সিকদার আমিনুল হকের কবিতার পথরেখা

লেখক:

মিনার মনসুর

সিকদার আমিনুল হকের (১৯৪২-২০০৩) অকালমৃত্যুর পর লেখা এক দীর্ঘ কবিতায় অগ্রজ কবি সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন, ‘তোমার মতো কেউ কবিতা লিখত না, লিখবে না -’। সংকেতময় এই একটি পঙ্ক্তি দিয়েই শনাক্ত করা যায় তাঁকে। কবি হিসেবে শুরু থেকেই তিনি স্বতন্ত্র। এই স্বাতন্ত্র্য যে আকস্মিক বা ভুঁইফোঁড় কিছু নয়, প্রথম কাব্যগ্রন্থ দূরের কার্নিশেই সেই বার্তা তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন প্রবলভাবে। এও নিশ্চিত করেছিলেন যে, এ-স্বাতন্ত্র্য তাঁর স্বোপার্জিত। পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোতে তা আরো পরিণত ও উজ্জ্বলতর হয়েছে মাত্র। শামসুর রাহমান সম্পর্কে কবি-সমালোচক-গবেষক হুমায়ুন আজাদ যে-অভিধাটি ব্যবহার করেছিলেন, উভয়ের পথ ভিন্ন হলেও সিকদার আমিনুল হকের ক্ষেত্রেও তা পুরোপুরি প্রযোজ্য হতে পারত। কবিমাত্রই যে পরিব্রাজক, তাতে সন্দেহ নেই। তবে সিকদার আমিনুল হক ছিলেন সত্যিকারের এক শেরপা – যার লক্ষ্য ছিল ‘মহৎ কবিতার সমগ্রতা’র শিখরে আরোহণ। এ যে বড়ো দুঃসাহসী উচ্চাভিলাষ তিনি তা জানতেন। তা সত্ত্বেও সজ্ঞানে তো বটেই, সর্বোপরি সুদৃঢ় সংকল্প ও গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি এ কঠিন পথটি বেছে নিয়েছিলেন নিজের জন্যে। ফলে স্বাতন্ত্র্যের মুকুট তাঁর শিরে শোভা পাক না পাক, সমকালের কবিতাকেন্দ্রিক উচ্চ কোলাহলের ভেতরেও, একলব্যের মতো কঠিন উপেক্ষা ও নিঃসঙ্গতার শরে রক্তাক্ত হতে হয়েছে তাঁকে পদে পদে।

দূরের কার্নিশ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে। কবির প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, এতে অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল পূর্ববর্তী এক দশকে। সেই হিসাবে ধরে নেওয়া যায় যে, সিকদার আমিনুল হকের কাব্যযাত্রার শুরু ১৯৬৫ সালে এবং কিছু দোলাচল সত্ত্বেও তা স্থায়ী হয়েছিল প্রায় চার দশক। জীবন-জীবিকার পাগলা ঘোড়া তাঁকেও পথভ্রষ্ট করতে চেয়েছে বারবার। শেষাবধি কবিতা ছাড়া অন্য কোনো প্রেম কিংবা প্রলোভনের কাছে কখনোই তিনি নিজেকে সমর্পণ করেননি কিংবা করার কথা ভাবেননি। এ-সময়ে শ্রেষ্ঠ কবিতাসহ তাঁর ষোলোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পূর্ববর্তী ও সমকালীন বহু কবির বিপুল রচনাসম্ভারের তুলনায় নগণ্য হলেও তাঁর স্বাতন্ত্র্যকে শনাক্ত করার জন্যে তা নিঃসন্দেহে যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারতো। এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, তাঁর সতত ডানার মানুষ কাব্যগ্রন্থটির সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে এমন কাব্যগ্রন্থ বাংলাদেশের কবিতায় শুধু নয়, সমগ্র বাংলা কবিতায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। কিন্তু জীবদ্দশায় তো বটেই, এমনকি মৃত্যুর এক দশক পরেও কবি হিসেবে তাঁর এ-অনন্যতা অনেকটাই হয় অনাবিষ্কৃত অথবা অস্বীকৃত থেকে গেছে। তাঁর কবিতাসমগ্র নিয়ে গভীর ও বিশদ কোনো আলোচনা আমার চোখে পড়েনি। এমনকি তাঁর কবিতা বিষয়ে সাধারণ আলোচনা-সমালোচনার সংখ্যাও বিস্ময়করভাবে কম। সব মিলিয়ে যে পঁচিশ-ত্রিশটির মতো আলোচনা আমার চোখে পড়েছে তার বৃহদাংশই কবির মৃত্যুর পর লেখা  – যেখানে তাঁর কবিতার স্বরূপসন্ধান নয়, বরং তাঁকে ঘিরে বন্ধু ও সহযাত্রীদের ব্যক্তিগত ও আবেগময় স্মৃতির উচ্ছ্বাসই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এটা কি ইচ্ছাকৃত উপেক্ষা, আরোগ্যাতীত এক আত্মকেন্দ্রিকতা নাকি সর্বজনীন এক নিস্পৃহতা – তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। অবশ্য কবিতার অঙ্গনে নানা কারণে এ-ধরনের উদাসীনতা, উপেক্ষা বা অস্বীকৃতি যে অস্বাভাবিক নয়, জীবনানন্দ দাশই তাঁর সেরা উদাহরণ হতে পারেন। কিন্তু কাব্য-রাজনীতি থেকে দূরবর্তী নিস্তরঙ্গ যে অ্যাকাডেমিক জগৎ, সেখানেও সিকদার আমিনুল হকের মৃত্যুর পূর্বাবধি তাঁকে নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি।

কেন এটা হয়েছে তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে অতীত অভিজ্ঞতা, পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা এবং প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে। প্রথমত, কবি হিসেবে সিকদার আমিনুল হক যে সমকালের ও অব্যবহিত পরবর্তীকালের সংঘবদ্ধ ও সুপরিকল্পিত উপেক্ষার শিকার হয়েছেন তাতে সন্দেহ নেই। কবিস্বভাবের দিক থেকে অনেকটা নিরাসক্ত, নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ হওয়া সত্ত্বেও এটা তাঁকে রক্তাক্ত করেছে। তাঁকে যারা চিনতেন তাঁরা জানেন যে, বিরল এক আভিজাত্য ও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল মৃদুভাষী ও বন্ধুবৎসল এ-মানুষটির সহজাত। কবি ফজল শাহাবুদ্দীন লিখেছেন, ‘আমি অবশ্য তাকে বলতাম আমাদের ভদ্রলোক কবিদের প্রধান’। রসিকতার ছলে বলা হলেও কথাটি সত্য। তিনি ছিলেন তাঁর কবিতার মতোই স্নিগ্ধ পরিশীলিত এক মানুষ। সহজে মুখ খুলতেন না। তার পরও হাতে গোনা যে-কটি সাক্ষাৎকার তিনি দিয়েছেন, সেখানেও অন্তর্গত এ-ক্ষতকে তিনি আড়াল করতে পারেননি। বিবৃত করেছেন তিক্ততম দু-একটি দৃষ্টান্তও। বলেছেন, ‘আমার জীবনের অনেকটাই উপেক্ষার আর অন্ধকারের। সাধে কী আর একটি কবিতার বইয়ের নাম রেখেছি ‘বহুদিন উপেক্ষায় বহুদিন অন্ধকারে’।’ (পূর্ণতা, এপ্রিল-মে ১৯৯৫)। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে তিনি যে-কালের কবি সেটা ছিল নক্ষত্রখচিত। সেখানে অভিন্ন প্রেমিকার প্রতাপশালী প্রণয়প্রার্থীদের মধ্যে এ-ধরনের গোপন ও প্রকাশ্য কাব্যহিংসা না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণটি ছিল তাঁর বিশিষ্ট কবিস্বভাব – যা বরাবরই তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছিল। জীবনানন্দের পঙ্ক্তি ধার করে বলা যায়, ‘নিজের মুদ্রাদোষে’ই তিনি আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন অন্য সকলের কাছ থেকে – সেটা কি কবিতায়, কি তাঁর ব্যক্তিজীবনে। তিনি নিজেও সচেতন ছিলেন এ-ব্যাপারে। খোলামেলা কথাও বলেছেন এ-নিয়ে। তাঁর কবিতায়ও তা উল্লিখিত হয়েছে নানাভাবে। লিখেছেন, ‘…পুরস্কার আমার হয়নি/ কথিত মুদ্রার দোষে উচ্চারণ সবুজাভ বলে।’ (তুলনীয় : ‘সকল লোকের মাঝে ব’সে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা?/ আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?/ আমার পথেই শুধু বাধা?’ – ‘বোধ’/ ধূসর পান্ডুলিপি)। তাঁর এ-স্বাতন্ত্র্যের অকুণ্ঠ স্বীকৃতি রয়েছে বন্ধু-অগ্রজ-অনুজ সকলের লেখায়ও। ফখরুজ্জামান চৌধুরীর সাক্ষ্য শোনা যেতে পারে : ‘আসলে সিকদার মানুষ হিসেবে ছিলেন খুবই উঁচুমাপের ­- আমাদের মতো গড়পড়তা মানুষদের চেয়ে অনেক উঁচু। ছিলেন নিভৃতচারী, তৈরি করেননি নিজের ঢোল বাজানোর জন্য পকেটসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। নিজের জন্য অনেক পুরস্কার জোগাড় করেননি যা আবর্জনাতুল্য।’ (ভোরের কাগজ, ২৮ মে ২০০৩)। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সর্বতোভাবেই তিনি আলাদা হতে চেয়েছিলেন। তাতে তিনি কামিয়াব হয়েছেন। তার মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছে কড়ায়গন্ডায়। হয়তো দিতে হবে আরো কিছুকাল। কারণ সর্বকালেই নিঃসঙ্গতা আর উপেক্ষাই হলো একলব্যদের নিয়তি-নির্ধারিত পুরস্কার।

সর্বশেষ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি কারণও রয়েছে বলে আমাদের ধারণা। সেটি হলো, সৎ, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান পাঠক-সমালোচকের অভাব। সমাজ ও রাজনীতির অন্যসব ক্ষেত্রের মতো শিল্প-সাহিত্যেও অনেকদিন যাবৎ অর্বাচীন ও ভুঁইফোঁড়দের তান্ডব চলছে। কোনো বিষয়কে গভীরভাবে জানা ও আত্মস্থ করার জন্যে যে-অধ্যয়ন ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন তার অভাব এখন সর্বব্যাপী। প্রায় সকলেই যেখানে সহজ সিদ্ধির পথে ছুটছেন, সেখানে সিকদার আমিনুল হকের মতো শুদ্ধাচারী কবির উপেক্ষিত না হওয়াটাই বরং অস্বাভাবিক। তবে এ দুর্ভাগ্য তাঁর একার নয়। প্রকৃত কারণ যা-ই হোক না কেন, সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে পারিপার্শ্বিক উপেক্ষা তাঁকে পীড়িত করেছে সত্য, কিন্তু চিড় ধরাতে পারেনি তাঁর আকাশস্পর্শী সংকল্পে। কারণ শীর্ষত্বের অভিলাষী হিসেবে অন্য যে-কারো চেয়ে তিনিই ভালো জানতেন যে, ‘উপেক্ষা হচ্ছে কবির জন্যে আশীর্বাদ। যত উপেক্ষা তত ধারালো; যত অবহেলা ততই নিজের দিকে তাকানোর সুযোগ; যত নিভৃতি ততই উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা। কবিতা বলো শিল্প বলো – একটা দীর্ঘ ভ্রমণ। একদিন-দুুদিনের ঝড়-বৃষ্টির ব্যাপার নয়, তুমি শেষ পর্যন্ত চূড়ায় উঠতে পারলে কিনা সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন…। উৎপীড়ন, উপেক্ষা, অবহেলা এগুলি থেকে প্রেরণা পাওয়ার শক্তিকেই বলবো – প্রতিভার শক্তি।’ (পূর্ণতা, এপ্রিল-মে ১৯৯৫)।

তাঁর কবিতা-বিষয়ে আলোচনার পরিমাণ যতো কমই হোক না কেন, যেটুকু আলোচনা হয়েছে, তাতে শামসুর রাহমান থেকে ওবায়েদ আকাশ পর্যন্ত সকলেই নিজেদের মতো করে স্বীকার করেছেন যে, সিকদার আমিনুল হক তাঁর সমকালের অন্য কবিদের মতো নন। তিনি আলাদা। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার উচ্চারণে অবশ্য কোনো জড়তা বা অস্পষ্টতা নেই। তিনি বলেছেন, ‘সিকদার আমিনুল হক বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নান্দনিক কবিদের অন্যতম। বাংলা কবিতায় তিনি এক স্বতন্ত্র অধীশ্বর।’ (কবির মৃত্যু-পরবর্তী নাগরিক স্মরণসভার ‘স্মারক প্রকাশনা’, ২৭ মে ২০০৩)। এতটা বলিষ্ঠভাবে না হলেও তাঁর সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন আরো অনেকেই। বিশেষত, কবিরাই তাঁকে সিক্ত করেছেন উচ্চ প্রশংসাসূচক বিশেষণের বৃষ্টিতে। তাঁকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘কবিদের কবি’, ‘কবি, শুধু কবি’, ধীসম্পন্ন অনন্য মেধার এক সম্ভ্রান্ত কবি’, ‘স্বতন্ত্র ও শুদ্ধাচারী এক কবি’, ‘এদেশের কবিতাশিল্পের সার্থক কবিশিল্পী’, ‘নিভৃতচারী’, ‘সতত কবি’, ‘আমাদের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ কবি’, ‘বিরল প্রতিভাবান কবি’, ‘প্রতীকী কবিতার একমাত্র প্রতিনিধি’, ‘বাংলা কবিতায় প্রতীকী রূপকল্পের সাধক’, ‘পরাবাস্তববাদী কবি’ এবং ‘তিরিশ-পরবর্তী বাংলা কবিতার বিশুদ্ধতম রোমান্টিক কবি’ প্রভৃতি অভিধায়। বলা হয়েছে, ‘আপনার কবিতা সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী, আন্তর্জাতিক প্রেরণায় আচ্ছন্ন, গভীরতর জীবন-অনুভূতিতে বর্ণিল।’ এমন মন্তব্যও করা হয়েছে যে, ‘শুদ্ধ কবিতা ও সিকদার আমিনুল হক পরস্পর সমার্থবাচক’। এ-প্রসঙ্গে জীবনানন্দ দাশের ভাষায় বলা যায়, ‘প্রায় সবই আংশিকভাবে সত্য – কোনো কোনো কবিতা বা কাব্যের কোনো কোনো অধ্যায় সম্পর্কে খাটে; সমগ্র কাব্যের ব্যাখ্যা হিসেবে নয়।’ (জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা)।

সবটাই যে প্রশংসার পাপড়ি তা অবশ্যই নয়, সেইসঙ্গে আছে কাঁটার কিছু খোঁচাও। পরিহাস করে কেউ কেউ বলেছেন, ‘সিকদার আমাদের একমাত্র ফরাসি কবি’। সিকদার আমিনুল হকের বিরুদ্ধে প্রধান তিনটি অভিযোগের মধ্যে এটি অন্যতম। বিষয়টি দৃষ্টি এড়ায়নি শামসুর রাহমানেরও। তিনি লিখেছেন, ‘সিকদার আমিনুল হক বিদেশি কবিতার অনুরক্ত পাঠক। তার এই কাব্যপাঠ ভাসা-ভাসা কিছু নয়। তার বিদেশি কাব্যপাঠকে নিজের কবিতার কাজে লাগিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে। কেউ কেউ ভুল করে ভাবতে পারেন, বুঝি বিদেশি কবিতা পড়ছেন।’ (ভোরের কাগজ, ৩ জুন ১৯৯৪)। দ্বিতীয় অভিযোগটি দুর্বোধ্যতার। স্বয়ং বিষ্ণু দেও তা সমর্থন করেছেন। সর্বশেষ অভিযোগটি উত্থাপন করেছেন শামসুর রাহমান। তিনি লিখেছেন, ‘সিকদার আমিনুল হক বাইরের জগতকে নিজের বারান্দা থেকে দেখতে পছন্দ করেন। এই অবলোকন একঘেয়েমির জন্ম দিতে পারে, যা ইতোমধ্যে এই নিবেদিতচিত্ত কবির কবিতায় উঁকিঝুঁকি দিতে শুরু করেছে। আমি তাঁর কবিতার অনুরক্ত পাঠক বলেই চাই, তার কবিতার পরিধি অধিকতর বিস্তৃত হোক।’  (ভোরের কাগজ, ওই)। শেষোক্ত অভিযোগটি যে অগ্রাহ্য করার মতো নয়, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

সিকদার আমিনুল হক কেন গুরুত্বপূর্ণ কবি সেই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানেও প্রবৃত্ত হয়েছেন কেউ কেউ। তন্মধ্যে দুটি পর্যবেক্ষণ আমাদের কাছে মূল্যবান বলে মনে হয়েছে। প্রথমটি কবি ওবায়েদ আকাশের। তিনি লিখেছেন :

মুক্তিযুদ্ধ ও গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উন্মাদনা ও বিশ্বব্যাপী কবিতাকেন্দ্রিক নানামুখী মুভমেন্টের ঝড়ো হাওয়ায় বাংলাদেশের ষাটের কবিতা উচ্চস্বর-শ্লোগানমুখীনতা থেকে গভীরতর নির্জনতায় সর্বত্র চষে বেড়িয়েছে। সিকদার আমিনুল হকের গুরুত্ব ও স্বাতন্ত্র্য এখানেই যে, তিনি সেই সমসাময়িক হয়েও সেই উন্মাদনার ভিড়ে পড়েও তাতে গা এলিয়ে দেননি। তিনি যে কাব্যিক প্রমত্ততায় নিজেকে নিঃশব্দ পেঁচার মতো আড়াল করে কবিতা লিখেছেন, সে ধারা তাঁর একান্ত নিজের, নির্জনতম এবং মানবিক অস্তিত্বের গভীরতর শেকড় পর্যন্ত তাঁর যাত্রা। তাঁর সেই স্বনির্মিত কাব্যভাষা তাঁর সহজাত কবিপ্রতিভার ঠাস বুননে তিনি নির্মাণ করেছেন। নিবিড় সতর্কতা, সচেতনতাকে ধীরে ধীরে মুঠোবন্দি করে আমাদের বাংলা কবিতাকে যে নতুন ধারার গতিময়তা এনে দিয়েছেন, তা আমাদের সমসাময়িক কবিদের ভেতর বিরল বলাটা মোটেও অত্যুক্তি নয়। সিকদার আমিনুল হক এ-কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, পাঠকমাত্র তাঁর কবিতা পড়ে বুঝে না-বুঝে ভাবতে বাধ্য হবেন যে, তিনি কবিতা কিংবা এমন কিছু পাঠ করছেন, যা তাকে সম্মোহিত করে। … সিকদার আমিনুল হক সেই ক্ষমতাধর কবি, যিনি কবিতার সব শর্ত পূরণ করে চারপাশের যা-কিছু দৃশ্যময়তাকে কবিতা করে তুলতে পারেন, যা কেবল কোনো মহৎ কবিই আয়ত্ত করতে পারেন। (সংবাদ সাময়িকী, ১১ মে ২০০৬)।

কবি শিহাব সরকারের পর্যবেক্ষণটি আরো নিবিড়। তিনি লিখেছেন :

তিনি (সিকদার আমিনুল হক) ছিলেন একজন খাঁটি ও প্রকৃত কবি। বিভ্রান্তির কুয়াশার ভেতর তিনি একসময় কবিতা-স্বদেশের অবয়ব দেখতে পান। আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করি, আশির দশকের প্রথমভাগে নিজস্ব কবিতার ভুবনে আমাদের অজান্তে কীভাবে সিকদার ভাইয়ের অভিষেক হয়ে গেছে। পথ পেয়ে গেছেন তিনি, একই সঙ্গে তিনি আয়ত্ত করেছেন এক নতুন কণ্ঠ। চলতে চলতে তাঁকে আর দ্বিধায় থমকে দাঁড়াতে হয়নি। তাঁর কবিতা আমাদের নিয়ে গেলো এক অনির্বচনীয় জগতে, যেখানে আছে একাধারে একজন জীবনবাদী, ভোগী পরিব্রাজকের বিরতিহীন আনন্দ ও বিষাদ, আছে অন্তর্লীন এক অধ্যাত্মচেতনা, যা শরীর পেয়েছে মৃত্যুচেতনায়। চমকে দেওয়ার মতো ইমেজ ও শব্দবন্ধের সমাবেশ ঘটিয়ে সিকদার আমিনুল হক মনোযোগী পাঠকের কাছে পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছেন মৃত্যুচেতনা ও মাংসের কবি। প্রেম ও প্রকৃতি সেখানে কবিতামুখী আবহ তৈরি করেছে মাত্র। (স্মারক সংকলন, প্রাগুক্ত)।

সিকদার আমিনুল হকের কবিতার সামগ্রিক মূল্যায়ন এ-পরিসরে সম্ভব নয়। সেই অভিপ্রায়ও আমাদের নেই। সংক্ষেপে শুধু এটুকু বলা যায় যে, মহৎ কবির প্রায় সব গুণাবলিই ছিল তাঁর মধ্যে। এমন নয় যে, এটা তাঁর জন্মসূত্রে প্রাপ্ত; এর জন্যে প্রচুর রক্ত ও ঘাম ঝরাতে হয়েছে তাঁকে। বিসর্জন দিতে হয়েছে বহুকিছু। অন্তর্গত এ-রক্তক্ষরণ থেকে তাঁর নিস্তার মেলেনি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। ছিলেন প্রবলভাবে কবিতা-অন্তপ্রাণ বিষয়বিমুখ এক মানুষ। লিখেছেনও যে নিতান্ত কবিতা ছাড়া তিনি আর কিছুই বোঝেন না। ফলে অবধারিত এক ব্যর্থতা তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছে সর্বক্ষেত্রে। এখন হয়তো বলা যাবে যে একমাত্র ব্যতিক্রম কবিতা। তিনি নিজেও জানতেন যে, ঈশ্বর যাকে কবি বানাতে মনস্থ করেছেন ব্যর্থতা তার সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু মহৎ কবির সহজাত যে চারিত্র্যলক্ষণ – অতৃপ্তি ও সংশয় – তা তাঁকে মুহূর্তের জন্যেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে দেয়নি। তদুপরি কবি স্বীকার করুন আর নাই করুন, পারিপার্শ্বিক অবজ্ঞা-অবহেলার পীড়ন তো ছিলই। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘আমি সব সময় সন্দেহ আর দ্বন্দ্বে থাকতে চাই। যতদিন রক্তাক্ত ততদিনই কবি। নির্দ্বন্দ্ব হলে আমাকে কাফন পরিয়ে দিও।’ (পূর্ণতা, এপ্রিল-মে ১৯৯৫)।

বস্ত্তত নিরন্তর অধ্যয়ন, অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়েই তিনি আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন মহৎ কবির গুণাবলি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি তেমন মনোযোগী ছিলেন না। ছিলেন স্বশিক্ষিত – অনেকটা রবীন্দ্রনাথের মতো। দেশি-বিদেশি সব ধরনের লেখাই পড়তেন। তবে মূল ঝোঁকটা ছিল বিদেশি সাহিত্যের প্রতি। বিশ্বের মহৎ সাহিত্যভান্ডারের সঙ্গে তাঁর হৃদয়ের সংযোগ ঘটেছিল ছাত্রাবস্থায়। আমৃত্যু তা শুধু যে অক্ষুণ্ণ ছিল তা-ই নয়, এটা তাঁর জীবনে সুদূরপ্রসারী ছায়া ফেলেছিল। তাৎপর্যপূর্ণভাবে বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবনবোধ ও কাব্যাদর্শকে। সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতাই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। এই একটি ক্ষেত্রে তাঁর কোনো আলস্য বা ক্লান্তি ছিল না; বরং তিনি ছিলেন একরোখা ও আপসহীন। সকলেই স্বীকার করেছেন যে, সিকদার আমিনুল হকের অন্যতম প্রধান একটি সম্পদ হলো তাঁর অনন্য কাব্যভাষা। বাংলাদেশের কবিতায় এর কোনো সমকক্ষতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সমগ্র বাংলা কবিতার নিরিখে বিচার করলেও তাঁর এ-অর্জনের ঔজ্জ্বল্য খুব একটা কমবে বলে মনে হয় না। যুগপৎ ঝকঝকে ও সাবলীল এ-ভাষা। চমকে দেওয়ার মতো তার দ্যুতি ও স্নিগ্ধতা। প্রকৃত কবির হাতে চেনা শব্দ, উপমা, পরিপার্শ্ব – এমনকি ছন্দও – কতোটা চমকপ্রদ ও নতুন হয়ে উঠতে পারে তা তাঁর কবিতার নিবিষ্ট পাঠক মাত্রই জানেন। ছন্দের শাসন মেনে চলেছেন কঠোরভাবে। আবার বাংলা কবিতায় টানা গদ্যের বা ‘গদ্যাকার কবিতার’ও তিনি অন্যতম পথিকৃৎ। উভয় ক্ষেত্রে তাঁর কুশলতা সমীহ-জাগানিয়া। শব্দ ও ছন্দের জাদুকর শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘সিকদার আমিনুল হক ছন্দসচেতন কবি। তিনি নির্ভুল ছন্দে কবিতা রচনা করেন। তার ছন্দে খুঁত খুঁজে পাওয়া দুরূহ। উপরন্তু তার কবিতা সুঠাম, ঘনবদ্ধ। শিথিলতা তার কবিতায় দুর্লভ।’ (ভোরের কাগজ, ৩ জুন ১৯৯৪)।

তাঁর কাব্যভাষা শুধু নয়, যেসব উপকরণের সমন্বয়ে তিনি এ-কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তাও বাংলাদেশের কবিতায় খুব সহজলভ্য নয়। সারাবিশ্বের মানচিত্রই যেন ঠাঁই করে নিয়েছে তাঁর কবিতায়। কবিকে মনে হবে এক বিশ্ব পর্যটক; বিশ্ব পরিভ্রমণের পথে যা কিছু তাঁর ভালো লেগেছে, ছায়া ফেলেছে হৃদয়ের গভীরে – সবই তিনি নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন তাঁর কবিতায়। সেখানে বিশ্বখ্যাত নগর-বন্দর-বাজার এবং অবশ্যই ‘দীর্ঘাঙ্গিনী’ রূপসীরা যেমন আছে, তেমনি আছেন বিশ্বসেরা শিল্পী-কবি-লেখকগণ। আছে তাঁদের অবিস্মরণীয় সব সৃষ্টিকর্ম, এমনকি কবিপ্রেমিকা থেকে শুরু করে তাঁদের সৃষ্ট চরিত্রের নামও। সে-তালিকা অনেক দীর্ঘ। (আশা করি, ভবিষ্যতের অনুসন্ধিৎসু পাঠক-গবেষকরা এই দিকটিতে বিশেষভাবে নজর দিতে ভুলবেন না। আমি নিশ্চিতভাবে তাঁদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি।) তাঁর কাব্যগ্রন্থের নামকরণ থেকেও তা কিছুটা অাঁচ করা যাবে। যেমন – আমি সেই ইলেক্ট্রা, বিমর্ষ তাতার, কাফকার জামা, সুলতা আমার এলসা, লোর্কাকে যেদিন ওরা নিয়ে গেলো প্রভৃতি। এ থেকেই তাঁর মানসগঠনের, তাঁর স্বাতন্ত্র্যের এবং একই সঙ্গে তাঁর বিশিষ্ট কবিস্বভাবের নেপথ্য প্রেরণা বা প্রেক্ষাপট সম্পর্কেও মোটামুটি স্পষ্ট একটি ধারণা পাওয়া যায়।

আগেই উল্লিখিত হয়েছে যে, বিশ্বসাহিতের আগ্রাসী পাঠক ছিলেন তিনি। সমসাময়িক কবি (পরবর্তীকালে ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক) মোহাম্মদ রফিক লিখেছেন, ‘দীপক (কবির ডাকনাম) ছিল আমার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে নাগরিক। ইউরোপীয় ধাঁচে তৈরি কাপড়চোপড় পরে সে বের হতো রাস্তায়, তার ঠোঁটে-জিহবায় কথায় কথায় উঠে আসত দেশ-বিদেশের কবিদের অমর পঙ্ক্তি, তাদের জীবন-জীবিকার নানা অনুষঙ্গ। … মূলত সেই সময় তার কথার ওপর ভর করেই সম্ভব ছিল আমাদের বিশ্বপরিভ্রমণ।’ (দৈনিক যুগান্তর, ৩০ মে ২০০৩)। মাইকেল মধুসূদন দত্তের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি সিকদার আমিনুল হকের ক্ষেত্রেও এ-বিশ্বযোগ এ-অধ্যয়ন তাঁর স্বতন্ত্র কাব্যাদর্শ ও কাব্যভাষা বিনির্মাণে যে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তাতে সন্দেহ নেই। অবশ্য এ নিয়ে কিছু সমালোচনাও রয়েছে যা ইতিপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে। কেউ কেউ তাঁর কবিতায় নানা জনের প্রভাবের কথাও বলেছেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এ-অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে বিশ্ববরেণ্য যেসব কবির নাম উল্লেখ করা হয়েছে সে-তালিকা অনেক দীর্ঘ শুধু নয়, একজনের তালিকার সঙ্গে অন্যজনের তালিকার মিল খুঁজে পাওয়াও দুষ্কর। এমনকি সিকদার আমিনুল হক তাঁর প্রিয় বা পছন্দের কবি হিসেবে যাদের নাম বলেছেন তা যুক্ত করলে তালিকাটি আরো দীর্ঘ হয় শুধু, কিন্তু তাঁর ওপর সুনির্দিষ্ট কোনো কবির প্রভাবের বিষয়টি প্রমাণিত বা নিশ্চিত হয় না। এ-প্রসঙ্গে কবি ও ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক খোন্দকার আশরাফ হোসেনের   মন্তব্যটি এখানে প্রণিধানযোগ্য :

(কবির) জীবৎকালে ঈষৎ লীলাচ্ছলে বলতাম, ‘সিকদার আমাদের একমাত্র ফরাসি কবি’। তাঁর ‘দূরের কার্নিশ’এ ফরাসি কবিতার মৃদু রোদের সম্পাত ঘটেছিল। তবে শুধু ফরাসি সৌরভ নয়, আরও দূর কোনো অধিজাগতিক বৈনাশিকতার ছায়াপাতও কি ঘটেছিল তাঁর কবিতায়? পাঠকরা বুঝবেন। আপাতত শোক করি একজন ‘শুদ্ধতা’র কবির জন্য। অশুদ্ধ এবং অপূর্ণ এ পৃথিবীতে দুর্লভ অভিকাঙ্ক্ষা ছিল তাঁর। সেজন্য ট্র্যাজিকভাবেই নিঃসঙ্গ ছিলেন তিনি, কবিতায়। মৃত্যুতে অধিকতর। (স্মারক সংকলন, প্রাগুক্ত)

শুরুতে সব তরুণ কবিই কারো না কারো দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হতে পারেন। এর মধ্যে দোষের কিছু নেই। সিকদার আমিনুল হক বলেছেন, ‘সব বড় কবিই আমার গুরু। সবাই আমার শিক্ষক।’ দেশি-বিদেশি এই ‘গুরু’ বা ‘শিক্ষক’দের কাছ থেকে তিনি অকুণ্ঠভাবে গ্রহণ করেছেন। সমৃদ্ধ করেছেন নিজের ভান্ডার। নির্মাণ করেছেন নিজের জন্যে কবিতার স্বতন্ত্র একটি ভুবন। সব বড়ো কবি-লেখকই তা করেন। সদ্যপ্রয়াত গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও যে এর ব্যতিক্রম নন, তা তাঁরা নিজেরাই স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি, এও স্মর্তব্য যে, ‘আমাদের যুগে, মানবসভ্যতার পাঁচ-সাত হাজার বছর যখন কেটেছে, তখন স্বকীয়তার সম্ভবপরতা স্বভাবতই যৎকিঞ্চিৎ। বিচার করে দেখলে আজকের দিনে আর আমূল নতুনের সাক্ষাৎ মিলবে না, পাওয়া যাবে শুধু পুরনোর ধ্বংসাবশিষ্ট উপকরণে নির্মিত অধুনাতনী অট্টালিকা।  এখানেও স্বাতন্ত্র্যে অবকাশ অত্যল্প; কারণ অট্টালিকার প্রয়োজন এতো সার্বজনীন ও সর্বকালীন যে তার মুখ্য রীতিও আজ অখন্ডনীয়। নবতর সমাবেশ ও বিন্যাস ছাড়া নূতনত্ববিলাসীর আর গতি নেই।’ (কাব্যের মুক্তি/ সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)। তবে এই বিশ্বযোগই যে সিকদার আমিনুল হকের স্বাতন্ত্র্যের একমাত্র কারণ নয়, তাও বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর সমকালে ও পরবর্তীকালে বিশ্বসাহিত্য আরো অনেকেই পড়েছেন। এখনো পড়ছেন। শুধু বিশ্বসাহিত্যের পন্ডিত হলেই যে বড়ো কবি বা লেখক হওয়া যায় না, তার উদাহরণ ভূরি ভূরি।

আমি ইতিপূর্বেও একাধিক নিবন্ধে সিকদার আমিনুল হককে ‘সতত ডানার কবি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছি। তাঁর মতো এতো বিশাল ডানাধারী কবি এদেশে আর আছে বলে আমার মনে হয় না। এ হলো কল্পনার ডানা ­- যাকে সাহিত্যের সমালোচকরা মহৎ কবি-লেখকের অন্যতম প্রধান চারিত্র্যলক্ষণ বলে মনে করেন। ঈর্ষণীয় রকমের কল্পনাশক্তির অধিকারী ছিলেন তিনি। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, সিকদার আমিনুল হককে নিয়ে এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যেও যে দুটি বড়ো ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে তার একটি হলো – তিনি সারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছেন। কিন্তু এ-তথ্যটি একেবারেই সত্য নয়। অবশ্য সারা পৃথিবী তিনি চষে বেড়িয়েছেন সত্য – তবে তা মানসিকভাবে। শারীরিকভাবে তাঁর বিদেশ ভ্রমণ আমেরিকা, ভারত ও ব্যাংককেই সীমিত। তাও খুব বেশি সময়ের জন্যে নয়। তার পরও তাঁকে নিয়ে যতো লেখা আমি পড়েছি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ-ভুলটি আমার নজরে এসেছে। এ-বিভ্রান্তির জন্যে মূলত তাঁর কবিতাই দায়ী। আগেই বলা হয়েছে যে, তাঁর কবিতা পড়ে মনে হতে পারে, এ হলো ইবনে বতুতার মতো কোনো বিশ্বপরিব্রাজকের দিনলিপি। তার ছত্রে ছত্রে অসাধারণ যেসব দৃশ্য ও ছবি ছড়িয়ে আছে তা চিত্তাকর্ষক শুধু নয়, আশ্চর্যরকম জীবন্তও বটে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বেশিরভাগ ছবিই তিনি এঁকেছেন তাঁর অনন্য শক্তিশালী সেই কল্পনার তুলিতে। তাঁর কবিতার অনিবার্য একটি অনুষঙ্গ হলো নারী। তার কামনামদির প্রবল যে শরীরী উপস্থিতি পাঠকের ইন্দ্রিয়কে ক্রমাগত অস্থির করে রাখে, তাও যতো না তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ, ততোধিক হলো কল্পনারই গর্ভজাত।

ভাবুকতা ছাড়া কি কবি হয়? জীবনানন্দ যেহেতু বলে গেছেন যে কবিতা অনেক রকম, অতএব, হলে হতেও পারে। আমাদের চেনা জগতেও কি এ-ধরনের কবির সংখ্যাই বেশি নয়? ভাবুকতার লেশমাত্রও লালন করেন না নিজের ভেতরে, কিন্তু কবি হিসেবে সর্বত্র সদম্ভে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন – এমন বহু কবির সঙ্গেই আমাদের দেখা হয় প্রতিনিয়ত। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের গলায় কবির সনদপত্রও ঝুলিয়ে দেয়। গণমাধ্যমে কারণে-অকারণে তাঁদের সচিত্র জীবনবৃত্তান্ত প্রচারিত হয়। ক্রমেই দীর্ঘ হতে থাকে তাঁদের পদক-পুরস্কারের তালিকা; কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। আখেরে কোনো কিছুই আড়াল করতে পারে না তাঁদের গৌণত্বকে। অচিরেই বুদ্ধুদের মতোই তারা হারিয়ে যায়। ভাবুকতাবর্জিত কবি হয়, কিন্তু মহৎ কবি – নৈব নৈব চ। সিকদার আমিনুল হকের কবিসত্তার উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্য হলো এই ভাবুকতা। প্রথম থেকে শেষাবধি এ-ভাবুকতাই ছিল তাঁর ছায়াসঙ্গী।

তাঁর কবিতায় বহির্জগতের ছায়াপাত আছে তবে তা গৌণ, মুখ্য হলো অন্তর্জগৎ। বিশাল তার ব্যাপ্তি। মহাসমুদ্রের মতো সর্বক্ষণই তা ফেনিল ও তরঙ্গময়। বিচিত্র ও বর্ণাঢ্য সব মাছের মতো সেখানে তাঁর ভাবনারা সাঁতার কাটে নিরন্তর। তার মধ্যে কিছু হয়তো আমাদের চেনা, বৃহদংশই বেগানা। তাঁর ভাবসামগ্রের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে রহস্যময় মাছটির নাম যে মৃত্যু – তাতে সন্দেহ নেই। সিকদারের আমিনুল হকের খেলা প্রধানত এই মৃত্যুর সঙ্গে। নানাভাবে মৃত্যু এসেছে তাঁর কবিতায়। আর যা কিছু তা সে জীবন, নারী, প্রেম-বিরহ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি যাই হোক – সবই তিনি পরখ করে দেখেছেন মৃত্যুর পাল্লায়। কখনো তাঁর মনে হয়েছে ‘সমস্ত পিপাসা মৃত, সত্য শুধু লাশকাটা ঘর’। আবার পরক্ষণেই মৃত্যুর মহাপরাক্রান্ত কর্তৃত্বকে অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘তবু পৃথিবীতে আমরা এমন কিছু রেখে যাবো, যার উদ্ধত ভঙ্গির কাছে মৃত্যুর প্রতিজ্ঞা আর দস্যুতার চিরকালের অবসান হবে।…’    (সতত ডানার মানুষ, পৃ ২৯)। এখানে এও বলে রাখা আবশ্যক যে, গভীর গভীরতর এ দার্শনিক ভাবনার গুরুভার কখনোই তাঁর কবিতার ডানাকে নিম্নগামী করতে পারেনি। বরং বহির্জগতের যতো উপকরণ তিনি সংগ্রহ করেছেন বিস্ময়কর শৈল্পিক দক্ষতার সঙ্গে তার সবই তিনি কাজে লাগিয়েছেন তার অন্তর্সত্তা উন্মোচনে। তা এতোটাই নির্ভার, স্নিগ্ধ ও সাবলীল যে তার সম্মোহন এড়ানো কঠিন।

ভারত বিভাগোত্তরকালে ঢাকাকেন্দ্রিক বাংলা কবিতার যে নবযাত্রার সূচনা হয়েছিল তার প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য হলো দেশাত্মবোধ। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ অবধি স্বাধীনতা সংগ্রামের যে মহাসড়ক ধরে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে গেছে আমাদের রাজনীতি, আমাদের কবিতার যাত্রাপথও তার থেকে ভিন্ন নয়। রাজনীতির গতিধারার সঙ্গে তাল রেখে আমাদের কবিতা কখনো উচ্চকণ্ঠ হয়েছে, আবার সামরিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রাজনীতি যখন নির্বাসিত হয়েছে সাময়িকভাবে, তখন কবিতাও বিষাদাক্রান্ত হয়েছে। কবিদের হাতে রচিত হয়েছে ‘স্যাড জেনারেশনে’র মেনিফেস্টোর মতো বিপন্নতার দলিল। তার ছায়াপাত ঘটেছে তাঁদের কবিতায়ও। এ-সময়ের কবি হওয়া সত্ত্বেও আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে প্রবলভাবে টালমাটাল পরস্পরবিরোধী এ-দুটি ধারা থেকেই সিকদার আমিনুল হক নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। বিস্ময়করভাবে তাঁর কবিতার ভাষা ও ভাবনা কোথাও তার উল্লেখযোগ্য ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে এও লক্ষণীয় যে, পিতার চাকরিসূত্রে তিনি বাংলাদেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। খুব কাছে থেকে দেখেছেন বাংলার মোহময় প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনকে। কিন্তু তাঁর কবিতার অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গে এর প্রভাব অতি নগণ্য। কেউ কেউ তাঁকে পরিশীলিত নাগরিক কবি হিসেবেও চিহ্নিত করেছেন। কিন্তু এ-পর্যবেক্ষণকেও যথার্থ বলা যাবে না। সিকদারের কবিতায় নগর আছে সত্য – সেখানে কদাচিৎ সদ্য সাবালক হয়ে-ওঠা ঢাকা মহানগরের অবয়বও উকিঝুঁকি মারে, কিন্তু তাঁর কবিতার যে-জগৎ সেটা কবির স্বনির্মিত – সেখানে স্বদেশের চেয়ে আন্তর্জাতিকতার ছায়াপাতই বেশি। এমনকি তার অবয়বও অনেকটা অতীতমুখী।

তবে কি বলতে হবে যে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং অতি অল্প সময়ের মধ্যে স্বাধীনতার যিনি মহান স্থপতি তাঁকে সপরিবারে নৃশংস হত্যার মতো বিশাল সব ঘটনাও কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি এই বাঙালি কবির চৈতন্যে? কীভাবে তা সম্ভব? না, প্রকৃত কোনো কবির পক্ষে স্বদেশের এমন উত্তাল সময়ে, মানবিকতার এমন বিপর্যয়ে নির্বিকার থাকা সম্ভব নয়। বাঙালি কবির পক্ষে তো তা আরো কঠিন। সিকদার আমিনুল হকও নির্বিকার ছিলেন না। সবই আছে তাঁর কবিতায়। (রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, ‘নয়নের জল গভীর গহনে/ আছে হৃদয়ের তলে/ মাঝে মাঝে বটে ছিঁড়েছিল তার/ তাই নিয়ে কে বা করে হাহাকার/ সুর তো গিয়েছিনু ভুলে)। না, সিকদার আমিনুল হক কিছুই ভোলেননি। ভুলবেনই কী করে? বাংলার মায়াময় এই প্রকৃতিই তো ছিল কবির নিঃসঙ্গ শৈশবের সর্বক্ষণের সঙ্গী : ‘কত একা ছিলাম আমি। শৈশবে। বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত। কিছুই আমি হারাইননি সেই পর্যন্ত; এমন যে দূরের নক্ষত্র, তারাও সারারাত্রি নীলিমার মধ্যস্থতায় আমার সঙ্গে কথা বলতো। সেই ভাষাও আমি জানতাম।’ (সতত ডানার মানুষ, পৃ ১২)। দেশকে, দেশের মানুষকে, মুক্তিযুদ্ধকে এবং অবশ্যই বঙ্গবন্ধুকে তো তাঁর ভুলে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে তাঁর প্রকাশভঙ্গি আলাদা। মাতৃভূমির প্রতি গভীর ভালোবাসার পাশাপাশি স্বদেশকে ঘিরে আশা ও আশাভঙ্গের বেদনা যেভাবে উঠে এসেছে তার কবিতায় তাও অন্য কারো সঙ্গে মেলানো যাবে না। একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

মুশকিল হলো স্মৃতি। যুদ্ধ আর স্বদেশের কথা কার না মনে পড়ে ফিরে ফিরে? … এই যে সারি সারি কবর, অগণন বর্বরতা আর ক্ষতবিক্ষত আমাদের বোনেরা; আমরা দিয়েছি মূল্য ঠিক অন্যদেরই মতো।…গভীর অন্ধকার তবু পৃথিবীর যায়নি; তার গায়ে নেকড়ের গন্ধ; এখনও রাত্রে শুনি কুয়াশার জঙ্গলে সিংহের গর্জন। (সতত ডানার মানুষ, পৃ ৩৮-৩৯)।

প্রবলভাবে আছেন বঙ্গবন্ধুও। পঁচাত্তরের বিভীষিকা বিষাদের ঘন কালো মেঘে ঢেকে রাখে তাঁর চৈতন্যের আকাশ। নানাভাবে তাঁর প্রকাশ ঘটেছে বহু কবিতায়। যেমন –

ঘাতকের পদশব্দে দগ্ধ দিনে বৃষ্টির অভাবে

অকালে ঝরছে পাতা; এলোমেলো অস্থির সময় –

তুমি নেই, পার্শ্বচর তস্করের রাঙা সূর্যোদয়;

আমার একার কান্না বিষাদের নীরব আষাঢ়ে

(আমি সেই ইলেক্ট্রা)

সিকদার আমিনুল হকের বিশেষত্ব এখানে যে-প্রবল রাজনৈতিক ডামাডোলের ভেতরেও স্বকীয়তা ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। মনে রাখতে হবে যে, তাঁর কবিতা লেখার সমগ্র কালটিই ছিল উত্তাল তরঙ্গমুখর। এটাকে বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে উত্তেজনাময়, ঘটনাবহুল এবং অনিশ্চিত সময়ও বলা যেতে পারে। যখন তিনি কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন, তখন একদিকে ছিল আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরশাসন, যা বাঙালির সর্বস্ব গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছিল; অন্যদিকে সহস্র বছরের শীতনিদ্রার ভেতর থেকে জনসমুদ্রের ক্রমজাগরণ। আবার যখন চার দশকব্যাপী এ-ভ্রমণ অসমাপ্ত রেখে অকস্মাৎ তাঁকে বিদায় নিতে হচ্ছে, তখনো ঘাতকদের গাড়িতে পতাকা ওড়ছে। সদম্ভে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে  পাকিস্তানি প্রেতাত্মার দল। দশক-নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রায় সব কবিই তাতে সাড়া দিয়েছেন। তাদের কবিতার কণ্ঠস্বর, ভাবনা, ভাষা, ছন্দ ও অলঙ্কার সর্বত্রই তার প্রবল প্রভাব লক্ষ করা যাবে। মোটা দাগে বাংলাদেশের কবিতা হলো সেই সময়েরই শাব্দিক দলিল এবং তা নিশ্চিত হওয়ার জন্যে শুধু শামসুর রাহমানের কবিতা-বিশ্লেষণই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু অভিন্ন দেশ-কাল-পরিপার্শ্বের সংবেদনশীল বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও সিকদার আমিনুল হক এ-ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। দেশকালবিমুখতা নয়, বরং তাকে আত্মস্থ করেই তিনি এগিয়ে গেছেন তাঁর নিজস্ব পথে। আগেই বলা হয়েছে যে, মহৎ কবিতার সমগ্রতার শিখরে আরোহণই ছল তাঁর অভীষ্ট। কিন্তু দীর্ঘ ঝঞ্ঝাতাড়িত যাত্রাপথের অপ্রতিরোধ্য সেই আবেগ-উত্তেজনার জলোচ্ছ্বাসও তাকে কখনোই সে-লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

কবি হিসেবে সিকদার আমিনুল হক তাঁর সমকালের তো বটেই, এমনকি পরবর্তীকালের বহু গৌণ কবির তুলনায়ও নির্দয়ভাবে উপেক্ষিত হয়েছেন। জীবদ্দশায় মাত্র দুটি পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন। তার মধ্যে একটি হলো বাংলা একাডেমি পুরস্কার। সেটাও তাঁকে দেওয়া হয়েছে মর্মান্তিক অবজ্ঞার সঙ্গে। তাঁর আগে কবি হিসেবে যারা এ-পুরস্কারটি পেয়েছেন তাঁদের তালিকায় চোখ বুলালেই তা কিছুটা হলেও অাঁচ করা যাবে। তবে এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ এর পেছনে যে কদর্য রাজনীতি কাজ করে তার দৌড় এতোটাই সীমিত যে, ডজন ডজন পুরস্কার দিয়েও তা কোনো অকবিকে কবি বানাতে পারে না। আবার প্রকৃত কবিকে সাময়িকভাবে কোণঠাসা করে রাখা সম্ভব হলেও তাঁর অনিবার্য উত্থান ঠেকানোর ক্ষমতাও তার নেই। সিকদার আমিনুল হকের ক্ষেত্রেও তাই ঘটতে বাধ্য। এটা প্রমাণিত যে, পরিকল্পিত পুরস্কারে-সংবর্ধনায় সমকালকে সন্ত্রস্ত করে রাখা দৌর্দন্ড প্রতাপশালী বহু কবির ‘রণক্লান্ত’ হয়ে পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু প্রকৃত কবি যিনি, তিনি একদিন ঠিকই আবিষ্কৃত হবেন – ‘… প্রাচীন গুহা, জাপানি উপাসনালয়ের ফিরোজা পাথর আর হ্রদের নিচে পড়ে থাকা চঞ্চল স্বভাব রূপসীর আঙটি’র মতো। এ উত্থান অনিবার্য শুধু নয়, অপ্রতিরোধ্যও বটে।

এটা সত্য যে, সিকদার আমিনুল হকের কবিতার রসাস্বাদন সহজ নয়। প্রতীক, উপমা, রূপক ও চিত্রকল্পের বহুস্তরবিশিষ্ট আবরণ সরিয়ে সেখানে প্রবেশ করতে হয়। দক্ষ বাজিকরের মতোই শব্দ নিয়ে খেলা করেন তিনি। সেটাও ধন্দে ফেলে দিতে পারে অসতর্ক পাঠককে। সেইসঙ্গে আমাদের অভ্যস্ত কাব্যরুচি ও কাব্যবোধের সঙ্গে তাঁর কবিতার ব্যাপক দূরত্বের বাধা তো আছেই। বাংলা কবিতায় যাকে দুর্বোধ্যতার প্রধান-পুরুষ বলা হতো সেই বিষ্ণু           দে-ই সিকদার আমিনুল হকের প্রথম কাব্যগ্রন্থ দূরের কার্নিশ পড়ে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘কবিতাগুলি পড়েছি। শক্ত। তবে কবির মন সজাগ। অবশ্যই আত্মসচেতনও বটে।’ (তিন পাঁপড়ির ফুল) এজন্যেই সিকদার আমিনুল হককে ‘কবিদের কবি’ অভিধায়ও ভূষিত করেছেন কেউ কেউ। এটা অযথার্থ নয়। সিকদার আমিনুল হকের কবিতা পাঠের জন্যে ব্যাপক প্রস্ত্ততির প্রয়োজন আছে। কেউ যদি মনে করেন এ-কালের সস্তা উপন্যাসের মতো এক নিশ্বাসে তা পড়ে ফেলবেন কিংবা একবার পড়েই সব বুঝে ফেলবেন তাহলে তাকে নিশ্চিতভাবে হতাশ হতে হবে। ‘এ কালের ছড়াকারের জন্যে আমার কবিতা নয়’ – সিকদার আমিনুল হকের এ-সতর্কবার্তাটি অহেতুক নয়।

কবিতার পাঠক কোনোকালেই বেশি ছিল না। এখন নাকি তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। প্রকাশকদের এ-অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে সিকদার আমিনুল হকের মতো জটিল স্বভাবের কবির অবস্থা কী হতে পারে তা অনুমান করা কঠিন নয়। তবে এ কঠিন সময়ে কবি ওবায়েদ আকাশ একটি সুসংবাদ শুনিয়েছেন। সেটি তাঁর ভাষায় শোনা যাক :

আজ যখন কবিদের মার্কেটখ্যাত আজিজ সুপার মার্কেটের বইয়ের দোকানগুলো থেকে কেবলই শেষ হয়ে যায় সিকদার আমিনুল হকের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’; কিংবা ‘দূরের কার্নিশ’ কিংবা ‘পারাবাত এই প্রাচীরের শেষ কবিতা’ কিংবা ‘তিন পাপড়ির ফুল’-এর মতো দুষ্প্রাপ্য বইগুলোর জন্য আজকের একজন তরুণ কবিতাকর্মী হন্তদন্ত হয়ে খুঁজে বেড়ান নীলক্ষেত কিংবা পল্টনের বইয়ের দোকানগুলো – তখন আর আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন কবি সিকদার আমিনুল হক। (‘সিকদার আমিনুল হক কেন গুরুত্বপূর্ণ কবি’, প্রাগুক্ত)।

ওবায়েদ আকাশের এ-পর্যবেক্ষণটি সাত বছর আগের। ইতোমধ্যে পরিস্থিতির আরো কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এমএ শেষ বর্ষের একজন ছাত্রী তাঁকে নিয়ে একটি অভিসন্দর্ভ রচনা করেছেন ২০১২ সালে। তাঁর ওপর পিএইচ-ডির কাজ চলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এটা সূচনা মাত্র। আমরা চাই বা না চাই সিকদার আমিনুল হক তাঁর সৃষ্টিকর্মের গুণেই ক্রমশ আবিষ্কৃত ও আলোকিত হতে থাকবেন তাতে সন্দেহ নেই।

পরিশেষে বলার কথা এটুকু যে, এটা কোনো পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা মূল্যায়ন নয়। বড়োজোর তাঁর কবিতার একটি সামান্য ভূমিকা মাত্র। ভবিষ্যতে যারা তাঁর ‘জটিল’ কবিতার ও কবিসত্তার স্বরূপ সন্ধানে ব্রতী হবেন সেই মেধাবী ও সাহসী অভিযাত্রীদের কথা মনে রেখেই একটি পথরেখা নির্মাণের এ নগণ্য প্রয়াস। সিকদার আমিনুল হকের স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করতে গিয়ে আমি তাঁর সমসাময়িক ও অগ্রজ কবিদের বিশিষ্টতার কথা থেকে মুহূর্তের জন্যেও বিস্মৃত হইনি। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের অর্জন ও ঔজ্জ্বল্য বাংলা কবিতার অমূল্য সম্পদ বলেই আমি মনে করি। অতএব, কাউকে কোনোভাবে খাটো করার তো প্রশ্নই আসে না। তার পরও যদি আমার অজ্ঞাতে এরকম কিছু ঘটে গিয়ে থাকে তার জন্যে আমি সবিনয় ক্ষমাপ্রার্থী। আমি মনেপ্রাণে জীবনানন্দের এ-কথা বিশ্বাস করি যে, ‘কবিতা অনেক রকম।’ একজন কবির স্বতন্ত্র হওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্যদের গুরুত্ব খর্ব হওয়া। লেখাটি শুরু করেছিলাম কবি সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের একটি পঙ্ক্তি দিয়ে, শেষ করতে চাই কবিতাসাম্রাজ্যের স্বয়ম্ভু এক সম্রাট আসাদুল্লাহ খাঁ গালিবের (১৭৯৭-১৮৬৯) একটি পঙ্ক্তি দিয়ে। সেটি হলো : ‘দুনিয়াতে ভালো কবি আরও আছেন/ লোকে বলে গালিবের বলার ভঙ্গিই আলাদা \’ (হৈঁ অওর-ভী দুনিয়া-মেঁ সুখনবর বহুৎ অচ্ছে।/ কহতে হৈঁ কেহ্ গালিব-ভী অন্দাজ-এ বয়াঁ অওর \)। [গালিবের গজল থেকে, আবু সয়ীদ আইয়ুব] কথাটি সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে শতভাগ প্রযোজ্য।