই।

– কেন বলো তো!

– আপনি আমার আঙ্কেল, বাবা না।

– তুমি আমার মেয়ে হওয়ার সম্ভাবনাও হয়তো অনেকটা ছিল।

– আমার বাবা মাকে অনেক মিস করে। আমি জানি তো বাবা মাকে তেমন করে পায়নি। আপনি একটা দেয়াল তুলে দিয়েছিলেন আমাদের সংসারে। বাবা ওই দেয়াল পেরোতে অপমান বোধ করত।

– আমি তোমার মায়ের সঙ্গে অন্যায্য কিছু করিনি।

– সেটা আপনি আর আমার বাবা বুঝবেন। নিশ্চয়ই আমার মাকে নিয়ে আপনাদের দুজনের কথা বলতে ভালো লাগবে।

– এরকম হয় নাকি!

– হবে।

কেন জানি মনে হয় লতার স্বামীর সঙ্গে বসে বুঝে নিয়ে আবার ঝর্নার পাশে গিয়ে বসতে পারবেন।

হয়তো একটা সময়ে এসে সব ঠিকঠাক হয়ে যায়, বোঝাবুঝি হয়ে যায়।

– চলো তাহলে বিনতা।

মাথা তুলে উঠতে গেলে ফৈয়াজকে কোনো একটা হাত

থামিয়ে দেয়।

– কোথায় চললেন?

–  যেখানে ইচ্ছা, তার জন্য অনুমতি নিতে হবে নাকি।

যে হাতটা ঠেসে ধরছে তাঁকে, এই হাতটা যেন চিনতে পারছেন, তাঁর শরীর হাতড়ে বেড়াচ্ছিল, পকেট থেকে বের করে নিয়েছিল তার সব আইডেন্টিটি – মানিব্যাগ, ফোন। এখন খেয়াল হয়, হাসপাতাল থানা-পুলিশ, এই মর্গ এই লোকের উদ্যোগেই হয়েছে।

বিনতার গলা শুনতে পান ফৈয়াজ।

– এই লোকটা কি আপনার বন্ধু আঙ্কেল?

– কেন?

– সেই তো আপনার খোঁজ দিয়ে এখানে আমাকে নিয়ে এলো।

কালোকুলো লোকটার মেটালিক-রোবোটিক স্বর শোনা গেল।

– আপনারা আমাকে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম পেয়েছেন নাকি!

ফৈয়াজ বলেন, তা কেন?

– আপনার বউ, ছেলেমেয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কেউ আপনার জন্য টাকা ঢালতে চায় না। আপনার ফেসবুকে ঢুকে তারপর এই মেয়ের খোঁজ পেলাম। টের পেলাম, এখানে কী সব হৃদয়ঘটিত কেস। টাকা-পয়সার মামলা এখানে হবে না।

ফৈয়াজ আর বিনতা মুখ চাওয়াচাওয়ি করেন।

তৃতীয়জনই মুখ খোলে – একটা ভালো ডিল পেয়েছি। আপনাকে খুন হতে হবে। মরেই তো গেছেন কষ্ট কম হবে।

– আমাকে কী করতে হবে বলেন তো! কাজ খুঁজছিলাম। রিটায়ার্ড মানুষ বলে কেউ কাজ দিতেও চায় না।

– আপনি দোদুল সাহেবের কোম্পানিতে কাজ করতেন। ভাগ-ভাটোয়ারা নিয়ে তাঁকে ফাঁসালেন, জেল-জরিমানা করালেন। অনেক টাকাও সরিয়েছিলেন।

– দোদুলভাই আমাকে খুন করাতে চান?

– দোদুলভাইয়ের সঙ্গে আপনার বিপুলভাইয়ের বড় বিজনেস ঠোকাঠুকি চলছে। দোদুলভাই আমাকে কন্ট্রাক্ট দিয়েছে আপনাকে খুন করার। তারপর এই খুন দিয়ে বিপুলভাইকে ফাঁসাবে। কেস, থানা-পুলিশ-কোর্ট তৈরি হচ্ছে।

হাঁপ ছাড়লেন ফৈয়াজ। বড় ব্যবসায়ীদের কেস। পত্রপত্রিকায় নিশ্চয়ই অনেকদিন লেখালেখি হবে। বেশি সেনসেশনাল হলে নেটফ্লিক্সে হয়তো ওয়েব সিরিজও।

ঝর্ণার কাছে একটা পরিচয় তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো ফৈয়াজের। স্বামীকে নিয়ে এই হিন্দি ওয়েব সিরিজ – ডিউরেশন।