সুনীল কুমারের তৃতীয় একক প্রদর্শনী অসুন্দরের বিরুদ্ধে সুন্দরের দ্রোহ

সুনীল কুমার পথিক ছবি আঁকায় নিবেদিত এক শিল্পী। ছবি আঁকাই তাঁর নেশা ও পেশা। নিজে আঁকেন এবং আগ্রহীদের আঁকা শেখান। অঙ্কন শেখাতে শেখাতে নিজের অঙ্কনও পরিশীলিত হয়েছে।

সুনীলকে চিনি প্রায় দুই যুগ থেকে। চিত্রবিদ্যা শিখেছেন বাংলাদেশের প্রধান দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অঙ্কন ও চিত্রায়ণে স্নাতক করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুটি চিত্র-প্রদর্শনীও করেছেন, সেও অনেকদিন হলো। সে-সময় তাঁর আঁকা দেখেছি, তাতে দৃষ্টিনন্দন নিসর্গ ও সুললিত ফিগর অঙ্কনে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার প্রভাবটাই অধিকতর উচ্চকিত ছিল।

সম্প্রতি ঢাকার লালমাটিয়ায় শিল্পাঙ্গন ও ভূমি গ্যালারির যৌথ আয়োজনে সুনীল কুমারের তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। বারো দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী হয় গত ১৬ থেকে ২৭ মে পর্যন্ত। ১৬ মে শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের প্রফেসর এমেরিটাস অধ্যাপক শিল্পী রফিকুন নবী এ-প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন।

অসুন্দরের বিরুদ্ধে সুন্দরের লড়াইয়ের দীক্ষা দিয়েছিলেন আমাদের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। সেই ব্রত নিয়ে যাঁরা ছবি আঁকছেন সুনীল তাঁদের অন্যতম। প্রায় এক দশক ধরে দেখছি মানুষের দেহপ্রধান চিত্রচর্চায় স্বাতন্ত্র্যের সন্ধান করছেন তিনি। আর এক্ষেত্রে সুনীলের কাজের প্রধান চরিত্র নারী। নারীর ললিত সৌন্দর্য শুধু নয়, তাঁর সামাজিক অন্তরায়, তাঁকে আবদ্ধ রাখার নানা বিধিবিধানকে তিনি প্রতীকীভাবে তুলে আনছেন ছবিতে। পুরুষতান্ত্রিক ভাবনা চাপিয়ে দিয়ে নারীর গতিবিধিকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রক্রিয়াকে মেনে নিতে পারেননি তিনি। নারীত্বের মাহাত্ম্য তিনি উপলব্ধি করেছেন শিল্পীসুলভ মানসিকতা দিয়ে। আবার সমাজ-নিয়ন্ত্রকদের নারীবিদ্বেষী মনোভাব, নারী নির্যাতনের নির্মমতাকে তিনি চিত্রিত করে এক্ষেত্রে নিজের প্রতিবাদী সত্তাকে হাজির করেছেন।

এমনই এক অঙ্কনপ্রধান চিত্রকর্ম – ‘বিশেষ কারও অপেক্ষায়’ শিরোনামের চিত্রকর্মের কেন্দ্রস্থলে যোগ ফর্মের মতো জায়গায় লালপাড় সাদা শাড়ি পরে বসে থাকা নারী, তাকে ঘিরে আছে ফুল-পাখি-প্রজাপতি এবং অনেক মানুষের সহজ, কারো কারো বাঁকা-চোখের দৃষ্টি। এমনতর দৃষ্টিপাত আমরা দেখতে পাই তাঁর অন্য কয়েকটি চিত্রকর্মে। যেমন ‘সে এবং ওইসব অবয়ব-১ ও ২’ শিরোনামের ছবি দ্রষ্টব্য।

সভ্যতার পাশাপাশি অসভ্যতারও বিস্তার ঘটেছে দুনিয়ায়। মানুষ তার মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। এজন্য মানুষী দেহের জ্যামিতিক উপস্থাপন শিল্পীর কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। এমনকি তাঁর আঁকা নারী ও পুরুষের শরীরের অস্থিসন্ধিতে স্ক্রু ও নাটবোল্টের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এ যেন মানুষের যান্ত্রিক হয়ে ওঠার একধরনের প্রতীকচিহ্ন। তাঁর এসব কাজ যেন এ-কালের এ-সময়েরই পোস্টমর্টেম।

নারীকে টোপ দেওয়া, লোভ দেখানো, নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীকে বিভ্রান্ত করা, নারীধর্ষণ, খুন – এসব অপরাধকে মাথায় রেখে শিল্পী তাঁর চিত্রপটে নারীদেহকে কেন্দ্রে রেখে নানাবিধ অভিব্যক্তির অনেক পুরুষ অবয়ব স্থাপন করেন। হিন্দু মিথে রাবণের অনেক অবয়বের অভিব্যক্তির সঙ্গে এসব তুলনীয়। সেইসঙ্গে ফুল-পাখি ও প্রাণীর অবয়বকেও কোথাও কোথাও প্রয়োগ করেছেন স্পেসকে যথাযথ মূল্য দিতে। রিয়ালিস্টিক ফর্মের সঙ্গে কিউবিক ফর্মের মেলবন্ধনের পরেও কেমন একটা সুররিয়ালিস্টিক মেজাজের দেখা মিলছে তাঁর চিত্রকর্মের
সদরে-অন্দরে।

বড় ক্যানভাসে তেলরঙে আঁকা ‘কথা বলার স্বাধীনতা আমার অধিকার’ চিত্রটিতে শিল্পী সমসাময়িক দেশ ও রাজনীতিকে বিষয় করেছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে চাইছেন – সেই আকাঙ্ক্ষা এতে প্রতিফলিত হয়েছে। কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে উপজীব্য করে ছবি এঁকেছেন।

এর বাইরে সুন্দরের প্রতি শিল্পীর মনের টান ও আবেগের স্ফুরণ প্রত্যক্ষ করি কোনো কোনো চিত্রে। এমনতর চিত্রে আমরা শিল্পীর রোমান্টিক মনের সন্ধান পাই, অপরিসীম দরদে প্রেমিকের মন দিয়ে তিনি নারীর সৌন্দর্য ও কমনীয়তাকে চিত্রিত করেছেন, বার্তা দিয়েছেন – সৌন্দর্যের প্রতীককে যেন অবহেলা, অবজ্ঞা, অসম্মান না করি, অন্তর দিয়ে ভালোবাসি, তাকে সুরক্ষা দিই, তার সঙ্গে মানবিক আচরণ করি। যেমন তিনি এঁকেছেন
প্রেমিক-প্রেমিকা ও দম্পতির প্রেমময় অভিব্যক্তির ছবি।

অঙ্কনপ্রধান এসব চিত্রকর্ম তাঁর সাম্প্রতিক কাজ, অঙ্কনে দৃঢ়তা আনতে প্রচুর রেখা ব্যবহার করেছেন। এঁকেছেন কাগজে চারকোল, পেনসিল, জলরং ও ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে। তাঁর কাজ বাস্তবতার কাছাকাছি হলেও চিত্রে বর্ণ-আলিম্পন ঠিক বাস্তবানুগ নয়, পাত্র-পাত্রীর দেহাবয়ব নীলচে, তামাটে ও হলদেটে। কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর প্রমুখ বরেণ্য শিল্পী এবং আমাদের প্রাচ্য চিত্রকলার শিল্পীদের চিত্রে আমরা এসব বর্ণের বহুল ব্যবহার দেখি। শিল্পসমালোচক অধ্যাপক মঈনুদ্দীন খালেদের ভাষায় – তাঁর ছবির নীল-সবুজে যে লাল ছোপ তা শুধু ফুল ফোটার বার্তা দেয় না, তা কালের রাগ ও রক্তের কথাও বলে।

শিল্পী ভালোবাসেন তাঁর দেশ, দেশের প্রকৃতি ও দেশের মানুষকে, দুনিয়ার সৃষ্টিকে। তাঁর চিত্রকর্মে আমরা এই দেশাত্মবোধের পরিচয় পাই; দেখি দেশপ্রেমিক হয়েও দরদি মন নিয়ে তিনি হাঁটেন আন্তর্জাতিকতার পথে, মানবমুক্তির কল্যাণ চিন্তায়।

সুনীলের তৃতীয় একক চিত্রপ্রদর্শনী তাঁর শিল্পপ্রয়াসের বাঁকবদল ঘটিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর শ্রমসাধ্য
সৃজন-সাধনার সুফল তিনি এবার পাবেন নিশ্চয়ই। শিল্পী সুনীল কুমার পথিকের জয় হোক, আমাদের চারুশিল্প ও শিল্পীর জয় হোক।