‘দেশে এখন জাঁকজমজপূর্ণ শান্তির সময়। এখন চিতাবাঘের পাশে হরিণ, হাঙ্গরের পাশে মাছ, বাজের নিকটে কপোত এবং ঈগলের পাশে চড়ুই শুয়ে থাকে’ – এভাবেই ফকির খাইরুদ্দিন এলাহাবাদি উনিশ শতকের প্রথম দশকের ভারতকে বর্ণনা করেছেন। ১৮০৩ সালের দিল্লির এবং মহারাষ্ট্রের অসইয়ের লড়াইয়ে মারাঠা শক্তির বিরুদ্ধে ইংরেজদের জয়ের মাধ্যমে কার্যত ভারতের স্থানীয় শক্তির বিরুদ্ধে ইংরেজদের জয় সম্পূর্ণ হয়। এর আগে মীর কাশিম, সুজাউদ্দৌলা, টিপু সুলতান প্রমুখের প্রতিরোধ ছলে-বলে-কৌশলে ইংরেজরা নস্যাৎ করেছে। দিল্লির লড়াইয়ের পর অন্ধ মোগল সম্রাট শাহ আলম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সুরক্ষায় নামমাত্র সম্রাটে পরিণত হন এবং ভারতে দীর্ঘস্থায়ী ব্রিটিশ শাসনের পাকাপোক্ত ভিত নির্মিত হয়। এসময়ই অভিজাত মুসলমানরা মনে করেন যে, দ্বাদশ শতাব্দীর পর এই প্রথম ভারতের শাসন মুসলমানদের হাত থেকে চলে গেল। দিল্লি জামে মসজিদের ইমাম শাহ্‌ আব্দুল আজিজ লিখেছিলেন – ‘এখান (দিল্লি) থেকে কলকাতা পর্যন্ত এখন খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রণে … এই দেশ আর ‘দারুল ইসলাম’ নয়।’১ ছোটখাটো ঘটনা বাদ দিলে ১৮০৩ সালের পরবর্তী কয়েক দশক ছিল ভারতে ইংরেজ শাসনের অধীনে একটি সুস্থির সময়। কলকাতা তখন ইংরেজদের রাজধানী। কলকাতার হিন্দু ‘ভদ্রলোক’দের কাছে এই সময়টা ছিল এক স্বস্তির সময়। ইংরেজ শাসনের প্রতি তাঁদের কৃতজ্ঞতা ও মুগ্ধতা প্রচুর। তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য করে, মহাজনি ব্যবসা করে প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক হচ্ছেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর কারণে পুরোনো জমিদারদের সম্পত্তি নিলাম হলে সেই জমিদারি কিনছেন, আবার সেগুলি অন্যদের কাছে পত্তন দিচ্ছেন। কলকাতাকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে একটি হিন্দু মধ্যশ্রেণি গড়ে উঠছে। তাদের মধ্যে ইংরেজি শেখার আকাক্সক্ষা তীব্র। এরকম একটি সময়ে কলকাতা কেন্দ্রিক বঙ্গীয় জাগরণের সূচনা এবং রামমোহন রায়ের আবির্ভাব।

উনিশ শতকের বাংলার জাগরণ প্রসঙ্গে আলোচনায় রামমোহন রায়ের পর যে-নামটি উচ্চারিত হয় তা বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগর রামমোহন রায়ের চেয়ে বয়সে ৪৮ বছরের  ছোট ছিলেন। ১৮৩৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইংল্যান্ডে রামমোহন মারা যাওয়ার সময় বিদ্যাসাগর ১৩ বছরের বালক এবং সংস্কৃত কলেজের ছাত্র। রামমোহনকে বিদ্যাসাগর দেখেননি। কিন্তু সংস্কৃত কলেজের ছাত্র হিসেবে বালক বয়সেই তাঁর সম্পর্কে নিশ্চয়ই জেনেছিলেন এবং যা জেনেছিলেন তা নেতিবাচক হওয়ারই কথা। কারণ রামমোহন রায়ের বিরোধী রক্ষণশীলদের একটি দুর্গ ছিল সংস্কৃত কলেজ। বিদ্যাসাগরের শিক্ষকরা ছিলেন রামমোহনের ‘আত্মীয় সভা’র বিরোধী ‘ধর্মসভা’র সঙ্গে সম্পর্কিত। রামমোহন-ডিরোজিও-ইয়াং বেঙ্গলরা সমাজে যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তার মধ্যেই বিদ্যাসাগর বেড়ে ওঠেন। বিদ্যাসাগরের বালক বয়সে বারাসতে ওহাবী আন্দোলনের মোড়কে তিতুমীরের কৃষক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। তাঁর বয়স যখন ৩৭ বছর তখন ইংরেজ সরকারবিরোধী মহাবিদ্রোহ ঘটে। এর পরপরই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনব্যবস্থা ব্রিটিশ সরকারের হাতে ন্যস্ত হয় এবং ভারতবাসী ‘মহারাণী’ ভিক্টোরিয়ার প্রজায় পরিণত হয়। পরবর্তী বছরগুলিতে বাংলার সমাজ ও রাজনীতিতে ধীরে ধীরে নানারূপ পরিবর্তন ঘটতে থাকে এবং বাঙালি মধ্যবিত্তের পূর্ববর্তী স্বস্তির অবস্থাও নানা কারণে পরিবর্তিত হতে থকে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভেতর থেকেই তখন ধীরে ধীরে একটি বাঙালি মুসলমান মধ্যশ্রেণির জন্ম হচ্ছে। তারাও তখন ইংরেজি শেখা শুরু করেছে। এসময় ইংরেজ শাসনের প্রতি মুগ্ধতা কমে জাতীয়তাবাদী চিন্তার উন্মেষ ঘটতে শুরু করে। তাই রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের বিদ্যমান থাকার সময় কাছাকাছি হলেও দুই সময়ের মধ্যে পার্থক্যও ছিল।

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর দুজনই তাঁদের সমাজের সময়ের ব্যতিক্রমী ও অগ্রসর ব্যক্তি। দুজনই রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে নিরলস লড়েছেন। কখনো সফল হয়েছেন, কখনো হননি। দুজনেরই নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। তৎকালীন হিন্দু সমাজের সংস্কারে, বাংলা ভাষা নির্মাণে, শিক্ষার প্রসারে, নারীর অধিকারের পক্ষাবলম্বনে সর্বোপরি আধুনিক চিন্তার প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের উজ্জ্বল পূর্বসূরি রামমোহন। আবার তাঁদের মধ্যে পার্থক্যও ছিল । পার্থক্য ছিল জীবনচর্যায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। কখনো তাঁরা একই পথের পথিক, কখনো বা বিপরীত চরিত্রের মানুষ।

রামমোহনের মূল মিশন ছিল ধর্মসংস্কার এবং তিনি তাঁর এই কাজে একা ছিলেন। সহমরণ নিবারণসহ অন্যান্য কাজে তিনি যাঁদের কাছে পেয়েছিলেন তাঁরাও তাঁর ধর্মমতের সমর্থক ছিলেন না। পৌত্তলিকতার বিরোধিতার জন্য তিনি পারিবারিকভাবে নিগৃহীত এবং রক্ষণশীলদের তীব্র বিরাগভাজন হয়েছেন। বিদ্যাসাগর তাঁর বিধবাবিবাহ আন্দোলন শুরু করে প্রচুর শত্রু সৃষ্টি করেছিলেন, আবার অনেককেই তিনি সঙ্গে পেয়েছিলেন। সতীদাহ নিবারণ আন্দোলনে যাঁরা রামমোহনের সঙ্গে ছিলেন তাঁদেরও কেউ কেউ বিধবাবিবাহ সমর্থন করে বিদ্যাসাগরের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। আবার রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে তাঁদের দুজনের বিরোধীপক্ষও প্রায় অভিন্ন ছিল।

দুই

রাজা রামমোহন রায় কোনো রাজা ছিলেন না, তাঁর পারিবারিক পদবিও ‘রায়’ ছিল না। ‘রাজা’ ও ‘রায়’ দুটোই তাঁর উপাধি। তাঁকে রাজা উপাধি দেন ইংরেজের পেনশনভোগী নামমাত্র মোগল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী যে পরিমাণ পেনশন ও সুবিধা পাওয়ার কথা তার চেয়ে কম পাওয়ায় সম্রাট অসন্তুষ্ট ছিলেন। রামমোহন রায় ইংল্যান্ড যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি ইংল্যান্ডের রাজদরবারে তাঁর হয়ে কথা বলার জন্য তাঁর দূত হিসেবে রামমোহনকে মনোনীত করেন এবং ১৮২৯ সালে তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দেন। তিনি ‘রাজা’ উপাধি নিয়ে মাত্র চার বছর বেঁচে ছিলেন। এর আগে তাঁকে ‘দেওয়ান’ রামমোহন রায় বলা হতো কারণ তিনি ইংরেজ কালেক্টরের দেওয়ান ছিলেন। রামমোহনের প্রপিতামহ মোগল সরকারের কাজ করে ‘রায়’ উপাধি পান। রামমোহন ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তাঁদের প্রকৃত পারিবারিক পদবি ছিল ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’; কিন্তু তাঁদের সেই উপাধি পুরুষানুক্রমে ঢাকা পড়েছিল মোগলের দেওয়া ‘রায়’ উপাধির নিচে। রামমোহনের পিতামহ ব্রজবিনোদ রায় এবং পিতা রামকান্ত রায় মুর্শিদাবাদে নবাব-সরকারে কাজ করেছেন।

রামমোহনের মতো ঈশ্বরচন্দ্রের পারিবারিক পদবিও ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা পুরুষানুক্রমে ছিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। তাই তাঁদের বন্দ্যোপাধ্যায় পদবিও ঢাকা পড়েছিল উপাধির নিচে। এই উপাধি ছিল সংস্কৃত পণ্ডিতের উপাধি। ঈশ্বরচন্দ্রের প্রপিতামহ ছিলেন ভুবেনশ্বর বিদ্যালঙ্কার, পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ আর ঈশ্বরচন্দ্র তো ‘বিদ্যাসাগর’ হিসেবেই ভুবনবিখ্যাত হন। বিদ্যাসাগরের ভাইদের, পুত্রেরও নামের শেষে এরূপ উপাধি ছিল, তাঁরাও সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন। ব্যতিক্রম ছিলেন বিদ্যাসাগরের পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। দারিদ্র্যের কারণে তিনি কুলপ্রথা গ্রহণ করার মতো সংস্কৃত শিখতে পারেননি। তাই তাঁর কোনো উপাধি ছিল না।

রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের পারিবারিক পটভূমি তাঁদের পরবর্তীকালের জীবন-জীবিকাকে প্রভাবিত করেছে। রামমোহনের পিতা সম্পত্তিশালী ছিলেন। পুত্রকে রাজ-সরকারের কাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে গৃহেই রাজভাষা ফার্সি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং নয় বছর বয়সে উত্তমরূপে ফার্সি ও আরবি শেখার জন্য পাটনা প্রেরণ করেন। বারো বছর বয়সে তিনি সংস্কৃত শেখার জন্য রামমোহনকে কাশীতেও পাঠান। কিন্তু বিদ্যাসাগরের পিতা ছিলেন অতিদরিদ্র। মাসিক মাত্র দশ টাকা বেতনে কলকাতায় এক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পুত্র উত্তম সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করে পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী গ্রামে একটি চতুষ্পাঠী খুলুক। তাই দেখি, যে বয়সে রামমোহন ফার্সি-আরবি রপ্ত করতে পাটনা যাচ্ছেন, প্রায় একই বয়সে ঠাকুরদাস নিজের চরম দারিদ্র্যের মধ্যেও ছেলেকে কলকাতায় রেখে সংস্কৃত শেখাচ্ছেন। একজন ভবিষ্যৎ সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতের রাজভাষা ফার্সি শেখার কোনো প্রয়োজন ছিল না বলে বিদ্যাসাগরকে ফার্সি শিখতে হয়নি। এটি তাঁর সময়ের অন্যান্য শিক্ষিত লোকের তুলনায় বিদ্যাসাগরের একটি সীমাবদ্ধতাও বটে। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর প্রায় একই বয়সে, একুশ-বাইশ বছরে, ইংরেজি শিখতে শুরু করেন। রামমোহন পরবর্তীকালে আরো বেশ কয়েকটি ভাষা শিখেছিলেন। আরবি-ফার্সি ভাষার ওপর এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানের জন্য তাঁকে ‘জবরদস্ত মৌলভি’ বলা হতো। বিভিন্ন ভাষার ওপর দখল তাঁকে বিবিধ বিষয়ে বহুমুখী জ্ঞানার্জনে সাহায্য করে। তিনি যখন ইংরেজ কালেক্টর জন ডিগবির অধীনে কেরানির চাকরি নেন তার আগেই কলকাতায় মহাজনি কারবার ও কোম্পানির শেয়ারের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থশালী হয়েছেন এবং জমিদারিও কিনেছেন। তারপরও ইংরেজ সরকারের নিম্নপদে চাকরি নেওয়ার পেছনে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী সরকারি চাকরির প্রতি একটি মোহ হয়তো কাজ করেছে। কেরানিগিরি দিয়ে শুরু করলেও রামমোহন ‘দেওয়ান’ পর্যন্ত হয়েছেন। অন্যদিকে বিদ্যাসাগর তাঁর পূর্বপুরুষদের মতো ঠিক টুলো পণ্ডিত না হলেও একজন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতই হয়েছিলেন।

রামমোহন রায় আরবি-ফার্সি ভালোভাবেই শিখেছিলেন। তিনি আরবি ভাষায় কেবল কোরানই পড়েননি, ইউক্লিড, প্লেটো-অ্যারিস্টটলের রচনাও পড়েছিলেন আরবি ভাষায়। ফার্সিতে সুফি কবিদের কাব্য পড়েছেন। এসব পড়েই তাঁর ধর্মচিন্তায় নতুন বাঁক আসে। তিনি মূর্তিপূজাবিরোধী একেশ্বরবাদী হয়ে ওঠেন। তিনি বেদান্তেও একেশ্বরবাদের সন্ধান পান এবং রংপুর কালেক্টরেটে কাজ করার সময় থেকে এক ঈশ্বরের বা পরমব্রহ্মের উপাসনা প্রচার শুরু করেন। পৌত্তলিকতাবিরোধী ধর্মমতের জন্য তিনি পিতা-মাতারও বিরাগভাজন হন এবং তাঁরা একাধিকবার তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। ফার্সি ভাষায় লেখা তাঁর বই তুহফাত-উল-মুওয়াহিদ্দীন ১৮০৪ সালে, তাঁর ৩২ বছর বয়সে, মুর্শিদাবাদে প্রকাশিত হয়। এই বইতে প্রচলিত নানা ধর্মমত সম্পর্কে তাঁর চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। বইটি তিনি ফার্সিতে লিখেছিলেন কারণ বাংলা ভাষা তখনো গুরুগম্ভীর বিতর্কমূলক বিষয় আলোচনার ভাষা হয়ে ওঠেনি। কিছুদিন পর তাঁর হাত ধরেই বাংলা ভাষার সেই সক্ষমতা তৈরি হবে। 

রামমোহন রায়কে শুধু বাংলার নয় সারা ভারতের একজন আধুনিক চিন্তার পথিকৃৎ বলা যায়। ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা, ভাষা, রাজনীতি – এরকম সকল বিষয় নিয়ে তিনি ভেবেছেন, লিখেছেন এবং একটি যুক্তিবাদী অবস্থান থেকে তিনি যেভাবে কথা বলেছেন তা এর আগে কেউ বলেননি। তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার ও অলৌকিকতার প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন এবং তাঁর সমসাময়িক ব্যক্তিবর্গের (যাঁদের মধ্যে ইংরেজি শেখা লোকও ছিলেন) চেয়ে চিন্তাভাবনায় দৃশ্যমানভাবে পৃথক ও অগ্রসর ছিলেন। ইংরেজি শিক্ষার স্কুল স্থাপন, বাংলায় ও ফার্সিতে পত্রিকা সম্পাদনা, রাষ্ট্রচিন্তা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য সোচ্চার হওয়া, কালাপানি পার হয়ে বিলেত যাত্রা এরকম কাজে বর্ণিল তাঁর জীবন। আধুনিক যুগে তিনিই প্রথম বাঙালি যাঁর লেখা বই বিদেশে ছাপা হয়েছে ও যাঁর পরিচিতি বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

সতীদাহ প্রথা রোধ প্রয়াসে ভূমিকা রামমোহন রায়ের প্রধান কীর্তি হিসেবে পরিচিত। অবশ্য সতীদাহ নিবারণের জন্য রামমোহনের বহু পূর্বেই ইংরেজ সরকার থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সতীদাহের ওপর নানা বিধিনিষেধ, কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছিল এবং আইন করে সতীদাহ নিষিদ্ধ করার কথাবার্তাও শুরু হয়েছিল। আবার ১৮১৭ সালেই সুপ্রিম কোর্টের পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার আদালতে সহমরণ প্রথার বিপক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। পরের বছর, ১৮১৮ সালে রামমোহন রায় তাঁর সহমরণ বিষয় প্রবর্তক নিবর্তকের সম্বাদ-এ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারের অনুরূপ শাস্ত্রীয় যুক্তিতেই সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি শাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে হিন্দুশাস্ত্রমতে মৃত স্বামীর সঙ্গে পুড়ে মরে ‘সতী’ হওয়ার চেয়ে ব্রহ্মচর্য বা চিরবৈধব্য উত্তম। এই পুস্তিকা প্রকাশের পর সতীদাহের পক্ষে-বিপক্ষে তীব্র বিতর্ক শুরু হয় এবং রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথাবিরোধিতার একজন প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। উইলিয়াম বেন্টিংক গভর্নর জেনারেল হওয়ার পর আইন করে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি এ-বিষয়ে রাজা রামমোহন রায় এবং আরো কয়েকজন ব্যক্তির মত জানতে চান। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় ছিল, রামমোহন রায় আইন করে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করার বিপক্ষে মত দিয়েছিলেন। কারণ তাঁর আশঙ্কা ছিল, আইন করে এই প্রথা বন্ধ করলে লোকে মনে করবে মুসলমান শাসকদের মতো ইংরেজরাও হিন্দুদের ওপর তাঁদের ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা করছেন। তাঁর মত ছিল, নীরবে কিছু প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং পুলিশের অপ্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সহমরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এই প্রথা রোধ করা সম্ভব হবে।২ তবে ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর আইনটি পাশ হওয়ার পর তিনি আইনটিকে স্বাগত জানান। রক্ষণশীল হিন্দুরা আন্দোলন শুর করলে এবং প্রিভি কাউন্সিলে আপিল করলে তিনি তাঁর ‘আত্মীয় সভা’কে সঙ্গে নিয়ে এই আইনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন।

বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি হিসেবে পরিচিত বিধবাবিবাহ প্রবর্তন। বিদ্যাসাগর নিজেও বলেছেন, এটি তাঁর জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম। বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আন্দোলন শুরু করেন সতীদাহ প্রথা বন্ধ হওয়ার চব্বিশ বছর পর। তখনো বিধবাবিবাহের বিপক্ষে একটি শক্তিশালী মত থাকলেও নিষ্পাপ বালবিধবাদের দুঃখ যেমন সমাজমানসে করুণা, সহানুভূতি জাগ্রত করেছিল তেমনি এই কুপ্রথার কারণে সমাজে বিদ্যমান যৌন-অনাচার একটি অস্বস্তিও তৈরি করেছিল। বিদ্যাসাগরের পূর্বেই ইয়াং বেঙ্গল গোষ্ঠীর পত্রিকা বেঙ্গল স্পেক্টেটর বিধবাবিবাহের পক্ষে সোচ্চার ছিল। বেশকিছু ব্যক্তি তাঁদের বিধবা কন্যার বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যদিও সফল হননি। ধনাঢ্য ও রক্ষণশীলদের অন্যতম নেতা মতিলাল শীলও বিধবাবিবাহ প্রচলনের চেষ্টা করেছিলেন এবং ঘোষণা করেছিলেন, যে প্রথম বিধবাবিবাহ করবে তাঁকে তিনি বিশ হাজার টাকা পুরস্কার দেবেন। ১৮৩৭ সালে ভারতীয় ল’কমিশন বিধবাবিবাহ প্রচলন আইন করার উদ্যোগ গ্রহণ করে; কিন্তু হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কারের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে কিছু ইংরেজ কর্মকর্তার ভিন্নমতের জন্য তখন আইনটি করা হয়নি। বিদ্যাসাগর ১৮৫৪ সালের ২৮শে জানুয়ারি বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করার পর বিধবাবিবাহ আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে এবং বিদ্যাসাগর তার অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হলেন। রামমোহন আইন করে সতীদাহ বন্ধ করা পক্ষে না থাকলেও, বিদ্যাসাগরের মূল লক্ষ্যই ছিল বিধবাবিবাহের সমর্থনে আইন পাশ করা। এই দুটি আইনের চরিত্রগত পার্থক্য ছিল। সহমরণ নিবারণ আইন চূড়ান্তভাবে পাশ হওয়ার পর সতীদাহ ফৌজদারি আদালতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় এবং এই আইন কার্যকর করার দায়িত্ব ইংরেজ সরকারের ওপর বর্তায়। কিছুদিনের মধ্যেই সতীদাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং এরপর সহমরণবিরোধীদের আর কিছু করার ছিল না। রামমোহন রায় এরপর ইংল্যান্ড থেকে আর দেশে ফিরে আসেননি। কিন্তু বিধবাবিবাহ আইন পাশ হওয়ার পরই ছিল বিদ্যাসাগরের আসল কাজ। বিধবাবিবাহ আইন বিধবাবিবাহ আইনসম্মত করেছিল। কিন্তু আইনসম্মত হতেই বিধবাদের বিয়ে হওয়া আদৌ শুরু হয়নি। বিধবাবিবাহ চালু করতে বিদ্যাসাগর ও তাঁর সমর্থকদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। নানা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এর জন্য বিদ্যাসাগরকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে, ঋণের বোঝা মাথায় নিতে হয়েছে। এসব কারণে তাঁর নাম হয়েছিল ‘বিধবার বে-দেয়া বিদ্যেসাগর’।

তিন

রামমোহন রায় বাংলা লেখা শুরু করার আগেই বাংলা গদ্য বেশ এগিয়ে গিয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের হাতে। এসব পণ্ডিতের মধ্যে উত্তম গদ্য লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। কারো কারো মতে, বিদ্যাসাগরের পূর্বে শ্রেষ্ঠ গদ্যলেখক মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। তাহলে বাংলা গদ্যে রামমোহনের স্থান কোথায়? তাঁর পূর্ববর্তী গদ্যকারদের সঙ্গে তাঁর একটি তফাৎ হলো, তিনি গদ্য লিখেছেন ধর্মীয় ও সামজিক দায়বদ্ধতা থেকে। এই দায়বদ্ধতা তাঁর রচনার বিষয়বস্তুতে যেমন অভিনবত্ব এনেছে তেমনি ভাষা ও রচনাশৈলীতেও এনেছে নতুনত্ব। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা বাংলায় পাঠ্যপুস্তক লিখেছিলেন ইংরেজ সিভিলিয়ানদের বাংলা শেখানোর জন্য। কিন্তু রামমোহন বাংলা লিখেছেন সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর বক্তব্য প্রচার করার তাগিদে। তিনি বাংলা ভাষায় যুক্তিনির্ভর ও দার্শনিক বিষয়ের আলোচনা সূচনা করেন এবং বাংলা গদ্যকে সর্বসাধারণের ব্যবহারের উপযুক্ত করে তোলেন। বাংলা ভাষায় প্রথম ব্যকরণ রচনার কৃতিত্বও রামমোহনের। রবীন্দ্রনাথের মতে, রামমোহন রায়ই ‘বাংলা গদ্যসাহিত্যের ভূমিপত্তন’ করেন।

রামমোহনের মতো বিদ্যাসাগরও সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে বিধবাবিবাহের পক্ষে ও বহুবিবাহের বিপক্ষে শাণিত গদ্য লিখেছেন। বাংলা ভাষায় পলেমিক্যাল রাইটিং বা যুক্তিতর্কমূলক রচনার সূত্রপাত করেন রামমোহন এবং তার বিকাশ ঘটে বিদ্যাসাগরের হাতে। কিন্তু বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের কীর্তি বাংলা ভাষাকে সাহিত্যের উপযুক্ত ভাষায় পরিণত করা। যে বঙ্কিমচন্দ্র নানা বিষয়ে বিদ্যাসাগরের সমালোচনায় মুখর ছিলেন, তিনিও লিখেছেন, ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর। তাঁহার পূর্বে এরূপ সমধুর বাঙ্গালা গদ্য কেহই লিখিতে পারে নাই, তাঁহার পরেও পারে নাই।’ বিদ্যাসাগরের কয়েক পৃষ্ঠার আত্মজীবনী বিদ্যাসাগরচরিত-এ চোখ বুলালেই বোঝা যায় তাঁর হাতে উনিশ শতকেই বাংলা গদ্য কেমন ঝ‌রঝরে প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছিল। এ-কারণে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তাঁহার প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা।’

উনিশ শতকের বাংলায় নারীর প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থনের প্রথম দৃঢ় কণ্ঠটি রামমোহনের। ‘প্রবর্তক নিবর্তকের সম্বাদ-এ নারীর প্রতি সমাজের আচরণ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যের যুক্তি ও ভাষা অশ্রুতপূর্ব। সহমরণ সমর্থনকারী প্রবর্তক স্ত্রীলোককে ‘অল্পবুদ্ধি’, ‘অস্থিরান্তকরণ’, ‘বিশ্বাসের অপাত্র’ ইত্যাদি বলে উল্লেখ করলে তাঁর জবাবে সহমরণবিরোধী নিবর্তকের জবাব, ‘স্ত্রীলোকেরা শারীরিক পরাক্রমে পুরুষ হইতে প্রায় ন্যূন হয়, ইহাতে পুরুষেরা তাহারদিগকে আপনার হইতে দুর্বল জানিয়া যে যে উত্তম পদবীর প্রাপ্তিতে তাহারা স্বভাবত যোগ্য ছিল। তাহা হইতে উহারদিগকে পূর্ব্বাপর বঞ্চিত করিয়া আসিতেছেন। …

‘স্ত্রীলোকের বুদ্ধির পরীক্ষা কোনকালে লইয়াছেন যে তাহারদিগকে অল্পবুদ্ধি কহেন? কারণ বিদ্যা শিক্ষা এবং জ্ঞান শিক্ষা দিলে পরে ব্যক্তি যদি অনুভব ও গ্রহণ করিতে না পারে তখন তাহাকে অল্পবুদ্ধি কহা সম্ভব হয়; আপনারা বিদ্যাশিক্ষা জ্ঞানোপদেশ স্ত্রীলোককে প্রায় দেন নাই, তবে তাহারা বুদ্ধিহীন হয় ইহা কিরূপে নিশ্চয় করেন?

‘বিবাহের সময় স্ত্রীকে অর্দ্ধ অঙ্গ করিয়া স্বীকার করেন, কিন্তু ব্যবহারের সময়ে পশু হইতে নীচ জানিয়া ব্যবহার করেন। … স্বামীর গৃহে প্রায় সকলের পত্নী দাস্যবৃত্তি করে।’৩

এখানে প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করতে রামমোহন শাস্ত্রের কাছে যাচ্ছেন না, যাচ্ছেন যুক্তির কাছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নির্মমতা ও ভণ্ডামি অনাবৃত করছেন। বাংলায় প্রচলিত দায়ভাগ আইনে বিধবা নারী মৃত স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী না হওয়ার বিধানকে রামমোহন অন্যায় এবং শাস্ত্রসম্মত নয় বলে উল্লেখ করেছিলেন এবং যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, বিধবা নারীর স্বামীর সম্পত্তি না পাওয়া বাংলায় সহমরণ ও বহুবিবাহের আধিক্যের কারণ। তবে রামমোহন যুক্তি দিয়ে কথা বলার সময় যতটুকু প্রগতিপন্থী শাস্ত্র ধরে কথা বলার সময় ততটুকু নন। যেমন, বিধবা নারীকে স্বামীর চিতা থেকে বাঁচাতে তিনি শাস্ত্র থেকে নারীর ব্রহ্মচর্যের বা চির-বৈধব্যের বিধান খুঁজে বের করে প্রচার করেন। নারীর পুনর্বিবাহ তাঁর চিন্তায় স্থান পায়নি এবং বিধবাবিবাহকে তিনি শাস্ত্রসম্মত বলে মনে করতেন না। অপরদিকে বিধবা সম্পর্কে রামমোহনের এবং পরবর্তী সময়ের রক্ষণশীলদের যে অবস্থান ছিল (আজীবন ব্রহ্মচর্য) তার বিরুদ্ধেই ছিল বিদ্যাসাগরের লড়াই। রামমোহন প্রমাণ করতে চেয়েছিলেনে যে, স্বামীর মৃত্যুর পর সহমরণ নয়, ব্রহ্মচর্যই নারীর জন্য শাস্ত্রের বিধান আর বিদ্যাসাগর প্রমাণ করতে চান বিধবা নারীর পুনর্বিবাহ হিন্দুশাস্ত্রে অনুমোদিত। বিধবা নারীর ব্রহ্মচর্য একটি অতি কষ্টের বিষয় স্বীকার করেও রামমোহন শাস্ত্রানুগত থেকে বিধবা নারীর ব্রহ্মচর্যের পক্ষে অনেক যুক্তি দেখিয়েছেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বিধবার এই ব্রহ্মচর্যের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যুক্তি আর আবেগ দিয়ে :

তোমরা মনে কর পতিবিয়োগ হইলেই, স্ত্রী-জাতির শরীর পাষাণময় হইয়া যায়; দুঃখ আর দুঃখ বলিয়া বোধ হয় না। যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা বলিয়া বোধ হয় না। দুর্জ্জয় রিপুবর্গ এক কালে নির্ম্মূল হইয়া যায় … যে দেশে পুরুষজাতির দয়া নাই, ধর্ম্ম নাই, ন্যায় অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদ্বিবেচনা নাই, কেবল লৌকিক রক্ষাই প্রধান কর্ম্ম ও পরম ধর্ম্ম; আর যেন সে দেশে অবলা জাতি জন্ম গ্রহণ না করে।

হা অবলাগণ! তোমরা কি পাপে, ভারতবর্ষে আসিয়া, জন্মগ্রহণ কর, বলিতে পারি না।৪

অবশ্য আমাদের মনে রাখতে হবে, রামমোহনের জন্য সহমরণ নিবারণই আশু কাজ ছিল। তখন বিধবাবিবাহের মতো বিষয় তুললে মূল দাবি আদায়ই হয়তো কঠিন হতো। তবে বিধবাবিবাহ প্রচলনের বিষয় নিয়ে তখনই কথাবার্তা চালু ছিল এবং জনরব ছিল যে, রামমোহন বিলেত থেকে ফিরে বিধবাবিবাহ প্রচলন করবেন।

চার

উনিশ শতকের কলকাতাকেন্দ্রিক জাগরণের ও তার নায়কদের নিয়ে যে-কোনো আলোচনায় এই জাগরণের সীমাবদ্ধতার কথা ভুলে গেলে চলবে না। হিন্দু মধ্যশ্রেণির এই জাগরণের সঙ্গে গ্রামের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ ছিল না। বাংলার মুসলমানের মধ্যবিত্তের সঙ্গেও এর যোগাযোগ ছিল নিতান্তই পরোক্ষ। তাই কলকাতায় ব্রিটিশ অনুগত মধ্যবিত্তশ্রেণির মধ্যে ইংরেজদের সহায়তায় যখন সাংস্কৃতিক জাগরণ বা ‘রেনেসাঁস’ চলছিল তখন ব্রিটিশ শাসক-জমিদার-নীলকরদের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার হিন্দু-মুসলমান কৃষক-কারিগর ও আদিবাসী সম্প্রদায় দফায় দফায় বিদ্রোহ করছে। এসব বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বাংলার জাগরণের নেতাদের ভূমিকা ছিল নির্লিপ্ততা না হয় বিরোধিতার। স্মরণ করা যেতে পারে ব্রিটিশ শাসকদের প্রতি আনুগত্যের অভিযোগে একসময় নকশালপন্থীরা পশ্চিমবঙ্গে অন্যদের সঙ্গে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের মূর্তিও ভেঙেছিলেন।

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর দুজনই নানাভাবে ব্রিটিশ শাসনের সুবিধাভোগী ছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁদের ব্রিটিশ আনুগত্যের চরিত্রের মধ্যে ব্যাপক ফারাক ছিল। রামমোহন রায় প্রথম জীবনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শেয়ারের ব্যবসা করে এবং ব্রিটিশদের সুদে টাকা ধার দিয়ে প্রচুর বিত্তশালী হন এবং সেই অর্থে তিনি চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি কেনেন। ইউরোপীয়দের সঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছাড়াও নিবিড় সখ্য ও কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল। ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে ‘কমার্শিয়াল অ্যান্ড প্যাট্রিওট্রিক অ্যাসোসিয়েশন’ নামে মূলত কলকাতার শ্বেতাঙ্গ ব্যবসায়ীদের তৈরি একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিষদের রামমোহন সদস্য ও যুগ্ম-কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত হন।৫ কলকাতার ইংরেজ সমাজে রামমোহন রায় একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন এবং ইংল্যান্ডেও তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় হিসেবে যথেষ্ট মর্যাদা লাভ করেন।

রামমোহন ভারতে ব্রিটিশ শাসনকে কেবল ঈশ্বরের আশীর্বাদই মনে করতেন না, তিনি মনে করতেন, ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে ভারতের অনেক সমৃদ্ধি হবে এবং ভারতবাসী ইউরোপীয়দের মতো সভ্য জাতিতে পরিণত হবে! রাডইয়ার্ড কিপলিং তাঁর বহুল বিতর্কিত ‘ডযরঃব গবহ’ং ইঁৎফবহ’ কবিতায় বলেছিলেন যে, বিজিত উপনিবেশের ‘অসভ্য’ ‘বন্য’ মানুষদের সভ্য করার দায়িত্ব শ্বেতাঙ্গদের। উপনিবেশের বাসিন্দা হলেও এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুরূপ একটি দৃষ্টিভঙ্গি রামমোহনও পোষণ করতেন। তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের অকুণ্ঠ সমর্থক ছিলেন; কিন্তু ভারতের ব্রিটিশ অধীনতায় কোনো সমস্যা দেখেননি! ফরাসি প্রকৃতিবিদ ভিক্তর জ্যাকেমোঁকে তিনি বলেছিলেন :

বিজিত দেশের মানুষের তুলনায় বিজয়ী দেশের মানুষ যদি অধিক সভ্য হয় তবে এক দেশ কর্তৃক অন্য দেশ জয় করার দোষের কিছু নেই। কারণ বিজয়ীরা বিজিত দেশের মানুষের নিকট সভ্যতার সুফল নিয়ে আসে। ভারতের আরও বহু বছর ইংরেজের অধীনে থাকা প্রয়োজন যাতে ভারত যখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা ফেরত চাইবে তখন তাকে অনেক কিছু হারাতে না হয়।৬

এই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তিনি ইউরোপীয়দের ভারতে জমিজমা কিনে স্থায়ী বসতি স্থাপনের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তিনি মনে করতেন, ইউরোপীয়দের সঙ্গে ভারতীয়দের সংশ্লিষ্টতা যত বেশি বাড়বে ভারতের সাহিত্য, সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে তত উন্নতি হবে। নীলকরদের অত্যাচারে বাংলার চাষীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও রামমোহন-দ্বারকানাথ ঠাকুরের মতো ব্যক্তিরা মনে করতেন, নীলচাষে দেশের উপকার হচ্ছে। তাঁরা নীলকরদের প্রশংসা করতেন। রামমোহনের পত্রিকা সম্বাদ কৌমুদিতে নীলকরদের সমালোচনা খণ্ডন করে প্রবন্ধ লেখা হতো। তাঁরা নীলচাষের প্রসার ঘটানোর জন্য ইউরোপীয়দের ভারতে জমি কিনে নীলচাষে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন এবং ইউরোপীয়দের ভারতে উপনিবেশ স্থাপনের সুযোগ দেওয়ায় ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন জানান। তাঁদের আবেদন ব্রিটিশ সরকার মঞ্জুর করে। এরপর ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশ-অধিকৃত ওয়েস্ট ইন্ডিজে দাসপ্রথা রোধ হওয়ার পর সেখানকার প্ল্যান্টেশনে কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের নির্যাতনে হাত পাকানো প্ল্যান্টেশনের মালিকরা বাংলায় জমিজমা কিনে নীলচাষ শুরু করে। এই নীলকরদের অত্যাচারের কিছু বর্ণনা দীনবন্ধু মিত্রের নীল দর্পণ নাটকে আছে। নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ১৮৫৯-৬১ সালে সারা বাংলাজুড়ে ‘নীল বিদ্রোহ’ হয়।

বিদ্যাসাগরও তাঁর সময়ের শহুরে মধ্যবিত্তদের মতোই ভারতে ইংরেজ শাসনের পক্ষে ছিলেন। তিনি ইংরেজের জয়গান করেননি বটে কিন্তু এর বিপক্ষেও কিছু বলেননি। সময়ে সময়ে ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক সরকারকেও তাঁর সহায়তা করতে হয়েছে। তবে বিদ্যাসাগর মূলত একটি ফব ভধপঃড় শাসনব্যবস্থার প্রতিভূ হিসেবে ভারতে ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের সঙ্গে কাজ করেছেন। মেধা, যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত সততার জন্য তিনি বেশ ক’জন ইংরেজ কর্মকর্তার পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন। আসলে এসব ব্রিটিশ কর্মকর্তার সান্নিধ্যে এসেই তিনি ইংরেজি শেখেন ও ‘পশ্চিমের দ্বার’-এর সন্ধান পান। তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের বাংলা শেখানোর শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত লাভালাভের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ইংরেজ ডিরেক্টরের প্রবর্তিত শিক্ষাপদ্ধতি পছন্দ না-হওয়ায় এবং একজন দেশীয় হিসেবে তাঁর প্রতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ  থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর পরম সুহৃদ ছোটলাট হ্যালিডে পদত্যাগপত্রের কড়া ভাষা সংশোধন করতে বললেও তিনি তাঁর কথা রাখেননি। রামমোহন রায়ের মতো ইউরোপীয়দের প্রতি তাঁর কোনো মুগ্ধতা ছিল না। তিনি সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল থাকার সময় একবার শিক্ষা কাউন্সিল বিদ্যাসাগরকে নির্দেশ দিয়েছিল বারানসী সংস্কৃত কলেজের ইংরেজ অধ্যক্ষ ব্যালেন্টাইনের সঙ্গে  যোগাযোগ রেখে ও তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করতে। কিন্তু বিদ্যাসাগর পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, সংস্কৃত কলেজ সম্পর্কে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তাঁকে অবাধ স্বাধীনতা দিতে হবে। এই তেজস্বী বাঙালির কথা শিক্ষা কাউন্সিলকে মেনে নিতে হয়েছিল। বিধবাবিবাহের জন্য ব্যয় করে ঋণগ্রস্ত থাকাকালে সংস্কৃত কলেজে বিদ্যাসাগরের চাকরি করার কথা হয়েছিল। কিন্তু বেতন ইউরোপীয় অধ্যাপকদের সমান না হওয়ায় তিনি এই পদে যোগ দিতে রাজি হননি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের ইংরেজ সদস্যদের আপত্তি সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর তাঁর গড়া মেট্রোপলিটান কলেজে কোনো ইংরেজ অধ্যাপক না নিয়ে কেবল দেশীয় অধ্যাপক দিয়ে এফ.এ ক্লাস চালু করাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন এবং প্রথম বছরই পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন কোনো ইংরেজের সহায়তা ছাড়া বাঙালি কলেজ চালাতে পারে।

পাঁচ

রামমোহন ও বিদ্যাসাগর দুজনে রাঢ়ীয় কুলীন ব্রাহ্মণ হলেও তাঁদের সামজিক অবস্থানে আকাশ-পাতাল পার্থক্য ছিল। সমাজের উচ্চকোটির লোক রামমোহন গ্রামের সাধারণ মানুষ থেকে বহুদূরে বসবাসকারী একজন অনুপস্থিত ভূস্বামী ছিলেন। জমিদার হিসেবে তিনি হিসেবি ছিলেন। রামমোহন-জীবনীকার নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর বইতে রামমোহনের কিছু হস্তাক্ষরের নমুনা দিতে গিয়ে তাঁর সেরেস্তা থেকে কিছু চিঠি উদ্ধৃত করেছেন। এতে জানা যাচ্ছে যে, খাজনা বকেয়া থাকলে রামমোহন রায়ের কর্মচারীরা জমির ফসল আটকে রাখতো। রামমোহন রায় চিঠি দিলে তাঁরা খাজনা নিয়ে ফসল ছাড়তো। তিনি তাঁর সময়ের ভূস্বামীদের স্বার্থের প্রতিভূ এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একজন বড় সমর্থক ছিলেন। অপরদিকে বিদ্যাসাগর ছিলেন দরিদ্র পরিবারের সন্তান। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। এক পর্যায়ে বই বিক্রির টাকায় যথেষ্ট বিত্তশালী হলেও তিনি অন্যদের মতো জমিদারি কেনেননি। কৃষকের স্বার্থের সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ সংঘাত ছিল না। বর্ধমানের রাজা তাঁকে বীরসিংহ গ্রামের তালুক দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, ‘আমার যখন এমন অবস্থা হবে যে আমি সমস্ত প্রজার খাজনা দিতে পারবো সেদিন তালুক নেব।’

রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের জীবনযাত্রা, চালচলনে তফাৎ ছিল। রামমোহন মুসলমান শাসনের সমালোচক হলেও মুসলমানি পোশাক পরতেন, মুসলমানি খাবারে তাঁর অরুচি ছিল না। তান্ত্রিক বামাচারী, পঞ্চ-মকারের সাধক হরিহরানন্দ তীর্থস্বামীর শিষ্য রামমোহন ভোগ-সুখবাদী ছিলেন। বিদ্যাসাগর ধর্ম না মানলেও হিন্দুর অভক্ষ্য কোনো খাবার খেতেন না, মদ্যপান করতেন না। তাঁর পোশাক ছিল মোটা কাপড়ের ধুতি-চাদর-চটি জুতা। তাঁর চটি জুতা নিয়ে নানা কাহিনী আছে। অথচ রামোমোহন ধুতি-চাদর নিতান্তই অপছন্দ করতেন। তাঁর প্রার্থনা সভায় ধুতি-চাদর পরে আসতে নিষেধ করতেন। এঁদের দুজনেই আবার পৈতা পরতেন। বিদ্যাসাগর নিজে ধর্মচর্চা না করলেও অন্যের ধর্মচর্চায় এমনকি কুসংস্কারচর্চায় বাধা দিতেন না। এটি খুবই আশ্চর্যজনক যে, নিজে অন্তর্জলি যাত্রার বিরোধী থাকলেও তাঁর প্রিয় পিতামহীর মৃত্যুর পূর্বে ভাগীরথী তীরে অন্তর্জলি ঠেকানোর চেষ্টা করেননি!

তবে রামমোহনের সঙ্গে বিদ্যাসাগরের আসল তফাতের জায়গা অন্যত্র। ইউরোপীয় সভ্যতার প্রগতিশীল উপাদান ব্যাপকভাবে গ্রহণ করলেও, তাঁর বিরোধীরা রক্ষণশীলরা তাঁকে ধর্মদ্রোহী কালাপাহাড় মনে করলেও, তাঁর ধর্মচিন্তার স্বরূপ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, রামমোহন রায় মূলত একজন ধার্মিক  ছিলেন। তাঁর নানা কাজের মধ্যে কোন কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তিনি নিজেকে জিহাদ বা ধর্মযুদ্ধের প্রেরণা নিয়ে যে কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন তা হলো, মূর্তিপূজা বিরোধিতা এবং নিরাকার পরব্রহ্মের উপাসনা তথা একেশ্বরবাদকে আঁকড়ে ধরা। ইংল্যান্ডে থাকার সময় এক ইংরেজ বন্ধুকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন :

আমার সমস্ত তর্ক-বিতর্কে আমি কখনও হিন্দুধর্মকে আক্রমণ করিনি। হিন্দু ধর্মের নামে যে বিকৃত ধর্ম বর্তমানে প্রচলিত, তা-ই আমার আক্রমণের বিষয় ছিল। আমি এটিই দেখাতে চেয়েছিলাম যে, ব্রাহ্মণদের পৌত্তলিকতা, তাঁদের পূর্ব পুরুষদের আচরণের ও যে সকল শাস্ত্রকে তাঁরা শ্রদ্ধা করেন ও যা অনুসারে চলেন বলে স্বীকার করেন, তার মতবিরুদ্ধ।

সে হিসাবে রামমোহনের মূল আন্দোলন ছিল ধর্মসংস্কার আন্দোলন এবং চরিত্রগতভাবে ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্যগত দিক দিয়ে তা ছিল উনিশ শতকের ওহাবী ও ফরায়েজিদের আন্দোলনের অনুরূপ। ওহাবী ও ফরায়েজিরাও তাঁদের মতে, ইসলাম ধর্মের বিকৃতির এবং মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত নানান শাস্ত্রবিরোধী আচারের (শিরক ও বেদাত) বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিলেন। রামমোহনের রচনার অধিকাংশ জুড়ে আছে বিভিন্ন বেদান্ত, উপনিষদ প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থের অনুবাদ, পণ্ডিতের সঙ্গে, খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের সঙ্গে ধর্মীয় বিতর্ক ইত্যাদি। তিনি মদ্যপান করতেন, বৈষ্ণব হয়েও মাংস আহার করতেন এবং তাঁর একজন মুসলিম উপপত্নী ছিল। তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা এসবের প্রতি ইংগিত করলে তিনি শাস্ত্রের উদাহরণ দিয়েই এসবের জবাব দেন। যেমন নিজের মুসলিম উপপত্নীকে তিনি শৈবমতে বিয়ে করা পত্নী হিসেবে দাবি করে শৈবমতে যবনী বিয়েকেও বৈধ বলে দাবি করেন। তাঁর ‘আত্মীয় সভা’ একটি ধর্মীয় সংগঠনই ছিল। অর্থাৎ রামমোহন আমৃত্যু একজন হিন্দু এবং ধার্মিক লোকই ছিলেন, যদিও তাঁর এই ধর্ম প্রচলিত হিন্দু ধর্ম থেকে আলাদা ছিল। ব্রিস্টলে মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে পীড়িত অবস্থায় সারাক্ষণ তিনি প্রার্থনারত থাকতেন। তাঁর মুখে শেষ যা শোনা গিয়েছিল তা নাকি ছিল ‘ওম’ (ওঁ) ধ্বনি।

কিন্তু বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন মানুবমুখিন ইহজাগতিক মানুষ। ধর্মসংস্কার নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি। তাঁর জীবনে আধ্যাত্মিকতা বা পারলৌকিতার কোনো স্থান ছিল না। তিনি আদৌ কোনো ধর্মচর্চা, প্রার্থনা ইত্যাদি করতেন না। নিজের ঈশ্বর বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে তিনি কথাবার্তা না বললেও ধর্ম, ধর্মপ্রচারক, পরকাল নিয়ে ঠাট্টা-রসিকতা করতেন। দয়া-দাক্ষিণ্য দিয়ে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে তিনি সাহায্য করেছেন, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালিয়েছেন নিজ খরচে, কিন্তু কোনো ধর্মপ্রতিষ্ঠানে চাঁদা দেননি। অবশ্য শাস্ত্র না মানলেও বিধবাবিবাহের পক্ষে এবং বহুবিবাহের বিপক্ষে জনমত সংগঠনের জন্য তিনি হিন্দু শাস্ত্র থেকে যুক্তি দিয়েছেন। বহুবিবাহ-রদ আন্দোলনের বিরোধী বঙ্কিমচন্দ্র প্রশ্ন তুলেছিলেন, বিদ্যাসাগর যে বহুবিবাহ শাস্ত্রসম্মত নয় বলে প্রচার করছেন, তিনি নিজে কি শাস্ত্র মানেন? যুক্তি ও হৃদয়বত্তার অনুসারী বিদ্যাসাগরের চিন্তাভাবনা জুড়ে ছিল মানুষের কল্যাণচিন্তা। নিজে বিশাল শাস্ত্রবেত্তা হলেও তিনি পথনির্দেশের জন্য শাস্ত্রের দ্বারস্থ হননি। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেও ঈশ্বরচিন্তা বা পরকালচিন্তা নয়, মানুষের কল্যাণচিন্তায় তিনি আচ্ছন্ন ছিলেন।

ছয়

বেদান্ত দর্শন নিয়ে রামমোহন ও বিদ্যাসাগরের মতামত থেকে দুজনের চিন্তাভাবনার একটি তুলনা করা যায়। রামমোহন বাংলাদেশে বেদান্ত দর্শনের চর্চার পথিকৃৎ। প্রথম মূল সংস্কৃত বেদাস্ত দর্শন তিনিই প্রথম ছাপার ও প্রচারের ব্যবস্থা করেন, প্রথম বাংলা ভাষায় বেদান্ত দর্শনের ভাষ্য রচনা করেন ও উপনিষদের বাংলা অনুবাদ করেন। বেদান্ত-দর্শনকে অবলম্বন করে তিনি তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের বিরুদ্ধে মসীযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অথচ ইংরেজ সরকার সরকারি সংস্কৃত কলেজ খোলার উদ্যোগ নিলে তাঁর প্রতিবাদ করে রামমোহন বড়লাট লর্ড আমহার্স্টকে ১৮২৩ সালে যে বিখ্যাত চিঠি লিখেন তাতে তিনি সংস্কৃত ভাষা ও ব্যাকরণের দুরূহতা, সংস্কৃত শিক্ষার অসারতার কথা উল্লেখ করে ভারতীয়দের উন্নতির জন্য গণিত, প্রাকৃতিক দর্শন, রসায়ন বিদ্যা, অ্যানাটমি এবং অন্যান্য বিজ্ঞানের বিষয় পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে উল্লেখ করেন। এই চিঠিতে তিনি বেদান্ত সম্পর্কে বলেন, বেদান্ত শিক্ষা দ্বারা যুবকরা সমাজের উত্তম সদস্য হতে পারবে না। বেদান্ত যা শেখায় তা হলো, এই দৃশ্যমান জগতের কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। পিতা, ভ্রাতা এঁদের কোন প্রকৃত স্বত্বা নেই, তাই তাঁরা কোন স্নেহ পাবার যোগ্য নন। তাই যত দ্রুত আমরা এদের থেকে মুক্ত হয়ে পৃথিবী ত্যাগ করতে পারি ততই উত্তম। আবার বেদান্তের কি মন্ত্র পাঠ করলে একজন ছাগল বধকারি পাপমুক্ত হয় কিংবা বেদের কোনো অনুচ্ছেদের প্রকৃত চরিত্র বা কার্যকর প্রভাব কি তা জেনে মীমাংসায় একজন ছাত্রের প্রকৃত লাভ হয় না।

আবার দেখি এই চিঠি লেখার তিন বছর পর ১৮২৬ সালে তিনি নিজেই কলকাতায় একটি বেদান্ত বিদ্যালয় স্থাপন করেন, যেখানে সংস্কৃত ভাষায় বেদ শিক্ষা দেওয়া হতো! রামমোহন চরিত্রের এই স্ববিরোধিতায় রামমোহনের আধুনিকতার একটি সীমাবদ্ধতার আভাস আছে।

রামমোহন বিরোধিতা করলেও ১৮২৪ সালে কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই কলেজে বারো বছর একটি রক্ষণশীল আবহে সংস্কৃত এবং বেদান্ত-দর্শনসহ নানা প্রাচীন ভারতীয় দর্শন পড়া শেষ করে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করে বেরোন বিদ্যাসাগর। কিন্তু ইংরেজি শিখে, কিছু মুক্তমনের ইংরেজের এবং সম্ভবত দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অক্ষয় দত্তের মতো কিছু বন্ধুর সাহচর্যে তিনি একজন ধর্মীয় সংস্কারমুক্ত ইহজাগতিক মানুষে পরিণত হন। সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল হওয়ার পর তিনি সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাক্রমে কিছু সংস্কার প্রসঙ্গে সংস্কৃত কলেজে ভাববাদী দার্শনিক বার্কলের দর্শন পড়ানোর একটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে বেদান্ত দর্শন সম্পর্কে ১৮৫৩ সালে যে মন্তব্য করেছিলেন তা এখন একটি যুগান্তকারী মন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয় :

কতকগুলো কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য আমাদের পড়াতেই হয়। কি কারণে পড়াতে হয় তা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। সাংখ্য আর বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, সে সম্পর্কে এখন আর বিশেষ মতভেদ নেই। তবে ভ্রান্ত হলেও এই দুই দর্শনের প্রতি হিন্দুদের গভীর শ্রদ্ধা আছে। সংস্কৃতে যখন এগুলো পড়াতেই হবে তখন তার প্রতিষেধক হিসেবে ছাত্রদের ভাল ভাল ইংরেজি দর্শনশাস্ত্রের বই পড়ানো দরকার। বার্কলের বই পড়ালে সেই উদ্দেশ্য সাধিত হবে বলে মনে হয় না, কারণ সাংখ্য ও বেদান্তের মতো বার্কলেও একই শ্রেণীর ভ্রান্ত দর্শন রচনা করেছেন। ইউরোপেও এখন আর বার্কলের দর্শন খাঁটি দর্শন হিসেবে বিবেচিত হয় না। কাজেই তা পড়িয়ে কোন লাভ হবে না। তা ছাড়া হিন্দু ছাত্ররা যখন দেখবে যে বেদান্ত ও সাংখ্যের মতামত একজন ইউরোপীয় দার্শনিকের মতের অনুরূপ, তখন এই দুই দর্শনের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আরো বাড়তে থাকবে।

যে রামমোহন লর্ড আমহার্স্টকে চিঠি লিখেছিলেন, এখানে আমরা তাঁর উত্তরসূরির কণ্ঠই শুনতে পাচ্ছি। রামমোহন যে দর্শনকে অপ্রয়োজনীয় বলে পড়ানোর প্রয়োজন নেই বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর তাকে ভ্রান্ত বলার মতো দুঃসাহস দেখালেন। বেদান্ত, সাংখ্যকে সিলেবাস থেকে বাদ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তখন ছিল না। কিন্তু এসব ভাববাদী দর্শন পড়ার ভ্রান্ত-প্রভাব কাটিয়ে যুক্তিবাদী হয়ে ওঠার জন্য সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদের বিদ্যাসাগর মিলের লজিক পড়ানোর পক্ষে ছিলেন। তবে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধিতে তাঁর অনন্যসাধারণ অবদান মনে রেখেও বলতে হয় যে, সংস্কৃতের প্রতি বিদ্যাসাগরের একটি অনাবশ্যক পক্ষপাত ছিল। তিনি মনে করতেন, ভালো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সেবা করার জন্য সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা জানা প্রয়োজন। সংস্কৃতের মতো একটি অপ্রচলিত ও দুরূহ ভাষা শিক্ষার প্রয়োজন আধুনিক যুগে যে ফুরিয়ে আসছে সেটি তাঁর বহু পূর্বেই রামমোহন বুঝতে পারলেও বিদ্যাসাগর বোঝেননি এবং বুঝলেও মেনে নিতে তাঁর সময় লেগেছে। তাই দেখি, রামমোহন লেখেন বাংলা ভাষার জন্য ‘গৌড়িও ব্যাকরণ’, কিন্তু বিদ্যাসাগর লিখছেন ‘সংস্কৃত ব্যকরণের উপক্রমণিকা’, ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’। অবশ্য শিক্ষা ও পেশাগত প্রয়োজনেই সংস্কৃতের পেছনে বিদ্যাসাগরকে এই সময় ব্যয় করতে হয়েছে। নয় বছর বয়সে তিনি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর জীবনের দীর্ঘসময় এই কলেজের সঙ্গে বাঁধা পড়েছিল।

সাত

বিদ্যাসাগরের তুলনায় রামমোহনের চিন্তা ও কর্মের ক্যানভাসটা অনেক বড় ছিল। ধর্ম-সংস্কার, সমাজ-সংস্কার, ভাষা, শিক্ষা, আইন, রাষ্ট্রচিন্তা, কৃষি, রাজনীতি, সাংবাদিকতা, সংগঠন গড়া ইত্যাদি বিচিত্র ও বিস্তৃত ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ ছিল। বিদ্যাসাগরের বিচরণ ক্ষেত্র রামমোহনের মতো বিস্তৃত ছিল না; কিন্তু প্রচেষ্টা ও অর্জন ছিল বড়। রামমোহন মূলত একজন চিন্তাবিদ কিন্তু বিদ্যাসাগর মূলত একজন কর্মবীর। তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছেন এবং আশেপাশে সংগঠিত রাজনৈতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে নির্লিপ্ত থেকেছেন। কিন্তু যে-কাজটি করা দরকার মনে করেছেন ধনুর্ভঙ্গ পণ নিয়ে সেই কাজে নেমেছেন। বিদ্যাসাগরের অসাধারণ হৃদয়বত্তার জন্য দুঃখী-পীড়িত-অসহায় সবসময় তাঁকে কাছে পেয়েছে। তাই বিদ্যাসাগরের এখনো কিংবদন্তির উৎস। আবার রামমোহন তাঁর পরবর্তী সকল প্রগতিশীল ও সংস্কারমুক্ত মানুষদের জন্য দীর্ঘদিন একটি প্রেরণার উৎস ছিলেন। তাঁর সৃষ্ট চেতনার ধারা থেকে বিদ্যাসাগরের সমাজসংস্কার আন্দোলন ও অন্যান্য প্রচেষ্টা পুষ্টি অর্জন করেছে।

বিদ্যাসাগরের জীবনের একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করছি, যা থেকে রামমোহনের প্রতি বিদ্যাসাগরের মনোভাব বোঝা যাবে। বিধবাবিবাহ আইন পাশ হওয়ার বেশ কিছুদিন পর প্রথম বিধবাবিবাহের আয়োজন করেছেন বিদ্যাসাগর ও তাঁর বন্ধুরা। বর শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন আর কনে কালীমতী দেবী। বিশাল আয়োজন করে পুলিশ প্রহরায় বিয়ে হবে। এই বিয়ের সমর্থকের চেয়ে বিরোধীর সংখ্যাই বেশি। চেষ্টা করা হচ্ছে কলকাতার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিয়েতে উপস্থিত রাখার। কিন্তু অনেকেই আসবেন না। কেউ কেউ আগে কথা দিলেও পরে আসতে চাইছেন না সমাজপতিদের ভয়ে। শোনা গেল, রামমোহন রায়ের পুত্র রমাপ্রসাদ রায় বিয়েতে আসবেন না, যদিও আগে আসতে রাজি ছিলেন। রমাপ্রসাদ বিদ্যাসাগরের বন্ধু। বিদ্যাসাগর ছুটে গেলেন রমাপ্রসাদের বাড়ি।

রমাপ্রসাদ বললেন, ‘আমি তো ভেতরে-ভেতরে আছিই। সাহায্যও করবো। কিন্তু বিবাহস্থলে না-ই বা গেলাম।’

রামমোহনের পুত্রের মুখে একথা শুনে বিদ্যাসাগর অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙ্গানো রামমোহন রায়ের ছবির দিকে। বিদ্যাসাগর রমাপ্রসাদকে বললেন, ‘এই ছবি এখান থেকে ফেলে দাও।’

তথ্যসূত্র

১.  William Dalrymple, The Anarchy, 2019, p 381-382.

২.  Lord William Bentinck’s Minutes of Suttee, Rammohun Roy and Progressive Movements in India.1941, p 142.

৩.       প্রবর্তক নিবর্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ।

৪.       বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি না এতদবিষয়ক প্রস্তাব, দ্বিতীয় পুস্তক।

৫. Arabinda Poddar, Renaissance in Bengal : Quests and Confrontations, 1800-1860, 1970, p 50.

৬.  Arabinda Poddar, Renaissance in Bengal: Quests and Confrontations, 1800-1860,1970, p 62.

Leave a Reply