শম্ভু মিত্র : জন্মশতবর্ষে

লেখক:

মলয়চন্দন মুখোপাধ্যায়

বাংলা নাটকের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালটি বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে আছে বহুরূপী নাট্যসংস্থা-প্রযোজিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী মঞ্চায়নের জন্য। মাত্র ছ-বছরের নাট্যদল, যদিও তাঁদের প্রারম্ভিক প্রযোজনাগুলিও ছিল যথেষ্ট সম্ভ্রম আদায় করা ও একইসঙ্গে সমীহ করার মতো। দলে ছিলেন মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের মতো প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব, শিশিরকুমার ভাদুড়ীর সীতা নাটকে বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয়সূত্রে যাঁর চিরস্থায়ী নামই হয়ে যায় ‘মহর্ষি’। ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘ থেকে বেরিয়ে আসা (ভাগনাস) সবিতাব্রত দত্ত, তৃপ্তি ভাদুড়ী (পরবর্তীকালে মিত্র), শম্ভু মিত্র। নবান্ন নাটক দিয়ে দলটির নাট্যযাত্রার সূচনা, যে নবান্ন (১৯৪৪) আইপিটিএতে অভিনীত হয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিল একদা। এছাড়া পথিক, ছেঁড়া তার, উলুখাগড়া, বিভাব, দশচক্র, স্বপ্ন আর ধর্মঘট ইত্যাদি রক্তকরবীর আগে বহুরূপী-কর্তৃক প্রযোজিত হয়েছিল, যে-নাটকগুলোর রচয়িতারা হলেন তুলসী লাহিড়ী, ইবসেন বা ইউজিন ও’নিলের মতো নাট্যকার। রবীন্দ্রনাথের নাটকও ’৫৪-পূর্ববর্তী পর্বে করে      সে-দল, কিন্তু সেটি প্রকৃত প্রস্তাবে নাটক ছিল না। চার অধ্যায় উপন্যাসের নাট্যরূপ ছিল সেটি। কিন্তু ১৯৫৪-র ১০ মে বহুরূপী রেলওয়ে ম্যানশন ইনস্টিটিউটে রক্তকরবীর যে-মঞ্চয়ন করে, নানা দিক দিয়ে ঘটনাটি তাৎপর্যবাহী। রবীন্দ্রনাথের জীবতকালে এ-নাটক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ করতে চেয়ে ব্যর্থ হন। নাটকের ভাষাকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করা দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা ছিল। রূপক-সাংকেতিক নাটক বলে রবীন্দ্রনাথের ডাকঘর, মুক্তধারা, রাজা, রক্তকরবীকে এমনভাবে সমালোচককুল দেগে দিয়েছিলেন, যেন এসব নাটকের মঞ্চায়ন অসম্ভব বলেই বিবেচিত হয়ে আসছিল। ভালো নাটক ভালোভাবে করবেন, এই দায়বদ্ধতা থেকেই শম্ভু মিত্র সংকল্প নিলেন এ-নাটকটিকে মঞ্চে আনার। ফলে বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের ইতিহাস গতিজাড্য পেয়ে গেল।

আমরা এই মহান নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রের জন্মশতবর্ষের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। ২২-৮-১৯১৫-তে তাঁর জন্ম। শতবর্ষে পদার্পণ করা এই নাট্যাচার্যের সামগ্রিক কৃতির দিকে সশ্রদ্ধ অবলোকনের অবকাশে বাংলা নাটক তাঁর কাছে কী বিপুল ঋণী, তা উপলব্ধি করার প্রয়াস নেব বর্তমান রচনায়।

প্রথমে দু-একটি তথ্য জেনে রাখা জরুরি। ‘গ্রুপ থিয়েটার’ বলতে আজকে আমরা যা বুঝি, বাংলা নাটকের ইতিহাসে তার প্রকৃত সূচনা হয়েছিল ওই বহুরূপী প্রতিষ্ঠার দ্বারা, ১৯৪৮-এর ১ মে। আজ বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ তথা বিশ্বের যেখানেই বাঙালির বসবাস, গ্রুপ থিয়েটার নেই এমনটা ভাবাই যায় না। বহুরূপীর নামকরণ করেন পূর্ববর্ণিত মহর্ষি। আর দলের প্রতীকরূপে যে-মুখোশের ছবি, সেটি দক্ষিণ ভারতের মালয়ালমভাষী, কেরালার ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য কথাকলির মুখোশ। একটু কৌতূহলী হয়ে মুখোশের ছবিটি উলটোলেও দেখা যাবে, অনুরূপ আরো এক মুখ। মুখোশের এই চমৎকারিত্ব আনার কৃতিত্ব খালেদ চৌধুরীর, যিনি বহুরূপীর মঞ্চসজ্জাকার থেকে মেকাপম্যান, প্রয়োজনে অভিনেতা। বহুরূপীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কুমার রায়, সবিতাব্রত দত্ত, গঙ্গাপদ বসু, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, কলিম শরাফী, মোহাম্মদ জাকারিয়া, শোভন মজুমদার, অমর গঙ্গোপাধ্যায়, স্মৃতি ভাদুড়ী, গীতা ভাদুড়ী, তৃপ্তি মিত্র, দেবতোষ ঘোষ, শাঁওলী মিত্র ও আরো বহুলোকের নাম। তবু শম্ভু মিত্র আর বহুরূপী, নাম দুটি অনন্য  ও উজ্জ্বল। দলের বহুধাউদ্দেশ্যকে বাস্তবরূপ দিয়েছেন যেমন, তেমনি প্রতিভায় তিনি বহুরূপীরই নয়, বাংলা নাট্যজগতেই পুরোধা হয়ে আছেন।

 

যাত্রারম্ভ

শম্ভু মিত্রের জন্ম ১৯১৫ সালে, এবং অভিনেতা হিসেবে মঞ্চে তাঁর আত্মপ্রকাশ কুড়ি বছর বয়সে। তাঁর ছাত্রজীবন কাটে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে, যে-কলেজের অন্যতম ছাত্র বাংলার অন্য এক যুগন্ধর নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত। ১৯৩৫ থেকে শুরু করে প্রায় আমৃত্যু তিনি নাটকের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। কেবল অভিনয় করেছেন নাটকে, তাই নয়, শম্ভু মিত্রকে আমরা পাই নাট্যকার ও নাট্যপরিচালকরূপে, পাই নাট্যবিষয়ক প্রবন্ধকাররূপেও। নাট্যবিষয়ে বক্তৃতাকারী শম্ভু মিত্র, এ তাঁর অন্যতর পরিচয়। মঞ্চনাটক ছাড়াও তিনি বেতার নাটকেও নিয়মিত অংশ নিয়েছেন। দীর্ঘকাল সম্পাদনা করেছেন বহুরূপী ষান্মাসিক পত্রিকাটি। ঐতিহ্যবাহী নাট্যবিষয়ক এই পত্রিকাটি দীর্ঘ চুয়াত্তর বছর ধরে নিয়মিত, অবিচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে।

চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন শম্ভু মিত্র। সমসাময়িক বা তাঁর কিছু পূর্বেকার নাটকের অভিনেতা যাঁরা, যেমন শিশির ভাদুড়ী, ছবি বিশ্বাস, অহীন্দ্র চৌধুরী, উৎপল দত্ত, কুমার রায়, গঙ্গাপদ বসু প্রমুখ যেমন চলচ্চিত্রে অভিনয়কেও আত্মপ্রকাশের মাধ্যম মনে করতেন, শম্ভু মিত্রও তাই। তবে একান্তভাবেই মঞ্চনাটকে নিবেদিতপ্রাণ শম্ভু মিত্র কলকাতা আর মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও নিয়মিত চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেননি।

এই যে নানা শম্ভু মিত্রের মালা, তাঁর সঙ্গে যোগ করতে হবে নিজ নাটকের দলটিকে বছরের পর বছর ঋদ্ধ করে তোলা, বাঙালি দর্শকের কাছে একের পর এক নন্দিত, আহ্লাদিত আর অভূতপূর্ব নাট্য-প্রযোজনার অবতারণা করে বাংলা নাট্যচর্চাকে সম্ভ্রান্ত পর্যায়ে উন্নীত করে তোলা, কলকাতা ও কলকাতার বাইরে নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে বৃহত্তর দর্শকমন্ডলীর সামনে নাটক প্রদর্শনের মাধ্যমে বাংলা নাটককে বৃহদায়তনে নিয়ে আসা এবং তাকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্রের নিরলস প্রয়াসকে। আজ যে বাংলা নাটকের বিপুল চলমানতা, বৈচিত্র্য, হাজার হাজার অভিনেতা-অভিনেত্রীর নাটকে যোগদান, নাট্যবিষয়ক পত্রপত্রিকার ব্যাপকতা, নাট্য-গবেষণার অভিজাত ব্যাপ্তি, দর্শকবৃন্দের নাট্যসচেতনতা, তাঁর পেছনে শম্ভু মিত্রের অবশ্যম্ভাবী ও স্থায়ী অবদানকে অস্বীকার করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, কোনো অর্থকরী লাভালাভের বিবেচনাকে একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে তাঁর এবং তাঁর দলের সদস্যদের যে-নান্দনিক কারুবাসনা, তারই গতিজাড্যে প্রথমে কলকাতায় ও পরে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল গ্রুপ থিয়েটারের বৈভব আর মুন্শিয়ানা, শিক্ষিত মানুষ অভিনয় করতে এলেন, শিক্ষিত মানুষ গ্রুপ থিয়েটার না দেখলে নিজেকে প্রকৃত শিক্ষিত বলে ভাবতে দ্বিধাবোধ করতে শুরু করলেন। একটি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন ঐতিহ্যিক উত্থান এবং তার পরম্পরাকে অনুসরণ ও রক্ষা করার ভেতর দিয়ে যে উত্তরাধিকারের অরণি বয়ে নিয়ে চলা, তার মূল্যায়ন সহসা করা হয় না। আরো দুর্ভাগ্য, আমাদের মতো দেশে আমরা ঠাহর করার চেষ্টাও করি না, দেবতার দীপ হাতে কে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোয় আহবান জানান, আলোর মূল উৎসটি কোথায়। বহুরূপী যে-পরম্পরার জন্ম দিলো, তারই প্রসারতা লক্ষ করি অনতিবিলম্বে উৎপল দত্তের ‘লিটল থিয়েটার গ্রুপ’ বা এল.টি.জি (ফেব্রুয়ারি ১৯৪৯), অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়-রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের ‘নান্দীকার’, বাদল সরকারে ‘শতাব্দী’ (১৯৬৭), শ্যামল ঘোষের ‘গন্ধর্ব’ (১৯৫৬) বা অনুরূপ আরো গ্রুপ থিয়েটারের আবির্ভাবে। পেশাদার রঙ্গমঞ্চের প্রতিস্পর্ধী এই নাট্যদলগুলো বাংলা নাটকের নবজাগরণে যে-ভূমিকা রেখেছে, তা অতুলনীয়। শম্ভু মিত্র এই নাট্যযজ্ঞের পুরোহিত।

 

বাংলা নাটক : ঐতিহ্য, পরম্পরা ও শম্ভু মিত্র

বাংলা নাটকের ঐতিহ্য সুবিদিত। সেলিম আল দীন তাঁর বিস্তৃত গবেষণায় দেখিয়েছেন, চর্যাপদের সময়কালেই নাটকের চল ছিল। তিনি সে-যুগে নট-নটীর রূপসজ্জা রাখার জন্য যে ‘নটপেটিকা’ ব্যবহৃত হতো, তারও সন্ধান দিয়েছেন। পরবর্তীকালে শূন্যপুরাণ আমাদের নাট্যশালার সঙ্গে পরিচয় ঘটায়, যার সমর্থন মেলে রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল (‘নাটশালা তুল্যাছিল বার দিবার ঘর/ সুবর্ণ পতাকা উড়ে চালের উপর’ উল্লেখ করে সেলিম আল দীন একটি কৌতূহলী তথ্য দিচ্ছেন, ‘মধ্যযুগে বাঙলায় নাট্যশালার চালের উপর স্বর্ণবর্ণ পতাকা স্থাপিত হত’) আর বিজয় গুপ্ত-বিরচিত পদ্মাপুরাণে এমনকি চৈতন্য চরিতামৃততে কানাইর নাটশালার উল্লেখ মধ্যযুগে বাংলা নাটকের অস্তিত্বের যথোচিত প্রমাণ দেয়। বাংলা নাটক অতএব ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে এদেশে আসেনি।

তবে ঔপনিবেশিকতা বাংলা নাটককে বেশ পালটে দিয়েছে অনেকটা। ১৭৫৭-তে পলাশীর যুদ্ধ এদেশে যে ঔপনিবেশিক শাসনের সূত্রপাত ঘটায়, তার কিঞ্চিৎ আগে থেকেই ইস্ট ইন্ডিয়া কর্মচারীরা কলকাতায় অভিনয়ের জন্য Old Play House নির্মাণ করেন, বর্তমান লালবাজারের কাছে, ৮ নম্বর লালবাজার স্ট্রিটে। ১৭৫৬-তে সিরাজউদদৌলা কলকাতা আক্রমণ করার সময় এটিকে ধ্বংস করা হয়েছিল। যাই হোক, গোটা আঠারো আর উনিশ শতকের, বিশেষ করে প্রথমার্ধ পর্যন্ত বিদেশিদের দ্বারা স্থাপিত ইংরেজি ভাষায় অভিনীত নাটকের প্রবহমানতার মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে বাংলা নাটক নিয়ে গেরাসিম স্টেপেনোভিস লেবেডেফের (১৭৪৯-১৮১৭) আবির্ভাব। ইউক্রেনের (রাশিয়া) যাজক পরিবারের এই সন্তান যৌবনে লন্ডন ও প্যারিস ঘুরতে ঘুরতে চলে এলেন কলকাতায়, স্থাপন করলেন ‘The Bengalli Theatre’, আর ১৭৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর দশজন বাঙালি অভিনেতা ও তিনজন অভিনেত্রী নিয়ে তাঁরই রচিত নাটক মঞ্চস্থ করলেন। ২৫ নম্বর ডোমতলা (বর্তমান এজরা স্ট্রিট), যেখানে অভিনীত হয়েছিল তাঁর লেখা কাল্পনিক সংবদল, দর্শনীর বিনিময়ে, তিনশো আসনবিশিষ্ট জগন্নাথ গাঙ্গুলির দোতলাগৃহ, যা ছিল ‘দ্য বেঙ্গলি থিয়েটারে’র ঠিকানা বা আধুনিক বাংলা নাটকের সূতিকাগার।

১৭৯৫ থেকে ১৮৭২ বাংলা নাট্য-ইতিহাসের অন্য এক পর্যায়, বা বাংলা নাটকের গঠনপর্ব। উনিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকেই ঔপনিবেশিক ভারতের রাজধানী কলকাতার নব্য বাবুসমাজকে নাটকে আগ্রহী ও উৎসাহিত হতে দেখি। তাঁরা নিজ শ্রেণির স্বার্থেই বাংলা নাটকের পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন। তৈরি হয় নাটমঞ্চ, রচিত হতে থাকে একের পর এক নাটক, আবির্ভূত হন তারাচরণ শিকদার, হরচন্দ্র ঘোষ, কালীপ্রসন্ন সিংহ, রামনারায়ণ তর্করত্ন এবং অবশেষে মধুসূদন দত্তের মতো যুগন্ধর নাট্যকার। কালীপ্রসন্ন সিংহের ‘বিদ্যোৎসাহিনী মঞ্চ’, পাথুরিয়াঘাটার ‘বঙ্গরঙ্গালয়’, শোভাবাজারের ‘থিয়েট্রিক্যাল সোসাইটি’ ইত্যাদি। উল্লেখ্য, কলকাতার মতো ঢাকাতেও ইংরেজদের (নৌবাহিনীর) নাট্যশালা গড়ে ওঠে। ম্যাকবেথ অভিনীত হওয়ার সংবাদ পাচ্ছি পাবনায়, ১৮৫৮ সালে। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে ঢাকা থেকে, এবং ঢাকাতেই এ-নাটকের সর্বপ্রথম অভিনয় হয়েছিল পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬১ সালে। এরই সমসাময়িককালে ঢাকায় গড়ে ওঠা ‘পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি’ নিয়মিত নাট্যমঞ্চায়নের আয়োজন করে। রঙ্গমঞ্চটি ঢাকার গ্রুপ থিয়েটারের সূচনা ও সমৃদ্ধিকে প্রশ্রয় দেয়। ঢাকা ছাড়া রংপুর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা, কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রভৃতি স্থানের নাট্য-ঐতিহ্য ছিল। পেশাদারি থিয়েটারেরও সূচনালগ্ন হয়েছিল ১৮৭২ সালে ঢাকায়, রামাভিষেক (মতান্তরে সীতার বনবাস) নাটকের মাধ্যমে। এ-নাটকটির প্রযোজনায় ছিল ‘পূর্ববঙ্গ নাট্যসমাজ’। উল্লেখ্য, ওই একই সালে, অর্থাৎ ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর কলকাতায় নীলদর্পণ নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পেশাদারি নাটক-অভিনয়ের সূচনা। অমৃত লাল বসু (১৮৫৩-১৯২৯), অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফা (১৮৫০-১৯০৯), গিরিশচন্দ্র ঘোষ (১৮৪৪-১৯১২) প্রতিষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল থিয়েটার’ এ-নাটকের উদ্যোক্তা। পরবর্তী দীর্ঘ সময় পেশাদারি মঞ্চ বিচিত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বাংলা নাটককে এগিয়ে নিয়ে গেছে। এই সময়কালে বাংলা নাট্যকারের যে সম্ভ্রান্ত মেধাতালিকা পাই, তার মধ্যে অগ্রবর্তীরা হলেন মধুসূদন, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, রামনারায়ণ তর্করত্ন, দীনবন্ধু মিত্র, অমৃত লাল বসু প্রমুখ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রবীন্দ্রনাথ স্বতন্ত্র ঘরানায় থেকে বাংলা নাটককে দীপিত করে তুলেছেন এ-সময়। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের অভিঘাত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়কে কবিতা ও সংগীত রচনার জগৎ থেকে নিয়ে এলো নাট্য-রচয়িতার ভূমিকায়। নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন একদিকে, অন্যদিকে কর্নেল টড-বিরচিত Annals and Antiquities of Rajas-Ram-এর প্রকাশ, এই দুয়ের সংযোগ-বিয়োগে রচিত হতে থাকল তাঁর নাটকসমূহ, – সিরাজদ্দৌলা, সাজাহান, মেবারপতন, প্রত্যক্ষে ইতিহাস ও পরোক্ষে দেশাত্মবোধ এবং স্বদেশি-আন্দোলনের পরিচর্যা যেসব নাটকের সাধু অভিপ্রায়।

পেশাদারি নাটকের সুবর্ণ যুগ বলে গণ্য করা যেতে পারে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে দ্বিতীয় বিশবযুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত (১৯১৪-৪৫)। বিস্ময়কর নাট্যপ্রতিভার সন্ধান পাই আমরা এই পর্বে, আর বাংলা নাটক দর্শকের কাছে হয়ে ওঠে ব্রতপালনের মতোই পবিত্র কর্তব্য। বিশ শতকে চলচ্চিত্রের আবির্ভাব বাংলা নাটকের গতিজাড্যকে একেবারেই পরাভূত করতে পারেনি, বরং মঞ্চ আর চলচ্চিত্রে যুগপৎ অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করে নিচ্ছিলেন, তার বহুতর প্রমাণ পাই অহীন্দ্র চৌধুরী, ছবি বিশ্বাস, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ধীরাজ ভট্টাচার্য, শিশিরকুমার ভাদুড়ী, নরেশচন্দ্র মিত্র, মলিনা দেবী,  সরযূবালা দেবী, চুনিবালা দেবী, ছায়া দেবী, প্রভা দেবী প্রমুখের অভিনয়ে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম চার দশক আমাদের কাছে বাংলা নাটক তার সমূহ বাতিস্তম্ভ মেলে ধরে। সুদূর আমেরিকায় প্রদর্শিত হয় শিশিরকুমার পরিচালিত-অভিনীত সীতা নাটক। সতু সেন, যিনি আমেরিকায় মিকাডো চলচ্চিত্রের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর এবং হলিউডের মেরি পিক ফোর্ড, ডগলাস ফেয়ার ব্যাঙ্কস, চার্লি চ্যাপলিন প্রমুখ ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ করেন, কলকাতায় ফিরে প্রথম ‘রিভলভিং স্টেজে’র সূচনা করেন। কলকাতায় গড়ে ওঠে একের পর এক নাটকের প্রেক্ষাগৃহ, নাটক অভিনয়ের জন্য সদলে অভিনেতারা পাড়ি জমান কলকাতা ও বঙ্গের বাইরে। পেশাদারি নাটকের এই অভিযানের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ তাঁর একক প্রতিভায় নাট্যসাম্রাজ্য গড়ে তোলেন একের পর এক নাট্য-রচনার মাধ্যমে। তাঁর নাট্য-রচনার বিপুল পরিধিতে ছিল সার্থক লঘুরসের নাটক চিরকুমার সভা আর বৈকুণ্ঠের খাতা, তেমনি শান্তিনিকেতনের ছাত্রদের জন্য ছোট ছোট নির্মল হাসির নাটক রোগীর বন্ধু, সূক্ষ্ম বিচার বা খ্যাতির বিড়ম্বনা, আর ইনি-ই লেখেন অচলায়তন, ফাল্গুনী, রাজা, মুক্তধারা, ডাকঘর, রক্তকরবী। এমনকি পেশাদার রঙ্গমঞ্চও এড়িয়ে থাকতে পারেনি তাঁকে। বিপুল জনপ্রিয়তায় পেশাদারি মঞ্চে অভিনীত হয়েছে তাঁর লেখা নাটক গৃহপ্রবেশ, চিরকুমার সভা। যে-শিশিরকুমার ভাদুড়ী প্রযোজনা করছেন গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাটক প্রফুল্ল, রামনারায়ণ তর্করত্নের নর নারায়ণ বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের চন্দ্রগুপ্ত, তিনিই আবার প্রযোজনা করছেন রবীন্দ্রনাথের শেষ রক্ষা, বিসর্জন,  বৈকুণ্ঠের খাতা, চিরকুমার সভা। রবীন্দ্রনাথ নিজে প্রথমাবধি ছিলেন তাঁর নাটকের অভিনেতা ও পরিচালক, এবং কি কলকাতা, কি শান্তিনিকেতন এলাহাবাদ লাহোর, দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি অভিনয় করেন। বাংলা নাটকের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ এক স্বতন্ত্র অধ্যায়। এখানে সে-আলোচনার অবকাশ নেই।

আমরা শম্ভু মিত্র আলোচনা প্রসঙ্গে একটু বিশদ আকারেই আধুনিক বাংলা নাটকের বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করে নিলাম এজন্যেই যে, বাংলা নাটকের উত্তরাধিকার তিনি কীভাবে পেয়েছেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর মেধাবী পরিচর্যায় বাংলা নাটক কোন জায়গায় এসে পৌঁছেছে তা উপলব্ধিতে সহায়ক হবে।

পেশাদারি নাটক আর গ্রুপ থিয়েটারের মধ্যপর্বে বাংলা নাটকে ফ্যাসিবাদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-সঞ্জাত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী গণআন্দোলন ও সেই সূত্রে ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘ’ নামক প্রতিষ্ঠানটির একটি পর্ব রয়েছে। ‘ভাগনাসে’র উৎসে রয়েছে ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ (১৯৩৬) এবং ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পীসঙ্ঘ’ (১৯৪২) ইংরেজিতে ‘Indian People’s Theatre Association’ বা ‘IPTA’। এখানকার সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সুজাতা মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে, বিনয় রায়, শম্ভু মিত্র প্রমুখ। এই সংঘ প্রকৃতপক্ষে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখা হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল, এবং সেই সূত্রেই IPTA প্রযোজনা করে বিজন ভট্টাচার্যের আগুন (১৯৪৩), জবানবন্দী (১৯৪৪) ও নবান্ন (১৯৪৪) – ১৯৪৪-এর ২৪ অক্টোবর বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্রের যৌথ পরিচালনায় নাটকটি অভিনীত হয় শ্রীরঙ্গম মঞ্চে (বিশ্বরূপা)। নাটকে দয়াল মন্ডলের ভূমিকাভিনেতাও ছিলেন শম্ভু মিত্র। আমরা এই সময়কাল থেকেই নাট্যব্যক্তিত্বরূপে শম্ভু মিত্রের অগ্রগতি লক্ষ করব।

 

শম্ভু মিত্র : নবান্ন থেকে রক্তকরবী

‘নবনাট্য মানে সেই নাট্য, যেটা জীবন সম্পর্কে আমাদের গভীরতর বোধ এনে দেবে, সমাজের জটিল স্তরবিন্যাস সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধির সহায়ক হবে, যেটা আমাদের বুদ্ধি ও হৃদয়কে একসঙ্গে বেঁধে মহৎভাবে বাঁচবার অনুপ্রেরণা দেবে।’ – শম্ভু মিত্র, বাঙলার নবনাট্য আন্দোলন, ‘প্রসঙ্গ : নাট্য’, পৃ ১২৯।

IPTA-প্রযোজিত নাটক যে নতুন পথ দেখাতে শুরু করল নাট্যাঙ্গনে ১৯৪৩ থেকে, সমালোচকরা একে নবনাট্য আন্দোলন আখ্যা দিয়েছেন। এক দুরূহ সময়ে এর জন্ম আর হ্রেষাধ্বনি। নবান্ন নাটকের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ওই নাটকের অন্যতম ভূমিকাভিনেতা (হারু দত্ত) গঙ্গাপদ বসু লিখছেন, ‘হাহাকার উঠল সারা বাংলায় : ধান নেই, চাল নেই, ডাল নেই, নুন নেই, তেল নেই, কাপড় নেই। মানুষের সৃষ্টি এক মহামন্বন্তরে, সারা বাংলা ডুকরে কেঁদে উঠল।… পথে পথে মৃতদেহের স্তূপ, দোরে দোরে ফ্যান দাও, ফ্যান দাও চীৎকার।… যেখানে রাস্তায় একটা গাড়ি চাপা পড়ে কেউ মারা গেলে তার ছবি ছাপা হয়, সেখানে এতো মানুষ খেতে না পেয়ে মরছে অথচ কাগজে কোনো খবর নেই’ (পরে দ্য স্টেটসম্যান দুর্ভিক্ষের খবর ছবিসহ ছাপতে শুরু করে এবং দেখাদেখি বাংলা দৈনিক সংবাদপত্রগুলোও)। দুর্ভিক্ষ জয়নুল আবেদিন, চিত্তপ্রসাদ, সোমনাথ হোর প্রমুখ শিল্পীকে দিয়ে মর্মন্তুদ বেশ কিছু ছবি অাঁকিয়ে নিয়েছে। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় আকাল বেরোয় এ-সময়ে, যে-সংকলনের কবিতাসমূহ দুর্ভিক্ষ নিয়ে। এছাড়া কিষণচন্দর লিখলেন অন্নদাতার মতো উপন্যাস আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অশনিসংকেত। এরই সমরেখ করে বিচার করতে হবে নবান্ন নাট্যরচনা এবং এ-নাটক মঞ্চায়িত করার গূঢ়ৈষা। প্রসঙ্গত নবান্ন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার-সম্পাদিত অরণি পত্রিকায় ১৯৪৩ সালে। পরিচয় পত্রিকায় (শ্রাবণ ১৩৫১, ১৪শ বর্ষ ১ম সংখ্যা) রঙ্গীন হালদার আশা প্রকাশ করে লিখছেন, ‘আশা করে থাকব এর অভিনয়ের জন্য।’ ১৯৪৪-এর ২৪ অক্টোবর তাঁর সেই আশা পূর্ণ হয়, যেদিন নবান্ন প্রথমবারের মতো অভিনীত হলো শ্রীরঙ্গমে। ২৪ অক্টোবর থেকে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত সাতবার অভিনীত হয়েছিল নবান্ন, পরবর্তী ছমাসে আরো চল্লিশবার। নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য উল্লেখ করেছেন, চার মাসের মহলা শেষে এ-নাটকের অভিনয় এতোটাই দর্শকনন্দিত হয়েছিল যে, অবিভক্ত বাংলার জেলায় জেলায় এ-নাটকের অভিনয় ছড়িয়ে পড়ে। শম্ভু মিত্র কেবল এ-নাটকের অভিনেতা নন, সহ-পরিচালক, এবং বিজনের ভাষায়, ‘প্রয়োগ শিল্পের তত্ত্বাবধান করতে অনুরোধ করি শম্ভু মিত্রকে।’ দৈনিক সাত-আট ঘণ্টা মহলার প্রয়োজন অনুভব করেন শম্ভু মিত্র এজন্যে। আগুন, জবানবন্দী আর নবান্ন – এই ত্রয়ী নাটক রচনার সূত্রে সুভাষ মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, আদিতে গল্পকার বিজন ভট্টাচার্য পরিণত হন নাট্যকাররূপে, আর তৃপ্তি ভাদুড়ী (পরে মিত্র), শোভা সেন, গঙ্গাপদ বসুরা হয়ে দাঁড়ান বরাবরের মতো নাটকে সমর্পিত। নবনাট্যের এই সূচনাপর্বে শম্ভু মিত্রের আবির্ভাব এবং তাকে অন্তিম পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার পুরোভাগে তিনি।

নবনাট্যের কুললক্ষণ নিহিত শম্ভু মিত্রেরই ভাষায়, সমসাময়িক ঘটনার ওপর আলোকপাত করবে তা, মঞ্চসজ্জা হবে দেশীয়, অনুকরণহীন (এখানে ইয়োরোপীয় নাটকের মঞ্চায়নকে অনুকরণ করার কথা বলা হচ্ছে। শম্ভু মিত্র রবীন্দ্রনাথের মঞ্চভাবনার উল্লেখ করেছেন এক্ষেত্রে) ও বাস্তবানুগ, আর অভিনয়শৈলী হবে ‘naturalistic’। শম্ভু মিত্র মনে করিয়ে দেন, ‘আমাদের সাধারণ রঙ্গমঞ্চে এই সময়ে theatrical-এর প্রার্দুভাব। তাই আবেগ প্রকাশের সময়ে সক্ষম অভিনেতার হাতে সেটা একটু বেশি থিয়েট্রিক্যাল, একটু বেশি stylized লাগতো, আর অক্ষমের হাতে হতো ham acting।’ নবনাট্য অভিনয়ের দিক থেকে এই নাটুকেপনাকে মুক্তি দিলো।

‘প্রয়োগশিল্পের তত্ত্বাবধান’, যার কথা বলা হয়েছে এর আগে, নবান্ন নাটকের ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব উপলব্ধি করলে নাটক নিয়ে শম্ভু মিত্রের গভীর অন্তশ্চারিতা অনুমিত হতে পারবে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এ-নাটকে চরিত্রগুলোর সংলাপই কেবল নয়, সমান গুরুত্ব রয়েছে নেপথ্যের বাজনা, সূত্রধরের ভূমিকা, ‘আর কিছু আলো, ধোঁয়া ও নামহীন চরিত্রগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনাও ছিল।’ পেশাদারি মঞ্চে অভিনয়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু শম্ভু মিত্রের, বিধায়ক ভট্টাচার্যের মাটির ঘর, শচীন সেনগুপ্তের পথের দাবী আর যোগেশচন্দ্র চৌধুরীর পরিণীতা দিয়ে। এর সঙ্গে নবান্ন যুগান্তর আনয়নকারী প্রযোজনা। অন্যদিকে প্রাক-নবান্ন নাটকের জমানায় দেখা গেছে, কয়েকটি জনপ্রিয় নাটক (প্রফুল্ল, সাজাহান, কেদার রায়) প্রদর্শিত হতো তুরুপের তাস হিসেবে। আর দর্শকের কাছে কয়েকজন অভিনেতার বিশেষ কয়েকটি চরিত্রের রূপারোপ নাটকের বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখছিল বলে নাটকগুলো অভিনীত হতো প্রায়শ। অহীন্দ্র চৌধুরী খ্যাতিমান ছিলেন সাজাহান চরিত্রে, ভূমেন রায় বিখ্যাত ছিলেন কেদার রায় নাটকে কার্ভালো এবং প্রতাপাদিত্যতে রডার ভূমিকায়। তেমনি নির্মলেন্দু লাহিড়ী বলতেই বঙ্গেবর্গী নাটকে ভাস্কর পন্ডিত কিংবা সিরাজউদ্দৌলাতে নামভূমিকায় তাঁর অনবদ্য অভিনয়কলার জন্য এ-নাটকগুলো বারবার মঞ্চস্থ হতো। কিন্তু ‘নবনাট্য’ হলো আদ্যন্ত যৌথ শিল্পপ্রয়াস, প্রচলিত ছক ভেঙে একেবারে দিশারির ভূমিকায় অবতীর্ণ। শম্ভু মিত্র সেই নবনাট্যের ভগীরথ। এখানেই তাঁর মহিমা ও মাহাত্ম্য।

নাটকের নবজাগরণ, রেনেসাঁস বলেই ভাবা যায় একে। পুরনোদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি নবনাট্য, যদিও এর মনোহারিত্বে মুগ্ধ হতে কুণ্ঠা দেখাননি শিশির ভাদুড়ীর মতো প্রবীণ নাট্যব্যক্তিত্ব, মুগ্ধ হয়েছেন, তবু বিধুর সত্যটি এই, নবান্ন প্রযোজিত হওয়ার বেশ কয়েক বছর পর শিশির কুমারের প্রযোজনায় দুঃখীর ইমান মঞ্চে এলো, সাফল্য পেল না। কারণ শৈশিরিক মেধা ও প্রতিভা বহুদূরপ্রসারী হলেও তা নবনাট্য-ভাবনার যথার্থ সমীপবর্তী ছিল না। এবং এখানেই শম্ভু মিত্রের নব্যতা মোহরাঙ্কিত হয়ে উঠল। বিজন ভট্টাচার্য লিখেছিলেন গ্রন্থাকারে নবান্ন নাটকের ১৯৬২-র সংস্করণের ভূমিকায়, ততোদিনে ‘নবনাট্য’ কথাটি যথার্থ মাত্রা পেয়ে গেছে, ‘তখ্ত-ই-তাউস পরিত্যাগ করে প্রান্তরে সমাজের এক গুহক সৈনিকের দুর্মদ অঙ্গীকারের মধ্যেই নবনাট্যের নতুন দ্যোতনা।’

এ-কথা ঠিক, সময়ের প্রয়োজন ও দাবিই লিখিয়ে নিয়েছিল নবান্ন নাটক, মঞ্চায়নও ঘটিয়েছিল তার, কেননা সমসাময়িকতার লেবাস যে-নাটকের গায়ে আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত, সে-নাটকের অভিনয়কে তো ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা যায় না। বিয়াল্লিশের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন, মেদিনীপুরে ভয়াবহ বন্যা, সমগ্র বঙ্গদেশে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, যাতে মৃতের সংখ্যা পঞ্চাশ লাখ! ইতিহাস তার অরুন্তদ জ্বালামুখ খুলে দিয়েছে। একই সময়ে, আমরা পাশ্চাত্যের দিকে তাকালে দেখব, ১৯৩০-৫০ পর্বে সেখানেও নাটকে আসছে নতুন ধারা। তিরিশের বিশ্বব্যাপী মন্দায় আক্রান্ত ইয়োরোপ আর আমেরিকা, স্পেনে ফ্যাসিবাদ আর জার্মানিতে নাৎসিবাদ, হিটলারের উত্থান এবং এই উত্থানপর্বকে হুঁশিয়ারি দিয়ে লেখা নাটক আর্টুরো উই। হিটলার, গোয়েরিং ও গোয়েবলকে সহজেই শনাক্ত করা যায় এ-নাটকে যথাক্রমে আর্টুরো উই, রোমা ও জভোলা চরিত্রগুলোর মধ্যে। এ-সময় শ্রমিকশ্রেণির গুরুত্ব বাড়ছে, ইয়োরোপের দেশে দেশে, হাঙ্গেরি, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে। ১৯৩৯ সালে দেখতে পাচ্ছি, ব্রেখ্টের উপন্যাস ট্রেড ইউনিয়নকর্মীদের পড়তে দেওয়া হচ্ছে, তাদের প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য জানার জন্য। এবং তা শ্রমিকদের তৃপ্ত করলে ব্রেখ্ট উপন্যাসটির বাকি অংশ শেষ করেন। জার্মানিতে এ-সময় গড়ে উঠছে ‘লেবার স্টেজ’, যেখানে অভিনীত হচ্ছে হাউস্টমানের নাটক The Weavers, টলার-রচিত নাটক Messe-mensch ইত্যাদি সামাজিক বার্তাবাহী নাটক। অভিনয়ের চিরাচরিত আঙ্গিক পালটে যাচ্ছে এসব নাটকে, নির্মিত হচ্ছে নতুন নাট্যভাষা, ‘sprechor’ বা ‘speaking choir technique’। এক ধ্বনি মুহূর্তে বহুধ্বনি হয়ে উঠছে। নাটকে কোনো একটি শিশুর মুখ দিয়ে হয়তো বলানো হলো, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিশুদের কাছে পৃথিবী বাসযোগ্য হয়ে উঠবে, লড়াই, হ্যাঁ, লড়াইকে অক্ষুণ্ণ রাখলে (স্বভাবতই এখানে শ্রমিকদের লড়াই সম্পর্কে বলা হচ্ছে), আর অমনি নাটকের সব কুশীলব বাক্যটির প্রতিধ্বনি তুলল, আর দর্শকমনে এর অভিভব হলো মারাত্মক। রাশিয়ার ভ্রাম্যমাণ ‘Agitprop’ নাট্যদলও প্রচলিত নাট্য-আঙ্গিক বদলে ফেলে শ্রমিকস্বার্থকে অগ্রবর্তী করে নাট্যান্দোলন চালাতে লাগল।

অর্থনৈতিক মন্দার কেন্দ্রবিন্দু আমেরিকাতেও ব্রডওয়ে থিয়েটারের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছিল নব-আঙ্গিকের নাটক। Agitprop Groups, Shock troupes, The Blue Blouses, Rebel Players নামের নাট্যদলগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ল সর্বহারা তথা শ্রমিকের সমস্যা নাটকে প্রাধান্য দিয়ে। তাই সময়ের প্রয়োজন বড্ড বালাই, যা যাবতীয় শিল্পধারাকে প্রভাবিত না করে পারে না।

দুর্ভিক্ষের করালদংষ্ট্রা তাই নবান্ন নাটকের সূতিকাগার, এবং শম্ভু মিত্রের মতো নাট্যবুভুক্ষু নাটকটিকে সর্বাঙ্গীণ শিল্পময়তায় নিয়ে যেতে উঠেপড়ে লাগলেন। মহর্ষি, অর্থাৎ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্যের শিল্পিত সত্তা যুক্ত হয়েছিল সেইসঙ্গে। তাঁর পরামর্শেই তো মঞ্চসজ্জায় সাধারণ চট এনে কারুকৃতি রচিত হয়েছিল। চুয়াল্লিশ পর্বের নবান্নতে মঞ্চস্থপতিরূপে খালেদ চৌধুরী আসেননি। তিনি আসবেন ১৯৪৮-এ, এ-নাটক বহুরূপীর প্রযোজনায় যখন অভিনীত হবে। ’৪৪-এ ছিলেন চিত্ত ব্যানার্জি। শম্ভু মিত্র তাঁকে পাশে পেয়েছিলেন বলে নাটকটি তার যথার্থ মান রক্ষা করতে পেরেছে। এ মত স্বয়ং শম্ভু মিত্রের।

নবান্ন থেকে নবান্ন, অর্থাৎ প্রথমটি গণনাট্যের, ১৯৪৪-এ যার অভিনয়, এবং দ্বিতীয়বার ওই একই নাটক দিয়ে বহুরূপী গোষ্ঠীর যাত্রারম্ভ, চার বছর পরে, ১৯৪৮-এ। এই সময়পর্বে নাটক নিয়ে তাঁর ভাবনাচিন্তা, তাঁর লেখালেখি ও অভিনয়, ব্যক্তিগত জীবনের নানা পরিবর্তন, নাটকের পাশাপাশি তাঁর চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে যোগদান, তাঁর বিবাহপর্ব, এ সবকিছুই পড়ে।

১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮ কেবল চারটি নিরীহ প্রবাহিত হওয়া বছর নয়, আরো অধিক। পরাধীন দেশ স্বাধীন হলো দাঙ্গার রক্তাক্ত ক্লেদান্ত দক্ষিণার মাধ্যমে। হলো দেশভাগ, ছিন্নমূল হলো লাখ লাখ মানুষ। জনবিন্যাস গেল পালটে। হিরোশিমা-নাগাসাকির বীভৎসতা দেখল বিশ্ববাসী। চীনে বিপ্লব, প্যালেস্টাইন-ইসরায়েলের যুদ্ধসূচনা, ঠান্ডা লড়াই নিয়ে নতুন আবর্তে ছুটতে শুরু করল বিশ্ব। উপমহাদেশে গান্ধী আর জিন্নাহ দুজনেই নিহত ও প্রয়াত হলেন। ভারতের সংবিধান রচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে নাটকে ও চলচ্চিত্রে, যুগান্তরের সূচনাও এ-সময় থেকেই। স্বাধীনতার বছর অর্থাৎ ১৯৪৭-এ কলকাতায় গঠিত হলো ফিল্ম সোসাইটি, যার প্রাণপুরুষ ছিলেন চিদানন্দ দাশগুপ্ত, বংশীচন্দ্র গুপ্ত, সত্যজিৎ রায় প্রমুখ। নতুন ধারায় চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ার বীজ বপন করা হলো বলা চলে, যার ফলে ১৯৫৫-তে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীর আবির্ভাব, যদিও তাঁর আগে নিমাই ঘোষ-পরিচালিত ছিন্নমূল (১৯৫০) আর ঋত্বিক কুমার ঘটকের নাগরিক (১৯৫২) বাংলা ছবিতে নবতরঙ্গ এনেছিল, ঐতিহাসিকভাবে এ-সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। এবং ১৯৪৮-এ বহুরূপী। IPTA থেকে শম্ভু মিত্রসহ আরো অনেকেই বেরিয়ে এসেছেন। কারণটা সংক্ষেপে জানা দরকার।

শম্ভু মিত্র ‘ভাগনাসে’ (ভারতীয় গণনাট্য সংঘ) যোগ দিয়েছিলেন বিনয় ঘোষ ও বিজন ভট্টাচার্যের অনুপ্রেরণা ও আহবানে। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখারূপে ভাগনাস ক্রিয়াশীল ছিল। এর আগে পেশাদারি মঞ্চে কয়েক বছর অভিনয় করেন তিনি। প্রথমে রঙমহল মঞ্চে বিধায়ক ভট্টাচার্যের রত্নদীপ, গৌর শীর ঘূর্ণি নাটকে। এরপর তিনি যোগ দেন মিনার্ভায়, এবং জয়তী নাটকে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হন। এরপরে তিনি আসেন ‘নাট্যনিকেতনে’। এরপর কিছুদিন তিনি শিশির কুমার ভাদুড়ীর পরিচালনায় জীবনরঙ্গ নাটকে অংশ নেন। পরে কালীপ্রসাদ ঘোষের ভ্রাম্যমাণ নাট্যদলের সঙ্গে ছিলেন। পেশাদারি দল তাঁকে কিছুতেই তৃপ্তি দিতে পারছিল না। তাঁর নাট্য-এষণা, নাটক নিয়ে ভাবনা-চিন্তা, উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে শিশিরকুমার-কালীপ্রসাদেরা ন্যূন বিবেচিত হচ্ছিলেন, যদিও শিশিরকুমারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছিল তাঁর অপরিসীম। এ-সময়েই তিনি ভাগনাসে যোগ দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেন। কমিউনিস্ট পার্টি তখন ব্রিটিশ শাসকদলের কাছে সুয়োরানী, কেননা হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করলে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি মিত্র শক্তির সমর্থক হয়ে পড়ে ও রুশবিরোধী অক্ষশক্তির প্রতিকূলতা করে, একে ‘জনযুদ্ধ’ আখ্যা দেয়। তাই বিয়াল্লিশের আন্দোলনে এবং বাংলার দুর্ভিক্ষ-মন্বন্তরকেও তারা কিন্তু মূলত নেতিবাচক দৃষ্টিতে গ্রহণ করেছিল। নেতাজী সুভাষচন্দ্রের প্রতিও কটূক্তি করে তারা। অথচ এখানে একটি স্ববিরোধ দেখতে পাই আমরা। বাঙালি সংস্কৃতিমনাদের প্রায় সিংহভাগ, ঋত্বিক ঘটক থেকে রবিশঙ্কর, দেবব্রত বিশ্বাস, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সলিল চৌধুরী, স্নেহাংশু আচার্য, সকলেই ভাগনাসের ছত্রছায়ায় আসেন।

অচিরে মোহভঙ্গও হয় তাঁদের। পার্টি তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেয় নানা অবাঞ্ছিত শর্ত, সংস্কৃতির অঙ্গনে রাজনীতির অভিভাবকত্ব প্রকট হতে থাকে। তাছাড়া অন্তর্কলহ ভাগনাসে ভাঙন ধরায়। রবিশঙ্কর তাঁর স্মৃতিকথায় লিখছেন, ‘পার্টির অফিস থেকে নানা রকম ফরমায়েশ আসতে শুরু করল।… একটা সময় বুঝতেই পারছিলাম বড় বেশি মাপজোখের মধ্যে প্রবেশ করছি।… কিছুদিন পরেই বুঝলাম ওদের মূল দৃষ্টি কোনো টপিকাল ইস্যু নিয়ে কাজ করা।… স্থায়ী সাহিত্যের সঙ্গে সাংবাদিকের যে দূরত্ব, এদের কাজ-কারবারের সঙ্গে দেখলাম স্থায়ী কোনো শৈল্পিক কাজের সেই দূরত্ব থেকে গেছে।… কী রকম যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে-বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঠেকতে লাগল।’ এমন অবস্থা অনেকেরই হচ্ছিল। যেমন বিজন ভট্টাচার্য বা শোভা সেন। আনন্দবাজারের চাকরি ছেড়ে বিজন ভট্টাচার্য ভাগনাসকে ভালোবেসে যোগ দিয়েছিলেন। থাকতেন গোয়াবাগানের কমিউনে, যেখানকার চিলেকোঠায় শম্ভু মিত্রও ছিলেন। করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী ছবিতে সর্বজয়ারূপে যিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন গণনাট্যে। স্বামী সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ও মুম্বাইবাসী। তাঁরা থাকতেন আন্ধেরির কমিউনে। অাঁচড়ে এঁদেরও মোহভঙ্গ হয়। এইভাবে নবান্নের তুমুল সাফল্য সত্ত্বেও (বর্ধমানের হাটগোবিন্দপুরে ঝড়-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে লক্ষাধিক দর্শক এ-নাটক দেখতে এসেছিলেন, নবান্ন থেকে লালদুর্গ গ্রন্থে লিখেছেন শোভা সেন) সংঘের নাট্যশালাটির অকালমৃত্যু ঘটে। ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারিতে কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় অধিবেশন বসে কলকাতায়, আর তার কিছুদিনের মধ্যেই ভারত সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করে। নেতাকর্মীরা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান।

১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮, শম্ভু মিত্রকে একদিকে ভুগতে হয়েছে চেতনার সংকটে, অন্যদিকে বিবাহিত জীবন শুরু হয়েছে তাঁর। তৃপ্তি ভাদুড়ীর সঙ্গে তাঁর বিবাহের মধ্যে কিঞ্চিৎ নাটকীয়তা আছে। নবান্নের সূত্রেই দুজনের পরিচয় ও প্রণয়। খাজা আহম্মদ আববাস তাঁদের নবান্নের অভিনয় দেখে মুম্বাইতে সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। ছবির নাম ধরতি কে লাল। সেখানে অভিনয়ের শুটিং চলাকালেই তাঁদের বিয়ে, খাজা আববাসের ‘সমুদ্র তরঙ্গ’ গৃহে। বিয়ের তারিখ ১০ ডিসেম্বর, ১৯৪৫। বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন এমন সব বিশিষ্ট ব্যক্তি, – বলরাজ সাহানি, কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি.সি. যোশী, শান্তি বর্ধন, বি.টি. রণদিভে, ভবানী সেন প্রমুখ। ১৯৪৮ সালে বহুরূপী প্রতিষ্ঠার পর স্বভাবতই শম্ভু মিত্রের সঙ্গে তৃপ্তি মিত্রও দলে যোগ দিলেন।

গোড়ায় দলটি ছিল নামহীন, পরে নবান্ন মঞ্চায়িত হবে দল থেকে, তাই সাময়িকভাবে দলটির নাম রাখা হয় ‘অশোক মজুমদার ও সম্প্রদায়’। অস্থায়ী এই নামটি বহুরূপীতে পর্যবসিত হলো এরপর, মহর্ষির দেওয়া নাম।

এবারের নবান্ন কিন্তু প্রথমবারের মতো অতো উত্তুঙ্গ জনপ্রিয়তা পায়নি। মোটের ওপর সার্থক প্রযোজনা। বহুরূপী এরপরেও নবান্ন মঞ্চে এনেছে ১৯৯০-এ, যখন শম্ভু মিত্র দলে নেই আর। সে-মঞ্চায়ন বাংলাদেশেও গেছে, কিন্তু দর্শক স্বস্তি পায়নি সে-প্রযোজনায়।

তবু নবান্ন শম্ভু মিত্রের নাট্য-পথপরিক্রমায় নিঃসন্দেহে এক মাইলফলক। তাঁর প্রকৃত নাট্যদীক্ষা হয়েছে এ-নাটকের মাধ্যমে; দীর্ঘ প্রায় দুবছর একাদিক্রমে এ-নাটকটিতে সংলগ্ন ছিলেন তিনি। অতঃপর তাঁর অগ্রযাত্রা আমরা লক্ষ করব।

 

শম্ভু মিত্র : রক্তকরবী

নবান্ন ১৯৪৮-এর বহুরূপী প্রযোজনা আর রক্তকরবী ১৯৫৪-র। মধ্যপর্বে নটি নাটকের ব্যবধান – পথিক (১৯৪৯), উলুখাগড়া (১৯৫০), ছেঁড়া তার (১৯৫০), বিভাব (১৯৫১), চার অধ্যায় (১৯৫০), দশ চক্র (১৯৫২), স্বপ্ন (১৯৫৩), এই তো দুনিয়া (১৯৫৩) আর ধর্মঘট (১৯৫৩)। এই ছবছরে বহুরূপী একদিকে বাংলার গ্রুপ থিয়েটারে নিজের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করতে পেরেছে, অন্যদিকে উদ্দীপিত করছে নতুন নাট্যদলের আবির্ভাবকে। শম্ভু মিত্রকে কেন্দ্র করে বহুরূপীতে বিস্ময় সৃষ্টিকারী অভিনেতা-অভিনেত্রীর আবির্ভাব হচ্ছে, – কুমার রায়, গঙ্গাপদ বসু, কালীপ্রসাদ ঘোষ, দেবতোষ ঘোষ, মহম্মদ জাকারিয়া, শোভেন মজুমদার, কলিম শরাফী, শান্তি দাশ, সবিতাব্রত দত্ত, মহম্মদ ইসরাইল, কালী সরকার, শিবু মুখোপাধ্যায়, অমর গঙ্গোপাধ্যায়, তৃপ্তি মিত্র, আরতি মৈত্র, রমলা রায়, লতিকা বসু প্রমুখ।

রক্তকরবী করার ভাবনা অঙ্কুরিত হয়েছিল শম্ভু মিত্রের মধ্য দিয়েই। অমর গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন, ‘…নানান নাটক নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল – হঠাৎ শম্ভুদা বললেন, ‘রক্তকরবী’ অভিনয় করলে বেশ হয়।… এ পর্যন্ত যত নাটক নিয়ে আলোচনা হয়েছে কোনোটারই প্রয়োগ পরিকল্পনা আমাকে এতোটা মুগ্ধ করেনি। পুরো ‘রক্তকরবী’ স্পষ্ট হয়ে গেল।… সকলেই উল্লসিত। এই নাটকই করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।’ সিদ্ধান্তটি ১৯৫৪-র মার্চ মাসের, আর রক্তকরবী মঞ্চায়িত হয় এর মাত্র দেড় মাস পরে, ১০ই মে, ১৯৫৪-তে। এতো স্বল্প মহলায় এমন একটি দুঃসাহসিক প্রযোজনা। শঙ্খ ঘোষ এঁদের সামগ্রিক রবীন্দ্র-প্রযোজনা নিয়ে যা বলেন, তা তো রক্তকরবী সম্পর্কেও প্রযোজ্য, ‘চরিত্রের আবিষ্কার, শব্দের আবিষ্কার আর ধ্বনির আবিষ্কার এরই সচেতনতায় বহুরূপী-র অভিনয় নতুন করে আবার রবীন্দ্র নাটকের তুচ্ছতম অংশেরও দিকে যে আমাদের মন ফেরাতে বাধ্য করে, এখানেই তাদের বৈশিষ্ট্য। রবীন্দ্রনাথ এ-নাটক লেখার তিরিশ বছর পর অভিনীত হতে পারল এ-নাটক (যদিও এর আগে রক্তকরবী অভিনয়ের সংবাদ জানা যায়। ১৯৪৯-এ। দেবব্রত বিশ্বাসের পরিচালনায় নাটকটি মঞ্চায়িত হয়েছিল)।’ এই বিস্ময়কর তথ্যের পাশাপাশি এ-নাটকের মঞ্চসজ্জা, মেকআপ, অভিনয়শৈলী, সংগীতের ব্যবহার আর সামগ্রিক প্রযোজনা বাংলা নাটককে নান্দনিকতার শিখরে স্থাপন করল। প্রাথমিকভাবে এ-নাটকের মঞ্চস্থাপত্যে খালেদ চৌধুরী অনুসরণ করেছিলেন রক্তকরবী নাটকে গগনেন্দ্রনাথের প্রচ্ছদটিকে। পরিচ্ছদ পরিকল্পনা কী হবে স্থির করতে না পেরে শম্ভু মিত্র চলে যান শান্তিনিকেতনে নন্দলাল বসু এবং রামকিঙ্কর বেইজের কাছে। খালেদ চৌধুরী গগনেন্দ্রনাথের কিউবিজম থেকে বেরিয়ে এসে অচিরেই মঞ্চসজ্জায় স্বকীয়তা নিয়ে আসেন।

এখানে উল্লেখ্য, বহুরূপী সে-সময়ে তাদের নতুন নাটকের প্রথম প্রদর্শনী সাধারণ দর্শকদের জন্য করত না। বহুরূপীর অন্যতম চমৎকারিত্ব, নাটকের প্রথম অভিনয় প্রদর্শিত হতো কেবল ‘অনুগ্রাহক সদস্য’দের জন্য। নাটক শেষে তাঁদের মতামত নেওয়া হতো এবং গুরুত্বসহকারে তা বিবেচনা করে প্রযোজনাটির সংশোধিত রূপ প্রদর্শিত হতো সর্বসাধারণের সামনে। প্রাথমিক ত্রুটিগুলো থেকে মুক্ত হয়ে এইভাবে নাটকটিকে গোড়াতেই অনবদ্য করে তোলার প্রয়াস বাস্তবিকই প্রশংসার্হ।

কী ছিল প্রথম অভিনয়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া অনুগ্রাহক সদস্যদের, রক্তকরবী দেখার পর? অনেকেই উচ্ছ্বসিত, কেউ প্রশ্নায়িত, কেউ আবার উত্তেজিত, নাটকটির সামগ্রিক উপস্থাপনায়।